দুই রকম হোয়াইটওয়াশ

আরিফ সোহেল : প্রতিপক্ষ যখন ওয়েস্ট ইন্ডিজ তখন বাংলাওয়াশের অভিজ্ঞতা পুরনো। এর আগে শুধু বাংলাদেশেই নয়; ওদের দেশের মাটিতেই হোয়াইটওয়াশ করে জিতেছিল বাংলাদেশ। ২০০৯ সালে খেলোয়াড় বিদ্রোহের সুবাদে দ্বিতীয়সারির ওয়েস্ট ইন্ডিজকে পেয়ে তাদেরই মাঠে হোয়াইটওয়াশ করেছিল বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে এটা ছিল বাংলাদেশের ১০ম সিরিজ। এই সিরিজ জয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ৫-৫ সিরিজে সমতায় ফিরেছে। তবে এর আগে দুটি সিরিজই জিতেছিল বাংলাদেশ।
একসময় বাংলাদেশকে ভাবা হতো ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে নিচুসারির দল। সেই বাংলাদেশ এখন ক্রিকেট বিশ্বে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশ ক্রিকেট বিশ্বে এঁকে দিয়েছে রাজটীকা। প্রতিপক্ষকে যে-ই হোক; হোক ভারত-ইংল্যান্ড-পাকিস্তান, তাদের হারিয়ে দেওয়ার মন্ত্রও শিখে ফেলেছে বাংলাদেশ।
২০২১ সালে আবারও সামনে এসেছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। বাংলাদেশ ভুল করেনি। বোলারদের দাপটে ওয়ানডে সিরিজের প্রথম দুই ম্যাচে ১৫০ রানের গ-িও পার হতে পারেনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ঢাকায় প্রথম ম্যাচে ১২২ রানে অলআউট সফরকারী দল। জয়ের নেতৃত্ব দিয়েছেন বোলার সাকিব। নিয়েছেন ৪ উইকেট। সঙ্গী ছিলেন হাসান ৩ এবং মুস্তাফিজ ২ উইকেট নিয়ে। পরের ম্যাচে ওয়েস্ট ইন্ডিজের রানের চাকা থামিয়ে দিয়েছেন মিরাজ। নিয়েছেন ৪ উইকেট। সাকিব এবং মুস্তাফিজও ছিলেন বোলিং জাদু নিয়ে। নিয়েছেন দুটি করে উইকেট। প্রথম দুই ম্যাচে নিজেদের ব্যাটিং শক্তিকে শানিয়ে দেখার সুযোগ পায়নি বাংলাদেশ। তাই ওয়েনডে সিরিজের শেষ ম্যাচে সেই সুযোগ দারুণভাবে কাজে লাগিয়েছেন সাকিব-তামিম-মুশফিক-মাহমুদউল্লাহরা। ব্যাট হাতে অভিজ্ঞ এই চার ব্যাটসম্যান পেয়েছেন অর্ধশতক। বাংলাদেশও পায় ৬ উইকেটে ২৯৭ রানের বিশাল সংগ্রহ। যার ওপর দাঁড়িয়ে বোলাররাও সহজে বের করে দিয়েছেন ম্যাচজয়ের পথ। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হোয়াইটওয়াশ করার পথে এ ম্যাচে বাংলাদেশের জয় ১২০ রানের বিশাল ব্যবধানে। বড় লক্ষ্য তাড়ায় ক্যারিবীয়রা থামে ১৭৭ রানে। এই ম্যাচের বোলিং নায়ক সাইফউদ্দিন, নিয়েছেন ৪ উইকেট। এই ম্যাচেও মুস্তাফিজ ২ উইকেটের কোটা পূরণ করেছেন তার কাটার দিয়ে। এই ম্যাচ জয়ের ফলে ৩০ পয়েন্ট নিয়ে আইসিসির ওয়ানডে সুপার লিগের দুই নম্বরে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। ৪০ পয়েন্ট নিয়ে শীর্ষে আছে অস্ট্রেলিয়া।
তিন ওয়ানডেতেই বাংলাদেশের সামনে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেনি ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ওয়ানডে সিরিজে ম্যাচ সেরা হয়েছেন মুশফিকুর রহিম, আর সিরিজ সেরা সাকিব আল হাসান।
ওয়ানডে সিরিজের ঠিক উল্টোটাই ঘটেছে টেস্ট সিরিজে। অথচ দুটি টেস্টই বাংলাদেশের নাগালে ছিল। বাংলাদেশের জয় ছিনিয়ে নিয়ে গিয়েছে সফরকারীরা। প্রায় এক বছর পর আবার টেস্ট আঙিনায় বাংলাদেশ নেমেছিল। ২০২০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে মিরপুর টেস্ট অনুষ্ঠিত হওয়ার পর দ্বার ‘বন্ধ’ হয়েছিল, চট্টগ্রামে সেটি খুলছে। তবে ওয়ানডেতে নিজেদের সামর্থ্য ঠিকঠাক থাকলেও টেস্টের আঙিনা পুরোটাই আলাদা মনে হয়েছে বাংলাদেশকে। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় ক্রিকেটের বাইরে থাকায় চ্যালেঞ্জ নিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে মুমিনুলরা। ওয়েস্ট ইন্ডিজ বাংলাদেশে আসার আগে ৫টি টেস্ট খেলে নিজেদের গুছিয়ে নিয়েছিল। এই করোনাকালে টেস্ট তো দূরের কথা, বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা প্রথম শ্রেণির কোনো ম্যাচ খেলেননি। আর গোদের ওপর বিষফোঁড়া হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন সাকিব। কুঁচকির চোট নিয়েই সাকিবকে প্রথম টেস্টে খেলানো হয়েছিল। সাকিব দ্বিতীয় দিন থেকেই মাঠের বাইরে। ফলে ম্যাচের আগেই বাংলাদেশ কিছুটা বিপদ দেখেছিল। কিন্তু মুমিনুলের দুরন্ত ব্যাটিংয়ে জয়ের স্বপ্ন উঁকি দিয়েছিল বটে। সেই জয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের অভিষিক্ত ব্যাটার কে আর মায়ার্সের কাছে। এই ইন্ডিজ ব্যাটার খেলেছেন ডাবল সেঞ্চুরির এক নান্দনিক ইনিংস (২১০*)।
দ্বিতীয় টেস্টে ঢাকায় শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে চতুর্থ ইনিংসে ২০৯ রানের বেশি তাড়া করে জেতার রেকর্ড ছিল না। সেই মিরপুরে দ্বিতীয় টেস্টে বাংলাদেশকে জয়ের জন্য ২৩১ রানের লক্ষ্য ছুড়ে দিয়েছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ। চতুর্থ দিন সেটি তাড়া করতে নেমে দুর্দান্ত শুরু করলেও ব্যাটসম্যানদের অযথা শট খেলার তাড়ায় ধীরে ধীরে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ চলে নাগালের বাইরে। তারপরেও শেষ বিকালে রোমাঞ্চ সৃষ্টি করেছিলেন মিরাজ। ১৭ রানে হেরে গেছে বাংলাদেশ। এরই মাধ্যমে দুই ম্যাচের টেস্টে হোয়াইটওয়াশ হয়েছে মুমিনুল হকের দল। আর ২০১৭ সালের পর বিদেশের মাটিতে সিরিজ জেতার স্বাদ নিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।
ঢাকায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের সূচনা ইনিংসটা দুরন্ত ছিল। ৪০৯ রানের জবাবে বাংলাদেশ তুলেছিল মাত্র ২৯৬ রান। দ্বিতীয় ইনিংসে সফরকারীদের ১১৭ রানে গুটিয়ে দিয়ে জয়ের আবহ সৃষ্টি করেছিল বাংলাদেশ। দারুণ রোমাঞ্চ ছড়িয়েছে ম্যাচে। কিন্তু কিছু ভুলভাল শট বাংলাদেশের কপাল পুড়িয়েছে। তামিমের পর মিরাজের উইকেট আগলে রাখার লড়াই শেষ পর্যন্ত দীর্ঘদেহী কর্নওয়ালের কাছে পরাস্ত হয়েছে। বাংলাদেশ চট্টগ্রামের পর ঢাকায় হেরেছে জয়ের সুবাস মাখানো আবহ ছড়িয়ে।
চট্টগ্রাম ও ঢাকাতে দুই রকম অভিজ্ঞতা হয়েছে। চট্টগ্রামে বড় স্কোর গড়েও ক্যারিবীয়দের থামাতে না পারা; আর ঢাকায় ‘অনুকূলে’ থাকা লক্ষ্য তাড়া করে জিততে পারেনি বাংলাদেশ। চট্টগ্রামে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৩৯৫ রানের লক্ষ্য দিয়েছিল স্বাগতিকরা।
হোয়াইটওয়াশ হওয়া এই সিরেজে নিশ্চিতভাবে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হচ্ছে ব্যাটসম্যানদের। এক মুমিনুল ছাড়া বাংলাদেশের আর কোনো ব্যাটসম্যানের নেই ৪০ গড়! টেস্ট ক্রিকেটে যেখানে ব্যাটসম্যানদের ধৈর্য ও দৃঢ়তার পরীক্ষা দিতে হয়, সেখানে বারবার ব্যর্থ হচ্ছেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যান। চট্টগ্রাম টেস্টের পর ঢাকা টেস্টেও একের পর এক ব্যাটসম্যান নাম লিখিয়েছেন আত্মহুতির মিছিলে। তবে স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে লড়াইয়ের চেষ্টা করছেন মিরাজ।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে টার্নিং উইকেট বানিয়েও বিপদে পড়েছে বাংলাদেশ। চট্টগ্রাম ও ঢাকাতে জোমেল ওয়ারিকান ও রাকিম কর্নওয়ালের ঘূর্ণিজাদুর সামনে হিমশিম খেয়েছে মুমিনুলরা। দুই টেস্টে কর্নওয়াল নিয়েছেন সর্বোচ্চ ১৪ উইকেট। অন্যদিকে ওয়ারিকানের উইকেট সংখ্যা ১০। সেই তুলনায় বাংলাদেশি স্পিনারদের দাপট দেখা যায়নি। মিরাজ, তাইজুল ইসলাম, নাঈম হাসানের বিপক্ষে সাবলীল ব্যাটিং করেছেন ক্যারিবীয় ব্যাটসম্যানরা। ফলে আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ৫ ম্যাচে বাংলাদেশের পয়েন্টে ঘর শূন্য।
টেস্টে ন্যূনতম ১০০ উইকেট ছিল বাংলাদেশের তিন বোলারের। মোহাম্মদ রফিক, সাকিব আল হাসান ও তাইজুল ইসলামের। এই সিরিজে সেখানে যুক্ত হয়েছেন মিরাজ। কম ম্যাচে উইকেটপ্রাপ্তির সেঞ্চুরি করে টেস্টে বাংলাদেশের দ্রুততম ১০০ উইকেট নেওয়ার কীর্তি এখন ডানহাতি এই স্পিনারের। ২৩ ম্যাচে ছুঁয়েছেন এই মাইলফলক। মাত্র ২৩ বছর ১০৯ দিনে ছুঁয়েছেন ১০০ উইকেটের মাইলফলক। বিশ্বের চতুর্থ কনিষ্ঠতম বোলার হিসেবে এই রেকর্ডে নাম লিখিয়েছেন মিরাজ। তার চেয়ে কম বয়সে এই কীর্তি গড়েছেন ড্যানিয়েল ভেট্টরি, হরভজন সিং ও সাকলায়েন মুশতাক।

লেখক : সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, উত্তরণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply