সমুদ্রে পেতেছি শয্যা

ফারহানা রহমান : গোধূলির কনে দেখা মায়াবি আলোয় কেমন এক বিষাদময় রক্তিম উজ্জ্বলতা ছড়িয়ে আছে। বিলাসবহুল হোটেলের গাড়িবারান্দায় একটু আগেও গিজগিজ করছিল অগুনতি লোক। বিশাল গাড়িবহর। অথচ এখন সবকিছু সুনসান। গাঢ় কমলা লাল আর বেগুনি নীলের স্তরে স্তরে সাজানো মেঘে ছেয়ে আছে আকাশ। তারই নিচে হোটেলের বাইরের দিকের এক কোণায় দেহমনে গুমোট যন্ত্রণা আর বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্ত লুপ্তচেতনা নিয়ে বিকারগ্রস্তের মতো একা দাঁড়িয়ে আছে শ্যামা নামের নববধূটি।
আরিয়ানকে নিয়ে একটু আগেই অ্যাম্বুলেন্সটি ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়ে গেছে। অ্যাম্বুলেন্সের পেছনে পেছনে একে একে চলে গেল নানা প্রটোকলের গাড়ির বহর। শ্যামা শুধু পাথর হয়ে তাকিয়ে থাকল। এত অল্প সময়ের মধ্যে কী করে যে শয়ে শয়ে মানুষ এসে হাজির হলো কে জানে? আর কী করেই বা ওর শ্বশুর-শাশুড়ি আর একমাত্র দেবর আরিফ ঢাকা থেকে দুপুরের মধ্যেই উড়ে চলে এলো? আরিয়ানের মৃত্যুর খবরই বা কে তাদের কে জানাল তার কিছুই সে জানে না। এদিকে বহু চেনা-অচেনা লোক ওকে হাতেপায়ে ধরে অনুনয়-বিনয় করেও অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় ফিরে যেতে রাজি করাতে পারল না। শ্যামা খুব জেদি মেয়ে। আরিয়ানের লাশের পাশে বসে বসে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সে কিছুতেই তার প্রিয় শহর ঢাকায় ফিরে গেল না।
নিবিড় নীরবতায় বাকরুদ্ধ হয়ে সে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর কী করে যে ও লিফটে উঠেছিল, আর কী করেই বা দরজা খুলে সিভিউ ৮১৮ নম্বর রুমে এসে বিশাল কাচের দেয়ালের নিচে বিছানো ডিভানে এসে শুয়ে পড়েছিল, ও সবই ভুলে গেছে। শুধু আবছা মনে পড়ছে, সে ডিভানে শুয়ে শুয়ে বিশাল সমুদ্রের পেট চিরে লাল টকটকে সূর্যটাকে ডুবে যেতে দেখেছিল। তখন আকাশে যেন হোলির উৎসব হচ্ছিল। বিচিত্র কারুকার্যময় আকাশটাকে ধীরে ধীরে নিবিড় আঁধারে মিশে যেতে দেখেছিল শ্যামা। তারপর সারা পৃথিবী যেন এই রাসপূর্ণিমার রাতেও এক গভীর শূন্য আঁধারে ভরে গেল। শুধু অবিরাম গতি নিয়ে আরিয়ানের সেই ক্ষোভ মেশানো ভাষার নোংরা সৈকতে শুভ্র ফেনা নিয়ে একের পর এক ঊর্মি আছড়ে পড়তে লাগল। তারপর ঘুম আর ঘোরের মাঝে চেতন-অবচেতনের ভেতর ঘুরপাক খেতে খেতে কী করে যে চার দিন কেটে গেছে, শ্যামা জানে না। আজকে বিকেল সাড়ে তিনটায় ওর ঢাকায় যাওয়ার ফ্লাইট। চার দিনে এই প্রথম সে সম্পূর্ণ চেতন নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে এলো। ওকে দেখেই রিসিপসনের প্রত্যেকেই হৈহৈ করে উঠল। একেকজন একেক কথা বলে চলেছে। শ্যামা কিছুই শুনতে পায়নি। সে ধীরে ধীরে হোটেলের লবি ছাড়িয়ে পেছনের লম্বা পথ ধরে হেঁটে হেঁটে সাগরের দিকে যেতে লাগল।
ওকে অনুসরণ করে পেছনে পেছনে হোটেলের কয়েকজন স্টাফও আসতে লাগল। অথচ ও এসবের কিছুই জানে না। ঘোরগ্রস্ত বিপন্ন নিরাশ্রয় মানুষের মতোই সে সাগরের বুকের অতলে আশ্রয় খুঁজতে খুঁজতে হারিয়ে যেতে লাগল।
সেদিন রুমে এসেই সে ‘ডোন্ট ডিস্টার্ব’ লেখা সুইচটি অন করে দিয়েছিল। আর বন্ধ করে দিয়েছিল মুঠোফোনটিও। তারপর রিসিপসনে ফোন করে জানিয়ে দিয়েছিল ঢাকা বা অন্য কোথাও থেকে কারও ফোন এলে যেন ওকে থ্রু করা না হয়। আর সবাইকে যেন বলে দেওয়া হয়, সে বিশ্রাম নিচ্ছে। ভালো আছে। এরপর দুদিন চলে গেলে হোটেল থেকে নানাভাবে ওর সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হয়। অবচেতনে সে শুধু একবার ফোন রিসিভ করে ডিস্টার্ব না করার অনুরোধ করে। ফলে হোটেলের সবার অধীর হয়ে তার জেগে ওঠার অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় থাকে না।
এদিকে মাত্র সাত দিন আগে সুদর্শন ডাক্তার আরিয়ানের সঙ্গে দু-বছর বাঁধভাঙা উত্তাল প্রেমের পর ওর বিয়ে হয়েছে। দীঘল কালো চুল, গভীর উজ্জ্বল বুদ্ধিদীপ্ত চোখ! আর মাখনশুভ্র সারসির ডানার মতো মোলায়েম ত্বকের অধিকারী অপরূপা মেয়ে শ্যামা। ওর ননি মাখানো দুই হাত ও দীর্ঘ গ্রীবা দেখে একেবারে প্রথম দিনেই ইংরেজি মিডিয়ামে পড়া অতি আধুনিক ডাক্তার আরিয়ান ওকে পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে উঠল। শ্যামার পত্র-পত্রিকায় বের হওয়া সব গল্প-কবিতা সে প্রায় মুখস্ত করে ফেলেছে। সেইসাথে ওর আবৃত্তি শুনেও সে যারপরনাই মুগ্ধ। এদিকে ভীষণ খুঁতখুঁতে শ্যামার কাউকেই মনে ধরে না। একের পর এক প্রেম আর বিয়ের প্রস্তাবে সে একেবারে নাচার হয়ে উঠেছিল। আরিয়ানের পারিবারিক শিক্ষাদীক্ষা-ভদ্রতা শ্যামার ভালো লাগে। পরিচয়ের পরপরই আংটিবদল হয়। কিন্তু শ্যামার ইচ্ছে দুজন দুজনকে আরেকটু বোঝার। সে বিয়ের জন্য কিছুদিন সময় চায়। এভাবেই টানা দু-বছর কেটে যায় নিজেদের মধ্যে পোক্ত বোঝাপড়া করতে করতেই। আর চলে উদ্দাম-উত্তাল বাঁধ না-মানা প্রেম। তারপর দুজন অনেক হিসাব-নিকাশ করে হেমন্তের মিষ্টি শীতে রাসপূর্ণিমার তিথিতে বিয়ের তারিখ নির্ধারণ করে ফেলে।
আসলে এসবই হচ্ছিল শ্যামার ইচ্ছেতেই। আরিয়ান শুধু শ্যামার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছিল মাত্র। রাসপূর্ণিমা সম্পর্কে আরিয়ানকে ও বলেছিল, এই রাসপূর্ণিমাতেই রাধা-কৃষ্ণ গোপিনীদের নিয়ে বৃন্দাবনে লীলা করেছিল। একজন কৃষ্ণই অসংখ্য কৃষ্ণ হয়ে প্রত্যেক গোপিনীর সঙ্গে আলাদা আলাদা করে সঙ্গ দিয়েছিল এবং নেচেছিল। এটি অত্যন্ত রোম্যান্টিক পূর্ণিমা। তাই ও এ-সময়েই বিয়ের তারিখ ফেলতে চায়। আরিয়ান এসব কাহিনির কিছুই জানে না। সে বিয়ে-বৌভাত সবকিছুর ব্যাপারেই সম্পূর্ণভাবে শ্যামার ওপরই নির্ভর করেছিল। তবে হানিমুন করার স্থানটি সে নির্ধারণ করতে চেয়েছিল। সেটা অবশ্যই বিদেশের কোথাও।
বিয়ের দুদিন পর ওদের বৌভাত হলো। আর বৌভাতের ঠিক পরের দিনই প্লেনে করে সোজা কক্সবাজারে এসে নেমেছে নতুন দম্পতি। কক্সবাজারে আসার ব্যাপারে আরিয়ানের তীব্র আপত্তির পরও শ্যামার জেদের কাছে হার মানতে হয়েছে তাকে।
ঢাকা এয়ারপোর্ট থেকে এয়ারক্রাফটটি সময়মতোই ছেড়েছিল। নভেম্বরের বিকেলের মিষ্টি আলোয় মহেশখালী ছাড়িয়ে ডানে বিশাল বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে প্লেনটি উড়ে আসার সময় শ্যামা জীবনে প্রথমবারের মতো এত উঁচু থেকে এই বিপুল জলসম্ভার দেখল। সূর্যের তির্যক আলোতে সাগরের জল হাজারো রুপালি আঁশের মতো জ্বলজ্বল করছে। ৪-৫ হাজার ফুট উঁচু থেকে এভাবে বিস্তৃত জলের ওপর পড়া সূর্যের আলোর প্রতিটি কণার এমন বিস্ফোরিত রূপ তো সে জীবনে প্রথমবারের মতো দেখছে। এভাবে প্রিয়তম মানুষটির পাশে বসে দেখা এমন অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখার যে অনুভূতি তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সাগরের বালুর বুকের ওপর বসে আর আরিয়ানের বুকে মাথা রেখে সে কীভাবে এই সাত দিন কাটাবে, সেই স্বপ্নে বিভোর হতে হতেই প্লেনটি রানওয়ে স্পর্শ করল।
বিকেলে প্লেন থেকে নেমে হোটেলে আসার পথে মার্কেটে গিয়ে নানা শুকনো খাবার আর ফলমূল কিনে রুমে ঢুকেই আরিয়ান ঘোষণা দিয়েছিল আগামী সাত দিন তারা কিছুতেই রুম থেকে বের হবে না। শ্যামা চাইলে তারা সকালের ইনক্লুডিড ব্রেকফাস্ট করতে নিচে নামতে পারে। এছাড়া আর কোনোভাবেই তাকে রুম থেকে বের করা যাবে না। রুমে এসেই শ্যামাকে উন্মুল আদরে কাঁপিয়ে দিতে দিতে আরিয়ান ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলতে লাগল,
– বেইবি শোনো, আমরা কিন্তু এই ন্যাস্টি বিচে একবারও যাব না। বাচ্চাটা! সোনা বাচ্চাটা আমার! আমরা কিন্তু রুমেই থাকব। রুম সার্ভিস এসে লাঞ্চ আর ডিনার দিয়ে যাবে। ঠিক আছে?
– হুম বুঝলাম। আচ্ছা, দেখা যাক।
পড়ন্ত বিকেলে পাঁচতারা হোটেলের আটতলায় হানিমুন সুইটে পৌঁছেই শ্যামা দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। আহ! কী বিশাল এই সমুদ্র! ওর শিশুর মতো উচ্ছ্বাস দেখে আরিয়ান অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। এদিকে রাতের অন্ধকার নেমে আসতেই তাড়াতাড়ি ও বারান্দার দরজা বন্ধ করে কাচের দেয়ালের সব পর্দা টেনে দিয়ে গুটিগুটি পায়ে এসে আরিয়ানের বুকের ভেতর সেঁধিয়ে গেল। আরিয়ানও সুযোগ পেয়ে ওকে কাছে টেনে নিতেই শ্যামা বলে উঠল,
– আমার না খুব ভয় লাগছে। এত জল! ঢেউয়ের এত গর্জন! এত আওয়াজ! আমি সত্যি খুব ভয় পাচ্ছি!
– ও আমার সোনা বাচ্চারে! কী যে বলো? কোথায় গর্জন? কোথায় কী? কীসের আওয়াজ? আমি তো কিছুই শুনি না।
সারারাত শ্যামা একটু পরপর উঠে উঠে জানালার ফাঁক দিয়ে সাগর দেখে আর ভয় পেয়ে আবারও আরিয়ানের বুকে মাথা রাখে। ভোরের আজানের সঙ্গে সঙ্গেই সে আরিয়ানকে ডেকে উঠিয়ে দেয়।
– চলো না বিচে গিয়ে হাঁটি! এখানে কি তুমি ঘুমাতে এসেছ?
– অসম্ভব! এই নেস্টি বিচে আমি কিছুতেই যাব না। মরে গেলেও না।
– কী বলছো তুমি এসব? আমরা কি এখানে রুমে বসে থাকব?
– তাছাড়া কী করব? আমি তো তোমাকে বারবার বলেছিলাম বিচ দেখতে চাইলে পৃথিবীর অনেক সুন্দর সুন্দর বিচ আছে, ওখানে চলো। তুমি তো জেদ করে এখানে এলে। হাউএভার! আমি এই ডার্টি বিচে যাচ্ছি না।
– তাহলে আমি একাই যাব।
আকাশ একটু ফর্সা হতেই শ্যামা সত্যি সত্যি একাই বেরিয়ে গেল। ফিরে এলো সকাল আটটার দিকে। তখনও ঘুমে একেবারে কাদা হয়ে আছে আরিয়ান। শ্যামার একা একা সমুদ্র দর্শনের বর্ণনা আর প্রচ- উচ্ছ্বাস দেখে সে কথা দিল পরের দিন যাবে।
বিকেল হতেই শ্যামা এক প্রকার পাগল হয়ে উঠল সাগরতীরে আরিয়ানের হাত ধরে হাঁটার জন্য। একনাগাড়ে আরিয়ানের কানের কাছে ঘ্যানঘ্যান করে ওকে অস্থির করে তুলল সে। বাধ্য হয়ে আরিয়ানকে ওর পেছন পেছন বিচে গিয়ে হাঁটতে হলো। এদিকে শ্যামার ভাবভঙ্গি দেখেই কিছু ফটোগ্রাফার এসে ওদের ছেঁকে ধরল ফটোস্যুট করার জন্য। এসব দেখে শ্যামা অতি উৎসাহে আরিয়ানকে নিয়ে টেনে সাগরে নামিয়ে নানা ভঙ্গিমায় ছবি তুলতে লাগল।
– ওহ শিট! বাচ্চা! তুমি আমাকে এই ডার্টি সিতে নামালে?
– সোনা সোনা! জান আমার! চলো না গোসল করি!
– ওহ শিট! শিট! ইন দিস ডার্টি ওয়াটার? অ্যাবসারট! আই জাস্ট ক্যান্ট টেইক বাথ হেয়ার! জাস্ট ইম্পসিবল!
– আচ্ছা তাহলে আমি একাই ভিজব। একাই গোসল করব সাগরে। তুমি তাকিয়ে তাকিয়ে দ্যাখো তাহলে।
– ও বেইবি, বেইবি! বাচ্চা আমার! ডোন্ট ডু দ্যাট! ইউ ক্যান্ট ইভেন সুইম, ওকেই ওকেই! আই প্রমিস কালকে আমরা সিতে নামব।
আরিয়ানের কথা শুনে শ্যামা বাচ্চাদের মতো খুশি হয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে। তারপর আরও কিছুক্ষণ থেকে ফটোগ্রাফারের কাছ থেকে ফোনে ছবিগুলো নিয়ে খুশিতে নাচতে নাচতে রুমে ফিরে এলো।
ভোরে উঠে সাগরের পানিতে গোসল করতে করতে ও আরিয়ানকে কী করে নাকানি-চুবানি খাওয়াবে আর পানি ছিটিয়ে ছিটিয়ে কী করে অস্থির করে তুলবে, এসব ভেবে ভেবে আর ঘুমাতে পারল না। এই দুদিনে সাগর দেখে দেখে ওর ভয় কেটে গেছে। রাত জেগে বারান্দায় বসে বসে সে পশ্চিম সাগরের যেখানে রক্তিম গোল সূর্যটাকে ডুবে যেতে দেখেছিল, ঠিক সেখানেই রাসপূর্ণিমার পূর্ণ তিথিতে একটি স্বর্ণের থালার মতো জ্বলজ্বল করা চাঁদকে ধীরে ধীরে ডুবে যাওয়ার অপার্থিব এক অপূর্ব দৃশ্য অবলোকন করল। যেন এই পৃথিবীর নয়, অন্য কোনো জগতের কোনো একটি গোল স্বর্ণের চাকতি এসে সাগরের বুকের ভেতর দাউদাউ করে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। সেই আগুনের আলোয় ঝলমল করছে পৃথিবীর বস্তুগত যত অন্ধকার! ঝলসে যাচ্ছে শ্যামার পার্থিব চোখের সকল চাওয়া-পাওয়া! এমন আশ্চর্য মায়াবি দৃশ্য কী করে ও একা একা সহ্য করবে? দৌড়ে রুমে এসে ঘুমন্ত আরিয়ানকে জোর করে ব্যালকনিতে নিয়ে এলো। আরিয়ান ধনী পরিবারের ইংরেজি মিডিয়ামে পড়া ছেলে। শ্যামার মতো অল্পেই অতি উচ্ছ্বাস দেখানো মিডেলক্লাস আবেগ তার নেই। কক্সবাজার সে আগেও দুই-চারবার এসেছে। কিন্তু হানিমুন করতে কক্সবাজার আসার কথা সে স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। তবু সে আত্মসমর্পণ করেছে শ্যামার সমস্ত ইচ্ছের কাছে। সাগরের জলে পূর্ণ চাঁদের ডুবে যাওয়ার যে অপার্থিব দৃশ্য সেটি দেখে আরিয়ানও স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে শ্যামাকে বুকের ভেতর টেনে নেয়। তারপর দুজন বেরিয়ে পড়ে সাগরস্নানে।
কক্সবাজারের বালুকাবেলায় তখন আস্তে আস্তে আঁধার কেটে গিয়ে আলো ফুটে উঠছে। হেমন্তের হালকা শীতের মিষ্টি আমেজে দুই নববিবাহিত তৃষ্ণার্ত প্রেমিক-প্রেমিকা তাদের নিজেদের ওপর সমস্ত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে সাগরের অসীম জলের দিকে ছুটে যায়। ভোরের সাগরে তখন ভাটার টান। পূর্ণ পূর্ণিমার তিথিতে সেই টান আরও ভীষণ! আরও প্রবল! রাক্ষুসির ক্ষুধা নিয়ে এ-সময় সাগর যেন তার পাড়ের প্রতিটি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণাকেও তার বুকের ভেতর টেনে নিতে চায়। আরিয়ান তুখোড় সাঁতারু। আর শ্যামা সাঁতার জানে না। সে এভাবে কখনও আগে জলে নামেনি। সাগরে সে প্রথমবারের মতো এসেছে। তার উচ্ছ্বাস তীব্র। সে মনের খুশিতে আরিয়ানকে জল ছিটাতে শুরু করে। আরিয়ানও থেমে থাকে না। দুজন দুজনের গায়ে জল ছিটাতে ছিটাতে একবার এ ওকে টান দিয়ে বুকে পিষে আদর করে। আবার টেনেহিঁচড়ে বালুতে বসিয়ে জলে চুবায়। সুনসান সাগরতীরের হাঁটুজলেই চলছিল তাদের জলকেলি। কিন্তু ভাটায় সাগরের মন বোঝা দায়। মুহূর্তেই পায়ের নিচের বালি সরে গিয়ে দেখা গেল শ্যামা গলাজলে হাবুডুবু খাচ্ছে। আরিয়ানের হাত থেকে ছুটে চলে গেছে বহুদূর। আরিয়ান চারপাশে তীক্ষè দৃষ্টি নিয়ে তাকায়। দূরে কয়েকজন জেলেকে দেখা যায় জাল টেনে টেনে তাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। মাঝসমুদ্রে দু-চারটি নৌকা ভাসতে দেখে সে। শ্যামা বাঁচাও বাঁচাও করে চিৎকার করে একবার ডুবছে আবার পরমুহূর্তেই ভেসে উঠছে। আরিয়ান জানে শ্যামা সাঁতার জানে না। এ-কথা ভেবেই সে অসুস্থবোধ করে। যত দ্রুত সম্ভব সে শ্যামার কাছে সাঁতরে পৌঁছে যায়। ওকে ধরে টেনে ওঠানোর চেষ্টা করতেই সে আরিয়ানকে আঁকড়ে ধরে আরও দ্রুত জলের নিচে ডুবে যেতে থাকে যেন। এরই মাঝে তারা অথৈ জলের টানে ভেসে সাগরের অনেক গভীরে চলে এসেছে। তুখোড় সাঁতারু আরিয়ান কিছুতেই শ্যামাকে বাগে আনতে পারে না। আরিয়ানকে জাপটে ধরে সাগরের গভীরে শ্যামা ডুবে যেতে থাকে। অনেকক্ষণ সে প্রাণপণে ওকে ভাসিয়া রাখার চেষ্টা চালায়। কিন্তু এক সময় হঠাৎ সে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। শ্যামার সঙ্গে সঙ্গে সেও জলের গভীরে ডুবে যেতে লাগল। শ্যামার শরীর থেকে আরিয়ানের শক্ত হাত খসে গিয়ে দূরে ভেসে যেতে থাকে। শ্যামা তখনও হাবুডুবু খায়। একবার ডোবে আবার ভেসে ওঠে। একেবারেই যখন দম ফুরিয়ে যাচ্ছে, সে-মুহূর্তেই কোনো একটি শক্ত হাত তাকে টেনেহিঁচড়ে ওপরে তুলে নেয়। তারপর আরও কয়েকটি হাত এসে তাকে উদ্ধার করে তীরে এনে শুইয়ে দেয়।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply