ক্রিকেট ও সাকিব ফিরেছে ২২ গজে

Spread the love

সাকিব ফিরলেন বীরের মতোই। আর ফিরেই তার প্রিয় ওয়ানডে ভার্সানে টপ ক্রিকেটার।
আহ, এর চেয়ে আনন্দের কি হতে পারে একজন ক্রিকেটারের জন্য! ফিরেই সাফল্যের
বিজয়মালা। সাকিব পেছনে ফেললেন আফগানিস্তানের অল রাউন্ডার মোহাম্মদ নবীকে।
নবীর পয়েন্ট ৩০১। যেখানে সাকিব বড় ব্যবধানের এগিয়ে ৩৭৩ পয়েন্ট নিয়ে।
আইসিসির সর্বশেষ র‌্যাকিং এই পরিসংখ্যানে সাজিয়েছে সাকিবকে। এই সময়ে
ক্রিকেট খেলাখেলি ছিল করোনাকবলিত। ম্যাচ গড়ায়নি মাঠে। তাই সাকিবই গত
বছরের ফাটাফাটি পারফরমেন্সে ভর করেই নির্বাসন কাটিয়ে ফিরেছেন সিংহাসনে।
সব ঠিকঠাক থাকলে সাকিব ফিরছেন ৬ নভেম্বর। পারিবারিক সূত্রে এ তথ্য
জানা গেছে। এসে যথারীতি করোনা পরীক্ষা করাতে হবে সাকিবকে।

আরিফ সোহেল: করোনাভাইরাসে স্থবির ক্রীড়াঙ্গন সাত মাস থেকে নির্বাসিত ছিল ক্রিকেট। ছিল ফুটবলসহ অন্যান্য খেলাও ঘরবন্দি। বাইরে বেরুনোর উপায় নেই। পরিস্থিতিও থমথমে। এ সময়ে মাঠ সরব করতেও ঝুঁকি ছিল। সেই শঙ্কার মেঘ সরিয়ে ক্রিকেট-ফুটবলের ডামাডোল-মাতমে মেতে উঠল সারাবিশ্ব। বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে তখনও করোনার নিস্তব্ধতা, মাঠ শ্মশানের নীরবতায় খাঁখাঁ মরুভূমি। সেই দুর্বিষহ আবহ কাটাতে নেমে পড়েছিল বিসিসি। খেলাহীন ২২ গজি উইকেটে নাভিশ্বাস সরিয়ে আয়োজন করল প্রেসিডেন্ট কাপ টুর্নামেন্ট। ক্রিকেট মাঠ ফিরে পেয়েছে পুরনো জীবন। ক্রীড়াঙ্গনেও ফিরেছে প্রাণোচ্ছ্বল প্রণোদনা। সুরভিত স্নিগ্ধতার এই মৌ মৌ ঘ্রাণ অবগাহন করতেই যেন ঠিক এ-সময়ে নির্বাসন কাটিয়ে ফিরলেন ক্রিকেটের বরপুত্র সাকিব আল হাসান।
নির্বাসন সরিয়ে সাকিবের ক্রিকেটে ফেরা
না জানানোই অপরাধ। এটাই ক্রিকেটীয় বিধিবিধান। এই বিধান জানেন ক্রিকেটের সবাই। কিন্তু পাত্তা না দিয়েই যত বিপত্তি। হয়েছিল সাকিব আল হাসানের। অপরাধ করেননি। কিন্তু বাজিকর বলে কথা। তারা বড় টোপ ফেলেন। টাকার টোপ। ক্রিকেটকে কালিমালিপ্ত করার টোপ। ক্রিকেট নষ্ট করার কারবারী সাকিবকে কয়েকদফা জালে জড়াতে চেয়েছিলেন। সাকিব জেনে-বুঝেই সায় দেননি। বাজিকরের কথাও মেনে নেননি। তাই বিষয়টি নিয়ে খুব একটা ভাবেননি। সংশ্লিষ্ট কাউকে বলেনওনি। বাজিকর কি কথা বলেছেন সাকিবকেÑ তা না জানানোর অপরাধে দোষী হয়েছেন সাকিব। তাতেই দ-। ক্রিকেট থেকে পুরো দুই বছর নির্বাসন। প্রথম নির্বাসন; সরাসরি ক্রিকেটের বাইরে এক বছর। সেই এক বছরের ফাড়া কাটিয়ে সাকিব এখন মুক্ত। এবার ক্রিকেটে ফেরার পালা কিংবদন্তি সাকিব আল হাসানের। নিষেধাজ্ঞার কীট সরিয়ে সাকিব এখন যে কোনো পর্যায়ের পেশাদার ক্রিকেটে ফিরতে পারবেন। গত ২৯ অক্টোবর শেষ হয়েছে সাজার এক বছর।
২০১৯ সালের ২৯ অক্টোবর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল সাকিব আল হাসানকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করেছিল। যার মধ্যে এক বছর ছিল স্থগিত নিষেধাজ্ঞা। ছিলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের কঠিনতম নজরদারিতে। আইসিসি’র নোটিস পেয়েই সাকিব নিজের ভুল বুঝতে পারেন। বিনাবাক্যে সাকিব আল হাসান ঘটনার দায় স্বীকার করে বলেন, ‘আমি খুব দুঃখিত, আমার নিষেধাজ্ঞার জন্য। আমি খেলা ভালোবাসি। আমার বিরুদ্ধে আনা দায় আমি মেনে নিয়েছি। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইসিসির যে অবস্থান সেখানে আমি আমার দায়িত্ব যথাযথ পালন করতে পারিনি।’
সাকিবের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, আন্তর্জাতিক দুটি ম্যাচ ও আইপিএলের একটি ম্যাচে ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব পেয়েও তা জানাননি আইসিসির দুর্নীতি দমন বিভাগকে। আন্তর্জাতিক ম্যাচ দুটি ছিল জিম্বাবুয়ে ও শ্রীলংকার বিপক্ষে; ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ত্রিদেশীয় সিরিজে। একই বছর আইপিএলের সানরাইজার্স হায়দরাবাদ-কিংস ইলেভেন পাঞ্জাবের ম্যাচেও একই ঘটনা ঘটান সাকিব। আইসিসির দুর্নীতি দমন আইনের ২.৪. ৪ ধারার পরিপন্থী কাজ করেছেন সাকিব। আইসিসি জেনেছে তিনবারই সাকিবকে ফিক্সিংয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এই প্রস্তাব দেওয়া বাজিকরের নাম দীপক আগারওয়াল। ভারতীয় এই বাজিকরের সঙ্গে সাকিবের তিনবার যোগাযোগ হওয়ার প্রমাণ পায় আইসিসি। নথি পেয়ে ২০১৯ সালের ২৩ জানুয়ারি ও ২৭ আগস্ট দু-দফা সাকিবকে জিজ্ঞাসাবাদ করে আইসিসি। সাকিব ভুল স্বীকার করার পাশাপাশি দায় মেনে নেওয়ায় ২৯ অক্টোবর আইসিসি তাকে সব ধরনের ক্রিকেটীয় কর্মকা- থেকে দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে। নিয়ম অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞার প্রথম বছরে আইসিসির আইন না ভাঙায় পরের এক বছরের শাস্তি থেকে সাকিব রেহাই পাবেন। সেই রেহাই পেয়েই সাকিব ফিরেছেন।
গত এক বছরে ৩ সংস্করণের ক্রিকেট মিলিয়ে বাংলাদেশ দলের হয়ে ৩৬টি ম্যাচের বাইরে থাকার কথা ছিল সাকিবের। তবে করোনাভাইরাসের কারণে খেলাধুলা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এর বেশির ভাগ ম্যাচই হয়নি। বাংলাদেশ দলকেও তাই খুব বেশি ম্যাচে সাকিবের অভাব অনুভব করতে হয়নি। সাকিব নিষিদ্ধ থাকার সময়ে বাংলাদেশ দল খেলেছে মাত্র ৪টি টেস্ট, ৩টি ওয়ানডে ও ৭টি টি-টোয়েন্টি।
এ বছর অক্টোবর-নভেম্বরের শ্রীলংকা সিরিজটি করোনার কারণে স্থগিত না হলে এই সিরিজের দ্বিতীয় টেস্ট দিয়েই সাকিবের ক্রিকেটে ফেরার কথা ছিল। তাই সাকিবকে অপেক্ষায় থাকতে হবে জানুয়ারিতে হতে যাওয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে হোম সিরিজের জন্য।
সাকিব মাঠে নামছেন নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি সময়েই। এ-সময়ে বিসিবি পাঁচ দলের টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট আয়োজন করবে। সাকিব যুক্তরাষ্ট্রে থাকলেও টুর্নামেন্টে খেলতে চলতি মাসের শুরুতেই দেশে ফিরেছেন। নির্বাচকরাও তাকে রেখেই গড়ছেন দল।
নিষেধাজ্ঞার এক বছর সাকিব বেশির ভাগ সময়ই পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে কাটিয়েছেন। গত মার্চে দ্বিতীয় সন্তানের জন্মের সময় স্ত্রীর পাশে থাকতে সেখানে চলে যান তিনি। গত ২ সেপ্টেম্বর ফিরেছিলেন দেশে। এই ফেরার উদ্দেশ্য ছিল শ্রীলংকা সিরিজকে সামনে রেখে মাঠে ফেরার প্রস্তুতি নেওয়া। কোচ নাজমুল আবেদীনের তত্ত্বাবধানে বিকেএসপিতে অনুশীলনও শুরু করেছিলেন। কিন্তু সিরিজটি স্থগিত হয়ে যাওয়ায় সাকিব আবারও ফিরে যান যুক্তরাষ্ট্রে। তবে সেখানেও চালিয়ে গেছেন অনুশীলন।
সাকিবের ক্রিকেটকে ফিরে আসাটা দারুণভাবে সবাই স্বাগত জানিয়েছেন। তার মাঠের সতীর্থরা তো রীতিমতো মুখিয়েই ছিলেন। ক্রিকেট সংশ্লিষ্টরা ছিলেন তাতিয়ে। সেই তাদের একজন বাংলাদেশের নানা পর্যায়ের ক্রিকেট দল পরিচালনাকারী নাজমুল আবেদীন ফাহিম। তার কাছে বড্ড প্রিয় সাকিব আল হাসান। সাকিবও তাকেই গুরু মানেন। প্রয়োজন হলেই নানা টেকনিক্যাল ও ক্রিকেটীয় সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পেতে সাকিব ছুটে যান তার কাছেই। সাকিবের ফেরা নিয়ে উৎফুল্ল নাজমুল আবেদীন ফাহিম বলেছেন, সাকিব যে মাপের প্লেয়ার তাতে করে সময় ও দক্ষতাকে কাজে লাগাতে সক্ষম হবেন তিনি। নিষিদ্ধ হওয়াটা কখনোই কোনো ক্রিকেটারের কাছে সুখকর বিষয় নয়। কিন্তু সাকিব জানে যে পরিস্থিতি কীভাবে সামাল দিতে হয়। কীভাবে ঘুরে দাঁড়ানো যায়।

২২ গজ আঙিনায় ক্রিকেটের পুনর্যাত্রা
ক্রিকেটারদের জাগিয়ে তুলতে তিন দলের ক্রিকেট আসরের আয়োজন করেছে বিসিবি। এই আসর থেকে ক্রিকেটডঙ্কা বেজেছে সারাদেশে। উদ্বেলিত-উজ্জীবিত হয়ে উঠেছেন ক্রিকেটাররা। এই আসর শুরুর আগেই ক্রিকেটার একে একে ব্যক্তিগত উদ্যোগে অনুশীলনে ফিরেছিলেন সেপ্টেম্বর থেকেই। মাঠে কেমন আছেন ক্রিকেটাররা; তা জানতেই আসর সাজিয়েছিল বিসিবি। আসরের নাম ছিল প্রেসিডেন্ট কাপ টুর্নামেন্ট। ডাবল লিগ পদ্ধতিতে আসর গড়িয়েছিল। অংশ নেয় তিন দল। এই দল সাজানোর কাজটি করে দিয়েছে বিসিবিই। তামিম একাদশ, মাহমুদউল্লাহ একাদশ ও নাজমুল একাদশ। কাকতালীয়ভাবে এই আসরে ফাইনালে উঠেছিল মাহমুদউল্লাহর দল। ঠিক তেমনভাবেই আসরের চূড়ান্ত লড়াই থেকে ছিটকে গেছে দুরন্ত তামিমের একাদশ। আসরে ডাবল লিগ লড়াইয়ে দুবারই হেরেছিল তারা জুনিয়র নাজমুল একাদশের কাছে। ফাইনালে যাওয়াই অনিশ্চিত ছিল মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের দলের। তাকিয়ে থাকতে হয়েছে নাজমুলদের ম্যাচের জয়ের দিকে। সেই বাদ পড়া আর না পড়ার দোলাচলে থাকা মাহমুদউল্লাহরাই শেষ পর্যন্ত বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপের চ্যাম্পিয়ন দল।
তারপরও এ আসরটি ক্রিকেট রাঙিয়ে-জাগিয়ে-আলোকিত করেছে নানাভাবে। কীভাবে দেখে নিন আসরের নানা গল্পÑ
১. প্রেসিডেন্ট কাপ টুর্নামেন্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘প্রস্তুতিমূলক টুর্নামেন্ট’ বলা হলেও ১১ ক্যাটাগরির প্রাইজমানিসহ প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঝাঁজ আনতে অনেক আয়োজনই রেখেছিল বিসিবি। ফলে দীর্ঘ বিরতির পর ক্রিকেটের মাঠে ফেরাটা ছিল দুর্দান্ত। টুর্নামেন্টের চ্যাম্পিয়ন দলের জন্য ট্রফির সঙ্গে ছিল ১৫ লাখ টাকা। রানার্সআপ দল পেয়েছে সাড়ে ৭ লাখ টাকা। ম্যান অব দ্য সিরিজের পুরস্কার ২ লাখ টাকা। আসরের সেরা ব্যাটসম্যান, সেরা ফিল্ডার ও সেরা বোলার প্রত্যেকের জন্য ছিল ১ লাখ টাকা করে। ফাইনালের ম্যাচ সেরা খেলোয়াড়ও পেয়েছেন ১ লাখ টাকা। প্রতি ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়ের জন্য বরাদ্দ ছিল ৫০ হাজার টাকা। এছাড়া, প্রতি ম্যাচে সেরা ব্যাটসম্যান, সেরা বোলার ও সেরা ফিল্ডারের আলাদা ক্যাটাগরির পুরস্কারও রাখা হয়েছিল। তারা প্রত্যেকে পেয়েছেন ২৫ হাজার টাকা করে।
২. বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপ ক্রিকেট ছিল এবার পুরোপুরি পেসারদের। তাসকিন আহমেদ, রুবেল হোসেন, সাইফউদ্দিন, আল আমিনের মতো প্রতিষ্ঠিত পেসাররা যেমন ভালো করেছেন; ভালো করেছেন তরুণ পেসাররাও। এদের মধ্যে দুরন্ত ছিলেন নবীনতম পেসার সুমন। ছিলেন দুর্দান্ত। বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপে অন্য পেসাররাও দারুণ সফল। টুর্নামেন্টের সেরা ১০ উইকেট শিকারিদের তালিকায় আটজনই পেসার। ম্যান অব দ্য ফাইনাল হয়েছেন পেসার সুমন খান। তামিম একাদশের পেসার সাইফউদ্দিন, নাজমুল একাদশের মূল পেসার তাসকিন আহমেদও দারুণ ছন্দে ছিলেন এই আসরে। করোনার সময় কঠোর পরিশ্রম, ফিটনেস বাড়ানোর ফল পেয়েছেন পেসাররা। টুর্নামেন্টে ১২ উইকেট নিয়ে সেরা হয়েছেন রুবেল। ফাইনালে না উঠলে ১২ উইকেট পেয়েছেন মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন। তাকে অনুপ্রাণিত করতে বিশেষ একটি পুরস্কারও দেন বোর্ডপ্রধান। এছাড়া দারুণ ধারাবাহিক বল করে প্রভাব বিস্তার করেছেন মোস্তাফিজ ও তাসকিন। নিয়েছেন ৮ ও ৭ উইকেট করে। আল-আমিনও ৮ উইকেট নিয়ে দেখিয়েছেন ছন্দ। ইবাদত হোসেন, আবু জায়েদ রাহি, শরিফুল ইসলাম বা মুকিদুল হাসান মুগ্ধরা অল্প সুযোগেও নিজেদের চিনিয়েছেন। সব মিলিয়ে এতজন পেসারের ঝলমলে পারফর্ম বিসিবি সভাপতির কাছে ভীষণ স্বস্তির। বলেছেন, ‘পেস বোলিং আমাদের বড় দুর্বলতা ছিল। এই প্রথম একটা টুর্নামেন্ট দেখলাম যেখানে পেসাররা ভালো করেছে। নবীনরা দুর্দান্ত করেছে। তারা এখনি জাতীয় দলে আসবে তা না। কিন্তু ওদের যদি ঠিকঠাক নার্সিং করা যায়; তাহলে পেস বোলিংয়ে ভালো সম্ভাবনা আছে।’
৩. বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপ ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান করে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্ট হয়েও কষ্ট কমেনি মুশফিকুর রহিমের। আসরে খেলেছেন নাজমুল একাদশের হয়ে। শুরুটা অবশ্য তার হয়নি। প্রথম তিন ম্যাচে রান পাননি। কিন্তু পরের ম্যাচেই করেছেন ১০৩ রান। এরপর খেলেছেন ৫২ ও ৫১ রানের আরও দুটি ঝলমলে ইনিংস। ফাইনালে করেছেন ১২ রান। ৫ ম্যাচে ৪৩.৮০ গড়ে ২১৯ রান নিয়ে টুর্নামেন্টের সেরা রানার হয়েছেন মুশি। টুর্নামেন্টসেরা হলেও দল জিততে না পারায় মুশফিকের মুখে হাসি দেখা যায়নি। মুশফিকের বাইরে রান পেরেছেন নবীন ইরফান শুক্কুর।
৪. আসরে এবার নতুন এক নামের জয়-জয়কার ছিল চোখে পড়ার মতো। নামটি সুমন খান। উদীয়মান পেসার। বড় মঞ্চে দুর্দান্ত পারফর্ম করেছেন এই নবীন পেসার। তাকে ঘিরে সবার আলাদা একটা আগ্রহ তৈরি হয়েছে। সুমন খান বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপে নিজেকে সর্বোচ্চ উচ্চতায় মেলে দিয়েছিলেন। মাহমুদউল্লাহ একাদশের তরুণ পেসার শুধু ফাইনালেই ভালো বোলিং করেছেন, তা নয়। পুরো সিরিজেই নিজেকে চিনিয়েছেন, নিয়েছেন ৯ উইকেট। ফাইনালটা ছিল তার কাছে স্পেশাল। অথচ সিরিজ শুরুর আগে সুমন ছিলেন নাজমুল একাদশের স্ট্যান্ডবাই খেলোয়াড়। মাহমুদউল্লাহ একাদশের হাসান মাহমুদের হ্যামস্ট্রিংয়ের চোট তার কপাল খুলে দেয়। ফাইনালে নাজমুল একাদশকে গুঁড়িয়ে মাহমুদউল্লাহ একাদশের শিরোপা জয়ে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ অবদান। ৩৮ রানে ৫ উইকেট নিয়ে হয়েছেন ফাইনালের সেরা বোলার। ম্যান অব দ্য ফাইনালের পুরস্কারও উঠেছে তার হাতে। তারকা পেসারদের ভিড়ে নিজেকে আলাদা করে চেনানো সুমন বলেছেন, ‘যখন সিনিয়ররা ভালো করেন, তাদের পেছনে থাকা সবাই একটা অনুপ্রেরণা পায় যে, না আমাদের বড় ভাইয়েরা ভালো করেছেন, আমাদেরও করতে হবে। এই টুর্নামেন্টে রুবেল-তাসকিন-আল আমিন ভাই সবাই ভালো করেছেন। তখন ভেবেছি তাদের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে আমাকেও ভালো করতে হবে।’ মাশরাফি বিন মুর্তজাকে তিনি আদর্শ মানেন। তবে বোলিংয়ে অনুসরণ করেন জিমি অ্যান্ডারসনকে। ধারাবাহিক ভালো করে সুমন পা রাখতে চান জাতীয় দলেÑ এটিই তার স্বপ্ন। বয়সভিত্তিক দলেও কখন খেলা হয়নি সুমনের। ক্রিকেটের মূলস্রোতে সুমনের অনুপ্রবেশ হুট করেই। আসরে দুর্দান্ত পারফর্ম তার চলার পথকে মসৃণ করে দিয়েছে। ২০ বছরের এই তরুণ নিজেকে আরও ধারালো করতে চান।
৫. ফাইনালটা একপেশেই ছিল। রানের খেলা হয়নি। হয়েছে হেলেদুলে খেলার ফাইনাল। তারপরও লিটন দাসের মুগ্ধতা জাগানিয়া দুর্দান্ত ইনিংস, ইমরুলের দুরন্ত ব্যাটিং নবীনদের প্রাণিত করেছে।
শিরোপার লড়াইয়ের ম্যাচ ছড়াতে পারেনি উত্তাপ। ফাইনালে মাঠের খেলা হয়েছে পুরোপুরি একপেশে। নাজমুল একাদশকে ৭ উইকেটে উড়িয়ে দিয়ে বিসিবি প্রেসিডেন্টস কাপ নিজেদের ঘরে তুলেছে মাহমুদউল্লাহ একাদশ। ফাইনালে মাত্র ১৭৪ রানের টার্গেট দিয়েছিল নাজমুলরা। এই ফলক টপকেছে মাহমুদউল্লাহ একাদশ মাত্র ৩ উইকেট হারিয়ে ২০.২ ওভার হাতে রেখে।
সুমন খানের দুর্দান্ত বোলিংয়ে টার্গেট ছিল নাগালেই। সেটি সহজেই ছুঁতে লিটন দাসের দুর্দান্ত ৬৯ বলে ৬৮ রানের ইনিংস। সঙ্গে ইমরুল কায়েস ও অধিনায়ক মাহমুদউল্লাহ সময় নেননি। ৫৫ বলে ৫৩ রানে অপরাজিত থাকেন ইমরুল। মাহমুদউল্লাহ ২৩* ছিলেন রান নিয়ে।
ব্যাটিংয়ে নেমে শান্ত একাদশ ৬৪ রানে ৫ উইকেট হারিয়ে ম্যাচের লক্ষ্যপট হারিয়ে ফেলে। সেখান থেকে একাই লড়ে যান ইরফান শুক্কুর। তুলে নিয়েছেন দারুণ এক ফিফটি। শেষ পর্যন্ত আউট হন ৭৫ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলে।
তরুণ পেসার সুমন ৩৮ রানে নেন ৫ উইকেট। সঙ্গে অভিজ্ঞ রুবেল হোসেন ২ উইকেটের পাশে ইবাদত হোসেন, মেহেদী মিরাজ ও মাহমুদউল্লাহর একটি করে উইকেট জয়ের গতিপথ রচনা করে দিয়েছিল।
ক্রিকেট আর ক্রিকেটের সাকিবের নির্বাসন কেটে গেছে। কেটে গেছে শঙ্কার দুঃসময়। এবার ক্রিকেটের ঝলমলে দিগন্তে ফেরার পালা। ঠিক চলতি মাসেই তেমন এক আয়োজন রেখেছে বিসিবি। আগামী ১৫ নভেম্বর থেকে ৯০ জন দেশি ক্রিকেটার নিয়ে আয়োজন করছে একটি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্ট। এই টুর্নামেন্টে কোনো বিদেশি ক্রিকেটার থাকবে না। আর এই টুর্নামেন্ট দিয়েই ক্রিকেটে ফিরবেন নির্বাসনমুক্ত সাকিব আল হাসান।

লেখক : সম্পাদকম-লীর সদস্য, উত্তরণ

Leave a Reply