বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা ও আপসহীন নেতৃত্ব

লিয়াকত আলী লাকী : সেই ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ওস্তাদ আমির খসরু একটি অসাধারণ উক্তি করেছিলেন, “আমির খসরু গর্বিত সে ভারতে জন্মগ্রহণ করেছে, আর ভারত গর্বিত আমির খসরু একজন ভারতীয়।” যদিও পিতৃসূত্রে তিনি ছিলেন তুর্কি বংশোদ্ভূত, কিন্তু ভারতের ভাষা, সাহিত্য ও সংগীতে তার যে অবদান, তা তুলনারহিত। যখন জাতীয়তাবাদ বা দেশপ্রেম এমনকি ইউরোপেও তেমন আহামরি কিছু ছিল না; বরং বেঁচে থাকার প্রয়োজনে যোদ্ধা-বণিক-দাস-শ্রমিক হিসেবে ভাগ্যান্বেষণে নিজের আত্মপরিচয়ও মানুষ ভুলে যেত এবং ক্রমাগত নিজের আবাস স্থানান্তর করতে বাধ্য হতো, তখন তৎকালীন অভারতীয় শাসকবর্গের অংশ হয়েও এ ধরনের জাতীয় গরিমা খুব বিস্ময়কর সন্দেহ নেই।
অন্যদিকে কথিত আছে, বঙ্গবন্ধুর পূর্বপুরুষেরা ধর্মপ্রচারের উদ্দেশ্যে আরবভূমি থেকে এসেছিলেন এবং পরবর্তীকালে বাংলাকেই আপন-আবাস করে নেন। ইতিহাস-পূর্ব কাল থেকেই এ উপমহাদেশ নানা কারণে বহিরাগতদের আকর্ষণ করেছে। যেমন এসেছে দস্যু-লুটেরা-শাসক-শোষক, তেমনি এসেছে অনুসন্ধানী-পরিব্রাজক-কর্মী-সাধক। তাদের অনেকেই পরবর্তীকালে বৃহৎ-ভারতের নানা প্রান্তে নিজেদের স্থায়ী আবাস গড়ে তুলেছে এবং এই ভূমিতেই তাদের পরবর্তী প্রজন্মের শেকড় প্রোথিত রয়েছে। আর বাংলায় নানা কারণেই এই আগমন-নির্গমন ছিল খুব বিচিত্রমাত্রিক। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে অজস্র নদীবেষ্টিত এই সজল-সবুজ পললভূমি যুগে যুগে বহু জনগোষ্ঠীকে আকৃষ্ট করেছে। এই মাটির এমনই গুণ, শস্য ছিটিয়ে দিলেই এখানে সোনার ফসলে মাঠ ভরে উঠেছে। ফলে গোলাভরা ধান, পুকুরভরা মাছ, গোয়ালভরা গরু কোনো রূপকথা ছিল না। তবে এর সুফল বাঙালির কপালে খুব কমই জুটেছে। কারণ দস্যু, লুণ্ঠনকারী, দখলদার শাসক-শোষকদের চিরকাল বাংলা লোভী করে করে তুলেছে; বারবার এর মাটি ও মানুষ লুণ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু বাঙালি চিরকালই সাহসী ও লড়াকু, কেননা তাকে সব সময় বৈরী প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকতে হয়েছে। তবে এক অসামান্য প্রাচুর্যভূমি হওয়ায় তার লড়াইয়ের সিংহভাগই ছিল মানবসৃষ্ট বৈরিতার বিরুদ্ধে। বারবার তাকে দখলদারদের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করতে হয়েছে। আর এই ভূখ-ে যদিও অনেক বীর ও যোদ্ধার জন্ম হয়েছে এবং মাতৃভূমির জন্য তাদের অসীম আত্মত্যাগ রয়েছে, এবং লড়াইয়ে তার জয়-পরাজয়ের নানা মাত্রাও ছিল; কিন্তু তার কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা চিরকালই ছিল সুদূরপরাহত।
অবশেষে এলো সেই কাক্সিক্ষত কাল, যখন ১৯২০ সালে বাংলার এক ছোট্ট গৃহকোণে একজন ‘খোকা’র জন্ম হলো। কিন্তু এই খোকা লোকছড়ার সেই ‘খোকা ঘুমাল পাড়া জুড়াল/বর্গি এল দেশে’র খোকা নয়, বরং নিজে তো জেগে রইলই, ‘পাড়া’রূপী দেশকে জাগাল এবং ‘বর্গি’রূপী হানাদারদের বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করে জাতির স্বপ্নের স্বাধীনতা এনে দিয়ে তবেই ঘুমাল। তার হাত ধরেই একটি স্বাধীন বাঙালি জাতি ও তার স্বপ্নের বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম হলো এবং তিনি হলেন বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

২.
বাংলা তথা ভারতবর্ষের ইতিহাস নানা রহস্য, দ্বন্দ্ব ও জটিলতায় পূর্ণ। বিশেষত বৃহৎ বঙ্গ প্রায় হাজার বছর ধরেই পরশাসিত। হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম শাসকগোষ্ঠীর প্রায় সকলেই ছিল অবাঙালি। মাঝখানে খুব অল্প সময়ের জন্য বাঙালি কৈবর্তদের একটি স্বাধীন ভূখ- পরিচালনার ইতিহাস ছাড়া, তার স্বশাসনের ইতিহাস নেই বললেই চলে। বরং অধিকাংশ সময়ই এই জাতির কিছু গোষ্ঠী বহিরাগত শাসক-শোষকদের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছে। এমনকি এই বাংলার মানুষ একদা হাবশি ক্রীতদাসদের দ্বারাও শাসিত হয়েছে। বিপুল জনগণ সব সময়ই এসবের বাইরে থেকেছে। বরং যতক্ষণ পেরেছে ততক্ষণ নিজের ভাঁড়ার শূন্য করে রাজন্যবর্গের উদরপূর্তি করেছে। কেবল তখনই দ্রোহ করেছে যখন পেটে খেতে পারেনি বলে পিঠে সয়নি। অর্থাৎ একান্ত বাধ্য হলে এবং যোগ্য নেতৃত্ব পেলেই কেবল মরিয়া হয়ে উঠেছে। আর একটা কারণ হতে পারে এই যে, এ অঞ্চল মুসলমানপ্রধান এবং দীর্ঘকাল মুসলিমরাই ছিলেন এখানকার শাসক। যেহেতু তারা ছিলেন অনেকটা সহনীয়, পরধর্মসহিষ্ণু, রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে কম নিপীড়ক এবং এদেশের মাটির সঙ্গে মিলনেচ্ছু, আর জনগণও ছিল রাজনৈতিক-অসচেতন, তাই এক ধরনের স্থিতাবস্থা বিরাজ করছিল।
এই দৃশ্যপট দ্রুত বদলাতে শুরু করল, যখন ইউরোপীয় বণিকবেশী দস্যুরা ভারতবর্ষে হানা দিল। পর্তুগিজ, ফরাসিসহ নানা জাতির পর সব শেষে যখন ব্রিটিশরা এলো এবং বণিক থেকে শাসক হয়ে উঠল, সমস্ত স্থিতি শুধু ভেঙে চুরমারই হলো না; বরং বাঙালির ওপর নেমে এলো এক মহা দুর্বিষহ যুগ। বাংলার পরাজয়ের ভেতর দিয়েই তাদের জয় শুরু হয়, এবং ক্রমে ভারতবর্ষ, বার্মাসহ এশিয়ার বিশাল ভূ-ভাগ তাদের করায়ত্ত হয়। কিন্তু বাংলা ও ভারতে এর অভিঘাত ছিল মারাত্মক। কেবল বাংলার কথাই যদি বলি, তাহলে একচেটিয়া বাণিজ্য, মাত্রাহীন করারোপ, চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও জমিদারি শোষণ-নির্যাতন, নীল চাষ, দেশীয় শিল্প-বাণিজ্য ধ্বংস, দুর্ভিক্ষ-মন্বন্তর ইত্যাদি ধারাবাহিক নিষ্পেষণ ছিল ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম অধ্যায়। এর ফলে বাংলার বিপুল জনগণ, বিশেষত কৃষিজীবী-শ্রমজীবী, তাঁতি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাসহ অগণন সাধারণ জনগণ একেবারেই নিঃস্ব হয়ে পড়ে। এই যখন বাস্তবতা, তখন ইংরেজরা ভারত-শাসন স্থায়ীকরণে নানামুখী কৌশল ও উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর মধ্যে ছিল শিক্ষাক্ষেত্রে ও সরকারি কাজে ইংরেজি ভাষার প্রচলন এবং রাজভাষা ফার্সি অবলুপ্তকরণ; ইংরেজি-শিক্ষিত আমলা-কেরানি-মুৎসুদ্দি-জমিদার-বুদ্ধিজীবী শ্রেণি তৈরি; দেশীয় ঐতিহ্য-সংস্কৃতির বিরুদ্ধে ইউরোপীয় সংস্কৃতির আধিপত্য এবং হিন্দু-মুসলিম বিভেদ ও সাম্প্রদায়িকীকরণ।
এদিকে মুসলমানদের ছিল অন্যতর সংকট। সমন্বয়বাদী মুসলিম শাসনকালেও রাষ্ট্র-রাজ্য-প্রদেশের শাসনকার্য ও প্রশাসনের বিভিন্ন পদে উচ্চবর্ণ ও বণিক হিন্দুদের ছিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ফলে নতুন শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গেও তারা দ্রুত আত্তীকৃত হয়। অন্যদিকে শাসক ও রাজন্যবর্গ মুসলিম হলেও তারা ছিল ভিনদেশি এবং তাদের আমির-ওমরাহ, উজির-নাজির বা সৈন্য-সামন্তরাও ছিল তাদের দেশীয় বা আরব-তুর্কি-পার্সি-মধ্য এশীয়। স্থানীয়রা পাইক-পেয়াদার বেশি পদমর্যাদা খুব কমই লাভ করতে পেরেছে। সোজা কথায়, ধর্ম এক হলেও শাসক ও শাসিতের শ্রেণি-ব্যবধান ছিল আকাশ-পাতাল। এই ব্যবধান এতটাই তীব্র ছিল যে, ঐতিহাসিকদের মতে, মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় পলাশীর প্রান্তরে ১৭৫৭ সালে যে সামান্য ইংরেজ সৈন্যরা নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ও বাংলার পতন ঘটাল, তখন যেসব বাঙালি এই দৃশ্যের দর্শক ছিল, তারা চাইলে কেবল ঢিল ছুড়েই ইংরেজদের ছিন্নভিন্ন করে দিতে পারত। আবার রবার্ট ক্লাইভ যখন মুর্শিদাবাদের রাজকোষ শূন্য করে অজস্র সোনা-দানা-মোহরভর্তি বিরাট নৌবহর নিয়ে কলকাতায় পাড়ি জমাল, তখনও হাজার হাজার জনতা নদীতীরে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য উপভোগ করেছে! তাদের ভুলেও মনে আসেনি, এর মধ্য দিয়ে বঙ্গ উজাড় করার আনুষ্ঠানিক সূচনা হলো, পরবর্তীকালে যুগ যুগ ধরে যার শিকার হবে তারা প্রত্যেকেই, যতক্ষণ পর্যন্ত না ওরা এদেশ থেকে চিরতরে বিদায় হবে। এসব সত্ত্বেও কী এক জাত্যাভিমানে এদেশের মুসলমানরা নিজেদের ‘রাজার জাত’ মনে করত এবং ইংরেজ শাসকের দেওয়া সব সুযোগ-সুবিধা নিতে অস্বীকার করল, এমনকি তাদের শিক্ষাও বর্জন করল। এরপর শতবর্ষব্যাপী নানা বিদ্রোহ-সংগ্রাম-আত্মদানের পর এলো ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি নির্বিশেষে দেশপ্রেমিকদের সমর্থনে ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহ। এর পরিণামে নামমাত্র ভারত সম্রাট শেষ মোগল বাহাদুর শাহেরও পতন ঘটল, অসংখ্য মানুষ ফাঁসিতে ঝুলল এবং ইংরেজ অচিরেই পুরো ভারতবর্ষে জেঁকে বসল। একটি বিরাট প্রচেষ্টা বিফলে গেল এবং ইংরেজ হিন্দু-মুসলিম বিরোধের বিষবৃক্ষ বপন করল। এই রূঢ়-কঠিন বাস্তবের মুখে মুসলমানরা উপলব্ধি করল, তারা যে তিমিরে ছিল তার চেয়েও অন্ধকারে চলে গেছে, সব দিক থেকেই পিছিয়ে পড়েছে। এরপর ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগে যখন তারা ইংরেজদের শিক্ষা ও প্রশাসনের ভাগিদার হতে চাইল, ততদিনে হিন্দু উচ্চবিত্ত-মধ্যবিত্ত শ্রেণির কয়েক প্রজন্মের পরম্পরা তৈরি হয়ে গেছে। ফলে এক ধরনের জাগরণের প্রয়োজনে মুসলমানরাও ঐক্যবদ্ধ হতে চাইল। পরিণামে প্রথম সর্বজাতীয়, পরে হিন্দুপ্রধান সর্বভারতীয় কংগ্রেস দলের বিপরীতে তৈরি হলো মুসলমানদের রাজনৈতিক দল নিখিল ভারত মুসলিম লীগ। এটি গঠিত হলো পলাশী-পতনের ঠিক ১৪৮ বছর পর, ঢাকার নবাববাড়িতে, স্যার সলিমুল্লাহর নেতৃত্বে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে, যদিও দলটির জন্ম পূর্ব বাংলার ঢাকায়; কিন্তু এর নেতৃত্বের পুরোভাগে রইলেন অবাঙালিরাই এবং বঙ্গের মুসলমানদের তুমুল সমর্থন থাকা সত্ত্বেও, তাদের নেতাদের সঙ্গে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতা থেকেই গেল। বরং এ ভূখণ্ডের মানুষের শিক্ষা-সংস্কৃতি-ঐতিহ্যের ব্যাপারে তাদের কোনো আগ্রহই ছিল না। এমনকি বাংলা ভাষার ব্যাপারেও তাদের ভূমিকা ও দৃষ্টিভঙ্গি ছিল রহস্যময়। অভিজাত মুসলমানরা মনে করতেন উর্দু-ফার্সি তাদের ভাষা, বাংলা চাষাভুষো মুসলমান আর হিন্দুদের ভাষা। ফলে এমনকি চল্লিশের দশক পর্যন্ত, কিছু ব্যতিক্রম বাদে, এরা ‘ভারতীয় মুসলমানদের একক ভাষা’ হিসেবে উর্দুর পক্ষে লড়াই করলেন। আর পাকিস্তান সৃষ্টির এক বছরের মাথায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সমাবর্তনে এসে জিন্নাহ তো রীতিমতো হুকুমের সুরেই বললেন, “উর্দু, একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা।” আর তাৎক্ষণিকভাবে ‘পাকিস্তান-পিতা’ প্রতিবাদের মুখোমুখিই হলেন না, বস্তুত তিনি নিজের হাতেই বাংলায় পাকিস্তানের কবর রচনা করে গেলেন। আর ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে রক্তদানের ভিতর দিয়ে ভাষার সূত্র ধরেই চাষাভুষো কাঙাল বাঙালরা প্রথম সবচেয়ে তীব্র জাতীয়তাবাদী চেতনায় ঐক্যবদ্ধ হলো এবং স্বাধীনতার পথে যাত্রা শুরু করল। তবে এর জন্য অপেক্ষা করতে হলো আরও দুই দশক, কারণ তাদের স্বপ্নের নায়ক শেখ মুুজিবও তখন প্রস্তুত হচ্ছিলেন। আর সেই দৃঢ় ও সাহসী পুরুষ ছাড়া এই অসম্ভবকে সম্ভব করারও কোনো উপায় ছিল না।

৩.
এই সূত্র ধরেই ধরে বাংলার রাজনীতি ও নেতৃত্বের দিকে একটু ফিরে তাকাতে হয়। পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষ কিছুটা উপকৃত হলেন তখনই, যখন এ ভূখ-ের সর্বভারতীয় নেতা শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী হলেন। কিন্তু সেখানেও তিনি মুসলিম লীগেরই রাজনীতির শিকার হলেন। এই রাজনীতির একটি করুণ চিত্র তুলে ধরেছেন অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম : “১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুসারে ব্রিটিশরা আমাদের এই অঞ্চলে কিছুটা প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন দিয়েছিল। সেই ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুসারে এদেশে (অবিভক্ত বাংলায়) প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকার ভিত্তিতে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৩৭ সালে। সেই নির্বাচনে অবিভক্ত বাংলার আইন সভায় তিনটি দল মোটামুটিভাবে প্রায় সমান সমান আসন দখল করেছিল। একটি ছিল এ. কে. ফজলুল হকের নেতৃত্বে কৃষক প্রজা পার্টি, আরেকটি ছিল কংগ্রেস আর তৃতীয়টি ছিল আকরাম খাঁ, খাজা নাজিমুদ্দিন এঁদের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ। তো সেই নির্বাচনে কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেনি। সুতরাং সেখানে কোয়ালিশন সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছিল। শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হকের ইচ্ছা ছিল কংগ্রেসের সাথে কোয়ালিশন করার এবং সেই বিষয়ে তিনি নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সম্মতিও গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু কংগ্রেস, বিশেষ করে পণ্ডিত নেহেরু (কংগ্রেস নেতা) কংগ্রেসের কোনোরকম কোয়ালিশনে যাওয়ার বিরোধী ছিলেন। ফলে শেরে বাংলা (তখন শেরে বাংলা তিনি হননি) এ. কে. ফজলুল হক সাহেব মুসলিম লীগের সাথে কোয়ালিশন করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
তাতে একটা ভালো ফল পাওয়া গিয়েছিল, সেটা হলো- তখনকার নিখিল বঙ্গ বা নিখিল বঙ্গীয় মুসলিম লীগ এবং কৃষক প্রজা পার্টি এই দুটো কোয়ালিশন সরকার গঠিত হবার ফলে তার যে নেতৃত্ব সেটি শেরে বাংলার ওপরে অর্পিত হয়। এ. কে. ফজলুল হকের সেই প্রধানমন্ত্রিত্ব এতটাই জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল যে, সেটা সেকালে (ইংরেজ আমলে) প্রায় কিংবদন্তিতুল্য ছিল। কয়েকটা কাজ তিনি করেছিলেন। জমিদারি প্রথার কারণে প্রজারা যেভাবে নিষ্পেষিত হচ্ছিল, তাদের পরিত্রাণ দেবার জন্য তিনি ঋণ শালিসি বোর্ড করেছিলেন এবং বোর্ডের মাধ্যমে তাদের একটা রিলিফের (মুক্তি?) ব্যবস্থা করেছিলেন। এছাড়া এখানে প্রাথমিক শিক্ষার কোনো ব্যবস্থা ছিল না, প্রাথমিক শিক্ষার বিল তিনি পাস করিয়েছিলেন। তো এই প্রজাস্বত্ব আইন, প্রাথমিক শিক্ষা বিল ইত্যাদি কারণে এ. কে. ফজলুল হক সাহেবের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে পৌঁছে গিয়েছিল। যার ফলে ১৯৪০ সালে লাহোরে যখন মুসলিম লীগ কাউন্সিল অধিবেশনে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপনের দিন ধার্য হলো তখন জিন্নাহ সাহেব এ. কে. ফজলুল হককে অনুরোধ করলেন যে, তিনি (ফজলুল হক) যেন সে লাহোর প্রস্তাবটি উত্থাপন করেন। লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করার জন্য যখন এ. কে. ফজলুল হক সাহেব লাহোরে মুসলিম লীগ কাউন্সিলের অধিবেশনে প্রবেশ করছিলেন তখন স্বয়ং জিন্নাহ সাহেবের ‘শেরে বাঙ্গাল-জিন্দাবাদ’ ধ্বনিতে লাহোর প্রকম্পিত হচ্ছিল। সেই থেকে কিন্তু তিনি শেরে বাংলা। এই লাহোর প্রস্তাবটাই পরবর্তীকালে পাকিস্তান প্রস্তাবে রূপান্তরিত হয়েছিল। কিন্তু তার কিছুকাল পরেই যে কা-টি ঘটল (তখন দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলছে)- ভারতের ভাইসরয় একটা ওয়ার কাউন্সিল গঠন করলেন এবং সেই ওয়ার কাউন্সিলে প্রত্যেকটি প্রদেশের প্রধানমন্ত্রী এক্স অফিসিও মেম্বার হিসেবে নির্বাচিত হলেন। বাংলা থেকে প্রধানমন্ত্রী এ. কে. ফজলুল হক। কিন্তু জিন্নাহর অনুমতি না নিয়ে ফজলুল হক সাহেব ওই ওয়ার কাউন্সিলে কেন যোগ দিলেন সেজন্য জিন্নাহ সাহেব ফজলুল হককে মুসলিম লীগ থেকে বহিষ্কৃত করে দিলেন। যে ফজলুল হকের জন্যে মুসলিম লীগ বাংলায় ক্ষমতায় যেতে পেরেছিল, যে ফজলুল হকের জন্যে বাংলায় শেরে বাংলা মন্ত্রিসভা এত জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল, যাকে দিয়ে জিন্নাহ সাহেব লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করিয়েছিলেন তাঁকে তিনি মুসলিম লীগ থেকে বের করে দিলেন। তখন ফজলুল হক সাহেব বাধ্য হয়ে হিন্দু মহাসভার ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জীর সাথে একটা কোয়ালিশন সরকার গঠন করলেন।” [‘বাংলার রাজনৈতিক নেতৃত্ব’ (বঙ্গবন্ধু স্মারক বক্তৃতা), আয়োজক বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি]
একই সঙ্গে তার মারাত্মক ভুল নিয়েও আলোকপাত করেন তিনি : “এটা ফজলুল হক সাহেব একটা ভ্রান্ত কাজ করলেন, কারণ হিন্দু মহাসভা অত্যন্ত সাম্প্রদায়িক একটা দল। জিন্নাহ সাহেবও সে সুযোগ নিলেন এবং শেরে বাংলা অবিভক্ত বাংলার রাজনীতিতে একটা অপাঙ্ক্তেয় হয়ে গেলেন। যিনি শেরে বাঙ্গাল ছিলেন, এই কয়েকটি কারণে তার যে অভূতপূর্ব জনপ্রিয়তা ছিল তা সত্ত্বেও তিনি ক্ষমতা হারালেন। শুধু তাই নয়, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা হবার পর তিনি ঢাকায় এলেন। তখন পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দিন। যে খাজা নাজিমউদ্দিন ফজলুল হকের বিরুদ্ধে এতসব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন সে নাজিমউদ্দিনের অধীনে অ্যাটর্নি জেনারেলের চাকরি গ্রহণ করলেন তিনি। শেরে বাংলার এটা কোনো প্রয়োজন ছিল না, কারণ তাঁর মতো এত নামজাদা একজন উকিল- তিনি কেন অ্যাটর্নি জেনারেলের চাকরি গ্রহণ করবেন? তিনি যদি প্র্যাকটিস করেন তার থেকেই তাঁর অনেক বেশি আয় হতে পারে। যাই হোক, তারপরে যখন ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলা প্রদেশে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলল তখন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হলো। এই যুক্তফ্রন্ট আওয়ামী লীগ, কৃষক-শ্রমিক দল এবং অন্যদের নিয়ে একুশ-দফার ভিত্তিতে গঠিত হলো। একুশে ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে গুলিবর্ষণে বেশ কয়েকজন শহিদ হয়েছিলেন, সেই স্মৃতিকে জাগরূক রাখার জন্য একুশ-দফা করা হয়েছিল। এই একুশ-দফার প্রথম দফাই ছিলÑ একুশে ফেব্রুয়ারিকে শহিদ দিবস ঘোষণা করতে হবে, একুশে ফেব্রুয়ারিতে ছুটি ঘোষণা করতে হবে, বর্ধমান হাউজকে (পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন) বাংলা একাডেমি করতে হবে ইত্যাদি। এই একুশ-দফার ভিত্তিতে শেরে বাংলার নেতৃত্বে ওই নির্বাচনে মুসলিম লীগের চূড়ান্ত ভরাডুবি ঘটল এবং মুসলিম লীগ আমাদের পূর্ব বাংলার রাজনীতি থেকে স¤পূর্ণ মুছে গেল। নূরুল আমিন (খাজা নাজিমউদ্দিনের পর যিনি এখানের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন) নির্বাচনে ছাত্রলীগ নেতা খালেক নেওয়াজ খানের কাছে পরাজিত হলেন। শেরে বাংলার নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠিত হলো; কিন্তু এ মন্ত্রিসভা দুই মাসের বেশি টিকতে পারল না। তাঁকে বরখাস্ত করে দেয়া হলো। তারপরে একটা মজার ঘটনা ঘটল! যুক্তফ্রন্ট ভাগ হয়ে গেলÑ কৃষক প্রজা, আওয়ামী লীগ ইত্যাদিতে। আমরা দেখলাম কেন্দ্রীয় সরকারের যিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন (ইস্কান্দার মির্জা; যিনি ফজলুল হককে ট্রেইটর বলেছিলেন) তিনি তার কথার অধীনে যে পূর্ব বাংলা শাসিত হচ্ছিল সেখানে তিনি গভর্নর নিযুক্ত হয়ে এসেছিলেন, সেই কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ সরকারে ফজলুল হক সাহেব শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করছেন। এমন অদ্ভুত বৈপরীত্য শেরে বাংলার মতো একজন জনপ্রিয় নেতার মধ্যে আমরা দেখতে পাই। পরবর্তীকালে এখানে যখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতা দখল করে অর্থাৎ সরকার গঠন করে তখন কেন্দ্রীয় সরকার ফজলুল হক সাহেবকে পূর্ব বাংলার গভর্নর নিযুক্ত করেন, যাতে আওয়ামী লীগকে তিনি বাড়াবাড়ি করতে না দেনÑ এরকম বিভিন্ন কিছু বিবেচনায় রেখে। কাজেই শেরে বাংলার রাজনৈতিক জীবন যদি আমরা পর্যালোচনা করি, তাহলে এমন জনপ্রিয় নেতাকে যেমন আমরা দেখব না, তেমনি আবার তার রাজনৈতিক যে সিদ্ধান্তসমূহ সেগুলো সম্পর্কে যেসব প্রশ্নবোধক চিহ্ন রয়ে গেছে তারও উত্তর মেলা ভার। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক হলো আমাদের প্রথম জনপ্রিয় পার্লামেন্টারি রাজনৈতিক নেতা, যিনি তার জীবনে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠেছেন আবার রাজনৈতিক ভুল-ভ্রান্তির কারণে তার পতনও হয়েছে।” [পূর্বোক্ত]
“শেরে বাংলার পর যদি জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা কাউকে বলতে হয় তবে তিনি আবদুল হামিদ খান ভাসানী।” এ কথা উল্লেখ করে ড. রফিকুল ইসলাম তার মূল্যায়ন করেন এভাবে :
“মওলানা ভাসানী যখন আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন তখন তাঁরই চেষ্টায় কারারুদ্ধ শেখ মুজিবুর রহমানকে আওয়ামী লীগের যুগ্ম স¤পাদক করা হয়। অপর যুগ্ম স¤পাদক ছিলেন খোন্দকার মোশতাক আহমেদ (বাংলার নব্য মীরজাফর)। খোন্দকার মোশতাক মওলানা ভাসানীকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছিলেন যে, ও (শেখ মুজিবুর রহমান) তো জেলে, ওকে যুগ্ম স¤পাদক করলে আমাদের সংগঠনের কাজ কীভাবে হবে? কিন্তু মওলানা ভাসানী মোশতাকের কথা শোনেননি।
তিনি শেখ সাহেবকে যুগ্ম স¤পাদক করেছিলেন এবং পরবর্তীকালে শেখ সাহেব জেল থেকে বেরিয়ে আওয়ামী লীগ সংগঠনটিকে কীভাবে দাঁড় করিয়েছিলেন সেটা আপনারা সবাই জানেন। কিন্তু মওলানা ভাসানীর একটা সমস্যা ছিল। তা হলো তাঁর মধ্যে কনসিসটেন্সের অভাব ছিল। যেমন- তিনি ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ’৫৪ সালের নির্বাচনে তিনি যুক্তফ্রন্টের প্রতিষ্ঠাতা এবং অন্যতম নেতা। কিন্তু তিনি নিজে নির্বাচনে দাঁড়াননি। কারণ তিনি পার্লামেন্টারি রাজনীতি পছন্দ করতেন না। ভালো কথা; কিন্তু তাঁর হঠাৎ কী ভাবনা হলো যে তিনি আওয়ামী লীগ ছেড়ে ১৯৫৬-৫৭ সময়ের দিকে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি নামে নতুন দল গঠন করলেন। এই যে রাজনৈতিক দল পরিবর্তন এটা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ক্ষেত্রে, বিশেষত যিনি এখানকার আওয়ামী লীগের প্রধানÑ তাঁর পক্ষে কিন্তু মানানসই ছিল না। তাছাড়া ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি কিছুটা বামঘেঁষা ছিল। মওলানা ভাসানীও ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিতে যোগদানের পর থেকে কিছুটা বামঘেঁষা পলিটিক্স করতে শুরু করেন। যেখানে আওয়ামী লীগের রাজনীতি ছিল সম্পূর্ণরূপে জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এবং ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পরপর আওয়ামী লীগ একটি ধর্মনিরপেক্ষ দলে পরিণত হয়। তখন সবাই আওয়ামী লীগের সদস্য হতে পারত। হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না। সেদিক থেকে মওলানা ভাসানীর আওয়ামী লীগে থাকা নিয়ে কোনো অসুবিধা ছিল না। কিন্তু তিনি দল পরিবর্তন করে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠন করে তা নিয়েই ব্যস্ত থাকলেন। তারপরে যখন আইয়ুব খান ক্ষমতায় এলেন তখন সমস্যা দেখা দিল। তার যে বৈদেশিক নীতি তাতে ভারতবিদ্বেষ এবং চীনাপ্রীতি ছিল। এর আগে ভারত-চীন সীমান্তে সংঘর্ষ হয়েছিল। আর মওলানা ভাসানীর চীনের প্রতি দুর্বলতা ছিল। চীনের প্রতি দুর্বলতার কারণে আইয়ুববিরোধী কোনো সংগ্রামে মওলানা ভাসানীর প্রত্যক্ষ কোনো যোগাযোগ আমরা দেখতে পাই না। এটা কিছুটা বিস্ময়কর! এমনকি মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি যখন ভারতে ছিলেন তখন ভারত সরকারকে প্রস্তাব দিয়েছিলেনÑ তাকে যেন চীনে যেতে দেয়া হয়, তিনি চীনের নেতাদের বোঝাবেন যে, পাকিস্তান বাংলাদেশের ওপরে কী অত্যাচার করছে। ভারত সরকার অবশ্য তাঁকে চীনে যেতে দেননি। একটা পর্যায়ে তিনি মিসেস ইন্দিরা গান্ধীকে প্রস্তাব করেছিলেন যে, ভবিষ্যতে ভারত এবং বাংলাদেশ যেন একটা কনফেডারেশন গঠন করে। তখন মিসেস গান্ধী তাঁকে বলেছিলেন যে, আপনি যদি এসব প্রশ্ন এখন উত্থাপন করেন তাতে আপনাদের মুক্তিযুদ্ধ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এখন এসব প্রসঙ্গ আপনি বাদ রাখুন। তবুও মুজিবনগর সরকার মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছিল, এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে এবং মওলানা ভাসানী এই মুজিবনগর সরকারের যাতে বিরুদ্ধাচরণ করতে না পারে তার একটা ব্যবস্থা নিতে সক্ষম হয়েছিলেন।
এই যে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, যাকে কেন্দ্র করে ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান বা গণবিস্ফোরণ সেখানে কিন্তু মওলানা ভাসানী প্রথমে এর থেকে দূরে ছিলেন। কিন্তু শেষে যখন আরও বিভিন্ন ঘটনাবলির সাথে দেখা গেল আইয়ুব খানের পতন হচ্ছে, তখন দেখা গেলÑ তিনি হঠাৎ একদিন বায়তুল মোকাররমে গিয়ে এ আন্দোলনের পক্ষে কিছু কথা বলছেন। অর্থাৎ মওলানা ভাসানীর রাজনীতির মধ্যে এমন কিছু স্ববিরোধিতা ছিল যা আল্টিমেট এনালাইসিসে আমাদের বাংলাদেশের যে আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার বা স্বাধিকার সংগ্রাম তার পক্ষে খুব একটা সহায়ক ভূমিকা পালন করেনি।” [পূর্বোক্ত]

একই সূত্র ধরে তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক গুরু হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর অনেক ভুল সিদ্ধান্তের বিশ্লেষণ করে বলেন : “অবিভক্ত বাংলায় শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের পর খাজা নাজিমউদ্দিন ছিলেন। কিন্তু খাজা নাজিমউদ্দিন ঢাকা নবাব পরিবারের। বাংলায় তার কোনোরকম জনপ্রিয়তা ছিল না। তিনি তার নিজের জমিদারি পটুয়াখালীতে ’৪৬ সালের নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন এবং সোহরাওয়ার্দী সাহেব (অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী) তাকে দিনাজপুর বালুরঘাট কেন্দ্র থেকে নির্বাচন করিয়েছিলেন। জিন্নাহ সাহেব আবার সোহরাওয়ার্দীকে বিভিন্নভাবে ব্যবহার করেছেন। ’৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ বাংলা ছাড়া আর কোথাও সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। পাঞ্জাবে ইউনিয়নিস্ট পার্টির সাথে তাকে কোয়ালিশন করতে হয়েছে, সিন্ধুতে জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের সাথে হাত মেলাতে হয়েছে, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে খান আবদুল গাফফার খান-খান ওয়ালী খান তাদের নেতৃত্বে সেখানে রেড শর্ট সরকার গঠন করেছে। সুতরাং একমাত্র অবিভক্ত বাংলায় সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিম এবং সাথে বঙ্গবন্ধু তখন রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে এসে গেছেন- এঁদের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে। আর কোথাও না। বিভিন্ন প্রাদেশিক পরিষদে যাঁরা নির্বাচিত হয়েছেন এবং মুসলিম লীগ থেকে কেন্দ্রীয় আইনসভায় যাঁরা নির্বাচিত হয়েছিলেন জিন্নাহ সাহেব তাঁদের নিয়ে দিল্লিতে একটি সভা ডাকলেন। যেহেতু সোহরাওয়ার্দী একমাত্র মুসলিম লীগ নেতা যিনি সরকার গঠন করতে পেরেছিলেন তাই সোহরাওয়ার্দীকে দিয়ে তিনি সেই সভায় লাহোর প্রস্তাবের এমেন্ডমেন্ট আনালেন। তা হলো- আগে ছিল ভারতে উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্বাংশে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে একাধিক রাষ্ট্র (স্বাধীন স্টেটস) গঠিত হবে। সোহরাওয়ার্দীকে দিয়ে জিন্নাহ ওই স্টেটসকে এমেন্ড করিয়ে করালেন স্টেট। এই কিন্তু আমাদের দুর্দশার শুরু হলো। যেখানে আমাদের আলাদা রাষ্ট্র হওয়ার কথা ছিল, সেখানে আমরা পাকিস্তানের লেজুড় হয়ে গেলাম। তারপর শেরে বাংলাকে যেমন একটা অজুহাতে মুসলিম লীগ থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকেও জিন্নাহ তাই করলেন এবং খাজা নাজিমউদ্দিনকে এই পূর্ব বাংলার প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করলেন। এই দুইজন নেতার প্রতি জিন্নাহ সাহেবের যে আচরণ তার থেকে আমাদের নেতারা কতটুকু শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন আমরা জানি না। কিন্তু ইতিহাস বড় নির্মম। যদি আমরা আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করি, তাহলে এই নেতাদের যে পরিণতি পাওয়া যায় সেটা আমাদের জন্য খুবই বেদনাদায়ক মনে হয়। সেই সোহরাওয়ার্দী সাহেব যখন ঢাকায় এলেন খাজা নাজিমউদ্দিন তখন চিফ মিনিস্টার; সোহরাওয়ার্দীকে পূর্ব পাকিস্তান থেকেও বের করে দেয়া হলো। তিনি চলে গেলেন করাচিতে, সেখানে আইন ব্যবসা শুরু করলেন। একসময় অবিভক্ত বাংলায় তার মন্ত্রিসভায় মন্ত্রী ছিল বগুড়ার মোহাম্মদ আলী। মোহাম্মদ আলী মুসলিম লীগ ও সামরিক বাহিনীর ক্ষমতাসীন এবং আমেরিকার আশীর্বাদপুষ্ট। কারণ, এর আগে তিনি ওয়াশিংটনে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তো করাচির পর সোহরাওয়ার্দী সাহেব এই বগুড়ার মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভায় আইনমন্ত্রী হলেন। এটা অত্যন্ত অপমানজনক ছিল। আর তার চেয়ে বেশি হলো এই যে একটা মিশনে তারা তাঁকে ব্যবহার করল; তিনি ঢাকায় এসে বললেন যে, পাকিস্তানের সংবিধান তৈরি হবে by convention, not by constituent assembly. একটা দেশের সংবিধান কী করে একটা সভা করে তৈরি করা যায় এটা আমাদের মাথায় ঢোকে না। এই প্রস্তাব নিয়ে যখন সোহরাওয়ার্দী এলেন আমরা তার সাথে কারকুনবাড়ি লেনে ইয়ার মাহমুদ খানের বাসায় দেখা করতে গেলাম। তাকে বললাম যে, আপনি একজন গণতন্ত্রের মানসপুত্র বলে পরিচিত, আপনি এটা করবেন না, আপনি গণপরিষদ ছাড়া পাকিস্তানের সংবিধান রচনায় যাবেন না। তিনি আমাদের কথা না শুনে উল্টো নানান রকমের উপদেশ দিতে লাগলেন।” [পূর্বোক্ত]

৪.
ওপরের পর্যালোচনা থেকে জাতীয় তিন নেতার এসব ভুলের বিপরীতে যখন তাদেরই তরুণতম শিষ্য শেখ মুজিবের রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করা হয়, তখন বিরল ব্যতিক্রম চোখে পড়ে। ’৫৪ সালে পূর্ব পাকিস্তানে যখন আওয়ামী লীগ প্রথম মন্ত্রিসভা গঠন করে তখন মাত্র ৩৪ বছর বয়সে মন্ত্রী হন। কিন্তু পরে তিনি “মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেন এ কারণে যে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাঁকে আওয়ামী লীগ গঠন করতে হবে, আওয়ামী লীগকে একটি জনপ্রিয় এবং সার্বজনীন রাজনৈতিক দলে পরিণত করতে হবে। এমন উদাহরণ (মন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেয়া) কিন্তু এর আগে বা পরে আমরা দেখি না।” [পূর্বোক্ত] বরং তার দুই প্রধান পূর্বসূরি শেরেবাংলা-সোহরাওয়ার্দী ক্ষমতায় থাকার জন্য কত ধরনের আপস আর আত্ম-অবমাননাই না করেছেন! বিপরীতে বঙ্গবন্ধু, প্রায় কৈশোর থেকেই স্বাধীনতা লাভ পর্যন্ত কীভাবে অন্তহীন জেল-জুলুম-হত্যা-হুমকি আর নির্যাতনের মধ্যেও নিজের বিশ্বাস স্বপ্ন ও সততায় এত আস্থাশীল ছিলেন! এর প্রধান কারণ নিজের মাটি-মানুষ-মাতৃভাষার প্রতি অন্তহীন প্রেম, যা তাকে মৃত্যুভয়কেও তুচ্ছ করতে প্রেরণা দিয়েছিল। মাতৃভূমি বাংলার প্রতি তার ভালোবাসা এত তীব্র যে, এদেশের স্বার্থে তিনি তার প্রধান রাজনৈতিক গুরু সোহরাওয়ার্দীর নির্দেশও অগ্রাহ্য করেছিলেন। “সোহরাওয়ার্দী যখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হলেন তখন তিনি কনভেনশনের মাধ্যমে না, কন্সটিটুয়েন্ট এসেম্বলির মাধ্যমে সংবিধান তৈরি করলেন। কিন্তু সেই সংবিধানে একটা সর্বনাশ হয়ে গেল। দুই ইউনিটে তা প্রতিষ্ঠা হলো। পশ্চিম পাকিস্তান একটা ইউনিট, আর পূর্ব পাকিস্তান একটা ইউনিট যাতে সমান সমান প্রতিনিধি। অর্থাৎ আমাদের যে ৫৪-৫৫% ছিল, তার ৪-৫% চলে গেল। বঙ্গবন্ধু এই সংবিধানে স্বাক্ষর করেননি। তিনি বলেছিলেন যে ‘বাঙলা’ নামটা ‘বে অব বেঙ্গল’ ছাড়া আর কোথাও রইল না! পাঞ্জাবের নাম থাকল, সিন্ধুর নাম থাকল, বেলুচিস্তানের নাম থাকল, পূর্ব বাংলার নাম থাকল না! এতে বোঝা যায় যে বঙ্গবন্ধু তখন থেকেই অর্থাৎ সোহরাওয়ার্দীর জীবদ্দশাতেই কীভাবে বাংলার স্বার্থ নিয়ে বিচলিত ছিলেন। তারপরে যখন আইয়ুব খানের মার্শাল ল’ হলোÑ একে একে প্রথমে শেরে বাংলা বিদায় নিলেন, তারপর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীÑ যাকে আইয়ুব খান বিদেশে নির্বাসনে পাঠিয়েছিল। বিদেশ থেকে ঢাকায় তার মৃতদেহ এলো এবং এখানেই শেরে বাংলার কবরের পাশে তার দাফন হলো। তখন বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব গ্রহণ করার পর ভারত এবং পাকিস্তান যে যুদ্ধ বাঁধল তাতে একটা বিষয় স্পষ্ট হলো, তা হলো পূর্ব পাকিস্তান সম্পূূর্ণরূপে অরক্ষিত। ডিফেন্সের ৯০ ভাগ খরচ হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানে। যে টাকাটা আসত আমাদের পাট রপ্তানি থেকে। তখনকার দিনে কোরিয়ার যুদ্ধ, ভিয়েতনামের যুদ্ধ প্রভৃতিতে অনেক বালুর বস্তা প্রয়োজন হতো। এ বালুর বস্তা তৈরি হতো পাট দিয়ে সেজন্য আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের খুব চড়া দাম ছিল। কিন্তু সেই ডিফেন্সের ৯০ ভাগ খরচ হতো পশ্চিম পাকিস্তানে আর পাকিস্তান আর্মির ৯০ ভাগই ছিল পাকিস্তানের, যার অধিকাংশ ছিল পাঞ্জাবি। তো পাক-ভারত যুদ্ধের মধ্য দিয়ে যে অবস্থা দেখা গেল তাতে আমরা সম্পূর্ণরূপে ভারতের দয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে রইলাম। ভারত ইচ্ছা করলে তখন পূর্ব বাংলা নিয়ে নিতে পারত, কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে নেয়নি।”
“এই প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধু তাঁর ছয়-দফা পেশ করলেন। এর মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির মৌলিক যে অবদান তাঁর সূচনা ঘটল। এই ছয়-দফাটা কী ছিল? ছয়-দফা ছিল যে পাকিস্তান একটা লুজ কনফেডারেশন হবে এবং সেখানে পাকিস্তানের দুটি আলাদা প্রায় স্বায়ত্তশাসিত প্রদেশ হবে। কেন্দ্রের হাতে কেবলমাত্র ফরেন পলিসি এবং দেশরক্ষা থাকবে। আর অর্থনীতি হয়ে যাবে টু-ইকোনমি। এখানকার অর্থনীতি একরকম, ওখানকার অর্থনীতি আরেকরকম হয়ে যাবে। এই ছয়-দফা আন্দোলনের জন্যই কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে (বঙ্গবন্ধু এমনিতেই গ্রেফতার ছিলেন) আগরতলা মামলায় জড়ানো হলো। প্রথমে লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মোয়াজ্জেম এটার এক নম্বর আসামি ছিলেন, পরে বঙ্গবন্ধুকে এক নম্বর আসামি করা হলো। এর কারণই হচ্ছে বঙ্গবন্ধুর সেই ছয়-দফা। এই ছয়-দফা তিনি লাহোরে আওয়ামী মুসলিম লীগেরই একটি কনভেনশনে প্রথম উত্থাপনের চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু সফল হননি। তারপর তিনি দেশে ফিরে এসে প্রথম চট্টগ্রাম লালদিঘির ময়দানে এক জনসভায় তুলে ধরলেন। এই ছয়-দফার জন্যে তাকে দেশের শত্রুসহ এমন কোনো বিশেষণ নেই, যা প্রয়োগ করা হয়নি, তাঁকে অপাঙ্ক্তেয় করবার জন্য। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাঁর ছয়-দফায় অটল ছিলেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় তাঁকে অভিযুক্ত করার পর ছাত্ররা প্রথম এগিয়ে এলো এগারো-দফার মাধ্যমে। ঊনসত্তরের যে গণ-অভ্যুত্থান হলো তারও মূল কারণ ছিল শেখ সাহেবকে বন্দিদশা থেকে মুক্ত করা। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি তারিখে শেখ সাহেবকে মুক্ত করা হলো এবং ২৩ ফেব্রুয়ারিতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তাঁকে বঙ্গবন্ধু খেতাব দেয়া হলো। এই ছয়-দফা এবং এগারো-দফার ভিত্তিতে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের গণপরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিণত হলো। তখন ইয়াহিয়া খান ক্ষমতায়, এটা তারা আশা করেনি। এটা যখন হয়ে গেল তখন শুরু হলো ষড়যন্ত্র। ইয়াহিয়া খান ভুট্টোর কাছে ছুটে গেল কী করা যায়, তার উপায় বের করার জন্য। ঢাকায় পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশন আহ্বান করা হয়েছিল। সে গণপরিষদের অধিবেশন যখন স্থগিত করা হলো, সমগ্র পূর্ব বাংলা ফেটে পড়ল। চব্বিশ বছরের যে পুঞ্জিভূত ক্ষোভ, চব্বিশ বছর ধরে যে ওরা আমাদের পদদলিত করে রেখেছে, গোলাম করে রেখেছে, আমাদের পাটের টাকায়Ñ আমাদের নিউজপ্রিন্টের টাকায় তারা নতুন করে ইসলামাবাদে রাজধানী গড়ে তুলছেÑ সত্তরের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু সেটার জবাব দিলেন। উত্তরে তারা কী করল? গণপরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দিল, এখানে তারা আলাপ-আলোচনার ধাপ্পা দিয়ে সামরিক বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করা শুরু করল এবং ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার ও গণহত্যাযজ্ঞ শুরু হলো। বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণের কথা আপনারা স্মরণ করুন। বঙ্গবন্ধুর যদি ক্ষমতার লোভ এতই প্রবল হতো, তাহলে তিনি একটু ছাড় দিলেই তখন পাকিস্তানিরা তাঁকে ক্ষমতায় বসাত। পরে অবশ্য ভুট্টোর মতো অবস্থা হতোÑ আগে মেরে পরে ফাঁসিতে ঝুলাত।”
ড. রফিকুল ইসলামের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করে তাই আমরাও মনে করি, “আমাদের জীবনে আমরা যে কয়েকজন রাজনৈতিক নেতাকে দেখেছি- তার মধ্যে একমাত্র নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। যিনি নিজের ক্ষমতার লোভে, প্রতিষ্ঠার লোভে, প্রধানমন্ত্রিত্বের লোভে আপস করেননি। তিনি যদি আপস করতেন অনেক আগেই তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন। কিন্তু তিনি আপস করেননি। এই একমাত্র নেতার জন্যই আমরা মুক্তিযুদ্ধ করতে পেরেছি, আমরা স্বাধীন হতে পেরেছি এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করতে পেরেছি। তাঁর চারিত্র্যিক যে দৃঢ়তা, চারিত্র্যিক যে বলিষ্ঠতা এবং আমাদের বাংলার মানুষের অধিকার অর্জনে তাঁর আপসহীন যে রাজনীতি তা আমরা তাঁর পূর্বসূরিদের (তিনি যাদের রাজনৈতিক শিষ্য ছিলেন) মধ্যে সর্বদা দেখতে পাই না। কেন তাঁরা পারলেন না, এ বাংলার মানুষের দুঃখ দূর করতে? কেন বঙ্গবন্ধু পারলেন? তার কারণ হচ্ছে ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করে হলেও, সমষ্টিগত স্বার্থ তিনি বিসর্জন দেননি।” [পূর্বোক্ত]
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্ম না হলে, আমরা আজও স্বাধীনতার মুখ দেখতে পেতাম না। বলা হয়, সবচেয়ে ভালো পরাধীনতার চেয়ে নিকৃষ্টতম স্বাধীনতাও ভালো। আর বাঙালির সবচেয়ে কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা যিনি এনে দিয়েছেন, সেই মহান পিতার জন্মশতবর্ষে আমাদের অশ্রুসজল অন্তহীন সালাম।

লেখক : সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব ও মহাপরিচালক, বাংলাদেশ শিল্পকলা একডেমি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply