স্বাস্থ্য-ব্যবস্থা ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা

অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হাসান:  ১৯৫০ থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত পৃথিবীর অর্থনীতির আকার ৫ গুণ বেড়েছিল। পৃথিবীর ১ শতাংশ মানুষ ৫০ শতাংশের বেশি সম্পদের অধিকারী। বিশ্বের ২ হাজার কোটি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। প্রতিদিন ১ হাজার শিশু, যার বেশিরভাগই আফ্রিকায় বাস করে, ম্যালেরিয়া রোগে মারা যায়। প্রায় ১৫ হাজার শিশু ও মহিলা প্রতিদিন প্রতিরোধযোগ্য অথবা নিরাময়যোগ্য রোগে মৃত্যুবরণ করছে। বর্তমানে পৃথিবীর অর্ধেকের বেশি মানুষ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত। এর বেশিরভাগই উন্নয়নশীল ও কম সম্পদসম্পন্ন দেশগুলোতে বাস করে। স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার জন্য ব্যয় করে প্রতি বছর প্রায় ১০ কোটি মানুষ (স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার জন্য ব্যয় করে) দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। ৯৩ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবার জন্য তাদের আয়ের ১০ শতাংশের বেশি খরচ করতে বাধ্য হয়।
১৯৪৮ সালে প্রণীত বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) গঠনতন্ত্রে মানুষের মৌলিক অধিকারের মধ্যে স্বাস্থ্য একটি, তা স্বীকৃত। ১৯৭৮ সালে আলমা-আতায় স্বাক্ষরিত ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ (Health for All) ঘোষণাতেও এটা অন্তর্ভুক্ত। ২০১৫ সালে জাতিসংঘে যে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (Sustainable Development Goals) নির্ধারণ করা হয়, তার স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে এটা সম্পর্কিত। জাতিসংঘের সব সদস্য দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (Universal Health Care-UHC) চালু করার অঙ্গীকার করেছে। যে সমস্ত দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে UHC  চালু করতে পারবে তারা স্বাস্থ্য-সম্পর্কিত অন্যান্য লক্ষ্যগুলোও অর্জন করতে পারবে। শিশুরা সুস্বাস্থ্য অর্জন করতে পারলে, তারা লেখাপড়া করতে পারবে, প্রাপ্ত বয়স্করা অর্থোপার্জন করতে পারবে, দারিদ্র্যমুক্ত হতে পারবে ও দীর্ঘস্থায়ী উন্নতির ভিত্তি রচনা করতে পারবে।
সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা (UHC) কী? দেশের সব স্থানের সব স্তরের মানুষ প্রয়োজনীয় রোগ নিরাময়, রোগ প্রতিরোধমূলক, রোগের পর পুনর্বাসন ও রোগ প্রশমনমূলক গুণগত মানসম্পন্ন সেবা পাবেন। এতে ব্যবহারকারী/সেবা গ্রহণকারী অর্থকষ্টে পড়বেন না।
UHC-এর ৩টি লক্ষ্য আছে :
১. UHC-এর আওতায় সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা সবাই পাবে, শুধু বিত্তবানরা নয়।
২. সেবার গুণগতমান ভালো হতে হবে, যাতে স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়।
৩. যারা সেবা নিচ্ছেন তারা যেন আর্থিক দিক দিয়ে দুর্ভোগে না পড়েন বা ক্ষতিগ্রস্ত না হন, তার নিশ্চয়তা থাকতে হবে।
UHC-এর জন্য অর্থায়ন একটা প্রধান উপাদান। কিন্তু সুস্বাস্থ্য অর্জনের জন্য আরও অন্যান্য উপাদান প্রয়োজন, সেগুলোও নিশ্চিত করতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ব্যবস্থা বা Delivery, স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও হাসপাতালসমূহের উন্নয়ন, স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও ওষুধের নিয়মিত সরবরাহ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন করা, সঠিক পরিচালনা ব্যবস্থা গড়ে তোলা, প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা, মান যাচাই ও বজায় রাখার ব্যবস্থা করা, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা ও জনস্বাস্থ্যের অন্যান্য দিক নিশ্চিত করা।
অর্থায়ন কীভাবে হয়? অধিকাংশ দেশেই সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার সম্পূর্ণ অথবা একটা বড় অংশ বহন করে সরকার। সরকার এই অর্থ জনগণের করের টাকায় পায়। অনেক দেশে সম্পূরক স্বাস্থ্য বীমার ব্যবস্থা থাকে। এই সম্পূরক বা অতিরিক্ত বীমা ব্যক্তি নিজেও করতে পারে অথবা তার জন্য তার চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানও করতে পারে। ইউরোপের কোনো কোনো দেশে সরকার ও বীমা কোম্পানির সমন্বয়ে UHC-এর খরচ দেওয়া হয়। এখানে প্রতিষ্ঠান ও সরকার কতটা দেবে তা আইন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এই বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত অলাভজনক হয়ে থাকে।
৩টি মডেল আলোচনা করা যায়।
১. Single Payer System: এ ব্যবস্থায় UHC-র সম্পূর্ণ ব্যয় একটি প্রতিষ্ঠানই করে থাকে। সেটা সাধারণত সরকার। এ ব্যবস্থা যুক্তরাজ্য, কানাডা, আয়ারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, ইতালি, স্পেন, পর্তুগাল ইত্যাদি দেশে আছে। স্বাস্থ্যসেবার প্রতিষ্ঠান ও জনবল সরকারই ব্যবস্থা করতে পারে। হাসপাতালগুলো সরকারি মালিকানাধীন হয়; চিকিৎসক, সেবিকা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী সরকারের বেতনভোগী হয়। এটা Beveridge মডেল, যেমন- যুক্তরাজ্য। রাষ্ট্র ব্যক্তি খাতের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব দিতে পারে। এতে হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকর্মী এরা ব্যক্তি খাতের, কিন্তু সেবার ব্যয় বহন করে সরকার। এখানে মূল্য ও মান নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকার ব্যবস্থা নেয়। এ ব্যবস্থা কানাডায় চালু আছে।
২. Social Insurance System : এ ব্যবস্থায় শ্রমিক, কর্মচারী, বেতনভোগী মানুষ নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেয়, যে প্রতিষ্ঠান নিয়োগ দেয় তারাও নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দেয় এবং সরকারও দেয়। এসব অর্থ একটা তহবিলে জমা থাকে। এ থেকে স্বাস্থ্যসেবা যেসব প্রতিষ্ঠান দেয় তাদের চুক্তিভিত্তিক দায়িত্ব দেওয়া হয়। স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি বেসরকারি বা দু-রকমই হতে পারে। সরকার মূল্য ও মান নিয়ন্ত্রণ করে। জার্মানি প্রথম এ ব্যবস্থা চালু/শুরু করে। এছাড়া ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড ও জাপান এসব দেশেও এ ব্যবস্থা চালু আছে।
৩. National Health Insurance System: প্রত্যেক নাগরিককে স্বাস্থ্য বীমা করতে হয় সরকারের কাছে। কোনো কোনো দেশে সরকার পরিচালিত বীমা কোম্পানি বা তহবিল থাকে। এ ব্যবস্থা দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান এসব দেশে চালু আছে।
পৃথিবীর ৩৩টি উন্নত দেশের ৩২টিতেই (যুক্তরাষ্ট্র ব্যতীত) কোনো-না-কোনোভাবে UHC-এর ব্যবস্থা চালু আছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যেও অনেক দেশ UHC চালু করেছে। এদের মধ্যে আছে- কিউবা, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ভুটান, চিলি, পেরু, শ্রীলংকা, হংকং ইত্যাদি। তবে উন্নয়নশীল স্বল্পবিত্ত অধিকাংশ দেশে টঐঈ নাই। এসব দেশে সরকার কিছু স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা করে; কিন্তু অধিকাংশ সেবাই রোগীকে নিজের বা পরিবারের (Out of Pocket) খরচে নিতে হয়। এতে দরিদ্র মানুষ সময়মতো স্বাস্থ্যসেবা পায় না। যখন রোগ জটিল হয়ে যায় অথবা কঠিন রোগ দেখা দেয় তখন চিকিৎসা করার জন্য তারা আর্থিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়। এমনকি অবস্থাপন্ন পরিবারের জন্যও জটিল ও কঠিন রোগের চিকিৎসার খরচ বহন করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়; সম্পত্তি বিক্রয় করতে হয় বা ঋণগ্রস্ত হতে হয়। অর্থায়ন করা টঐঈ-এর একটা বড় উপাদান। সরকারি হোক বা বেসরকারি হোক বেশি ঝুঁকি ও কম ঝুঁকিসম্পন্ন মানুষের কাছ থেকে বীমার টাকা একত্র করে সেবায় ব্যয় করলে গড় খরচ কম হয়। স্বভাবতই যাদের ঝুঁকি কম (যেমন- কম বয়সের মানুষ) তাদের বীমা করার প্রবণতা কম থাকে। এজন্য আইনি বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে হয়। টঐঈ-এর সুবিধা হলো এ-রকম : এতে জনগণের সবার স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়, মোট ব্যয় কম হয়, প্রশাসনিক ব্যয়ও কমে। সময়মতো চিকিৎসা হওয়ায় ভবিষ্যতের ব্যয়ও কমে। স্বাস্থ্যসেবা মানসম্পন্ন হয়। কঠিন ও জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ দরিদ্র হয়ে যায় না।
অসুবিধা হলো : যাদের অসুখ কম হয় তাদের কিছুটা ব্যয় বেশি হয়। চিকিৎসার খরচ কমানোর জন্য চিকিৎসা কাটছাঁট করতে হয়। সরকার ব্যয়বহুল বা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম এমন চিকিৎসার অনুমোদন নাও দিতে পারে।
একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো UHC-তে কি কি সেবা থাকবে তা প্রত্যেক দেশ তার নিজের প্রয়োজন, সক্ষমতা ও পারিপার্শি^কতা বিবেচনা করে নির্ধারণ করবেন। প্রথমে সফল প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা চালু করা যেতে পারে। এরপর সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্যান্য সেবা যোগ করা যায়। উন্নয়নশীল দেশসমূহে স্বাস্থ্যসেবার অসাম্য এতটাই বেশি যে জনগোষ্ঠীর একটা বড় অংশ যে সমস্ত রোগে ভোগেন তা বিদ্যমান কাঠামোর কিছু উন্নতি ও সম্প্রসারণ করলে অনেকটা অর্জন করা যায়। সবার জন্য সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা নৈতিকতার দিক থেকে আদর্শ হলেও তা টঐঈ-এর সঙ্গে শুরু থেকে সম্ভব না-ও হতে পারে। নৈতিকভাবে সব ধরনের সেবায় ও সর্বজনীনতা আদর্শ। স্বাস্থ্যসেবায় অসাম্য বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সমস্যা বাড়ায়, যেমন- অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রা, মাদক ও তামাকজাত সামগ্রীর ব্যবহার। এগুলো দূর করতে হলে টঐঈ-এর চাইতে অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন দরকার। তার আগেই টঐঈ চালু করা যেতে পারে। অনেক রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম ব্যক্তির চাইতে সমাজের জন্য বেশি প্রয়োজন, যেমন- মশক নিধন কার্যক্রম। অনেক সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ সামাজিক ক্ষতি ও ব্যয় কমিয়ে দেয়। এটা টঐঈ-এর অন্তর্ভুক্ত।
সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার চেষ্টা না করার যে প্রধান কারণ দেখানো হয় তা হলো দারিদ্র্য। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম সম্পদশালী দেশ হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন জটিল সামাজিক, অর্থনৈতিক কারণে সেটা দিতে পারছে না, যদিও প্রায় সারা ইউরোপে UHC প্রতিষ্ঠিত। আবার অনেকগুলো কম সম্পদশালী দেশ, যেমন- কিউবা, থাইল্যান্ড, পেরু, শ্রীলংকা UHC চালু করেছে। সারা পৃথিবীর UHC-এর অভিজ্ঞতা কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস/বিষয় তুলে ধরেছে। UHCএর কারণে মানুষের জীবনযাত্রায় বিরাট অগ্রগতি হয়। এর প্রমাণ এশিয়ার কয়েকটি দেশ- জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন। টঐঈ মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নতিও তরান্বিত করে। এছাড়া কয়েকটি স্বল্প সম্পদশালী দেশ দেখিয়েছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সার্বিকভাবে অগ্রসর হলে কম খরচেই টঐঈ অর্জন করা যায়। এদেশগুলোর অর্জন ত্রুটিমুক্ত নয়। কিন্তু এদের সাফল্য প্রমাণ করে টঐঈ অর্জন দরিদ্র দেশের পক্ষেও সম্ভব। কোনো দেশ সম্পদশালী না হলে টঐঈ দিতে পারবে না, প্রচলিত এ ধারণা ভুল। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা টঐঈ-এর অন্যতম উপাদান। আর প্রাথমিক স্বাস্থ্য একটা শ্রমঘন সেবা। শ্রম উন্নত দেশসমূহে যত মূল্য দিয়ে কাজে লাগাতে হয়, উন্নয়নশীল দেশে তার চাইতে অনেক কম ব্যয় করতে হয়। এছাড়া এতে মানুষের কর্মসংস্থানও বাড়ে।
অর্থনীতিবিদ Kenneth Arrow বলেন, সুসংগঠিত সর্বজনীন সরকারি স্বাস্থ্যসেবা না থাকলে জনগণ কম কার্যকর ও দুর্মূল্য বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা (Ineffiecient Overpriced Private Care) নিতে বাধ্য হন। এর কারণ হলো Asymmetric Information। অন্যান্য পণ্য বা সেবার ক্ষেত্রে (যেমন- একটা জামা বা একটা ছাতা) মানুষ তার দাম সম্বন্ধে মোটামুটি ধারণা রাখে এবং গুণগত মানও মোটামুটি যাচাই করতে পারে। কিন্তু কোন রোগের চিকিৎসা, কোনটা ভালো এবং কত খরচ হতে পারে, (যেমন- কী কী পরীক্ষা লাগবে, কী কী ওষুধ লাগবে) এটা রোগীর পক্ষে জানা সম্ভব না। কাজেই বেসরকারি বা বাণিজ্যিক স্বাস্থ্যসেবা বাজার প্রতিযোগিতার যুক্তিতেও কম কার্যকর (Inefficient)। এটা আরও প্রকট হয় যখন স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যা কম, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোতে হয়। ফলে মানুষের বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে না। সীমিত সংখ্যক চিকিৎসক বা সেবাকেন্দ্রের দারস্ত হতে হয়। সরকার পরিচালিত UHC এতে একটা নিয়ন্ত্রণ আনতে পারে। এটা ভারতের কেরালা অঙ্গরাজ্যের উদাহরণে আরও ভালো বুঝা যায়। কেরালায় কয়েক দশক আগে সর্বজনীন প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা চালু হয়েছে। কেরালার মানুষের আয় ও শিক্ষার হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা চাহিদা বাড়ে এবং বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার প্রসার ঘটে। কিন্তু সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে প্রতিযোগিতা থাকায় ও সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্য সচেতন এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় সম্বন্ধে সজাগ হওয়ায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো সেবার মান ভালো রাখতে এবং মূল্যও যৌক্তিক রাখতে বাধ্য হয়। তুলনায় ভারতের উত্তর প্রদেশ বা মধ্য প্রদেশ অঙ্গরাজ্যের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান ভালো নয় এবং ব্যয়ও বেশি।
সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অনেক রোগ শুরুতেই নির্ণয় করে, ফলে রোগ বাড়ার আগে চিকিৎসা দেওয়া হয়। এতে কম খরচ হয়, জটিলতা ও মৃত্যুর হারও কম হয়। থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, UHC চালু হওয়ার ফলে হাসপাতালে ভর্তি ও ব্যয়বহুল চিকিৎসার প্রয়োজন অনেক কমে গেছে। UHCনা থাকলে দরিদ্র মানুষ সময়মতো চিকিৎসা নিতে পারে না। রোগ বাড়লে চিকিৎসার ব্যয়ও বাড়ে, সাধারণ রোগও জটিল বা কঠিন হয়।
স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নতির সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নতি সম্পর্কিত। প্রথম দিকে কেরালা অঙ্গরাজ্য ছিল ভারতের দরিদ্র অঙ্গরাজ্যগুলোর অন্যতম। UHC চালু করার পর স্বাস্থ্য সূচকের উন্নতি হয়েছে। এই রাজ্যে অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের তুলনায় শিশুমৃত্যুর হারও অনেক কম এবং প্রত্যাশিত গড় আয়ু সবচেয়ে বেশি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নতির ফলে এটা এখন উচ্চ আয়ের রাজ্য। তামিলনাড়– ও হিমাচল প্রদেশ অঙ্গরাজ্য একইভাবে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার উন্নতির পথ ধরে অর্থনীতিতে উন্নতি করছে। UHC শুধু যে জনগণের জীবনযাত্রার মান বাড়ায় তাই নয়, অর্থনৈতিক উন্নতিতেও অবদান রাখে। কাজেই সব দেশের রাষ্ট্রীয় নীতিতে UHC অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। [চলবে]
লেখক : সাবেক অধ্যাপক, গ্যাস্ট্রএনটারোলজি ও উপাচার্য
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply