বঙ্গবন্ধু অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী নেতা

শেখ ফজলুল করিম সেলিম এমপি : ধর্মপ্রবণ ও শিক্ষা-দীক্ষাহীন দারিদ্র্যপীড়িত দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের মতো এ-ধরনের একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নজির ইতিহাসে বিরল। বিশ্ব মানচিত্রে ‘বাংলাদেশ’ নামক স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনিই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি ও বাঙালি জাতির পিতা। বঙ্গবন্ধু একটি অসাম্প্রদায়িক পারিবারিক আবহে বেড়ে উঠেছেন। তার জীবনে অনেক ঘটনা আছে, যা থেকে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বহিঃপ্রকাশ পাওয়া যায়। বাংলার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ আসা নিয়ে হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে একটা উত্তেজনা তৈরি হয়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে হিন্দু ছেলেদের যথেষ্ট বন্ধুত্ব ছিল। একসঙ্গে ঘোরাফেরা, গান গাওয়া, খেলাধুলা- সবই করতেন। ১৯৩৮ সালের একটা ঘটনায় হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি চলছিল। গোপালগঞ্জ শহরের আশপাশেও হিন্দু গ্রাম ছিল। দু-একজন মুসলমানের ওপর অত্যাচারও হয়েছিল সে-সময়। আবদুল মালেক নামে এক সহপাঠী ছিলেন। তিনি খন্দকার সামসুদ্দীন সাহেবের আত্মীয়। বঙ্গবন্ধু ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে এ ঘটনাটি উল্লেখ করেছেন। মার্চ বা এপ্রিল মাস হবে, একদিন সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু ফুটবল খেলে মাঠ থেকে বাড়িতে ফিরেছেন। খন্দকার সামসুল হক ওরফে বাসু মিয়া মোক্তার বঙ্গবন্ধুকে ডেকে বললেন, মালেককে হিন্দু মহাসভার সভাপতি সুরেন ব্যানার্জির বাড়িতে ধরে নিয়ে মারপিট করছে। পারলে ওকে ছাড়িয়ে নিয়ে আসো। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে হিন্দু ছেলেদের ভালো সম্পর্ক থাকার কারণে মোক্তার সাহেব এ দায়িত্ব দেন। বঙ্গবন্ধু দেরি না করে সহপাঠী মালেককে ছাড়িয়ে আনতে রওনা হন। কয়েকজন ছাত্রকে সঙ্গে নিয়ে সুরেন ব্যানার্জির বাড়িতে গিয়ে মালেককে ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেন। রামপদ নামে এক লোক বঙ্গবন্ধুকে দেখেই খারাপ ভাষায় কথা বলা শুরু করেন। বঙ্গবন্ধু প্রতিবাদ করলেন এবং তার দলের ছেলেদের খবর দিতে বলেন। রামপদ থানায় খবর দিয়ে তিনজন পুলিশ নিয়ে আসেন। বঙ্গবন্ধু মালেককে কেড়ে নিয়ে চলে আসেন। গোপালগঞ্জ শহরজুড়ে তখন উত্তেজনা চরমে। সে-ঘটনায় হিন্দু নেতারা থানায় বসে মামলা দেন। শামসুল হক মোক্তারকে হুকুমের আসামি করে বঙ্গবন্ধুসহ অন্যদের আসামি করা হয়। মামলায় বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে মিথ্যা একটি অভিযোগ আনা হয়। সামান্য মারামারি ঘটনাকে হত্যাচেষ্টা হিসেবে অভিযোগ দেওয়া হয়। সে-ঘটনায় বঙ্গবন্ধুকে জামিন না দিয়ে জেলে পাঠানো হয়। সে-সময় তিনি সাত দিন জেলে ছিলেন। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর কাছে খবর যায়। গোপালগঞ্জে চরম উত্তেজনা চলে কয়েকদিন। সাত দিন পর বঙ্গবন্ধু প্রথম জামিন পান এবং ১০ দিনের মধ্যে সবাই জামিন পান। এটাই ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনে প্রথম জেল।
বঙ্গবন্ধুর বন্ধুত্ব ছিল অনেক হিন্দু ছেলেদের সঙ্গে। তিনি একসঙ্গে লেখাপড়া করতেন, বল খেলতেন, একসঙ্গে বেড়াতেন। বঙ্গবন্ধুর পরিবার ও শেখ বংশও অনেক সম্মান পেত হিন্দু-মুসলমান সবার কাছ থেকে। কোনো জাতিগত ভেদাভেদ ছিল না। কিন্তু একটি ঘটনা বঙ্গবন্ধুর মনে খুব দাগ কাটে। বঙ্গবন্ধুর এক বন্ধু ছিল ননী কুমার দাস। একসঙ্গে পড়তেন, বাসাও কাছাকাছি ছিল, দিনভরই বঙ্গবন্ধুর কাছে থাকতেন। গোপালগঞ্জের বাড়িতে একসঙ্গে সময় কাটাতেন। ননী কুমার দাস বঙ্গবন্ধুর বাসায় প্রায়ই খাওয়া-দাওয়া করতেন। ননী তার কাকার বাসায় থাকতেন। একদিন বঙ্গবন্ধু ননীর বাসায় যান। তখন ননী বঙ্গবন্ধুকে তার কাকার ঘরে নিয়ে বসান। ননীর কাকীমাও বঙ্গবন্ধুকে খুব স্নেহ করতেন। পরে বঙ্গবন্ধু তার বন্ধু ননীর কাছে জানতে পারেন তিনি চলে আসার পর কাকীমা অনেক বকেছে, পানি দিয়ে ঘর ধুয়েছে, ননীকেও ঘর ধুতে বাধ্য করেছে। এ জন্য বঙ্গবন্ধুকে ননী বলেছিল তার বাসায় না যেতে। বঙ্গবন্ধু ননীকে বলেছিল আমি যাব না, তুই আমার বাসায় আসিছ। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে ঘটনাটি উল্লেখ করে বঙ্গবন্ধু লিখেছেনÑ “এ ধরনের ব্যবহারের জন্য জাতক্রোধ সৃষ্টি হয়েছে বাঙালি মুসলমান যুবকদের ও ছাত্রদের মাঝে। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, শহরে এসেই এ ব্যবহার দেখেছি।” কারণ টুঙ্গিপাড়ার বাড়িতে হিন্দুরা যারা আসত প্রায় সকলেই শেখ পরিবারকে শ্রদ্ধা করত। হিন্দুদের কয়েকটা গ্রাম ছিল, যেগুলোর বাসিন্দারা শেখ বংশের এবং বঙ্গবন্ধু পরিবারের শরিকদের প্রজা ছিল। বঙ্গবন্ধু মনে করতেন, হিন্দু মহাজন ও জমিদারদের অত্যাচারে বাংলার মুসলমানরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। তাই মুসলমানরা ইংরেজদের সঙ্গে অসহযোগিতা করেছিল। হিন্দুরা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে, ইংরেজদের তোষামোদ করে অনেকটা উন্নতির দিকে অগ্রসর হয়েছিল। আবার যখন হিন্দু ইংরেজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াল তখন অনেকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলে মরতে দ্বিধা করেনি। জীবনভর জেল খেটেছেন ইংরেজদের তাড়ানোর জন্য। এ-সময় যদি সব নিঃস্বার্থ স্বাধীনতা সংগ্রামী ও ত্যাগী পুরুষরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের পাশাপাশি হিন্দু ও মুসলমানদের বিরোধ নিষ্পত্তির মাধ্যমে মিলনের চেষ্টা করতেন এবং মুসলমানদের ওপর যে অত্যাচার ও জুলুম হিন্দু জমিদার ও বেনিয়ারা করেছিল, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেন, তাহলে হিন্দু-মুসলিম তিক্ততা বাড়ত না।
হিন্দু নেতাদের মধ্যে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এবং নেতাজী সুভাষ বসু এ বিষয়টা বুঝেছিলেন। তাই তারা অনেক সময় হিন্দুদের সাবধান করেছেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তার লেখার মধ্য দিয়ে হিন্দুদের হুঁশিয়ার করেছেন। এ-কথাও সত্য, মুসলিম জমিদার ও তালুকদাররা হিন্দু প্রজাদের সঙ্গে একইরকম খারাপ ব্যবহার করতেন, তবে সেটা হিন্দু হিসেবে নয়, প্রজা হিসেবে। এ-সময়ে যখনই কোনো মুসলমান নেতা ন্যায্য অধিকারের দাবি করতেন তখনই দেখা যেত হিন্দুদের মধ্যে অনেক শিক্ষিত, গুণী সম্প্রদায় চিৎকার করে বাধা দিতেন। মুসলমান নেতারাও ‘পাকিস্তান’ সম্পর্কে আলোচনা ও বক্তৃতা শুরু করার আগে হিন্দুদের গালি দিয়ে শুরু করতেন। হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে এ বৈরীভাব ও সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প বঙ্গবন্ধুর মনে গভীর রেখাপাত করে। তৎকালীন সমাজের এমন বাস্তব প্রেক্ষাপটে একটি অসাম্প্রদায়িক চেতনা ধারণ করে বঙ্গবন্ধু ঐক্যবদ্ধভাবে বাঙালিদের অধিকার আদায়ের সংকল্প নেন। কিশোর বয়সের সেই চেতনাবোধ বঙ্গবন্ধুকে সত্যিকার অসাম্প্রদায়িক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় বিপদাপন্ন মানুষের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন জায়গায় ছুটলেন।
১৯৪৬ সালের ২৯ জুলাই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের কাউন্সিল সভা ডাকেন বোম্বে। অর্থাভাবে বঙ্গবন্ধু সে-সভায় যোগ দিতে পারেননি। সভায় ১৬ আগস্ট জিন্নাহ সাহেব ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে ঘোষণা করলেন। তিনি বিবৃতিতে শান্তিপূর্ণভাবে এ দিনটি পালনের আহ্বান জানান। তিনি চেয়েছিলেন যে ভারতবর্ষে ১০ কোটি মুসলমান পাকিস্তান দাবিতে বদ্ধপরিকর এ-বিষয়টি ক্যাবিনেট মিশনকে দেখাতে। এ-সময় হিন্দু মহাসভার নেতারা মুসলিমদের এই প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস, তাদের বিরুদ্ধে ঘোষণা করা হয়েছে বলে প্রচার শুরু করেন। দিবসটি পালনের জন্য কলকাতায় মুসলিম ছাত্রদের ডাক পড়ে। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ইসলামিয়া কলেজ থেকে ছাত্ররা মুসলিম লীগ অফিসে নেতাদের সঙ্গে প্রস্তুতি সভা করে। তখন মুসলিম লীগ নেতারা নির্দেশ দেন, মহল্লায় মহল্লায় গিয়ে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে শান্তিপূর্ণভাবে দিনটি পালনের আহ্বান জানানোর। বঙ্গবন্ধু দিনটি পালনের জন্য সহকর্মীদের নিয়ে প্রচারণায় নেমে পড়েন। কিন্তু কিছু হিন্দু নেতারা বলতে শুরু করলেন এ দিবস পালন তাদের বিরুদ্ধে। আগের দিন ১৫ আগস্ট ঠিক হলো কার কী দায়িত্ব। ১৬ আগস্ট গড়ের মাঠে মুসলিম লীগের জনসভা হবে। তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সেদিন সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হলো। বঙ্গবন্ধুর ওপর দায়িত্ব পড়ল ইসলামিয়া কলেজে থাকতে। সকাল ১০টায় মুসলমান ছাত্রদের জড়ো করতে। সকাল ৭টায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম লীগের পতাকা উত্তোলন করতে। ১৬ আগস্ট সকালে বঙ্গবন্ধু ও নুরুদ্দিন নামে এক ছাত্র সাইকেলে চড়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে যান এবং মুসলিম লীগের পতাকা উত্তোলন করেন। পরে শোনেন, হিন্দু ছাত্ররা সেই পতাকা ছিঁড়ে ফেলেছিল।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম লীগের পতাকা উত্তোলন করে বঙ্গবন্ধু ইসলামিয়া কলেজে ফিরে আসার পরই শুরু হয় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা। বেকার হোস্টেলে ফিরে এসেই বঙ্গবন্ধু শুনতে পারলেন বিভিন্ন স্থানে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা শুরু হয়ে গেছে। রিপন কলেজে মুসলিম ছাত্ররা পতাকা উত্তোলন করতে গিয়ে আক্রমণের শিকার হয়েছে। কলকাতার সুরেন ব্যানার্জি রোড, ধর্মতলা ওয়েলিংটন জংশন হিন্দু অধ্যুষিত এলাকা ছিল। ওয়েলিংটনে মসজিদে হামলা হয়েছে। এরই মধ্যে থেমে থেমে হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গার খবর আসতে লাগল। কালীঘাট, ভবানীপুর, হ্যারিসন রোড, বড়বাজারসহ বিভিন্ন জায়গায় মুসলিম শোভাযাত্রার ওপর হামলা হয়েছে। গড়ের মাঠের জনসভায় লাখো লোকের জমায়েত হয়েছে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বক্তব্য রাখলেন। সবাইকে বাড়ি ফিরে যেতে হুকুম দিলেন। কিন্তু যাদের বাড়ি হিন্দু এলাকায় তারা পড়েছিল সবচেয়ে বিপাকে। এ-সময় মুসলিম লীগ অফিস লোকে-লোকারণ্য হয়ে পড়েছে। যেসব জায়গায় মুসলিম ছাত্ররা আটকা পড়ল, তাদের অনেককে বঙ্গবন্ধু উদ্ধার করে নিরাপদে নিয়ে এলেন। অনেক হিন্দু পরিবার যারা বেকার হোস্টেলের আশপাশে ছিল তাদেরও উদ্ধার করে বঙ্গবন্ধু সুরেন ব্যানার্জি রোড এলাকায় পাঠিয়ে দিলেন। অনেক লোক মুসলিম লীগ অফিসে ফোন করলেন জীবন বাঁচাতে। বিভিন্ন জায়গায় হামলা হচ্ছিল। অনেক হিন্দু পরিবার মুসলিমদের আশ্রয় দিয়ে বিপদে পড়েছে, সেই খবরও আসতে লাগল। বঙ্গবন্ধু নিজেও খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। কারণ তার ছয় ভাইবোনের মধ্যে পাঁচ ভাইবোনই তখন কলকাতা ও শ্রীরামপুরে থাকেন। বঙ্গবন্ধুর মেজো বোন আমার মা আছিয়া খাতুন। তখন আমাদের বাসা বেনিয়াপুকুরে। এ এলাকাটি মুসলিম অধ্যুষিত হিসেবে পরিচিত। তাই আমাদের নিয়ে চিন্তা একটু কম ছিল। সবচেয়ে বেশি চিন্তায় পড়লেন তার ছোট ভাই আমার ছোট মামা শেখ আবু নাসেরকে নিয়ে। কারণ সে একবার আমাদের বাসা, আরেকবার ছোট খালার বাসায় আসা-যাওয়া করে। ছোট ভাই কোথায় গেছে সে-চিন্তা করতে লাগলেন বঙ্গবন্ধু। নাসের মামা একটু ডানপিঠে হওয়ায় চিন্তা আরও বেশি ছিল। বঙ্গবন্ধুর ধারণা ছিল নাসের মামা গড়ের মাঠে নিশ্চয়ই এসেছেন। এখনও কোনো বাসায় ফিরে আসেনি। কলকাতা শহরে এদিন শুধু লাশ আর লাশ পড়েছিল। মহল্লার পর মহল্লা আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। সে এক ভয়াবহ চিত্র। বেকার হোস্টেল, ইলিয়ট হোস্টেলে মুসলিম ছাত্রদের আর জায়গা দেওয়া যাচ্ছে না। ১৬ আগস্ট হিন্দুরা মুসলমানদের ভীষণভাবে মেরেছে আর পরদিন হিন্দুদের ব্যাপক মারধর করে মুসলিমরা। এদিকে যারা আশ্রয় নিয়েছে তাদের খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা করার জন্য বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন জায়গায় ছুটলেন। নিজে চালের বস্তা ঠেলাগাড়িতে করে ঠেলে নিয়ে এলেন। তবুও মানুষ বাঁচাতে হবে এমন চিন্তা থেকে বঙ্গবন্ধু রাতদিন কাজ করে চলেছেন। একদিকে নিজের পরিবারের ভাই-বোনদের চিন্তা, অন্যদিকে বিপদগ্রস্ত মানুষ বাঁচাতে হবে, হিন্দু-মুসলিম যে যেখানে বিপদে পড়েছে তাকেই বঙ্গবন্ধু সাহায্য করছেন। জীবনের মায়া কখনও করেননি। অনেক সময় নিজেও বিপদে পড়েছেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যেখানেই ছুটে গেছেন বঙ্গবন্ধুও তার সাথে শান্তি রক্ষায় দিনরাত পরিশ্রম করেছেন।
এখানে আমার মায়ের কাছ থেকে (বঙ্গবন্ধুর মেজো বোন আছিয়া খাতুন) শোনা একটি ঘটনার উল্লেখ করতে চাই, ১৯৪৬ সালের আগস্টে কলকাতায় ব্যাপকভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলছিল। বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু বিভিন্ন জায়গায় ছুটছেন অসহায় মানুষের সাহায্যে। জোরা গির্জায় সোহরাওয়ার্দীর সাথে বঙ্গবন্ধু এসেছিলেন আশ্রিত মানুষের অবস্থা তদারকি করতে। তখন শহীদ সাহেবকে বঙ্গবন্ধু বলেন, স্যার আমার মেজো বোন খুবই কাছে আছে, আমাকে ১০ মিনিট সময় দিলে তাকে দেখে আসতে পারি। সোহরাওয়ার্দী বললেন, তোমার বোন দেখে আসো। তখন কলকাতা শহরজুড়ে বিদ্যুৎ নেই। এক ভুতুড়ে শহর। নিরাপত্তার কারণে কেউ ঘর থেকে বের হন না। মুসলিম পরিবারগুলো আরও বেশি অসহায়। বঙ্গবন্ধু বেনিয়াপুকুর বোনের বাসায় গেলেন। লম্বা ছিপছিপে গড়নের এক যুবক বাসার গেটে এসে ‘বুজি বুজি’ বলে ডাকছিল। তখন ভয়ে কেউ গেট খুলছিল না। মা উপর থেকে অন্ধকারের মধ্যে ছায়া দেখে বুঝতে পারলেন খোকা এসেছে। তাড়াতাড়ি নিচে গিয়ে গেট খুললেন। উপরে এসে বঙ্গবন্ধু বললেন, বুজি ক্ষুধা লেগেছে, খাবার কিছু আছে, তিন দিন কিছুই খাই নেই। মা ঘরে রাখা ঠা-া ভাত, ছাগলের দুধ ও কলা মেখে দিলেন বঙ্গবন্ধুকে। খাওয়ার পর বেশি সময় থাকলেন না। চলে গেলেন সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কাছে।
কলকাতার দাঙ্গা শেষ হতে-না-হতেই দাঙ্গা শুরু হলো নোয়াখালীতে। মুসলমানরা হিন্দুদের ঘরবাড়ি লুট করল এবং আগুন ধরিয়ে দিল। ঢাকায় তো দাঙ্গা লেগেই ছিল। এর প্রক্রিয়ায় বিহারে আরম্ভ হয় ভয়াবহ দাঙ্গা। বিহারের বিভিন্ন জেলায় পরিকল্পিতভাবে মুসলমানদের বাড়িঘরে হামলা করা হয়। অনেক লোক মারা যায়। কলকাতা থেকে বঙ্গবন্ধুসহ অনেক স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী বিহার যান। অনেক চিকিৎসকও গিয়েছিল। বাংলার সরকার সে-সময় বিহারের মুসলিমদের সব ধরনের সহযোগিতা করেছিল। বঙ্গবন্ধু পাটনায় মুসলিম নেতাদের জানালেন বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বলেছেন, ট্রেনে ভরে আসানসোলে শরণার্থী পৌঁছে দিলে বাংলা সরকার সব দায়িত্ব নেবে। প্রথমে অনেকেই বঙ্গবন্ধুর কথা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। কারণ বয়স কম, এতটুকু ছেলেকে প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব দেবে এটা বিহারের মুসলিম নেতারা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। আকমল নামে একজন তো বঙ্গবন্ধুকে বলেই ফেললেন, আপনি কেমন করে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের পক্ষে কথা বলতে পারেন? তখন বঙ্গবন্ধু প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর টেলিফোন নম্বর দিয়ে বললেন, টেলিফোন করে দেখতে পারেন। পরদিন থেকেই বিহার থেকে আসানসোলে লোক পাঠানোর সিদ্ধান্ত হলো। কারণ গ্রাম থেকে পাটনায় যত লোক আসছে তাদের শহরে জায়গা দেওয়া অসম্ভব। দূর-দূরান্ত থেকে দাঙ্গাকবলিত লোকদের বঙ্গবন্ধু উদ্ধার করলেন। নিজে হাজার খানেক লোক নিয়ে আসানসোলের দিকে রওনা হলেন। আসানসোলে মুসলিম লীগ নেতা মওলানা ইয়াসিন সাহেবকে টেলিগ্রাম করা হয়েছে। তিনি দুইখানা ট্রাক ও কিছু স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে রেল স্টেশনে হাজির ছিলেন। বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও এসডিও-কে হুকুম দিয়েছেন, এদের জায়গা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করতে। যুদ্ধের সময় যে সকল ব্যারাকে সৈন্য রাখা হয়েছিল সেখানে শরণার্থীদের রাখার ব্যবস্থা করা হলো। সরকারের পক্ষ থেকে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। খাবার বণ্টনের জন্য বঙ্গবন্ধু আসানসোলের মুসলিম লীগ নেতা ও এসডিও-কে নিয়ে একটি বৈঠক করলেন। এসডিও ইউরোপিয়ান ভদ্রলোক খুবই বিনয়ী ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে খুবই সহযোগিতা করলেন। আসানসোলে প্রথম ক্যাম্প খোলা হলো ‘নিগাহ’ নামে একটা ছোট গুদাম ঘরে। এখানে হাজার খানেক লোকের সংস্থান হলো। পরে কান্দুলিয়া ক্যাম্প খোলা হলো। এখানে ১০ হাজার শরণার্থীর থাকার ব্যবস্থা হলো। বঙ্গবন্ধু এ ক্যাম্পের নাম দিলেন হিজরতগঞ্জ। আসানসোলের মুসলিম নীগ নেতা মওলানা ইয়াসিন নামটা গ্রহণ করলেন এবং খুশি হলেন। আসানসোল ও রানীগঞ্জ স্টেশনে ট্রেন থেকে শরণার্থীদের নামানো হতো। সেখান থেকে ট্রাকে নিয়ে আসা হতো ক্যাম্পগুলোতে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সার্বক্ষণিক কাজ করতেন শাহজাদপুরের পীর মাওলানা ওয়াহিদ। দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে আসানসোলে বিহার থেকে আসা শরণার্থীদের খাওয়া-দাওয়ার বন্দোবস্ত করতেন। নিজেরা না খেয়ে মানবিক সহযোগিতা চালিয়ে যেতেন। বঙ্গবন্ধু শরণার্থীশিবির থেকে সবার খাওয়ার পরে দিনে একবেলা যা থাকত, তা খেয়েই বিপদগ্রস্ত মানুষের সেবা করতেন। এভাবে ময়রা, মাধাইগঞ্জ, বিষ্ণুপুর, অন্ডাল, বর্ধমানে ক্যাম্প খুলে দুর্গত মানুষদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। বিরামহীনভাবে দাঙ্গাকবলিতদের আশ্রয় দেওয়া, খাবারের ব্যবস্থা করা, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে তার নির্দেশমতো ক্যাম্প পরিচালনাসহ নানা কাজে বঙ্গবন্ধু রাত-দিন ২৪ ঘণ্টাই ব্যস্ত থাকতেন। গোসল-খাওয়া ভুলে আর্তমানবতার সেবায় নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন। এর মধ্যেই বঙ্গবন্ধুর শরীর খারাপ হয়ে পড়ে। ভীষণ জ্বরে আক্রান্ত হন তিনি। বঙ্গবন্ধু সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কলকাতা আসেন, তাকে দেখলে যে কেউ সহজে অসুস্থতা বুঝতে পারত। বেকার হোস্টেলে বঙ্গবন্ধু ফিরে আসার পরও অসুস্থ ছিলেন। কিন্তু বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শত ব্যস্ততার মধ্যেও বঙ্গবন্ধুর কথা ভোলেননি। তিনি বেকার হোস্টেলে খোঁজ নিয়েছেন। হাসপাতালে ভর্তি করিয়েছেন এবং প্রিন্সিপালের কাছে প্রতিদিন টেলিফোন করে খোঁজ নিতেন। বঙ্গবন্ধু নিজে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দাঙ্গা দমনে বিভিন্ন জায়গায় যেতেন। বঙ্গবন্ধু কলকাতা ফিরে মনস্থির করলেন এ বছর বিএ পরীক্ষা দেওয়ার। ইসলামিয়া কলেজের প্রিন্সিপাল ড. জুবেরি’র সঙ্গে দেখা করলেন। প্রিন্সিপাল তাকে বললেন, পাকিস্তান আন্দোলনে অনেক কাজ করেছ, এবার কথা দাও এ-কয়েক মাস লেখাপড়া করে পরীক্ষার আগে কলকাতা আসবে এবং পরীক্ষা দেবে, তাহলেই অনুমতি দেওয়া হবে। অনুমতি নিয়ে বঙ্গবন্ধু তার বাল্যবন্ধুর কাছে উল্টোডাঙ্গায় চলে আসেন বইপত্র নিয়ে। পরীক্ষার আগে কলকাতায় বোনের বাসায় ওঠেন এবং ১৯৪৬ সালে বঙ্গবন্ধু ইসলামিয়া কলেজ থেকে বিএ পরীক্ষা দেন এবং পাস করেন। এ-সময় মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হিন্দু-মুসলিম শান্তি প্রতিষ্ঠায় কাজ করছিলেন। ব্যারাকপুরে সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু গিয়েছিলেন দাঙ্গা-পরবর্তী হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর জন্য। গান্ধীজী সেখানে জনসভা করেছিলেন। পরে বিহারের ভয়াবহ দাঙ্গার কিছু ছবি বঙ্গবন্ধু গান্ধীজীকে দিয়েছিলেন। যে ছবিগুলো পাটনায় গিয়ে তিনি ও তার বন্ধু ইয়াকুব তুলেছিলেন। মহাত্মা গান্ধী ছবি দেখে বুঝতে পেরেছিলেন কীভাবে নিরীহ লোকদের হত্যা করা হয়েছে।
একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতৃত্বের সংকীর্ণ রাজনীতির কারণে অনেক মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। কারণ মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে জিন্নাহ’র রাজনৈতিক মতবিরোধ অনেকটা শত্রুতায় পরিণত হয়েছিল। মুসলিম লীগের পাকিস্তান আন্দোলন ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে না হয়ে পাকিস্তান দাবির বিরোধী হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেক বাঙালি নেতৃত্ব ছিলেন, যারা পাকিস্তান দাবির সঙ্গে থাকলেও হিন্দুদের বিরোধিতা করা, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঘোর বিরোধী ছিলেন। দাঙ্গা দমনে সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধুর অক্লান্ত পরিশ্রমই তা প্রমাণ করে। অন্যদিকে খাজা নাজিমুদ্দিন, লিয়াকত আলী খানসহ মুসলিম লীগের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা ছিলেন সাম্প্রদায়িক। গান্ধীজীর রাজনৈতিক সহিষ্ণুতা ছিল। কিন্তু জিন্নাহ-সহ মুসলিম লীগের নেতারা ছিলেন অসহিষ্ণু ও সংকীর্ণ মানসিকতার। মহাত্মা গান্ধীই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে কায়দে আজম উপাধি দিয়েছিলেন। কিন্তু জিন্নাহ গান্ধীজীকে মহাত্মা বলতে রাজি ছিলেন না। তিনি সব সময় বলতেন ‘এ হিন্দু গ্রেট লিডার’। গান্ধীজী অহিংস রাজনীতির কথা বলতেন, আর জিন্নাহ’র কথা ছিল ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’। মুসলিম লীগের এ পাকিস্তান লড়াইটা মূলত হয়েছিল হিন্দু ও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। এ-কারণে মুসলিম লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব জিন্নাহ, লিয়াকত আলী খানদের কখনও ইংরেজদের রোষানলে পড়তে হয়নি। তারা কখনও পাকিস্তান আন্দোলনের জন্য গ্রেফতার হয়ে কারাগারে যেতে হয়নি।
১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্ট ভারতবর্ষে পাকিস্তান যে ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে পালনের ডাক দেয়। সবাই মনে করেছিল এটা ব্রিটিশদের ওপর চাপ প্রয়োগ করার একটা কৌশল। কিন্তু আগের দিন কলকাতায় এক জনসভায় খাজা নাজিমুদ্দিন প্রকাশ্যেই বলেন, এ ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে নয়, এটা পাকিস্তান দাবি মানতে রাজি নয় সেসব হিন্দুদের বিরুদ্ধে। এ-কারণে পরের দিন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। হাজার হাজার নিরীহ মানুষ হত্যাকা-ের শিকার হয়। এ দাঙ্গা বাংলা, বিহার ও গুজরাটে ছড়িয়ে পড়ে। দাঙ্গা সৃষ্টিতে হিন্দু মহাসভার অবদানও কম নয়। অবশেষে গান্ধীজীকে দাঙ্গা থামাতে আমরণ অনশন করতে হয়েছিল। শুধু আচরণে নয়, কথাবার্তায়ও মুসলিম লীগ নেতৃত্ব ছিল উগ্র। লিয়াকত আলী খান সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় উসকানি দিতেন। পাকিস্তান হওয়ার পরও প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান অশ্লীল ভাষায় হোসেন সোহরাওয়ার্দীকে গালিগালাজ করতেন ভারতের লেলিয়ে দেওয়া কুকুর বলে। ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার পর পাকিস্তান মুসলিম লীগের নেতা কাইয়ুম খান ঢাকায় পল্টনের জনসভায় আওয়ামী লীগের নেতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘শির কুচলে দেঙ্গে’ অর্থাৎ মাথা কেটে ফেলব। বঙ্গবন্ধুকেও মুসলিম লীগ নেতারা ‘ক্রিমিনাল’ আখ্যা দিতেন। সিন্ধুর নেতা আল্লাবকসকে হত্যার অভিযোগও ছিল মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে।
পাকিস্তান হওয়ার পর বাংলায় যাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় থাকে সেজন্য হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন জায়গায় সভা-সমাবেশে অংশ নিতেন বঙ্গবন্ধু। পাকিস্তান হওয়ার পর হিন্দু সম্প্রদায়ের দেশ ত্যাগের যে হিড়িক পড়েছিল, তা অনেকটা কমে যায় এ প্রচেষ্টার কারণে। আবার পশ্চিম বাংলা, বিহার থেকেও মুসলমানদের আসা অনেকটা কমে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঢাকা, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, খুলনায় বেশ কয়েকটি সভা করেন। এসব সভায় বহু লোক সমাগম হতো তা দেখে নাজিমুদ্দীনের সরকার অনেকটা ঘাবড়িয়ে যায়। সেজন্য সোহরাওয়ার্দীর ঢাকায় আগমনকে ভালো চোখে দেখত না মুসলিম লীগ সরকার। আগে আসলে সরকারি কর্মচারীরাই সব ব্যবস্থা করত। কিন্তু মুসলিম লীগে উপদল সৃষ্টি এবং সোহরাওয়ার্দীর অনুসারীদের বাদ দেওয়ায় পরিস্থিতি পাল্টে যায়। সরকার সব ধরনের অসহযোগিতা করতে থাকে। সরকারের গোয়েন্দা বিভাগও নজরদারি করত। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বাংলায় হিন্দু-মুসলমান সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে ঘরোয়া বৈঠকও করতেন। বঙ্গবন্ধু তার সাথে দুই বাংলায়ই ঘুরেছেন সম্প্রীতি বজায় রাখতে। সোহরাওয়ার্দী জনসভায় ভালো বক্তব্য দেওয়ায় মানুষ তার ভক্ত হয়ে যেত। এ-কারণে যেখানে যেতেন সেখানে বড় বড় জমায়েত হতো।
গোপালগঞ্জে চন্দ্রবাবু ঘোষ ছিলেন একজন সমাজকর্মী। জীবনে রাজনীতি করেননি। মহাত্মা গান্ধীর মতো একখানা কাপড় পরতেন আর একখানা গায়ে দিতেন। খড়ম পায়ে দিতেন। আপদমস্তক অসাম্প্রদায়িক এ মানুষটি এলাকায় জনদরদি হিসেবে পরিচিত ছিলেন। গোপালগঞ্জে মেয়েদের হাই স্কুলসহ অনেক স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। কাশিয়ানির রামদিয়া কলেজটি তিনি প্রতিষ্ঠিত করেছেন। জনসাধারণের কল্যাণার্থে অনেক খাল কেটেছেন, রাস্তাও নির্মাণ করেছেন। চন্দ্রবাবু ঘোষ জীবনের বেশিরভাগ সময় জনসেবায় কাটিয়েছেন। তার কোনো বদনাম ছিল না। অথচ পাকিস্তান সরকার এ লোকটাকে মিথ্যা সাম্প্রদায়িক অপবাদ দিয়ে জেলে নিয়েছে ও শাস্তি দিয়েছে। ১৯৪৮ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জে এসে বলেছিলেন, চন্দ্রবাবু ঘোষের মতো মানুষকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানের বদনাম করা হচ্ছে। জানা যায়, পাকিস্তান হওয়ার পর একজন সরকারি কর্মচারী মিথ্যা খবর দিয়ে তাকে গ্রেফতার করিয়েছিলেন। চন্দ্রবাবু ঘোষ শাস্তি ভোগ শেষে নিরাপত্তাবন্দি হয়ে ফরিদপুর কারাগারে ছিলেন। হিন্দু-মুসলমান অনেকেই তার ভক্ত ছিল। তবে তফসিলি সম্প্রদায়ের লোকই বেশি ভক্তি করত চন্দ্রবাবুকে। বঙ্গবন্ধুও তাকে বেশ জানতেন আগে থেকেই। গোপালগঞ্জে অনেক তফসিলি সম্প্রদায়ের লোক পাকিস্তান আন্দোলনের সমর্থক ছিল এবং সিলেটে গণভোটে কাজ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুও মুসলিম লীগের নেতা-কর্মীদের বলেছিলেন, চন্দ্রবাবুর যেন কোনো অসুবিধা না হয়। কারণ সমাজের অনেক কাজ হবে তার মতো জনদরদি নিঃস্বার্থ ত্যাগী সমাজসেবক থাকলে। পাকিস্তান হয়েছে তাই বাবুদের মতো লোককে কাজে লাগাতে হবে। বঙ্গবন্ধুর কথাও সে-সময় সরকারি কর্মচারীরা আমলে নেয়নি। দেশে হিন্দুরা আইন মানছে না, হিন্দুস্তানের পতাকা তুলেছে, এদের নেতা চন্দ্রবাবুÑ এ-ধরনের খবর পাঠিয়ে সরকারকে ক্ষেপিয়ে তোলা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু জানতেন চন্দ্রবাবুর বিরুদ্ধে সবই ছিল মিথ্যা প্রচারণা। কারণ এ-ধরনের কর্মকা- হলে গোপালগঞ্জে দাঙ্গা বেধে যেত। তবে চন্দ্র ঘোষের গ্রেফতারের হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন ভয় পেয়ে গিয়েছিল। তারা পশ্চিমবঙ্গের দিকে যাওয়া শুরু করেছিল। যারা ছিল তারাও যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।
মুসলিম চেতনায় পাকিস্তান সৃষ্টির পর বঙ্গবন্ধু সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে রাজনীতি করতে চাননি। তিনি মুসলিম লীগ ছেড়েছেন, আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে দলের নাম ১৯৫৫ সালের সম্মেলনে ‘মুসলিম’ বাদ দিয়ে শুধু আওয়ামী লীগ করেছেন।
১৯৬৪ সালে ঢাকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। প্রথমে বিহারিরা আমদজিতে হিন্দু-মুসলমান বাঙালিদের ওপর হামলা করে। একজন বাঙালি মুসলমান মারা গেলে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। হাইকোর্টের সিনিয়র অ্যাডভোকেট এসআর পাল, রামেন্দু মজুমদার-সহ অনেককে রক্ষা করেন এবং বঙ্গবন্ধু বাসায় নিয়ে আসেন। দাঙ্গাবাজরা বঙ্গবন্ধুর গাড়িতে হামলা করেছিল। জীবন-মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে তিনি সে-সময় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্রের মূলনীতি হবে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় পাকিস্তানের দুঃশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ডাক দেন তখনও তিনি বলেন, এ বাংলায় হিন্দু-মুসলমান বাঙালি-অবাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আপনাদের ওপর। আমাদের যেন বদনাম না হয়।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে সংবিধানে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় ধর্মনিরপেক্ষতা যুক্ত করেন। বঙ্গবন্ধু সাম্প্রদায়িক রাজনীতি বন্ধ করে দেন।
সাম্প্রদায়িক যে কোনো অপশক্তিকে বঙ্গবন্ধু মনে-প্রাণে ঘৃণা করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন সাম্প্রদায়িকতা মানবতার শত্রু, গণতন্ত্রের শত্রু, জাতির শত্রু, রাষ্ট্রের শত্রু। বঙ্গবন্ধু মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখেছেন। তিনি রাজনীতিতে মুসলমান, হিন্দু, খ্রিষ্টানসহ সকল ধর্মের মানুষকে সমানভাবে দেখেছেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদী নেতা।

লেখক : সভাপতিম-লীর সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply