বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে কয়েকটি কথা

আ মি র  হো সে ন  আ মু : আমাদের পারিবারিক ব্যবসা ছিল কলকাতায় (কাপড়ের দোকান)। থাকার বাড়িও ছিল। Hotel Bilkmore- এ আমার নানার শেয়ার ছিল। তার নাম ছিল বাদশা মিয়া (দত্তপাড়ার জমিদার)। পাকিস্তান হওয়ার পর পরিবারের সবাই একসাথে সবকিছু উইন্ডআপ/বিক্রি করে দেওয়ার জন্য যায়। ঐ সময় একদিন বিকেলে জনাব জাফর সাদেক (তানু নানা) বাসায় আসেন, কথাবার্তা বলার সময় আমাকে কোলে নিয়ে আদর করলেন। পরে উনি বললেন- আমি ওকে নিয়ে যাই, রাতে একটু ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে হোটেলে খাওয়া-দাওয়া করে আমার সাথে থাকবে। সকালে নাস্তা করিয়ে দিয়ে যাব। মা বেশ আপত্তি করছিল; কিন্তু আমি নানার কোলে থাকায় নানা আমাকে নিয়ে এলেন। সকালে নাস্তা খেতে বসেছি এই সময় তিন-চারজন লোক ঢুকল ও একজন নানাকে জিঞ্জেস করল- মামু এই কে। নানা আমার মায়ের নাম নিয়ে বললেন ওর ছেলে। তাই না-কি বলে ভদ্রলোক আমাকে কোলে নিয়ে আদর করতেই বললেন- আমার আপার অনেক সাধনার ধন। নানা আমাকে বললেন- উনি তোমার খোকা মামা (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব)। সে-ই ছিল প্রথম বঙ্গবন্ধুকে দেখা।
এরপরের ঘটনা, বঙ্গবন্ধু আসলেন আওয়ামী লীগ কমিটি করতে বরিশালে। আবার অনেক দিন পর মওলানা ভাসানীসহ আওয়ামী লীগের সভা করলেন। মিটিংয়ে কাজী গোলাম মাহবুবেব নাম ঘোষণা হওয়ার পর বেশ হৈচৈ হলো। উনারা সভা স্থগিত করে ডাকবাংলোতে চলে গেলেন। সেখানেও যারা হৈচৈ করেছিল তারাও গেল। উনি ডাইনিং রুমে কয়েকজনকে নিয়ে আলাদা আলাদা করে বসলেন। পরে বিকেলে আবার মিটিং শুরু হলো। সভায় মালেক খান সাহেবকে সভাপতি ও কাজী গোলাম মাহবুবকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ঘোষণা দিলেন। উনি বক্তৃতায় বললেন, “এই সেদিন যে ২১শে ফেব্রুয়ারি গুলি হলো, তার নেতা ভাষা আন্দোলনের কনভেনর মাহবুব। আজকে সারাদেশে মাহবুবের একটি আলাদা ইমেজ। সে কেন বরিশালে আসবে, সে তো আসতে চায় না, সে কেন্দ্রীয় বড় নেতা। আমি ও ভাসানী সাহেব জোর করে তাকে বরিশালে এনেছি; বরং তার জন্য বরিশাল গৌরব করতে পারবেন।” পরে বুঝতে পেরেছিলাম বিভিন্ন জায়গায় সংগঠন নিয়ে এইভাবে কাজ করতেন বঙ্গবন্ধু।
তারও বছরখানেক পর আমার তানু নানা (উনার মামা জাফর সাদেক-সহ) আমাদের বাসায় একসাথে এলেন। এসে নানি আম্মাকে এবং আমার মাকে সালাম দিয়ে নির্বাচনের দোয়া চেয়ে চলে গেলেন। তারও অনেক পরে যুক্ত নির্বাচনের দাবিতে সারাদেশে জনসভা-মিছিল-মিটিং হচ্ছিল। ঐ সময় উনি (বঙ্গবন্ধু) খান আবদুল গাফফার খান, আবদুল মজিদ সিন্ধি, গফুর বালুচ, আবদুল সামাদ আকজাই প্রমুখ নেতৃবৃন্দকে নিয়ে বরিশালে মিটিং করতে এসেছিলেন। সবাই হেঁটেই Bells Park-এ মিটিংয়ে যাচ্ছিল। আমি উনার পাশে পাশেই হাঁটছিলাম। উনি আমার হাত ধরে জিজ্ঞেস করলেন, “এডিএম-এর বাসা কোথায়?” আমি বললাম, পার্কের কাছেই। বললেন, “মিটিংয়ের পরে আমাকে নিয়ে যাবি, আমি দেখা দিয়ে আসব, আমার এক বন্ধু ফরেস্ট অফিসারের সাথে আজকে উনার মেয়ের বিয়ে।” এর মধ্যে এক ছেলে আমাকে আদাব দিল, আমি বললাম তোমাকে তো চিনি না। আমার হাতে উনি (বঙ্গবন্ধু) এমনভাবে চাপ দিলেন, আমি কাত হয়ে উনার দিকে তাকালাম। উনি থেমে বললেন, “ওকে ডাক। এবং বলো আমি খেয়াল করিনি, তুমি কেমন আছো? তোমার মা বাবা কেমন আছে? আমার সালাম দিও। তাকে ডেকে মাথায় হাত দিয়ে এ-কথাগুলো বলো।” আমি তাই করলাম। উনি বললেন, “এই ছেলে মা-বাবার কাছে গিয়ে তোর কথা বলবে, তোর প্রতি দুর্বল হবে। এই কথা স্মরণ রাখবি- আর যে ছেলেকে পছন্দ করবি, কথা বলার সময় দেখবি জামার বোতাম খোলা থাকলে হাত দিয়ে আটকিয়ে দিবি। তুই ছাত্র-রাজনীতি করবি, ছাত্রদের মাঝে তোর পরিচিতি আছে মনে হলো।” মিটিংয়ের পরে উনাকে নিয়ে এডিএম-এর বাসায় গেলাম, উনার বন্ধু এবং বরযাত্রী ইতোমধ্যে এসে পড়েছে। উনি একটু বসে উইস করে সোজা ঢাকা মেইলে উঠলেন।
তারপর আবারও বেশ কিছুদিন পরে বরিশালে এলেন। মিটিং করলেন। আমি এখন আর পিছু ছাড়ি না। উনি এলেই উনার সাথে সাথে থাকি, উনিও আদর করেন- পছন্দ করেন। মিটিংয়ের পর রিকশায় উঠে আমাকে বললেন, “ছাত্রলীগের অফিসে যাব চল।” আমি বললাম, জাহাঙ্গীর মামার দোকানের পাশেই দেখেছি একটা বড় ঘরকে সাজাচ্ছে, সামনে একটু গেটের মতো করেছে- এটাই হবে চলেন। অফিসের সামনে নামার পর উনি ফিতা কেটে অফিস উদ্বোধন করলেন এবং ভিতরে গিয়ে বসলেন।
বেলায়েত ভাই (পরবর্তীকালে খুলনার বড় শ্রমিক নেতা হয়েছিলেন), তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি হক ভাই উনারা বললেন, আমু ছাত্রলীগ করে না- বঙ্গবন্ধু আমার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী করিস?” বললাম, আওয়ামী লীগ সমর্থন করি। উনারা বললেন, আপনি একটু ভালো করে বলুন। বঙ্গবন্ধু তাদের দিকে জিজ্ঞাসার দৃষ্টিতে তাকালে, উনারা বললেন, ওর একটা বিরাট পার্সোনাল গ্রুপ আছে, তাদের সব দিকে প্রভাব আছে। আমি কলেজ ফুটবল টিমের কে ক্যাপ্টেন হবে, ক্রিকেটের কে ক্যাপ্টেন হবে ইত্যাদি ফয়সালা করতাম। তাছাড়া কলেজের থিয়েটার কেমন হবে- এই সমস্ত জিনিস নিয়ে থাকতাম। অরগানাইজ করতাম এবং মারোকসা বা মাস্তান গ্রুপও আমার কন্ট্রোলে ছিল। বঙ্গবন্ধু বললেন, “এখন থেকে ছাত্রলীগ করবি।” সেদিন ওখান থেকে বেরিয়ে ঢাকা মেইলে উঠলেন।
১৯৫৭ সালে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সম্মেলনে মঞ্জু ভাই ঢাকা থেকে আমাকে চিঠি দিয়েছে। আমার পছন্দমতো ৩৫ জন কাউন্সিলর নিয়ে যেতে। আমার বন্ধু তার ছোট ভাই হিরুকে বললাম কী রে গোলমাল হবে মনে হয়। তাই হলো। এসে দেখি আউয়াল ভাইর সাথে প্যানেলে সেক্রেটারি ক্যানডিডেট। গোলমাল হলো- আমি বাইরে বক্তৃতা দেওয়ার সময় কাজী মাহবুব সাহেব আমাকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, “আউয়াল তো অনেক বছর আছে, ও এখন ছাত্রও না। ব্রিলিয়েন্ট স্টুডেন্ট রফিকউল্লাহকে সবাই চায়, ওকে সমর্থন করবি।” আমি সালাম করে যাদের নিয়ে এসেছিলাম তাদের নিয়ে রফিকুল্লাহ-আজাহার আলী প্যানেলের পক্ষে রেজুলেশন করলাম। সভাপতি মমিন ভাইয়ের কাছে দিলাম- বঙ্গবন্ধুকে কপি দিলাম। উনি বললেন, “মনে হয় তুই সামনের কাতারে এসে পড়েছিস। মঞ্জু তো বহিষ্কার হবে। খুব শক্ত হাতে সংগঠন ধরিস আমি বলে দেব।”
১৯৬১ সালের শেষের দিকে বঙ্গবন্ধু বাড়ি থেকে ঢাকা যাবার পথে বরিশালে থামলেন এবং আমাদের বাসায় দুপুরে খেলেন। সভাপতি মালেক খান সাহেব (আমার মা’র ফুফাতো ভাই), সেক্রেটারি কাজী মাহবুব মালেক খান সাহেবের বড় ভাইয়ের শ্যালক আমার মামা জাহাঙ্গীর অরগানাইজিং সেক্রেটারি, উনারা অনেক আলোচনা করলেন। আমাকে সাথে নিয়ে রিকশায় উঠে সেরনিয়াবাত সাহেবের বাসায় গেলেন বোনের সাথে দেখা করতে। ওখানে কিছুক্ষণ থেকে স্টিমারের উদ্দেশ্যে যাবার সময় বললেন খুব শীঘ্রই আন্দোলন হবে। এবার ধাপে ধাপে মূল লক্ষে নিয়ে যেতে হবেÑ ওদের সাথে (পাকিস্তানের সাথে) আর থাকা যাবে না।
মাস খানেক পরে শেখ মনি খবর দিয়েছে ঢাকা যেতে- বিকেলে স্টিমারে উঠে সকালে ঢাকা পৌঁছলাম এবং শেখ মনির আরামবাগের বাসায় গেলাম। সে কিছু না বলে বলল, বঙ্গবন্ধু কথা বলবে। আমরা বঙ্গবন্ধুর আলফা ইন্স্যুরেন্স অফিসে এলাম। বঙ্গবন্ধু বললেন, “তোকে বলেই এসেছিলাম সোহরাওয়ার্দী সাহেব গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের দাবিতে প্রেস কনফারেন্স করবে এবং ঐ দাবিতে আন্দোলন শুরু করতে হবে।
ছাত্রলীগ-ছাত্র ইউনিয়ন সংগ্রাম পরিষদ হয়েছে সমস্ত জেলায়। এই ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম পরিষদ করতে হবে। শুনলাম বরিশালে ছাত্র ইউনিয়নের সাথে গোলমাল- ফরহাদের সাথে কথা বলে মিটিয়ে ফেলতে হবে। সে ছাত্র ইউনিয়নকে প্রয়োজনীর নির্দেশ দিয়ে দিবে।”

আরও বললেন, “মানিক ভাই ইত্তেফাকে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন দেশের মুক্তি আন্দোলনের কথা লিখবে- এগুলো নিয়ে ছেলেদের ভিতর পেপার ক্লাস করতে হবে। বঙ্গবন্ধু বললেন, “বরিশালের এসপি এবং ডিআই-ওয়ান আমার লোক তাদের সাথে যোগাযোগ করবি। এবং তারা তোকে সবরকম সাহায্য করবে। মনি মিয়াকে ইশারা দিয়ে বললেন, ঐ লিফলেট দিয়ে দিও।” মনি মিয়া এসএম হলে গিয়ে এক রুমে নিয়ে বড় একটা প্যাকেট দিয়ে বলল, বরিশালে গিয়ে খুলবে এবং সিলেকটিভভাবে সাবধানে ডিসট্রিবিউট করবে। আমি বরিশালে এলে ছাত্র ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ আহম্মেদ এবং ভিপি কাশেম আমাকে নিয়ে কলেজ সংসদ অফিসে বসল। বিস্তারিতভাবে আলোচনা হলো, তারাও ফরহাদ সাহেবের নির্দেশ পেয়েছে। কয়েকদিন পর আবার খবর পেলাম সোহরাওয়ার্দী সাহেব প্রেস কনফারেন্সের আগেই গ্রেফতার হবেন। গ্রেফতারের সাথে সাথে রাজবন্দিদের মুক্তি ও গণতান্ত্রিক শাসনতন্ত্রের দাবিতে আন্দোলন শুরু করতে হবে।
ঐ সময় আরেকটি ঘটনা ঘটল, শেখ মনি হঠাৎ আমাকে জিজ্ঞেস করল মঞ্জু মিয়ার সাথে তোমার যোগাযোগ আছে কি না? সম্পর্ক কেমন? আমি বললাম, ভালো যোগাযোগ আছে কিন্তু কেন? এবার ইকবাল হল থেকে বরিশাল থেকে প্রার্থী না দিলে জেতা যাবে না এবং অনেকে তার নাম বলেছে। মামার সাথে (বঙ্গবন্ধু) আলাপ করায় উনি বললেন, “ওকে বহিষ্কার করার পরে তো আমু কাজ করেছে, ওর সাথে সমঝোতা না থাকলে তো হবে না। তাই তুমি উনার সাথে আলাপ করে কালকে বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে আসো।” আমি সন্ধ্যার পরে এক নম্বর আজিমপুরে তার বাসায় গিয়ে আলাপ করলাম। উনি বললেন, আমি তো বহিষ্কৃত হয়েছি। আমি বললাম, আপনি বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে যদি ক্ষমা চান, তবে অবশ্যই ক্ষমা করবেন। পরের দিন সকালে বঙ্গবন্ধুর কাছে উনাকে নিয়ে গেলাম এবং উনি বঙ্গবন্ধুর কাছে ক্ষমা চাইলেন। বঙ্গবন্ধু কিছু রাজনৈতিক কথাবার্তা বলে আমাকে দেখিয়ে বললেন, “ওর সাথে আবার গোলমাল করবি না তোÑ যা একসাথে কাজ কর গিয়ে।” ঐ সময় ছাত্রলীগ প্যানেল থেকে উনি ইকবাল হলের ভিপি হন।
১৯৬২ সালের ৩০ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী সাহেব গ্রেফতার হওয়ার সাথে সাথে ছাত্র ইউনিয়নের সাথে বসলাম, তারা দুই-একদিন সময় নিতে চাইল। আমি বললাম আমরা প্রস্তুত, সব স্কুলের নেতাদের ব্রিফিং দেওয়া আছে। কালই তারা নেমে পড়তে পারে। আমি রাতেই ছেলেদের কনট্যাক্ট করলাম। সকালে সব স্কুল-কলেজে ধর্মঘট হলো, মিটিং হলো। পরের দিন মিছিল হলো। বঙ্গবন্ধুর ভাই নাসের মামা বাসার মাধ্যমে যোগাযোগ করে আমাকে ওয়াপদা সুপারেনটেড ইঞ্জিনিয়ারের বাসায় নিয়ে গেলেন। সেখানে একটি রিকশায় এসপি সাহেব এলেন এবং খুব রাগ করে বললেন, মুজিব ভাই বলে দেওয়ার পরেও আপনি আমার সাথে যোগাযোগ করলেন না কেন? আরও অনেক কিছু বললেন। এরপর থেকে যোগাযোগ করে কাজ করবেন বলে চলে গেলেন। আসার সময় মিসেস নাজমি (সুপারেনটেড ইঞ্জিনিয়ারের স্ত্রী) একটি প্যাকেট দিলেন। বুঝলাম টাকা। নাসের মামা নিয়ে আমার হাতে দিলেন।
১৯৬৩ সালে আমিও পাস করে ঢাকায় আসার পর সভাপতি মোয়াজ্জেম ভাইয়ের সাথে আলাপ করে আমাকে জগন্নাথ কলেজের ভিপি প্রার্থী ঠিক করে। এর পরে ভর্তির ফরম নিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে গেলেন। বঙ্গবন্ধুর কাছে দোয়া দেওয়ার জন্য ফরম উনার হাতে দিল। উনি বললেন, “বিএম কলেজেরই কী হবে? বরিশালেরই বা কী হবে, আমার লোক কোথায়?” এ-কথা বলতে বলতে ফরমটা ছিঁড়ে ফেলে দিলেন। আমাকে বিএম কলেজে পাঠিয়ে দিলেন এবং বিএম কলেজের ভিপি হয়েছিলাম। উনি (বঙ্গবন্ধু) খুব খুশি হয়েছিলেন।
১৯৬২ সালের ১ মার্চ আইয়ুব খানের রাষ্ট্রপতির সরকার ব্যবস্থা ও ৮০ হাজার বিডি মেম্বারের ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি ও সংসদ নির্বাচনে পদ্ধতি সংবিধান প্রবর্তন করেন। ৬ জুন বঙ্গবন্ধু কারাগার থেকে মুক্তি পান। ২৪ জুন আইয়ুব খানের এই সংবিধান গ্রহণযোগ্য নয়- এই ঘোষণা দিয়ে ৯ রাজনৈতিক নেতা সর্বজনাব আতাউর রহমান খান, শেখ মুজিবুর রহমান, হামিদুল হক চৌধুরী, আবু হোসেন সরকার, আজিজুল হক (নান্না মিয়া), পীর মোহসেন উদ্দীন (দুদ মিয়া), নুরুল আমীন, মোহন মিয়া, মাহমুদ আলী। বছরের শেষের দিকে নেতৃবৃন্দ বরিশাল সফরে আসেন। মিটিং পরিচালনার দায়িত্ব ছিল মূলত আমার। লিফলেটে উনাদের নাম ছিল, সঙ্গে শাহ আজিজুর রহমানও এসেছিল; কিন্তু প্রচারে (মাইকে) ও সেøাগান ছিল শুধু বঙ্গবন্ধুর নাম। মিটিংয়ের মধ্যমণি হিসেবে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। মিটিং শেষে স্টিমারে উঠে মনে হলো, সভার পক্ষ থেকেই শাহ আজিজ সাহেব জিজ্ঞেস করলেন- মিটিংয়ে তো একজনের নামে শুধু স্লোগান হলো? আমি বললাম, আপনাদের কর্মীদের কাছে জিজ্ঞেস করেন, তারা কেন স্লোগান দেয়নি আপনাদের নামে?
বঙ্গবন্ধু কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে আমার হাতে টাকা দিতে গেলে আমি বললামÑ না, বারেকের হাতে দেন। উনি বললেন, তুই নে- ইতোমধ্যে বারেক এলে তার হাতে টাকা দেওয়ালাম। বারেক নিয়ে সালাম দিয়ে আমার হাতেই দিল। উনি আমার মাথায় হাত দিয়ে কিছুক্ষণ থেমে বললেন, “ভালো থাকিস।”
১৯৬৫ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে পাক-ভারত যুদ্ধ ব্লাক আউট-এর মধ্যে ছাত্রলীগের সম্মেলন শেষ হলো। মোজাহারুল হক বাকী সভাপতি, আবদুর রাজ্জাক সাধারণ সম্পাদক এবং আমি প্রচার সম্পাদক ছিলাম। পরের দিন আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে যাওয়ার কথা। গিয়ে দেখি এসএসএফ এবং ছাত্র ইউনিয়নের একটি গ্রুপ এই যুদ্ধের ব্যাপারে আওয়ামী লীগের কোনো বিবৃতি নেই, ইত্তেফাকের কোনো ভূমিকা/খবর নেইÑ এর জন্য অকথ্য ভাষায় গালাগালি করছে। আমরা বেরিয়ে বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়ে তাকে সালাম দিয়ে সব কথা বললাম। উনি অট্টহাসি দিয়ে বললেন, “যুদ্ধের পরে এমন জিনিস দেবÑ ওরা পালাবে, তোমরা মালা পাবে।” বললাম, এর আগ পর্যন্ত তো বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করতে হবে- অনেক বলার পর বললেন, “আমার একজন পাকমার্কা নেতা আছে, তাকে বলি।” উনি শাহ আজিজুর রহমান (তখন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি)-কে বিবৃতি দিতে বললেন। এখানে তার পলিটিক্যাল কনভিকশনের ফারমনেস বোঝা গেল।
আমাকে নির্দেশ দিয়েছিলেন লিফলেট, বুলেটিনের মাধ্যমে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে শাসনতন্ত্রের দাবি এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ ঘটাবার কাজ। আমরা সমস্ত দোকানে সাইনবোর্ড বাংলায় লেখা এবং গাড়ির নাম্বার নেমপ্লেট ইত্যাদি করেছিলাম।
এরপর ৬-দফা দেওয়ার পরে আগরতলা মামলা থেকে মুক্তি পাওয়ার পরের দিন সকালে দেখা করতে গেলাম। উনি জাতীয় চার নেতার সাথে বসে আলাপ করছিলেন। আমি সালাম দেওয়ার পরে সবাইকে উদ্দেশ্যে করে বললেন, “ও অ্যাডভোকেট হয়েছে – খুব খুশির খবর” এবং আমাকে নিয়ে বেডরুমে এলেন। আমার হাতে কিছু টাকা দিয়ে বললেন, “ভালো একটা চেম্বার করবি, ভালো সেক্রেটারিয়েট টেবিল, চেয়ার, আলমারি, বই দিয়ে চেম্বার সাজাবি এবং বড় সাইনবোর্ড দিবি। আর সবাইকে বলতে বলবি তরুণ আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট আমির হোসেন আমু। শহরের সমস্ত ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন কমিটিগুলি ভালোমত কর, তোকে নমিনেশন দেব।” উনার এই কথায় বিস্মিত হয়েছিলাম ঐ মুহূর্তে।
আমি বরিশালে গিয়ে কাজ শুরু করলাম এবং শহরের ওয়ার্ড কমিটিগুলি করে ফেললাম। মঞ্জু মিয়া বুঝতে পেরেছিলেন। ইতোমধ্যে বন্যা উপদ্রুত অঞ্চল পরিদর্শনের নামে বঙ্গবন্ধু প্রোগ্রাম দিয়েছিলেন (তখন যেহেতু পলিটিক্যাল অ্যাকটিভিটি বন্ধ ছিল মার্শাল ল’-এর কারণে)। মঞ্জু মিয়া বঙ্গবন্ধুর আসার দুদিন আগে জেলা কমিটির সিদ্ধান্তের বরাতে আমাকে বাদ দিয়ে সেরনিয়াবাত সাহেবকে সভাপতি এবং অ্যাডভোকেট বারেককে সম্পাদক করে শহর কমিটি ঘোষণা দিলেন (দুজনই আমার লোক)। সন্ধ্যায় কর্মিসভায় তাজউদ্দীন সাহেব তার বক্তৃতায় এই শহর কমিটির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। তারা ঘাবড়িয়ে গেল। জেলা কমিটিতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ আমাকে দিয়ে সমঝোতার প্রস্তাব দিল। আমি মেনে নিলাম এবং বঙ্গবন্ধু খুশি হলেন।
১৯৭০-এর প্রথম দিকে বড় লঞ্চ নিয়ে বরিশালে সফরে এসেছিলেন; এক সময় স্পিডবোটে উনি (বঙ্গবন্ধু), আমি ও ড. কামাল ছিলাম। তখন নদীতে বেশ তুফান ছিল। কামাল হোসেন সাঁতার জানেন না। বেশ ভয় পাচ্ছিলেন। বঙ্গবন্ধু বললেন, “কামাল চিন্তা করিস না, দু-পা দিয়ে তোর মাথা উঁচু রেখে চিতসাঁতার দিয়ে নিয়ে যাব আর না হলে আমি ও আমু পিছন দিয়ে তোর চুল টেনে পাড়ে নিয়ে যাব।”
আমি নির্বাচনে মনোনয়ন লাভ করে যখন প্রচারে ব্যস্ত তখন ১১ নভেম্বর প্রলয়ঙ্করী বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসে ভোলা জেলা, পটুয়াখালী জেলা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু দ্রুত ছুটে এলেন। ঘূর্ণি উপদ্রুত অঞ্চল পরিদর্শনে দেখা হলো। যাওয়ার সময় নির্বাচনের খরচ বাবদ আমাকে ১০ হাজার টাকা দিলেন। নির্বাচনে আমার খরচ হলো ৯ হাজার টাকা। নির্বাচনের পরে ১ হাজার টাকা ফেরত দিতে গেলে কান ধরে বললেন, “যারা কাজ করেছেন তাদের খাইয়ে দিলি না কেন?” উনি পকেট থেকে আরও ১ হাজার টাকা বের করে দিয়ে বললেন, “এটা রাখ, কাজে লাগবে।”
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জেলার সমস্ত কমিটি সেন্ট্রাল থেকে হতো বঙ্গবন্ধুর অনুমোদনে। কোলাবরেটর অ্যাক্ট কমিটিতে আমি, ডিসি, এসপিÑ তিন সদস্য বিশিষ্ট পরে পিপি অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল।
জেলা ডেভলপমেন্ট কমিটির আমাকে চেয়ারম্যান ও এডিসি জেনারেলকে সচিব। Abandoned Property Committee চেয়ারম্যান আমাকে ও এডিসি রেভিনিউকে সচিব।
ডিসট্রিক্ট রিলিফ কমিটি’র চেয়ারম্যান আমাকে ও এডিসি সচিব। সদর সাউথ কমিটি’র চেয়ারম্যান আমাকে ও এসডিও সাউথ-কে সচিব করা হয়েছিল।
এমনকি প্রাইমারি স্কুল টিচার্স নিয়োগ কমিটির চেয়ারম্যান করা হয়েছিল আমাকে।
বরিশালের দুটি গভর্মেন্ট কলেজ ও মহিলা কলেজের গভর্নিং বডিতে দেওয়া হয়েছিল আমাকে এবং আরও কিছু কথা হয়েছিল, তা আর উল্লেখ করলাম না।
আমি সাধারণত সংসদ অধিবেশন উপলক্ষে ঢাকা আসতাম এবং ঢাকায় থাকা অবস্থায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় উনার (বঙ্গবন্ধু) বাসায় যেতাম। একদিন বললেন, “পার্টি ক্ষমতায়, কাজ করতে গেলে তো তুই চাঁদা তুলতে পারবি না। কাল সকালে অফিসে আসিস।” পরের দিন যাওয়ার পর তোফায়েল সাহেবকে (পলিটিক্যাল সেক্রেটারি) বললেন, “সমস্ত বড় বড় কর্পোরেশনের এমডিদের ফোন করে বলে দাও, বরিশালের সব এজেন্সি ওকে দিতে।” উনি ফোন করা শুরু করলে আমি নিষেধ করি এবং উনি বঙ্গবন্ধুকে জানালেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলে বললাম, যারা সাব-এজেন্সি নিবে তারা তো ব্লাক করবে, তখন আমারই বদনাম হবে। আপনিও ভুল বুঝবেন। উনি কাছে ডেকে মাথায় হাত দিয়ে বললেন, “যা পরে দেখব।”
এর মধ্যে খাদ্যমন্ত্রী ফণী মজুমদার দাদা আমাকে দেখা করতে বললেন। আমি দেখা করতে গেলে আমার হাতে একটি খাম দিয়ে বললেন, ১ লক্ষ টন চাল কেনার পারমিট আছে, বঙ্গবন্ধু দিতে বলেছেন। ৪১০ ডলার প্রতি টন; কিন্তু আমি ওয়ার্ল্ড মার্কেট বেড়ে যাওয়ায় দিতে পারিনি।
প্রায় বছর খানেক পরে বঙ্গবন্ধু আবার অফিসে যেতে বললেন, আমি গেলাম। জনাব নজরুল ইসলাম সাহেব ও মুনসুর আলী সাহেব বসা ছিলেন। নজরুল সাহেবকে আগের ঘটনা বলে বললেন, যেসব ইন্ডাস্ট্রি ডিসিনভেস্টমেন্ট হচ্ছে ওখান থেকে ওকে দিতে হবে। নজরুল সাহেব আমাকে তার অফিসে যেতে বলছেন।
১৯৭৩ সালে উনি বরিশালে সফরে গেলেন। মিটিংয়ের পর রাতে আমাকে বললেন, “২০ জেলার গভর্নর নিয়োগ করব। তারা হবে জেলার মূল কর্মকর্তা। ডেভলপমেন্টসহ সব কিছু থাকবে। তুই কী হবি? গভর্নর না এমপি?” ঐ সময় কিছু না বলে সকালে বললাম, আমার সিদ্ধান্ত তো আপনি দেবেন। উনি বললেন, “ঠিক আছে।” কিছুদিন পর আলাদা আলাদা শেখ মনি, তোফায়েল আহমেদ ফোনে বললেন, বঙ্গবন্ধু আপনাকে এমপি নমিনেশন পেপার নিতে বলছেন। অর্থাৎ তখন সিদ্ধান্ত স্থগিত হয়েছিল। পরবর্তীতে যখন গর্ভনর নিয়োগের সিদ্ধান্ত হলো তখন উনি আমাকে বরিশালের গভর্নর করেছিলেন। কিন্তু আমিনুল হক চৌধুরী খুব মন খারাপ করায় সেরনিয়াবাত সাহেব আমাকে বললেন, তুমি উনাকে ছেড়ে দেও। ঝালকাঠীতে তো তোমাকে দিবে। এ-কথা বঙ্গবন্ধুকে বললে বঙ্গবন্ধু প্রথমে রাজি হলেন না, পরে আমি অনুনয়-বিনয় করে বঙ্গবন্ধুকে রাজি করালাম। পরে বৃহত্তর বরিশালের ছয় গভর্নর নিয়ে বসে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “ওর সাথে আলাপ করে সব পলিটিক্যাল সিদ্ধান্ত নিতে হবে।” যেহেতু মঞ্জু মিয়াকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, তাই উনার ধারণা ছিল আমি ছাড়া তাকে (মঞ্জু মিয়াকে) কেউ কাউন্টার করতে পারবে না। তাই বঙ্গবন্ধু আমাকে সব ব্যাপারে প্রাধান্য দিয়েছিলেন সংগঠনের স্বার্থে।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার মাধ্যমে, উনার রাজনৈতিক আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য যেখানে যে-রকম নেতৃত্বের প্রয়োজন সে-রকম নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সংগঠনকে গতিশীল করতেন।
বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি ও সান্নিধ্য লিখে শেষ করার নয়, তারপরও লেখার স্বার্থে কয়েকটি উল্লেখ করলাম।

লেখক : সংসদ সদস্য ও উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply