বঙ্গবন্ধু আমলা থেকে সশস্ত্র মুক্তিযোদ্ধার চোখে

তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী, বীরবিক্রম, পিএইচডি

আমলা পরিচয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র দুই বছরের লেকচারশিপের পর ১৯৬৮ সালে আমি সিভিল সার্ভিস অব পাকিস্তানে যোগদান করি- সিএসপিদের সম্ভ্রান্ত পরিবারে উত্তরণ। পরীক্ষার রেজাল্ট বের হওয়ার পরপরই আসে আনন্দের জোয়ার- আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব আর শুভাকাক্সক্ষীদের অভিনন্দনের মধ্য দিয়ে। আমি টের পাই কী সমীহ নিয়ে তারা আমায় দেখছে।
লাহোরের একাডেমিতে পূর্ব-পাকিস্তানের ১০ জন সিএসপিসহ মোট ৩৫ জন শিক্ষানবিসের পদার্পণ ছিল পাকিস্তানের তরুণ পদপ্রার্থীদের বহু-আকাক্সিক্ষত চাকরি-জীবনের আকর্ষণীয় অধ্যায়। সুন্দরভাবে ছাঁটা বাগান দিয়ে ঘেরা এবং রেনেসাঁ যুগের স্থাপত্যকলার অনুকরণে নির্মিত লেফটেন্যান্ট গভর্নরের প্রাসাদোপম ভবন ছিল আমাদের ট্রেনিং ক্যাম্পাস এবং থাকার জায়গা। দিন শুরু হতো খুব ভোরে, আর্দালির হাতে আনা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে। এরপর থাকত ঘোড়সাওয়ারের প্রশিক্ষণ- পরণে ব্রিচেস, উন্নতজাতের ঘোড়ার পিঠে চড়ে- বিদায় নেওয়া ব্রিটিশ রাজের আয়েশী জীবনের স্বাদ। উন্মোচিত হচ্ছিল উত্তেজনায় পরিপূর্ণ এক নতুন জগত।
পূর্ব পাকিস্তানিদেরও নতুন আত্মোপলব্ধি হচ্ছিল, কিছুটা নিজেদের অজান্তে। ১৯৫০-এর ভাষা আন্দোলন এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দান- যা মনে করিয়ে দিচ্ছিল পাকিস্তানের দুই ‘অঙ্গের’ মধ্যে সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যগত বিভেদকে। ১৯৬০-এ পূর্ব পাকিস্তানে শুরু হলো আরেকটি আন্দোলন- অর্থনৈতিক সমতা আর পাকিস্তানের শাসন-ব্যবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানের সমান অংশীদারিত্বের দাবি নিয়ে।

৬-দফা ও তার প্রভাব
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার ছাত্র-জীবন এবং পরবর্তীতে সেখানে শিক্ষকতা করার বছরগুলো, আরও অনেকের মতো আমাকেও টেনে নিয়ে গেল তেজস্বী, চল্লিশোর্ধ্ব রাজনীতিবিদ শেখ মুজিবুর রহমানের তীক্ষ্ন যুক্তিতর্কের বলয়ে। তার জোর দাবি ছিল দুটো; ১৯৪১ সালের লাহোর প্রস্তাব, যার ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তার অনুসরণে একটি রাজনৈতিক কাঠামো গঠন করা এবং সংগতিপূর্ণ অর্থনীতি ব্যবস্থাপনার একটি অবকাঠামো প্রণয়ন করা। অবশেষে পাকিস্তানের ভেতরে একটি কনফেডারেশন অব স্টেট গঠনের দাবি এবং ভারতীয় ভূখণ্ডের ১ হাজার মাইলের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন পাকিস্তানের দুই অঙ্গের মধ্যে বিদ্যমান দুই অর্থনীতিকে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবির মধ্য দিয়ে এগুলো আত্মপ্রকাশ করে ৬-দফা দাবির রূপে।
সিএসপি হওয়ার প্রলোভন এবং পাকিস্তানের আমলাতন্ত্রের ভেতর একটি সুনিশ্চিত ক্যারিয়ার, যা কি না অবশেষে সরকারের সচিবের হওয়া নিশ্চিত করবে- এ-রকম একটা সুযোগ অনিশ্চিত কোনো রাজনৈতিক লক্ষ্যের বিনিময়ে হারানো খুব সহজ ছিল না। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান যতই নিজের দাবি আদায়ে স্বোচ্চার হতে থাকলেন, ততই দেশজুড়ে চলতে থাকল উত্তপ্ত বিতর্ক, যা এড়িয়ে যাওয়ার কোনো উপায় ছিল না। তার দাবিগুলো ছিল যুক্তি এবং পরিসংখ্যানের শক্ত ভিত্তির ওপর; লাহোর একাডেমির শিক্ষানবিসেরাও মাঝে মধ্যে নিজেদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক-বিতণ্ডায় লিপ্ত হয়ে পড়ত- পাকিস্তানের দুই অঙ্গের মধ্যে বিরাজমান এবং ক্রমশ প্রকটতর হতে থাকা বিভেদগুলোরই প্রতিফলন হতো এসব আলোচনায়।
আমাদের যে-রকম তোয়াজে রাখা হচ্ছিল তার বিনিময়ে আশা করা হচ্ছিল যে আমরা আমাদের পূর্বসূরিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করব। প্রতীকী এবং সত্যিকারের ক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকারের নোঙর হিসেবে কাজ করব এবং এক পাকিস্তানের ধ্বজাধারী হওয়ার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করব। যে দেশকে আমরা শাসন করতে যাচ্ছি, তার সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য একটা স্পেশাল ট্রেনে করে আমাদের পশ্চিম পাকিস্তানের আগাপাশতলা ঘুরিয়ে দেখানো হচ্ছিল, অফিসারদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, ঐতিহাসিক জায়গায় ভ্রমণ করানো হচ্ছিল- একটা আনুগত্যের বোধ আমাদের ভেতর জাগ্রত করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছিল। ট্রেনটা আমাদের পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত নিয়ে যায়- পুরো ১ হাজার মাইলের যাত্রা, অন্য ট্রেনের নিত্যদিনকার সময়সূচি ভঙ্গ করে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে থামত আর রাতের বেলা কোনো-না-কোনো স্টেশনে বিরতি নিত- চাকার ওপর আমাদের হোটেল।
একটা ঘটনা। আমাদের সেদিন করাচিতে নৌবাহিনীর সদর দপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। পাকিস্তানের নৌবাহিনীর প্রধান আমাদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেবেন। মাড় দেওয়া, দুগ্ধসফেদ ইউনিফর্ম পরিহিত অ্যাডমিরাল ঝরঝরে ইংরেজিতে লেকচার দিয়ে গেলেন, করাচির মূল বেইস থেকে পাকিস্তানি জলসীমা রক্ষার জন্য নৌবাহিনীর কৌশল সম্বন্ধে। প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হলে, আমি হাত উঠালাম।
“পূর্ব পাকিস্তান করাচি থেকে সমুদ্রপথে ২ হাজার মাইল দূরে। অথচ সেখানে নৌবাহিনীর কোনো উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি নেই। পূর্ব পাকিস্তানের জলসীমা আপনারা কীভাবে রক্ষা করবেন, যদি কোনো শত্রুর আক্রমণ ঘটে?”
আমার প্রশ্ন অ্যাডমিরালের ভালো লাগল না। একটু থেমে উত্তর দিলেন : “পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা নিহিত আছে এর পশ্চিম অঙ্গের সুরক্ষা এবং ভারতের পশ্চিম প্রান্তকে শক্তিশালী আক্রমণের হুমকির মুখে রাখার মধ্যে- যেখানে দিল্লি আক্রমণের নাগালের মধ্যে থাকবে। এর ফলে ভারতীয় সেনাবাহিনী পূর্ব পাকিস্তানকে ছেড়ে নিজেদের সীমান্ত রক্ষায় বেশি ব্যস্ত থাকবে।” সেই অ্যাডমিরাল ভাবলেন যে যুদ্ধবিদ্যার বিষয়ে এক অর্বাচীনের প্রশ্নের জবাব সুকৌশলে দিতে পেরেছেন।
তার এ ঘোরানো-প্যাঁচানো উত্তরের মধ্য দিয়ে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম, প্রতিরক্ষার বিষয়ে ছানিগ্রস্ত এক দৃষ্টিভঙ্গিকে- পূর্ব পাকিস্তানকে গ্রাহ্য না করার আরেকটি দৃষ্টান্ত। এক ঝলকে আমি দেখতে পেলাম কেন শেখ মুজিবুর রহমান তার ৬-দফা দাবির মধ্যে এ দাবিটি রেখেছেন যে- পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য একটি প্যারামিলিটারি ফোর্স থাকতে হবে। পাকিস্তানের প্রতি আমার আনুগত্য ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছিল।
১৯৪০ সালের ২২-২৪ মার্চে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের গ্রহণ করা লাহোর প্রস্তাবে বলা হয়েছিল :

“ভৌগোলিকভাবে সন্নিহিত এলাকাগুলোর সীমানা ভাগ করে এমনভাবে অঞ্চলে বিভক্ত করতে হবে, যেন প্রয়োজনে ভূখ-গত সামঞ্জস্য বিধানের মাধ্যমে ব্রিটিশ-ভারতের উত্তর-পূর্ব এবং পশ্চিমাংশের মতো মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে এমন এলাকাগুলোকে নিয়ে ‘স্বাধীন অঙ্গরাজ্য’ গঠন করা সম্ভব হয়, যেখানে প্রতিটি ‘রাজ্য’ গাঠনিক একক স্বায়ত্তশাসন এবং সার্বভৌমত্ব ভোগ করবে।”

৬-দফা দাবিতে বলা হয়েছিল যে এ রাষ্ট্রগুলো সর্বময় ক্ষমতা প্রয়োগ এবং ট্যাক্স সংগ্রহ করতে পারবে; কিন্তু আইনত ফেডারেল সরকারে অনুদান দিতে বাধ্য থাকবে; পৃথকভাবে মুদ্রা ব্যবস্থাপনা থাকবে এবং পৃথক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে বৈদেশিক বাণিজ্য এবং লেনদেন পরিচালনা করতে পারবে। এগুলো পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
কিন্তু পাকিস্তান একটি ভিন্ন সত্তায় বিবর্তিত হয়ে গিয়েছিল। দুই দশক ধরে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে উপার্জন এবং সম্পদ পাচারের পরিসংখ্যান এবং এ দুই অংশের জীবনযাত্রার মানের প্রকট বৈষম্য থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছিল পূর্ব পাকিস্তানকে উপনিবেশের মতো শোষণ করার নজির- আমি নিজে যার সাক্ষী ছিলাম। পাকিস্তান এবং মুসলমানদের একতাবদ্ধতার অজুহাত দেখিয়ে পাকিস্তানি অভিজাতগোষ্ঠী তখনকার বিদ্যমান অবস্থাতে অনড় থাকতে চাইছিল- পরিষ্কারভাবেই বোঝা যাচ্ছিল এ রাজনৈতিক চাতুরি কীভাবে দেশের মূল কাঠামোকে হেয় প্রতিপন্ন করছে। পূর্ব পাকিস্তান ছিল এক উদ্ভট ধারণার প্রতীক। দেশ চালানোর ক্ষেত্রে সামরিক অথবা বেসামরিক- কোনো বিষয়েই পূর্ব পাকিস্তানকে কোনো অর্থবহ সুযোগ দেওয়া হচ্ছিল না।
মাঝে মাঝে পরিসংখ্যান অনেক কিছুই বিশদ ব্যাখ্যা করে। পূর্ব পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় পশ্চিম অংশের আয়ের প্রায় অর্ধেক। পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তান থেকে সকল আর্থিক সম্পদ ধীরে ধীরে লোপাট করে নিয়ে যাচ্ছে এবং পাঞ্জাবের কেন্দ্র- ইসলামাবাদে একটি নতুন রাজধানী গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে, যেখানে পাকিস্তানের উভয় অঙ্গই সমানভাবে অনুদান দিচ্ছে; ১.৫ বিলিয়ন ইউএস ডলার খরচে তরবেলা বাঁধ নির্মাণ করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে সেচ ব্যবস্থাপনাসহ ৩৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে, যা পূর্ব পাকিস্তানের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতার ১০ গুণ।
৬-দফা দাবির আন্দোলন বেগবান হয়ে এমন এক শক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছিল, যা পূর্ব পাকিস্তানের সমাজের সর্বস্তরের জনগণকে অনুপ্রেরণা দান এবং শক্তি সঞ্চার করছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত এই রাজনৈতিক অভ্যুত্থানে অপরিসীম ব্যক্তিগত ঝুঁকি ছিল। কিন্তু তিনি ভয় পেয়ে মাথা নত করার মতো মানুষ ছিলেন না। সত্যিকার অর্থে এটা ছিল শোষণ এবং নির্যাতনের বিরুদ্ধে সুবিন্যস্ত রাজনৈতিক কর্মসূচির শক্তি পরীক্ষা।
পূর্ব পাকিস্তানে জনগণের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ এবং আওয়ামী লীগ পার্টির উত্থাপিত ৬-দফা দাবির সপক্ষে তাদের সমর্থনকে দেখে, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৬৯ সালে আরেক জেনারেল ইয়াহিয়া খানের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে দিলেন এবং বিদায়কালে রেডিওতে ঘোষণা দিলেন, তার পক্ষে পাকিস্তানের- যার কি না ইসলামের ঘাঁটি হওয়ার কথা- তার বিলুপ্তিকরণের নেতৃত্ব দেওয়া সম্ভব হবে না।
আমার কর্মজীবন বয়ে চলল, আর সেই সাথে প্রতিবাদ আন্দোলন চলতে লাগল অপ্রতিহতভাবে। ১৯৭০ সালের শেষের দিকে আমাকে পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে ছোট মহকুমা মেহেরপুরের সাব-ডিভিশনাল অফিসার (এসডিও) হিসেবে পদায়ন করা হলো- পশ্চিমবঙ্গের কৃষ্ণনগর জেলা থেকে ছেঁটে বের করা ছোট এক টুকরো জায়গা- সিরিল রেডক্লিফের হাতে ঘটে যাওয়া ভারত বিভাগের অনেক বিভ্রান্তির পরিণতির একটি। কাজ শেষ করে অনুতপ্ত চিত্তে রেডক্লিফ ১৪ আগস্ট ১৯৪৭-এর আগেই তড়িঘড়ি ভারত ছেড়ে চলে যান- এর পরিণতিতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে সৃষ্ট রক্তস্নান এবং হত্যাযজ্ঞ- যা তিনি নিজেই আশঙ্কা করছিলেন, সেটার জন্য তাকে যেন জবাব দিতে না হয়। আমার ব্যাচে পূর্ব পাকিস্তানের অফিসারদের মধ্যে মেধাতালিকায় প্রথম অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও, এ-রকম প্রান্তিক এলাকায় পোস্টিং দেওয়ার জন্য আমাকে বেছে নেওয়ার অর্থ হলো- আমি সরকারের সুনজরে নেই। করাচিতে নৌবাহিনীর সদর দপ্তরের ঘটনাটা মনে পড়ল।

বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশের ক্রান্তিকাল
১৯৭১-এর ৭ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। আওয়ামী লীগ ১৬৯টির মধ্যে ১৬৭টি আসনে জয়লাভ করে কেন্দ্রীয় সরকার গঠনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ দলে পরিণত হলো। প্রাদেশিক পরিষদেও আওয়ামী লীগ ৩০০টির মধ্যে ২৮৮টি আসনে জয়লাভ করল। এ ফলাফল থেকে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হলো যে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্ব এবং ৬-দফা দাবি ছিল পূর্ব পাকিস্তানের ম্যাগনা কার্টা। যদিও মনে মনে আমি নিশ্চিত ছিলাম যে পাকিস্তানের ক্ষমতাসীন অভিজাত সম্প্রদায় কখনোই এ নির্বাচনের ফলাফলকে মেনে নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করতে রাজি হবে না।
১৯৭১-এর ৭ মার্চ। আমি অফিসের কাজে মেহেরপুর থেকে ঢাকায় এসেছি। আসলে কাজটা একটা অজুহাত মাত্র। প্রাদেশিক রাজধানীতে যা ঘটতে যাচ্ছে, তা স্বচক্ষে দেখার জন্য ঢাকায় আসা।
বিদ্যমান অচলাবস্থার একটি ‘রাজনৈতিক সমাধান’ বের করার উদ্দেশ্যে মিলিটারি জান্তা এবং শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের মধ্যে চলছিল রাজনৈতিক সংলাপ। সরাসরি শাসন অথবা পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনৈতিক প্রতিনিধির মাধ্যমে শাসন করার যে লক্ষ্য পাকিস্তান সেনাবাহিনী স্থির করে রেখেছিল, তা সংগত কারণেই শেখ মুজিবের অবস্থানের বিপরীত। তিনি চাইছিলেন জাতীয় নির্বাচনের গণতান্ত্রিক ফলাফলের মর্যাদা রক্ষা করা। ঢাকা তখন সব রকমের গুজবে মুখর- পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতার ঘোষণা যে কোনো সময় আসতে পারে; পাক-সেনাবাহিনী কালক্ষেপণ করছে এবং সমুদ্র আর আকাশপথে অতিরিক্ত সৈন্য এবং যুদ্ধোপকরণ নিয়ে আসার জন্য এ-সময়কে কাজে লাগাচ্ছে; সেনাবাহিনীর আক্রমণ আসন্ন।
আমি চুপিসারে (যেন আমাকে সেখানে কেউ দেখতে না পায়, কারণ একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে কোনো রাজনৈতিক সমাবেশে উপস্থিত থাকাকে বেশ বড় মাত্রার শৃঙ্খলাভঙ্গ হিসেবে দেখা হবে) রেসকোর্স ময়দানে যাই, যেখানে এ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটতে যাচ্ছে- আজ নতুন দিক-নির্দেশনা দেবেন শেখ মুজিবুর রহমান, যাকে ইতোমধ্যে এক জনসভায় শ্রদ্ধাভরে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে।
রেসকোর্সের বিশাল মাঠটাকে রোমান কলিসিয়ামের রঙ্গভূমির মতো দেখাচ্ছিল, যেখানে গ্লাডিয়েটররা শেষবারের মতো মরণপণ লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। এই তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা অবলোকনের জন্য নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে ছিলাম আমি। চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম রেসকোর্সের পুরো ময়দানটাকে। বহুমাত্রিক স্থাপত্যকলার মধ্যে সমাহিত কয়েকশ’ বছরের ইতিহাস যেন জীবন্ত হয়ে ধরা দিল চোখের সামনে। বাস্তব জীবনের কী এক নাটকীয় মঞ্চ, দুই শতাব্দীরও আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার সেনাবাহিনীর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এ নাটকের শেষ অঙ্কের ওপর থেকে পর্দা উঠতে যাচ্ছে- এই বিরল দৃশ্য যে কোনো চিত্র পরিচালকের ঈর্ষার বস্তু হতে পারত! যে মুহূর্তটিকে আমি প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছি, যার বিশালতার কথা চিন্তা করে অভিভূত হলাম।
সেদিন সূর্যের আলোয় ভেসে যাচ্ছিল বসন্তের শেষ বিকালটা। একের পর এক মিছিল নিয়ে হাজার হাজার লোক এসে জড়ো হচ্ছিল। তাদের ব্যানার নৌকার পালের মতো বাতাসে উড়ছিল। হুমকির সুরে, একসাথে গলা মিলিয়ে, স্লোগান দিয়ে যাচ্ছিল তারা। ওপর উত্থিত সকলের মুষ্টিবদ্ধ হাত। দূর থেকে মনে হচ্ছিল অসংখ্য বিন্দুর সমন্বয়ে তৈরি ঢেউ দূরের সমুদ্রের বুকে ঝিকমিক করে জ্বলছে। দ্রুতই এটা জনতার সমুদ্রে পরিণত হলো। এই রেসকোর্স ব্রিটিশরা তৈরি করেছিল সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ঘোড়দৌড় উপভোগ করার জন্য, স্বদেশে ফেলে আসা ডার্বির আনন্দ মেটাতে। আজ এ ময়দানে সবচেয়ে দুঃসাহসিক জুয়া খেলা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে- একটি জাতির ভাগ্য নির্ধারণ।
ভিড়ের মধ্যে ফিসফিস করে অনেকে বলছিল যে পাকিস্তান সেনাবাহিনী এই জনসভায় হামলা চালাতে পারে। এমনকি বিমান হামলার আশঙ্কাকেও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। আমি টিএসসি’র উল্টোদিকে একপাশে দাঁড়িয়ে থাকলাম। প্রয়োজনে যেন দৌড় দিয়ে আত্মরক্ষা করতে পারি।
বক্তৃতা দেওয়া শুরু হয়ে গেছে। ছাত্রদের ডিজাইন করা বাংলাদেশের পতাকা মঞ্চের ওপর উত্তোলন করা হলো। বজ্রধ্বনির মতো করতালি। কিন্তু সবাই অপেক্ষা করছিল বঙ্গবন্ধুর কথা শোনার জন্য। তারপর ঝঙ্কার দিয়ে উঠল সেই বজ্রকণ্ঠ : “ভাইয়েরা আমার।” মুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল জনসমুদ্র।
গভীর নিনাদময় কণ্ঠে, অনন্য সাধারণ বাচনভঙ্গিতে, যা তাকে বাঙালির হৃদয়ে স্থান করে দিয়েছে, নাতিদীর্ঘ অথচ সারগর্ভ, মন্ত্রমুগ্ধ করে দেওয়ার মতো সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু তুলে ধরলেন এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণের পটভূমিকা। যখনই বাংলাদেশের মানুষ নিজেদের অধিকার আদায়ের দাবি তুলেছে, তখনই কীভাবে ক্ষমতাসীন পাকিস্তানি জান্তা কর্তৃক শোষণ, নির্যাতন এবং বঞ্চনার শিকার হয়েছে, তার দীর্ঘ বৃত্তান্ত তুলে ধরলেন তিনি- অগণিত মানুষের রক্তে রঞ্জিত এক বেদনাদায়ক ইতিহাস। এমনকি পাকিস্তানে সংখ্যাধিক্য পেয়ে আওয়ামী লীগ যখন নির্বাচনে জয়লাভ করল তখনও জেনারেল ইয়াহিয়া, ভুট্টোর প্ররোচনা শুনে চলেছেন এবং পরিষদের অধিবেশন ডাকাকে স্থগিত করে রেখেছেন। এখন ২৫ মার্চ তারিখ অধিবেশন ডাকা হবে ঘোষণা করা হয়েছে। যখন জনগণ শান্তিপূর্ণ অবরোধের ডাকে সাড়া দিল, অফিস, ফ্যাক্টরি- এসব বন্ধ করে দিল এবং আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তায় নেমে এলো, তখন তাদের ওপর পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জে গুলি চালানো হলো, সেই অস্ত্র দিয়ে- যেগুলো তাদের ঘাম ঝরানো অর্থ দিয়ে কেনা হয়েছে, বহিঃশত্রুর হাত থেকে তাদেরই রক্ষা করার জন্য! “… জেনারেল ইয়াহিয়া, আপনি তো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, দেশে যান কীভাবে আপনার সৈন্যরা নিরীহ মানুষের ওপর গুলিবর্ষণ করে তাদেরকে পশুর মতো হত্যা করেছে, সন্তানহারা মায়ের আহাজারিতে বাতাস এখনও ভারী হয়ে আছে।” তারপরও বাংলাদেশিদের দোষ দেওয়া হচ্ছে- কী উপহাস!
বঙ্গবন্ধু নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর, সামরিক শাসন প্রত্যাহার এবং মোতায়েনকৃত সৈন্যদলকে ব্যারাকে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানান। খেয়াল করে শুনলাম- একবারের জন্যও ‘পূর্ব পাকিস্তান’ শব্দটি উচ্চারণ করলেন না।
তিনি অনির্দিষ্টকালের জন্য বাংলাদেশে পূর্ণ কর্মবিরতির ডাক দিলেন। সরকারি-আধা সরকারি অফিস, সুপ্রিমকোর্টসহ অন্যান্য আদালত বন্ধ থাকবে। কেউ কর দেবে না। মাস শেষ হওয়ার আগেই কর্মচারীদের বেতন দিয়ে দিতে হবে।
বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামের নির্দেশনা আমলার বিবর্তন
ভবিষ্যতের সংগ্রামের বিষয়ে তার দিক-নির্দেশনা এলো : “প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে, তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে… আমরা তাদের ভাতে মারবো… পানিতে মারবো… আমরা যখন মরতে শিখেছি, কেউ আমাদের দমাতে পারবে না। এই বাংলায় হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-অবাঙালি, যারা আছে তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের উপরে। আমাদের যেন বদনাম না হয়।”
বক্তৃতার শেষে এলো তার আবেগঘন চূড়ান্ত আহ্বান। যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও। “এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম।” তারপর তার মুষ্টিবদ্ধ হাত প্রসারিত হলো আকাশের দিকে, আর কণ্ঠে বেজে উঠল পরিষ্কার সেই বার্তা : ‘জয় বাংলা।’ সাথে সাথে বিশ লক্ষ বজ্রকণ্ঠ একস্বরে গর্জে উঠল : ‘জয় বাংলা।’
পাশার শেষ চাল, ফিরিয়ে নেওয়ার উপায় নেই।
আমার দৃষ্টিতে বঙ্গবন্ধু সেদিন একজন বুদ্ধিদীপ্ত কৌশলপ্রণেতা এবং রাজনীতিবিদ থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতায় রূপান্তরিত হয়েছিলেন। আমি মেহেরপুরের এসডিও, দেশের প্রত্যন্ত এলাকায় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি এবং আশীর্বাদপুষ্ট কর্মকর্তা। কিন্তু ওইদিন রেসকোর্সের ময়দানে, এক বাঁশিওয়ালার সুরে বঙ্গবন্ধু আমাকে এমন একটা সীমানা অতিক্রম করিয়ে দিলেন, যার উল্টোদিকে ফেরত যাওয়া কখনও সম্ভব ছিল না। আরও লাখ লাখ মানুষের মতো আমিও বিপ্লবের আবর্তে আকৃষ্ট হলাম। আমার ভেতরের মুক্তিযোদ্ধার জন্ম হলো এবং সেই সাথে আরও লাখ লাখ মানুষেরও।
জাতির জীবনে যে নাটকের দৃশ্যপট উন্মোচিত হচ্ছিল, তাতে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা আমার পক্ষে আর সম্ভব হচ্ছিল না। ততদিনে বাংলাদেশিরা একটি জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশের দীক্ষা গ্রহণ করে ফেলেছে এবং এর পরবর্তীতে রাষ্ট্র গঠনের দাবি জানানোর পথে আছে। আমার ভেতরের সরকারি কর্মকর্তা ততদিনে মৃত্যুবরণ করেছে। বঙ্গবন্ধু যে সংগ্রামের জন্য আমাদের প্রস্তুত করেছেন, তার এক সামান্য সৈনিকে পরিণত হলাম আমি।
ঢাকা থেকে চলে আসার প্রস্তুতি যখন নিচ্ছি, তখন কেমন যেন রহস্যময় একটা অনুভূতি হলো যে বহুদিনের মধ্যে আমি আর ঢাকায় আসতে পারব না এবং ঢাকাও আর আগের মতো থাকবে না… ভেতরে কেমন যেন বিদায়ের সুর বেজে উঠল।
“মনে হচ্ছে তুমি চলে যাচ্ছো? আবার কবে আসবে?” স্কুলপড়–য়া দুই ভাইকে বনানীতে মায়ের কাছে রেখে মেহেরপুর চলে যাওয়ার জন্য যখন প্রস্তুত হচ্ছি, তখন মায়ের প্রশ্ন।
“ঠিক বলতে পারছি না। তাছাড়া তুমি তো দেখছো, দেশ এখন কোন দিকে যাচ্ছে- মৃদু ভাষায় বলতে গেলেও দুর্যোগের দিকে”- কথাটা বলেই মনে হলো কেন বলতে গেলাম। মায়ের হলুদবরণ গোল মুখটা নিমেষে ফ্যাকাশে হয়ে গেল ভয়ে। আমাকে কাছে টেনে নিয়ে মাথায় আলতো হাত রেখে চুলের ভেতর আঙ্গুল চালাতে চালাতে বললেন :
“বেটা, আমি তো পরিস্থিতিটা ঠিকমত বুঝে উঠতে পারছি না। তুমি তো জানো ব্রিটিশরা যখন ভারত বিভক্ত করে, তখন সিলেটে একমাত্র আমরাই গণভোট দিয়েছিলাম, পাকিস্তানে যোগ দেয়ার জন্য। সেই উত্তেজনায় ভরা দিনগুলোর অনুভূতি যদি তোমাকে বোঝাতে পারতাম। আমরা অনেক আশা করে পাকিস্তানে যোগ দিয়েছি। তারপর জানি না কেন কোনো কিছুই আর ঠিক নেই।”
তাকে থামিয়ে দিলাম। “আম্মা এটা খুবই সাধারণ হিসাব। পশ্চিম পাকিস্তানিরা, বিশেষ করে পাঞ্জাবিরা কখনও আমাদের সমান চোখে দেখেনি। তারা ভেবেছে পূর্ব পাকিস্তান তাদের জামিদারি, আর আমরা তাদের প্রজা। আমাদের সম্পদ শোষণ করে, তারা তাদের অংশ গড়ে তুলেছে। এখন যখন শেখ মুজিবুর রহমানের পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে, ক্ষমতা হারানোর ভয়ে, রাগে, ক্রোধে, দিশেহারা হয়ে গিয়েছে।”
“কিন্তু আমরা সবাই তো মুসলিম। ধর্মের বন্ধনে আবদ্ধ, যে ধর্মে স্পষ্টভাবে বলা আছে আমরা কীভাবে একে অপরের সাথে ব্যবহার করবো।”
“আম্মা এই ধর্মীয় জুজুর ভয় দেখিয়েই তো তারা এখন পর্যন্ত সকল সমস্যার কথা অগ্রাহ্য করেছে। যখনই কোনো দাবির কথা ওঠানো হয়, তখনই তাদের ভ-ামি মার্কা উচ্চৈস্বর শোনা যায় : পাকিস্তানের সামনে বিপদ। ইসলাম ঝুঁকির মুখে।”
“বাবা এটা তো দুর্বোধ্য। পাকিস্তান তো সবার জন্য। এমনকি সংখ্যালঘুদের জন্যও। পূর্ব পাকিস্তান তো আমরা সবার সাথে বহুকাল ধরে শান্তিতে বসবাস করে আসছি। মনে আছে নওগাঁতে তোমার বন্ধুদের মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যাই ছিল বেশি- ঝন্টু, দিলীপ, মমতা, আরও অনেকে। তাদের মায়েরা ছিল সবাই তোমার মাসীমা, পিসীমা, আবার আমারও বন্ধু।”
মনে পড়ল বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের প্রতি আমার মায়ের উদার মনোভাবের কথা। তিনি একজন কট্টর মুসলমান। কখনও এক ওয়াক্তের নামাজ তার বাদ যায়নি অথবা ইসলামের কোনো অনুশাসন তিনি মানেননি এমন কখনও দেখিনি। সব সময় সুন্দরভাবে শাড়ির আঁচলে মাথা ঢেকে রাখতে দেখেছি। কিশোর বয়স পেরোবার আগেই তিনি আমাদের কোরআন শরিফ পড়া শিখিয়েছেন, নামাজের সময় হলেই, নামাজ পড়ার কথা সব সময় মনে করিয়ে দিতেন। তারপরও অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি তার মনোভাব ছিল আন্তরিক। ইসলামের নামে যে স্বৈরাচার চলছে, তা থেকে তার জগতের অবস্থান কত দূরে।
“আম্মা তোমার মতো মানুষ তো লাখে একজন। কিন্তু বাস্তবতা এখন এত ভিন্ন যে আমাদের এক বিপজ্জনক সময়ের জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হবে।” মুখ ফস্কে এমন কথা বেরিয়ে গেলে যে আম্মা ভয় পেলেন।
“কিন্তু যা-ই হোক, তুমি একজন সরকারি কর্মকর্তা। আমাকে কথা দাও যে তুমি ঝামেলা থেকে দূরে সরে থাকবে।” দেখতে পেলাম তার জলভরা চোখে আকুল আবেদন, একটু নিশ্চয়তা লাভের জন্য।
“আমি সব সময় তোমার উপদেশ মনে রাখবো।”

বঙ্গবন্ধু ও অসহযোগ আন্দোলন
শেষ চেষ্টা হিসেবে বঙ্গবন্ধু সমগ্র জাতিকে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনের রাস্তা অবলম্বনের ডাক দিয়েছিলেন, পাকিস্তানি সামরিক-বেসামরিক শাসকগোষ্ঠীকে দাবি মানতে বাধ্য করত। তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে মেহেরপুরের সরকারি এবং আধা-সরকারি অফিস, ব্যাংক এবং বেসরকারি অফিস বন্ধ করে দেওয়া হলো; বন্ধ করে দেওয়া হলো অন্য সকল কাজকর্মও- এভাবে স্বেচ্ছা কর্মবিরতি শুরু হলো। ঢাকায় বঙ্গবন্ধুর বাসভবন সরকারের অস্থায়ী কার্যালয়ে পরিণত হলো। বাংলাদেশ বাস্তবে স্বাধীন হয়ে গিয়েছিল।
শান্তিপূর্ণ, ইতিবাচক কর্মসূচির মাধ্যমে নিজের লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করতে করতে, বঙ্গবন্ধু সেই পথটিও দেখিয়ে দিয়েছিলেন, যে রাস্তা হবে পাশবিক শক্তির বিরুদ্ধে- শান্তিবাদিতার ঊর্ধ্বে গিয়ে এক নতুন মাত্রা। সাত কোটি মানুষ তার অনুপ্রেরণায় রুখে দাঁড়িয়েছিল, হত্যার জন্য মরিয়া হয়ে থাকা একটা পেশাদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে- মৃত্যুর শীতল স্পর্শকেও মনে হচ্ছিল শুভাশিস। এক জাদুকরি বাঁশিওয়ালার মসীহাসুলভ নেতৃত্ব পরিণত হয়েছিল একটি শক্তিতে এবং প্রবাহিত হয়েছিল আমাদের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
মেহেরপুর মহকুমা আর এর সদর দপ্তরের একই নাম। পূর্ব পাকিস্তানের প্রেক্ষাপটে এ জায়গার গুরুত্ব অত্যন্ত নগণ্য। শহর বলতে উত্তর-দক্ষিণ বরাবর চলে যাওয়া একটিমাত্র বাঁধানো রাস্তা। এ রাস্তাটা আমার বাংলো পার হয়ে বাজার পর্যন্ত গিয়ে, দু-ভাগে বিভক্ত হয়ে- একটা অংশ চলে গিয়েছে কুষ্টিয়ার দিকে, প্রায় ৪০ মাইল আর অন্যটা চুয়াডাঙ্গায়, ১৮ মাইল দূরে।
আমাদের চাকরিতে জনগণ থেকে সব সময় দূরত্ব রেখে চলার চর্চা করা হয়। আমাকে অনেক সতর্কতা অবলম্বন করে শহরের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করতে হয়েছিল। এছাড়ও যে সরকারের প্রতিনিধিত্ব করছি, তার সাথে আপামর জনগণের যে দূরত্ব, তা অতিক্রম করার জন্য আস্থাও অর্জন করতে হচ্ছিল। সংসদের দুজন নির্বাচিত প্রতিনিধি নুরুল হক সাহেব আর সহিউদ্দিন সাহেবকে আমার বাংলোতে চায়ের দাওয়াত দিলাম। এর আগে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদের সাথে দেখা হলেও, উল্লেখযোগ্য সাক্ষাতের ঘটনা এই প্রথম। দুজনেই বয়সে আমার চেয়ে বড়, ভদ্র এবং অমায়িক। গতানুগতিক রাজনীতিবিদদের সম্বন্ধে যে-রকম বদনাম শোনা যায়, এ দুজন মোটেও সে-রকম ছিলেন না। কুশলবিনিময়ের পর রাজনৈতিক অবস্থা-সংক্রান্ত জটিল বিষয়ে নিজেই কথা শুরু করলাম। আমার কথার উত্তর দেওয়ার আগে, তারা প্রথমে আমার অবস্থান যাচাই করে বুঝতে চাইলেন; এ-রকম পরিস্থিতিতে সকল রাজনীতিবিদই স্বাভাবিকভাবে এটা করবেন।
“আপনার কী মনে হয়, সরকার কী করতে যাচ্ছে?” তাদের একজন উল্টো আমাকেই প্রশ্ন করে বসলেন।
তাদের জানালাম পূর্ব পাকিস্তানকে যে সকল অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, তা নিয়ে বহু বছর ধরে আমলাতন্ত্রেও তর্ক-বিতর্ক চলছে। আরও বললাম কীভাবে বছরের পর বছর ধরে ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ এবং সাম্প্রতিক সময়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলনের জোয়ার সকল পূর্ব পাকিস্তানিকে, এমনকি সরকারি কর্মকর্তাদেরও প্রভাবিত করেছে। তারা বেশ অবাক হলেন এটা শুনে যে, রমনা রেসকোর্সে ৭ মার্চের রাজনৈতিক সভায় আমি উপস্থিত ছিলাম, যেদিন বঙ্গবন্ধু বাস্তবিক অর্থে পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং সকলকে আহ্বান করেন সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হতে। সহিউদ্দিন সাহেব অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন :
“একজন এসডিও হয়ে এ-রকম একটা রাজনৈতিক সভায় যেতে আপনার ভয় করল না? পাকিস্তান বিমানবাহিনী তো ওই সময় ওই জায়গায় বোমা হামলাও করতে পারত। সেদিন কর্তৃপক্ষের নজরে পড়ে গেলে অচিরেই আপনার চাকরি যেত আর আজ আপনি কারাগারে থাকতেন।”
আর কথা না বাড়িয়ে, আমার মনে যা আছে তা তাদের সামনে তুলে ধরলাম। “যদিও আমি একজন সিএসপি অফিসার, কেন্দ্রীয় সরকারের একজন আস্থাভাজন কর্মী, এখন তো সময়টা অন্যরকম।” একটু থেকে আমার স্নায়ুকে শান্ত হতে দিয়ে যোগ করলাম : “বহুদিন যাবত এই দেশ স্বৈরশাসনের মুঠির ভেতর বন্দি হয়ে আছে। এখন দেশকে স্বাধীন করার এবং সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হওয়ার ডাক এসেছে। এই সফরে আমি আপনাদের সবার সাথে আছি।”
চমকে উঠে দুই রাজনীতিবিদ অবিশ্বাসের চোখে আমার দিকে তাকালেন। সেই সাথে তাদের চোখে নিশ্চয়তা আর আনন্দও দেখলাম। দুজনেই আমার সাথে হাত মেলালেন। মনে হচ্ছিল এই প্রথমবারের মতো আমাদের সাক্ষাৎ হলো। রচিত হলো নতুন একটা বন্ধন।

বঙ্গবন্ধু ও সশস্ত্র সংগ্রামের কৌশল
পরের কয়েক দিনের মধ্যে মেহেরপুর শহরটা যেন ঘুম থেকে জেগে উঠল; বহুদিন ধরে বিস্মৃত সত্তাকে জাহির করার জন্য। নতুন এই শক্তি তরঙ্গকে আমি অনুভব করতে পারছিলাম। বাজারে শোরগোলের শব্দ কয়েক ডেসিবেল বেড়ে গেল। ছাত্ররা মিছিল বের করতে লাগল। তাতে যোগ দিল সকল সাধারণ নাগরিক। মেহেরপুরের পাকা রাস্তাটার এ-মাথা থেকে ও-মাথা পর্যন্ত মিছিলকারীরা গলা ফাটিয়ে স্বাধীনতার দাবি জানিয়ে স্লোগান দিতে লাগল। একদিন সকালে আমার বাংলোর জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি, ছাত্ররা মিছিল করে আমার অফিস অর্থাৎ কাছারিতে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে, সেখানে বাংলাদেশের পতাকা ওঠাল; তাদের এ প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ দেখে পুলকিত হলাম- তারা অপ্রসূত একটি দেশের জন্মলাভের ঘোষণা দিল, বঙ্গবন্ধুর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করল আর স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখার দুঃসাহস প্রদর্শন করল। শত শত কণ্ঠে, ছন্দে ছন্দে, তারা সেøাগান দিতে থাকল : ‘জয় বাংলা’। চাপা কণ্ঠে আমিও তাদের সাথে যোগ দিয়ে বললাম ‘জয় বাংলা’। এ সমস্ত কিছুই ঘটে যাচ্ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নাগের ডগায়, যারা সমগ্র দেশকে কব্জায় নিয়ে নেওয়ার জন্য সর্বত্র দলে দলে সৈন্য পাঠিয়েছে। কিন্তু আমরাও হাত-পা গুটিয়ে বসে ছিলাম না।
নুরুল হক এবং সহিউদ্দিন সাহেব এসে আমাকে হালনাগাদ তথ্য দিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনী অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে, সারা পূর্ব পাকিস্তান ছড়িয়ে পড়ছে। মাঝে মাঝে জনতার সাথে তাদের খ-যুদ্ধ হয়েছে এবং এ-সময় তারা গুলি করে মানুষ মারতেও দ্বিধা করেনি। এভাবে একদিকে লাশ জমে স্তূপ তৈরি হচ্ছে আর অন্যদিকে জনমনে পুঞ্জিভূত হচ্ছে আক্রোশ। আওয়ামী লীগের পাশাপাশি ছাত্ররা একটা সর্বদলীয় জোট তৈরি করেছে সশস্ত্র সংগ্রাম করার জন্য। তরুণদের জন্য ক্যাম্প করা হচ্ছে, যেখানে নকল রাইফেল দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। তরুণীরা পর্যন্ত যোগ দিয়ে রীতিমতো কুচকাওয়াজে অংশ নিচ্ছে। সারাদেশে অহিংস-অসহযোগ শক্তিশালী হচ্ছে। কেবলমাত্র বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা অনুসরণ করা হচ্ছে, একমাত্র তার তরফ থেকে আসা সরাসরি নির্দেশনা ছাড়া সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানে কর্মবিরতি চলছে।
আমাদের ঐকমত্য ছিল যে মেহেরপুরের মতো দূর-দূরান্তে পৌঁছানোর মতো শক্তি সেনাবাহিনীর নেই। অন্ততপক্ষে এ-মুহূর্তে তো নেই-ই। তার মানে আপাতত হাতে কিছুটা সময় আছে।
“বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা ঠিক কী ছিল?” সহিউদ্দিন সাহেব আমাকে জিজ্ঞেস করলেন।
“কিছু নির্দেশনা আছে” উত্তর দিয়ে যোগ করলাম, “তিনি আমাদের বলেছেন, ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো।’ আমি এ থেকে যেটুকু বুঝতে পেরেছি তা হলো এই যে, আমাদের উচিত সেনাবাহিনীকে প্রতিহত করা অথবা অন্ততপক্ষে তারা আমাদের কাছে যা চায়, তা তাদের দিতে অস্বীকার করা। বঙ্গবন্ধুর আরও একটি উক্তি, ওদের ‘আমরা ভাতে মারব, পানিতে মারব।’ যেহেতু সেনাবাহিনী দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে সেহেতু জীবন ধারণের জন্য স্থানীয়ভাবে তাদের রেশন সংগ্রহ করতে হবে। আমাদের পরিকল্পনা করতে হবে কীভাবে তাদের এ কাজে বাধা সৃষ্টি করা যায়। এছাড়াও, আমাদের ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যকে নিজেদের প্রতিরক্ষার কাজে ব্যবহার করতে পারি- শুষ্ক ভূখণ্ডে অভ্যস্ত পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আমাদের দেশের নদী-নালা, খাল আর জলাভূমি দেখে দমে যাবে। এ-রকমও গল্প চালু আছে যে পশ্চিম পাকিস্তানের লোকজন কোমর পানিতে ডুবে মারা গেছে, কেবল আতঙ্কের কারণে! সবার শেষে তিনি যে কথাটি বলেছেন তার গুরুত্বও কোনো অংশে কম নয়। ‘যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকুন।’ বঙ্গবন্ধুর প্রথম দুটো নির্দেশনার বিষয়ে আপনার জনগণকে অনুপ্রাণিত করুন। শেষের নির্দেশনা নিয়ে আমার কিছু প্রস্তাব আছে।” একটু থামলাম।
“সেনাবাহিনী তো শহরগুলোতে ঘাঁটি গেড়ে থাকবে। আমি বুঝতে পারছি না বঙ্গবন্ধুর প্রথম দুটো নির্দেশনা বাস্তবায়ন আমি কীভাবে করব।” মনে হলো সহিউদ্দিন সাহেব নিজের মনে কথা বলছেন।
তার কথা শুনে মন্তব্য করলাম : “এই সংগ্রাম খুব একটা তাড়াতাড়ি শেষ নাও হতে পারে। তখন নির্দেশনাগুলো কিছু কিছু পরিষ্কার হবে; ধরুন যদি গেরিলা যুদ্ধ শুরু হয়।”
দুই রাজনীতিবিদই একটু হতভম্ভ হয়ে গেলেন দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, গেরিলা যুদ্ধ এসব কথা শুনে।
তাদের একটু আশ্বস্ত করার জন্য যোগ করলাম : “আমরা ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে পারি। ১৮১২ সালে নেপোলিয়ন মস্কো দখল করলেও, খুব বেশিদিনের জন্য ধরে রাখতে পারেননি। রাশিয়ানরাও একই কৌশল, একই উপায় অবলম্বন করেছিল (যেভাবে বঙ্গবন্ধু আমাদের নির্দেশনা দিয়েছেন)- ফরাসি সেনাবাহিনীকে কুপোকাৎ করার জন্য আর অপমান করে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য।” আমি বলে চললাম,
“আমাদের যাই সম্পদ আছে সেগুলোকে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, সে-সম্পর্কে আমি কিছু ধারণা দিতে পারি।”
আনসার/মুজাহিদ নামে আমাদের একটা অনিয়মিত প্যারামিলিটারি অস্কিলারি ফোর্স ছিল। দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা রক্ষা এবং দেশের মধ্যে আইন প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে, ডাকামাত্রই সহযোগিতা প্রদানের জন্য প্রস্তুত থাকত। ভারত বিভাগের পর, ইন্ডিয়ান হোম গার্ড থেকে বাদ পড়া পূর্ববঙ্গের লোকজনদের নিয়ে এই ফোর্স গঠন করা হয়েছে। এর সদস্য হিসেবে সীমান্ত এলাকা থেকে নিয়োগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, কারণ তাদের কাজ হচ্ছে সীমান্ত এলাকায় পাচার রোধ করা এবং আন্তঃসীমান্ত চলাচলের মতো বেআইনি কাজ বন্ধ করা। ফোর্স মোতায়েনের আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা ছিল এসডিও’র। তাদের অস্ত্র আর গোলাবারুদও এসডিও’র জিম্মায় থাকত। সশস্ত্র সংঘর্ষের বিষয়ে খুব সামান্য প্রশিক্ষণ এদের ছিল। তখন কেবল এই লোকগুলোই ছিল, যাদের ওপর ভরসা করতে পারি এবং দেশের পক্ষ নেওয়ার জন্য আহ্বান জানাতে পারি।
“সিদ্ধান্ত নিয়েছি মোট ১০০ জন আনসার/মুজাহিদকে দায়িত্বে ডেকে আনব আর মেহেরপুরে প্রশিক্ষণ ক্যাম্প খুলব। আমার অফিসে যা টাকা-পয়সা আছে, তা দিয়ে খরচ বহন করব। আপনারা গোপনে তাদের সাথে কাজ করতে পারেন এবং ভবিষ্যতে যদি সশস্ত্র সংঘর্ষের সম্মুখীন হতে হয়, তাতে যোগদানের জন্য তাদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে রাজি করাতে পারেন। আমি নিশ্চিত এ কাজটা সহজ হবে, কারণ পুরো জাতি এ-রকম একটা বিপদ মোকাবিলার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়ে আছে।” তাদের কী প্রতিক্রিয়া হয় তা দেখার জন্য একটু থামলাম।
“চমৎকার কথা। আনসারদের তো অন্ততপক্ষে থ্রি নট থ্রি রাইফেল আছে, আর কিছুটা প্রশিক্ষণও আছে। আপনার প্রস্তাবমতোই আমরা কাজ করব।” দুজন প্রায় একসাথে বলে উঠলেন।
“আরও একটা বিষয় আছে। এখানে কর্মরত পুলিশের সাথেও যোগাযোগ করুন। তাদের অবস্থাও ঠিক আমাদের মতো এবং সময় এলে তাদেরও যোগদান করা উচিত। এতে আমাদের শক্তি বাড়বে।” কথা শেষ করলাম আমি।
সভা শেষ হলো।
ঢাকা থেকে অনেক দূরে থাকার কারণে, বিচ্ছিন্ন তথ্য আর গুজব কেবল আমাদের কানে আসত। আসন্ন বিপদের আশঙ্কা আমাদের আঁকড়ে ধরল। মেহেরপুরের ছোট্ট শহরটা ভয়ে-আতঙ্কে কাঠ হয়ে যেন শূন্যের পানে চেয়ে রইল। সামনে যা-ই থাকুক না কেন, এ অপেক্ষার পালা শেষ হওয়া দরকার।

শেষ কথা
২৫ মার্চে ঢাকায় নিরীহ জনগণের ওপর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ক্র্যাকডাউনের পর, ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন। দখলদার সেনাবাহিনীর আগ্রাসনকে রুখতে সমগ্র জাতি অস্ত্র হাতে তুলে নিল, সংকল্পবদ্ধ হলো যে এ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটাতে হবে এবং ‘যোদ্ধা’ জাতি হওয়ার যে দেমাগ দেখিয়ে তারা আত্মপ্রচার করে, তা নস্যাৎ করতে হবে।
ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং একটি রাজনৈতিক পরিচয়ের আকাক্সক্ষা থেকে জেগে ওঠা জাতীয় চেতনার জোয়ার আমাদের নিয়ে গেল জনযুদ্ধের দিকে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন করা হলো ১৯৭১-এর ১০ এপ্রিল; বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলেন এর রাষ্ট্রপতি। সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান হলো ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় (সৌভাগ্যক্রমে যে অনুষ্ঠান আয়োজনের ক্ষেত্রে সংগঠন হিসেবে আমি দায়িত্ব পালন করেছিলাম)। ৯ মাসব্যাপী চলা যুদ্ধে শত্রুবাহিনীর শোচনীয় পরাজয় হলো। বঙ্গবন্ধুর সুদীর্ঘ ছায়াতলে, তার শিখিয়ে দেওয়া মন্ত্রকে হৃদয়ে ধরে, অগণিত মুক্তিযোদ্ধার ভিড়ের মাঝে মিশে গিয়ে, সেক্টর ৮-এর সাব-সেক্টর কমান্ডার হিসেবে, নিয়মিত যোদ্ধাদের একটি কোম্পানি এবং ৪০০-এরও বেশি গেরিলা যোদ্ধাকে নিয়ে যুদ্ধে অংশ নিলাম।
ডিসেম্বরের ১৬ তারিখ রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১ লাখ সৈন্য এবং অক্সিলারি ফোর্স নিয়ে বাংলাদেশ এবং ভারতের সেনাবাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বাংলাদেশ মুক্ত হলো। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর যে অপমান হয়েছিল, তাকে কেবলমাত্র ১৯৪৩ সালে স্ট্যালিনগ্রাদে হিটলারের সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের সাথেই তুলনা করা যেতে পারে।
বঙ্গবন্ধুর প্রতিশ্রুতির দেশ সত্যি হলো। যে রেসকোর্স ময়দানে বাংলাদেশের সুদীর্ঘ কাহিনির সূত্রপাত ঘটেছিল, সেই ময়দান আবারও সাক্ষী হয়ে রইল নতুন ইতিহাস সৃষ্টির।

লেখক : মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা এবং সাবেক সচিব

অনুবাদ : তানিয়া রহমান

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply