শেখ হাসিনা রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থপাঠ কেন অপরিহার্য

মুহাম্মদ সামাদ : আজ বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার ৭৪তম শুভ জন্মদিন। তার জন্ম ১৯৪৭ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর বাঙালির তীর্থভূমি জাতির পিতা ও বঙ্গমাতার জন্মগ্রাম টুঙ্গিপাড়ায়। শেখ হাসিনার শৈশব কেটেছে শান্ত গ্রামীণ পরিবেশে। পরবর্তীতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিক ঘটনাবলী তাঁর রাজনীতিক ও লেখক মানসপট সমৃদ্ধ করেছে। আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেদিনের শিশু ‘হাচু’ ১৯৫২ সালে কচিকণ্ঠে উচ্চারণ করে ভাষা আন্দোলনের স্লোগান; স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছাত্রনেত্রী হিসেবে দেশের সকল ছাত্র-গণআন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। প্রিয়কন্যা হিসেবে পিতা বঙ্গবন্ধু মুজিবের অবিসংবাদিত হয়ে ওঠা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ; একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসের বন্দিজীবনের দুঃসহ অভিজ্ঞতা; একাত্তরের ডিসেম্বরে প্রত্যক্ষ করেন অগণিত বাঙালির স্বজন-প্রিয়জন হারানোর বেদনা মিশ্রিত বিজয়োল্লাস ও প্রতীক্ষিত মুক্তির আনন্দ; প্রত্যক্ষ করেন বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ এবং দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর লক্ষ্যে নতুন বাংলাদেশ গঠনের জন্যে জাতির পিতার দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি ঘোষণা; এসবই শেখ হাসিনার সনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণের প্রথম অধ্যায়।
অন্যদিকে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে জাতির পিতার নির্মম হত্যাকা-; প্রবাসে ছয় বছরের দুঃসহ শরণার্থী জীবন শেষে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন; ঘাতকের রক্তচক্ষু ও মৃত্যুবাণ উপেক্ষা করে দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের সামরিক ও স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বদান; সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্ব পালন; অতঃপর জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে ১৯৯৬ সাল থেকে, এক মেয়াদের বিরতি বাদে, অদ্যাবধি বর্তমান বিশ্বের অন্যতম প্রাজ্ঞ রাজনীতিক ও সফল রাষ্ট্রনেতা হিসেবে দেশসেবার অনন্য নজির স্থাপন করে চলেছেন শেখ হাসিনা। এই যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতা এবং নিরন্তর সাহিত্য পাঠের অনুপ্রেরণায় তার নিজের লেখালেখি, পাশাপাশি অনুসন্ধিৎসু দৃষ্টি নিয়ে বঙ্গবন্ধুর তিনখানা মহাকাব্যিক আত্মজীবনী এবং ১৪ খ- গোয়েন্দা দলিলপত্র সম্পাদনায় ব্রতী হয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার প্রথম বই ‘ওরা টোকাই কেন’-এর ভূমিকা লিখতে গিয়ে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান গভীর এক বেদনাবোধ থেকে পরিপার্শ্বকে অবলোকনের কথা উল্লেখ করে তার রচনাকুশলতার প্রশংসা করেছেন; দ্বিতীয় গ্রন্থ ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’-এর ভূমিকায় অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম শেখ হাসিনার মধ্যে একজন গভীর সংবেদনশীল লেখকের অন্তর্দৃষ্টির পরিচয় পেয়েছেন। শেখ হাসিনার ‘রচনাসমগ্র : ১ ও ২’-এর মুখবন্ধে অধ্যাপক শামসুজ্জামান খানের অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ খুবই প্রশংসনীয়। কামাল চৌধুরী ‘লেখক শেখ হাসিনা’ শীর্ষক প্রবন্ধে শেখ হাসিনার লেখালেখিকে ‘যুগপৎ সৃজনশীলতার উদ্ভাসন ও দিনবদলের হাতিয়ার’ আখ্যা দিয়ে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।

উল্লেখ্য, প্রবন্ধের কাঠামো এবং পরিধি সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মতÑ ছবিতে যেমন চৌকা জিনিসের চারিটা পাশই একসঙ্গে দেখানো যায় না, তেমনি প্রবন্ধেও একসঙ্গে একটা বিষয়ের একটি, বড়োজোর দুইটি দিক দেখানো চলে। তাই, আমি এই প্রবন্ধে শেখ হাসিনা রচিত মৌলিক ও সম্পাদিত গ্রন্থপাঠের অপরিহার্যতার দিক কয়েকটি উপশিরোনামে তুলে ধরার প্রয়াস করেছি।

টুঙ্গিপাড়ার পল্লি প্রকৃতি
টুঙ্গিপাড়া বাঙালি জাতির স্বপ্নগর্ভা গ্রাম। এই ছায়া সুনিবিড় গ্রামে বনেদি শেখদের বাড়ি। বাড়ির পেছন ঘেঁষে বয়ে চলা সকলের প্রিয় ‘খোকা’র সাঁতার-গোসলের ও বৈঠা বেয়ে নৌকায় ঘুরে বেড়ানোর স্মৃতিবিজড়িত ক্ষীণতোয়া বাইগার নদী; আশপাশের দশ গাঁয়ের মেঠোপথ, আইল-বাতর, দিগন্তবিস্তৃত ফসলের মাঠে, হাটে-ঘাটে-বাটে টুঙ্গিপাড়ার প্রিয় ‘খোকা’র শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের পদচিহ্ন পড়ে আছে; বাতাসে তাঁর নিঃশ্বাস প্রবহমান। তিনি চিরনিদ্রায় অনন্তকালের জন্যে শুয়ে আছেন এই মাটিতে! তাহলে কেমন ছিল এই গ্রাম? শেখ হাসিনার শৈশবের মধুর স্মৃতিচারণে টুঙ্গিপাড়ার সেদিনের পল্লি প্রকৃতির চিত্রালেখ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে সঞ্চারিত হবে। আগামী দিনের অনাগত শিশু-কিশোরের কৌতূহলের উত্তর মিলবে বাঙালি জাতির এই তীর্থভূমিতে জন্ম নেওয়া বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার লেখায় :

বাইগার নদী এখন টুঙ্গীপাড়া গ্রামের পাশ দিয়ে কুল কুল ছন্দে ঢেউ তুলে বয়ে চলেছে। রোদ ছড়ালে বা জ্যোৎস্না ঝরলে নদীর পানি রুপোর মতো ঝিকমিক করে।… নদীর পাড় ঘেঁষে কাশবন, ধান-পাট-আখ ক্ষেত, সারিসারি খেজুর, তাল-নারকেল-আমলকি গাছ, বাঁশ-কলাগাছের ঝাড়, বুনো লতাপাতার জংলা, সবুজ ঘন ঘাসের চিকন লম্বা লম্বা সতেজ ডগা। শালিক-চড়–ই পাখিদের কল-কাকলি, ক্লান্ত দুপুরের ঘুঘুর ডাক। সব মিলিয়ে ভীষণরকম ভালোলাগার এক টুকরো ছবি যেন। আশ্বিনের এক সোনালী রোদ্দুর ছড়ানো দুপুরে এ টুঙ্গীপাড়া গ্রামে আমার জন্ম। গ্রামের ছায়ায় ঘেরা, মায়ায় ভরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ এবং সরল-সাধারণ জীবনের মাধুর্য্যরে মধ্য দিয়ে আমি বড় হয়ে উঠি।
আমার শৈববের স্বপ্ন-রঙিন দিনগুলো কেটেছে গ্রাম-বাংলার নরমপলিমাটিতে, বর্ষার কাদা-পানিতে, শীতের মিষ্টি রোদ্দুরে, ঘাসফুল আর পাতায় পাতায় শিশিরের ঘ্রাণ নিয়ে, জোনাক-জ্বলা অন্ধকারে ঝিঁঝিঁর ডাক শুনে, তাল-তমালের ঝোপে বৈচি, দীঘির শাপলা আর শিউলি-বকুল কুড়িয়ে মালা গেঁথে, ধুলোমাটি মেখে, বর্ষায় ভিজে খেলা করে।… বৈশাখে কাঁচা আম পেড়ে কুচি কুচি করে কেটে সর্ষেবাটা ও কাঁচা মরিচ মাখিয়ে, তারপর কলাপাতা কোনাকুনি করে সে আম মাখা পুরে, তার রস টেনে খাওয়ার মজা ও স্বাদ আমাকে এখনও আপ্লুত করে রাখে। কলাপাতায় এ আম মাখা পুরে যে না খেয়েছে, কিছুতেই এর স্বাদ বুঝবে না।

১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন
রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রথম প্রত্যক্ষ সংগ্রাম শুরু হয় ১৯৪৮ সালের ৪ঠা মার্চ। সেদিন বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা দাবি করে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে লিফলেট বিলি করা হয়। সেই লিফলেটের অন্যতম স্বাক্ষরদাতা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ১১ই মার্চ প্রদেশব্যাপী ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। ধর্মঘটের সমর্থনে জনমত গঠনের লক্ষ্যে শেখ মুজিব ফরিদপুর, যশোর, খুলনা ও বরিশালে ছাত্রসভা করেন। ঢাকায় ফিরে ১০ই মার্চ রাতে ফজলুল হক হলে এক সভায় ১১ই মার্চের হরতালের কর্মসূচিতে কারা, কোথায় ও কীভাবে দায়িত্ব পালন করবেন তা ঠিক করে দেন। শেখ হাসিনা সম্পাদিত পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা বিস্তারিত তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয় :

Secret information was received on 12.3.48 that the subject (Bangabandhu) along with others took part in the discussions held at Fazlul Haq Hall on 10.3.48 and gave opinion in favour of violating section 144 Cr.p.c. on 11.3.48. On this decision, small batches of Hindu and Muslim students were sent out on 11.3.48 to picket the G.P.O., the secretariat and other important Govt. offices. The subject [Sheikh Mujibur Rahman] was arrested on 11.3.48 for violating the orders. … He took very active part in the agitation for adopting Bengali as the State language of Pakistan. …

১৯৫২-এর ফেব্রুয়ারিতে শহিদদের রক্তের বিনিময়ে ভাষা আন্দোলন যৌক্তিক পরিণতি লাভ করে এবং পূর্ব বাংলার সর্বস্তরের মানুষের মনে এই আন্দোলন গভীর ছাপ ফেলে। শেখ হাসিনার শিশুমনের ওপরও এর প্রভাব পড়ে। ১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু জেল থেকে মুক্তি পেয়ে টুঙ্গিপাড়ায় গেলে শিশুকন্যা শেখ হাসিনা পিতাকে জড়িয়ে ধরে কচিকণ্ঠে ভাষা আন্দোলনের সেøাগান দেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন : [কারামুক্তির] ‘পাঁচ দিন পর বাড়ি পৌঁছলাম।… হাচু আমার গলা ধরে প্রথমেই বলল, ‘আব্বা, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই, রাজবন্দিদের মুক্তি চাই।… ২১শে ফেব্রুয়ারি ওরা ঢাকায় ছিল, যা শুনেছে তাই বলে চলেছে।’ শিশুকাল থেকে লালিত মায়ের ভাষার প্রতি শেখ হাসিনার ভালোবাসার ঐতিহাসিক প্রমাণ মেলে ১৯৯৯ সালে আমাদের শহীদ দিবস রক্তে রাঙানো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের জন্যে ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃতি লাভের মধ্যে দিয়ে। এই স্বীকৃতি আদায়ের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাধ্যমে তিনি ব্যাপক কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেন। শেখ হাসিনার ভাষায় :

১৭ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সদস্যপদ প্রাপ্তির ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে নিউইয়র্ক যাই। জাতিসংঘ রজতজয়ন্তী উদযাপন করি। জাতিসংঘের মহাসচিব এবং অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধানদের সাথে সাক্ষাৎ হয়। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনও উপস্থিত ছিলেন।… জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার প্রধানদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ হয়। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য বাঙালি জাতির অবদানের কথা বিশেষভাবে তুলে ধরি। মাতৃভাষাকে আমরা কত ভালোবাসি তা গর্বভরে উল্লেখ করি।… নিউইয়র্ক থেকে আমি প্যারিস যাই ইউনেস্কো কর্তৃক শান্তি পুরস্কার গ্রহণের জন্য। ২৪ সেপ্টেম্বর আমাকে এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। ইউনেস্কোর প্রধানের সঙ্গে আলোচনা প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের বিষয়ে আলোচনা করি। ২১ ফেব্রুয়ারির কথাও উল্লেখ করি। ইউনেস্কোর ৩০তম সাধারণ সম্মেলনে সর্বসম্মতিভাবে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব গৃহীত হয়।

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের আন্দোলন-সংগ্রাম
ঢাকার গভর্নমেন্ট ইন্টারমিডিয়েট কলেজে (আজকের সরকারি বদরুন্নেসা কলেজ) বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্যে ভালোই কাটছিল তার নানা রঙের দিন। ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হয়ে কলেজে শহিদ মিনার স্থাপনের আন্দোলনের নেতৃত্বদান তার জীবনের পথ ঘুরিয়ে দেয়। গ্রেফতারের হুমকিও দেওয়া হয় তাকে। তবে তাকে নানাভাবে দমিয়ে রাখার লক্ষ্যে কলেজ কর্তৃপক্ষের কোনো চেষ্টাই সফল হয়নি। সেই সময় কলেজ থেকে স্বল্প দূরত্বে নাজিমুদ্দিন রোডের কারাগারে তার পিতা শেখ মুজিব বন্দি ছিলেন। গ্রেফতারের হুমকির প্রতিক্রিয়ায় শেখ হাসিনার উপলব্ধি ছিল এ-রকম :

আমাদের আন্দোলন বেশ তুঙ্গে। শহীদ মিনার আমাদের চাই। ঢাকার ডিসিকে প্রিন্সিপাল খবর দিলেন। আমাকে হুমকি দিলেন অ্যারেস্ট করার। আব্বা তখন জেলে, নাজিমুদ্দিন রোড বকশীবাজার থেকে বেশি দূরে না। চারআনা রিকশা ভাড়া লাগে। প্রায় ১৫ দিন পরপর আব্বার সাথে সাক্ষাতের সুযোগ পেতাম। কলেজ থেকে প্রায়ই যেতাম। আমাকে যখন হুমকি দেওয়া হলো গ্রেপ্তারের, বললাম, আপত্তি নেই। কারণ প্রায়ই তো যাচ্ছি। আর আব্বা যখন ভেতরে আছেনই আমি যাব জেলে।

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে ছাত্রনেত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা আইয়ুবের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ’৬২-র শিক্ষা আন্দোলন, বাঙালির মুক্তির সনদ ’৬৬-র ৬-দফার সংগ্রাম এবং ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানসহ সকল ছাত্র গণ-আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সেই উত্তাল সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে ধারাবাহিক ইতিহাস তুলে ধরেছেন তার ‘সংগ্রামে আন্দোলনে গৌরবগাথায়’ শিরোনামের লেখাটিতে। সামরিক জান্তা আইয়ুব খান ফাঁসির ভয় দেখিয়ে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে যখন বঙ্গবন্ধুকে তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাবার প্রস্তাব করেন, তখন পিতার রাজনৈতিক সহযাত্রী প্রজ্ঞাময়ী মা ফজিলাতুন্নেছা কন্যা শেখ হাসিনাকে দিয়ে লিখিত বার্তা পাঠিয়েছিলেন কারাবন্দি বঙ্গবন্ধুর কাছে। কিন্তু সেদিন সেই বার্তা না দিতে পেরে কারাগারের গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে শেখ হাসিনা শুধু বলে আসতে পেরেছিলেন যে : “মা দেখা করার চেষ্টা করছেন। মার সাথে দেখা না করা পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্ত নেবেন না।” ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে বন্দি অবস্থায় সন্ধ্যায় নিয়মিত হাঁটার সময় বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে হত্যার চক্রান্তও করেছিল সামরিক জান্তা আইয়ুব খান। যা হোক, এভাবে প্রাথমিক প্রচেষ্টায় ব্যর্থ প্যারোলপন্থিরা বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ও শেখ হাসিনাকে দোষারোপ করেছিলেন। এখানে মাতা-কন্যার দৃঢ়তা ও আবেগঘন কথাগুলো পাঠকের জন্যে উল্লেখ করা অপরিহার্য:

আমি যখন ফিরে এলাম অনেকে আমার সাথে আমাদের বাড়িতে ফিরে এলেন এবং আমার মাকে দোষারোপ করলেন। তারা ভয় দেখাচ্ছিলেন যে, আপনি এত কঠিন, আপনি জানেন না যে ওনাকে ফাঁসি দেবে, ফাঁসি দিয়ে মেরে ফেলবে। আমার মা বলেছিলেন যে, “বিধবা হলে তো আমিই হবো আর পিতা হারালে আমার সন্তানরা হারাবে। আপনারা ব্যস্ত হচ্ছেন কেন? সারা বাংলাদেশের মানুষের আশা-আকাক্সক্ষাকে পদদলিত করে তিনি প্যারোলে যেতে পারেন না।” এরপর এলো আমার ওপর আক্রমণ। আমাকে তারা বললেন, তুমি কেমন মেয়ে, তুমি চাও না তোমার বাবা ফেরত আসুক? আমি শুধু একটি কথাই বলেছিলাম যে, “হ্যাঁ, আমি চাই, আমার বাবা আমার মতো উঁচু করে ফিরে আসবেন। আমার বাবা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটিই সঠিক সিদ্ধান্ত। আপনারা অযথা বাবাকে বিরক্ত করবেন না।” আমি মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেছিলাম। আমার মা আমাকে সান্ত¡না দিয়েছিলেন। বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলেন যে, “কিছুই হবে না। তোমার বাবা মাথা উঁচু করে ফিরে আসবেন।”

লেখক : কবি, উপ-উপাচার্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
[বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়]

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply