মুজিববর্ষেই সব গৃহহীন ও ভূমিহীনকে ঘর দেওয়ার অঙ্গীকার

উত্তরণ প্রতিবেদন : স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আজীবনের লালিত স্বপ্নই ছিল দেশের দুখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। তারই জন্মশতবার্ষিকীতে চলা মুজিববর্ষে সরকারিভাবে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে প্রায় ৭০ হাজার ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বপ্নের স্থায়ী ঠিকানা একখ- জমির ওপর সুদৃশ্য বাড়ি নির্মাণ করে তা হস্তান্তরকালে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনাও ছিলেন আবেগতাড়িত, তেমনি এত মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পেরে নিজের জাতির পিতার স্বপ্ন পূরণের তৃপ্তি ও উচ্ছ্বাসও ঢাকতে পারেননি। এর মাধ্যমে শুধু দেশেই নয়, সারাবিশ্বের মধ্যে মানবকল্যাণে এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা।
তাই বিশ্বে নজির স্থাপন করা এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যেও উঠে আসে মুজিববর্ষেই ধারাবাহিকভাবে দেশের সব ভূমিহীন-গৃহহীন মানুষকে স্থানীয় স্বপ্নের নীড় গড়ে দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয়। মুজিববর্ষে গৃহহীন-ভূমিহীনদের ঘর উপহার বাংলাদেশের মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় উৎসব জানিয়ে আবেগজড়িত কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের ভূমিহীন-গৃহহীন মানুষকে ঘর দিতে পারার চেয়ে বড় কোনো উৎসব আর কিছুই হতে পারে না। আজকে সত্যিই আমার জন্য একটা আনন্দের দিন। ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে জমি এবং ঘর প্রদান করতে পারা বড় আনন্দের। যখন এই মানুষগুলো এই ঘরে থাকবে, তখন আমার বাবা-মার আত্মা শান্তি পাবে। লাখো শহিদের আত্মা শান্তি পাবে। কারণ এসব দুখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই তো ছিল আমার বাবার (বঙ্গবন্ধু) লক্ষ্য। প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধি সকলের সম্মিলিত প্রয়াসেই এত বড় অসাধ্য সাধন হয়েছে। সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করেছেন বলেই বিশ্বে একসঙ্গে এত মানুষকে ঘর দেওয়া নজিরবিহীন ঘটনা।
বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন পূরণে দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সকলের জন্য নিরাপদ বাসস্থানের ব্যবস্থা করাই হবে মুজিববর্ষের লক্ষ্য, যাতে দেশের প্রতিটি মানুষ উন্নত জীবনযাপন করতে পারে। দেশের ভূমিহীন-গৃহহীন মানুষকে ঘর দিতে পারার চেয়ে বড় কোনো উৎসব আর কিছুই হতে পারে না। এভাবেই মুজিববর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে পুরো বাংলাদেশের গৃহহীনদের নিরাপদ বাসস্থান তৈরি করে দেওয়া হবে, যাতে দেশের একটি লোকও গৃহহীন না থাকে। যাতে তারা উন্নত জীবনযাপন করতে পারে, আমরা সে-ব্যবস্থা করে দিব। যাদের থাকার ঘর নেই, ঠিকানা নেই আমরা তাদের যেভাবেই হোক একটা ঠিকানা করে দেব।
গত ২৩ জানুয়ারি মুজিববর্ষ উপলক্ষে সারাদেশে ভূমিহীন এবং গৃহহীন পরিবারকে জমি ও গৃহ প্রদানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে প্রথমবারের মতো বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মাধ্যমে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে মূল অনুষ্ঠানে ভার্চুয়াল যুক্ত হয়ে অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের ৬৬ হাজার ১৮৯টি ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারকে জমি ও গৃহ প্রদান করা হয় এবং একই সঙ্গে ৩ হাজার ৭১৫ পরিবারকে ব্যারাকে পুনর্বাসন করা হয়। এসব পরিবার শুধু ঘর নয়, সঙ্গে পেয়েছেন জমির মালিকানাও। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুক্ত ছিলেন সারাদেশের ৪৯২ উপজেলার মানুষ- যাদের হাতে দেওয়া হলো মুজিববর্ষের সেরা উপহার স্বপ্নের স্থায়ী ঠিকানা। আগামী মাসে গৃহহীনদের মাঝে আরও প্রায় ১ লাখ গৃহ বিতরণ করা হবে।
অনুষ্ঠানে সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ওপর একটি ভিডিও ডকুমেন্টারি পরিবেশিত হয়। প্রধানমন্ত্রী ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার কাঁঠালতলা গ্রাম, নীলফামারি জেলার সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুর গ্রাম, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সদর উপজেলার উপকারভোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন এবং তাদের হাতে সরকারিভাবে নির্মিত জমিসহ বাড়িগুলো উপহার হিসেবে হস্তান্তর করেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়া ভিডিও কনফারেন্সটি সঞ্চালনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী এই স্বল্প সময়ে সফলভাবে গৃহনির্মাণ এবং কাগজপত্র তৈরির মতো জটিল কাজ ঠিকাদার নিয়োগ না দিয়ে সম্পন্ন করতে পারায় জেলা প্রশাসন এবং তার দপ্তর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সর্বস্তরের কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানান। এই ৪টি স্থানের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সরাসরি মতবিনিময় করলেও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাগণ তাদের এবং স্থানীয় জনগণের ভিডিও বার্তা মূল অনুষ্ঠানে প্রেরণ করেন। নতুন গৃহপ্রবেশ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সারাদেশের উপকারভোগীদের নিয়ে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়। সেইসঙ্গে উপকারভোগী পরিবার ও এই বিশাল কর্মযজ্ঞের সঙ্গে জড়িতদের মিষ্টিমুখও করানো হয়।
‘মুজিববর্ষে একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না’Ñ প্রধানমন্ত্রী ও বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার এমন ঘোষণার ধারাবাহিকতায় ২৩ জানুয়ারি ৬৬ হাজার ১৮৯ বাড়ির মালিকানা দেওয়া হলো গৃহহীন ও ভূমিহীন পরিবারগুলোর হাতে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পছন্দ করা নকশায় নির্মাণ করা হয়েছে প্রতিটি বাড়ি। প্রতিটি বাড়িতে রয়েছে দুটি শয়ন কক্ষ, একটি লম্বা বারান্দা, একটি রান্নাঘর ও একটি টয়লেট। এসব ঘরের জন্য নিশ্চিত করা হয়েছে বিদ্যুৎ ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা। পরিবারগুলোর কর্মসংস্থানের সুযোগ রেখেছে সরকার।
এসব পরিবার শুধু ঘর নয়, সঙ্গে পেয়েছেন জমির মালিকানাও। প্রত্যেককে তার জমি ও ঘরের দলিল নিবন্ধন ও নামজারিও করে দেওয়া হচ্ছে। দেশের ৫০ বছরের ইতিহাসে এর আগে একদিনে এত বেশি মানুষকে সরকারি ঘর হস্তান্তর করা হয়নি। সারাবিশ্বেও এমন একটির নজির নেই, যে অসম্ভবকে সম্ভব করে বাংলাদেশ যে এখন সব পারে, গোটা বিশ্ববাসীকে সেই জানানই দিয়েছে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, ইতোমধ্যে সারাদেশের ৮ লাখ ৮৫ হাজার ৬২২টি ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। এ তালিকা অনুযায়ী গৃহ নির্মাণ ও পরিবার পুনর্বাসনের কার্যক্রম চলবে। পরে প্রধানমন্ত্রী উপকারভোগীদের সঙ্গেও ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে কথা বলেন। অনুষ্ঠানে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী গম্ভীরা গানসহ উপকারভোগীরা গান গেয়ে এবং প্রধানমন্ত্রীর সুস্থ ও দীর্ঘায়ু কামনা করে সেøাগানও দিতে দেখা গেছে।
আবেগজড়িত কণ্ঠে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের প্রতিটা মানুষ যাতে সুন্দরভাবে বাঁচতে পারে, তাদের জীবন যেন উন্নত হয়, বিশ্ব দরবারে আমরা বাঙালি হিসেবে মাথা উঁচু করে সম্মানের সঙ্গে যেন চলতে পারি। এদেশটাকে জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়তে পারি। বাংলাদেশের প্রত্যেকটা মানুষ যেন সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারে- সেটাই আমার একমাত্র লক্ষ্য। মুজিববর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে কোনো মানুষ গৃহহারা থাকবে না। মুজিববর্ষে অনেক কর্মসূচি করতে পারিনি করোনার কারণে। কারণ করোনা একদিকে কিছুটা আশীর্বাদও হয়েছে, কারণ আমরা এই একটি কাজের দিকেই (ভূমিহীনদের ঘর করে দেওয়া) নজর দিতে পেরেছি। গৃহহীন-ভূমিহীন মানুষকে ঘর দিতে পারলাম, এর থেকে বড় উৎসব বাংলাদেশে হতে পারে না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তারপরেও সীমিত আকারে আমরা করে দিচ্ছি এবং একটা ঠিকানা আমি সমস্ত মানুষের জন্য করে দেব। কারণ আমি বিশ্বাস করি, যখন এই মানুষগুলো ঘরে থাকবে তখন আমার বাবা এবং মা যারা সারাটা জীবন এদেশের জন্য ত্যাগ স্বীকার করে গিয়েছেন তাদের আত্মা শান্তি পাবে। তিনি বলেন, আজকে আমি সবচেয়ে খুশি যে এত অল্প সময়ে এত পরিবারকে আমরা একটা ঠিকানা দিতে পেরেছি। এই শীতের মধ্যে তারা থাকতে পারবে। কেননা আমাদের যারা শরণার্থী (রোহিঙ্গা) তাদের জন্যও আমরা ভাসানচরে ঘর করে দিয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, খালেদা জিয়া যখন ক্ষমতায় ছিল ’৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদেরও কক্সবাজার এবং পিরোজপুরে আমরা ফ্ল্যাট করে দিয়েছি, অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্তদেরও ঘর করে দিয়েছি এবং সেখানে শীঘ্রই আরও ১০০টি ভবন তৈরি করা হবে। আজ ১ লাখ ৬৬ হাজার ১৮৯টি ঘর করে দিলাম এবং শীঘ্রই আরও ১ লাখ ঘর আমরা করে দেব। তিনি বলেন, এত দ্রুত সময়ে পৃথিবীর কোনো দেশে কোনো সময় কোনো সরকার একসঙ্গে ৬৬ হাজার ১৮৯টি ঘর করে দিয়েছে কি না আমার জানা নেই।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply