উচ্চ জিংকসমৃদ্ধ ব্রি ধান ১০০ এবার উৎপাদনে

রাজিয়া সুলতানা: বাঙালির সংস্কৃতি ও কৃষ্টির সাথে ঐতিহাসিকভাবেই জড়িয়ে আছে ভাত। দ্বিধাহীনভাবে বাঙালির কাছে প্রাণভোমরা হচ্ছে ভাত। ভাত না হলে যেন সবটাই অতৃপ্ত থেকে যায়। বাঙালির মোটা দাগের ক্ষুধা নিবারণে আকুণ্ঠ তৃপ্তির অবিকল্প উপাদান ভাত। যদিও চারদিক থেকে অনাহূতভাবে বলা হচ্ছেÑ ভাতই নানা রোগের উৎস। আমি সেখানে যতিচিহ্ন টেনে বলতে চাই পরিমিত ভাত; সুস্থ-সবল দেহের জন্য অনিবার্য পূর্বশর্ত। বাংলাদেশের প্রধান দানাদার শস্য চাল; আর তাই বাঙালির কাছে ভাতই প্রধান খাদ্য।
ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশ একটি বৃহৎ সমতল ব-দ্বীপ। অবস্থান গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনার অববাহিকায়। ঋতুবৈচিত্র্যে গ্রীষ্মম-লীয় প্রভাব সুস্পষ্ট। যা ধান চাষের এক উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি করে। তাই যুগ যুগ ধরে বাঙালির পছন্দের খাবার ভাত। সহজলভ্যও বটে। দামেও সাশ্রয়ী। ভাতের একমাত্র উৎস ধান। তাই ধান নিয়েই গবেষকদের নিরলস চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। নানা জাতের ধান উৎপাদনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে আদিকাল থেকেই। সাধারণভাবে ধানে নানারকম উপাদান রয়েছে। প্রথম দিকে গবেষণা ছিল বিভিন্ন জাত নিয়ে। তার ফলন ও উৎপাদন উর্বরতা নিয়ে। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সামনে চলে আসে পুষ্টিসমৃদ্ধ ধান চাষের বিষয়টি। তা নিয়ে এখনও চলছে নিরন্তর গবেষণা। তবে শুরুটা ২০০৬ সালে। সেখানে সাফল্য এসেছিল। কৃষিতে সংযোজন হয়েছে পুষ্টিসমৃদ্ধ ধান। ধানেই পাওয়া যাবে মানবদেহের প্রয়োজনীয় সকল পুষ্টি উপাদান। সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে শরীরের অত্যাবশ্যকীয় মাইক্রো উপাদান জিংকসমৃদ্ধ নতুন জাতের ধান। যা পুষ্টি উপাদান জোগানের পাশাপাশি করোনাকালীন মানুষের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও বাড়াতে সক্ষম। এই অর্জন শুধু বাংলাদেশেরই। বিশ্বে এদেশের গবেষকরাই প্রথম আবিষ্কার করেছেন জিংকসমৃদ্ধ ধান। যার নাম ব্রি ধান ১০০।
বর্তমান প্রেক্ষাপট খাদ্য নিরাপত্তার সাথে সাথে পুষ্টি নিরাপত্তার বিষয়টিও সামনে চলে এসেছে। ২০০৮ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। তখন বার্ষিক চালের ঘাটতি ছিল প্রায় ২৬ লাখ টন। অনেক চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফল নেতৃত্বে ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে বাংলাদেশে মোট চাল উৎপাদনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৮.৬ মিলিয়ন টন। মোট জনগণের জন্য মোট প্রয়োজন ৩৫.৬ মিলিয়ন টন চাল। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে কিছু উদ্বৃত্ত চাল উৎপাদন করছে। ক্ষুধা নিবারণের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য উৎপাদন হওয়ার পর প্রশ্ন আসে খাদ্য নিরাপত্তার। পুষ্টি নিরাপত্তা ও খাদ্য নিরাপত্তার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আর খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ৩টি বিষয় অত্যাবশ্যক। যথাÑ খাদ্যের প্রাপ্যতা, খাদ্যের সহজ লভ্যতা এবং খাদ্যের পুষ্টিমান। মুজিব শতবর্ষে প্রথম দুটি শর্ত পূরণে আমরা প্রায় সফলতার দ্বারপ্রান্তে। এখন লক্ষ্য তৃতীয়টির দিকে, যা অনুধাবন করেছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি খাদ্য উৎপাদন ও পুষ্টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের সংবিধানে নাগরিকদের পুষ্টি উন্নয়নকে রাষ্ট্রের প্রাথমিক কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করেন। ১৯৭৫ সালের ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশ পুষ্টি পরিষদ গঠন করেন। জাতির পিতার অভীষ্ট লক্ষ্যকে সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু-কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও খাদ্য উৎপাদনকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্ব দিয়েছেন। তার দায়িত্বশীল নেতৃত্বেই বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) বিভিন্ন পুষ্টি উপাদান, যেমনÑ জিংক, আয়রন, প্রোটিন, মিনারেলসসহ শরীরের অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যোপাদানগুলো প্রয়োজন অনুসারে চালে সংযোজন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি কার্যকর পর্যায় থেকে তা সারাদেশে সরবরাহ এবং উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে নানা উদ্যোগ নিয়ে নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
আমাদের দেহে ৬টি খাদ্যোপাদনের পাশাপাশি বেশ কিছু মাইক্রো নিউট্রিয়েন্ট প্রয়োজন। এদের মধ্যে অন্যতম একটি জিংক। মানবদেহে প্রায় ৩৬০ ধরনের হরমোনকে নিয়ন্ত্রণ করে জিংক। জিংকের অভাবে ব্যাহত হয় শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রম। দেখা দিতে পারে নানা ধরনের অসুখ-বিসুখ। বিশেষ করে ক্ষুধামন্দা, শিশুদের বৃদ্ধি কমে যাওয়া, চুল ও নখের অস্বাভাবিকতা, হাড় গঠনে অসামঞ্জস্যতা, ক্ষতস্থান স্বাভাবিক হতে বিলম্ব হওয়া, বন্ধ্যাত্ব, ডায়রিয়া, রক্তশূন্যতা, স্নায়বিক দুর্বলতা, রাতকানা, মানসিক অস্থিরতা ও ডায়াবেটিসসহ নানা ধরনের অসুস্থতার অন্যতম একটি কারণের নাম জিংকহীনতা। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ জিংক ঘাটতিজনিত অপুষ্টিতে ভুগছেন। ইউনিসেফ’র তথ্যমতে, জিংক ঘাটতিজনিত কারণে সারাবিশ্বে ৪ লাখেরও অধিক শিশু মারা যায়। গ্লোবাল ফুড সিকিউরিটি ইনডেক্সের পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের খাদ্য তালিকায় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট অর্থাৎ ভিটামিন এ, আয়রন এবং জিংকের অভাবের কারণে পুষ্টির নিরাপত্তা বিঘিœত হচ্ছে। (Source- https://foodscuritzindex.eiu.com)। আর এক গবেষণায় উঠে এসেছে দেশে প্রায় পাঁচ বছরের নিচে এমন বয়সী ৪৪ শতাংশ শিশু, বিভিন্ন বয়সী ৫৭ শতাংশ নারী, ১৫ থেকে ১৯ বছরের ৪৪ শতাংশ মেয়ে জিংকের অভাবজনিত পুষ্টি সমস্যায় ভুগছে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দৈনিক জিংকের প্রয়োজন ১২-১৫ মিলিগ্রাম, দুগ্ধদানকারী মায়েদের প্রয়োজন ১৬ মিলিগ্রাম এবং শিশুদের ২-১০ মিলিগ্রাম। জিংকের উৎস সাধারণভাবে সামুদ্রিক মাছ, লাল মাংস, কলিজা, ফলমূল, আটা-ময়দার রুটি, দুগ্ধজাত খাদ্য, শিম জাতীয় উদ্ভিদ, মসুর ডাল, চিনাবাদাম, মাশরুম, সয়াবিন ও ঝিনুক ইত্যাদি। তবে গরু ও ভেড়ার মাংসে উচ্চমাত্রায় জিংক রয়েছে। বাংলাদেশের মতো মধ্যম আয়ের দেশের মানুষের পক্ষে প্রতিদিন এসব খাদ্যের সংকুলান করা সম্ভব নয়। ফলে দেহে জিংকের ঘাটতি থেকেই যায়। এতে মানুষের দৈহিক বৃদ্ধি এবং মানসিক বিকাশ চরমভাবে ব্যাহত হয়।
ভাত আমাদের প্রধান খাদ্য। অন্য পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করতে না পারলেও ভাতের সংস্থান প্রায় সকলেরই সামর্থ্যরে মধ্যে রয়েছে। তাই কৃষিবিজ্ঞানীরা চালের সাথে পুষ্টি উপাদান বাড়ানোর জন্য ধারাবাহিকভাবে গবেষণা করে যাচ্ছেন। যাতে স্বল্পআয়ের মানুষ অতি সহজেই দৈহিক পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে পারে। উচ্চমাত্রার জিংকসমৃদ্ধ ধান উৎপাদন করে গবেষকরা সেই কাজটি নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করেছেন।
বিশ্বে প্রথম জিংকসমৃদ্ধ বাংলাদেশের ব্রি-১০০ ধানের চাল খুবই সরু ও চিকন। এই চাল প্রক্রিয়াজাত করার প্রয়োজন হয় না। ফলে ব্রি-১০০-তে তুলনামূলকভাবে জিংকের পরিমাণ অনেক বেশি পাওয়া যাবে।
ব্রি-১০০; বোরো মৌসুমে আবাদের জন্য ধানের জাত। এই ধানে উচ্চমাত্রার জিংক ছাড়াও রয়েছে অন্যান্য পুষ্টি উপাদান। ব্রি ধান-১০০-তে রয়েছে আধুনিক সকল উফসি জাতের ধানের বৈশিষ্ট্য। ফলে চাষ পদ্ধতি ও সারের মাত্রাও অন্যান্য উচ্চফলনশীল ধানের মতোই। বীজ বপনের উপযুক্ত সময় ১৫ থেকে ৩০ নভেম্বর (বাংলা ১-১৬ অগ্রহায়ণ)। মাঝারি উঁচু থেকে উঁচু জমি এই ধান চাষের জন্য উপযুক্ত। চারার বয়স ৩৫-৪০ দিন। চারার সংখ্যা প্রতি গোছায় ২-৩টি। রোপণ দূরত্ব ২৫ ঢ ১৫ সেন্টিমিটার। উৎপাদনকালে পরিমাণমতো ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম ও জিংক সালফেট প্রয়োগ করতে হবে। সর্বশেষ জমি চাষের সময় টিএসপি, অর্ধেক এমওপি, জিপসাম ও জিংক সালফেট প্রয়োগ করতে হবে। ইউরিয়া সার সমান তিন কিস্তিতে যথা রোপণের ১০-১৫ দিন পর প্রথম কিস্তি, ২৫-৩০ দিন পর দ্বিতীয় কিস্তি এবং ৪০-৪৫ দিন পর তৃতীয় কিস্তি প্রয়োগ করতে হবে। বাকি অর্ধেক এমওপি দ্বিতীয় কিস্তি ইউরিয়া সার প্রয়োগের সময় প্রয়োগ করতে হবে। রোপণের ৩০-৪০ দিন পর্যন্ত কোনোভাবেই জমিতে আগাছা রাখা যাবে না। থোড় অবস্থা হতে দুধ অবস্থা পর্যন্ত জমিতে পর্যাপ্ত রস বা পানি রাখতে হবে। ব্রি ধান-১০০-এ রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণ প্রচলিত জাতের চেয়ে অনেক কম। রোগবালাই হলে সাথে সাথে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করতে হবে। ধান কাটার উপযুক্ত সময় ৫ হতে ২০ এপ্রিল (২২ চৈত্র-৭ বৈশাখ)। শীষের ৮০ শতাংশ ধান পাকলে দেরি না করে ধান কেটে নিতে হবে।
স্বাভাবিকভাবে সকল ধানেই মানবদেহের প্রয়োজনীয় প্রায় সকল প্রকার পুষ্টি উপাদান থাকে। সুনির্দিষ্টভাবে বললে, প্রতি ১০০ গ্রাম চালে প্রায় ১২৯ কিলোক্যালরি শক্তি, ৭৮.০৯ গ্রাম শর্করা, ৭.১২ গ্রাম প্রোটিন, ০.২৮ গ্রাম চর্বি, ১.৩০ গ্রাম আঁশ, ০.০৭ মিলিগ্রাম থায়ামিন, ০.০১৫ মিলিগ্রাম রিভোফ্লাবিন, ১.০৯ মিলিগ্রাম জিংক, ২৮ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ০.৮০ মিলিগ্রাম আয়রন, ২৫ মিলিগ্রাম ম্যাগনেসিয়াম ইত্যাদি থাকে। পক্ষান্তরে জিংকসমৃদ্ধ প্রতি কেজি ধানে জিংকের পরিমাণ থাকে অনেক বেশি; প্রায় ১৯-২৭ মিলিগ্রাম।
জিংকসমৃদ্ধ ধান অবমুক্ত করার পর ব্যাপকভাবে তৃণমূলের কৃষকদের তা চাষে বিপুলভাবে উৎসাহিত করতে হবে। বিশেষ করে বীজ, সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ দিয়ে সাহায্য করতে হবে। সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানের সময় জিংকসমৃদ্ধ ধান-চাল ক্রয়ে প্রাধান্য দিতে হবে। এ ব্যাপারে জনগণকে সচেতন করে তুলতে হবে।

লেখক : শিক্ষক; পিএইচডি গবেষক, প্ল্যান্ট প্যাথলজি
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, শেরে বাংলা নগর, ঢাকা
raziasultana.sau52@gmail.com

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply