বিজয়ের মাসে সংস্কৃতি অঙ্গন

স্থবির নয় সাংস্কৃত অঙ্গন। করোনাকালে সকল কর্মযজ্ঞ সামাজিক দূরত্ব ও
স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে। অনলাইনেও হয়েছে অনেক আয়োজন। বাংলাদেশিদের
নিকট বিজয় মানে অন্যরকম আনন্দ ও অনুভূতির দিন। তাই মুজিববর্ষ ও
বিজয়ের উৎসব বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে ডিসেম্বর মাসে সংস্কৃতি
অঙ্গনে। সেসব আয়োজন নিয়ে লিখেছেন সোহাগ ফকির

ডিসেম্বরে মাসব্যাপী চারুকলা প্রদর্শনীর আয়োজন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। প্রদর্শনীতে নবীন শিল্পীদের সাহসী আচড়ে ফুটে উঠেছে প্রকৃতি ও ১৯৭১ সালে নারী নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র। নবীন শিল্পী চারুকলার ২২তম আয়োজনে ‘রিভেঞ্জ-২’ শীর্ষক ক্যানভাসে ফুটে উঠেছে প্রকৃতি রক্ষার আবেদন। স্থাপনা শিল্প ‘ক্ষত’তে ফুটে উঠেছে ১৯৭১ সালে নারী নির্যাতনের ভয়াবহতা। প্রদর্শনীতে ১ হাজার ৩৫০টি শিল্পকর্ম জমা দেন ২১ হতে ৩৫ বছরের ৫১৯ শিল্পী। উদ্বোধনের পরে নির্বাচকম-লী ৩৩৭ শিল্পীর ৩৬৮টি শিল্পকর্ম প্রদর্শনের জন্য নির্বাচন করে। পুরস্কারপ্রাপ্তদের হাতে ক্রেস্ট, সনদ, অর্থের চেক তুলে দেওয়া হয়। আলোকচিত্র, স্থাপনা শিল্প, চিত্রকলা, ছাপচিত্র, ভাস্কর্য, প্রাচ্যকলা, মৃতশিল্প, কারুকলা, গ্রাফিক্স ডিজাইন, পারফরমেন্স আর্ট, নিউ মিডিয়াসহ চারুশিল্পগুলো প্রদর্শিত হয় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালার ১, ৩, ৫ ও ৬নং গ্যালারি এবং ভাস্কর্য গ্যালারিতে। নবীণ শিল্পীদের এ শিল্পকর্ম প্রদর্শনী প্রতিদিন সকাল ১১টা হতে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত চলে। ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রদর্শনীটি চলার কথা থাকলেও আরও ১৫ দিন বাড়ানো হয়েছে।
৪ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন ও জাদু প্রদর্শনীর আয়োজন করে আওয়ামী জাদুশিল্পী পরিষদ। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল থিয়েটার হলে অনুষ্ঠিত হয় এ আয়োজন।
৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল থিয়েটার হলে নাট্যদল শূন্যন প্রদর্শন করে নাটক ‘লাল জমিন’। অন্যদিকে জাতীয় নাট্যশালা এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে নাট্যদল থিয়েটার (আরামবাগ)-এর প্রযোজনায় নাটক ‘নিখাই’ প্রদর্শন করে।
১০ ডিসেম্বর থেকে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতি বছরের মধ্যে এবারও ‘মানবাধিকার দিবস থেকে বিজয় দিবস’ শীর্ষক সপ্তাহব্যাপী বিজয় উৎসবের আয়োজন করে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রাঙ্গণে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও বধ্যভূমির সন্তান দলের জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান আরম্ভ হয়। ‘সংস অব ফ্রিডম’ শিরোনামে মাকসুদ, স্পন্দন, পরাহ, আঁচল, পার্থিব ও সভ্যতা অ্যান্ড ব্যান্ড-সহ খ্যতিমান ব্যান্ড সংগীতের পরিবেশনা ভার্চুয়ালে সম্প্রচার করা হয়।
১২ ডিসেম্বর ‘শেখ হাসিনা : অন দ্যা রাইট সাইড অব হিট্রি’ শীর্ষক শিল্পকর্ম দুমাসব্যাপী প্রদর্শনীর করা হয় রাজধানীর কসমস সেন্টারে। ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটারটন ডিসকন ও তুরস্কের রাষ্ট্রদূত মোস্তফা ওসমান তুরান যৌথভাবে উদ্বোধন করেন। গ্যালারি কসমস ও কসমস আতেলিয়ার ৭১ যৌথভাবে কসমস ফাউন্ডেশনের সহায়তায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে বছরব্যাপী অংশ হিসেবে এ আয়োজন করেন। সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে কসমস সেন্টারে আগামী ২০২১ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সবার জন্য এ আয়োজন উন্মুক্ত থাকবে।
১৩ ডিসেম্বর ‘নবান্ন উৎসব ১৪২৭’ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। বাংলাদেশের নবান্ন এর কৃষ্টি এ উৎসবে তুলে ধরা হয় বিভিন্ন পরিবেশনার মধ্য দিয়ে।
১৪ ডিসেম্বর শহিদ বুদ্ধিজীবী ও মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। জাতীয় নাট্যশালাল মিলনায়তনে এ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস বাংলাদেশিদের নিকট আবেগ ও আনন্দের বিষয়। যার দরুন করোনা মহামারির সময়ও উৎসবমুখর ছিল সারাদেশ। পাড়া-মহল্লায় ধ্বনিত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ। বেজেছে দেশাত্মবোধক গান। লাল সবুজের পতাকায় শোভিত হয় দেশ। রং-বেরঙের ঝাড়বাতিতে দারুণ মাত্রা যোগ করে বিভিন্ন ভবনগুলোতে। এ উপলক্ষে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠসৈনিক প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীদের আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। অনুষ্ঠানে একাডেমির মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন সাংস্কৃতিক প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ। কবিতা আবৃত্তি, সংগীত, নৃত্য, নৃত্যালেখ্য ও অ্যাক্রোবেটিক প্রদর্শন করে শিল্পীরা। এছাড়া বিশিষ্ট চারুশিল্পীদের অংশগ্রহণে আর্টিস্ট ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদ ‘স্মৃতির বিজয়’ শীর্ষক উন্মুক্ত চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর তিন দিনব্যাপী আয়োজন শেষ করে। এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক সমিতি টিএসসিতে ‘সংবাদপত্রে বিজয়গাথা’ শীর্ষক আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করে।
ছায়ানট প্রতি বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহায়তায় কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে মহান বিজয় দিবসের অনুষ্ঠান আয়োজন করলেও এ বছর করোনা মহামারির জন্য বড় পরিসরের আয়োজন থেকে বিরত থেকে অনলাইনে ‘আমাদের এই পতাকা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে নাট্যদল অনুরাগ থিয়েটারের প্রযোজনায় প্রদর্শন করে নাটক ‘অবজেকশন ওভাররুল’। জাতীয় নাট্যশালা এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে নাট্যদল প্রাঙ্গণে মোর-এর প্রযোজনায় নাটক ‘মেজর’ প্রদর্শন করে। অন্যদিকে জাতীয় নাট্যশালা স্টুডিও থিয়েটার হলে নাট্যদল স্পেস অ্যান্ড অ্যাক্টিং সেন্টার-এর প্রযোজনায় নাটক ‘দুই আগন্তুক বনাম করবী ফুল’ প্রদর্শন করে।
১৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে নাট্যগোষ্ঠী আরণ্যক নাট্যদল-এর প্রযোজনায় প্রদর্শন করে নাটক ‘কহে ফেসবুক’। জাতীয় নাট্যশালা এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে নাট্যদল স্বরবীথি থিয়েটার-এর প্রযোজনায় নাটক ‘শাস্তি’ প্রদর্শন করে। অন্যদিকে জাতীয় নাট্যশালা স্টুডিও থিয়েটার হলে জাতীয় মূকাভিনয় উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। এর আয়োজন করে জাতীয় মূকাভিনয় ফেডারেশন।
২৫ ডিসেম্বর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে নাট্যদল ব্যাতিক্র নাট্যগোষ্ঠীর প্রযোজনায় প্রদর্শন করে নাটক ‘সহবাস’। জাতীয় নাট্যশালা এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে নাট্যদল থিয়েটার সার্কেল (মুন্সিগঞ্জ)-এর প্রযোজনায় নাটক ‘পঞ্চ ভূতের রং-তামাশা’ প্রদর্শন করে। অন্যদিকে জাতীয় নাট্যশালা স্টুডিও থিয়েটার হলে নাট্যদল কল্পরূপ-এর প্রযোজনায় নাটক ‘দেখিবার অপেক্ষায় আছু’ প্রদর্শন করে।
২৬ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমির ৪৩তম বার্ষিক সাধারণ সভা একাডেমির প্রাঙ্গণে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সঙ্গে জাতীয় পতাকা ও বাংলা একাডেমির পতাকা তোলার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। বাংলা একাডেমি প্রবর্তিত, পরিচালিত সাত বিশিষ্টজনকে ফেলোশিপ প্রদান করা হয়। ফেলোশিপপ্রাপ্তরা হলেনÑ ডা. সারওয়ার আলী (মুক্তিযুদ্ধ), নুরুল ইসলাম নাহিদ (শিক্ষা), নূহ-উল-আলম লেনিন (সমাজ দর্শন ও সাহিত্য), অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান (চিকিৎসাসেবা), লিয়াকত আলী লাকী (সংস্কৃতি), জুয়েল আইচ (জাদুশিল্প) এবং মনজুরুল আহসান বুলবুল (সাংবাদিকতা)।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply