আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস: প্রবাসী দুই বাঙালির প্রচেষ্টা সফল হলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে

শেখর দত্ত : আজ থেকে ৭৩ বছর আগে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার এক বছর হতে-না-হতেই ১৯৪৮ সালে যখন বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়, ওই বছরই পাকিস্তান গণপরিষদে কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত সদস্য ধীরেন্দ্র নাথ দত্ত যখন এই দাবি উত্থাপন করেন কিংবা ১১ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানসহ ৩০০ ছাত্র যখন গ্রেফতার হন ও পুলিশি নির্যাতন চলে; তখন কল্পনা করাও সম্ভব ছিল না যে এই আন্দোলনকে ভিত্তি করে চার বছর যেতে-না-যেতেই তৎকালীন পূর্ব বাংলার ইতিহাসে সালাম-বরকত-শফিক-রফিক-জব্বারের রক্তস্নানে একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা শহিদ দিবসের জন্ম হবে। বাঙালি জাতিসত্তা তথা অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক-ন্যায়বিচারভিত্তিক চেতনার ভ্রুণের সৃষ্টি হবে এবং তা পূর্ব বাংলার স্বাধিকার ও গণতন্ত্রের আন্দোলনকে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ অভিমুখী করে তুলবে। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হবে।
‘একুশ মানেই মাথানত না করা।’ একুশ মানেই বাঙালি জাতিসত্তার স্মারক। একুশ মানেই জাতীয় চার মূলনীতির লক্ষাভিমুখী হওয়া। একুশ মানেই মানবতার পক্ষে প্রগতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা। এসবই আমরা জানতাম। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ব দরবার জাতিসংঘে মাতৃভাষা বাংলায় ভাষণ দিয়ে মায়ের ভাষা বাংলাকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কিন্তু তখনও এমনটা অনুধাবন করা যায়নি যে এই দিবসটি একদিন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা লাভ করবে। দিবসটির তাৎপর্য বিশ্ব মানবের ইতিহাসে অনন্য সাধারণ দিবস হিসেবে গৌরবান্বিত হতে থাকবে। বাঙালির সংগ্রাম বিশ্ব সংগ্রামের ঐতিহ্যের স্বাক্ষর হয়ে উঠবে। বিশ্বের দেশে দেশে শহিদদের রক্তরঞ্জিত দিবসটি পালিত হবে।
এজন্য বাংলাভাষী মানুষ হিসেবে আমরা গর্ব করতেই পারি। ১৯৬০-৬১ সালে ভারতের আসামে বরাক উপত্যকার বাঙালিরা মাতৃভাষা বাংলাকে রাজ্যের অন্যতম সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতির দাবিতে রক্তক্ষয়ী আন্দোলনে নেমেছিল। ১৯ মে কাছার জেলার শিলচরে শহিদ হয়েছিলেন ৯ বীর বাঙালি। তাদের মধ্যে ছিলেন একজন স্কুলছাত্রী, কমলা ভট্টচার্য। যার জন্ম আমাদের প্রাণপ্রিয় দেশ সিলেটে। ওই আন্দোলনও একুশের মতো বিজয়ী হয়েছিল; বরাক উপত্যকা অঞ্চলে বাংলা সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃত পেয়েছিল। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য দুদেশে দুই প্রেক্ষাপটে শহিদদের রক্ত ঝরেছে। রক্ত ঝরেছে পুরুষের, রক্ত ঝরেছে নারীরও। ‘এক বৃন্তে দুটি ফুল’-এর মতো বাঙালির দুই সম্প্রদায় মুসলিম ও হিন্দুর রক্তস্রোত বাংলা ভাষাকে এক মোহনায় মিলিত করেছে। নিঃসন্দেহে বরাক উপত্যকার বাঙালি ছাত্র-যুবকসহ জনগণ বাংলাদেশের বাঙালিদের থেকে মাতৃভাষার জন্য সংগ্রাম করতে অনুপ্রাণিত হয়েছে।
বলাই বাহুল্য একুশের পর থেকে সময় যত অতিক্রান্ত হচ্ছে, ততই বিশ্বের দেশে দেশে বিভিন্ন জাতির মধ্যে মাতৃভাষাকে সমর্যাদার সুরক্ষা ও প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে একুশে বাতিঘর হয়ে উঠছে। যতদিন যাবে, বর্তমানের আঁধার অপসৃত হয়ে মানবিক বিশ্বায়ন গড়ার সংগ্রাম যতই অগ্রসর হবে, ততই প্রতিটি জাতি তার স্বাতন্ত্র্যম-িত ঐতিহ্য-ভাষা-সংস্কৃতির সুরক্ষা ও উন্নতির জন্য একুশ থেকে অনুপ্রেরণা নেবে। একুশ হচ্ছে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য, স্বাতন্ত্র্যের মধ্যে মিলন, পার্থক্যের বিপরীতে সৌভ্রাতৃত্ব, ঘৃণার বিরুদ্ধে ভালোবাসার মাইলফলক। আমাদের জাতির জন্মের উৎসমুখে এমন একটি বিশ্বমানবের মিলনের তাৎপর্যময় সর্বজনীন ও কালজয়ী দিবস সগৌরবে বিরাজ করায় জাতি হিসেবে আমরা পরিতৃপ্তি পেতেই পারি।
ইতিহাসে কখনও এমন কিছু সংগঠিত হয়, যার প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারি, কালজয়ী। পূর্ব বাংলার জনগণের রাজনৈতিক- সামাজিক-অর্থনৈতিক-শিক্ষা-সংস্কৃতির গতিধারার সব কল্যাণকর সুকীর্তির সম্মিলনের ফল হচ্ছে ভাষা দিবস হিসেবে রক্তস্নাত একুশের প্রাপ্তি। যে প্রাপ্তি কেবল বাঙালি জাতির নয়, বিশ্বমানবেরও পরম প্রাপ্তি। ইতিহাসের গতিধারায় কত জাতি, কত ভাষা-সংস্কৃতি যে তার অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারেনি; কত জাতির ঐতিহ্য যে ধ্বংস হয়ে গেছে, নিজেকে সুরক্ষা ও অগ্রসর করতে পারেনি; তার লেখাজোখা নেই। ২০০৯ সালে জাতিসংঘ তথ্য প্রকাশ করে বলেছে, বিশ্বের ৬ হাজার ভাষার মধ্যে আগামী ১০০ বছরে ৩ হাজার ভাষার অবলুপ্তি ঘটবে। প্রকৃত বিচারে একুশের চেতনাই এই অবলুপ্তি রোধ করতে পারে। তাই একুশে ফেব্রুয়ারি কোনো জাতির ভাষা ও সংস্কৃতিকে সুরক্ষা ও অগ্রসর করার সংগ্রামের দিক-নির্দেশক। আর সেজন্যই বিশ্ব-সমাজ আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস হিসেবে একুশের স্বীকৃতি দিয়েছে এবং দেশে দেশে তা আজ মহান গৌরবে পালিত হচ্ছে।
প্রসঙ্গত বলতেই হয়, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম লীগে যদি নবাব-জমিদার-মহাজনবিরোধী অগ্রসর চিন্তার ধারক-বাহক উদার-মানবিক ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সপক্ষের শক্তি না থাকত, তবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকায় ১৫০ মোগলটুলি ওয়ার্কার্স ক্যাম্পের যেমন উদ্ভব হতো না, তেমনি সরকারি দল ভেঙে প্রথমে ’৪৮-এর ভাষা আন্দোলনের আগে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের আগে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হতো না। বাংলা ভাষা ও বাংলার মানুষের ওপর পাকিস্তানি শাসক-শোষক গোষ্ঠীর অন্যায্য-অন্যায়, শোষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে তখনকার ছাত্র, রাজনৈতিক ও শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলন না ঘটত, তখনকার সংগ্রামী নেতা মওলানা ভাসানীসহ বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা যদি সামনে না দাঁড়াতেন এবং শামসুল হক-শেখ মুজিবের মতো ছাত্র-যুবক নেতারা যদি সংগ্রামের কাতারে শামিল না হতেন, তবে মহান একুশের জন্ম হতো না।
বাঙালি জাতির ইতিহাস যেন সব কার্যকারণ ও ইতিহাস খ্যাত জাতীয় বীরদের সম্মিলন ঘটিয়েছিল বায়ান্ন’র একুশের সেই মাহেন্দ্রক্ষণে। আমাদের সৌভাগ্য এই যে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপর সংগ্রামমুখর ওই ঐতিহাসিক দিনগুলোতে আমাদের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান সেই কৃত্রিম রাষ্ট্রে রাজনীতির পাঠ নিয়েছিলেন। অকুতভয় সাহস ও দূরদৃষ্টি নিয়ে শিক্ষাঙ্গন থেকে বহিষ্কার, জেল-জুলুম সহ্য করে আন্দোলনের মধ্যমণি হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। বলাই বাহুল্য, ঠিক এমনই একটি সম্মিলন ঘটেছিল ১৭ নভেম্বর ১৯৯৯ সালে। সেটিও ছিল বিশ্ব ইতিহাসের মাহেন্দ্রক্ষণ; একুশে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস হিসেবে বিশ্বের প্রতিটি দেশের সম্মিলন কেন্দ্র জাতিসংঘের ইউনেস্কোর ১৫৭তম অধিবেশনের শেষ দিনে। কানাডা থেকে দুই বাঙালি যদি অমর একুশকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতির তৎপরতা শুরু না করতেন, কানাডার বহুভাষিক ও বহুজাতিক মাতৃভাষা প্রেমিকগোষ্ঠী যদি এই স্বীকৃতির পক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রচেষ্টায় শামিল না হতেন এবং তখন যদি আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় না থাকত এবং সর্বোপরি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনা যদি যথাযথ উদ্যোগী ও কর্মতৎপর না হতেন, অর্থাৎ আন্তর্জাতিক ও জাতীয় সব উপাদানের যদি সম্মিলন না ঘটত, তবে ওই তারিখে ওই মাহেন্দ্রক্ষণটির জন্ম হতো না।
জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী না থাকলে এমনটা যে আদৌ হতো না, তারও প্রমাণ রেখেছে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস। মহান একুশে আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর ৭ ডিসেম্বর ১৯৯৯, পল্টন ময়দানে অনুষ্ঠিত জনসভায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন যে, পৃথিবীর বিকাশমান ও বিলুপ্তপ্রায় ভাষাগুলোর মর্যাদা ও অধিকার রক্ষায় গবেষণার জন্য ঢাকায় একটি প্রতিষ্ঠান ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউশন’ স্থাপন করা হবে। তার অক্লান্ত উদ্যোগে ১৫ মার্চ ২০০১, সেগুন বাগিচায় জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের উপস্থিতিতে ওই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। তা স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ও ক্ষুদ্র জাতিসমূহের ভাষা সংগ্রহ, সংরক্ষণসহ প্রয়োজনীয় গবেষণা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম সম্পন্ন করা এবং বাংলাসহ অন্যান্য ভাষার তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা এবং ইউনেস্কোর সদস্য দেশসমূহের মধ্যে এ-সংক্রান্ত তথ্যাবলি পৌঁছে দেওয়া প্রভৃতি।
ওই ঘোষণার সাত মাস যেতে-না-যেতেই ১ অক্টোবর ২০০১, নির্বাচনে বিএনপি-জামাত ইসলামী ঐক্যজোটের চারদলীয় জোট ভোট ডাকাতির ভেতর দিয়ে ক্ষমতায় আসে। প্রতিষ্ঠিত হয় খালেদা-নিজামীর সরকার। পড়ে থাকে ওই ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার কাজ। এমন হওয়াই ছিল স্বাভাবিক। কেননা ঐতিহ্য ও গৌরবম-িত একুশের চেতনা-জাত সৃষ্টি বাংলাদেশের জন্মলগ্নের মর্মবাণী তো ওই জোট গ্রহণ করে না। একাত্তরের ঘাতক দালাল ও উগ্রবাদীরা ক্ষমতায় থেকে এমন একটি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করবে কেন? ২০০৮ সালের নির্বাচনে জনগণের ভোটে পুনরায় ক্ষমতায় এসে ২০১০ সালের অমর ২১শে ফেব্রুয়ারিতে এই প্রতিষ্ঠানের ভবন উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনিই হন ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। বর্তমানে ওই ইনস্টিটিউটটি পরিণত হয়েছে ইউনেস্কোর ক্যাটাগরি-২ প্রতিষ্ঠানে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেই যে পরিস্থিতি অনুযায়ী জাতি শিকড়ের সন্ধান খোঁজে, স্ব-স্ব ভাষাভাষী জনগণের ভাষা ও জাতিসত্তা সুরক্ষা ও অগ্রসর করার ভেতর দিয়ে বিশ্বসমাজের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে বিশ্ব দরবারে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে, এটাই হচ্ছে এর প্রমাণ।
আমাদের জাতির এবং বিশ্ব ইতিহাসের রাজনীতির অভিজ্ঞতার দিকে দৃষ্টি ফেরালেই এটা সুস্পষ্ট হয়ে উঠবে যে, বিশেষ পরিস্থিতিতে যদি নেতা-জনতা-দাবির সম্মিলন না ঘটে, তবে মহৎ কোনো সাফল্য ও অর্জন হয় না। এটা সবৈবভাবে বাচ্চাদের সেই টোনাটুনির পিঠা তৈরির ছড়ার গল্পের মতো। বাস্তবে মানুষসহ সব উপকরণের সম্মিলন না হলে যেমন পিঠা হয় না; তেমনি বাস্তব পরিস্থিতির উপযোগী নেতা ও জনতার সম্মিলন ও উদ্যোগ ছাড়া ইতিহাসও মহৎ কর্ম করতে পারে না। একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস করার জন্য বিগত শতকের শেষ দিকে ইতিহাস সব উপকরণ ও মানুষকে সাজিয়েই রেখেছিল। কেবল প্রয়োজন ছিল সংযুক্তি ও সম্মিলনের।
১৯৯৮ সালে কানাডার ভাঙ্কুভার শহরে বসবাসরত দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম ও আবদুস সালাম জাতিসংঘ মহাসচিব কফি আনানকে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করার অনুরোধ জানিয়ে একটা চিঠি লেখেন। এদিকে মূলত ওই দুজনের উদ্যোগে কানাডায় ‘মাদার্স ল্যাংগুয়েজ লাভার্স অব দ্যা ওয়ার্ল্ড’ নামে একটি সংগঠন গড়ে ওঠে এবং সাত জাতি ও সাত ভাষার ১০ জনের স্বাক্ষরিত আরও একটি চিঠি ২৯ মার্চ তারা জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছে পাঠিয়ে দেন এবং চিঠির কপি ইউএনও-র কানাডীয় দূতের কাছেও প্রেরণ করা হয়। জানা যায়, প্রেরিত চিঠি তখনকার সেক্রেটারি জেনারেলের প্রধান তথ্য কর্মচারী প্রখ্যাত সাহিত্যিক-সাংবাদিক হাসান ফেরদৌসের নজরে আসে। তিনি ২০ জানুয়ারি ১৯৯৯ রফিকুল ইসলামকে জানান, সিদ্ধান্ত গ্রহণের উপযুক্ত স্থান হচ্ছে ইউনেস্কো এবং প্যারিসে ওই প্রতিষ্ঠানের সেক্রেটারি জেনারেলের সাথে যোগাযোগ করতে হবে। এমনটা জেনে তারা ইউনেস্কোকে চিঠি দেন এবং যোগাযোগ করেন।
১৯৯৯ সালের ৩ মার্চ ইউনেস্কোর সদর দপ্তরের ভাষা বিভাগের কর্মকর্তা আন্না মারিয়া পত্র লেখকদের জানান প্রস্তাবটি আকর্ষণীয়। তবে ব্যক্তিগত আবেদন নয়, ইউনেস্কোর পরিচালনা পর্যদের কোনো একটি সদস্য রাষ্ট্রের মাধ্যমে প্রস্তাবটি তুলতে হবে। বাংলাদেশ, ভারত, কানাডা, ফিনল্যান্ড ও হাঙ্গেরি- এই ৫টি সদস্য রাষ্ট্রের নাম ও ঠিকানা তিনি পাঠিয়ে দেন। উদ্যোক্তা-গোষ্ঠী বিষয়টি বাংলাদেশের শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জানায় এবং মন্ত্রণালয় সময় কম থাকায় দ্রুত প্রধানমন্ত্রীর কাছে নোট দেয়। ইতোমধ্যে ওই উদ্যোগ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে রূপান্তরিত হয়।
এদিকে ইউনেস্কোর নির্বাহী পরিষদের ১৫৭তম অধিবেশন এবং ২৬ অক্টোবর-১৭ নভেম্বর ৩০তম অধিবেশন সামনে এবং হাতে কম সময় থাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এড়াতে মন্ত্রণালয়ে নোট বা পরামর্শ না পাঠিয়ে ৯ সেপ্টেম্বর সরাসরি ইউনেস্কোর কাছে প্রস্তাব পাঠিয়ে দেন। বাংলাদেশ জাতীয় ইউনেস্কো কমিশনের পক্ষে এর সচিব অধ্যাপক কফিলউদ্দিন চৌধুরী বাংলাদেশের পক্ষে এই প্রস্তাবে স্বাক্ষর করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাাসিনার পরামর্শে এই দিনগুলোতে ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ও ইউনেস্কোর স্থায়ী প্রতিনিধি সৈয়দ মোয়াজ্জেম আলী এবং ইউনেস্কোর সেক্রেটারি জেনারেলের সিনিয়র স্পেশাল এভাইজার ফর এশিয়া অ্যান্ড স্পেসিফিক তোজাম্মেল টনি হক বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তিনিই উদ্যোগ নিয়ে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এএসএইচকে সাদেকের নেতৃত্বে অধিবেশনে শক্তিশালী প্রতিনিধি দল পাঠান।
অধিবেশনের আলোচনায় এক পর্যায়ে দুটো সমস্যা দেখা দেয়। প্রথমত; দিবস পালন করতে গেলে বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হবে, যা বরাদ্দ নেই। দ্বিতীয়ত; ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ‘ইন্টারন্যাশনাল মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ ডে’ নয়, ‘ইন্টারন্যাশনাল মাদার টাংগ ডে’ নামকরণ করতে চেয়েছিলেন। তাই তিনি ১ লাখ ডলার ব্যয়ের প্রস্তাব করেন এবং দুই বছর পর নির্বাহী পরিষদের ১৬০তম অধিবেশনে একটি সম্ভাব্যতা জরিপের মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরার প্রস্তাব করেন। এ সময় বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল উপস্থিত সদস্য দেশগুলোকে বুঝাতে সক্ষম হয় যে, এতে ইউনেস্কোর ১ ডলারও লাগবে না এবং বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ নিজের প্রয়োজনেই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করতে চাইবে। এদিকে প্রস্তাবটি পাসের জন্য পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের সমর্থন প্রয়োজন ছিল। কেননা একুশের রক্তাক্ত ঘটনার জন্য পাকিস্তান সরকার দায়ী ছিল। আর পাকিস্তান সমর্থন না করলে সৌদি আরবসহ আরব বিশ্বের দেশগুলোর সমর্থন লাভ করা ছিল কঠিন।
যতটুকু জানা যায়, ১৯৯৯ সালে সামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকায় সে-বছর পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী ইউনেস্কো অধিবেশনে যাননি; গিয়েছিলেন শিক্ষা সচিব। তিনি বাংলায় মোটামুটি কথা বলতে পারতেন এবং বাংলাদেশের শিক্ষামন্ত্রীর অধীনে পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে কাজও করেছেন। এই যোগাযোগও কাজে লাগে। বাস্তবে পাকিস্তানের প্রস্তাবের পক্ষে দাঁড়ানো ছাড়া বিকল্প ছিল না। এদিকে ইউরোপীয় কোনো কোনো দেশের প্রতিনিধি দল দিবস পালনের পক্ষে থেকেও একুশে ফেব্রুয়ারি তারিখটা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কিন্তু শহিদদের রক্তদানের আবেগ ও অনুভূতি অনুধাবন করতে পেরে তারাও শেষ পর্যন্ত মত দেন। বাংলাদেশ ছিল মূল প্রস্তাবক এবং সৌদি আরব ছিল সমর্থক। বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত আইভোরি কোস্ট, ইতালি, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ডোমেনিকান রিপাবলিক, পাকিস্তান, ওমান, পাপুয়া নিউগিনি, ফিলিপাইন, বাহামাস, বেনিন, বেলারুশ, গাম্বিয়া, ভারত, রুশ ফেডারেশন, লিথুয়ানিয়া, মিশর, শ্রীলংকা, সিরিয়া, হন্ডুরাস প্রভৃতি ২৩টি দেশ সম্মিলিতভাবে এই প্রস্তাব সমর্থন করে এবং ১৮৮টি দেশ সর্বসম্মতভাবে প্রস্তাবটি পাস করে।
বিশ্বের বুকে আবির্ভূত হয় একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস। বলাই বাহুল্য, একটি ব্যক্তিগত উদ্যোগ কীভাবে সরকারি উদ্যোগে পরিণত হয়ে মানব ইতিহাসের অতীব তাৎপর্যপূর্ণ দিবসের জন্ম দিতে পারে, এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক এই বিশ্ব স্বীকৃতি। বাংলা ভাষার যারা বিরোধিতা করেছিল, বাঙালি জাতিসত্তা ও জাতীয়তাবাদকে যারা অবমূল্যায়ন বা হেয় করতে চায়; তাদের জন্য এই স্বীকৃতি ছিল চরম এক শিক্ষা। জাতীয়তাবাদ যে কীভাবে আন্তর্জাতিকতা ও বিশ্বজনীনতায় রূপ নেয়, এটা ছিল তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
এই স্বীকৃতি পাওয়ার দীর্ঘদিন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ২০১০ সালের মে মাসে ১১৩ সদস্যবিশিষ্ট জাতিসংঘের তথ্যবিষয়ক কমিটিতে বাংলাদেশ প্রস্তাবটি উত্থাপন করলে সর্বসম্মতক্রমে গৃহীত হয়। এরই সূত্র ধরে ২১ অক্টোবর সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে বাংলাদেশ একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব উত্থাপন করলে জাতিসংঘ সর্বসম্মতক্রমে প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। বর্তমানে বিশ্বের ১৮৮টি দেশে দিবসটি পালিত হচ্ছে। ক্রমেই দিবসটি পালনে বিশ্বব্যাপী আগ্রহ বাড়ছে। বিগত বছর ২০২০ সালে প্যারিসে ইউনেস্কোর সদর দপ্তরে একুশে ফেব্রুয়ারি দিনব্যাপী ‘ল্যাঙ্গুয়েজ উইদাউট বর্ডার’ শিরোনামে অনুষ্ঠিত হয়েছে আলোচনা সভা। সদস্য দেশগুলোতে ভাষা-সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন এবং ভাষাগত বৈচিত্র্যকে সংরক্ষণের জন্য ইন্টারনেট ও মিডিয়ায় যেন ভাষাগত বৈচিত্র্য হারিয়ে না যায় এবং ভাষাকে আরও কীভাবে সহজ করা যায় সে-বিষয়ে বিশে^র বিভিন্ন দেশ ও ইউনেস্কো এখন কাজ করছে।
আজ থেকে ৭০ বছর আগে বরকত-সালাম-রফিক-শফিক-জব্বারসহ শহিদের রক্তে রঞ্জিত হয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি দিবসটি যে আজ সারাবিশে^ পালিত হচ্ছে, তা আমাদের জাতির সব সুকীর্তি ও সাফল্যের ফসল। একুশে প্রমাণ করেছে, ন্যায্য দাবির আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের বুকের রক্ত যারা কেড়ে নেয়, সেই প্রতিক্রিয়ার স্থান সব সময়েই হয় ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে আর শহিদের রক্তদান কখনও বৃথা যায় না। সালাম-বরকত-রফিক-শফিক-জব্বার প্রমুখ শহিদরা অমর। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারি শহিদ দিবস অমর হোক।

লেখক : সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, উত্তরণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply