করোনায় শিক্ষাব্যবস্থা : বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

অধ্যাপক ড. জেবউননেছা: সেই বিংশ শতাব্দীর কথা, বিশ্বজুড়ে মহামারির আতঙ্ক বিরাজ করছিল। সে-সময়ও অর্থনীতিসহ শিক্ষাক্ষেত্র পড়ে যায় হুমকির মুখে। বিশ্ব দরবার যখন মুখ থুবড়ে পড়ছিল প্রকৃতির কাছে, তখন বিশ্বনেতারা এই সংকট থেকে উত্তরণের উপায় খুঁজতে মশগুল। সে-সময় ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি সাতজনে একজন মারা যেত (সূত্র : সিডিসি, আমেরিকা)। সেই ভয়ঙ্কর মহামারির নাম ছিল- যক্ষ্মা, যার প্রতিষেধক বের হয়েছিল ১৯২১ সালে। ১০০ বছর আগে শিশুরা যেন বিদ্যালয়ে ফিরতে পারে তার সমাধান হিসেবে জন্ম নেয় খোলা মাঠে বিদ্যালয় ব্যবস্থা। হালকা ওজনের টেবিল এবং চেয়ার বাগানে নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রকৃতির সান্নিধ্যে শিক্ষাদান করা হয়। এক শতাব্দী পর পুনরায় ভয়াল আগ্রাসনে গ্রাস করে নিল পুরো বিশ্বকে ‘করোনা’ নামক ভাইরাসে। ঠিক ১০০ বছর পরে একইভাবে শিক্ষা-সংস্কৃতি, অর্থনীতি-সমাজনীতি পড়েছে মুখ থুবড়ে। পরবর্তী প্রজন্ম পড়েছে হুমকির মুখে কারণ দীর্ঘ বিরতিতে শিক্ষাক্ষেত্র অনেকটা মৃতপ্রায়। পৃথিবীজুড়ে বিপর্যস্ত ৭৭ কোটি শিক্ষার্থীর জীবন। এমন অবস্থায় বাংলাদেশেও করোনা আঘাত হেনেছে। আঘাত হেনেছে শত শত শিক্ষার্থীর ওপর। যাদের শৈশব-কৈশোর হারিয়ে যাচ্ছে করোনার আগ্রাসী উপস্থিতির জন্য। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার দক্ষ হাতে মোকাবিলা করে যাচ্ছে করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে। প্রাথমিকে শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ থাকলেও পরবর্তীকালে শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইনভিত্তিক শিক্ষাদান এবং সংসদ টেলিভিশনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। তবে এই অতিমারিতে গ্রামাঞ্চলে শিক্ষার্থীদের বাল্যবিবাহ এবং ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বেড়েছে। অভিভাবকদের নিয়মিত শিক্ষার্থীদের বেতন পরিশোধ করার অনীহার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের বেতনও নিয়মিত হতে পারেনি। যে কারণে শিক্ষকরা মানবেতর জীবনযাপন করছে। একটানা শিশুরা বাড়িতে অবস্থানের ফলে তাদের আচরণে ভারসাম্যহীনতা, শারীরিক স্থূলতা, মুঠোফোনে আসক্তি বেড়েছে। অপরদিকে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মুঠোফোন এবং ইন্টারনেট ক্রয়ের অসামর্থ্যতা এক ধরনের ভারসাম্যহীন পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তথাপি শহরের শিক্ষার্থীরা অনলাইনভিত্তিক শিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছে। ফলে ভবিষ্যতে শহর এবং গ্রামের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানসিক এবং মেধাভিত্তিক বৈষম্য জেগে ওঠার প্রবণতা বেড়ে যাবে বলে মনে হচ্ছে। অপরদিকে, শিশুদের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে সোনালি শৈশব। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের অনলাইনভিত্তিক শিক্ষায় দারুণভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের চাকরির বয়সসীমা প্রয়োজনে বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু শিশুদের শারীরিক এবং মানসিক গঠনের লক্ষ্যে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ এবং সবুজ মাঠের বিষয়ে চিন্তা করার সময় এখনই। জাতিসংঘভিত্তিক সংগঠন ইউনেস্কোর মতামত বিদ্যালয় খুলে দেবার বিষয়ে। অপরদিকে, ইউনিসেফ বিদ্যালয়ে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে বিদ্যালয় খুলে দেবার বিষয়ে মতামত প্রদান করেছে। তাদের সুপারিশকৃত পদক্ষেপের মধ্যে অন্যতম সুপারিশ হচ্ছে, প্রতিটি বেঞ্চের মধ্যে ব্যবধান বৃদ্ধি করা, শিক্ষকদের সংখ্যা বৃদ্ধি করা, বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ত্যাগ করার পর জমায়েত না করা, বিদ্যালয়ের দিনগুলো আলাদা করা, শ্রেণিকক্ষের প্রবেশপথ বন্ধ করা, প্রবেশপথের চারপাশে ১ মিটার দূরত্ব বৃদ্ধি করা।
দুঃখের বিষয় হলো, বাংলাদেশে ফোর-জি নেটওয়ার্ক বিস্তৃত নয়। আমাদের অর্থনৈতিক জীবনব্যবস্থা অনলাইনের পাঠদানের সাথে ততটা অনুকূলে নয়। মুঠোফোন পরিষেবা গ্রহণ ব্যয়বহুল। এ-মুহূর্তে টেলিকম কোম্পানিগুলো শিক্ষার্থীদের সিএসআর হিসেবে জিবি বিনা পয়সায় এই মহামারিতে প্রদান করতে পারে সেই সাথে ইন্টারনেটের গতি বাড়াতে হবে। অনলাইনে যে পাঠদান করা হয় সেই ক্লাসটি ভিডিও করে রেখে পরবর্তীতে আপলোড করা যেতে পারে। যারা অংশগ্রহণ করতে পারবে না, তারা পরে ডাউনলোড করে নিতে পারে। তাছাড়া দীর্ঘদিন শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলে তাদের লেখাপড়ার মনোযোগ ঘটাতেও সমস্যা হবে। তাই শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষকদের মানসিক যোগাযোগ রাখাটাও জরুরি বলে আমি মনে করি। তাছাড়া, পৃথিবী খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন অনলাইন শিক্ষার মাধ্যমে ডিগ্রি প্রদান করছে। অনলাইনের শিক্ষাকে ব্যক্তিবিশেষের স্বতন্ত্র করার জন্য এডুটেনমেন্ট বা গেমিফিকেশনের মাধ্যমে অনলাইন শিক্ষায় আর্টিফিসিয়াল ইন্টিলিজেন্স ও মেশিন লার্নি ব্যবহার করা যেতে পারে। এখনই সময় ডিজিটাল উদ্ভাবনীমূলক দক্ষতাভিত্তিক পাঠ্যসূচি তৈরি করা। আমাদের ডিজিটাল শিক্ষাব্যবস্থার বিষয়ে জনসচেতনতা ও সমাজ সংস্কার এবং মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।
এতদ্সত্ত্বেও আশা জাগায়, শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব ২০১৩-২০১৪ অর্থবছর থেকে সারাদেশের বিদ্যালয় এবং মহাবিদ্যালয়ে তথ্য ও প্রযুক্তি অধিদপ্তর থেকে ৪ হাজার ৬৭৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ১৭টি কম্পিউটার, একটি প্রজেক্টর, একটি প্রিন্টার, একটি স্ক্যানার এবং ছয় মাসের জন্য ফ্রি ইন্টারনেটসহ প্রতিষ্ঠা করেছে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব। সেই সাথে প্রতিটি ল্যাবের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং তিনজন শিক্ষক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং তথ্যপ্রযুক্তি অধিদপ্তরের উদ্যোগে আইসিটি ইন এডুকেশন লিটারেসি অ্যান্ড ট্রাবলশুটিং প্রশিক্ষণে ৪১টি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে। আরও ৫ হাজার ল্যাব স্থাপনের লক্ষ্যে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতায় সারাদেশে প্রায় ৩৫ হাজার মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এবং ১২৯টি বিশেষায়িত ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। উচ্চশিক্ষা স্তরে ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রসারে এ রকম যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে দিন-রাত নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ ১৯৩টি দেশের মধ্যে ই-গভর্নমেন্ট ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১১৫তম স্থান দখল করেছে এবং ০.৪৮৬২ স্কোর অর্জন করেছে। বাংলাদেশ সরকার ২০২১ সালের মধ্যে সরকারি সেবা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে। নতুন কাজে ডিজিটাল মুদ্রাব্যবস্থা ব্লকচেইন প্রযুক্তি চালু করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। ব্লকচেইন বিশ্বজুড়ে তথ্য আদান-প্রদান অপরিবর্তনীয় এবং নিরাপদ মাধ্যম। এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে ২০২১-২৩ সালের মধ্যে সারাদেশে ফাইভ-জি ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেওয়ার কথা অঙ্গীকার করা হয়েছে। সেই সূত্র ধরে মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর, উপজেলা, জেলা, বিভাগসহ ১৮ হাজার ৪৩৬টি সরকারি অফিসকে একীভূত নেটওয়ার্কে সংযুক্ত করা হয়েছে। সরকারিভাবে জাতীয় ডাটা স্টোর স্থাপন করা হয়েছে। সারাদেশে প্রায় ৩৫ হাজার মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম এবং ১২৯টি বিশেষায়িত ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে। আইসিটি ইন এডুকেশন মাস্টার প্ল্যান (২০১২-২১)-এর আওতায় বিশাল জনগোষ্ঠী একুশ শতকে ডিজিটাল শিক্ষায় শিক্ষিত হবে।
গত ২৫.১১.২০১৯ইং তারিখে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শুদ্ধাচার চর্চার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ডিজিটাল সমন্বিত ব্যবস্থার কথা মহামান্য রাষ্ট্রপতি প্রথম কথা বলেন। তারই ধারাবাহিকতায় ২২ জানুয়ারি ২০২০ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের উদ্যোগে ‘ডিজিটাল সার্ভিস অ্যান্ড প্লানিং ল্যাব’-এর সমাপনী অনুষ্ঠান রাজধানীর ওসমানী মিলনায়তনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি উপস্থিত ছিলেন। উক্ত অনুষ্ঠানের বিষয় ছিল ইন্টিগ্রেটেড ইউনিভার্সিটি ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট প্ল্যাটফর্ম এবং ইউনিভার্সিটি ইউনিফর্ম ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের বিষয়ে রিপোর্ট প্রদান করা। উক্ত রিপোর্টটি তৈরি করতে ৩৬টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের বিশেষজ্ঞ সাত দিনব্যাপী কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেন। সেই কর্মশালা থেকে বেরিয়ে আসে কিছু তথ্য যেমনÑ ৬৮টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সফটওয়্যার সিস্টেম রয়েছে, ৪০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সফটওয়্যার আপগ্রেড করতে হবে এবং ৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিজিটাল পদ্ধতি প্রবর্তনে দুর্বলতা রয়েছে। কর্মশালায় একটি সফটওয়্যার প্রবর্তনের কথা সুপারিশ করা হয় যে, সফটওয়্যার দিয়ে শিক্ষার্থীবা তাদের ফলাফল এবং সনদপত্র সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করবেন। সেই সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ-সংক্রান্ত বিষয়েও সফটওয়্যার থাকবে। এরই প্রেক্ষিতে সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব, শিক্ষা কার্যক্রম, ফলাফল এবং ব্যবস্থাপনা সমন্বিত ব্যবস্থা উন্নয়ন করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের ১.১২.২০১৮ইং তারিখে ‘শিক্ষাক্ষেত্রে ডিজিটাল কন্টেন্ট ব্যবহারের সুবিধা’ বিষয়ক একটি প্রশিক্ষণ কর্মশালায় বক্তব্যটি আজ ভীষণ মনে পড়ছে, “আজকাল কেউ যদি নিজেকে তথ্যপ্রযুক্তির বাইরে রাখেন বা ডিজিটাল শিক্ষায় অনাগ্রহ প্রকাশ করেন তবে নিশ্চিতভাবে তিনি পিছিয়ে পড়েছেন। একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষায় ডিজিটাল রূপান্তর অপরিহার্য। বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার মান বৃদ্ধিতে শিক্ষকদের অবশ্যই ডিজিটাল শিক্ষা ভালোভাবে আয়ত্ত করতে হবে। তা না হালে যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা থেকে এক ধাপ পিছিয়ে পড়বে শিক্ষার্থীরা।” কথাটি ভীষণ সত্যি। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশে সক্রিয় ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৯ কোটি ৮১ লাখ। ওয়াইম্যাক্স গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৪০,০০০। তারের মাধ্যমে সার্ভিস প্রোভাইডারের সেবা গ্রহণকারী সংযোগ এখন ৫৭ লাখ ৩৫ হাজার। এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য এই অতিমারিতে টেলিফোন অপারেটররা ফ্রি পরিষেবা প্রদান করা টেলিফোন অপারেটরদের জন্য তেমন কোনো বিষয় নয়। সত্যি কথা বলতে কি, করোনা মহামারিতে সকল সেক্টরে ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নামলেও টেলিফোন কোম্পানির লোকসান গুনতে হয়নি। সুতরাং, সিএসআর হিসেবে টেলিফোন কোম্পানিগুলো শিক্ষার্থীদের জন্য জিবি বিনা পয়সায় প্রদানের বিষয়টি সুবিবেচনায় রাখতে পারে। ৯ এপ্রিল ১৯৭২, ছাত্র ইউনিয়নের ত্রয়োদশ কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমাদের শিক্ষা হবে গণমুখী শিক্ষা’ এ বক্তব্যটি নিয়ে ভাবনার মোক্ষম সময় এটি। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী যারা এখন প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে তারা যখন কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করবে সে-সময় বর্তমানের মতো থাকবে না। তাছাড়া এই মহামারির সাথে আমাদের অনেকদিন বাস করতে হবে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লব দরজায় কড়া নাড়ছে। এর মধ্যে করোনাভাইরাস আমাদের সতর্ক করে দিল। আমাদের তথ্যপ্রযুক্তিতে আরও অনেক দূর এগিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে একটি অসমতা তৈরি হচ্ছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দক্ষ হাতে করোনা পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছেন। তিনি অনলাইনে মন্ত্রিপরিষদ সভা করছেন। দেশের সকল জেলার খবর অনলাইনের মাধ্যমে নিয়েছেন, যা বিশ্বের অন্য কোনো রাষ্ট্রপ্রধান করেননি। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সকল শিক্ষার্থীর ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক বিনা পয়সায় ব্যবহার করার জন্য সুযোগ করে দেওয়া যেতে পারে। উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে গতিশীল করার জন্য এর চেয়ে বড় প্রণোদনা আর কী হতে পারে? আপনার হাত ধরেই ২০০৬ সালের ২১ মে বাংলাদেশ যুক্ত হয়েছে তথ্যপ্রযুক্তির মহাসড়কে। সেই মহাসড়কের দ্বার আরও অবারিত করে দিন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ‘আমাদের অনলাইন শিক্ষাব্যবস্থায় কয়েক বছর পর যেতেই হতো। করোনা পরিস্থিতির কারণে আমাদের আগে করতে হলো। রূপকল্প-২০৪১ ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হলে আমাদের জনসংখ্যাকে জনসম্পদে রূপান্তরিত করতে হবে। শিক্ষার্থীদের নতুন দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজন রয়েছে। সুতরা, অনলাইন শিক্ষাই তাদের জন্য বড় সহায়ক হতে পারে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মাইন্ডসেট পরিবর্তন করতে হবে।” প্রত্যন্ত অঞ্চলে নেটওয়ার্কে সমস্যা, শিক্ষার্থীদের ডিভাইসের সমস্যা এ দুটোই। প্রথম সমস্যাটি টেলিকম কোম্পানিগুলো সমাধান করতে পারে। শিক্ষার্থীদের জন্য সুলভে ডাটা প্যাকেজ প্রদান করতে পারে। ব্যাংকগুলো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে স্টুডেন্ট লোনের ব্যবস্থা করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ল্যাপটপ ক্রয়ের ব্যবস্থা করে দিতে পারে। শিক্ষার্থী সেই টাকা পুরো শিক্ষাজীবনে মাসভিত্তিতে অর্থটি পরিশোধ করতে পারে।
গত ২৯.০৫.২০২০ইং তারিখে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় সামাজিকবিজ্ঞান অনুষদের এক ভার্চুয়াল আলোচনায় শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, “সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সম্পূর্ণ অনলাইন ক্লাস শুরু না করার পেছনে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক অবস্থা বড় বাধা। আমাদের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যে ডিজিটাইলেজশন, বিশেষ করে আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যে ডিজিটাইজেশন প্রয়োজন ছিল, সেই ডিজিটালাইজেশন হয়নি। তার থেকে বড় কথা আমাদের মাইন্ডসেটটা কিন্তু পরিবর্তন হয়নি। আমরা কি বলব আমাদের অনলাইনে সমস্যা, সেহেতু আমরা অনলাইনে যাব না? তাহলে আমাদের এই শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে কতগুলো দিন, কতগুলো মাস ঝরে যেতে দিব? সারাবিশ্ব স্টুডেন্ট লোনের ব্যবস্থা আছে, আমরা আমাদের এখানে সেটা নিয়ে এখনও চিন্তা করব না, তা তো হয় না। আজকে যদি আমরা বলি আমি অনলাইনে পড়াতে পারি না, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। আজকে যদি বলি আমার এক্সেস নেই, কত দিনের মধ্যে এক্সেস দেওয়া যায়, কেন এক্সেস সেই, কোথায় সমস্যা, কীভাবে আমরা সেই সমস্যা সমাধান করতে পারি।”
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদে অনুযায়ী “১. সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে সচেষ্ট হইবেন। ২. মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করিবার জন্য নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করার জন্য এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম সুযোগ সুবিধাদান নিশ্চিত করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা করিবেন।” এই অনুচ্ছেদের আলোকে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীবৃন্দ সমান সুযোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ কারণে প্রান্তিক এবং শহরের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করে শিক্ষাব্যবস্থাকে অতিমারিতে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। তবে সব কিছুকে ছাপিয়ে এখন এগিয়ে যেতে হবে চতুর্থ শিল্পবিপ্লব মোকাবিলায়। ২০১৬ সালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের প্রধান ক্লাউস শোয়াইব এই বিপ্লবের কথা বলেন। নইলে প্রচলিত নিয়মে গ্রাজুয়েট তৈরি হলে ২০৩০ সালে সমাজে আর এদের চাহিদা থাকবে না। যদিও সরকার চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের বিষয়ে কাজ শুরু করেছে। একটি সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য এখনই সময় শিক্ষা-সংক্রান্ত সুন্দর নীতি-পরিকল্পনা প্রণয়নের। সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে মিলবে মুক্তি, শিক্ষার্থীরা পাবে স্বস্তি।
তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে স্বপ্ন দেখি, করোনামুক্ত বিশ্বে দেশের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর একটি আইডি পাসওয়ার্ড থাকবে। যেখানে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষার নম্বর, পুরো কোর্সের পরিকল্পনা ও লেকচার প্রেজেন্টেশন বছরের শুরুতে পেয়ে যাবে। সময়মতো ফলাফল প্রকাশ হবে। মেধাবীরা সঠিকভাবে মূল্যায়িত হবে। ‘সেশনজট’ নামক শব্দটি অভিধান থেকে মুছে যাবে। শিক্ষার্থীরা এগিয়ে যাবে বিশ্বায়নের সাথে তাল মিলিয়ে। দেশের সকল প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ থেকে শুরু করে সব বিষয়াদি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হবে। মেধাবী তরুণরা দেশের বাইরে পাড়ি জমাবে না। দেশের ভিতরেই তাদের শানিত মেধা দিয়ে দেশকে আলোকিত করবে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৩০ এপ্রিল ১৯৭২ সালে মে দিবস উপলক্ষে বক্তব্যের একটি অংশ দিয়ে শেষ করব লেখাটি। তিনি বলেছিলেন, “সমৃদ্ধির পথে কোনো সংক্ষিপ্ত রাস্তা নেই।” এই বক্তব্যটির চুলচেরা বিশ্লেষণের সময় এখনই।

লেখক : অধ্যাপক, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply