বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন-সাধ, বদলে যাওয়া বিশ্ব এবং সমকালীন বাংলাদেশ

Spread the love

ড. আতিউর রহমান: তীব্র ঠা-াযুদ্ধের টানাপড়েনের মধ্যেই বাংলাদেশের জন্ম। তখনও বিশ্ব সনাতনী পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক শিবিরে বিভক্ত। সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব সে-সময় বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের পাশে ছিল। আমাদের ঘনিষ্ঠতম সমর্থক ভারতও তখন ঐ বিশ্বের সমর্থক। সামাজিক ন্যায়বিচার, অর্থনীতির প্রধান প্রধান অংশ সরকারি খাতে এবং জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাসী ভারত সরকার ও জনগণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্তর্নিহিত লক্ষ্যসমূহের সাথে একমত ছিল শুরু থেকেই। পরবর্তী সময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান, প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা, বাজেট এবং আর্থ-সামাজিক নীতিমালায় বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক, গণতান্ত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমাজ ও অর্থনীতি গড়ে তোলার প্রত্যয় ঘোষণা করা হয়।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার বিভিন্ন ভাষণে এমন একটি জনহিতৈষী আর্থ-সামাজিক রূপান্তরের কথা বারেবারে উচ্চারণ করেছেন। ১৯৭২ সালের ৭ জুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক ভাষণে তিনি সমাজ নির্মাণের নিজস্ব চিন্তাধারার প্রকাশ ঘটান। তিনি বলেন, “আমি বিশ্বের কাছ থেকে সমাজতন্ত্র ধার করতে চাই না। বাংলার মাটিতে এই সমাজতন্ত্র হবে বাংলাদেশের মানুষের। এই সমাজতন্ত্র হবে বাংলার মানুষের যেখানে কোন শোষণ এবং সম্পদের বৈষম্য থাকবে না। ধনীকে আমি আর ধনী হতে দিবো না। কৃষক, শ্রমিকেরা এবং জ্ঞানীরা হবে এই সমাজতন্ত্রের সুবিধাভোগী।” তিনি এমন সামাজিক ব্যবস্থা চালু করতে চেয়েছিলেন যেখানে জমির মালিকানা অক্ষুণœ রেখেই সমবায়ের ভিত্তিতে কৃষির আধুনিকায়ন করা হবে। অন্যদিকে শিল্প-কারখানার ব্যবস্থাপনায় শ্রমিক প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। তিনি গণতন্ত্রের মাধ্যমে তার উদ্ভাবিত সমাজতন্ত্র বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন। তিনি ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী ছিলেন। তাই তিনি শ্রমিকদের অংশগ্রহণে যাতে কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি না হয় তা নিশ্চিত করতে চেয়েছেন। সংবিধানে যে ৪টি মৌলভিত্তি তাতেই তিনি গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের পাশাপাশি অন্যান্য লক্ষ্য পূরণ করতে চেয়েছেন।
জনগণকে সম্পৃক্ত করে মাটিঘেঁষা অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করার যে লক্ষ্যে তিনি ‘দ্বিতীয় বিপ্লবে’র কর্মসূচি নিয়েছিলেন; তার মূল কথাই ছিল প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ, দুর্নীতি দূর করা এবং শোষণমুক্ত সমাজ গঠন করা। তার নিজের ভাষায় “এদের মুখে হাসি ফোটাতে হবে, দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে হবে, এদের খাবার দিতে হবে।… আমার আদর্শ হলো বাংলাদেশকে স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে ইজ্জত সহকারে দুনিয়াতে বাঁচিয়ে রাখা, বাংলার দুঃখী মানুষকে পেট ভরে খাবার দিয়ে শোষণমুক্ত সমাজ গঠন করা, যেখানে অত্যাচার জুলুম থাকবে না, দুর্নীতি থাকবে না।” (মোনায়েম সরকার সম্পাদিত, বাঙালির কণ্ঠ, আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৮. পৃ. ৪৩১)। জনতাকে একতাবদ্ধ করে সামাজিক পুঁজিকে ব্যবহার করে অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নের কর্মসূচি তিনি দিয়েছিলেন। মানুষের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দিয়ে ভেবেচিন্তে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।
শুধু স্বদেশের নয়, সারাবিশ্বের নির্যাতিত, নিপীড়িত মানুষের জন্য শোষণমুক্ত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে নয়াবিশ্ব-ব্যবস্থার ডাক দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথমবারের মতো বাংলা ভাষায় বঙ্গবন্ধু উচ্চারণ করেছিলেন, “জাতিসংঘের যে মহান আদর্শের কথা বলা হয়েছে তা আমাদের জনগণের আদর্শ এবং এ আদর্শের জন্য তারা চরম ত্যাগ স্বীকার করেছে। এমন এক বিশ্ব-ব্যবস্থা গঠনে বাঙালী জাতি উৎসর্গকৃত, যে ব্যবস্থায় মানুষের শান্তি ও ন্যায় বিচার লাভের আকাক্সক্ষা প্রতিফলিত হবে এবং আমি জানি আমাদের প্রতিজ্ঞা গ্রহণের মধ্যে আমাদের শহীদের বিদেহী আত্মার স্মৃতি নিহিত রয়েছে। অনাহার, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও বুভুক্ষার তাড়নায় জর্জরিত, পারমাণবিক যুদ্ধের দ্বারা সম্পূর্ণ ধ্বংস হওয়ার শঙ্কায় শিহরিত বিভীষিকাময় জগতের দিকে আমরা এগোবো না, আমরা তাকাবো এমন এক পৃথিবীর দিকে যেখানে বিজ্ঞান ও কারিগরি জ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতির যুগে মানুষের সৃষ্টিক্ষমতা ও বিরাট সাফল্য আমাদের জন্য এক শঙ্কামুক্ত উন্নত ভবিষ্যৎ গঠনে সক্ষম। এই ভবিষ্যৎ হবে পারমাণবিক যুদ্ধের আশঙ্কা থেকে মুক্ত। বিশ্বের সকল সম্পদ ও কারিগরি জ্ঞানের সুষ্ঠু বণ্টনের দ্বারা এমন কল্যাণের দ্বার খুলে দেয়া যাবে যেখানে প্রত্যেক মানুষ সুখী ও সম্মানজনক জীবনের ন্যূনতম নিশ্চয়তা লাভ করবে।” বিশ্বব্যাপী যে মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে সম্পদের বিরাট অংশ সমবেত হচ্ছিল তিনি সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার লক্ষ্যে “ন্যায়সংগত আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য যুক্তির শক্তিকে কাজে লাগানোর” কথা বলেছিলেন। এমন এক বিশ্ব-ব্যবস্থার তিনি পক্ষে ছিলেন যেখানে “প্রতিটি মানুষ যাতে তার ব্যক্তিত্বের বিকাশ ও মর্যাদার উপযোগী অর্থনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার ভোগ করতে পারে।” মানবাধিকার সংক্রান্ত সর্বজনীন ঘোষণায় এ অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেছিলেন, আমাদের আন্তর্জাতিক দায়িত্ব এমনভাবে পালন করতে হবে যাতে প্রতিটি মানুষ নিজের ও পরিবারের সুখ-সমৃদ্ধির জন্য প্রয়োজনীয় জীবন ধারণের মান প্রতিষ্ঠা অর্জনের নিশ্চয়তা লাভ করে। সবশেষে তিনি জাতিসংঘের বিশ্বসভায় তার অন্তরের গভীরতম স্বপ্ন-সাধ এই ভাষায় প্রকাশ করেন : “আমি মানবের অসাধ্য সাধন ও দুরূহ বাধা অতিক্রমের অদম্য শক্তির প্রতি আমাদের পূর্ণ আস্থার কথা আবার ঘোষণা করতে চাই। আমাদের মতো দেশসমূহ, যাঁদের অভ্যুদয় সংগ্রাম ও ত্যাগের মধ্য দিয়ে, এই আদর্শের বিশ্বাসই তাঁদের বাঁচিয়ে রাখবে। আমাদের কষ্ট স্বীকার করতে হতে পারে। কিন্তু আমাদের ধ্বংস নাই। এই জীবনযুদ্ধের মোকাবেলায় জনগণের প্রতিরোধ ক্ষমতা ও দৃঢ় প্রতিজ্ঞাই শেষ কথা। আত্মনির্ভরশীলতাই আমাদের লক্ষ্য। জনগণের উদ্যোগই আমাদের নির্ধারিত কর্মধারা।” তিনি সেই কর্মধারা বাস্তবায়নে সৃজনশীল নানা উদ্যোগ নিয়ে “জনগণের ঐক্যবদ্ধ ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে” নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে হাঁটছিলেন। কিন্তু আমাদের এবং এ বিশ্বের শোষিত জনগণের বড়ই দুর্ভাগ্য যে দেশীয় ও বিশ্বের কায়েমি স্বার্থবাদীরা তার এই চলার প্রচেষ্টা থমকে দেয় পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট। মানবতার সেই জঘন্যতম অপরাধের কথা আমরা সবাই জানি। এরপর বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতিতে যে কতিপয়তন্ত্রের আবির্ভাব হয় এবং সামাজিক সুবিচার ভূলুণ্ঠিত হয় সে-কথাও আমরা জানি।
যে দুষ্ট গ্রহ বাংলাদেশের সোনার বাংলা অভিমুখে যাত্রার পথকে কণ্টকাকীর্ণ করেছিল তাদের রাজনৈতিকভাবে সরাতে দীর্ঘদিন আমাদের সংগ্রাম করতে হয়। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পর ঐ অপশক্তিকে রাজনৈতিকভাবে অপসারণ করা গেলেও সমাজ ও অর্থনীতিতে তারা যে অপশক্তির শেকড় গেড়ে গেছে, সেসবের মোকাবিলা করে করেই উদারনৈতিক বাংলাদেশকে এগুতে হচ্ছে। যে বৈষম্যের বীজ তারা সর্বত্র বুনেছে সেসব থেকে বিশাল বিশাল বিষবৃক্ষের কালোছায়া সমাজ ও অর্থনীতিকে এখনও ঢেকে রাখছে। এ-কথা ঠিক যে বঙ্গবন্ধু-কন্যা তার প্রজ্ঞা, ধৈর্য ও কৌশলের মাধ্যমে সবদিক সামলে কৃষি ও শিল্পের অভাবনীয় বিকাশ ঘটিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। খাদ্য সূচকে বাংলাদেশ এখন চীন, ভারত ও ভিয়েতনামকেও পেছনে ফেলে দিয়েছে। শিল্প খাতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি ঘটে চলেছে। জিডিপি’র প্রায় এক-চতুর্থাংশের জোগান এখন শিল্প খাতই দিচ্ছে। এর প্রভাব কর্মসংস্থানের ওপর পড়েছে। আর বাড়ন্ত কৃষি তো প্রায় ৪০ শতাংশেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান দিয়েই যাচ্ছে। সবমিলে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার আশাতীতভাবে কমছিল। ২০০৯ সালে বঙ্গবন্ধু-কন্যা পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর কৃষি ও শিল্প ছাড়া সেবা খাতেও ব্যাপক প্রবৃদ্ধি ঘটেছে। যে-কারণে গত এক দশকে দারিদ্র্যের হার ৪০ শতাংশ থেকে কমে অর্ধেকে নেমে এসেছিল। কোভিড-১৯ আক্রমণের আগে অতিদারিদ্র্যের হারও অর্ধেকে নেমে এসেছিল। আর সামাজিক সূচকগুলোতে তো বাংলাদেশের অগ্রগতির ধারা ছিল বিশ্বখ্যাত। কিন্তু গত সাত মাস ধরে এই অভাবনীয় মহামারি সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিকেও বেশ খানিকটা কাবু করে ফেলছে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু-কন্যার বিচক্ষণ নীতি-উদ্যোগের কারণে অন্যান্য অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশ তার প্রবৃদ্ধির বিচারে অপেক্ষাকৃত ভালোই করেছে। তা সত্ত্বেও অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর যে চাপ পড়েছে তাতে দারিদ্র্য নিরসনের যে অগ্রগতি আমরা করেছিলাম তা অনেকটাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দারিদ্র্য ফের ২০.৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৯ শতাংশে পৌঁছে গেছে। তদুপরি কয়েকবার বন্যার প্রকোপে বাংলাদেশের উত্তর ও মধ্য অঞ্চলে কৃষির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চরাঞ্চলগুলোতে বড় ধরনের চাপ পড়েছে। সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক নানা ধরনের প্রণোদনা কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে এলেও বড় উদ্যোক্তরা যেভাবে সরকারের দেওয়া আর্থিক সুবিধা নিতে পেরেছে গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাত, বিশেষ করে কৃষক সেভাবে নিতে পারেনি। এমনিতেই কোভিডের আগে অর্থনৈতিক বৈষম্যের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থা বেশ চ্যালেঞ্জিং ছিল। দশমিক ৪৭-এর মতো ছিল। এই কোভিডের প্রভাবে হয়তো এই সূচকের আরও অবনতি হয়েছে।
শুধু বাংলাদেশ কেন, সারাবিশ্বেই কোভিডের কারণে দারিদ্র্য পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের সূচকসমূহের অবনতি ঘটেছে। বিশ্ব অর্থনৈতিক যে মন্দা এক দশক আগে পৃথিবীকে গ্রাস করেছিল, তা থেকে অনেক কষ্টে বিভিন্ন দেশ মূলত নমনীয় মুদ্রানীতি ব্যবহার করে উঠে দাঁড়িয়েছিল। প্রবৃদ্ধির গতি আগের মতো না হলেও বিশ্বব্যাপী ইতিবাচক প্রবৃদ্ধিই হচ্ছিল। দারিদ্র্যও কমছিল। তবে বৈষম্যের সূচকসমূহ প্রাক-কোভিডকালেও অস্বস্তিকর ছিল। কিন্তু কোভিড আসার পর তা আরও খারাপের দিকে যেতে শুরু করেছে।
বার্লিন দেয়াল ভেঙে দেওয়ার পর সনাতনী সমাজতন্ত্র উঠে যেতে শুরু করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে অনেক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। তবুও রাশিয়া অন্যতম প্রধান রাষ্ট্রের পরিচয় ধরে রাখে। পুঁজিবাদী অর্থনীতির পথ বেছে নেয় এসব রাষ্ট্র। এর কিছুদিন পরে চীনেও পুরনো সমাজতান্ত্রিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। একদলীয় শাসন-ব্যবস্থা বজায় থাকলেও চীনে ব্যক্তি খাত ও বিদেশি বিনিয়োগের দরজা খুলে দেওয়া হয়। ফলে চীনের জিডিপি দ্রুত বাড়তে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমী দেশগুলোর সাথে অর্থনৈতিক সংযোগ দ্রুতলয়ে বাড়তে শুরু করে চীন যখন বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় প্রবেশ করে। বিশ্বায়নের গতিও বাড়তে থাকে। বিশ্ব আর্থিক মন্দা থেকে বিশ্বকে টেনে তোলার ক্ষেত্রে চীনের ক্রমপ্রসারমান অর্থনীতি অনেকটাই ইঞ্জিনের ভূমিকা পালন করে। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত চীনের পণ্য প্রবেশের পথ উন্মুক্তই ছিল। তাতে মার্কিনীদের ভোগ্যপণ্য সস্তায় মিললেও বাণিজ্যিক ভারসাম্য যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে এবং চীনের পক্ষে যেতে শুরু করে। চীনও যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক খাতে বিপুল বিনিয়োগ করে। মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চীনের রিজার্ভ কয়েক ট্রিলিয়ন ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় এসেই চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করে দেন। ফলে বিশ্বায়নের ধারা অনেকটাই ব্যাহত হয়। ইউরোপ ও জাপানও চীনের সাথে কোভিড-উত্তর বাণিজ্য কমিয়ে ফেলার উদ্যোগ নিতে শুরু করেছে। এসবের প্রভাব সারাবিশ্বের অর্থনীতিতে পড়তে শুরু করেছে। তাছাড়া কোভিড ঠেকাতে লকডাউন করায় কম আয়-রোজগারি মানুষের আয় আরও কমতে শুরু করেছে। ফলে বিশ্বজুড়েই আয় ও সামাজিক বৈষম্য বাড়ছে। আইএমএফ প্রক্ষেপণ করেছে যে চলতি বছর বিশ্ব অর্থনীতি ৫ শতাংশের বেশি হারে সংকুচিত হবে। বিশ্বব্যাংক আশঙ্কা করছে এর ফলে ১০ কোটি মানুষ নতুন করে গরিব হয়ে যাবে, যাদের অর্ধেকই অতিগরিব। এছাড়াও সামাজিক বৈষম্য ব্যাপক হারে বাড়বে। বিশেষ করে নারীর ওপর দারিদ্র্যের চাপ আরও বেশি করে পড়বে। তাছাড়া বয়স্ক, শিশু, প্রতিবন্ধী এবং মাইগ্র্যান্ট জনগোষ্ঠীর আয়-রোজগার কমে যাচ্ছে। যারা উচ্চ আয়ের কর্মী তারা ঘরে বসে কাজ করতে পারলেও কম মজুরির কর্মীরা প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা ও কাজের ধরনের কারণে তেমনটি পারছেন না। আর কম আয়ের মানুষেরাই হোটেল, রেস্তোরাঁ, ছোটখাটো দোকান ও ফুটপাথে কাজ করে। গৃহকর্মী হিসেবেও কম আয়-গোষ্ঠীর নারীরাই সংখ্যায় বেশি। লকডাউনের সময় বিশ্বজুড়েই এই নারীরা কাজ হারিয়েছেন।
বাংলাদেশসহ কম উন্নত দেশের অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীরা গ্রাম থেকে এসে শহরে কাজ করে থাকেন। কোভিডের ধাক্কায় তারা (১৫%+) গ্রামে ফিরে গেলেও বেশির ভাগই আর শহরে ফিরে আসেননি। তাছাড়া, বিদেশে কাজের সন্ধানে যাওয়া প্রবাসী কর্মীরা কাজ হারিয়ে ফিরে এসেছেন। ফলে এ শ্রেণির মানুষের বেকার হয়ে যাবার আশঙ্কা বেশি। বাস্তবেও তাই ঘটছে। সে-কারণে বলা হচ্ছে, বিশ্বজুড়েই সব ধরনের বৈষম্য বেড়ে চলেছে। আইএমএফ-র এক জরিপ থেকে জানা যায়, কোভিড-১৯ এর কারণে উদীয়মান দেশগুলোর বিনিয়োগ ৪২.৭-এ উঠে গেছে। তার মানে ২০০৮-এর পর গরিব দেশের গরিব মানুষের দারিদ্র্য পরিস্থিতির যে উন্নতি হচ্ছিল তা ভেস্তে গেছে। আয় কমলে ভোগও কমে। তাই কল্যাণ সূচকেও তারা খারাপের দিকে যাচ্ছে। আর নতুন করে যেসব কাজের সুযোগ স্বাস্থ্য খাত ও সহযোগী খাতে তৈরি হচ্ছে সেখানেও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নয় বলে এই গরিব মানুষের সংযুক্ত হওয়া বেশ কষ্টকর হবে। তার মানে এই মহামারি বিশ্বজুড়েই গরিব মানুষকে বিশেষ করে নারী ও শিশুদের আরও নিঃস্ব করে ফেলছে। স্বাস্থ্য ছাড়াও এই মহামারি শিক্ষা খাতে যে বিপর্যয় ডেকে এনেছে তা গরিব ও নিম্নআয়ের মানুষের সন্তানদের শিক্ষা কার্যক্রম থেকে ছিটকে পড়তে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করছে। মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য নিরসন প্রক্রিয়ায় এর নেতিবাচক প্রভাব সহজেই অনুমেয়।
কোভিডের বহু আগেই পিকেটি একুশ শতকের পুঁজিবাদী বিশ্বে দ্রুত প্রসারমান অর্থনৈতিক বৈষম্যের যে আশঙ্কা করেছিলেন এই মহামারি তার গতি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ওইসিডি কোভিডের আগেই এক হিসাবে বলেছিল ধনী দেশগুলোর সবচেয়ে ধনী ১ শতাংশ মানুষ, সবচেয়ে গরিব ১০ শতাংশ মানুষের মোট আয়ের ৯ গুণের বেশি আয় করে। এই মহামারির যুগে এই পার্থক্য আরও বেশি বেড়েছে। কেননা এই সময়টায় স্টক মার্কেট বরং আরও চাঙ্গা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বড় বড় উদ্যোক্তাদের বেশি বেশি প্রণোদনা দিয়েছে। অথচ গরিবের পুরনো কাজ ধরে রাখাই মুশকিল হয়েছে। সবার জন্য আয়-রোজগারের সুযোগ করে দেবে প্রতিযোগিতাপূর্ণ পুঁজিবাদÑ তেমন প্রত্যাশা এমনিতেই বাস্তবে পূরণ হচ্ছিল না। কোভিড জামানায় তা আরও হতাশাজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
কোভিড-১৯ মহামারির কারণে সারাবিশ্বের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও চাপের মুখে পড়েছে এ-কথা বলতে দ্বিধা নেই। তবে পাশাপাশি এটাও বলতে হবে যে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে সরকারের ধারাবাহিক ও সুবিবেচনাভিত্তিক অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন নীতির কারণে দেশ যে শক্ত সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে তার সুফল আমরা পেয়েছি। অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশ এমনকি অনেক উন্নত দেশের তুলনায়ও আমরা করোনাজনিত অর্থনৈতিক স্থবিরতার ধাক্কা সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশি সক্ষমতা দেখাচ্ছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে সমস্ত স্টিমুলাস প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তায় সেগুলোর বাস্তবায়ন চলমান থাকায় আমরা আশার আলো দেখতে পাচ্ছি। সত্যি বলতে ইতোমধ্যেই অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়া দ্রুত বেগে চলতে শুরু করেছে। আশা করা যাচ্ছে, বড় আর কোনো ধাক্কা না এলে দ্রুততম সময়ের মধ্যেই আমরা প্রবৃদ্ধির আগের ধারায় ফিরতে পারব।
অর্থনীতি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় যে বিষয়গুলোর দিকে বিশেষ নজর দিলে আমাদের অগ্রগতি সুরক্ষিত এবং টেকসই হবে সেগুলো ইতোমধ্যেই কম-বেশি চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে। এ নিয়ে মতবিনিময় ও লেখালেখি চলছে। যে বিষয়গুলোতে নজর দেওয়া একান্ত জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন সেগুলো হলোÑ

  • খাদ্যশস্যসহ কৃষির সকল উপখাতে বিনিয়োগের ধারা অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ কৃষিই আমাদের অর্থনীতির রক্ষাকবচ।
  • জ্বালানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যাপক প্রসার উৎসাহিত করতে হবে এবং প্রয়োজনে এ খাতে সরকারি বিনিয়োগ বহুগুণে বাড়াতে হবে।
  • আইসিটি অবকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং নতুন স্টার্টআপগুলোকে নীতি ও অর্থায়ন সহায়তাসহ সকল ধরনের সমর্থন জুগিয়ে যেতে হবে।
  • অভ্যন্তরীণ, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইনগুলোতে আমাদের অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। এক্ষেত্রে অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদার করার পাশাপাশি ডিজিটাইজেশনের মাধ্যমে কর ব্যবস্থাপনাকেও বেগবান করতে হবে।
  • রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে আমাদের অনেক উন্নতি করার সুযোগ রয়েছে। জনবলের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ডিজিটাইজেশনে যথাযথ মনযোগ ও বিনিয়োগ করলে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাতে দ্রুততম সময়ে দৃশ্যমান উন্নতি সম্ভব।
  • এ-কথা মানতেই হবে অবকাঠামো উন্নয়ন প্রবৃদ্ধি বেগবান করার প্রধানতম শর্ত। তাই মেগা অবকাঠামো প্রকল্পগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
  • শিক্ষা, দক্ষতা বৃদ্ধিসহ সর্বাত্মক মানবসম্পদ উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নীতি প্রণয়ন ও সেগুলোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলেই আগামীদিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব।
  • পুরো সামষ্টিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে হবে। বিনিময় হার, মুদ্রস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নজর রাখতে হবে মোট বৈদেশিক দায় ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের দিকে। গত এক দশকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে বাস্তবমুখী ও উদ্ভাবনী মুদ্রানীতি অনুসরণ করেছে, তার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা খুবই জরুরি।
    তবে এ-কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, চরাঞ্চলের বাস্তবতা বাকি দেশের চেয়ে ভিন্ন। তাই অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে জাতীয় নীতি পরিকল্পনায় সার্বিক পরিকল্পনার পাশাপাশি চরের জন্য আলাদা কর্মসূচির প্রয়োজন রয়েছে। চরের মানুষের জীবিকা এখনও প্রধানত কৃষিনির্ভর এবং চরের অর্থনীতি প্রধানত অনানুষ্ঠানিক। আর আমরা জানি যে, এই মহামারিতে অনানুষ্ঠানিক খাতের ক্ষতিই হয়েছে সবচেয়ে বেশি। মহামারির আগেও চরাঞ্চল আর্থ-সামাজিক সূচকগুলোর বিচারে তুলনামূলক পিছিয়েই ছিল। এ নিয়ে আমরা প্রচুর গবেষণা ও এডভোকেসি কার্যক্রম পরিচালনা করেছি। নীতি-নির্ধারক পর্যায় থেকে ইতিবাচক সাড়াও পেয়েছি। কিন্তু মহামারি পরবর্তী পরিস্থিতিতে চরের পরিস্থিতি উন্নয়নে নতুন করে বাড়তি মনোযোগের দরকার রয়েছে।
    মহামারি পরবর্তী অর্থনীতি পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় চরের জন্য বিশেষভাবে উদ্যোগী হতে হবে সকল পক্ষকেই। সরকার যেমন নতুন বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং এডিপিতে চরের জীবন-জীবিকা উন্নয়নের সুনির্দিষ্ট প্রকল্প নিতে পারে, তেমনি অ-সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও নিত্যনতুন বাস্তবমুখী উদ্ভাবনী কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে। সর্বোপরি দেশের বর্ধিষ্ণু ব্যক্তি খাতেরও এক্ষেত্রে আরও উদ্যোগী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কেবল সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে নয়, ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ হিসেবে চরের উদ্যোক্তাদের কাজে লাগিয়ে ব্যক্তি খাতের প্রসার ঘটানোও খুবই সম্ভব।
    শুধু চর কেন, হাওড়, উপকূল এবং জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার অঞ্চলগুলোর জন্য আরও সংবেদনশীল ও দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক সুরক্ষামূলক ও ‘রেজিলিয়েন্ট’ বিশেষ উন্নয়ন কর্মসূচি হাতে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। কোভিড-১৯ এর বিপদ এখনও কাটেনি। তাই এই মহামারি থেকে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধারের প্রক্রিয়ায় সামাজিক পিরামিডের নিচের দিকের মানুষগুলোর কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য এবং বৈষম্যের মতো মৌল বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষè নীতিনজর ও সহায়তা অব্যাহত রাখতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রণোদনা কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নের সময় যেন কৃষক, ক্ষুদে ও ছোট উদ্যোক্তারা বঞ্চিত না হন। ধনী এবং ঋণখেলাপিরাই যদি বেশি বেশি সুবিধে নিয়ে নেন, তাহলে সরকারের ভারসাম্যপূর্ণ আর্থ-সামাজিক পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে যেতে পারে। তাই আগে থেকেই অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের বিষয়টি নীতি-সহায়তার কেন্দ্রে রাখা চাই।

লেখক : ঢাবির বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

Leave a Reply