ভাস্কর্য বিতর্কের অবসান হোক

ইনাম আহমেদ চৌধুরী: সম্প্রতি ভাস্কর্য-স্থাপনা নিয়ে দেশে একটি অনভিপ্রেত বিতর্কের সূচনা হয়েছে। রাজধানীর দোলাইরপাড় মোড়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য নির্মাণের বিরোধিতা করেছেন কোনো কোনো ধর্মভিত্তিক দল বা কোনো কোনো ধর্মীয় নেতা। কুষ্টিয়া এবং ঠাকুরগাঁওতে বঙ্গবন্ধুর স্থাপিত ভাস্কর্যের অঙ্গহানির অপচেষ্টাও করেছে কোনো কোনো দুষ্কৃতিকারীরাÑ লোকচক্ষুর অন্তরালে, রাত্রির আঁধারে। তাদের এই অপকর্ম যে আইন ও সমাজের বিচারের মানদ-ে শাস্তি প্রদানযোগ্য জঘন্য অপরাধ, এ ব্যাপারে কোনো দ্বিমত নেই। আমরা দেখে স্বস্তিবোধ করেছি যে সমগ্র জাতি এক বাক্যে এই দুষ্কর্মকে অগ্রহণযোগ্য অপরাধ বলেই নিন্দাবাদ করেছে। একটি বিষয় প্রকট হয়ে উঠেছে যে কোনো এক সুযোগের দুর্ব্যবহার করে বিশেষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিসন্ধিমূলকই হয়েছে এই কুকা-। দেশবাসী এতে ক্ষুব্ধ, রুষ্ট, প্রতিবাদী ও সুবিচার প্রত্যাশী।
অবশ্যই যে কোনো ব্যাপারে একটি গণতান্ত্রিক দেশে দ্বিমত থাকতে পারে, যে কোনো ‘ইস্যু’তে ভিন্ন ভিন্ন মতাবলম্বীরা তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারেন। তবে এ নিয়ে কোনো সাংঘর্ষিক বচসা পরিহার করাই শ্রেয়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনাও যথাযথভাবেই আশা করছেন, একটি সমঝোতামূলক পরিবেশেই এই তথাকথিত বিরোধের সমাধান হোক এবং সেটাই কাম্য। বিশেষ করে যেখানে দ্বিমতের কোনো অবকাশ নেই সেই জাতির পিতার প্রতি সর্বজনীন শ্রদ্ধা প্রদর্শন তো প্রশ্নাতীতভাবেই পরম বাঞ্ছনীয়। পৃথিবীতে মুসলিমপ্রধান দেশসমূহসহ এমন খুব কম দেশই আছে যেখানে জাতির পিতা, দেশ-নেতা, মনীষী বা বরেণ্য ব্যক্তিবর্গের ভাস্কর্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা হয় না।
ইরানের মতো ইসলামিক দেশেও বর্তমানে ইমাম খোমেনি ছাড়াও শেখ সাদি, মৌলানা রুমি, হাফেজ ফেরদৌসী, ওমর খৈয়াম, আবু সিনা (ইবনে সিনা) এদের অবয়ব-ভাস্কর্য আছে। তাছাড়া ইরানে এখন তো সগর্বে সুরক্ষিত রয়েছে প্রাচীন ইরানি/পারসিক সভ্যতার নিদর্শনসমূহ, যেমন- পার্সিপোলিস, আপাদানা, ইস্ফাহান এবং অন্যান্য স্থানে রয়েছে মানব-ভাস্কর্যের সমাহার। ঐতিহ্যবাহী মধ্যপ্রাচ্য ও সেন্ট্রাল এশিয়ার বহু দেশেও তাই।
ঐতিহাসিক Mortimer Wheelerতার খ্যাতনামা গ্রন্থ Splendours of the East-এ উল্লেখ করেছেন, বিভিন্ন শিল্পকলায়, বিশেষ করে ভাস্কর্যে, প্রাচীন ইরান, ইরাক, সমরখন্দ, বোখারা, খিভা- গোটা মধ্যপ্রাচ্য ও সেন্ট্রাল এশিয়ায় কি আশ্চর্য উৎকর্ষতা অর্জিত হয়েছিল এবং কী করে ‘আরব ও ইসলাম’ তাকে গ্রহণ ও সমন্বিত করেছিল। বর্ণনানুক্রমে তিনি লিখেছেন (পৃ. ১৭) : And now the Arabs and Islam have come upon the scene … they were impetuously ready to adopt and adapt the magnificence of established civilizations : We shall here travel with them to three great cities where their handiwork is proudly manifest : Samarra (Iraq) Ispahan and Samarkhand. শাহান শাহ রেজা শাহ পাহলভীর পতনের পর পাহলভীদের কয়েকটি মূর্তি ভাঙাচোরা হয়েছিল বটে, তবে তা ছিল রাজনৈতিক কারণে। কোনো ধর্মীয় কারণে নয়। ইমাম খোমেনি এবং অন্যান্য বহু ইরানিয়ান/পারসিক নেতা ও মনীষীদের মনুষ্য অবয়ব-ভাস্কর্য শুধু তেহরানে নয়, ইরানের বিভিন্ন স্থানে স্থাপিত হয়েছে, যেমন- সিরাজ, ইস্ফাহান, কওম। ‘Superb Carving-এর মাধ্যমে ‘handiwork’-এর মানব-প্রতিকৃতি ও ভাস্কর্য, ম্যুরাল সবই সযতেœ এবং সগর্বে রক্ষিত রয়েছে। বাগদাদে সাদ্দাম হোসেনের ভাস্কর্য-অবয়বকে নামিয়ে আনা হয়েছিল ধর্মীয় কারণে নয়, শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে, যেমন করে ইদানীং ইউরোপে বা আমেরিকার কোনো কোনো স্থানে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনে সাম্রাজ্যবাদী-বর্ণবাদী বা দাসপ্রথার সঙ্গে সম্পৃক্ত কারও কারও এ-জাতীয় ভাস্কর্য-অবয়ব সরিয়ে ফেলা হয়েছে।
সেন্ট্রাল এশিয়ার সব মুসলিমপ্রধান দেশেই রয়েছে মানব-অবয়ব ভাস্কর্যের বহু স্থাপনা। অতীতের এবং অধুনা। উজবেকিস্তানে, যেখানে রয়েছে সমরখন্দ, তাসখন্দ, বোখারা, খিভা, তিরমিজÑ যেখানে জন্মেছিলেন ইমাম বোখারী, আল-তিরমিজি, ইমাম বাহাউদ্দিন নক্সবন্দী, আল-বেরুনি, মীর্জা উলুগ বেগ, বাবুর (মুঘল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা)- সেখানে তো চতুর্দিকেই মনুষ্য-অবয়ব সমন্বিত ভাস্কর্যের উপস্থিতি। তাসখন্দে আমির তৈমুরের Statue হচ্ছে শহরের ‘মহত্তম আকর্ষণ’। ১৯৯৬ সালে উজবেক প্রেসিডেন্ট ইসলাম করিমভ নতুন করে আমির তৈমুরের ভাস্কর্যের উৎকর্ষ সাধন করে প্যারিসে ইউনেস্কো হেডকোয়ার্টারে মহাপরিচালক Federico Mayor-এর উপস্থিতিতে গর্বভরে ঘোষণা করেছিলেন- এটা নতুন নয়- “Yet in the 15th century there was erected the monument to Amir Temur with an expressive and prefoundly symbolic inscription- ‘To the Liberator of Europe ’. নিজে দেখেছি জন্মস্থান ফরগনায় বাবরের ভাস্কর্য-অবয়বে নববিবাহিত বহু যুগলের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন। ওটা ওখানে প্রায় সামাজিক রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে আমি দীর্ঘকাল জেদ্দাস্থ ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে পৃথিবীর সব সদস্য মুসলিমপ্রধান দেশে ভ্রমণ করেছি। মানব-অবয়বম-িত ভাস্কর্য প্রায় সব দেশেই দেখেছি। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, মিশর, তুরস্ক, মাগরেব-এর দেশসমূহ, মালে, সেনেগাল, গাম্বিয়া, গিনিসহ পশ্চিম আফ্রিকার সব মুসলিম-অধ্যুষিত দেশ- কোথাও ভাস্কর্যবিরোধী অবস্থার মুখোমুখি হইনি। প্রায় সর্বত্রই দেখেছি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের জন্য মানব-অবয়ব সমন্বিত ভাস্কর্যের উপস্থিতি। দেখেছি ইউরোপের বসনিয়া হারজেগভনিয়া, আলবেনিয়ায়। কসোভোতে দেখেছি তাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে সহায়তার কৃতজ্ঞতা স্মারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত বিল ক্লিনটনের আবক্ষ মূর্তি। নব্বইয়ের দশকে সেন্ট্রাল এশিয়ায় ভূতপূর্ব সোভিয়েত ইউনিয়নের নব্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত সব মুসলিম দেশসমূহের আইডিবি, ওআইসি’তে যোগদান এবং সহায়তা প্রদান প্রসঙ্গে সে অঞ্চলে বেশ ক’বার গিয়েছি। মনে পড়ে, তুর্কমেনিস্তানের প্রেসিডেন্ট সাপারমুরাদ নিয়াজভ অশ্বারোহী একজন নেতার একটি সুন্দর ভাস্কর্য স্মৃতি-স্মারক হিসেবে দিয়েছিলেন। আফ্রিকার গ্যাবনের প্রেসিডেন্ট ওমর কঙ্গো আইডিবি’র নেতৃবর্গকে অতীব সুন্দর মানব-অবয়ব সমন্বিত Semi-Precious Stone-এ নির্মিত মূর্তি উপহার দিয়েছিলেন, যা অফিস কক্ষে সংরক্ষিত ছিল। কাজাকস্তানের নতুন প্রেসিডেন্ট কাসেম তোকায়েভ সম্প্রতি আস্তানায় ভূতপূর্ব প্রেসিডেন্ট নূর সুলতানের একটি আবক্ষ ভাস্কর্য উন্মোচিত করেছেন। তুরস্কের বর্তমান গণতান্ত্রিক এবং ইসলামিক মূল্যবোধে গভীর বিশ্বাসী প্রেসিডেন্ট এরদোগানের আমলে ভাস্কর্যবিরোধী কোনো কথা বা তৎপরতা কখনও দেখা যায়নি; বরং স্থাপনা হয়েছে। ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সালের ঢাকা ট্রিবিউনে Zaraf Bow পাকিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি আরব দেশে ঝঃধঃঁব থাকার বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। পাকিস্তানে তো এই ২০১৮ সালেই লাহোরের বিখ্যাত আলহামরা কমপ্লেক্স প্রাঙ্গণে পাকিস্তানের স্থপতি এমএ জিন্নাহর প্রতিষ্ঠিত অবয়ব ভাস্কর্যের উন্মোচন হলো।
এটা অনস্বীকার্য, যদি আমরা বাংলাদেশে ভাস্কর্য স্থাপনাবিরোধী অবস্থানে আসি, তাহলে তা অধিকাংশÑ প্রায় সব, মুসলিম দেশগুলোর এবং উম্মার চিন্তাধারার বিপরীতধর্মী হবে। মুসলিমপ্রধান বহু দেশে, বাংলাদেশের কয়েকজন প্রাক্তন রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে আলোচনা করে দেখেছি, তাদেরও এই একই অভিজ্ঞতা ও অভিমত। অন্যান্য দেশে ভাস্কর্য প্রতিষ্ঠা হলেই যে তাদের অনুসরণ আমরা করব, তা নয়। তবে আমাদের উপলব্ধি করা উচিত হবে যে সব দেশেই প্রাজ্ঞ মুসলিম নেতৃবৃন্দ সবকিছু বিবেচনা করেই ভাস্কর্য সম্পর্কে ইতিবাচক মনোভাব ধারণ এবং গ্রহণ করেছেন। শতাব্দী শতাব্দী ধরে তাদের সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত, তাদের উলেমা-মাশায়েখ-প-িত ব্যক্তিদের মতামত ও নির্দেশনা হেলায় তুচ্ছ করা বা অভিসন্ধিমূলকভাবে তাদের বিরোধিতা করা সংগত নয়। তাছাড়া ধর্মাচরণে আমরা তো সবাই আলাদা আলাদা দ্বীপে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসবাস করছি না এবং তা ঈপ্সিতও নয়। মুসলিম উম্মা তো একটি অদৃশ্যমান সুতার বাঁধনে সংযুক্ত এবং সেটাই তো কাম্য।
আমি কোনো ধর্মীয় শাস্ত্রজ্ঞ বা ইসলামিক ধর্মীয় রীতিনীতি-অনুশাসনে বিশেষ জ্ঞানী বা অভিজ্ঞ কেউ নই। তবুও আমি একজন আন্তরিক ও শ্রদ্ধাশীল মুসলিম এবং এই হিসেবে ভাস্কর্য, মূর্তি, ছবি, পেইন্টিং ইত্যাদি বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট ব্যাপারে জানার চেষ্টা করেছি। আমি জেদ্দাস্থ ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে দীর্ঘকালীন অপারেশন এবং প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলাম। এ হিসেবে ইসলামিক রিসার্চ ও ট্রেনিং ইনস্টিটিউট এবং ওআইসি’র সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সংযোগ ও সংশ্লিষ্টতা ছিল। বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় জ্ঞানী-গুণী সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ, আল-আজহার, উম্মুল কুরা, মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো অধ্যাপক বা আলেমদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করার সুযোগও প্রয়োজন ছিল। ভাস্কর্য, ছবি, মূর্তি, ফটো ইত্যাদি সম্পর্কে আলাপে ও আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছি। আমার কাছে মনে হয়েছে ভাস্কর্যই হোক বা মূর্তিই হোক বা ফটো-ছবি-পেইন্টিংই হোকÑ মূল বিষয়টি হচ্ছে, কী কারণে এই সৃষ্টি হয়েছে, একে উপাসনাযোগ্য বা দৈব-শক্তিধারী বিবেচনা করা হয় কি না বা ‘শিরক’-এর কোনো সম্ভাবনা বা উদ্দেশ্য আছে কি না? তা যদি হয়ে থাকে, তাহলে তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু সেটা না হলে তো অন্য ব্যাপার। সৌদি আরবেই তো সর্বত্র ফটোগ্রাফ-পেইন্টিং আছে। পৃথিবী খ্যাত ভাস্করদের তৈরি শিল্প-নির্দেশক ভাস্কর্য দেখেছি রাস্তাঘাটে। সৌদি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা কিং আবদুল আজিজ, বাদশাহ এবং যুবরাজÑ এই ত্রয়ীর ফটো তো সব সরকারি কার্যালয় এবং প্রায় সর্বত্রই সযতেœ রক্ষিত। ছবি, প্রতিকৃতি, ফটো বা অঙ্কিত শিল্পকেও তো ইচ্ছে করলে পূজা বা কোনো কোনো ধর্মে দৈব-শক্তিধারী বলে বিবেচনা করা যেতে পারে। যিশু খ্রিষ্টের, বুদ্ধদেবের, মেরীর, শ্রীকৃষ্ণের এবং অনেক দেব-দেবীর মূর্তি ছাড়াও ধর্মীয় ছবি, ফটো বা পেইন্টিংকে খ্রিষ্টান, বৌদ্ধ এবং হিন্দুরা গভীর শ্রদ্ধা সহকারে উপাসনাও করে থাকেন। অধুনা তো রোবটও তৈরি করা হচ্ছে, যারা শুধু যে মানুষের অনুকরণ করে তা নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কথোপকথন বা নির্দেশক কর্ম-সমাধাও করে। এ ধরনের একটি রোবট রিয়াদ ও ঢাকায়ও আনীত হয়েছিল। মূল কথা হচ্ছেÑ কী উদ্দেশ্যে তাদের তৈরি করা হয়েছে। কারণটি ধর্মীয় হলে অবশ্যই মুসলমানদের কাছে অগ্রহণযোগ্য হবে। কিন্তু তা না হলে তো সম্পূর্ণ অন্য ব্যাপার হয়ে যায়। প্রতিকৃতি, ফটো-ছবি-রোবটের গ্রহণযোগ্যতা তো প্রশ্নাতীত।
এ-সম্পর্কে কেউ কেউ বিভিন্ন উদাহরণও দিয়ে থাকে। একটি নিবন্ধে পড়েছিÑ যেখানে হযরত ঈসা (যিশুখ্রিষ্ট) (রা.)-কে আল্লাহ সোবহানাতায়ালার বক্তব্য ইরশাদ করেছেন সেখানে (সূরা আল মাইদা ৫ : ১১০) উল্লেখ করে বলা হয়েছে- “And when you made a figure of bird out of clay by My Permission, and then you breathed into it (by God’s Permission), it became a bird..” উল্লিখিত হয়েছে, অনুমোদনযোগ্য না হলে তো সৃষ্টিকর্তা যিশুখ্রিষ্টকে পাখির ভাস্কর্য সৃষ্টি করতে বলতেন না। মোদ্দাকথা হচ্ছে, কী উদ্দেশ্যে একটি ভাস্কর্য বা ছবি বা পেইন্টিং তৈরি হয় এবং কীসের জন্য তা ব্যবহৃত হয়।
এখানে উদাহরণস্বরূপ ‘ডল’ বা পুতুলের কথা বলা যেতে পারে। উম্মুল মুমেনিন বিবি আয়েশার বয়ানে রয়েছে (সুনান আবু দায়ূদ, বোখারী থেকে উদ্ধৃত) যে তিনি পুতুল নিয়ে খেলা করতেন এবং রাসূলুল্লাহ তা দেখেছেন এবং সম্মতি প্রকাশ করেছেন। পুতুল বা ডল তৈরি হয় খেলা বা আমোদের জন্য। আমাদের দেশে মেলা বা দোকানপাটেও প্রচুর মাটির, কাঠের, কাপড়ের তৈরি অনেক পুতুল দেখা যায়, যা মানব-অবয়বসদৃশ। এগুলো তো নিষিদ্ধ হতে পারে না। কেননা সেগুলো উপাসনার জন্য নয়।
অথচ পুতুলসদৃশ মূর্তি তো পূজার বা উপাসনার জন্য তৈরি হতে পারে। এসব মেলাতেও দেব-দেবীর মূর্তিও অনেক দেখা যায়। যিশুখ্রিষ্ট বা বুদ্ধদেবের অনেক ছবি বা মূর্তি রয়েছে, যা Artifect হিসেবেও ঘরে রক্ষিত হয়ে থাকে। এগুলোর তো বিরোধিতা হয় না। ছবি, পেইন্টিংÑ এমনকি পোট্রেট পেইন্টিং, ফটো ইত্যাদির বিরোধিতা তো কোনোক্রমেই গ্রহণযোগ্য নয়, যদি তারা উপাসনা-মানসে তৈরি না হয়। ছবি বা মানবমূর্তির প্রতিফলনের বিদ্বেষ কত অভাবিত পর্যায়ে যেতে পারে তা নিম্নে বিবৃত একটি ঘটনা থেকে অনুধাবন করা যেতে পারে। বহুকাল সৌদি আরবে গোঁড়া কিছু লোক এবং ওয়াহাবী ঈষবৎরপং দেশে টেলিভিশন প্রবর্তনের ঘোর বিরোধিতা করতেন। ১৯৬৫ সালে যখন সৌদি আরবে টেলিভিশন প্রথম চালু হলো, তখন কিং ফয়সালের একজন আপন ভ্রাতুষ্পুত্র প্রিন্স খালিদ ইবনে মুসা বিন আবদুল আজিজ দলবল নিয়ে একটি নতুন টেলিভিশন কেন্দ্র আক্রমণ করেন (আগস্ট ১৯৬৫) এবং পুলিশ ‘Shoot Out’-এ তাকে নিহত করে ঐ বিরোধিতাকে দমন করতে হয়েছিল। [Boyd, Douglas. Journal of Broadcasting- Winter 1970-71 Ges Syracuse University Press  প্রকাশিত Hrair Dekmegian-এর ((Fundamentalism in Arab World, p.133)] বস্তুত পক্ষে Idolatry যদি ‘ইস্যু’ (বিবেচনার বিষয়) হয়ে থাকে, তাহলে তো মূর্তি, ছবি, ফটোপোর্ট্রেট- এগুলোর মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। মূল প্রশ্ন- উদ্দেশ্যটা কী? যদি উপাসনা করা হয়, তাহলে এগুলোতে divine attributes কল্পনা করে কোনো কিছু প্রাপ্তির জন্য প্রার্থনা থাকবে। আর যদি তা না থাকে, তার সঙ্গে সংঘাত কেন থাকবে? ইসলামের ইতিহাসে আমরা ছবিতে, ম্যুরালে বা দেয়ালে, শিল্পকর্মে-প্রাণী এবং মনুষ্য অবয়বের উপস্থিতির প্রভূত নিদর্শন দেখি। Terry Allen-এর ‘Anicomism and Figural Representation in Islamic Art’-এ উল্লিখিত হয়েছে (এবং এ জাতীয় মন্তব্য আরও অনেক রয়েছে)- “The representation of living beings in Islamic art is not just a modern phenmenon and examples are found from the earliest periods of Islamic History. Frescos and releefs of humans and animals adorned places of the Umayyad era. The Abbasid Palaces of Samarra also contained figurative imagery.” এটা অনস্বীকার্য যে পার্সিয়ান (ইরানি), অটোমান (তুর্কি) এবং মুঘল (দক্ষিণ এশিয়া উপমহাদেশীয়) Miniature (মিনিয়েচার) এবং অন্যান্য চিত্রকলায় মনুষ্য মূর্তি প্রাধান্য পেয়েছে। দ-ায়মান মানব-অবয়ব সমন্বিত ভাস্কর্যের নিদর্শন আন্দালুসিয়া, উমাই ইয়াদ, সিরিয়া এবং সেলজুক ইরানে প্রচুর পাওয়া যায়। হযরত আলী (রা.)-এর পোট্রেট বা খোদিত, প্রতিকৃতি ইরানে বা ইরাকে কোনো কোনো স্থানে অনায়াস-লব্ধ। ধর্মীয় এবং জাতীয় নেতৃবর্গের মধ্যে কারও কারও ছবি তো ব্যাংক নোটে ও কয়েনে খোদিত থাকে। কিন্তু তাই বলে ঐসব কি পৌত্তলিকতার পর্যায়ে পড়ে? উরারহব বা উপাসনার কারণে নয়; কিন্তু অন্য বহুবিধ শৈল্পিক কারণে ভাস্কর্যের সৃষ্টি হতে পারে। পঞ্চাশের দশকে পাকিস্তানের মুসলিম লীগ শাসনামলেও ঢাকায় তদানীন্তন পুরনো এয়ারপোর্ট রোডে বাংলাদেশের যশস্বী ভাস্কর নভেরা আহমদের একটি মানবমূর্তি নির্দেশক ভাস্কর্য ঢাকার Landmark হিসেবে বহু বছর ছিল। পরবর্তীকালে সম্ভবত সড়ক প্রশস্তকরণ কিংবা বিল্ডিং করার বাণিজ্যিক কারণে তা অপসৃত হয়। কোনো ধর্মীয় কারণে নয়।
আমাদের জীবনে প্রতিকৃতি, পোট্রেট পেইন্টিং, ফটো, পুতুল, মানব-অবয়ব সমন্বিত শৈল্পিক সৃষ্টি, ভাস্কর্যÑ এগুলো জীবনের একটি অঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটি ছোট উদাহরণ দিচ্ছি। গলফ খেলায় কৃতিত্বের জন্য উপহারসামগ্রীর মধ্যে গলফ-স্টিক নিয়ে দ-ায়মান মানবমূর্তি প্রদান একটি প্রচলিত রেওয়াজ। আমিও সম্প্রতি এ ধরনের একটি পুরস্কার পেয়েছি। অন্যান্য ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়ও তা হয়ে থাকে। বুদ্ধি-প্রয়োগ-সমর্থ মানবাকৃতির রোবট ও আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক সৃষ্টি। এগুলোকে তো কোনো অবস্থায়ই অস্বীকার বা পরিহার করা যায় না এবং তার উচিত বা সম্ভব নয়। তবে এগুলোতে কোনো দৈব বা ঐশ্বরিক গুণাগুণ প্রয়োগ অসংগত, অগ্রহণযোগ্য এবং তা করাও হয় না। বাস্তবসম্মত সত্যি হচ্ছে, জীবনের এসব অপরিহার্য উপকরণকে, যে কারণে সেগুলো সৃষ্টি বা তৈরি হয়েছে, তা অনুধাবন করে সহজ ও স্বাভাবিক হিসেবে গ্রহণ করা।
এটা সত্যিই অতীব দুর্ভাগ্যজনক যে বর্তমানে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপনা নিয়ে একটি অনাকাক্সিক্ষত উগ্রতার সৃষ্টি হয়েছে এবং কোনো কোনো দুষ্কৃতিকারী এই সুযোগের দুর্ব্যবহার করে ধ্বংসাত্মক কাজে লিপ্ত হয়েছে। সরকারের কোনো কোনো মাননীয় মন্ত্রী এসব ক্ষেত্রে অত্যন্ত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা করেছেন। সমগ্র জাতিই একবাক্যে মত প্রকাশ করেছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর, কোনো প্রকার অবমাননা সহ্য করা যাবে না। পত্রিকায় দেখলামÑ বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির প্রেসিডেন্ট রাশেদ খান মেনন এই ইস্যু নিয়ে বলেছেন, (ডেইলি স্টার, ২৯ ডিসেম্বর ২০২০) “এটা একটি বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এটি রাজনৈতিক ইস্যু। বাংলাদেশকে একটি fundamentalist এবং সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এর লক্ষ্য।” এ জাতীয় বহু সংস্থা বা ব্যক্তির বহু মতামত প্রকাশিত হয়েছে।
বস্তুতপক্ষে এ নিয়ে কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি মোটেই অভিপ্রেত নয়। আমাদের দেশে আলেম-উলেমা-মাশায়েখদের অতীব শ্রদ্ধা করা হয়। দৈনিক নয়া দিগন্তের ২৮ ডিসেম্বরে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে ড. মাকসুদুল হক লিখেছেন- “আলেমদের বক্তব্য বঙ্গবন্ধুর ব্যাপারে দ্ব্যর্থহীন। তারা মরহুম শেখ মুজিবকে স্বাধীনতার রূপকার হিসেবে এবং জাতির অবিসংবাদিত নেতা ও বঙ্গবন্ধু হিসেবে অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকৃতি দিয়েছেন।” বিশ্বনন্দিত বঙ্গবন্ধু তো শুধু জাতির জনকই নন, তিনি সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। তিনি বাঙালি জাতিসত্তার প্রতিষ্ঠাতা। তার প্রতি সর্বপ্রকার সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন প্রত্যেক বাঙালির অন্তরের একান্ত অভিলাষ। বিশ্বের গণতন্ত্রকামী সকল মানুষও তাই-ই চাইবে। স্বাভাবিকভাবেই মুসলিমপ্রধান দেশগুলোসহ সারাবিশ্বে গৃহীত ও প্রতিষ্ঠিত একটি প্রক্রিয়ায়Ñ অর্থাৎ ভাস্কর্য-স্থাপনার মাধ্যমে যদি তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান থাকার কথা হয়। তাহলে এ নিয়ে অনর্থক একটি সাংঘর্ষিক অবস্থার সৃষ্টি অহেতুক। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনাও এ ব্যাপারে বিজ্ঞজনোচিত ধৈর্যের পরিচয় দিয়ে সহনশীলতার সাথে বিতর্কের অবসানের নির্দেশ দিয়েছেন।
আমরা আশা করব, সমগ্র জাতিই এই মুজিববর্ষে বাস্তব অবস্থা অনুধাবন করে সঙ্গত কারণেই ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে এসে প্রস্তাবিত প্রক্রিয়ায় জাতির পিতাকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জানাতে কোনো দ্বিধা করবে না।

লেখক : সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply