রাষ্ট্রভাষার লড়াইয়ে-বঙ্গবন্ধু

ড. এম আবদুল আলীম : বাঙালি, বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু এক ও অভিন্ন সূত্রে গাঁথা। কালে কালে অধিকারের প্রশ্নে বাঙালি জেগে উঠলেও, সূর্যের তেজে চির-অম্লান স্বাধীনতার বীজ এই জাতির চেতনায় প্রথম উপ্ত হয় রাষ্ট্রভাষার লড়াইয়ের মাধ্যমে। এই লড়াইয়ে সামনের কাতারে থেকে নেতৃত্ব দেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তান আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী হিসেবে বাংলার তরুণ ও যুবসমাজের কাছে পরিচিতি লাভ করলেও, রাষ্ট্রভাষার লড়াই থেকেই পূর্ব বাংলার রাজধানী ঢাকার রাজনীতিতে তার দৃঢ় পদযাত্রা শুরু হয়। প্রায় ২০০ বছরের ইংরেজ শাসনের অবসানের পর ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সৃষ্টি হলে স্বাধীনতার গৌরবে গৌরবান্বিত পূর্ব বাংলার মানুষ আশায় বুক বাঁধে এবং নতুন দিনের স্বপ্নে বিভোর হয়। তারা ভেবেছিল এবার শোষণ-বঞ্চনামুক্ত একটি সুন্দর জীবন পাবে, পাবে স্বাধীনতার সুফল। কিন্তু বিধি বাম! তাদের সে আশা অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়। তাদের স্বপ্নের ঘটে অপমৃত্যু। কুচক্রী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী শুরু থেকেই সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক- সকল দিক থেকেই পূর্ব বাংলার মানুষকে পিছিয়ে রাখার অপ্রয়াস চালায়। বাঙালির আত্মজাগরণ ও স্বকীয় সত্তাকে চিরতরে স্তব্ধ করার জন্য পাকিস্তান সৃষ্টির শুরু থেকেই পরিকল্পিতভাবে আঘাত হানা হয় বাঙালির ভাষা, সাহিত্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ওপর। এর প্রতিবাদে শুরু হয় রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন, লেখনীর মাধ্যমে যার সূত্রপাত করেন সচেতন বুদ্ধিজীবীগণ। ঘটনার ধারাবাহিকতায় ১৯৪৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদে ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের ভাষাবিষয়ক সংশোধনী প্রস্তাব নাকচ করা, পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মুহম্মদ আলী জিন্নাহ কর্তৃক রেসকোর্স ময়দানের সংবর্ধনা-সভা ও কার্জন হলের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা দেওয়া এবং ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন কর্তৃক তার উক্তির পুনরাবৃত্তির ফলে রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে। এরপর আসে ইতিহাসের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। রাষ্ট্রভাষা বাংলার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সালাম, বরকত, রফিক, জব্বার, শফিউর, অহিউল্লাহ, আউয়ালসহ বাংলার অনেক দামাল সন্তান জীবন-উৎসর্গ করেন। ভাষা শহিদদের স্মৃতি অমøান করে রাখতে নির্মাণ করা হয় শহিদ মিনার। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে একুশের চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে পূর্ববঙ্গের মানুষ ব্যালট বিপ্লবের মাধ্যমে মুসলিম লীগের কবর রচনা করে। অবশেষে ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

রাষ্ট্রভাষার লড়াইয়ের প্রথম পর্বে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর বঙ্গবন্ধু স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন এবং ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে। একজন সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সঙ্গীদের নিয়ে ‘কর্মী শিবির’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নবপ্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে নতুন ধারার কল্যাণধর্মী রাজনীতি গড়ে তোলার কাজ শুরু করেন। তিনি প্রগতিশীল ও উদার রাজনৈতিক বলয়ের বন্ধু-বান্ধব ও সহযোদ্ধাদের নিয়ে গড়ে তোলেন গণতান্ত্রিক যুবলীগ, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রভৃতি সংগঠন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করলে তিনি প্রথম থেকেই প্রতিবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। ভাষা-আন্দোলন বেগবান করার লক্ষ্যে ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলে আয়োজিত সর্বদলীয় সভায় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখেন। ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের ধর্মঘটের পক্ষে জনমত গঠনের লক্ষ্যে তিনি ফরিদপুর, যশোর, দৌলতপুর, খুলনা ও বরিশালে ছাত্রসভা করেন। এরপর ঢাকায় ফিরে ১০ মার্চ রাতে ফজলুল হক হলে এক সভায় ১১ মার্চের কর্মসূচিতে কে, কোথায়, কী দায়িত্ব পালন করবে- তা নির্ধারণ করেন। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে :

“Secret information was received on 12.3.48 that the subject (Bangabandhu) along with others took part in the discussions held at Fazlul Haq Hall on 10.3.48 and gave opinion in favour of violating section 144 cr.p.c. on 11.3.48. On this decision, small batches of Hindu and Muslim students were sent out on 11.3.48 to picket the G.P.O., the secretariat and other important Govt. officers. The subject (Bangabandhu) was arrested on 11.3.48 for violating the orders…. He took very active part in the agitation for adopting Bengali as the State language of Pakistan, and made propoganda at Dacca for general strike on 11.3.48. on this issue. On 11.3.48 the subject was arrested fo violating orders under section 144 Cr. P.C.

রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১১ মার্চ সকালে কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে তিনি জেনারেল পোস্ট অফিস ও ইডেন বিল্ডিংয়ের সামনে পিকেটিং করেন। পিকেটিং করার সময় পুলিশি হামলার শিকার ও গ্রেফতার হন। সেদিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেন : “১১ মার্চ ভোরবেলা শত শত ছাত্রকর্মী ইডেন বিল্ডিং, জেনারেল পোস্ট অফিস ও অন্যান্য জায়গায় পিকেটিং শুরু করলো।… সকাল নয়টায় ইডেন বিল্ডিংয়ের সামনের দরজায় লাঠিচার্জ হল। খালেক নেওয়াজ খান, বখতিয়ার, শহর ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এম. এ. ওয়াদুদ গুরুতররূপে আহত হল।… আমাদের উপর কিছু উত্তম মধ্যম পড়ল এবং ধরে নিয়ে জিপে তুলল।… আমাদের প্রায় সত্তর-পঁচাত্তরজনকে বেঁধে নিয়ে জেলে পাঠিয়ে দিল সন্ধ্যার সময়।” ‘কারাগারের রোজনামচা’য় তিনি এ বিষয়ে লিখেছেন : “প্রথম ভাষা আন্দোলন শুরু হয় ১১ মার্চ ১৯৪৮ সালে। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ (এখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ) ও তমদ্দুন মজলিসের নেতৃত্বে। ঐদিন ১০টায় আমি, জনাব শামসুল হক সাহেবসহ প্রায় ৭৫ জন ছাত্র গ্রেফতার হই এবং আবদুল ওয়াদুদ-সহ অনেকেই ভীষণভাবে আহত হয়ে গ্রেফতার হয়।”
১১ মার্চের ধর্মঘটে পুলিশের লাঠিচার্জ ও নির্বিচারে গ্রেফতারের প্রতিবাদে আন্দোলন আরও প্রবল রূপ ধারণ করে। এই আন্দোলন প্রশমন এবং পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর পূর্ববঙ্গ সফর শান্তিপূর্ণভাবে করার লক্ষ্যে সরকার আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ৮-দফা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির শর্তগুলো যথাযথ হয়েছে কি না তা কারাগার থেকেই দেখে দেন বঙ্গবন্ধুসহ অন্য নেতৃবৃন্দ। এদিকে “শেখ মুজিবুর রহমানের গ্রেফতারের প্রতিবাদে ১৬-৩-৪৮-এ গোপালগঞ্জে সর্বাত্মক হরতাল ডাকা হয়। বিকেলে এস এন একাডেমি এবং এম এন ইনষ্টিটিউটের ৪০০ ছাত্র শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’, ‘নাজিমুদ্দীন নিপাত যাক’, ‘মুজিবকে মুক্তি দাও’, ‘অন্য গ্রেফতারকারীদের মুক্তি দাও’ ইত্যাদি সেøাগান দেয়।” তবে তার আগেই ১৫ মার্চ ১৯৪৮, তিনি মুক্তিলাভ করেন। ১৯৪৮ সালের ১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় এক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন শেখ মুজিবুর রহমান। এ প্রসঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদ লিখেছেন : “বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বেলা দেড়টায় সভা শুরু হলো। মুজিবুর রহমান সভাপতিত্ব করলেন। সংশোধনীগুলি গৃহীত হলো এবং অলি আহাদের মাধ্যমে তা প্রধানমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হলো।” ঐদিন সভাশেষে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদ ঘেরাও করেন। এতে পুলিশ বাধা দেয় এবং হামলা চালিয়ে শওকত আলীসহ অনেককে আহত করে। এ সময় আন্দোলনের তীব্রতা দেখে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন পেছন দরজা দিয়ে পালিয়ে যান। এ প্রসঙ্গে আইয়ুব খান তার ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টার’ গ্রন্থে লিখেছেন :

“আমি পরিষদের মধ্যে গেলাম এবং উজিরে আলার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম। আমি তাঁকে বললাম যে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে এবং ছেলেরা ইতিমধ্যে আমাদের লোকদের খুব কাছে এসে গেছে। ‘আমি কি করবো বলুন?’ তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন।… আমি পীরজাদাকে উজিরে আলার গাড়ী পরিষদ গৃহের পেছনের দিকে আনতে বললাম এবং আমরা দুজনে সবার চোখে ধুলো দিয়ে উজিরে আলাকে বাবুর্চিখানার মধ্য দিয়ে পার করে দিয়ে এলাম। এই অসাধারণ কার্যটি সুসম্পন্ন করার পর আমি বেরিয়ে এলাম এবং ছেলেদেরকে বললাম, ‘পাখী উড়ে গেছে’।”

১৭ মার্চ সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট পালিত হয়। ঐদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে নাইমউদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে এক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ প্রমুখ বক্তৃতা করেন। সন্ধ্যার পর ফজলুল হক হলে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর সভা অনুষ্ঠিত হয়, এই সভায় শেখ মুজিবুর রহমান যোগদান করেন।
১৯৪৮ সালের ১৯ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ পূর্ববঙ্গ সফরে আসেন। ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঢাকার নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সংবর্ধনার জবাবে তিনি বিভিন্ন প্রসঙ্গে দীর্ঘ বক্তৃতা দেন এবং রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে বলেন : ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোন ভাষা নয়।’ এ বক্তব্যের প্রতিবাদ করেন বঙ্গবন্ধুসহ উপস্থিত ছাত্র-জনতা। এ প্রসঙ্গে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে লিখেছেন : “জিন্নাহ পূর্ব পাকিস্তানে এসে ঘোড় দৌড় মাঠে বিরাট সভায় ঘোষণা করলেন, ‘উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে।’ আমরা প্রায় চার-পাঁচ শত ছাত্র এক জায়গায় ছিলাম সেই সভায়। অনেকে হাত তুলে দাঁড়িয়ে জানিয়ে দিল, ‘মানি না’।” এরপর ভাষা-আন্দোলন স্তিমিত হয়ে এলেও ভাষার প্রশ্নে চলতে থাকে বিভিন্ন আলোচনা-পর্যালোচনা। ঐ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলের সামনে অনুষ্ঠিত এক সভায় কতিপয় ছাত্রনেতা উর্দুপ্রীতিমূলক বক্তৃতা দিলে শেখ মুজিবুর রহমান এর প্রতিবাদ জানান। ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর মৃত্যু হলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন লিয়াকত আলী খান। প্রধানমন্ত্রী হয়েই তিনি পূর্ববঙ্গ সফরে আসেন। তার সফরকে কেন্দ্র করে “১৭ নভেম্বর সন্ধ্যা সাতটায় আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একটি বৈঠক বসে। আজিজ আহমদ, আবুল কাসেম, শেখ মুজিবুর রহমান, কামরুদ্দীন আহমদ, আব্দুল মান্নান, আনসার এবং তাজউদ্দীন আহমদ এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।” এতে ছাত্রলীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বাংলা ভাষার দাবির পক্ষে তার দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান।
রাষ্ট্রভাষা-আন্দোলন ও বিভিন্ন ছাত্র-আন্দোলনের সময় ছাত্রদের ওপর জুলুম-নির্যাতনের প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধুকে আহ্বায়ক করে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের উদ্যোগে গঠন করা হয় ‘জুলুম প্রতিরোধ কমিটি’। ১৯৪৯ সালের ৮ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের ‘জুলুম প্রতিরোধ’ কমিটির উদ্যোগে হরতাল, মিছিল ও ছাত্র-সমাবেশ আয়োজন করা হয়। এ কর্মসূচি উপলক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রলীগের আহ্বায়ক নাইমউদ্দীন আহমদের সভাপতিত্বে একটি সাধারণ ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় শেখ মুজিবুর রহমান বক্তৃতা করেন। ১৯৪৯ সালের ১১ মার্চেও ‘প্রতিবাদ দিবস’ পালন করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এ কর্মসূচি পালনের অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা। আর সেজন্য তাকে কারাবরণ করতে হয়। ভাষা-আন্দোলনের প্রথম পর্বে শেখ মুজিবুর রহমানের ভূমিকা ছিল অতি উজ্জ্বল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র ও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা ও সাংগঠনিক কমিটির কেন্দ্রীয় নেতা হিসেবে তিনি এই আন্দোলনে নেতৃত্বস্থানীয় ভূমিকা পালন করেন। বস্তুত, ১৯৪৮ সালের ভাষা-আন্দোলনে নেতৃত্বদানের মাধ্যমে তিনি ঢাকার ছাত্র-আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হন এবং নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের শক্ত ভিত নির্মাণ করেন।

বায়ান্নর রাষ্ট্রভাষার লড়াইয়ের চূড়ান্ত পর্বে বঙ্গবন্ধুর অবদান
বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনের সময় বঙ্গবন্ধু নিরাপত্তা-বন্দি হিসেবে আটক ছিলেন। “জেল থেকেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির সাথে যোগাযোগ রাখতেন এবং তাদের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে নির্দেশনা দিতেন।” মুস্তাফা নূরউল ইসলাম বলেছেন : “১৯৫২ সালের একুশের আন্দোলনে তিনি জেলে বন্দি ছিলেন। কারাগারে থেকে নানাভাবে তিনি আন্দোলনের ব্যাপারে নির্দেশনা দিতেন। ফেব্রুয়ারি মাসের ঐ সময়টায় তাঁর স্বাস্থ্য খুব ভেঙে পড়ে, তাই তাঁকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। তখন মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় একই ভবনে অবস্থিত ছিল। বঙ্গবন্ধু সে সময় ছাত্রনেতাদের সঙ্গে গভীর রাতে রাজনৈতিক বিষয় ও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি নিয়ে আলোচনা করতেন।” পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯৫১ সালের ৩০ আগস্ট থেকে ১৯৫২ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে বেশ কয়েকবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ঐ সময় আইনজীবী, রাজনীতিবিদ, ছাত্রনেতা, চিকিৎসক, গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন, আত্মীয়-স্বজন অনেকেই তার সঙ্গে দেখা করেন। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ৩০ নভেম্বর ১৯৫১ তারিখে সকাল ৯.১৫টায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক খালেক নেওয়াজ খান। তিনি ৯.১৫টা থেকে ৯.৪৫টা পর্যন্ত তার সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় আবদুস সালাম খান নামক এক গোয়েন্দা সদস্য একটু দূরে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকলেও, তারা কি বিষয়ে আলাপ করেন, তা শুনতে পাননি বলে ৩০ নভেম্বর, ১৯৫১ তারিখের গোপন গোয়েন্দা রিপোর্টে উল্লেখ করেছেন। ১৯৫২ সালের ২৫ জানুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কেবিনে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সহ-সভাপতি আতাউর রহমান খান, আজিজ আহমদ; পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক অলি আহাদ; পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শামসুল হক চৌধুরী ও সহ-সভাপতি কাজী গোলাম মাহবুুব। তারা সমসাময়িক রাজনৈতিক বিষয়ে নানা আলাপ করেন। এভাবে হাসপাতালের কেবিন থেকে নিরাপত্তা-বন্দি শেখ মুজিবুর রহমান “পুলিশের নজরকে ফাঁকি দিয়ে তার রাজনৈতিক সহকর্মীদের সঙ্গে দেশের সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি আলোচনা এবং ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গে পরামর্শ প্রদান” করেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে, সেখানে বসেই তিনি রাজনৈতিক কর্মকা- চালাতে থাকেন।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন ঢাকা সফরে এসে ১৯৫২ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর উক্তি পুনর্ব্যক্ত করে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিলে পূর্ববঙ্গের ছাত্র-জনতা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা-বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ছাত্রনেতাদের আলোচনা হয়। তারা সিদ্ধান্ত নেন ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন এবং একুশে ফেব্রুয়ারি ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ পালনের। কেবল তাই নয়, ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর আহ্বায়ক যাতে ছাত্রলীগ থেকেই করা হয়, সে-বিষয়েও শেখ মুজিবুর রহমান নির্দেশনা দেন। এ প্রসঙ্গে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তিনি লিখেছেন : “আমি হাসপাতালে আছি। সন্ধ্যায় মোহাম্মদ তোয়াহা ও অলি আহাদ দেখা করতে আসে। আমার কেবিনের একটা জানালা ছিল ওয়ার্ডের দিকে। আমি ওদের রাত একটার পরে আসতে বললাম। আরও বললাম, খালেক নেওয়াজ, কাজী গোলাম মাহবুব আরও কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকে খবর দিতে। দরজার বাইরে আইবিরা পাহারা দিত। রাতে অনেকে ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন পিছনের বারান্দায় ওরা পাঁচ-সাতজন এসেছে।… বারান্দায় বসে আলাপ হল এবং আমি বললাম, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে। আওয়ামী লীগ নেতাদেরও খবর দিয়েছি। ছাত্রলীগই তখন ছাত্রদের মধ্যে একমাত্র জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান। ছাত্রলীগ নেতারা রাজি হল। অলি আহাদ ও তোয়াহা বলল, যুবলীগও রাজি হবে।… সেখানেই ঠিক হল, আগামী একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে এবং সভা করে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে হবে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কনভেনর করতে হবে। ফেব্রুয়ারি থেকেই জনমত গঠন করতে হবে।” ‘কারাগারের রোজনামচা’য় তিনি আরও স্পষ্ট করে লিখেছেন : “জানুয়ারি মাসে আমাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসার জন্য ভর্তি করা হয়।… আমি তখন বন্দি অবস্থায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। রাত্রের অন্ধকারে মেডিকেল কলেজের ছাত্রদের সহায়তায় নেতৃবৃন্দের সাথে পরামর্শ করে ২১শে ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদের দিন স্থির করা হয়। আমি ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন শুরু করব মুক্তির জন্য। কাজী গোলাম মাহবুব, অলি আহাদ, মোল্লা জালালউদ্দিন, মোহাম্মদ তোয়াহা, নাঈমুদ্দীন, খালেক নেওয়াজ, আজিজ আহম্মদ, আবদুল ওয়াদুদ ও আরো অনেকে গোপনে গভীর রাতে আমার সঙ্গে দেখা করত।” ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠন এবং পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি কাজী গোলাম মাহবুবের আহ্বায়ক নির্বাচিত হওয়া, সভায় গৃহীত প্রস্তাবে শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তির শর্ত যুক্ত করা প্রভৃতি বিষয় পর্যালোচনা করলে এ বিবরণের বস্তুনিষ্ঠতা খুঁজে পাওয়া যায়। তাছাড়া ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’-এ ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রাধান্য থেকেও এটা অনুধাবন করা যায়।
তখনকার গোয়েন্দা প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন ভাষাসংগ্রামীর সাক্ষাৎকার ও স্মৃতিচারণ থেকে জানা যায়, “ছাত্রনেতারা গোপনে তাঁর (বঙ্গবন্ধুর) সাথে দেখা করতেন। তাঁর মুক্তির জন্য রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ বিবৃতি দেন। নাইমউদ্দীন, খালেক নেওয়াজ, অলি আহাদ ও মোহাম্মদ তোয়াহা দেখা করেন এবং তাঁরা ভাষা-আন্দোলন বিষয়ে তাঁর সাথে পরামর্শ করতেন। সরকার তাঁকে হাসপাতালে বসে রাজনীতি করার অপরাধে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে এবং তাদের সুপারিশে তাঁকে অনেকটা সুস্থ বলে ঘোষণা দিয়ে আবার কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে থাকাকালে বঙ্গবন্ধু ও মহিউদ্দিন আহমেদ চিঠি দিয়ে সরকারকে জানান, ১৫ ফেব্রুয়ারি মুক্তি না দিলে ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে তাঁরা অনশন ধর্মঘট শুরু করবেন।” এরপর তারা ১৯৫২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন ধর্মঘট শুরু করলে ভাষা-আন্দোলনে কর্মসূচিতে আসে উৎসাহ ও প্রেরণা। তাদের মুক্তির দাবি যুক্ত হয়ে ভাষা-আন্দোলনের কর্মসূচি ভিন্নমাত্রা পায়। ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে এক ছাত্রসভা হয়। ঐদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে শেখ মুজিব ও মহিউদ্দিনসহ সকল রাজবন্দির মুক্তি দাবি করে পোস্টারও দেওয়া হয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ‘মানবতার নামে’ শীর্ষক এক পৃথক বিবৃতিতে শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমদের মুক্তির দাবি জানান।

১৯৫২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে অত্যন্ত অসুস্থ শরীরেও বঙ্গবন্ধু গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জ থেকেই একুশে ফেব্রুয়ারির গুলিবর্ষণে প্রাণহানির ঘটনায় মর্মাহত হয়ে বিবৃতি পাঠান এবং শহিদদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করেন। এরপর কিছুটা সুস্থ হয়ে ঢাকায় ফিরে এসে নিরাপত্তা-বন্দিদের মুক্তির দাবিতে বিবৃতি দেন। ১৯৫২ সালের ৩১শে মার্চ এ পত্রিকা ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ শিরোনামে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দীর্ঘ কারাবাসের পর তার মুক্তিলাভ এবং ঢাকায় ছাত্রদের ওপর গুলিচালনায় তার মর্মাহত হওয়া এবং শহিদদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপনের বিষয়টি প্রকাশিত হয়েছে। সাপ্তাহিক ইত্তেফাক-এর ঐ প্রতিবেদনটি ছিল নিম্নরূপ :

“গত ২৮শে ফেব্রুয়ারী মুক্তি পাইয়া জনাব শেখ মুজিবুর রহমান তার গ্রামের বাড়ীতে অবস্থান করিতেছেন। তাহার স্বাস্থ্যের অবস্থা এখনও উদ্বেগজনক। ঢাকায় ছাত্রদের উপর গুলি চালনা ও ধরপাকড়ের খবরে তিনি অতিশয় মর্মাহত হইয়াছেন। তিনি শহীদদের শোকসন্তপ্ত পরিবার পরিজনকে সমবেদনা জ্ঞাপন করিয়াছেন। জনাব রহমান শীঘ্রই চিকিৎসার জন্য ঢাকা আসিবেন। আড়াই বৎসর কারাবাসের ফলে তাহার স্বাস্থ্যের অবস্থা একদম ভাঙ্গিয়া গিয়াছে।”

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়ে তিনি সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেন এবং বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানান। ১৯৫২ সালের ২৭ এপ্রিল ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’-এর উদ্যোগে এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে বঙ্গবন্ধুসহ অন্য নেতৃবৃন্দ বক্তৃতা করেন। ভাষা-আন্দোলনের সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর বিবৃতি নিয়ে যে ধূম্রজাল সৃষ্টি করা হয়, তা পরিষ্কার করতে বঙ্গবন্ধু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৫২ সালের জুন মাসে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানে গিয়ে ভাষা-আন্দোলনের পক্ষে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সমর্থন আদায় করেন এবং বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তাকে দিয়ে একটি বিবৃতি প্রদান করান। শুধু তাই নয়, করাচিতে গিয়ে তিনি ভাষা-আন্দোলনের বন্দিদের মুক্তির দাবিতে প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের কাছে স্মারকলিপি দেন। এছাড়া সংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে ভাষা-আন্দোলনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন, ভাষা-আন্দোলন নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানিদের মধ্যে যে বিভ্রান্তি ছিল তা দূর করেন।
১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বঙ্গবন্ধু শান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য চীন সফরে যান। সেখানে গিয়ে তিনি ‘মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করেন।’ চীন সফরের সেই স্মৃতি স্মরণ করে তিনি রচনা করেছেন ‘আমার দেখা নয়াচীন’ গ্রন্থ। ১৯৫৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি বিকেলে আরমানিটোলা মাঠে আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে আয়োজিত জনসভায় বন্দিদের মুক্তি ও বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তিনি বক্তৃতা করেন। ঐ সময় সরকার আরবি হরফে বাংলা চালু ও উর্দু শিক্ষার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করলে তিনি তার বিরুদ্ধে জনমত গড়তে ভূমিকা রাখেন। পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ১৯৫৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি “ঢাকার এক জনসভায় তিনি ঘোষণা করেন, এ দেশ জুড়ে উর্দু বয়কট করার জন্য আন্দোলন শুরু করা হবে।” এ বছর ৫ ফেব্রুয়ারি বগুড়ার একটি জনসভায়ও তিনি একই সুরে কথা বলেন। এ প্রসঙ্গে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে : “বক্তৃতার সময় শেখ মুজিব বলেন, বাংলাকে পাকিস্তানের একটি রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। এখানকার স্কুল-কলেজে নূরুল আমীন সরকার উর্দু চালু করেছেন, কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তান তার স্কুল-কলেজে বাংলা চালু করেনি। তারা যদি বাংলাকে না মেনে নেয়, তাহলে কয়েকমাস পর আমরাও উর্দুকে বয়কট করব।”
ভাষা-আন্দোলনের বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ১৯৫৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পালনে তিনি বিশেষ অবদান রাখেন। তিনি বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানান। ঢাকা প্রকাশ-এ বলা হয় : “আওয়ামী লীগের অস্থায়ী সেক্রেটারী জনাব মুজিবুর রহমান সভায় বক্তৃতা প্রসঙ্গে বলেন যে, গত বৎসর ঠিক এমন দিনে পূর্ব্ব পাকিস্তানের সাড়ে চার কোটি অধিবাসীর ভাষা বাংলাকে আজাদ পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করিবার দাবীতে ঢাকা শহরে ছাত্র ও জনসাধারণ নির্ভীকভাবে পুলিশের গুলিতে প্রাণ দিয়াছে। তাহারা সেই দিন যে নতুন ইতিহাস রচনা করিয়াছে, সমগ্র জাতি তাহা চিরদিন শ্রদ্ধার সহিত স্মরণ করিবে। ২১ ফেব্রুয়ারীকে তিনি ‘জাতীয় কারবালা দিবস’ বলিয়া অভিহিত করেন। তিনি বলেন যে, আজ পাকিস্তান সরকারের সম্মুখে শুধুমাত্র দুইটি পথ খোলা রহিয়াছে। হয় তাঁহারা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বলিয়া মানিয়া লইবেন, নতুবা গদি ছাড়িবেন। তিনি সকল রাজবন্দীর আশু মুক্তি এবং নিরাপত্তা আইন প্রত্যাহার করিবার জন্যও দাবী জানান।”
১৯৫৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পালনে সরকার নানাভাবে বাধা দিলেও বঙ্গবন্ধু, মওলানা ভাসানী, আতাউর রহমান খানসহ অন্যান্য রাজনৈতিক নেতার সক্রিয়তায় সরকারের এই হীন চেষ্টা ব্যর্থ হয়। এ বছর ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু, মওলানা ভাসানী, মহিউদ্দীন আহমদ, তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখ নেতা প্রভাতফেরিতে অংশগ্রহণ করেন। তারা শহিদ মিনারের পাদদেশে সমবেত হয়ে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ বছর একুশে ফেব্রুয়ারি আরও একটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, তা হলো ১৯৫৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পূর্ব বাংলার মানুষের ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবোধের জাগরণ। আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শেখ মুজিব বাংলার মানুষের দ্বারে দ্বারে গিয়ে একুশের চেতনার স্মারক যুক্তফন্টের ২১-দফা কর্মসূচির পক্ষে ভোট প্রার্থনা করেন।
১৯৫৬ সালের ১৭ জানুয়ারি আইন পরিষদের অধিবেশনে তিনি আইন পরিষদের দৈনন্দিন কর্মসূচি বাংলায় মুদ্রণের দাবি করেন। একই বছর ৭ ফেব্রুয়ারি আইন পরিষদের অধিবেশনে খসড়া শাসনতন্ত্রে বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা করার দাবি তোলেন এবং বলেন, রাষ্ট্রীয় ভাষার প্রশ্নে কোনো ধোঁকাবাজি করা চলবে না। ১৯৫৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারির অধিবেশনে তিনি রাষ্ট্রভাষা ও আঞ্চলিক ভাষা-সংক্রান্ত বিষয়ে স্পষ্ট অভিমত ব্যক্ত করেন। পরবর্তীকালে স্বাধিকার-সংগ্রামের উত্তাল দিনগুলোতে এবং স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি একুশের চেতনা বিস্তার ও সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনে অবদান রাখেন। পাকিস্তানের কারাগারে দুঃসহ জীবনযাপন করে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। ‘রেসকোর্সের হর্ষোৎফুল্ল বিশাল জনসমুদ্রের সম্মুখে’ তিনি আবেগদীপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করেন : “আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান…।… বাঙালি আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান।” রাষ্ট্রের কর্ণধার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেই তিনি ১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি থেকে বাংলা ভাষায় গেজেট প্রকাশ শুরু করেন। ১৯৭২ সালের ৪ জানুয়ারি গণপরিষদে গৃহীত হয় ‘সাড়ে সাত কোটি বাঙালীর আশা-আকাংক্ষার প্রতীক’ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান। ঐ সংবিধানের ৩নং অনুচ্ছেদে বলা হয় : “প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা হবে বাংলা।” স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম শহিদ দিবস পালনের জন্য তিনি ২১ ফেব্রুয়ারির প্রথম প্রহরে তিনি শহিদ মিনারে উপস্থিত হন এবং শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। প্রথম শহিদ দিবস পালনকালে তার ভাষণে বলেন : “আমরা শহিদ দিবস পালন করছি। লক্ষ লক্ষ ভাই-বোনের রক্তের বিনিময়ে আজ আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। খেয়াল রাখবেন এই স্বাধীনতা যেন বৃথা না যায়।… সেইদিন এই শহিদের আত্মা শান্তি পাবে, যেদিন বাংলার মানুষ পেট ভরে ভাত খাবে, শান্তিতে বাস করবে, বেকার সমস্যা দূর হবে, ছাত্ররা লেখাপড়ায় সুযোগ পাবে। সে জন্য আজ বলছি আমি, শহীদ স্মৃতি অমর হউক।”
১৯৭২ সালের ২৫ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি অফিস-আদালতেÑ সর্বস্তরে বাংলা ভাষা ব্যবহারের জন্য নির্দেশ জারি করেন। দাপ্তরিক কাজে বাংলা ভাষা ব্যবহারের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকার পরেও অনেক সরকারি কর্মকর্তা ইংরেজিতে নথিপত্র লেখায় তিনি এই নির্দেশ প্রচার করেন। দাপ্তরিক কাজে ব্যাপকভাবে বাংলা ভাষা প্রচলনের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালে ‘সরকারি পর্যায়ে বাংলা প্রচলন কমিটি’ গঠন করেন। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ২৯তম অধিবেশনে বাংলা ভাষায় প্রথম বক্তৃতা প্রদান করার গৌরব অর্জন করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার পেয়ে বাংলা ভাষাকে যেভাবে বিশ্বদরবারে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেছিলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতিসংঘে বাংলা ভাষায় ভাষণ দিয়ে একইভাবে এই ভাষাকে গৌরব দান করেন। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনা লিখেছেন : “বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ বাংলা ভাষার সাহিত্যের জন্য নোবেল পুরস্কার লাভ করিয়া বাংলা ভাষাকে গৌরবান্বিত করিয়াছেন, আর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার পর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিয়া বাংলা ভাষা ও বাঙালি জাতিকে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেন।” সর্বস্তরে বাংলা ভাষা প্রচলনের জন্য রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান বাস্তবসম্মত নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। দাপ্তরিক কাজে বাংলা ভাষা প্রচলনের জন্য তিনি ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ এক সরকারি আদেশ জারি করেন।
এভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভাষা-আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর অবদান অসামান্য। মূলত, ভাষা-আন্দোলনের মাধ্যমেই ঢাকার রাজনীতিতে তার অবস্থান সুদৃঢ় হয়। এবং এই আন্দোলনের মাধ্যমে উপ্ত বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা লালন, বিকাশ ও বাস্তবায়নে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সর্বোপরি, ভাষা-আন্দোলনের চেতনার চূড়ান্ত ফসল ‘বাংলাদেশ’ নামক রাষ্ট্রের স্থপতি হিসেবে তিনি ইতিহাসে মহিমান্বিত হয়ে আছেন। এক কথায় রাষ্ট্রভাষার লড়াইয়ে বঙ্গবন্ধুর যে অবদান, সে জন্যে ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে থাকবেন।

লেখক : গবেষক ও অধ্যাপক, পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply