নতুন বই হাতে উৎফুল্ল শিশুরা

পরিস্থিতির উন্নতি হলেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে : প্রধানমন্ত্রী

উত্তরণ প্রতিবেদন: প্রাণঘাতী করোনা পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে কোটি কোটি শিক্ষার্থীর জীবনকে সরকার ঝুঁকির মধ্যে ফেলবে না, এ-কথা আগেই বলা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, মহামারির মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হলে তখনই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত হবে। আমরা এখন ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় দিয়েছি। এর মধ্যে যদি অবস্থা ভালো হয়, খোলা হবে। যদি না হয়, আমরা খুলব না। ডিজিটাল পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
নতুন বছরে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন পাঠ্যবই পৌঁছে দেওয়ার কার্যক্রমের উদ্বোধন করে ৩১ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেছেন। অন্যবছর গণভবনে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন হলেও মহামারির মধ্যে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এবার এ অনুষ্ঠান হয় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে। প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে বই উৎসবের উদ্বোধন করেন। তার পক্ষে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন এমপি বিভিন্ন পর্যায়ের ২৩ শিক্ষার্থীর হাতে নতুন বই তুলে দেন। গণভবন থেকে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস অনুষ্ঠানের সঞ্চালনা করেন। শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন, শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী এমপিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন।
রাজধানীর বিভিন্ন স্কুল ও মাদ্রাসার প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীর উপস্থিতি ছিল এ অনুষ্ঠানে। যাদের সকলেই নতুন বই পেয়েছে। মহামারির মধ্যে পাঠ্যবই ছাপানো কঠিন উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা বলেন, এবার মহামারির মধ্যে বিপুলসংখ্যক নতুন বই ছাপানো অনেক কঠিন ছিল। বই বিতরণের সময় একসঙ্গে যেন বেশি সমাবেশ না হয়, স্বাস্থ্যবিধি মেনে ভাগে ভাগে সবাইকে বিতরণ করাই ভালো। করোনার মধ্যে বই ছাপানোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
শিক্ষার দুই মন্ত্রণালয় থেকে আগেই জানানো হয়েছে, করোনা মহামারির কারণে এবার অন্য বছরের মতো স্কুলে স্কুলে পাঠ্যবই উৎসব করে শিক্ষার্থীদের হাতে নতুন বই তুলে দেওয়া হচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিধির কথা চিন্তায় স্কুল থেকেই আজ বছরের প্রথম দিন থেকে ১২ দিনব্যাপী বই বিতরণের ব্যবস্থা করা হবে। শিক্ষার্থীদের সুরক্ষিত রাখতে প্রতিটি শ্রেণির বই বিতরণের জন্য মাধ্যমিক ও নিম্নমাধ্যমিক স্কুলগুলোকে তিন দিন সময় দেওয়া হচ্ছে। ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বই বিতরণে ১২ দিন সময় পাবে স্কুলগুলো। ইতোমধ্যে মাঠপর্যায়ে বই পাঠানো হয়েছে। কর্মকর্তারা প্রধান শিক্ষকদের হাতে বই তুলে দিচ্ছেন। স্কুল থেকেই শিক্ষার্থীদের বই সংগ্রহ করবেন। স্কুলগুলো আলাদা আলাদাভাবে প্রতিটি শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বই বিতরণের ব্যবস্থা করবে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বই ১ জানুয়ারি থেকে বিতরণ শুরু হচ্ছে। স্কুল থেকেই শিক্ষার্থীদের বই নিতে হবে। বই বিতরণে প্রাথমিক স্কুলগুলোতে শ্রেণিভিত্তিক বুথ করা হয়েছে। একজন শিক্ষক একটি বুথের দায়িত্বে থাকবেন। শিক্ষার্থীরা শ্রেণিওয়ারি বুথ থেকে বই সংগ্রহ করবে। অনেক উপজেলায় বইয়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের মাস্ক ও হ্যান্ড সেনিটাইজার দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টানা বন্ধের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি জানি এই করোনাভাইরাসের কারণে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় সবচেয়ে কষ্ট পাচ্ছে আমাদের ছাত্রছাত্রীরা। তার কারণ, স্কুল ছাড়া সারাক্ষণ ঘরে বসে থাকা, এটা যে কত কষ্টকর, এটা সত্যিই খুব দুঃখের। তারপরও ডিজিটাল বাংলাদেশে এখন শিক্ষার্থীরা যে ঘরে বসে অনলাইনে শিক্ষাগ্রহণের সুযোগ পাচ্ছে, সে-কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, যার ফলে অন্তত ছেলেমেয়েরা একেবারে শিক্ষা থেকে দূরে যাচ্ছে না। কিছুটা শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে আমরা মনে করি, আমাদের স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, সেখানেও অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চলছে এবং এটা চলমান থাকবে।
এই মহামারি থেকে কবে মুক্তি মিলবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে শেখ হাসিনা বলেন, পুরো বিশ্ব সেই অপেক্ষাতেই রয়েছে। আমরা যখন একটু সিদ্ধান্ত নিলাম যে স্কুল খুলব, তখন আবার নতুন করে দ্বিতীয় ধাক্কা এলো করোনাভাইরাসের। কাজেই আমরা ছেলেমেয়েদের কথা চিন্তা করেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার চিন্তা করব। মহামারির মধ্যে দীর্ঘ সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিচ্ছে, তা মোকাবিলা করার ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি জানি ঘরে বসে থাকা অত্যন্ত কষ্টকর, সময় কাটানোও কষ্টকর। তারপরও খালি পাঠ্যবই না, এমন অনেক বই আছে, পড়া যায়, যা পড়ার জন্য আমি অনুরোধ করব। আর শিক্ষার্থীরা যাতে খেলাধুলা করতে পারে, নিয়মিত কিছুটা রোদে বা খোলা হাওয়ায় যেতে পারে, অভিভাবকদের সেই পরামর্শ দেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি বাইরে গেলে সবাইকে মাস্ক পরতে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে বললেন।
করোনাকালীন বিশেষ ব্যবস্থায় ১ হাজার ৬৪৬টি স্কুল-কলেজকে এমপিওভুক্তকরণের মাধ্যমে ২ হাজার ৫৫ শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা ও অবসর সুবিধা নিশ্চিত করাসহ এই সময়ে সরকার প্রদত্ত অন্যান্য সুবিধাদির কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। বলেন, সাধারণ শিক্ষা ধারার ৬৪০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বৃত্তিমূলক কোর্স চালু করে ইতোমধ্যে ৬৭৬ জন ট্রেড ইন্সট্রাক্টর নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৫ হাজার ৩৫১ শিক্ষক-কর্মচারীকে ৫১৭ কোটি ৩৩ লাখ ১২ হাজার টাকা অবসর সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। পাশপাশি ৫ হাজার ৪৪৬ শিক্ষক-কর্মচারীর কল্যাণ ভাতার আবেদন নিষ্পত্তি করে ২১৮ কোটি ৬৩ লাখ ৮ হাজার ১৩৫ টাকা প্রদান করা হয়েছে। সকল ধরনের বৃত্তির অর্থ ‘জিটুপি’ পদ্ধতিতে ১ লাখ ৫৯ হাজার ৫২৬ বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীকে অনলাইনে ‘ইএফটি’-এর মাধ্যমে ‘ব্যাংক অ্যাকাউন্টে’ প্রেরণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ৪০ লাখ দরিদ্র শিক্ষার্থীর মাঝে উপবৃত্তির টাকা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অনলাইনে করোনাকালীন পাঠানোর তথ্যও তুলে ধরেন।

নতুন বই হাতে উৎফুল্ল শিশুরা

গত ১ জানুয়ারি শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিন। টানা ১০ বছর ধরে এই দিনটির সেরা আয়োজন ছিল বই উৎসব। এই উৎসব ছড়িয়ে পড়ত দেশের প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। শিক্ষার্থীরা খালি হাতে স্কুলে যেত, আর নতুন বই নিয়ে ঘরে ফিরত। কিন্তু করোনার কারণে এবার এই চিত্র পাল্টে গেছে।
এবার বই উৎসবে ভিন্নতা ছিল। বড় কোনো আয়োজন ছিল না। স্কুলে ছিল না উল্লেখ করার মতো শিক্ষার্থীর উপস্থিতিও। খুবই স্বল্প পরিসরে আয়োজন করে স্কুলের কিছু শিক্ষার্থীকে ডেকে বই বিতরণ করা হয়েছে। তবে কোনো কোনো স্কুল কর্তৃপক্ষ বই উৎসবের ব্যানার টানিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রধান অতিথি করে বই বিতরণের সংক্ষিপ্ত আয়োজন করে।
করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে এবার বছরের প্রথম দিন একসঙ্গে পাঠ্যপুস্তক উৎসব না করে ভাগে ভাগে ৪ কোটি ১৬ লাখ ৫৫ হাজার ২২৬ শিক্ষার্থীর হাতে ৩৪ কোটি ৩৬ লাখ ৬২ হাজার ৪১২টি বই তুলে দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক স্তরের বইগুলো শুক্র ও শনিবার এবং মাধ্যমিকের বইগুলো ১ থেকে ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত বিতরণ করতে সরকারের তরফ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর আগে ৩১ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে বই উৎসব উদ্বোধন করেন। বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. জাকির হোসেন এমপির মাধ্যমে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের বই তুলে দেওয়া হয়। ১ জানুয়ারি সকাল থেকে সব বিদ্যালয়ে বই বিতরণ শুরু হয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply