জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান ও ঢাকা দক্ষিণে সাকরাইন উৎসব

বরাবরের মতো জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের মধ্য দিয়ে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০১৯ প্রদান অনুষ্ঠিত হয় রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে। করোনার কারণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত  ছিলেন অনুষ্ঠানে। অনুষ্ঠানটিতে বসেছিল তারকাদের মেলা। এছাড়াও পৌষ সংক্রান্তি ঘিরে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যকে ধারণ করে প্রথমবারের মতো সাকরাইন তথা ঘুড়ি উৎসব-এর আয়োজন করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। রঙিন ঘুড়িতে ভরে ওঠে এলাকার আকাশ।

চলচ্চিত্রে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য ২৬টি ক্যাটাগরির মধ্যে ৩৩ জনকে পুরস্কার প্রদান করা হয়। আজীবন সম্মাননা গ্রহণ করেন মাসুদ পারভেজ সোহেল রানা ও কোহিনূর আক্তার সুচন্দা। শ্রেষ্ঠ অভিনেতা তারিক আনাম খান, শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার মাহবুবুর রহমান, শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী সুনেরাহ বিনতে কামাল, চিত্রগ্রাহক সুমন কুমার সরকার, শ্রেষ্ঠ শব্দগ্রাহক রিপন নাথ চলচ্চিত্র ‘ন ডরাই’।
যৌথভাবে শ্রেষ্ঠ শিল্প নির্দেশক হিসেবে পুরস্কার গ্রহণ করেন রহমত উল্লা বাসু ও ফরিদ আহমেদ, শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা জাকির হোসেন রাজু, শ্রেষ্ঠ নৃত্য পরিচালক হাবিবুর রহমান চলচ্চিত্র ‘মনের মত মানুষ পাইলাম না’।
যৌথভাবে শ্রেষ্ঠ গীতিকার কবি নির্মলেন্দু গুণ ও কবি কামাল চৌধুরী, শ্রেষ্ঠ সম্পাদক জুনায়েদ আহমেদ হালিম, শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক মুস্তাফিজুর রহমান ইমন, শ্রেষ্ঠ কাহিনিকার মাসুদ পথিক, শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব চরিত্রে অভিনেত্রী নার্গিস আক্তার, শ্রেষ্ঠ মেকআপম্যান মো. রাজু, যৌথভাবে শ্রেষ্ঠ গায়িকা মমতাজ ও ফাতিমা তুজ জোহরা ঐশি, যৌথভাবে শ্রেষ্ঠ সুরকার প্লাবন কোরেশী ও তানভীর তারেক। শ্রেষ্ঠ গায়ক মৃণাল কান্তি দাশ চলচ্চিত্র ‘শার্টল ট্রেন’-এর জন্য। যৌথভাবে শ্রেষ্ঠ শিশুশিল্পী নাইমুর রহমান আপন চলচ্চিত্র ‘কালো মেঘের ভেলা’ ও আফরিন আক্তার চলচ্চিত্র ‘যদি একদিন’-এর জন্য। শ্রেষ্ঠ খলচরিত্র অভিনেতা জাহিদ হাসান চলচ্চিত্র ‘সাপলুডু’। শ্রেষ্ঠ প্রামাণ্য চিত্র ‘যা ছিল অন্ধকারে’-এর জন্য বাংলাদেশ টেলিভিশনের মহাপরিচালক এসএম হারুন অর রশিদ ও প্রযোজক আউয়াল চৌধুরী পুরস্কার গ্রহণ করেন।
যৌথভাবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ‘ন ডরাই’-এর জন্য চলচ্চিত্রটির প্রযোজক মাহবুবুর রহমান ও শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র ‘ফাগুন হাওয়ায়’-এর জন্য চলচ্চিত্রটির প্রযোজক ফরিদুর রেজা সাগর পুরস্কার গ্রহণ করেন।
শ্রেষ্ঠ পোশাক ও সাজসজ্জায় সাজিয়া আফরিন, শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব চরিত্রে অভিনেতা ফজলুর রহমান বাবু, ‘ফাগুন হাওয়ায়’ চলচ্চিত্রটির জন্য পুরস্কার গ্রহণ করেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমারও একটা দুঃখ থেকে গেল, করোনার জন্য সরাসরি চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারলাম না। তারপরও যারা পুরস্কার পেলেন তাদের অভিনন্দন। এদেশের সিনেমার জন্য আমরা অনেক কাজ করেছি। আমাদের পরিবারের সদস্যরা শিল্প-সাহিত্য অনেক ভালোবাসতেন। শেখ কামাল খেলার বাইরে নাটকের সঙ্গে জড়িত ছিল। এই শিল্পের মানুষদের কাছ থেকে অনেক আগে থেকেই দেখেছি। তাই তাদের জন্য ভালো কিছু করার ইচ্ছা অনেক দিনের, সেভাবেই কাজ করছি। মক্তিযুদ্ধের সিনেমা বেশি বেশি নির্মাণ হওয়া দরকার। তাহলে নতুন প্রজন্ম অনেক কিছু জানতে পারবে। একটি সিনেমা, নাটক, গান বা কবিতার মধ্য দিয়ে অনেক কিছু জানা যায়। গভীরে প্রবেশ করা যায়। চলচ্চিত্র শিল্প ধ্বংস হয়ে যাক, তা আমরা চাই না। আমরা চাই, আমাদের সিনেমা আগের সুনাম ফিরিয়ে আনুক। শিশুদের জন্য সিনেমা নির্মাণ হওয়া প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী মো. মুরাদ হাসান এমপি ও তথ্য সচিব খাজা মিয়া। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ এমপি চলচ্চিত্র শিল্পীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেন। ‘মায়া : দ্য লস্ট মাদার’ চলচ্চিত্রটি ৮টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পায়। ৬টি ক্যাটাগরিতে পুরস্কার পায় স্টার সিনেপ্লেক্সের সিনেমা ‘ন ডরাই’। ৩টি করে পুরস্কার পায় ইমপ্রেস টেলিফিল্মের সিনেমা ‘ফাগুন হাওয়ায়’ ও দেশবাংলা মাল্টিমিডিয়ার সিনেমা ‘মনের মতো মানুষ পাইলাম না’।
সভাপতির বক্তব্যে তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ বলেন, ‘চলচ্চিত্র জীবনের কথা বলে, সমাজের কথা বলে, দেশের কথা বলে। চলচ্চিত্র শিল্পের কথা ভেবে বঙ্গবন্ধু এদেশে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল সহসাই চালু হবে। শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্টও হয়েছে। আরও অনেক কাজ হয়েছে এই শিল্পের জন্য এবং হওয়ার পথে।’ অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশ টেলিভিশন, বিটিভি ওয়ার্ল্ড ও বাংলাদেশ বেতার সরাসরি সম্প্রচার করে।
‘এসো উড়াই ঘুড়ি, ঐতিহ্য লালন করি’ সেøাগানে গত ১৪ জানুয়ারি ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আয়োজনে ৭৫টি ওয়ার্ডে প্রথমবারের মতো সাকরাইন উৎসব-১৪২৭ উদযাপন করে। পৌষ গেলে দেশে বাড়ে শীতের তীব্রতা। ঘরে তখন তৈরি হয় রসালো পিঠা। প্রচলিত আছে, জামাই পৌষ শেষে শ্বশুর বাড়ি এলে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ঘুড়ি ও নাটাই। জামাইরা বাড়ির ছাদে ঘুড়ি ওড়ান। তা দেখতে ভিড় করে এলাকাবাসী। সেই রীতি এখন চোখে না পড়লেও সাকরাইন উৎসব রয়ে গেছে এখনও।
পঞ্জিকামতে বাংলা পৌষের শেষ দিন উদযাপন করা হয় পৌষ সংক্রান্তি। আর এই পৌষ সংক্রান্তি শুধু সংক্রান্তি নামে পরিচিত লাভ করেছে বর্তমান সময়ে। এ সংক্রান্তিতে পুরান ঢাকার মানুষরা সাকরাইন উৎসব পালন করে। বংশাল, লালবাগ, হাজারীবাগ, সূত্রাপুর, সদরঘাট, পোস্তগোলা, নবাবপুর, মিল ব্যারাক , চকবাজার, বংশাল, শাঁখারীবাজার, গে-ারিয়া, ওয়ারীসহ বিভিন্ন এলাকায় পূর্ব থেকেই পৌষ সংক্রন্তিতে প্রাচীনকাল থেকে এই সাকরাইন উৎসব পালন করে আসছে স্থানীয়রা। আর সেই উৎসব স্বীকৃতি স্বরূপ প্রথমবারের মতো বর্ণাঢ্যভাবে আয়োজন করে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন।
শূন্যে ঘুড়ি ওড়ানো, সবার দৃষ্টি আকাশের দিকে। ঘুড়ি ওড়ানোর পাশাপাশি সারাদিন এলাকা কাঁপিয়ে অলিগলিতে বাজতে থাকে গান, চলতে থাকে নাচ, সন্ধ্যার পর মুখে কেরোসিন-আগুনের খেলা, আকাশে ছোড়া রং-বেরঙের আতশবাজি ও ফানুস। আর খাওয়ার আয়োজনের মধ্যে বিভিন্ন রকমের পিঠা, খিচুড়ি, মাংস-পোলাও।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস পুরান ঢাকার পাতলা খান লেনে ডিএসসিসি সাকরাইন ঘুড়ি উৎসবের উদ্বোধন করেন। এ সময় নিজেও ঘুড়ি ওড়ান মেয়র।
এ উৎসবের উদ্বোধন করে মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য ঢাকার ঐতিহ্যকে লালন, সংরক্ষণ ও পালন করা। সেই লক্ষ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এখন থেকে প্রত্যেক বছর এই আয়োজন করবে। এর মাধ্যমে আমরা ঢাকার সকল সংস্কৃতিকে বিশ্বব্যাপী তুলে ধরতে পারব।’
শীতের হিমেল হাওয়ায় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০১৯ প্রদান ও পৌষ সংক্রান্তি ঘিরে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যকে ধারণ করে প্রথমবারের মতো ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সাকরাইন তথা ঘুড়ি উৎসব নতুন মাত্রা যোগ করে সংস্কৃতি অঙ্গনে।

গ্রন্থনা : সোহাগ ফকির

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply