বিজয়ের মাসেই পদ্মা জয়

উত্তরণ প্রতিবেদন : ২০০১ সালের ৪ জুলাই পদ্মাসেতুর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তখন থেকেই দেশের মানুষ গুরুত্বপূর্ণ এই সেতু নির্মাণের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। এর মধ্যে কেটেছে ১৯ বছরের বেশি সময়। আর গত ১০ ডিসেম্বর দুপুর ১২টা ২ মিনিটে দেশে আরেকটি নতুন ইতিহাস সৃষ্টি হয়। পদ্মাসেতুতে সর্বশেষ স্প্যান বসানো হয়েছে এই মাহেন্দ্রক্ষণে। যুক্ত হয়েছে মাওয়া-জাজিরা দুই প্রান্ত। দৃশ্যমান হয়েছে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটারের সেতুটি। এর মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পেয়েছে স্বপ্ন। অবসান হয়েছে দীর্ঘ প্রতীক্ষার। রচিত হয়েছে ঐতিহাসিক সেতুবন্ধন। ইতিহাসে অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে এই দিনটি। দেশি ও আন্তর্জাতিক নানা চক্রান্ত পেছনে ফেলে দেশীয় অর্থায়নে নির্মিত হলো দেশের যোগাযোগ খাতে সবচেয়ে বড় এই প্রকল্প। এখন বাকি শুধু যান চলাচলের জন্য সেতুটি খুলে দেওয়া। সবকিছু ছাপিয়ে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ সৃষ্টি করল আরও এক বিস্ময়।
দুপুরে সেতুর ১২ ও ১৩ নম্বর পিলারের ওপর শেষ স্প্যানটি যখন বসে তখন নদীর দু’পাড়ে হাজারও উৎসুক জনতার ভিড়। শেষ পর্যন্ত অনেকেই নদীর পাড়ে থাকতে পারেননি। শুভক্ষণের সাক্ষী হতে শত শত বোট নিয়ে উৎসুক জনতা চলে আসেন ঘটনাস্থলে। সর্বশেষ স্প্যান সংযোগের মধ্য দিয়ে যখন বাংলাদেশ আরেকটি স্বপ্নকে স্পর্শ করছিল, ঠিক এ-মুহূর্তে করতালি দিয়ে অভিবাদন জানান সবাই। তিন ঘণ্টা চেষ্টার মধ্যে চারপাশজুড়ে কঠোর নিরাপত্তা বলয়ে মাওয়া ও জাজিরা প্রান্ত এক সুতোয় গেঁথে দৃষ্টিসীমায় পূর্ণ রূপে ভেসে ওঠে সেতুর মূল অবকাঠামো। এজন্য বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আসতে হয়েছে। বিশ্ব দেখছে নিজস্ব অর্থায়নে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষম বাংলাদেশ। এজন্য ১০ ডিসেম্বর পুরো দিনটিতেই আন্তর্জাতিক মহলের নজর ছিল বাংলাদেশের ওপর। অল্প সময়ের মধ্যে বিশ্ব গণমাধ্যমে উঠে আসে দক্ষিণের ২৯ জেলাসহ পদ্মাসেতুর মধ্য দিয়ে গোটা দেশকে যুক্ত করার খবর; যা একসময় গোটা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াসহ আন্তর্জাতিক যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায়। শেষ পর্যন্ত সেতুটি দৃশ্যমান হওয়ায় স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন সবাই।
সেতু নির্মাণের ফলে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের চলাচলের পথ সুগম হলো। সময় বাঁচল কয়েক ঘণ্টা। দূরত্ব কমবে ৭০ থেকে শত কিলোমিটার পথের। ফলে সময় বাঁচবে তিন ঘণ্টার বেশি। উপকৃত হবে ৩ কোটির বেশি মানুষ। দারিদ্র্য কমবে ১ দশমিক ৯ শতাংশ হারে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সেতুকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ।
সর্বশেষ স্প্যানটি বসানোর মাধ্যমে আলোচিত পদ্মাসেতুর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বড় কাজের সমাপ্তি হলো। এরপর সড়ক ও রেলের স্লাব বসানো সম্পন্ন হলে সেতু দিয়ে যানবাহন ও ট্রেন চলাচল করতে পারবে। এতে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২৯ জেলার সঙ্গে সারাদেশের সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অর্থাৎ আগামী বছরের ডিসেম্বরে শেষ হবে সেতুর কাজ। তবে ১০ ডিসেম্বর মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছেন, ২০২২ সালের মাঝামাঝি সেতু যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।
তবে যখনই কাজ শেষ হোক; এখন পদ্মাসেতু নির্মাণে আর কোনো জটিলতা নেই। প্রমত্তা এই মহানদীর বুকচিরে চার-লেনের সড়কে ছুটবে একের পর এক যানবাহন। মাঝখানে থাকবে ডিভাইডার। সড়কপথের ৪০ ফুট নিচ দিয়ে ১৬০ কিলোমিটার গতিতে ছুটে যাবে ট্রেন। ১১০ কিলোমিটার গতিতে চলবে পণ্যবাহী ট্রেন।
সেতুর বাস্তব অগ্রগতি ৯১ শতাংশ : গত ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত মূল সেতুর বাস্তব কাজের অগ্রগতি ৯১ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৮৮ দশমিক ৩৮ শতাংশ। পদ্মাসেতুর প্রথম স্প্যানটি খুঁটির ওপর বসেছিল ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর। বাকি ৪০টি স্প্যান বসাতে তিন বছর দুই মাস লাগল। প্রসঙ্গত, ২০১৭ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ৩৭ ও ৩৮ নম্বর খুঁটিতে প্রথম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান হয় পদ্মাসেতু। সেই হিসাবে তিন বছর দুই মাস ১০ দিনে বসানো হচ্ছে সেতুর সব স্প্যান। বন্যা, নদী ভাঙন, চ্যানেলে নাব্য সংকট, করোনাভাইরাস মহামারিসহ নানা জটিলতা কাটিয়ে একে একে ৪০টি স্প্যান বসানো হয়। গত ৪ ডিসেম্বর ৪০তম স্প্যান বসানো শেষ হয়। ১০ ডিসেম্বর শেষ স্প্যানটি নদীর এপার-ওপারকে হাত ধরে যেন মিলিয়ে দিল।
প্রকল্পের নদীশাসন কাজের ৭৫ দশমিক ৫০ শতাংশ, সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এলাকার কাজের শতভাগ সম্পন্ন হয়েছে। প্রকল্পের সার্বিক অগ্রগতি ৮২ দশমিক ৫০ শতাংশ। প্রকল্প ব্যবস্থাপক দেয়ান আবদুল কাদের বলেন, সার্বিকভাবে সেতুতে যান চলাচল শুরু করতে পারবে ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসে।
আর যা বাকি : ৪১তম স্প্যান বসার মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান পদ্মাসেতু। তবে আরও কিছু কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে, যা সম্পন্ন হতে লাগবে প্রায় আরও এক বছর। এমনটাই জানিয়েছেন প্রকল্প ব্যবস্থাপক ও নির্বাহী প্রকৌশলী (মূল সেতু) দেওয়ান মো. আবদুল কাদের।
তিনি জানান, ৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত মূল সেতুর ২ হাজার ৯১৭টি রোডওয়ে স্লাবের মধ্যে ১ হাজার ২৮৫টি এবং ২ হাজার ৯৫৯টি রেলওয়ে স্লাবের মধ্যে হাজার ৯৩০টি স্থাপন করা হয়েছে। মাওয়া ও জাজিরা ভায়াডাক্টে ৪৮৪টি সুপার-টি গার্ডারের মধ্যে ৩১০টি স্থাপন করা হয়েছে। বাকি রোডওয়ে স্লাব, রেলওয়ে স্লাব ও সুপার-টি গার্ডার বসাতে প্রায় আট মাস সময় লাগবে। এর পরে স্লাবের ওপর হবে পিচ ঢালাইয়ের কাজ। এছাড়া, ল্যাম্পপোস্ট বসানোর কাজও বাকি।
কাদের আরও জানান, ভাঙনের কারণে পদ্মাসেতুর ১২৬টি রোডওয়ে স্লাব ও ১৯২টি রেলওয়ে স্লাব নদীতে তলিয়ে যায়। সেগুলো নতুন করে তৈরি করা হচ্ছে। রেলওয়ে গার্ডার লুক্সেমবার্গ থেকে আনা হবে। আগামী ফেব্রুয়ারি মাস নাগাদ সেগুলো কনস্ট্রাকশন সাইটে চলে আসার কথা। এসব কাজ ছাড়াও বিদ্যুৎ, গ্যাস ও টেলিযোগাযোগ লাইন স্থাপনের কাজ বাকি আছে। সব মিলিয়ে বছরখানেক পর যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হতে পারে পদ্মাসেতু। রেল সড়কের জন্য আলাদা স্লাব বসানো হচ্ছে। পদ্মাসেতুতে থাকছে গ্যাসলাইন, বিদ্যুৎ সংযোগ ও ফাইবার অপটিক্যাল। বাগেরহাটের রামপাল ও পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আসা বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হবে।
সেতুর স্টিলের স্প্যানের ওপর দিয়ে চলবে যানবাহন। এই পথ তৈরির জন্য কংক্রিটের সø্যাব বসানোর কাজ চলছে। সম্পন্ন হয়ে গেলে পিচঢালাই করা হবে। পুরো কাজ শেষ হলে যানবাহন চলাচলের পথটি হবে ২২ মিটার চওড়া, চার-লেনের। মাঝখানে থাকবে বিভাজক। স্প্যানের ভেতর দিয়ে চলবে ট্রেন। সেতুতে একটি রেললাইনই থাকবে। তবে এর ওপর দিয়ে মিটারগেজ ও ব্রডগেজ দুই ধরনের ট্রেন চলাচলেরই ব্যবস্থা থাকবে। ভায়াডাক্টে এসে যানবাহন ও ট্রেনের পথ আলাদা হয়ে মাটিতে মিশেছে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply