‘আমরা মানুষের কল্যাণে কাজ করি’

দেশে বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাসের টিকা প্রদান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। গত ২৭ জানুয়ারি বিকাল সাড়ে ৩টায় রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের স্টাফ নার্স রুনু বেরোনিকা কস্তা’র শরীরে প্রথম টিকা প্রয়োগের মধ্য দিয়ে দেশে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় করোনাভাইরাসের টিকা প্রদান কার্যক্রম। গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে টিকাদান কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা। তিনি পাঁচজনের টিকাদান প্রত্যক্ষ করেন। বর্তমানে দেশের ৫টি হাসপাতালে বিনামূল্যে করোনা টিকা প্রদানের কার্যক্রম চলছে। ঢাকা মেডিকেল কলেজ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্বাস্থ্যকর্মীরা কোভিড-১৯-এর টিকা গ্রহণ করছে। পর্যায়ক্রমে সরকারের নির্ধারিত অগ্রাধিকার তালিকা অনুযায়ী এই টিকা প্রদান কার্যক্রম পরিচালিত হবে। ইতোমধ্যে যাদের শরীরে টিকা প্রয়োগ করা হয়েছে তারা সবাই সুস্থ রয়েছেন এবং তেমন কোনো পাশ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আজকে বাংলাদেশের জন্য এটা একটা ঐতিহাসিক দিন। বিশ্বের অনেক দেশ এখনও করোনা ভ্যাকসিন শুরু করতে পারেনি। সেখানে আমাদের মতো সীমিত অর্থনৈতিক শক্তি নিয়েই আমরা শুরু করলাম। আমরা মানুষের কল্যাণে কাজ করি, সেটাই আজকে প্রমাণ হলো। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা আমাদের কর্তব্য। যখন অক্সফোর্ড-এ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা আসলো, আমরা বললাম যত দ্রুত এই টিকা নেওয়া যায়। আমি ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছিলাম ভ্যাকসিন কেনার জন্য।’ তিনি আরও বলেন, ‘কিছু মানুষ ভালো না-লাগা রোগে ভোগে। তার বলে দেশে ভ্যাকসিন আসবে কি না, এই টিকা কার্যকর হবে কি না? দেশে সমালোচনার লোক দরকার আছে। তারা যত সমালোচনা করেছে আমরা তত অনুপ্রাণিত হয়েছি।’ প্রথম দিনে ভ্যাকসিন গ্রহণকারীদের ধন্যবাদ জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা আশা করি এর মাধ্যমে করোনাভাইরাস থেকে দেশের মানুষ রক্ষা পাবে। দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানাই। কারণ তারা এগিয়ে না আসলে এত কিছু করা সম্ভব হতো না। যারা করোনায় মারা গেছেন তাদের মৃত্যুতে দুঃখ প্রকাশ করছি।’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রথমে ভ্যাকসিন গ্রহণকারী রুনু ভেরোনিকা কস্তা প্রধানমন্ত্রীকে সম্বোধন করে বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, শুভ অপরাহ্ন।’ এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তোমার ভয় লাগছে না তো? ভয় পাচ্ছো না তো?’ তার জবাবে রুনু বলেন, ‘না ম্যাডাম।’ এ সময় তাকে সাহস দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খুব সাহসী তুমি। তোমাকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা। তুমি ভালো থাকো, সুস্থ থাকো। আরও অনেক রোগীর সেবা করো সেই দোয়া করি।’ টিকা গ্রহণ শেষে সিনিয়র স্টাফ নার্স ‘জয় বাংলা’ সেøাগান দিলে প্রধানমন্ত্রীও তার জবাবে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান ধরেন।
এরপর প্রধানমন্ত্রীকে সালাম জানিয়ে টিকা গ্রহণ করতে আসেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা। প্রধানমন্ত্রী এ সময় তাকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘তুমি সুস্থ থাকো, ভালো থাকো দোয়া করি। সাহস করে টিকা নিতে এসেছো, নার্ভাস লাগছে না তো?’ জবাবে ডা. নাসিমা বলেন, ‘আপনি আমাদের সঙ্গে আছেন, জয় বাংলা।’ ট্রাফিক পুলিশ দিদারুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রীকে সালাম জানালে জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘করোনাকালে অনেক কাজ করেছো। এবার পুলিশ এত সার্ভিস দিয়েছে তা বলার মতো না। অনেক সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে।’ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম ইমরান হামিদ সালাম দিয়ে টিকা নিতে গেল প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তুমি নিচ্ছো, ভয় পাচ্ছো না তো?’ জবাবে এই সামরিক কর্মকর্তা ‘না’ বললে প্রধানমন্ত্রী সবার সুস্থ ও দীর্ঘায়ু কামনা করেন।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এমপি বলেন, ‘আজ ভ্যাকসিন প্রদান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে। এর মাধ্যমে ৩৬ লাখ লোককে ভ্যাকসিন দেওয়া সম্ভব হবে। টিকাদান কার্যক্রমে ৪২ হাজার কর্মী রয়েছেন। ভ্যাকসিন গ্রহীতার নিরাপত্তার জন্য চিকিৎসা রাখা হয়েছে। প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে তার জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। অক্সফোর্ডের এই টিকা এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নিরাপদ ভ্যাকসিন হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে।’
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, করোনার ভ্যাকসিনে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হবে না তা নয়। ভ্যাকসিন নেওয়ার পরে জ্বর হতে পারে, মাথা ব্যথা হতে পারে, ভ্যাকসিন নেওয়ার জায়গা একটু ফুলে যেতে পারে। তবে এতে ভয়ের কিছু নেই। এখন পর্যন্ত যতজনকে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে তারা সবাই ভালো আছেন। অনেক রাষ্ট্র এখনও ভ্যাকসিন পায় নাই। বিশ্বের ২৩ নম্বর দেশ হিসেবে বাংলাদেশে ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু করেছে। আরও ৩ কোটি ভ্যাকসিনের টাকা অলরেডি দিয়ে দিয়েছি। ডব্লিউএইচও’তে আমাদের সাড়ে ৬ কোটি ভ্যাকসিনের অর্ডার দেওয়া আছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের স্টাফ নার্স রুনু ভেরোনিকা কস্তা প্রথম গ্রহণের পর পর্যায়ক্রমে টিকা নেন ডা. আহমেদ লুৎফুল মোবেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ডা. নাসিমা সুলতানা, ট্রাফিক পুলিশ মো. দিদারুল ইসলাম ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরান হামিদ। এরপর গত কয়েক দিনে অগ্রাধিকার তালিকার অসংখ্য ব্যক্তি টিকা গ্রহণ করেছেন এবং প্রতিনিয়ত টিকা গ্রহণকারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। টিকা গ্রহণকারীরা সবাই সুস্থ রয়েছেন। এখন পর্যন্ত টিকার আশঙ্কাজনক তেমন কোনো পাশ্বপ্রতিক্রিয়ার লক্ষণ দেখা যায়নি।
উদ্বোধনী দিনেই টিকা পেতে অগ্রাধিকার তালিকার আগ্রহী ব্যক্তিদের অনলাইনে নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করা হয়। এজন্য চালু করা হয়েছে ‘সুরক্ষা’ নামক ওয়েব পোর্টাল (www.surokkha.gov.bd)। টিকা প্রদান কার্যক্রমের প্রথম দিনই ওয়েবসাইটটি চালু হয়। এরপর থেকে অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা পেশার ব্যক্তিদের অনেকেই এতে নিবন্ধন করছেন।
উল্লেখ্য, ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত অক্সফোর্ড-এ্যাস্ট্রাজেনেকার করোনাভাইরাসের টিকা বাংলাদেশে দেওয়া হবে। সরকার সেরাম ইনস্টিটিউট থেকে যে ৩ কোটি ডোজ টিকা কিনছে, তার প্রথম চালানে ৫০ লাখ ডোজ গত ২৫ জানুয়ারি দেশে পৌঁছেছে। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর প্রথম চালানের টিকা মানবদেহে প্রয়োগের অনুমতিও দিয়েছে। এছাড়া সেরাম ইনস্টিটিউটে উৎপাদিত আরও ২০ লাখ ডোজ টিকা ভারত সরকারের উপহার হিসেবে পেয়েছে বাংলাদেশ। সব ঠিক থাকলে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে সারাদেশে কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন প্রদান কর্মসূচি শুরু হবে।
সরকার-বিরোধী কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের নেতারা এবং তাদের মতাদর্শের বুদ্ধিজীবীরা সভা-সমাবেশে টিকা নিয়ে নানা ধরনের টিপ্পনী-কটূক্তি পর্যন্ত করছেন, মনগড়া তথ্য দিয়েছেন। টিকা সম্পর্কে ভীতি সঞ্চারও করা হয়েছে। অথচ টিকা প্রদান কার্যক্রম উদ্বোধন এবং টিকা গ্রহণকারীদের বর্তমান শারীরিক অবস্থান আজ সব ষড়যন্ত্র ও মিথ্যাচারের জবাব দিয়ে দিয়েছে।
টিকা প্রদানের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভ্যাকসিন নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারীদের কড়া সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সব কিছুতেই কিছু ভালো লাগে না নামে একটা রোগে তারা ভোগে। এই রোগের কি চিকিৎসা আছে আমি জানি না। এর জন্য কোনো ভ্যাকসিন পাওয়া যাবে কি না তাও আমি জানি না।’ তিনি বলেন, ‘ভ্যাকসিন আসার সঙ্গে সঙ্গে এগুলো টেস্ট করা হয়, তারপরই কিন্তু দেওয়া হয়। আমাদের দুর্ভাগ্য হলো যে, কিছু কিছু লোক থাকে, সবকিছুতেই তারা একটা নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করে। হয়তো তাদের কাছে মানুষ কোনো সাহায্য পায় না। কিন্তু কোনো কাজ করতে গেলে সেটা নিয়ে বিরূপ সমালোচনা, মানুষের ভিতরে সন্দেহ ঢোকানো, মানুষকে ভয়ভীতি দেখানো; এ-ধরনের কিছু কাজ করা কারও অভ্যাস আছে। যতই ভালো কাজ করেন, সব সময় কিছুই তাদের ভালো লাগে না, এ-রকম একটা রোগে তারা ভোগে।’
রায়হান কবির : গবেষণা সহকারী, উত্তরণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply