বসন্ত হাওয়ায় অমর একুশে

ঋতুরাজ বসন্ত ছুঁয়ে দিয়েছে প্রতিটি প্রাণ। পহেলা ফাল্গুনে বসন্তকে বরণ করা হয়েছে। বাঙালি হৃদয়কেও রাঙিয়ে রঙিন করেছে বসন্ত উৎসব। বাঙালি জাতির অন্যতম গৌরব ও গর্বের অমর একুশে ফেব্রুয়ারি মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালন করেছে বাঙালির সাথে গোটা বিশ্ব। এসব নিয়ে সোহাগ ফকিরের প্রতিবেদন

ফুল ফুটুক আর নাই ফুটুক আজ বসন্ত। কবির কবিতার মতোই শিমুল, পলাশ, গোলাপ ও গাদার রঙে রঙিন গোটা দেশ। ঋতুরাজ বসন্ত আগমনে ছুয়ে দিয়েছে প্রতিটি প্রাণ। পরিণত হয়েছে উচ্ছ্বাসে। সকাল হতে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন। আয়োজনের মধ্যে ছিল- বাংলার চিরায়ত গান, নাচ, নাটক, পিঠা উৎসব, শোভাযাত্রা, যন্ত্রসংগীত, কবিতা আবৃত্তি, পিঠা উৎসব ইত্যাদি। তরুণ-তরুণীরা সেজেছিল বাসন্তী রঙে। পরনে হলুদ-লাল শাড়ি-পাঞ্জাবি ও ফুলে রঙিয়েছে নিজেদের। শাহবাগসহ ফুলের দোকানগুলোতে ছিল ফুল বেচাকেনার ভিড়। এসব দোকান থেকে গোলাপ, গাদা, চন্দ্রমল্লিকাসহ নানা ফুলের মালা, ফুল ফুলের তোড়া, ফুলের টায়রা সংগ্রহ করতে দেখা যায়। কেউবা গালে রঙিন রঙে ‘শুভ বসন্ত’ লিখে ঘুরতে দেখা যায়। বাসন্তী আবিরে রঙিয়ে মানুষের ঢল নামে হাতিরঝিল, বেইলি রোড, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ধানমন্ডি লেক, রবীন্দ্র সরোবর, বলধা গার্ডেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোতে।
‘এসো মিলি প্রাণের উৎসবে’ সেøাগানকে লালন করে এবারে ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় বসন্ত উদযাপন পরিষদের বসন্ত উৎসবের আয়োজনে ছিল গান, কবিতা আবৃত্তি, দলীয় নৃত্য, বসন্ত কথন ইত্যাদি।
এছাড়াও শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনের মধ্যে ছিল একাডেমির নন্দন মঞ্চে নাচ, গান, আবৃত্তি এবং আলোচনা সভা। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে ব্যান্ডদল স্পন্দন, বাংলাদেশ একাডেমি অব ফাইন আর্ট, নন্দন কলা কেন্দ্র, মারমা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়, ধৃতি নৃত্যনালয়, সরকারি সংগীত কলেজ ও জগন্নাথ বিশ্বদ্যিালয় শিল্পীবৃন্দ এবং শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীবৃন্দ।
‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি।’ ভুলতে পারব না আমরা। ভুলতে পারবে না বিশ্ব। বাংলা ভাষার জন্য জীবন উৎসর্গকারী সকল শহিদদের বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে মানুষের ঢল নামে শহিদ মিনারে। কেউ কালো রঙের শাড়ি বা পাঞ্জাবি। কেউবা ধারণ করেছে কালো ব্যাজ। একুশে ফেব্রুয়ারি গৌরবে গাথা মহান শহিদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস যথাযথ মর্যাদায় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ভাব গাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পালন করেছে বাঙালির সাথে গোটা বিশ্ব। শহিদদের স্মরণে ১ মিনিট নীরবতা পালনের পাশাপাশি দেশে ও বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাস এগুলোতে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও অর্ধনমিত রাখা হয়। আয়োজন করা হয় পবিত্র ফাতেহা পাঠ, দোয়া ও মোনাজাত, আলোচনা অনুষ্ঠান এবং চিত্র প্রদর্শনী। বেতার ও বিভিন্ন টেলিভিশন একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে গান, কবিতা আবৃত্তি, নাটক ও আলোচনা বিষয়ক অনুষ্ঠান সম্প্রচার করে। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট কর্তৃক প্রবর্তিত এ দিনটিতে এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা জাতীয় পদক-২০২১’ ও ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা আন্তর্জাতিক পদক-২০২১’ প্রদান করা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানের ‘ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবিবুল্লা সিরাজী। বাংলাদেশে বিদ্যমান বিভিন্ন মাতৃভাষার কার্যক্রম ও বিকাশ প্রশস্ত করার স্বীকৃতিস্বরূপ জাতীয় অধ্যাপক বিশিষ্ট লেখক-গবেষক রফিকুল ইসলাম ও খাগড়াছড়ি জাবরং ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক মথুরা বিকাশ ত্রিপুরাকে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা জাতীয় পদক-২০২১’ এবং বলিভিয়ার অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অ্যাক্টিভিজমো লিংগুয়ান বা ল্যাংগুছেৎ অ্যাকটিভিজম ও উজবেকিস্তানের ইসমাইলভ গুলম মির জায়ালিজ-কে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা আন্তর্জাতিক পদক-২০২১’ প্রদান করা হয়েছে। শহিদদের স্মরণে ১ মিনিট নীরবতা পালনের পরই একুশের গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি’ সমবেত কণ্ঠে পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান।
অনলাইনে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভার্চুয়ালি উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘ভাষা মানুষের পরিচয়। এ পরিচয় মানুষকে সম্মানিত করে। আমরা রক্ত দিয়ে সেই সম্মান অর্জন করেছি। এটা আমাদের গৌরবময় অর্জন।’
এছাড়া রাজধানীর ওসমানী মিলনায়তনে একুশে পদক-২০২১ প্রদান করা হয়েছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের জন্য ২১ গুণীজনকে এই পদকে ভূষিত করা হয়। ভাষা আন্দোলনের জন্য মরণোত্তর একুশে পদক পেয়েছেন মোতাহার হোসেন তালুকদার, শামছুল হক, অ্যাডভোকেট আফছার উদ্দিন আহম্মেদ।
মুক্তিযুদ্ধে অবদানের জন্য গোলাম হাসনায়েন, ফজলুর রহমান খান ফারুক, বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দা ইসাবেলা।
শিল্পকলায় অবদানের জন্য কণ্ঠশিল্পী পাপিয়া সরোয়ার, অভিনেতা রাইসুল ইসলাম আসাদ, সালমা বেগম সুজাতা, আহম্মেদ ইকবাল হায়দার (নাটক), সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকি (চলচ্চিত্র), ড. ভাস্বর বন্দ্যোপাধ্যয় (আবৃত্তি) ও পাভেল রহমান (আলোকচিত্র)।
সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য অজয় দাস গুপ্ত, গবেষণায় অধ্যাপক ড. সমীর কুমার সাহা, শিক্ষায় বেগম মাহফুজা হক, অর্থনীতিতে ড. মির্জা জলিল, সমাজসেবায় প্রফেসর কাজী কামরুজ্জামান, ভাষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য কবি কাজী রোজী, বুলবুল চৌধুরী ও গোলাম মুর্শিদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ।
অনলাইনে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ভার্চুয়ালি উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘যারা রক্ত দিয়ে শুধু মাতৃভাষার দাবি প্রতিষ্ঠা নয়, স্বাধীনতা অর্জনের পথ করে দিয়েছিল আমরা তাদের প্রতি সম্মান জানাই।’
‘অন্ধকার থেকে মুক্ত করুক একুশের আলো’ এই সেøাগানকে সামনে রেখে নড়াইলে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট সন্ধ্যার পরে ১ লাখ মোমবাতি প্রজ্বলন করে ও ৭০টি ফানুস উড়িয়ে ভাষা শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়।
‘বিশ্বের সব মাতৃভাষা রক্ষা করবে বাংলাদেশ’ সেøাগানকে সামনে রেখে শিল্পকলা একাডেমি আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিল্পকলার মহাপরিচালকের সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কেএম খালিদ। অনুষ্ঠানে বাংলা গান, নৃত্য ও বাংলা কবিতা আবৃত্তি করেন দেশের ও বিদেশি বিভিন্ন দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত ও দূতাবাসের কর্মকর্তারা। ব্যতিক্রমধর্মী এই অনুষ্ঠান সবার মন কাড়ে। ‘বঙ্গবন্ধু ও একুশের চেতনায় লালিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করে জাতীয় জাদুঘর। এরপর সুন্দর হাতের লেখা প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়।
সন্ধ্যায় অনলাইনে গান, পাঠ ও আবৃত্তি সাজানো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে ছায়ানট।
‘একুশের পথ ধরে স্বাধীনতা’ শীর্ষক অনুষ্ঠান আয়োজন করে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ফেসবুক পাতায়। মারমা, মুরং, বম ও ত্রিপুরা নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা ও নৃত্য পরিবেশন করে শিল্পীরা।
ফাগুন হাওয়ায় বসন্ত উৎসব যেভাবে সবার মন রাঙিয়েছে তেমনি একুশের বিভিন্ন আয়োজন গৌরবান্বিত করেছে বাঙালিকে। সাংস্কৃতিক অঙ্গন সরব ছিল ফেব্রুয়ারির মাসজুড়ে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply