রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু

গোলাম কুদ্দুছ : রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা’র প্রতিষ্ঠার লড়াই দীর্ঘদিনের। উর্দু, হিন্দি, ফার্সি, ইংরেজি, সংস্কৃত ভাষা এবং পশ্চাদপদ চিন্তা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে শত শত বছর ধরে লড়াই করে কবি, সাহিত্যিক, লেখক, সংস্কৃতিজন এবং প্রগতিশীল মানুষ বাংলাকে ভাষা হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করায় বিরাট ভূমিকা পালন করেছেন। কখনও কখনও বাংলাভাষা তৎকালীন রাজন্যবর্গের পৃষ্ঠপোষকতাও পেয়েছে।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ বিভক্ত হয়ে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত হয়ে গেলে এ নবপ্রতিষ্ঠিত দেশের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে নানা আলোচনা ও বিতর্কের সূত্রপাত হয়। ১৯৪৭ সালের ১৯ মে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকার সংবাদ থেকে জানা যায় যে, হায়দারাবাদে ‘মজলিস-এ ইত্তেহাদুল মোছলেমিন’-এর বার্ষিক অধিবেশন উপলক্ষে আয়োজিত এক উর্দু সম্মেলনে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ওয়ার্কিং কমিটির প্রভাবশালী নেতা চৌধুরী খালেকুজ্জামান ভবিষ্যৎ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা উর্দু করার পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন। ১৯৪৭ সালের ২৪ জুলাই আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ ও পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ‘উর্দু’ হওয়া উচিত বলে একই মত প্রদান করেন।
এ সময় বাঙালি মুসলমানদের মধ্যেও রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দেখা দেয়। ভবিষ্যৎ পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোর যে প্রস্তাবনা আগেই করা হয়েছে তাতে বাংলাভাষী নাগরিকরাই যে সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে তা সহজেই অনুমিত হয়। আর সে-কারণেই রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে দাবি এবং যুক্তি উচ্চারিত হতে শুরু করে।
বিচ্ছিন্নভাবে এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনেকে বাংলা ভাষার পক্ষে কথা বললেও সর্বপ্রথম এ বিষয়ে সাহসী উচ্চারণ করেন আবদুল হক। তিনি তখন কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘সওগাত’ ও ‘শিশু সওগাত’-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক। সাপ্তাহিক ‘বেগম’ ও তার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত ছিল। এ সময় আবদুল হক ভবিষ্যৎ পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার পক্ষে নানা যুক্তি উপস্থাপন করে ৪টি প্রবন্ধ লেখেন। প্রথম প্রবন্ধের নাম ‘বাংলা ভাষা বিষয়ক প্রস্তাব’। এ প্রবন্ধটি দু-কিস্তিতে দৈনিক ইত্তেহাদ-এ প্রকাশিত হয় ১৯৪৭ সালের ২২ ও ২৯ জুন। দ্বিতীয় প্রবন্ধ ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ৩০ জুন ১৯৪৭। ২৭ জুলাই দৈনিক ইত্তেহাদে তৃতীয় প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়Ñ যার শিরোনাম ছিল ‘উর্দু রাষ্ট্রভাষা হলে’। এছাড়াও আবদুল হক ছদ্মনাম ব্যবহার করে মহিলাদের জনপ্রিয় ‘বেগম’ পত্রিকায় রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে আরেকটি প্রবন্ধ লেখেন। ১৯৪৭ সালের ৩ আগস্ট মিসেস এম. এ. হক নামে ‘বেগম’ পত্রিকায় লেখা তার প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’।
এ সময় আবদুল হক ছাড়াও ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, মাহবুব জামাল জাহেদী, একেএম নূরুল হক, মুহাম্মদ এনামুল হক, কাজী মোতাহার হোসেন, মো. ওয়াজেদ আলী, ফররুখ আহমদ, আবুল মনসুর আহমদ, মোহছেনা ইসলাম প্রমুখের রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে নানা যুক্তিপূর্ণ লেখা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
ভাষাবিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর বক্তব্য এ প্রসঙ্গে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ‘দৈনিক আজাদ পত্রিকা’য় ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সমস্যা’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে তিনি বলেনÑ

“পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাই জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলের সাহিত্যিক ভাষা। পাকিস্তান ডোমিনিয়নের অধিকাংশ অধিবাসীর মাতৃভাষা বাংলা এবং বাংলা সাহিত্য সমৃদ্ধশালী। সুতরাং পাকিস্তানে ভাষার ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা শ্রেষ্ঠ।”
[সূত্র : দৈনিক আজাদ, ১২ শ্রাবণ ১৩৫৪]

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত
সদ্য স্বাধীন পাকিস্তান তখনও সংবিধান প্রণীত হয়নি- কাজেই রাষ্ট্রভাষার বিষয়টিও অমীমাংসিত। কিন্তু রাষ্ট্র এবং সমাজ তো চলমান প্রক্রিয়া। কোনো-না-কোনো ভাষাতে কার্যক্রম চালাতে হয়। বিপত্তিটা এখানেই। তখন সমগ্র পাকিস্তানের প্রায় ৬৬ শতাংশ নাগরিকের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। অথচ রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম শুরু হলো বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দু এবং ইংরেজি ভাষায়। জনগুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ের টিকিট, মানি অর্ডার, পোস্টকার্ড, মুদ্রা- সবই উর্দু এবং ইংরেজিতে। নৌবাহিনীসহ বিভিন্ন সরকারি নিয়োগ পরীক্ষায় নেই বাংলা ভাষা। ১৯৪৭ সালের শেষ দিকে পাকিস্তানের বিভিন্ন সরকারি পদে জরুরি নিয়োগের জন্য ‘উচ্চতর সিভিল সার্ভিস’ পরীক্ষার জন্য ৯টি ভাষা নির্দিষ্ট করে আগাম একটি সার্কুলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রেরণ করা হয়। পরীক্ষার জন্য ইংরেজি, উর্দু, হিন্দি, জার্মান, ফ্রেন্স, ল্যাটিন- এমনকি সংস্কৃত ভাষা থাকলেও বাংলাকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে। বিস্মিত হতবাক সচেতন বাঙালি সমাজ। আশাহত এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ল ছাত্র, যুবক এবং প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে যুক্ত মানুষেরা। এমনি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবি সুপ্রতিষ্ঠিত করা এবং বাঙালি তথা পূর্ব বাংলার স্বার্থ সংরক্ষণে সচেতন মহল থেকে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এ উদ্যোগগুলো পরবর্তীকালে বাঙালির বৃহত্তর জাগরণ এবং রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন ছড়িয়ে দেওয়ায় বড় ভূমিকা পালন করে।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বাংলাভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার আন্দোলন দু-পর্বে পরিচালিত হয়। প্রথম পর্ব ১৯৪৭-৪৮ এবং দ্বিতীয় পর্ব ১৯৫২ সাল। এ-কথা বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখা বাঞ্চনীয় যে, দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র জনপ্রিয়তা ছিল আকাশচুম্বী। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অসামান্য ভূমিকা রাখায় মুসলিম লীগও ছিল মানুষের কাছে বিশেষভাবে সমাদ্রিত। এমনি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও মুসলিম লীগ সরকারের বিপক্ষে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা ‘বাংলা’ করার দাবিতে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা ছিল এক দুঃসাহসিক কাজ। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সদ্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে প্রথম পর্যায়ের গড়ে তোলা এ আন্দোলনে যারা অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছিলেনÑ সময়, কাল ও বাস্তব অবস্থার বিবেচনায় তারা হলেন প্রকৃত বাঙালি, ভাষাপ্রেমিক এবং সময়ের সাহসী সন্তান। বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার এ আন্দোলনে অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তবুও সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে শেখ মুজিবুর রহমান নিজেকে আলাদাভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছেন। দেখা যাক, কী ছিল শেখ মুজিবের ভূমিকা :

ক. যুব সম্মেলন
১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা পৌরসভার তৎকালীন ভাইস চেয়ারম্যান খান বাহাদুর আবুল হাসনাত আহমেদের বাড়ির বিশাল লনে তসুদ্দুক আহমদের সভাপতিত্বে প্রগতিশীল যুবকদের এক সম্মেলনে ‘পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগ’ গঠন করা হয়। এ সম্মেলনে রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব গৃহীত হয়। ভাষাসৈনিক গাজীউল হকের বক্তব্য অনুযায়ী প্রস্তাবটি ছিল-

“পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে, বাংলাভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন ও আইন আদালতের ভাষা করা হউক।
সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হইবে সে সম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার জনসাধারণের উপর ছাড়িয়া দেওয়া হউক এবং জনগণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয়া গৃহীত হউক।”
[সূত্র : ভাষা আন্দোলনের আর্থ-সামাজিক পটভূমি, সম্পাদনায় : আতিউর রহমান]

পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা-সংক্রান্ত প্রস্তাবের দ্বিতীয় অংশটি প্রস্তাব করেন যুবনেতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং তার এই প্রস্তাব সমর্থন করেন রাজশাহীর যুবনেতা আতাউর রহমান। সে-সময়ে পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৬৬ শতাংশ ছিল বাঙালি- সুতরাং শেখ মুজিবের কৌশলী প্রস্তাবের উদ্দেশ্য বুঝতে আর কারও অসুবিধা হয়নি।
উক্ত কর্মী সম্মেলনে ভাষা-সম্পর্কিত প্রস্তাবটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এ সম্পর্কে লেখক ও গবেষক বদরুদ্দীন উমর বলেন-

“পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলন প্রস্তাব করিতেছে যে, বাংলা ভাষাকে পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষার বাহন ও আইন-আদালতের ভাষা করা হউক। সমগ্র পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হইবে তৎসম্পর্কে আলাপ-আলোচনা ও সিদ্ধান্ত প্রদানের ভার জনসাধারণের উপর ছাড়িয়ে দেওয়া হউক এবং জনগণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলিয় গৃহীত হউক।”
[সূত্র : পূর্ববাংলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি (প্রথম খ-), বদরুদ্দীন উমর, পৃ. ২৫]

বদরুদ্দীন উমর তার গ্রন্থে প্রস্তাবকারী হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখ না করলেও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাবটি উল্লেখ করেছেন- ইতিহাসের সত্য উদঘাটনে এ সূত্রটিও গুরুত্বপূর্ণ।
উক্ত কর্মী সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী অধ্যাপক মুস্তাফা নূর উল ইসলাম ২৩ জুন ২০১৩ বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে বলেন :

“সভা যাতে সফল হতে না পারে সেজন্য ক্ষমতা গ্রহণকারী মুসলিম লীগ সরকার নানা ষড়যন্ত্র শুরু করে। পুরনো ঢাকার মহল্লা সর্দার এবং অন্যদের ক্ষেপিয়ে দেওয়া হয়। তাদের গুণ্ডারা সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের উপর হামলা চালায় এবং এতে অনেকে আহত হন। হামলায় আহত শেখ মুজিব ব্যান্ডেজ দেওয়া অবস্থায় এ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।”

খ. ১১ মার্চ ১৯৪৮
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত পাকিস্তান গণপরিষদের দ্বিতীয় অধিবেশনে কুমিল্লায় জন্মগ্রহণকারী কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দু এবং ইংরেজির পাশাপাশি ‘বাংলা’কে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এবং পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনসহ মুসলিম লীগের সকল সদস্য রাষ্ট্রভাষা ‘বাংলা’র বিরোধিতা করেন।
২৫ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদের সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব ভোটে দিলে তা কণ্ঠভোটে বাতিল হয়ে যায়। এ খবর পূর্ব বাংলায় এসে পৌঁছলে সর্বত্রই ক্ষোভের সঞ্চার হয়। ছাত্ররা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ২ মার্চ ১৯৪৮, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে বিভিন্ন ছাত্র-যুব এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনের এক যৌথসভায় শামসুল আলমকে আহ্বায়ক করে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটি ১১ মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে পূর্ব বাংলায় সাধারণ ধর্মঘট আহ্বান করে। রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ডাকা ১১ মার্চ ১৯৪৮-এর সাধারণ ধর্মঘটের আগেরদিন ফজলুল হক হলে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের জরুরি বৈঠকে কর্মসূচি বাস্তবায়ন নিয়ে নেতৃবৃন্দ দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতে থাকে। কেউ কেউ ধর্মঘট আপাতত প্রত্যাহারেরও প্রস্তাব করেন। এ সময় শেখ মুজিব কর্মসূচি বাস্তবায়নের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেন এবং সকল দোদুল্যমানতা পরিহার করে ১১ মার্চের ধর্মঘট সফল করার বিস্তারিত কর্মসূচি গ্রহণ ও দায়িত্ব বণ্টন করা হয়। ভাষাসৈনিক অলি আহাদ, গাজীউল হক এবং আরও অনেকেই তাদের লেখায় এ বক্তব্য সমর্থন করেছেন।
এ প্রসঙ্গে ভাষাসৈনিক গাজীউল হক বলেন,

“ঢাকায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলো। ১১ মার্চ পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্র ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হলো। ১০ মার্চ রাতে ফজলুল হক হলে রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের একটি সভা বসল। সভায় আপসকারীদের ষড়যন্ত্র শুরু হলো। রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের আহ্বায়কসহ অনেকেই তখন দোদুল্যমানতায় ভুগছে, আপস করতে চাইছে সরকারের সঙ্গে। একটি ব্রজকণ্ঠ সচকিত হয়ে উঠলÑ সরকার কি আপস প্রস্তাব দিয়েছে? নাজিমুদ্দিন সরকার কি বাংলা ভাষার দাবি মেনে নিয়েছে? যদি তা না হয়ে থাকে, তবে আগামীকাল ধর্মঘট হবে, সেক্রেটারিয়েটের সামনে পিকেটিং হবে। এই বজ্রকণ্ঠ ছিল শেখ মুজিবের। ছাত্রনেতা শেখ মুজিবকে সমর্থন দিলেন অলি আহাদ, তোয়াহা, মোগলটুলীর শওকত সাহেব, শাসসুল হক সাহেব। আপসকামীদের ষড়যন্ত্র ভেস্তে গেল।”
[সূত্র : ভাষা আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, লেখক : মাযহারুল ইসলাম, পৃ. ২৪-২৫]

গাজীউল হকের বক্তব্যের সমর্থন মিলল অলি আহাদের কথায়। এ প্রসঙ্গে ভাষাসৈনিক অলি আহাদ বলেন,

“সেদিন সন্ধ্যায় যদি মুজিব ভাই ঢাকায় না পৌঁছাতেন তাহলে ১১ মার্চের হরতাল, পিকেটিং কিছুই হতো না।”
[সূত্র : বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান Ñ জীবন ও রাজনীতি, প্রথম খ-, সম্পাদক : মোনায়েম সরকার, পৃ. ১৬৭]

১১ মার্চ ১৯৪৮ সাধারণ ধর্মঘট পালনের জন্য ছাত্ররা ঢাকা শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে পিকেটিং করে। তবে তৎকালীন সেক্রেটারিয়েট ভবন (ইডেন বিল্ডিং) ছিল সবচেয়ে উত্তপ্ত। এখানে ছাত্রনেতারা পিকেটিংয়ের দায়িত্বে ছিলেন। ছাত্রনেতা শেখ মুজিব, শামসুল হক, অলি আহাদ প্রমুখ সেক্রেটারিয়েটের প্রথম গেটে এবং কাজি গোলাম মাহবুব, শওকত আলী দ্বিতীয় গেটে অবস্থান নেন। এখানে পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল জাকির হোসেন, ডেপুটি ওবায়দুল্লাহ, সার্জেন্ট রবার্টসন পিকেটিংয়ে বাধা প্রদান করে। নেতৃবৃন্দের সঙ্গে পুলিশের বচসা, ধস্তাধস্তি হয় এবং এক পর্যায়ে নেতৃবৃন্দ রাস্তায় শুয়ে পড়ে পিকেটিং করেন। পুলিশ শেখ মুজিবুর রহমান, শামসুল হক, কাজী গোলাম মাহাবুব, অলি আহাদ, শওকত আলীসহ মোট ৬৩ জনকে গ্রেফতার করে।
১১ মার্চ সাধারণ ধর্মঘট পালনে পুলিশি বাধা, হামলা, নির্যাতন এবং ব্যাপক গ্রেফতারের প্রতিবাদে দেশব্যাপী ছাত্র আন্দোলন বিস্তৃত হয়। ছাত্রদের সঙ্গে সাধারণ মানুষও যুক্ত হতে থাকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার এ আন্দোলনে। আন্দোলনের ব্যাপকতা এবং জিন্নাহর আসন্ন ঢাকা সফর সব মিলিয়ে খাজা নাজিমুদ্দিনের সরকার বিপাকে পড়ে এবং আপসের পথে অগ্রসর হয়। ব্যাপক আলাপ-আলোচনা ও বাকবিত-ার পর ১৫ মার্চ মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে তার সরকারি বাসভবন বর্ধমান হাউজে (বাংলা একাডেমির পুরনো ভবন) ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে আট-দফা চুক্তিনামা স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী সেদিন বিকেলেই শেখ মুজিবসহ গ্রেফতারকৃত ছাত্র নেতৃবৃন্দ কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন।
১৫ মার্চ ১৯৪৮, কারাগার থেকে মুক্তিলাভের পর শেখ মুজিব খাজা নাজিমুদ্দিনের সাথে সম্পাদিত আট-দফা চুক্তিনামা বিশ্লেষণ করে এ চুক্তিনামাকে অসম্পূর্ণ ও আপসকামী হিসেবে আখ্যায়িত করে ১৬ মার্চ সকালবেলা ফজলুল হক হলে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের জরুরি সভা আহ্বানের তাগিদ দেন। এ সভায় আট-দফা চুক্তিনামায় ৩টি সংশোধনী প্রস্তাব অনুমোদিত হয় এবং পূর্বঘোষিত ঐদিন দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিতব্য ছাত্রসভায় উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়।
বেলা দেড়টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বেলতলায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বানে সাধারণ ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম নেতা এবং পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বায়ক নাঈমুদ্দিনের প্রস্তাবে সভায় সভাপতিত্ব করেন সদ্য কারামুক্ত ছাত্র ও যুবনেতা শেখ মুজিবুর রহমান। সভায় তিনিই ছিলেন একমাত্র বক্তা। উক্ত সাধারণ সভায় আট-দফা চুক্তিনামায় ৩টি সংশোধনী প্রস্তাব গ্রহণ করে ছাত্রনেতা অলি আহাদের মাধ্যমে তা মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের নিকট প্রেরণ করা হয়। সভাশেষে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে একটি জঙ্গি মিছিল পূর্ব বাংলা ব্যবস্থাপক পরিষদ ভবনে যায়। মিছিলকারীরা বিক্ষোভ প্রদর্শন ও স্লোগান দিতে থাকে। পুলিশ টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ ও লাঠিচার্জ করে মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়।
এ সম্পর্কে ভাষাসৈনিক গাজীউল হক বলেন,

“আট-দফা চুক্তির ফলে মিইয়ে যাওয়া ভাষা আন্দোলনকে সেদিন বঙ্গবন্ধু এককভাবে নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। এখানেই ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের বৈপ্লাবিক দিক। এখানে উল্লেখ্য তারপর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক জনাব শামসুল আলম পদত্যাগ করেন।”
[সূত্র : ভাষা আন্দোলনের আর্থ-সামাজিক পটভূমি : আতিউর রহমান সম্পাদিত, চতুর্থ খ-,
ভাষা আন্দোলন : অংশগ্রহণকারীদের শ্রেণি অবস্থান, আতিউর রহমান ও সৈয়দ হাশমী, পৃ. ৫৩]

১৬ মার্চের ছাত্রসভা সম্পর্কে আন্দোলনের অন্যতম নেতা মোহাম্মদ তোয়াহা বলেন,

“আমরা মিটিং দিয়েছিলাম ইউনিভার্সিটিতে সকাল ১১টার সময়। সেদিন মিটিংয়ের জন্য আমরা গিয়ে দেখলাম শেখ মুজিবুর রহমান সময়ের পূর্বেই বেলতলায় মিটিং শুরু করে দিয়েছে। সেখানে তখন ১০০ জনের মতো ছাত্র ছিল। আগে আমারই মিটিংয়ে সভাপতিত্ব করার কথা ছিল কিন্তু মুজিব আগে থেকেই সভাপতি হয়ে বক্তৃতা শুরু করে দিয়েছিলেন।… যাই হোক, আমরা গিয়ে দেখলাম সে খুব গরম বক্তৃতা দিচ্ছে। এর পূর্বে নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে আমাদের একটি Agreement হয়েছিল, কিন্তু মুজিব সে Agreement-এর কোনো কথা জানত না। কথা ছিল আমরা সেদিনের মিটিংয়ে অমৎববসবহঃ এবং তার বিবরণ পেশ করব। কিন্তু মুজিবের জন্য সেটা সম্ভব হয়নি। সে বক্তৃতার পর অন্য কাউকে বলার সুযোগ না দিয়ে বলল, ‘চলো চলো Assembly চলো।’ সে-সময় প্রাদেশিক Assembly সেশন হচ্ছিল।… স্লোগান দিয়ে মুজিব কিছু সংখ্যক ছাত্রদের নিয়ে Assembly-র দিনে রওনা হলো। পরে পথে আরও লোক জুটে গেল।”
[সূত্র : ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ : কতিপয় দলিল (দ্বিতীয় খ-), বদরুদ্দীন উমর, পৃ. ২৬৪]

সেদিনের সভা সম্পর্কে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আরেক নেতা শওকত আলী বলেন,

“১৬ তারিখ সকাল থেকে আমরা সভার ব্যাপারে কাজকর্ম করতে থাকলাম এবং বেলা দেড়টা-দুইটায় সভা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শুরু হলো। সভায় সভাপতিত্ব করল শেখ মুজিবুর রহমান। সে-ই বক্তৃতা করল তারপর একটি মিছিল নিয়ে আমরা Assembly House-এর দিকে গেলাম।”
[সূত্র : বদরুদ্দীন উমর, ভাষা আন্দোলন প্রসঙ্গ Ñ কতিপয় দলিল (দ্বিতীয় খ-), পৃ. ২৫০]

১৬ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ আয়োজিত সভা সম্পর্কে আবদুল মতিন ও আহমদ রফিক বলেন,

“যা-ই হোক, সংশোধিত প্রস্তাব ছাত্রসভায় অনুমোদিত হওয়ার পর অলি আহাদের মাধ্যমে নাজিমুদ্দীনের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে ওই সভায় বক্তৃতা শেষে শেখ মুজিবুর রহমান সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই কিছু সংখ্যক ছাত্রের একটি মিছিল নিয়ে সরকারীবিরোধী ধ্বনি দিতে দিতে পরিষদ ভবনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকেন। পুলিশ সেখানে যথারীতি তাদের বাধা দেয়। তাদের সেøাগানে আকৃষ্ট হয়ে আরও বহু ছাত্র সেখানে সমবেত হন এবং এই সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকে। পুলিশের লাঠি চালনা সত্ত্বেও ছাত্রদের বিক্ষোভ সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এবং মন্ত্রী ও পরিষদ সদস্যগণ পরিষদ ভবন থেকে বের হতে পারে না। অবশেষে পুলিশের লাঠি, কাঁদানে গ্যাস এবং ফাঁকা গুলির চাপে ছাত্রদের অবরোধ ছেড়ে চলে যেতে হয়।
[সূত্র : ভাষা আন্দোলন ইতিহাস ও তাৎপর্য, লেখক : আবদুল মতিন ও আহমদ রফিক, পৃ. ৫৫]

পুলিশি হামলার প্রতিবাদে পরদিন ১৭ মার্চ ঢাকা শহরে ছাত্র ধর্মঘট আহ্বান করা হয়। ১৭ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত ছাত্রসভা থেকে ১৯ মার্চ মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ’র প্রথমবারের মতো ঢাকা আগমন উপলক্ষে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় ছাত্র ধর্মঘট আপাতত প্রত্যাহার করা হয়। ২১ মার্চ ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে আয়োজিত নাগরিক সংবর্ধনা এবং ২৪ মার্চ কার্জন হলে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার কথা উল্লেখ করলে ছাত্রসমাজ তীব্র প্রতিবাদ জানায়, আর এ প্রতিবাদের অন্যতম ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১১ সেপ্টেম্বর ১৯৪৮, মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ মৃত্যুবরণ করলে রাষ্ট্রভাষার বিষয়টি অমীমাংসিত থেকে যায় এবং আন্দোলনেও ভাটা পড়ে।

গ. ’৫২-এর ভাষা আন্দোলন ও কারাবন্দি শেখ মুজিব
১ জানুয়ারি ১৯৫০, শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হয়ে কারাবন্দি হন। বাস্তব কারণে ’৫২-এর ভাষা আন্দোলনে তার প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ সম্ভব ছিল না। কিন্তু কারাবন্দি শেখ মুজিব চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেলে সাক্ষাৎপ্রার্থী রাজনৈতিক সহকর্মীদের ভাষা আন্দোলন সংগঠিত করার জন্য বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়েছেন।
রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন, ধর্মঘট আহ্বান ইত্যাদি বিষয়ে তার পরামর্শ পাওয়ার কথা ভাষাসৈনিক জিল্লুর রহমান, কে.জি. মোস্তফা, অলি আহাদ, গাজীউল হক, শামসুল হক চৌধুরী প্রমুখ তাদের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ও লেখায় উল্লেখ করেছেন। এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু বলেন-

“আমি হাসপাতালে আছি। সন্ধ্যায় মোহাম্মদ তোয়াহা ও অলি আহাদ দেখা করতে আসে। আমার কেবিনের একটা জানালা ছিল ওয়ার্ডের দিকে। আমি ওদের রাত একটার পরে আসতে বললাম। আরও বললাম, খালেক নেওয়াজ, কাজী গোলাম মাহাবুব আরও কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকে খবর দিতে। দরজার বাইরে আইবিরা পাহারা দিত। রাতে অনেকে ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন পিছনের বারান্দায় ওরা পাঁচ-সাতজন এসেছে। আমি অনেক রাতে একা হাঁটাচলা করতাম। রাতে কেউ আসে না বলে কেউ কিছু বলত না। পুলিশরা চুপচাপ পড়ে থাকে, কারণ জানে আমি ভাগব না। গোয়েন্দা কর্মচারী একপাশে বসে ঝিমায়। বারান্দায় বসে আলাপ হল এবং আমি বললাম, সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে। আওয়ামী লীগ নেতাদেরও খবর দিয়েছি। ছাত্রলীগই তখন ছাত্রদের মধ্যে একমাত্র জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান। ছাত্রলীগ নেতারা রাজি হল। অলি আহাদ ও তোয়াহা বলল, যুবলীগও রাজি হবে। আবার ষড়যন্ত্র চলছে বাংলা ভাষার দাবিকে নস্যাৎ করার। এখন প্রতিবাদ না করলে কেন্দ্রীয় আইনসভায় মুসলিম লীগ উর্দুর পক্ষে প্রস্তাব পাস করে নেবে। নাজিমুদ্দীন সাহেব উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথাই বলেন নাই, অনেক নতুন নতুন যুক্তিতর্ক দেখিয়েছেন। অলি আহাদ যদিও আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের সদস্য হয় নাই, তবুও আমাকে ব্যক্তিগতভাবে খুবই শ্রদ্ধা করত ও ভালবাসত। আরও বললাম, “খবর পেয়েছি, আমাকে শীঘ্রই আবার জেলে পাঠিয়ে দিবে, কারণ আমি নাকি হাসপাতালে বসে রাজনীতি করছি। তোমরা আগামীকাল রাতেও আবার এস।” আরও দু’একজন ছাত্রলীগ নেতাকে আসতে বললাম। শওকত মিয়া ও কয়েকজন আওয়ামী লীগ কর্মীকেও দেখা করতে বললাম। পরের দিন রাতে এক এক করে অনেকেই আসল। সেখানেই ঠিক হল আগামী ২১শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা দিবস পালন করা হবে এবং সভা করে সংগ্রাম পরিষদ গঠন করতে হবে। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকেই রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কনভেনর করতে হবে। ফেব্রুয়ারি থেকেই জনমত সৃষ্টি করা শুরু হবে। আমি আরও বললাম, “আমিও আমার মুক্তির দাবি করে ১৬ই ফেব্রুয়ারি থেকে অনশন ধর্মঘট শুরু করব। আমার ছাব্বিশ মাস জেল হয়ে গেছে।” আমি এ-কথাও বলেছিলাম, “মহিউদ্দীন জেলে আছে, আমার কাছে থাকে। যদি সে অনশন করতে রাজি হয়, তবে খবর দেব। তার নামটাও আমার নামের সাথে দিয়ে দিবে। আমাদের অনশনের নোটিশ দেওয়ার পরই শওকত মিয়া প্যামপ্লেট ও পোস্টার ছাপিয়ে বিলি করার বন্দোবস্ত করবে।”
[সূত্র : অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান, পৃ. ১৯৬. ১৯৭]

২১ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ধর্মঘটের পূর্বে রাজবন্দির মুক্তির দাবিতে শেখ মুজিব ও মহিউদ্দিন আহমদের ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে আমরণ অনশন কর্মসূচি ঘোষণা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সরকারকে চাপে রাখা এবং আন্দোলনে নানামুখী উপাদান যুক্ত করে ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে সরকারের বিরুদ্ধে মাঠে নামানোর এ এক প্রাজ্ঞ কৌশল বলেই প্রতিভাত হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি সরকার শেখ মুজিবুর রহমান এবং মহিউদ্দিন আহমেদকে ফরিদপুর জেলে স্থানান্তরিত করে। ২১ ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে ছাত্র হত্যার সংবাদ ফরিদপুর কারাগারে পৌঁছলে শেখ মুজিব নিজেদের মুক্তির পাশাপাশি ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্র হত্যার বিচার তাদের অনশনের দাবির সঙ্গে যুক্ত করেন।
সে-সময়ে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের ঢাকা অফিস ছিল ৪৩ যোগীনগর লেনে। বাড়ির উপরতলায় থাকতেন সহ-সভাপতি মোহাম্মদ তোয়াহা ও সাধারণ সম্পাদক অলি আহাদ। নিচতলায় ছিল অফিস। যুবলীগ অফিসের পাশেই ছিল আনিসুজ্জামানের বাসা এবং তিনি তখন যুবলীগের সক্রিয় সংগঠক। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন-

“… ডাকপিয়নকে বলে রেখেছিলাম, যুবলীগের চিঠিপত্র যেন আমার বাসায় দিয়ে যায়। ২৩ তারিখে একটা টেলিগ্রাম পেলাম ফরিদপুর জেল থেকে। রাজবন্দির মুক্তির দাবিতে সেখানে কয়েকদিন ধরে অনশন করছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান ও মহিউদ্দিন আহমদ। ২১ ফেব্রুয়ারির হত্যাকা-ের খবর পেয়ে অনশনের কারণ হিসাবে তার প্রতিবাদও তারা যুক্ত করেছেন এবং সে সংবাদ জানিয়েছেন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদককে। এ টেলিগ্রামের ভিত্তিতে একটা খবর তৈরি করে আমি আজাদ পত্রিকায় দিয়ে আসি এবং যথারীতি মুদ্রিত হয়।”
[সূত্র : কাল নিরবধি, আনিসুজ্জামান, প্রকাশক : সাহিত্য প্রকাশ, দ্বিতীয় মুদ্রণ, পৃ. ১৮০]

১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা পালনকারী আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যান্য বন্দিদের মুক্তির দাবি জানিয়ে ৩১ জানুয়ারি ১৯৫২, ঢাকা বার লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় সভায় একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।
কৌশলগত কারণে আন্দোলনকে আরও বেগবান করার জন্য শেখ মুজিব ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে বন্দি মুক্তির দাবিতে আমরণ অনশন শুরু করেন। ১৭ই ফেব্রুয়ারি ১৯৮২ সাপ্তাহিক ইত্তেফাকে শেখ মুজিবসহ আটক বন্দিদের মুক্তি প্রদানের দাবি জানিয়ে প্রগতিশীল রাজনীতি, ছাত্র-যুব ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সংগঠনের নেতৃবৃন্দের একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়। বিবৃতিদাতাদের মধ্যে ছিলেন মওলানা ভাসানী, আতাউর রহমান খান, আবুল হাশিম, নুরুল হুদা, কফিল উদ্দিন চৌধুরী, সামসুল হক, কমরুদ্দিন, আবদুস সালাম, তোফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া), কাজী গোলাম মাহবুব, সিরাজুদ্দীন আহমদ, হাসান ইকবাল প্রমুখ।
শেখ মুজিবুর রহমানসহ রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে ১৯শে ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবনে ছাত্রনেতা জিল্লুর রহমানের (সাবেক রাষ্ট্রপতি) সভাপতিত্বে এক ছাত্রসভা অনুষ্ঠিত হয়। এ সভায় বক্তব্য রাখেন নাদেরা বেগম (শহীদ মুনির চৌধুরীর বোন), শামসুল হক চৌধুরী (বিশিষ্ট আইনজীবী)। সবাই গাজিউল হককে আহ্বায়ক করে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাজবন্দী মুক্তি আন্দোলন কমিটি’ গঠন করা হয়।
ফরিদপুর জেলে অনশনরত শেখ মুজিবের শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি মওলানা ভাসানী এক বিবৃতিতে অবিলম্বে শেখ মুজিবকে মুক্তি প্রদানের দাবি জানান, যা ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
অনশনে শেখ মুজিবুর রহমানের শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছলে সরকার তাকে মুক্তি দেওয়ার আদেশ কারাগারে পাঠায় ২৬ ফেব্রুয়ারি এবং তিনি কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করেন ২৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২।অমৎববসবহঃ

ঘ. পিকিং-শান্তি সম্মেলনে শেখ মুজিবের বাংলায় ভাষণ প্রদান
১৯৫২ সালের অক্টোবর মাসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার দেশগুলোর এক শান্তি সম্মেলন চীনের তৎকালীন রাজধানী পিকিং-এ অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে পাকিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে ৩০ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। এর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ছিলেন পাঁচজন। তারা হলেনÑ আতাউর রহমান খান, তোফাজ্জল হোসেন (মানিক মিয়া), শেখ মুজিবুর রহমান, খন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াছ এবং উর্দু লেখক ইব্নে হাসান। পাকিস্তান প্রতিনিধি দলের নেতা ছিলেন মানকি শরিফের পির সাহেব। উক্ত সম্মেলনে ৩৭টি দেশের ৩২৮ জন প্রতিনিধি অংশ নেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে নির্ধারিত বক্তা ছিলেন আতাউর রহমান খান ও শেখ মুজিবুর রহমান। সবাইকে অবাক করে দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান উক্ত সম্মেলনে বাংলায় বক্তৃতা দিলেন এবং আতাউর রহমান খান তার ইংরেজি তরজমা করে দিলেন। তখনও পর্যন্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না হওয়া সত্ত্বেও বিদেশে আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বাংলায় ভাষণ প্রদান শুধু বাংলা ভাষার মর্যাদাই বৃদ্ধি করেনিÑ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিকেও জোরদার করেছে। সেদিনের বক্তৃতা সম্পর্কে শেখ মুজিব বলেনÑ

“… আমি ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে পারি। তবু আমার মাতৃভাষায় বলা কর্তব্য। আমার বক্তৃতার পরে মনোজ বসু (ভারতীয় প্রতিনিধি দলের সদস্য-লেখক) ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেনÑ ‘ভাই মুজিব, আজ আমরা দুই দেশের লোক; কিন্তু আমাদের ভাষাকে ভাগ করতে কেউ পারে নাই। আর পারবেও না। তোমরা বাংলাভাষাকে জাতীয় মর্যাদা দিতে যে ত্যাগ স্বীকার করেছ আমরা বাংলা ভাষাভাষী ভারতবর্ষের লোকেরাও তার জন্য গর্ব অনুভব করি।”
[সূত্র : অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান, প্রকাশক : দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লি., পৃ. ২২৮-২৯]

পিকিং থেকে ঢাকা ফিরে এলে প্রতিনিধি দলকে ঢাকা জেলা বোর্ড মিলনায়তনে এক নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেনÑ

“… সম্মেলনে শেখ মুজিব বাংলায় বক্তৃতা দিয়েছিলেন বলে সংবর্ধনা সভায় তিনি ভাষণ দিতে দাঁড়ালে আমরা বেশ জোরে করতালি দিয়েছিলাম। তার উদাত্ত কণ্ঠ যেমন চিত্তাকর্ষক ছিল, তেমনি তাঁর মৃত্তিকাসংলগ্ন ভাবভঙ্গি ও কথাবার্তা ছিল আনন্দদায়ক।”
[সূত্র : কাল নিরবধি, আনিসুজ্জামান, সাহিত্য প্রকাশ, পৃ. ১৯৩]

ছাত্র-জীবন থেকেই শেখ মুজিবুর রহমান মুসলিম লীগের প্রগতিশীল অংশ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং আবুল হাশিমের রাজনৈতিক অনুসারী ছিলেন। ১৪ আগস্ট ১৯৪৭, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হবার পর শেখ মুজিব কলকাতা থেকে ঢাকা প্রত্যাবর্তন করেন। এ সময় শওকত আলীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত ১৫০নং মোগলটুলীতে অবস্থিত অফিস প্রগতিশীল ধারার কর্মীদের আস্তানায় পরিণত হয়। পরবর্তীতে শেখ মুজিব এ ধারার অন্যতম কা-ারিতে পরিণত হন। ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ তার প্রচেষ্টা আত্মপ্রকাশ করেন। পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ, আওয়ামী লীগ এবং যুক্তফ্রন্ট গঠনেও তার ছিল অগ্রগণ্য ভূমিকা।
সামগ্রিকভাবে বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আঁতুড়ঘর হিসেবে ভাষা আন্দোলনের ভূমিকা অনস্বীকার্য। এই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই মূলত বাঙালি জাতিসত্তাÑ তার জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে এবং বঙ্গবন্ধুর ৬-দফা ঘোষণার মধ্য দিয়ে একটি অবয়ব লাভ করে। ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের অগ্রগণ্য ভূমিকাটি যথাযথভাবে ইতিহাসে মূল্যায়িত না হবার দুটি কারণ আছে বলে আমার মনে হয়। প্রথম কারণটি হলোÑ বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির মুক্তি আন্দোলন এবং স্বাধীনতা অর্জনে মুখ্য ভূমিকা পালন করায় ভাষা আন্দোলনে তার অবদান আলাদাভাবে আর চিহ্নিত হয়নি। আরেকটি কারণও এড়িয়ে যাবার সুযোগ নেই, আর তা হলোÑ যারা পরবর্তীতে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস রচনা করেছেন, তাদের অনেকেই মতাদর্শগত ভিন্নতার কারণে উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকাটি আড়াল করতে চেয়েছেন। কিন্তু ইতিহাসকে কখনও আড়াল করা যায় নাÑ সত্য নিজ গুণেই প্রকাশিত হয়। ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আপসহীন ভূমিকাটি সত্য অনুসন্ধান এবং গবেষণার মধ্য দিয়ে আজ দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে এ পাঠ উন্মোচনও আমাদের চিন্তার শক্তিকে সমৃদ্ধ করবেন নিঃসন্দেহে।

লেখক : গবেষক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply