মীরার স্বপ্নাচ্ছন্ন প্রেম

মফিদা আকবর : শীতকাতুরে মানুষকে লেপ-কম্বল যেমন করে উষ্ণতা দিয়ে আরামে ঘুমুতে দেয়। তেমনি আজকাল মীরাও স্বপ্নের চাদরখানা মুড়ি দিয়ে ঘুমিয়ে যায় নিশ্চিন্তে। আহ্ সারাদিনের ক্লান্তির পর ঘুম স্বপ্নের মধ্যে মাঝে মাঝে ওর আত্মাটা বেরিয়ে পড়ে। দিনমান যেসব কাজে শাসন-বারণের জালে আটকে থাকতে হয়, লোকলজ্জার ভয়ে সেঁটে থাকতে হয়, স্বপ্নের মাঝে শাসন-বারণের কোনো বালাই নেই। চিন্তার লেশমাত্র নেই। মন মনরে আমার যেখানে খুশি সেখানে চল। স্বপ্নের রথে চড়ে ওড়ে ওড়ে চলা আহ্ কি প্রশান্তি।
স্বপ্নরথে চড়ে মীরা রাতভর পইপই করে ঘুরে বেড়ায়। টিএসসি চত্বরে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মেতে ওঠে। শিল্পকলা একাডেমিতে একক অথবা যৌথ চিত্র প্রদর্শনী ঘুরে ঘুরে দেখে। শিল্পীদের জল রঙের ছবি অথবা শুধুই রঙের ছোপ ছোপ আঁকিবুঁকি। অথবা স্নিগ্ধ তমাল-তরু আঁকাবাঁকা সরুপথ কিংবা নদী বয়ে চলে গেছে বহুদূর। রংতুলি দিয়ে শিল্পীদের কারুকলা খেলা। কি ভীষণ মুগ্ধতায় আটকে রাখে চোখকে। কখনও কখনও মনে হয় যেন স্নিগ্ধ আবেশে নদী যেন থমকে দাঁড়িয়ে আছে। আবার কখনও মনে হয় কাচের মতো স্বচ্ছ টলটলায়মান জল। এ-রকম ভাবনাগুলো টুপটুপ করে ঝরে পড়তে থাকে মীরার মনে। অথচ এই আঁকিবুঁকির সাথে শিল্পীর মনের অজান্তে কত বিশাল খেয়াল, কত কথা, অথবা সুখ-দুঃখের রং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকে।
মীরা তন্ময় হয়ে এসব বিশ্লেষণে মেতে থাকে কিছুক্ষণ। এক সময় মনে হয় দূর ছাই! আমি ভাবছি কী! আর শিল্পী কী ভেবে এসব চিত্র এঁকেছেÑ তা-ই বা কে জানে? শিল্পীর মতো তৃতীয় নয়ন আমার নেই! এ কর্ম আমার নয়। সুতরাং দে ছুট।
মীরা এবার একা একা বইমেলার আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়ায়। গ্রন্থবিতানের বইগুলো ছুঁয়ে ছঁয়ে দেখে এবং যা যা মন চায়- গীতবিতান থেকে শুরু করে কত কী! সবকিছুই সে করে নিজের মতো করে। নিজের খেয়ালে হাওয়ার পিঠে চড়ে মীরা রাজ্যের বইগুলো কিনে নিয়ে ঘরে ফিরে ঢুকে যায় রিডিং রুমে। আহ কী শান্তি। পরম শান্তি!
বই কিনে নিয়ে আসার পর আর তর সয় না। জানতে ইচ্ছে করে কোন্ বইয়ে কী আছে? পৃষ্ঠার পর নান্দনিক পৃষ্ঠাগুলো গেঁথে নেয় নিজের মগজে। যেদিন সে বই পড়ে না। সেদিন ওর মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। বই পড়া মানেই মীরার মনের দুয়ার খুলে যায়। কী এক অনন্য ভালোলাগা ছড়িয়ে পড়ে ওর শরীরময়। মীরা এবার শুতে যায় নবীনের সাথে। নবীন যখন মাথা ব্যথায় উহ্ আহ্ করে, মীরা তখন ওর আধা কাঁচাপাকা চুলের গোড়ায় আঙ্গুল ডুবিয়ে রগড়ে দেয়। ওর কপালে আলতো করে চুমু খেলে নবীন ওর উপস্থিতি টের পায়। ঘুমঘোরে ওকে জাপটে ধরে। সুযোগটি হাতছাড়া করে না মীরাও। পরম নিশ্চিন্তে ওর বুকে লেপ্টে থাকে। ওর শরীরের উষ্ণতায় জেগে যায় নবীন। ঘরময় আধো আলো, আধো ছায়া খেলা করে। এ সময় আত্মার রমণে নিজেকে পরিতৃপ্ত করে মীরা। প্রতিদিন মীরার আত্মা একবার করে স্বপ্নাচ্ছন্ন ও প্রেতাত্মা হয়। কিছুক্ষণের জন্য হলেও চলে যায় অন্য জগতে। অন্য মোহে। এসবই স্বেচ্ছাকৃত স্বপ্ন অথবা দুঃখ মীরার। নবীনকে পাওয়ার আর কোনো সুযোগই নেই বলে মীরা স্বপ্নের মাঝে এভাবেই প্রতিনিয়ত নিজেকে ক্ষত-বিক্ষত করে। কারণ, মীরা জানে, মানুষের মন তো আর লোহার কল নয় যে, তাকে বেঁধে রাখা যায়? বাহ্যিক অর্থে মীরার দেহ সামাজিক, পারিপার্শ্বিকতাকে ভেদ করে এক চুলও পাপ-পুণ্যের বাইরে নয়। অথচ স্বপ্নাচ্ছন্ন মীরার অন্তরাত্মা কি নিষ্কলুষ এবং কত স্বাধীন। স্বপ্নাচ্ছন্ন মীরা মনে মনে বলে জীবনের যে কোনোদিন অথবা যে কোনোভাবেই হোক আমি তোমাকে আমার স্বপ্নের মতো করে আর আমার প্রেতাত্মার মতো করে পেতে চাই। তোমাকে পেতে একবুক কষ্টকে কেউটের মতো গলাধঃকরণ করে মরে যেতে চাই। ঈশ্বরহীন হতে চাই। পাপাগ্নির লেলিহানে পুড়ে পুড়ে অঙ্গার হতে চাই। তাই আমার মূর্ত এবং বিমূর্ততায় কষ্টগুলো মজে মজে, কষে কষে আমার শরীরের কোষে কোষে মাখো মাখো হয়ে লেপ্টে আছে। যেমন করে নাশতার টেবিলে পাউরুটিতে মাখন মাখিয়ে দেয়।
আমি জানি, আমার ভালোবাসা কঠিনতম শুদ্ধ, আত্মপীড়িত, অনুপম, দেবোপম পুণ্য শুচি-শুভ্রতায় স্নিগ্ধ। তাই নির্বাক, স্পন্দনহীন অস্পষ্ট নিশ্চিত অসাড়তার চেয়ে, মিথ্যে প্রেমহীন সংগমের চেয়ে স্বপ্নের প্রেমময় সংগম আমাকে প্রতি রাতে স্বপ্নময় আত্মার রমণে নিবিড় স্নিগ্ধতায় মিঠেকড়া স্বাদে ভাসিয়ে দেয়। তখন আমার জাগতিক ছাইপাশ ভাবনা আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায় না। আমি তখন অন্য জগতে, অন্য মোহে, দ্বিধাহীন, নিঃসংকোচ। আহ কী শান্তি। পরম শান্তি।

লেখক : সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply