বাংলাদেশের নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়নের সাহসী চেতনা

অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম: স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মাত্র ৯ মাসের মধ্যেই জাতিকে একটি সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুই প্রথম নারী-পুরুষের সমান অধিকারের বিষয় উপলব্ধি করেছিলেন। তিনি মনে করতেন, নারী-পুরুষের সমান অংশীদারিত্বের মধ্য দিয়েই দেশ উন্নতির পথে এগিয়ে যাবে। বঙ্গবন্ধু ‘সোনার বাংলা’ গড়ে তুলতে পুরুষের পাশাপাশি নারীকে অন্তর্ভুক্ত করে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। তিনি সোনার বাংলা গড়ার কাজে শিক্ষার প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। তিনি প্রাথমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক করার উদ্দেশ্যে দেশের সব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে জাতীয়করণ করেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরও তিনি মর্যাদার আসনে স্থান প্রদান করেন। সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি তিনি কারিগরি বা কর্মমুখী শিক্ষার ওপরও বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। উদার, স্বাধীন এবং মুক্তচিন্তার অনুশীলনের জন্য বঙ্গবন্ধু সরকারি বিশ^বিদ্যালয়গুলোকে স্বায়ত্তশাসন প্রদান করেন। বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের সুষ্ঠু তদারকির জন্য তিনি বিশ^বিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন গঠন করেন এবং উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশ^মানের গবেষণা বাড়ানোর তাগিদ অনুভব করেন। বঙ্গবন্ধু প্রায়শই বলতেন, ‘সোনার বাংলা গড়তে সোনার মানুষ চাই।’ সোনার মানুষ হবে মানবিকতার গুণে দক্ষ মানবসম্পদ। মানবসম্পদ তৈরির জন্য প্রয়োজন সুশিক্ষা।
বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের পার্থক্য কমিয়ে আনার লক্ষ্যে ক্রমান্বয়ে নারী ও পুরুষকে পাশাপাশি দক্ষভাবে গড়ে তুলতে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। ১৯৭৪ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগ প্রথম বার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে বঙ্গবন্ধু শিক্ষার উদ্দেশ্য এবং নারী শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব অনুধাবন করে বলেন, “শতকরা ২০ জন শিক্ষিতের দেশে নারীর সংখ্যা আরও নগণ্য। শুধুমাত্র ক-খ শিক্ষলেই শিক্ষত হয় না, সত্যিকারের আলোকপ্রাপ্ত হইতে হইবে।” আবার বঙ্গবন্ধু শুধুমাত্র নারী শিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করেননি; পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের কাজ করার সুযোগও সৃষ্টি করেছেন। ১৯৭৩ সালে গঠিত মন্ত্রিসভায় শিক্ষা ও সমাজকল্যাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দুজন মহিলাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু সরকার মহিলাদের জন্য সরকারি চাকরিতে ১০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণেরও ব্যবস্থা করেন। সংসদে নারীদের জন্য সংরক্ষিত আসনেরও ব্যবস্থা করেন, যাতে নারীরা রাজনৈতিক কর্মকা-ে অধিকতর সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ পায়। বঙ্গবন্ধু ৬-দফা আন্দোলন করতে গিয়ে গ্রেফতার হলে দলের কর্মকা- সচল রাখার জন্য একজন নারীকে দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর বিশাল ব্যক্তিত্বের কারণে ষাটের দশকে আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলনে বহু নারী স্বপ্রণোদিত হয়ে আওয়ামী লীগের দলীয় কর্মকা-ে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধেও নারীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। স্বাধীনতা-পরবর্তী মাত্র তিন বছরের মধ্যেই বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে অগ্রসরমানতার সোপান এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালে ঘৃণ্য হত্যাকা-ের মাধ্যমে ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুকে নয়; একটি আদর্শকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবার এবং পরবর্তীতে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে জাতিকে নেতৃত্বহীন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। ১৯৭৫-পরবর্তী মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী সরকারগুলো দীর্ঘ ২১ বছর এদেশের মানুষের ইচ্ছের বিরুদ্ধে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসেছিল।
বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে শুধু হত্যা করে ক্ষান্ত হয়নি, তার নামগন্ধ পর্যন্ত মুছে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল বিকৃত ইতিহাস রচনার মধ্য দিয়ে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে পরাধীনতার শেকল থেকে মুক্ত করতে নানা ধরনের নিপীড়ন ও অত্যাচার সহ্য করেছেন। বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি নিরন্তর সংগ্রাম করেছেন। নিজের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনকে বিসর্জন দিয়েছেন। সেই বাঙালির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান বঙ্গবন্ধুকে কয়েকটি প্রজন্মের কাছে অপরিচিত করার অপচেষ্টা চলে। কিন্তু দৈবক্রমে বঙ্গবন্ধুর দু-কন্যা বিদেশে থাকায় বেঁচে যান। জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা ১৯৮১ সালের ১৭ মে অবতারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে আসেন। দিশেহারা বাঙালিরা আবার আশার আলোর সন্ধান পায়। নানা আন্দোলন আর ষড়যন্ত্রের ভিতর বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাকে দুর্গম পথ অতিক্রম করতে হয়। আওয়ামী লীগের কা-ারি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে আসীন হয় আওয়ামী লীগ। নানা প্রতিকূলতার ভিতর রাষ্ট্র পরিচালনায় বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারণ করে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। স্থানীয় পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়নে শেখ হাসিনা সরকার ইউএনডিপি’র সহায়তায় বিশেষ সুযোগ সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। ব্যক্তিগতভাবে এই নিবন্ধ লেখার সুযোগ হয়েছিল স্থানীয় পর্যায়ে মহিলা নেতৃত্বের বিকাশ নিয়ে গবেষণা করার। স্থানীয় ওয়ার্ড কমিশনারদের নিবিড় সাক্ষাৎকারের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে কী ধরনের ‘অসুবিধা’ বা ‘বাধা’র সম্মুখীন হতে হয়। জানা যায়, সেসব বাধাবিপত্তি কাটিয়ে বর্তমানে স্থানীয় সরকারে নারীর জন্য ৩০ শতাংশ অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এটা শেখ হাসিনা সরকারের একটি সুনির্দিষ্ট কর্মসূচির ফসল। ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত দুটো সরকার ক্ষমতায় আসে। এ সময় শেখ হাসিনা সরকারের অনেকগুলো কর্মসূচি বাতিল বা পরিবর্তন করা হয়। ফলশ্রুতিতে অনেক প্রগতিশীল কর্মসূচি ব্যাহত হয়। ২০০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ এখন পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে অধিষ্ঠিত থাকার ফলে দেশের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে।
পিতার অসমাপ্ত স্বপ্ন বাস্তবায়ন এবং স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছেন তারই কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বাংলাদেশকে একটি মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত করার আশার নাম দেন ‘রূপকল্প ২০২১’। তিনি বাংলাদেশের সকল নাগরিককে ডিজিটাল বাংলাদেশের শুধু স্বপ্ন দেখাননি; বাংলাদেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশে রূপান্তরিত করেছেন। বর্তমানে সর্বাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে কেন্দ্র থেকে প্রান্তিক পর্যায়ে তথ্য বাতায়নসহ নানা ধরনের কর্মকা- নিয়ে তরুণ প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। যোগ্য মানবসম্পদ কিংবা দক্ষ তথ্যপ্রযুক্তিবিদ হওয়ার ক্ষেত্রে শিক্ষার বিকল্প নেই। দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের লক্ষ্যে নারী-পুরুষের একসাথে চলার মধ্য দিয়ে পারিবারিক তথা সামাজিক, রাষ্ট্রীয় সমৃদ্ধির সোপান রচিত হয়। শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে শতভাগ শিশুকে প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষিত করার সাফল্য দেখিয়েছেন। প্রাথমিক শিক্ষায় শিশু ভর্তি ছিল ৬১ শতাংশ। বর্তমানে তা ৯৭.৭ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। শিক্ষায় সুবিধাবঞ্চিত গরিব ও মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট আইন ২০১২’ প্রণয়ন করেছেন। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাতাগণ এখন নিজস্ব মোবাইল ফোনের মাধ্যমে বৃত্তির টাকা উত্তোলন করতে পারছেন। পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে ডিজিটালাইজেশনের আওতায় আনা হয়েছে। প্রায় প্রতিটি স্কুলে আইসিটি ল্যাব চালু করা হয়েছে। শুধুমাত্র সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; একই সাথে মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থারও আধুনিকায়ন ও যুগোপযোগী করা হয়েছে। নারী শিক্ষাকে এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত উপবৃত্তি চালু করা হয়েছে। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬০ শতাংশেরও অধিক নারী শিক্ষক নিয়োজিত হওয়ার ফলে পরিবার ও সমাজে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়েছে। শুধু মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থার উন্নতি বা নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পায়নি; এখন উচ্চ শিক্ষায়ও নারীর অংশগ্রহণ ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন পুরুষের ভালো ফলাফলের সমান্তরালে নারীরাও অনেক ক্ষেত্রে সাফল্য ও সক্ষমতা প্রদর্শন করছে।
২০০৮ সালের পরে বাংলাদেশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নয়ন সাধন করেছে। এই উন্নয়নের অনুষঙ্গগুলো দৃশ্যমান। প্রায় ৪০টির মতো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয়, প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। একইভাবে শতাধিক বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়, বহু সংখ্যক মেডিকেল কলেজসহ নানা ধরনের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “শিক্ষাক্ষেত্রে অর্থ ব্যয় প্রকৃতপক্ষে ব্যয় নয়, এটা বিনিয়োগ। এ বিনিয়োগের ফসল দ্রুত পাওয়া যায় না। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়।” বাংলাদেশে শিক্ষা বিনিয়োগের ধারাবাহিকতায় পুরুষের পাশাপাশি দক্ষ নারী জনশক্তির উদ্ভব হয়েছে। ‘মধ্যম’ আয়ের দেশ থেকে ‘উন্নত’ দেশে রূপান্তরিত হওয়ার পথযাত্রায় নারী-পুরুষের সমান অবদান ছাড়া এগিয়ে যাওয়া যায় না, তেমনি উন্নয়নকেও ধরে রাখা যায় না। সুতরাং শিক্ষার মাধ্যমে অর্থাৎ বিজ্ঞান, চিকিৎসা, কৃষি, স্বাস্থ্য, সাধারণ সকল ধরনের শিক্ষার বিনিয়োগের ফসল হবে আগামী দিনের দক্ষ জনশক্তি।
বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার শাসনামলের শুরু থেকেই নারী নেতৃত্বকে শক্তিশালী করতে চেয়েছিলেন। রাষ্ট্র ও সামাজিক জীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকার, মর্যাদা ও সম-অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই ছিল তার লক্ষ্য। বঙ্গবন্ধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অর্থাৎ বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার আলোকে আমাদের সংবিধান উপহার দিয়েছিলেন। সেই সংবিধানে নারী-পুরুষ, শ্রেণি-বৈষম্যসহ সকল প্রকার বিভেদ দূর করা হয়েছিল। বাঙালির পাশাপাশি অন্যান্য নৃ-গোষ্ঠীর তথা পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছিল স্বাধীনতার প্রথম সংবিধানে। বঙ্গবন্ধুর ভাবনায় নারী-পুরুষ সমযাত্রা শুধু বক্তৃতায় ছিল না, বাস্তবে এর রূপায়ণ করেছিলেন। আওয়ামী লীগ অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ ও সমতায় বিশ^াসী রাজনৈতিক দল হিসেবেই এক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে।
ইতোপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে যে, তৎকালীন পাকিস্তান আমলে ৬-দফা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুসহ নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা যখন কারাগারে অন্তরীণ, তখন বঙ্গবন্ধু একজন নারীকে সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়ে ইতিহাস গড়েছিলেন। রাজনৈতিক দলের ভেতরেই নয়, পারিবারিক জীবনেও বঙ্গবন্ধু নারীদের সম্মান করতেন এবং তাদের যথাযথ দায়িত্ব প্রদান করতেন। বঙ্গবন্ধু তার সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনে তার সহধর্মিণী বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কারাগারে অন্তরীণ বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তিনি দলের সাংগঠনিক কর্মকা-ের খোঁজখবর রাখতেন। ছাত্রলীগের খোঁজখবর রাখতেন, পরামর্শ দিতেন, এমনকি নিজের গহনা বিক্রি করে অর্থ সাহায্যও করেছেন। বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্যে থেকে বঙ্গমাতাও নেতৃত্বের গুণাবলিতে বিকশিত হয়েছিলেন। ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুর প্যারোলে মুক্তির বিরুদ্ধে সুদূঢ় ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি টার্নিং পয়েন্ট ছিল। বঙ্গমাতার এ অসাধারণ ভূমিকা জাতি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে।
শুধু ছেলেদেরই নয়, মেয়েদেরও সমান শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেছিলেন বঙ্গবন্ধু পরিবার। তার প্রমাণ আজকে পাওয়া যায় জননেত্রী শেখ হাসিনা ও তার বোন শেখ রেহানার রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সামাজিক সচেতনতাসহ বঙ্গবন্ধুর আদর্শের গভীর প্রভাব।
আমাদের সংবিধানে ৬৫নং ধারায় পার্লামেন্টে নারীদের জন্য ১৫টি আসন সংরক্ষিত রাখার ব্যবস্থা করা হয়। সংরক্ষিত আসনের পাশাপাশি নারীর সরাসরি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত থাকে। সংরক্ষিত এ আসনের সংখ্যা সময়ের প্রেক্ষাপটে ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে ১৫টি থেকে ৩০ এবং বর্তমানে তা ৫০ সিটে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। এর ফলে স্থানীয় পর্যায় থেকে জাতীয় পর্যায়ে নারী নেতৃত্ব বিকশিত হতে থাকে। বঙ্গবন্ধু নারীদের বঞ্চনা থেকে মুক্তি এবং সম্মান বৃদ্ধির জন্য সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে বেশ কিছু যুগান্তকারী উদ্যোগ নেন। বাংলাদেশের প্রথম নারী সংগঠন মহিলা সংস্থার ভিত্তি রচনা করেন। শিশু-কিশোরদের নৈতিক শিক্ষা ও সমমর্যাদা বৃদ্ধির জন্য গার্লস গাইড ঢেলে সাজিয়ে পুনর্গঠন করেন। যৌতুক প্রথা উচ্ছেদ করতেও পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর পথ অনুসরণ করে তারই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা নারী নেতৃত্ব ও ক্ষমতায়নের জন্য নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। এক্ষেত্রে অসামান্য অবদানের জন্য সম্মানজনক ‘গ্লোবাল উইমেন্স লিডারশিপ’ অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। বাংলাদেশসহ এশীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে নারী শিক্ষা ও ব্যবসায়িক উদ্যোগের বিষয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের জন্য যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল সামিট অব উইমেন্স পুরস্কার লাভ করেন। পুরস্কার গ্রহণকালে শেখ হাসিনা নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থানের জন্য ৪টি প্রস্তাব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রথমত, নারীর সক্ষমতা নিশ্চিত করতে প্রচলিত একমুখী ধারণা পরিহার করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রান্তিক ও ঝুঁকির মুখে থাকা নারীরা এখনো কম খাদ্য পাচ্ছে, স্কুলে যেতে পারছে না, কম মজুরিতে কাজ করছে এবং সহিংসতার শিকার হচ্ছে। কোনো নারী ও মেয়েকে পেছনে রাখা উচিত নয়। তৃতীয়ত, নারীদের উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে এবং চতুর্থত, জীবন ও জীবিকার সব ক্ষেত্রে নারীদের জন্য সমান সুযোগ তৈরি করতে হবে।
নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বিশ্বে ১৫৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে তিনিই প্রথম তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে নারীকে বসিয়েছেন। বর্তমানে শিক্ষামন্ত্রীও একজন নারী, যিনি ইতোমধ্যেই দক্ষতার ছাপ রেখেছেন। তার নেতৃত্বাধীন জাতীয় সংসদে প্রথম নারী সংসদ উপনেতা হয়েছেন। জাতীয় সংসদের স্পিকার পদে নারী বসেছেন তার হাত ধরেই, যিনি পরপর তিন মেয়াদে নির্বাচিত হয়ে দায়িত্ব পালন করছেন। এটা দেশের ইতিহাসেও নজিরবিহীন। শেখ হাসিনার সরকারের ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জাতীয় বাজেটে নারী উন্নয়নে বরাদ্দ ছিল ২৮ শতাংশ, ২০১৮-১৯ সালে তা ২৯.৬৫ শতাংশে উন্নীত করা হয়। প্রতি বছরই বাজেটে এই খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের বিনা বেতনে শিক্ষার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তার সরকারের আমলেই নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে কোনো জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা এসএমই ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তার নেতৃত্বেই একটি যুগোপযোগী জাতীয় নারীনীতি প্রণয়ন করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সময়ে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীসহ সামরিক বাহিনীতে নারীদের অধিক অংশগ্রহণ এবং গুরুত্বপূর্ণ ও উচ্চপদগুলোতে নারীদের নিয়োগ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সময়কালেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নারী উপাচার্য হিসেবে এ নিবন্ধ লেখককে নিয়োগ দিয়েছেন। যদিও সিনেট কর্তৃক উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনে নিবন্ধকার জয়লাভ করেছিলেন। উপাচার্য হিসেবে শতবর্ষের ইতিহাসে প্রথম একজন নারীকে নিয়োগ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী নিজেই বেগম রোকেয়া পদক ২০১৬ প্রদান অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হবেন মেয়েরাÑ এটা কেউ কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। যা হোক, আমি উদ্যোগ নিই এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী ভিসি, প্রো-ভিসি নিয়োগের ব্যবস্থা নিয়েছি। তারা কিন্তু খুব ভালোও করছেন। এমনকি আমরা বুয়েটেও দিয়েছিলাম (নারী ভিসি) কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য, তিনি হঠাৎ ক্যানসারে মারা যান।’ উল্লেখ করা যেতে পারে, বাংলাদেশে বিশ^বিদ্যালয় পর্যায়ের প্রায় শতবর্ষের ইতিহাসের খোলস ভেঙে প্রথম নারী উপাচার্যের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে।
আমরা আরও লক্ষ করেছি যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সময়কালে উচ্চ আদালতের বিচারপতি, চিকিৎসা কোরের একজন নারী সেনা অফিসারকে প্রথমবারের মতো মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। রাজনীতি ও দেশ পরিচালনায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসন ৪৫ থেকে বাড়িয়ে শেখ হাসিনা ৫০-এ উন্নীত করেছেন। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়নে ইউনিয়ন পরিষদে নারী জনপ্রতিনিধিকে সরাসরি ভোটে নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছেন শেখ হাসিনা। বাল্যবিবাহ রোধ ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর আইন করেছে সরকার। নারী নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জে দেশের প্রথম নারী সিটি মেয়র বঙ্গবন্ধু-কন্যার হাত ধরেই হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের বাস্তবমুখী কর্মসূচির ফলে বাংলাদেশ জেন্ডার গ্যাপ সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য সব দেশের তুলনায় শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। আর বৈশ্বিক হিসেবে, গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট, ২০১৬ অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ১৪৪টি দেশের মধ্যে ৭২তম। এই অবস্থান গত ২০০৬ সালে ছিল ১১৫টি দেশের মধ্যে ৯১তম। ষষ্ঠ ও সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় সরকার দেশকে ২০২১ সাল নাগাদ একটি মধ্য আয়ের রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার পথ মানচিত্র অংকনের প্রয়াস পেয়েছে। তন্মধ্যে অর্থনৈতিক এবং সামাজিক উদ্যোগ, মাতৃত্ব ও স্বাস্থ্য, শিক্ষা, জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি, নারীর প্রতি সহিংসতা দমন, বাল্যবিবাহ নিরোধ ইত্যাদি। সার্বিকভাবে লিঙ্গ-বৈষম্যের দিক দিয়ে বাংলাদেশ ১১১তম, যেখানে পাকিস্তান ১২৩ এবং ভারত ১৩৩ নম্বরে। এই সূচকে এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সুদৃঢ়। বর্তমানে এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে নারী নেতৃত্বের ছোঁয়া লাগেনি। প্রায় সকল ক্ষেত্রে নারীর অবাধ বিচরণ সংখ্যাতাত্ত্বিক বিবেচনায় হয়তো এখনো নারী-পুরুষ সমান্তরাল হয়ে ওঠেনি। তবে প্রতীকী বা স্বল্পসংখ্যায় উপস্থিত হলেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উৎসাহিত করবে নবদিগন্তের সূচনায়।
আমরা জানি, উন্নয়নের সঙ্গে অনেকগুলো সূচক জড়িত। এর মধ্যে শিক্ষা এবং নারীর ক্ষমতায়ন অন্যতম। ক্ষমতায়ন একটি প্রক্রিয়া, যার মধ্য দিয়ে নারী ক্ষমতায়িত অবস্থান অর্জন করেন। অর্থাৎ একজন নারী একজন পুরুষের পাশাপাশি সমান শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তার ব্যক্তিগত সামাজিক ও রাজনৈতিক চিন্তা ও ভূমিকা প্রকাশ করতে পারে এবং সেই সঙ্গে সে সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ গ্রহণেও সক্ষমতা অর্জন করে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপরোক্ত নীতিমালা ও কার্যক্রমের ভিতর দিয়ে নারীর প্রতি সেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। তবে এখনো বিশ্বব্যাপী মুখ্যত ‘পুরুষ প্রধান’ সমাজব্যবস্থা নারীর প্রতি অহিংস ও ক্ষমতায়নে বাধা প্রদান করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জানেন এ পথ বন্ধুর; কিন্তু তার সুদূরপ্রসারী ও সাহসী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নারীর প্রতি আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন ঘটাতে বাংলাদেশের নারী তথা সমগ্র জাতিকেই ভূমিকা রাখতে হবে। আমরা লক্ষ করছি যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়কালে নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নের সূচকে বাংলাদেশ শুধুমাত্র দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, পৃথিবীজুড়ে বিস্ময়ের সৃষ্টি করেছে। এসব কার্যকারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সময়ে ৪০টিরও বেশি অ্যাওয়ার্ড লাভ করেছেন। আমরা মনে করি, সাফল্য বা অর্জনের স্বীকৃতি বহুদূর এগিয়ে যেতে প্রেরণা জোগায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিনে আমরা তাকে শুভেচ্ছা ও অভিবাদন জানাই। তার দীর্ঘ কর্মময় জীবন ও সফল নেতৃত্ব কামনা করি।

লেখক : উপাচার্য, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply