বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব: ঢাকা ম্যারাথনের বর্ণিল আয়োজন

আরিফ সোহেল : শুধু কর্মব্যস্ত রাজধানীবাসীই নয়, দেশের অধিকাংশ মানুষই তখন লেপ মুড়ি দিয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। সকালের সূর্য তখনও আলো ছড়ায়নি। চারদিকে পৌষের হিমশীতল হাওয়া। কুয়াশার চাদরে ঢাকা এপাশ-ওপাশ।

শীত-কুয়াশা ছাপিয়ে উত্তাপ ছড়াতে দেশ-বিদেশের দু-শতাধিক দৌড়বিদ শতভাগ প্রস্তুত। স্টার্ট পয়েন্ট বাঁশির অপেক্ষায়। উপলক্ষ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে জাতির পিতার স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবসকে ঘিরে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঢাকা ম্যারাথন’। এই ম্যারাথন আর্মি স্টেডিয়াম থেকে শুরু হয়েছিল ঠিক সাড়ে ৬টায়। শেষ হয়েছে হাতিরঝিলে। অভ্যাগতদের হৈ-হুল্লোড়; উৎসাহ-উদ্দীপনাÑ এগিয়ে যাওয়ার প্রণোদনা। ঠিক এমন উৎসবমুখর আয়োজনে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঢাকা ম্যারাথন’ আয়োজন।
জমজমাট এই আয়োজনের সফল উদ্যোক্তা বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এই মহাযজ্ঞের খুঁটিনাটির সামগ্রিক দায়িত্ব পালন করেছে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ। ১০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত এই আলোচিত ম্যারাথন আয়োজনের সহযোগিতা করেছে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি।
আন্তর্জাতিকভাবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের ক্ষেত্রে ম্যারাথন আয়োজন নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে সূচনা হয়েছিল ঢাকা সেনানিবাসের আর্মি মাল্টিপারপাস কমপ্লেক্সে। ওই অনুষ্ঠানে জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক কামাল চৌধুরী এবং ম্যারাথন আয়োজক কমিটির সভাপতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ লেফটেন্যান্ট জেনারেল সফিকুর রহমান উপস্থিত ছিলেন। ঘোষণা আয়োজনে বক্তারা বলেছেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উদ্যোগে প্রতি বছর এই ম্যারাথনে বিশ্বের খ্যাতিমান দৌড়বিদরা অংশগ্রহণ করবেন, যা একসময় বিশাল আয়োজনে রূপান্তরিত হবে এবং সারা পৃথিবীর মানুষ বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আমাদের আত্মত্যাগ সম্পর্কে জানতে পারবে। বাংলাদেশে ইতোপূর্বে ম্যারাথন অনুষ্ঠিত হলেও মুজিববর্ষ উপলক্ষে দেশে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিকমানের ম্যারাথন আয়োজন করা হয়েছে। ম্যারাথনে দেশি-বিদেশি খ্যাতনামা দৌড়বিদরা অংশগ্রহণ করেছে। নারী ও পুরুষ দুই বিভাগে এই ম্যারাথন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশসহ এই ম্যারাথনে ফ্রান্স, লেসেফো, স্পেন, কেনিয়া, ইথিওপিয়া, বাহরাইন, বেলারুশ, ইউক্রেন, মরক্কো, মালদ্বীপ, নেপাল, ভারতের দৌড়বিদরা অংশ নিয়েছেন।
১০ জানুয়ারি ২০২১, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এমপি আর্মি স্টেডিয়ামে ম্যারাথনের উদ্বোধন করেন। এ-সময় যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান রাসেল এমপিও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। প্রধান অতিথি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এই ম্যারাথনের আয়োজন করায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ, বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশন ও বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনকে ধন্যবাদ জানান। তিনি আরও বলেন, সারা পৃথিবীতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ম্যারাথনই ২০২১ সালের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া অনুষ্ঠান। ক্রীড়াক্ষেত্রে এই ইভেন্ট একটা মাইলফলক হয়ে থাকবে। ভোর সাড়ে ৬টায় আর্মি স্টেডিয়াম থেকে শুরু হওয়া এই ম্যারাথন বনানীর কামাল আতাতুর্ক এভিনিউ, গুলশান-২ চত্বর, গুলশান-১ চত্বর হয়ে হাতিরঝিলে দুই চক্কর ঘুরে হাফ ম্যারাথন ও ৫ চক্কর ঘুরে ফুল ম্যারাথন শেষ হয়েছে। বেলা ১১টায় হাতিরঝিলের এম্ফিথিয়েটারে সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ। তিনি বিজয়ীদের পুরস্কৃত করেছেন। উপস্থিত ছিলেন জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান সমন্বয়ক কামাল আবদুল নাসের চৌধুরীসহ আয়োজক কর্মকর্তারা।
এই আয়োজন এখনও চলমান। এখানেই আয়োজন পরিকল্পনার বিশেষত্ব। কারণ দু-পর্বের ম্যারাথন শেষ হয়ে গেলেও এই প্রতিযোগিতা আগামী ৭ মার্চ পর্যন্ত চলমানÑ ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে ডিজিটাল ম্যারাথন। দেশ-বিদেশের যে কেউ নিবন্ধন করে তার সুবিধাজনক স্থানে ৫ কিলোমিটার দৌড়ে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন এই ডিজিটাল ম্যারাথনে। এই ম্যারাথনে অংশ নেওয়ার জন্য একটি মোবাইল অ্যাপ চালু করা হয়েছে। দেশি দৌড়বিদদের জন্য ১০০ ও ২০ টাকা এবং বিদেশি দৌড়বিদদের জন্য ৫ ডলার নিবন্ধন ফি রাখা হয়েছে। প্লে-স্টোর থেকে অ্যাপ নামিয়ে নির্দেশনা অনুসরণ করে ডিজিটাল ম্যারাথনে অংশ নেবেন ১০ লাখ দৌড়বিদ।
ম্যারাথনে তিন ক্যাটাগরির প্রতিযোগিতা রাখা হয়েছিল। ফুল ম্যারাথন, হাফ ম্যারাথন এবং ডিজিটাল ম্যারাথন। ফুল ম্যারাথনের দূরত্ব নির্ধারণ করা হয়েছিল ৪২.১৯৫ কিলোমিটার। এই প্রতিযোগিতায় দেশি-বিদেশি ১০০ দৌড়বিদ অংশগ্রহণ করেছেন। হাফ ম্যারাথনের দূরত্ব ছিল ২১.০৯৭ কিলোমিটার; এখানে ১১১ দৌড়বিদ অংশগ্রহণ করেছেন। ডিজিটাল ম্যারাথনের দূরত্ব নির্ধারণ করা হয়েছিল ৫ কিলোমিটার। ডিজিটাল ম্যারাথন শুরু হয়েছে ১০ জানুয়ারি থেকে। চলবে আগামী ৭ মার্চ পর্যন্ত। ফুল ম্যারাথন টেলিভিশন দর্শকদের জন্য সরাসরি সম্প্রচার করা হয়েছে।
হাফ ম্যারাথনে এলিট অ্যাথলেট ৬ জন অংশ নিয়েছেন। পুরুষ ৩ জন, নারী ৩ জন। তাদের মধ্যে প্রথম হয়েছেন এডমিন কিপ্রো, দ্বিতীয় আবদেল আজিজ ও তৃতীয় হয়েছেন দাওয়াদ ফিকাসু। ফুল ম্যারাথনে ৩১ জন বিদেশি অংশ নিয়েছেন। ফুল ম্যারাথনে পুরুষ ও নারী বিদেশি এলিট বিভাগে চ্যম্পিয়ন ১৫ হাজার মার্কিন ডলার করে, রানারআপ ১০ হাজার ডলার করে, তৃতীয় স্থান অর্জনকারী ৫ হাজার ডলার করে, চতুর্থ স্থান অর্জনকারী ৪ হাজার করে, পঞ্চম ৩ হাজার, যষ্ঠ ২ হাজার এবং সপ্তম স্থান অর্জনকারী ১ হাজার ডলার পুরস্কার পেয়েছেন। সার্ক এবং দেশি পুরুষ ও নারী দৌড়বিদদের মধ্যে চ্যাম্পিয়ন পেয়েছেন ৫ লাখ টাকা, রানারআপ ৪ লাখ টাকা, তৃতীয় স্থান অর্জনকারী ৩ লাখ করে, চতুর্থ স্থান অর্জনকারী ২ লাখ টাকা এবং পঞ্চম স্থান র্অজনকারী ১ লাখ টাকা করে পেয়েছেন। হাফ ম্যারাথনে পুরুষ ও নারী দুই বিভাগেই বিদেশি এলিট বিভাগের চ্যম্পিয়ন ২ হাজার ৭৫০ মার্কিন ডলার, রানারআপ ১ হাজার ৫০০ ডলার এবং তৃতীয় হওয়া দৌড়বিদ পাবেন ৭৫০ মার্কিন ডলার। দেশি অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে চ্যম্পিয়ন পেয়েছেন আড়াই লাখ টাকা, রানারআপ ২ লাখ, তৃতীয় স্থান অর্জনকারী দেড় লাখ টাকা এবং চতুর্থ ও পঞ্চম স্থান অর্জনকারী পেয়েছেন ১০ হাজার টাকা।
নারী-পুরুষ উভয় ক্যাটাগরিতে আধিপত্য দেখিয়েছেÑ মরক্কো, কেনিয়া ও ইথিপিওয়ার অ্যাথলেটরা। এলিট ক্যাটাগরিতে পুরুষ বিভাগে সেরা পুরস্কার জিতে নেন মরোক্কোর হিসাম লাকোহী। তিনি সময় নিয়েছেন ২ ঘণ্টা ১০ মিনিট ৪০ সেকেন্ড। একই ক্যাটাগরিতে মেয়েদের মধ্যে কেনিয়ার অ্যাঞ্জেলা জিম আসুন্দে প্রথম হয়েছেন। তিনি সময় নিয়েছেন ২ ঘণ্টা ২৯ মিনিট ৪ সেকেন্ড। সাফ ক্যাটাগরিতে ছেলেদের মধ্যে আধিপত্য ছিল ভারতের। ভারতের বাহাদুর সিং ২ ঘণ্টা ১১ মিনিট ৩৪ সেকেন্ড সময় নিয়ে প্রথম হয়েছেন। মেয়েদের মধ্যে প্রথম হয়েছেন নেপালের পুষ্পা ভা-ারি। ছেলেদের মধ্যে প্রথম হয়েছেন ফারদিন মিয়া। তিনি সময় নিয়েছেন ২ ঘণ্টা ৯ মিনিট ২ সেকেন্ড। মেয়েদের ইভেন্টে প্রথম হয়েছেন পাপিয়া খাতুন। আন্তর্জাতিক ম্যারাথন অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট প্যাকো বোরাও এই ম্যারাথনকে স্বীকৃতি দিয়ে বলেছেন, ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ম্যারাথন ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে এবং প্রতি বছর এটা হবে। বাংলাদেশ সরকার ও আয়োজক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই।
ভিন্নমাত্রার এই আয়োজন দেখতে বিপুল উৎসুক খেলাপ্রেমী মানুষের ভিড় ছিল। বিশেষ করে উত্তেজনাপূর্ণ রশি ছোঁয়ার ক্লেজিং পয়েন্টে। উদ্যোক্তা আশা করছেন প্রতি বছর আয়োজনের। এই আয়োজন বাংলাদেশের মিনি ম্যারাথনের জন্য এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচন করবে। অনুপ্রাণিত করবে এদেশের ক্রীড়াবিদদের।

লেখক : সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, উত্তরণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply