৪৬তম প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন

‘যুক্তরাষ্ট্রে নতুন এক দিনের সূচনা’

গত ২০ জানুয়ারি বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের ৪৬তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডেমোক্র্যাট দলীয় জো বাইডেন।
এক করোনার জন্য অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে মার্কিন কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটল বিল্ডিংয়ের ওয়েস্ট ফ্রন্টে স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৪৮ মিনিটে আয়োজন করা হয় শপথ অনুষ্ঠানের। নিজের পরিবারের ১২৭ বছরের পুরনো বাইবেলের একটি কপি হাতে ৭৮ বয়সী জো বাইডেনকে শপথ গ্রহণ করান সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস। শপথের পর তুমুল করতালি ও হর্ষধ্বনিতে অভিনন্দন জানানো হয় বাইডেনকে। আগামী চার বছরের জন্য এই দেশটির প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন তিনি। বাইডেনের শপথের পর বক্তব্য দেন বিদায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স।
বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করেন সংগীত তারকা লেডি গাগা। এ সময় উপস্থিত সবাই বুকে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে জাতীয় সংগীতের সঙ্গে একাত্ম হন। আরও অংশ নেন সংগীতশিল্পী জাস্টিন টিম্বারলেক, জন বন জোভি, ডেমি লোভাটো এবং অ্যন্ট ক্লেমনস। বাইডেনের শপথ গ্রহণ উপলক্ষে ৯০ মিনিটের অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন দুবার অস্কারজয়ী অভিনেতা টম হ্যাংকস। এছাড়াও অনুষ্ঠানটিতে বক্তব্য রাখতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে জর্জিয়ার এক কৃষ্ণাঙ্গ দমকলকর্মী, একজন সাবেক তরুণ কবি পুরস্কার বিজয়ী, এক ক্যাথলিক ধর্মযাজক এবং বাইডেনের নিজ শহর উইলমিংটনের এক যাজককে। অনুষ্ঠানে তারা বৈচিত্র্যপূর্ণ মার্কিন জাতির প্রতিনিধিত্ব করবেন বলে বাইডেনের টিমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
প্রথা অনুযায়ী প্রথমে ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন কমলা হ্যারিস। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম নারী, প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান ও প্রথম দক্ষিণ এশীয় নেতা হিসেবে এই পদে অধিষ্ঠিত হলেন কমলা। তাকে শপথ পড়ান সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সোনিয়া সোটোমেয়র। কমলা হ্যারিসের শপথের পর সংগীত পরিবেশন করেন জেনিফার লোপেজ।
পূর্ব ঘোষণামতোই ১৫২ বছরের মার্কিন ঐতিহ্য ভেঙে এই শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দেননি বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার প্রথা ভাঙলেও, বাইডেনের জন্য প্রথামাফিক একটি চিঠি রেখে গেছেন ট্রাম্প। বাইডেন জানিয়েছেন, সেখানে শুভেচ্ছাবার্তা দিয়েছেন ট্রাম্প।
নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন, বাইডেনের স্ত্রী জিল বাইডেন ও ভাইস প্রেসিডেন্টের স্বামী ডগলাস এমহফ, বিদায়ী ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স সস্ত্রীক উপস্থিত ছিলেন। অন্যদের মধ্যে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, জর্জ ডব্লিউ বুশ ও বিল ক্লিনটন এবং সাবেক ফার্স্ট লেডি মিশেল ওবামা, লরা বুশ ও হিলারি ক্লিনটন। আরও উপস্থিত ছিলেন ডেমোক্র্যাট নেতৃবৃন্দ, হাউস স্পিকার ন্যান্সি পেলোসিসহ পদস্থ সামরিক-বেসামরিক শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তারা ও আমন্ত্রিত অতিথিরা।
শপথ নেওয়ার আগে বাইডেন ও তার স্ত্রী জিল বাইডেনের দিনটা শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অতিথিশালা ব্লেয়ার হাউস থেকে। সকালে বাইডেন প্রথমে যান ক্যাথেড্রাল অব সেন্ট ম্যাথিউ দ্য অ্যাপোস্টল গির্জায়। সেখানে তার সঙ্গে যোগ দেন তার দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি ও বিরোধী দল রিপাবলিকান পার্টির নেতারা। প্রার্থনার পর বাইডেন এক টুইটে লেখেন- ‘যুক্তরাষ্ট্রে নতুন এক দিনের সূচনা’।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম ভাষণে তিনি বলেন যে মানুষের কথা শোনা হয়েছে, তাদের ইচ্ছে প্রতিফলিত হয়েছে। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রথম দিনের ভাষণ গত চার বছরে তৈরি হওয়া বিভেদের এই মার্কিন ছবিটি বদলে দেওয়ার শপথ। বাইডেন বলেছেন, ‘গণতন্ত্র ভীষণ মূল্যবান। গণতন্ত্র ভঙ্গুর। তাকে রক্ষা করতে হয়। এ-মুহূর্তে দাঁড়িয়ে গণতন্ত্র রক্ষা করাই আমার দায়িত্ব। দেশজুড়ে যে আনসিভিল যুদ্ধ শুরু হয়েছে, তা আমাদের শেষ করতে হবে।’ কোভিড আক্রান্ত আমেরিকায় তার সামনে চ্যালেঞ্জ যে খুব বড় সেটাও স্বীকার করে নেন তিনি। অনেক কিছু জোড়া লাগাতে হবে, অনেক ক্ষতকে শুকোতে হবে, অনেক কিছু গড়তে হবে বলে জানান তিনি। অতীতে খুব কম সময়ই আমেরিকা এমন কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে গেছে বলে জানান জো বাইডেন।
এদিন আমেরিকার ভিতরে যে অনৈক্য দেখা দিয়েছে ডেমোক্র্যাট ও এক শ্রেণির রিপাবলিকানদের মধ্যে, সেটা নিয়েও কথা বলেন বাইডেন। তিনি বলেন যে এটি নতুন নয়। ইতিহাসেও দেখা দিয়েছে যে বহু সময় জাতি-বিদ্বেষসহ অন্যান্য ইস্যু মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন যে এই সংকটের মুহূর্তে একতাই একমাত্র পথ।
কয়েকদিন আগেই ট্রাম্প সমর্থকরা যে দাঙ্গা করেছিল ওই ক্যাপিটল হিলে, সেটার প্রসঙ্গও উত্থাপন করেন বাইডেন। তিনি বলেন যে একদল দাঙ্গাবাজ চেষ্টা করেছিল গণতন্ত্রকে রুখতে। তারা চাইছিল এই পবিত্র ভূমি থেকে সরিয়ে দেওয়ার। সেটা আগে হয়নি, ভবিষ্যতেও হবেও না, কোনোদিনই হয়নি বলে জানান বাইডেন।
সামান্য সহনশীল হতে পারলেই আমরা একে অপরের অনেকটা কাছাকাঠি পৌঁছে যেতে পারব। শেষ বাক্যে বাইডেন নতুন এক রূপকথার আমেরিকা তৈরির শপথ নেন। ঐক্যবদ্ধ আমেরিকা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ১৭টি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছেন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এর মধ্য দিয়ে বিদায়ী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বেশ বিতর্কিত নীতি বদলে দিয়েছেন, তিনি বলেছেন, সংকট মোকাবিলার জন্য অপচয় করার মতো কোনো সময় আমাদের হাতে নেই। আমি আমেরিকার মানুষকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করতে যাচ্ছি।
বাইডেনের স্বাক্ষরিত ১৭টি নির্বাহী আদেশের ৩টিই করোনাভাইরাস মোকাবিলা বিষয়ক। কোভিড, অর্থনীতি এবং জলবায়ুর পর চতুর্থ স্থানে রয়েছে বর্ণবাদের সমস্যা। বাইডেন বলেছেন, তিনি দ্রুত এই সমস্যা মোকাবিলার কাজ শুরু করবেন।
তবে প্রথম দিনে জারি করা নির্বাহী আদেশে তিনি ফেডারেল অফিসগুলোতে মাস্ক ও সামাজিক দূরত্ব বাধ্যতামূলক করার নির্দেশ দিয়েছেন।
করোনাভাইরাস মহামারির মোকাবিলা। প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে ১০ কোটি মানুষকে করোনার টিকার অন্তত প্রথম ডোজ দিয়ে দেওয়া। প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে আবার যোগদান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় আবার যোগদান।
দীর্ঘ বিতর্কের পর মেক্সিকো সীমান্তে পাঁচিল তোলার জন্য যে জরুরি তহবিল তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ট্রাম্প, প্রথম দিনেই তা বাতিল করেছেন।
সাত মুসলিম দেশ থেকে আমেরিকায় ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন, সেগুলো প্রত্যাহার।
কর্মক্ষেত্রে লিঙ্গ বৈষম্য দূর করা তথা সমতা নিশ্চিত করার আদেশ দিয়েছেন তিনি।

সাইদ আহমেদ বাবু : সদস্য, সম্পাদকম-লী, উত্তরণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply