স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী

সম্পাদকের কথা : “স্বাধীনতা-হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে,/ কে বাঁচিতে চায়?/ দাসত্ব শৃঙ্খল বল কে পরিবে পায় হে…।”
আজ থেকে ৫০ বছর আগে বাঙালি জাতির দাসত্বের শৃঙ্খল এক সাগর রক্তের নদীতে চিরদিনের জন্য ভেসে গেছে। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী জাতি নানা উত্থান-পতন-অভ্যুদয়ের মধ্যেও ইতিহাসে গত অর্ধশতাব্দী যাবত বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। সমগ্র জাতি এবার গর্ব ও গৌরবের সাথে উদযাপন করবে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। এই দিনে আমরা বিশেষভাবে স্মরণ করছি- সেই সব অগণিত শহিদের কথা, যাদের রক্তে-স্নাত এই পবিত্র মাটি- প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ আজ সারাবিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল। এই দিনে আমরা বিশেষভাবে স্মরণ করছি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পবিত্র স্মৃতি।
১৯২০ সালের ১৭ মার্চ যার জন্মদিন। জন্মশতবর্ষ পেরিয়ে এ বছর আমরা উদযাপন করব জাতির পিতার ১০১তম জন্মদিন। জন্মদিনে জাতির পিতার প্রতি প্রাণঢালা সশ্রদ্ধ ভালোবাসা। মার্চ আমাদের জাতীয় ইতিহাসে ঘটনাবহুল মাস। এ মাসের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে স্মরণকালের বৃহত্তম জনসভায় জাতির পিতা তার রচিত সেই অমর কবিতাখানি পাঠ করেছিলেন, যে কবিতা শুনে শান্তিপ্রিয় বাঙালি জাতি ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে’ আসন্ন মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতার ঘোষণা করার পরমুহূর্তে একটি অসামরিক জাতি সামরিক জাতিতে পরিণত হয়। শুরু হয় মহান মুক্তিযুদ্ধ। মাত্র ৯ মাসের সেই প্রতিরোধ যুদ্ধে বাঙালি জাতি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করে। ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারা আত্মসমর্পণ করে প্রাণ ভিক্ষা চায়।
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠতে পারে, এই স্বাধীনতা আমাদের কী দিয়েছে? বিগত ৫০ বছরে আমরা কী পেয়েছি। লাখো শহিদের স্বপ্ন- বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলার স্বপ্ন আমরা কতটা রূপায়ণ করতে পেরেছি?
এই সংখ্যার একাধিক প্রবন্ধে সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা এখানে তার বিস্তারিত বিবরণ পুনরুচ্চারণ করতে চাই না। আমার বিবেচনায় মাত্র ৫টি সূচকের মধ্যেই আমাদের অর্জনের হিসাব-নিকাশ তুলে ধরা যায়।
প্রথম অর্জন – একটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্র বদলে দিয়েছে;
দ্বিতীয় অর্জন – মাত্র এক বছরের মাথায় একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান রচিত হয়েছে;
তৃতীয়ত – একটি হত-দরিদ্র দেশের লজ্জা ঘুচিয়ে বাংলাদেশ আজ স্বল্পোন্নত থেকে মধ্যম আয়ের উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হয়েছে;
চতুর্থত – ১৯৭১-৭২ সালের মাথাপ্রতি গড় বার্ষিক আয় ১২৯ ডলার থেকে বেড়ে ২,০৬৪ ডলারে উন্নীত হয়েছে এবং শিক্ষার হার ১৬.৮০ থেকে ৭৪.৭০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। ১৯৭১-এর পূর্বে দারিদ্র্যসীমা ৮৮ শতাংশ ছিল, যা এখন ২০ শতাংশের নিচে।
পঞ্চমত – বাংলাদেশের সকল নাগরিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছে। নারীর ক্ষমতায়নে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ শীর্ষে। ডিজিটাল বাংলাদেশ, নিজস্ব স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আকাশ জয়, টেকসই সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং অবকাঠামো উন্নয়নে নিজস্ব আয়ে পদ্মাসেতু, কর্ণফুলিতে টানেল নির্মাণ, পায়রা সমুদ্রবন্দর ও রাজধানীতে মেট্রোরেল বিস্ময়কর উন্নতি ইত্যাদি।
আমাদের এতসব অর্জনে আমরা আত্মতুষ্ট নই। ১৯৭৫-এ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে এবং চার জাতীয় নেতাকে হত্যার ভেতর দিয়ে সামরিক-স্বৈরশাসক আমাদের দেশকে পিছিয়ে দিয়েছিল। ভূলুণ্ঠিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের অর্জন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা- ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও আমাদের যা ক্ষতি হয়ে গেছে, তা কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। তা সত্ত্বেও জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাঙালি জাতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার লক্ষ অর্জনের ভেতর দিয়ে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে উঠবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply