বেকারজীবনের অপঠিত গল্পটা

Spread the love

মোজাফ্ফর হোসেন: সাহিত্য সম্পাদক ফোন করে বলেছেন সাত দিনের মধ্যে একটা গল্প দিতে হবে। বিষয়ভিত্তিক গল্প। এবারের বিষয় বেকারত্ব। কোনোরকম ভাবনা-চিন্তা ছাড়া বলে দিয়েছি পারব। বেকারত্ব নিয়ে ভাবতে ভাবতে আজ ঠিক পঞ্চম দিনের মাথায় আমার চাকরিটা গেল। ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! এখন এই দুদিনে বেকার অবস্থায় আমাকে লিখতে হবে বেকারত্ব নিয়ে। আগেও বেকার আমি হয়েছি; কয়েকবার। এবারও যে খুব সহজে চাকরি হবে এমনটা ভাবছি না। পত্রিকা অফিসগুলো পাল্লা দিয়ে লোক ছাঁটাই করছে। অনলাইনে কপি-পেস্ট করেও আজকাল একটা দৈনিক দিব্যি চালিয়ে নেওয়া যায়। এক সময় বেতন বাড়ানোর জন্য হাউস পরিবর্তন করেছি, আর এখন হাউস পরিবর্তন করা মানেই বেতন কমা। তাও যদি জেনে যায় চাকরি নেই, তাহলে তো আমার কিছু বলার সুযোগই থাকবে না। এক মাস বা দু-মাস চাকরি না থাকলেও আমি চালিয়ে নিতে পারব, ততটুকু সঞ্চয় আছে; কিন্তু এর বেশি হলে রুমাকে বাড়ি পাঠিয়ে দিতে হবে। এর আগেও দুবার ওকে এরকম পরিস্থিতিতে পাঠিয়েছি। প্রথমবার মেয়েটার জন্ম হয়নি, বিয়ের মাস ছয়েক পর, দ্বিতীয়বার ইলা সবে হয়েছে। এখন ইলার বয়স পনেরো। মাধ্যমিকে পড়ে। চাইলেও এ অবস্থায় ওদের বাড়িতে পাঠানো সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় বাধা হলো ইলার নানা-নানি মানে আমার শ্বশুর-শাশুড়ি আর বেঁচে নেই। চাকরি হোক আর না-হোক মিলি আর ইলাকে ঢাকাতেই থাকতে হবে। কিন্তু এসব নিয়ে পরে ভাবা যাবে, আপাতত আমাকে গল্পের একটা কাঠামো ঠিক করে নিতে হবে। এখনই যদি গল্পটা ভেবে নিতে পারি তাহলে বাসায় ফিরে লিখতে সময় লাগবে না। হাতির ঝিলে পূর্বপাশে বসে ভাবি। মানিব্যাগটা আজ খালি, তাই কিছুক্ষণ বসে আবার হাঁটতে হবে বাসার পথে।
নিজের বেকার জীবনের কিছু ঘটনা লিখলে বেকারত্ব বিষয়ে গল্প একটা হয়ে যায়। বেকার জীবনের সব গল্প যে কষ্টের তাও না, কিছু কিছু মজার গল্পও আছে। এই মুহূর্তে মজার গল্পগুলো মনে পড়ছে না। চাকরিটা থাকলে হয়তো মনে পড়ত। বিপদে পড়লে সুখস্মৃতিগুলোও মুখ ফিরিয়ে নেয়। অবশ্য মনে পড়েও লাভ নেই। আমি নিজের জীবন থেকে কিছু লিখব না বলে ঠিক করেছি। নিজের জীবন নিয়ে এত বেশি লিখেছি যে মাঝেমধ্যে অপরাধী মনে হয় নিজের কাছে। নিজস্ব কিছু দুঃখকষ্ট সবার থাকে, কিন্তু সেগুলো লিখে জনপ্রিয় হওয়ার কোনো মানে হয় না। যে জীবন নিজের তা অন্যের হবে কেন! লিখতে লিখতে জীবনের একটা গল্পও অবশিষ্ট নেই নিজের জন্য। কোনো-না-কোনো গল্পে কোনো-না-কোনো চরিত্রের মধ্যে নিজের জীবনটা যখন চলে যায় তখন আর নিজের জীবনের সেই অংশটা নিজের বলে দাবি করার সুযোগ থাকে না। গল্পে যা বলে ফেলেছি সেটা পরে বউকে বলতে গেলে বলেছে, ধুর, এটা তো তোমার গল্প! তোমার নিজের গল্প বলো। আমি আর তখন বউকে রাতের অন্ধকারে বারান্দায় বসে নিজের কোনো গল্প মনে করে বলতে পারিনি। গল্পকারের জীবনের সবগল্প উজাড়Ñ এটা একরকমের ব্যর্থতা বলে এখন মনে হয়।
কেউ তো আমার গল্প ছিনতাই করেনি, আমি সেধেই দিয়ে দিয়েছি, বিনিময়ে লোকে আমাকে লেখক হিসেবে চিনেছে। এখন যখন কেউ আমাকে প্রশ্ন করে কীভাবে লেখক হওয়া যায়, আমি অনায়াসে বলে দিতে পারি, নিজের গল্পগুলো নিঃশর্তে অন্যের মাঝে বিলিয়ে দিতে পারলে সম্ভব। কোনো গল্পই ধরে রাখা যাবে না। কেউ যদি পণ করে বসে, একটা লাইনও নিজের কথা লিখব না কোথাও, তার পক্ষে প্রতিবেদক হওয়া সম্ভব, লেখক হওয়া নয়। জীবনের শুরুতে এ-রকম সামান্য পণ আমার ছিল। ভেবেছিলাম মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান, সবকিছু বিকিয়ে দিলেও নিজের জীবনটা ধরে রাখব। বাবা-মা, পরিবার, আপনজন এদের একান্ত যে জীবন, চার দেয়ালের ভেতর যে গল্পের চলাচল তা রাষ্ট্র হতে দেব না। কিন্তু আজ পেছনে তাকিয়ে দেখি, স্মৃতিজুড়ে খাঁখাঁ শূন্যতা। বেকার জীবনের কিছু কিছু গল্প হয়ত বাকি আছে, যেহেতু বেকার জীবন নিয়ে কোনো গল্প বা উপন্যাস লিখিনি এখনও। এই কারণে এই গল্প লেখার আগে খুব সচেতন থাকতে হচ্ছে যেন সেগুলো চলে না আসে।
গল্পটা হবে অন্যকারও। অন্য কেউ বেকার হলো, তার গল্পটা বলতে হবে। তাকে নিজের কোনো গল্প দেব না। প্রথমেই চরিত্রের একটা নাম ভেবে নিই। রফিক। নামটা কমন। এ নামে দেশে কেউ-না-কেউ বেকার আছে। মেহেদিও হতে পারে। এটা আরও প্রচলিত নাম। কিন্তু মেহেদি নামে আমার এক বন্ধু আছে। গার্মেন্ট কারখানার মালিক। এই নামের কেউ যে বেকার হতে পারে সেটা মনে আসে না ওর কারণে। রফিক নামটা রাখা যেতে পারে। মোটামুটি পাকা করে ফেলি।
না। রফিক নামটা আমার পছন্দ না। পেছন থেকে অপরিচিত একজন বলে। বয়স আমার চেয়ে কম হবে। মুখে খোঁচাখোঁচা দাড়ি। জিন্সের প্যান্টের ওপর লালরঙা কলারবিহীন ফতুয়া। এ-ধরনের ফতুয়ার চল এখন উঠে গেছে। লোকটাকে মনে হয় সময় ফসকে একলাফে পনেরো বিশ বছর পরে চলে এসেছে।
আপনাকে কি আমার চেনার কথা? আমি বিস্মিত হয়ে জানতে চাই।
আমার নামটা আগে ঠিক করে নেওয়া দরকার। রফিক হলে আমি মানব না। নামটা আমার পছন্দ না। আপনি অন্য একটা নাম দিতে পারেন, শফিক হতে পারে, এটাও বেশ কমন, যদি কমন নাম নিতেই হয়। আর কমন না হলেও যদি চলে তবে আমার জীবনানন্দ নামটা খুব পছন্দের। জীবনানন্দ বেকার হয়ে রাজধানী শহরে চাকরি খুঁজে বেড়াচ্ছেন, কোনো চাকরি তিনি পাচ্ছেন না, গল্পটা নামের কারণেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে। এমনিতে বেকার জীবনের গল্প খুব একটা আকর্ষণীয় হওয়ার কথা না। লোকটি এমন করে কথার পিঠে কথা চড়িয়ে দেয় যে আমি একটা বাক্যও মাঝে বলার সুযোগ পাই না।
আপনার পরিচয়টা ভাই? আমি এবার খুব কমল সুরে বলি। এখানে নির্জন সন্ধ্যায় স্বর চড়া করার সাহস হয় না, কখন কে কোনো মতলব নিয়ে আসে বলা যায় না।
আপনার গল্পের চরিত্র। বেকার জীবনে আছি। আমার গল্পটা আপনি লিখবেন। লোকটি বলে। এতক্ষণে বুঝতে পারছি। গল্প লেখার কথা ভাবতে-না-ভাবতেই চরিত্র এসে হাজির। আগে এমন হতো না, এখন প্রায়ই হয়। কখনও কখনও চরিত্র এসে নিজেই তার গল্পটা লিখিয়ে নেয়। তারপর যখন প্রকাশ করব বলে খুঁজতে যাই, দেখি হারিয়ে ফেলেছি।
শফিক নামটা আমার পছন্দ হয় না, এই নামে একটা লোক ছিল গাঁয়ে, প্রায়ই আমার মায়ের কাছে আসত। এর বেশি বলা যাবে না। সম্পাদক বলে দিয়েছেন দৈনিকে প্রকাশিত গল্পে যৌনতার বিষয় থাকা যাবে না। আরও কিছু শর্ত আছে। গল্পটা হতে হবে দুই হাজার শব্দের মধ্যে। কোনো কঠিন শব্দ রাখা যাবে না। খুব সরলভাবে বলতে হবে যাতে কোনো সাহিত্যের অপাঠকও ভুল করে পড়ে ফেললে যেন জলের মতো বুঝে ফেলে। আর গল্পে কোনো মৌলানা বা হাজি চরিত্র রাখা যাবে না। বিতর্কিত হতে পারে এমন কোনো বিষয় থাকবে না। লেখার সময় এগুলো মাথায় রাখতে হবে। আমি আপাতত নাম নিয়ে ভাবি। জীবনানন্দ হতে পারে।
আমার প্রিয় কবি না হলেও জীবনানন্দ নামটা থাক। আমি বলি।
প্রিয় নই কেন? জীবনানন্দ আপনার প্রিয় কবি না, এটা লিখলে আপনার এই গল্প কোনো সম্পাদক ছাপবেন? বিশেষ করে সম্পাদক নিজে যদি কবি হন? লোকটি জানতে চায়।
আচ্ছা, ঠিক আছে, লাইনটা সম্পাদনার সময় ফেলে দেব। জীবনানন্দ নামটা ফাইনাল। আমি বলি। নামটা নির্ধারণ করতে পেরে কিছুটা হলেও স্বস্তি পাই।
জীবনানন্দ, আপনি কি চাকরি হারিয়েছেন? আমি লোকটির কাছে জানতে চাই।
না, ছেড়েছি। জীবনে তিনটা প্রেম করেছি, কাউকে আমি ছাড়তে পারিনি, আমি ছেড়ে দেওয়ার আগেই ওরা আমাকে ছেড়ে গেছে। চাকরির ক্ষেত্রে এই ঝুঁকিটা নিতে চাইনি। আর একদিন দেরি করলেই অফিস আমাকে ছেড়ে দিত। জীবনে কিছু না কিছু নিজে ছেড়েছি ভাবতেই ভালো লাগে। জীবনানন্দ বলেন।
আপনি কি চাকরি ছাড়ার পর থেকে খুব কষ্টে আছেন? আমি জানতে চাই।
আপনার কি মনে হয়? আপনার যদি মনে হয় আমি কষ্টে আছি, তো, আমি কষ্টে আছি। আমি তো এখন আপনার গল্পের চরিত্র মাত্র। উনি বলেন।
চরিত্র হলেও আমি চাই আপনি নিজের কথা বলেন। গল্পটা আমরা শেয়ারে লিখি।
সেটা কীভাবে?
আপনি আপনার বেকার জীবনের কষ্টের কথা বলবেন, আমি লিখব। প্রয়োজনমতো পরিবর্তন পরিবর্ধন করে নেব পরে। সেটা আপনার না জানলেও চলবে।
কিন্তু আমার তো কোনো কষ্ট নেই। মানে বেকার জীবনের কষ্ট তো আমার নেই। জীবনানন্দ বলেন।
কেন? সামনের মাস থেকে ঘরভাড়া আসবে কোথা থেকে? পরিবারের খাবার, অন্যান্য সব আয়োজন? আমি বিস্মিত হয়ে জানতে চাই।
আমাকে ওসব নিয়ে ভাবতে হয় না। বড়লোক বাবার একমাত্র সন্তান আমি। চাকরিটা ছিল সখের। ওরা ছাড়িয়ে দেওয়ার আগেই তাই ছেড়ে দিতে পেরেছি। আমার একটুও সমস্যা হয়নি সিদ্ধান্ত নিতে। চাকরি গেল এখন বাবার হোটেলে খেয়ে কিছুদিন দেশ-বিদেশ করে নেব। ভবিষ্যতে বাবার সবই তো আমার থাকবে। ওত চিন্তা কীসের! তিনি বলেন।
আপনার স্ত্রী সন্তান? আমি জানতে চাই।
আছে। স্ত্রী একটা ব্যাংকের সিনিয়র কর্মকর্তা। দুটো ছেলে, বড়টা কানাডায় স্কলারশিপ নিয়ে গেছে, ছোটটাও যাবে কিছুদিন পর। শেষ বয়সে আমারও যাওয়া ইচ্ছা আছে।
তাহলে আপনার বেকার জীবন নিয়ে আমি লিখতে পারব না। আমি কিছুটা হতাশ হয়ে জানিয়ে দিই।
কেন?
আপনার গল্প লিখলে সেটি দেশের আর সব বেকারজীবনের গল্প হবে না। আপনার যে গল্প সেটা আমাদের পাঠক খাবেও না। বড়লোক বেকারের গল্প পাঠক পড়বে কেন? বেকারের কষ্ট মানেই পরিবার খেতে পাচ্ছে না, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের চিকিৎসা হচ্ছে না, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ হঠাৎ বন্ধ। এটাই আমাদের সামাজিক বাস্তবতা। এর বাইরে কিছু লিখলে বেকারদের অপমান করা হবে।
কিন্তু যেটা সকলের জীবনে ঘটে, সেটা জানার জন্য পাঠক আপনার গল্প পড়বে কেন? জীবনপাঠ কি আরও বিশ্বস্ত নয়? জীবনানন্দ জানতে চান।
পাঠক পড়বে কারণ নিজের ব্যথার জায়গাটা পাঠক খোঁচাতে পছন্দ করে। চুলকানি যার আছে সে বোঝে ওটা না থাকার কষ্ট। দেখবেন প্রত্যেক মানুষের প্রিয় বিষয় হলো তার নিজের ক্ষত, এক মুহূর্তের জন্যও আড়াল হতে দেয় না; কোনো-না-কোনোভাবে প্রকাশ করবেই। আমি বলি।
তাহলে যে আমি মানে কবি জীবনানন্দ লিখলেন, কে হায় হৃদয়খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে? তিনি বলেন।
ভুল লিখেছেন। এই কারণেই তো কবিকে আমি অপছন্দ করি। সকলেই হৃদয়খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে। এটা মানুষের কমন রোগ। আমরা প্রত্যেকে এই কারণে অসুস্থ।
কিন্তু আমার তো কোনো দুঃখ নেই। অন্তত বেকার জীবনের দুঃখ। আমার স্ত্রী সন্তান সুখে আছে। ফুর্তিতে আছে। ওদের বাজারের জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ভাবতে হয় না। বিদেশি পণ্য আসে, ভেজাল নিয়ে ভাবতে হয় না। রোগ হলে বিদেশ ভ্রমণটাও হয়ে যায়। চিন্তা করা মাত্রই প্রয়োজন মিটে যায়।
এই কারণেই তো আপনি আমার গল্পের চরিত্র হতে পারবেন না। আমি বলি।
কেন? দুঃখ না-থাকা কি অপরাধ? সবার জীবন কোনো-না-কোনো লেখক লিখে যান তার গল্পে। আমার জীবন নিয়ে কেউ লিখবে না? আমি বড়লোকের ছেলে, সদ্য বেকার, চাকরিটা ছেড়ে আনন্দ করছিÑ এটা গল্প হতে পারে না? একটা সমাজে যখন সকলে চাকরি গেলে কষ্ট পায়, সেখানে একজন চাকরি ছেড়ে আনন্দ পাচ্ছে, এটা কি গল্পের জন্য কম আকর্ষণীয় বিষয়? তার দৃঢ় জবাব।
আমাকে ভাবতে হবে। আমি মোটেও প্রস্তুত না। আমি লক্ষ করি, নিজের জীবন নিয়ে লিখতে চাই না, আবার যে জীবন আমার নয়, তা নিয়ে লিখতেও আমার আপত্তি। লোকটির দিকে তাকিয়ে থাকি, একটা মানুষ চাকরি ছেড়ে আমার কাছে এসে নিজের গল্পটা লেখাতে চাচ্ছেন কিন্তু আমি তার গল্পটা ধরতে পারছি না। বেকারত্বের গল্প লিখতে হবে কিন্তু বড়লোকের সন্তানেরা বেকার হলেও বেকারত্বের কোনো গল্প তাদের থাকে কি না আমার বুঝতে অসুবিধা হয়।
তাহলে আপনাকে ঘর ভাড়া দিতে হয় না? ঘুরেফিরে সেই প্রশ্ন। প্রতিমাসে ঘর ভাড়া দিতে দিতে মনটা আমার ছোট হয়ে গেছে। দ্বিতীয়বার এই প্রশ্ন করাতে লজ্জা পাই। যার বাবার ঢাকায় একাধিক ফ্লাট, তাকে কেন বাড়ি ভাড়া নিয়ে ভাবতে হবে! সে তো উল্টো বাড়ি ভাড়া তুলবে মাসে মাসে।
ভাড়া মাসে মাসে দেওয়া আর তোলা কি এক বিষয় হলো! জীবনানন্দ বলেন।
আচ্ছা, প্রতি মাসে বাড়ি ভাড়া পেতে কেমন লাগে? এটা কোনো প্রশ্ন হলো, কিন্তু মুখ ফসকে বের হয়ে আসে। আমি বুঝতে পারি বেকারত্বের গল্প থেকে বের হয়ে যাচ্ছি। সচেতনভাবে গল্পে ফেরার চেষ্টা করি।
আপনি কি কখনো কোনো বেকারকে ঘর ভাড়া দিয়েছেন? আমি জানতে চাই।
ভালো মাইনে নিশ্চিত না করে ভাড়া দিই না। তবে এক ভাড়াটে একবার বেকার হয়েছে। ডেসটিনিতে কাজ করত, বন্ধ হয়ে গেলে বেকার হয়ে গেল।
বেচারা! তারপর কি ঘর ভাড়া দিতে পারত নিয়ম করে? কতদিন পর ফের চাকরি পেল জানেন? আমি জানতে চাই।
দু-মাস মতো দিতে পেরেছিল। আমার তখন হঠাৎই টাকার দরকার পড়ল, নিজে হাতে নিয়েছি বেতনটা।
আপনি কোনো বেকারের ঘর ভাড়া সংগ্রহ করার সময় কখনও কি তার চোখের দিতে তাকিয়েছেন? আমি জানতে চাই।
না। আমি টাকাটা হাতে নিয়ে গুনেছি। প্রথমবার মাঝপথে ভুল করে ফেলেছিলাম। পরেরবার দেখলাম ঠিক আছে। এক টাকাও কম দেয়নি।
এরপর কি তিনি নেমে গেলেন স্বেচ্ছায় না নামিয়ে দিলেন?
আমি কিছু বলিনি। লোকটা খুব ভদ্র ছিল। নামিয়ে দেওয়ার সুযোগ দিল না। আমার খুব ইচ্ছা ছিল, একজন ভাড়াটিয়াকে নামিয়ে দেব আমি নিজে। কিন্তু প্রতিবারই তারা আমি বলার আগেই নেমে গেছে। জীবনানন্দ বলেন।
আগে জানলে আপনার নাম জীবনানন্দ দিতাম না। তিনি এত বড়লোক ছিলেন না। তিনি বেকারের ঘর ভাড়া তার সামনে দাঁড়িয়ে তার চোখের দিকে একবারও না তাকিয়ে দুবার গুনতে পারতেন না। আপনাকে ভুল নাম দিয়েছি।
জীবনানন্দ নামটি যে জীবনানন্দের জন্য সঠিক ছিল তারই-বা প্রমাণ কি? আমরা সকলে যে ভুল নামে ভুল মানুষের ভূমিকায় অভিনয় করে যাচ্ছি না, তা কি আপনারা লেখকরা নিশ্চিত করে বলতে পারেন? লোকটি উত্তর দেয়।
আপনাদের তো প্রতিষ্ঠান আছে, কারবার আছে, কত লোকের চাকরি দেন; কখনও কি কোনো মানুষের চাকরি গেছে ক্যারিয়ারের মাঝপথে? আমি জানতে চাই।
একবার একজনের চাকরি খেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এক সড়ক দুর্ঘটনায় লোকটা পৃথিবী ছেড়েই চলে গেল! আমি সব সময় কাউকে-না-কাউকে চাকরিচ্যুত করে দেখতে চেয়েছি কেমন লাগে কিন্তু যাদের টার্গেট করেছি তারা আগেই কোনো-না-কোনো কারণে চলে গেছে, অধিকাংশ চাকরি ছেড়ে, দুয়েকজন পরকালে।
যে লোকটা চাকরি ছেড়েছে কখনও তার কাছে জানতে চেয়েছেন সে কোনো ব্যবস্থা করে ছাড়ছে কি না কিংবা তার কয়েক মাস চলার মতো সঞ্চয় আছে কি না?
না। যে লোকটার চাকরি গেছে, আমাকে তার রিপ্লেসমেন্ট নিয়ে ভাবতে হয়েছে। বেকার জীবনের কষ্ট আমি বুঝি না। কিন্তু জানি যোগ্য মানুষকে রিপ্লেস করা কত কষ্টের কাজ। সামান্য একটা দারোয়ান পোস্টের জন্য শতশত মানুষ আসে। যে লোকটা দাঁড়াতে পারে না সেও আসে। যার বয়স হয়েছে মৃত্যুর, সেও এসে সিকিউরিটি গার্ডের চাকরি চায়। কখনও কখনও নারীরাও চলে আসে সিকিউরিটি গার্ড হতে। একবার এক প্রেগন্যান্ট মহিলা এসে চাকরি চায়, আটতলা পর্যন্ত সিঁড়ি ধোয়া-মোছা করবে।
চাকরিটা দিয়েছিলেন?
না।
শেষ পর্যন্ত কোনো চাকরি কি পেয়েছিল?
জানি না। আরও অনেক গল্প জানি চাকরি না পেয়ে কিংবা ছেড়ে চলে যাওয়ার।
কিন্তু নিজে বেকার হয়েও আপনি একজন বেকারের গল্পটা বলতে পারবেন না। আমি বলি। আমাকে উঠে পড়তে হয়। পশ্চিম দিকে হাঁটা শুরু করি। পূর্বদিকে বাড়ির পথ। কিন্তু আজ পশ্চিম দিকে হাঁটতে আমার ভালো লাগছে। লোকটি আমার পেছনে পেছনে হাঁটেন।
আমি আপনার গল্প লিখতে পারব না। আমি বলি। আমাকে আমার গল্পই লিখতে হবে।
লোকটি তবু পেছনে পেছনে আসেন। রাস্তা সকলের, আমি কিছু বলতে পারি না।
আপনার কাছে কটা টাকা হবে? লোকটি আমার কাছে জানতে চান। আমি এবার না থেমে পারি না।
মেয়েটার জ্বর। নিশ্চয় ছেড়ে যাবে। ওষুধ না খেলেও কখনও কখনও জ্বর ছেড়ে যায়। কিন্তু দুধ না খেলে বাঁচবে না! তিনি বলেন। আমি ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকি। একজন বেকারের চোখের-মুখের ভাষা আমার চেনা।
জীবনানন্দ; আপনি গল্পের সেই জীবনানন্দ তো? আমি জানতে চাই।
না; অন্যকেউ। বাস্তবে আমি একজন শফিক অথবা একজন রফিক।
তাহলে জীবনানন্দ কে? কার গল্প ওটা? আমার বিস্ময় ও বিরক্তি দুটোই বাড়ে।
অন্য কেউ। আমি জানি না। রোজ রোজ এক গল্প ভালো লাগে না। বলেছিলাম না, কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালোবাসে! অন্য গল্পের চরিত্র হতে চেয়েছি। এভাবে যদি জীবনের গল্পটা বদলে ফেলা যেত! বিপরীত চরিত্রে কেমন মানিয়েছে আমাকে? লোকটি জোর করে হেসে জানতে চান।
কিন্তু কেন? ভুল গল্পের নায়ক হবেন কেন? আমি বলি।
জীবন অদলবদল করতে চাই। আপনি লেখক, এটা করা আপনার কাজ। পারবেন আমারটা বদলে দিতে?
কিন্তু আপনাকে চাকরি পাইয়ে দিলে তো বেকার জীবনের গল্প লেখা হলো না? আমাকে বেকার জীবনের গল্প লিখে পাঠাতে হবে। হাজার দুয়েক টাকা পাব এই চাকরি হারানো মাসে। অন্য গল্পের এখন প্রয়োজন নেই আমার।
চাকরির কথা বলছি না। বলছি, বেকারই থাকলাম, আমার অবস্থানটা বদলে দেন।
কী রকম? আমি জিজ্ঞাসা করি হাঁটতে হাঁটতে। পেছনে পেছনে হাঁটেন লোকটি।
যে-রকম বললাম। ইচ্ছা করে চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি। বড়লোক বাবার একমাত্র সন্তান। স্ত্রী চাকরি করে, একটা ছেলে দেশের বাইরে, অন্যটাও যাবে। বলতে বলতে লোকটি খুব কাছে আসেন একবার। আমার শরীরের কোথাও ছোঁয়া লাগে তার। এরপর দ্রুত পায়ে হেঁটে যান আমাকে অতিক্রম করে। আমি তাকাতেই দৌড়ে ঢুকে পড়েন ডানের এক চিকন গলিতে। কী যেন ভেবে পকেটে হাত দিয়ে দেখি। ভাবি চিৎকার দিই পকেটমার বলে, তৎক্ষণাৎ মনে পড়ে মানিব্যাগটা খালি, কয়েকটা অকেজো কার্ড পড়ে আছে শূন্যস্থান পূরণ করে।

Leave a Reply