স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এই আমার বাংলাদেশ

অধ্যাপক ড. জেবউননেছা : কয়েকটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা দিয়ে শুরু করতে চাই ‘স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এই আমার বাংলাদেশ’ লেখাটি। ব্যক্তিগত ফ্ল্যাটটির নামজারির জন্য ভূমি অফিসে আবেদন করেছিলাম। সব খরচ মিলিয়ে মাত্র ১১০০ টাকায় এক মাসেরও কম সময়ে মিলে যায় নামজারির কাগজ। রাজধানীর একটি রেস্তোরাঁয় সব সময় ক্রেতা দিয়ে রাত অবধি পূর্ণ থাকে। একদিন আমিও জায়গা পাওয়ার অভাবে ফিরে এসেছিলাম। করোনার সময় ও ছুটির দিনে একটি বুফে রেস্তোরাঁয় বেশ কয়েকদিন বুকিং দিতে চেয়ে পাইনি। কারণ বুকিং হয়ে গেছে পূর্বেই। ঘরে বসে নানারকমের খাবার সরবরাহ করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। মুঠোফোনে খুঁজে বের করতে সক্ষম হচ্ছি গন্তব্যের গাড়ি। বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল প্রদান করছি প্রি-পেইড কার্ডে। আর আমার ছেলে তো তার বিদ্যালয়ের বেতন নিজেই মুঠোফোনে পরিশোধ করে। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি চাকরিজীবী পিতার পেনশন ভাতা তার অ্যাকাউন্টে জমা হয় প্রতি মাসে। রাজধানীর যে এলাকায় আমি বাস করি, সেই ভবনের পাশেই পেয়ে যাই প্রতিদিন অঢেল সজীব সবুজ শাক-সবজি। কর্মস্থলে ঢাকা থেকে যাওয়ার জন্য গণপরিবহনের অভাব নেই।
এতসব অভিজ্ঞতার পিছনে আরও অভিজ্ঞতা আছে। যখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করতাম, তখন মুঠোফোনে এক মিনিটে পরিশোধ করতে হতো ৭ টাকা, সিমকার্ডের মূল্য ছিল ৭ হাজার টাকার ঊর্ধ্বে। মনে পড়ে সে-সময় ৭ হাজার ৭৭৫ টাকায় সিমকার্ড ক্রয় করেছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সংবাদ খুঁজতে হয়েছিল পত্রিকার দোকানে। নানারকম টিভি চ্যানেলের কোনো সুবিধা পাইনি। তার চেয়ে আর একটু পিছনে যদি যাই, দেখা যায় তখন বিদ্যালয়-মহাবিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালীন সন্ধ্যায় প্রচুর পরিমাণে লোডশেডিং হতো। পড়াশোনায় ভীষণ সমস্যা হতো। বাড়ির দোতলার সিঁড়িতে বসে পশ্চিম দিকে যেখানে কচুরিপানার পরিত্যক্ত পুকুর দেখতাম, সেখানে এখন প্রশস্ত রাস্তা, সেই রাস্তায় চলাচল করে ভারী যানবাহন। তবে এই অভিজ্ঞতা বেশি দিনের নয়। এই তো আশির দশক থেকে নব্বইয়ের দশকের গল্প। শোষণে জর্জরিত যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ২৪ বছরের রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা পেয়েছিলাম স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। সেই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের তিনি হাল ধরেছিলেন, প্রণয়ন করেছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের পবিত্র সংবিধান, গ্রহণ করেছিলেন দেশ গঠনের লক্ষ্যে নানা ধরনের পদক্ষেপ।
১৯৭৫-এর ১৫ আগস্টের পর স্তব্ধ হয়ে পড়ে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা। নানারকম সামরিক শাসন, ইতিহাস বিকৃতিসহ উদ্ভট এক উটের পিঠে চলছিল বাংলাদেশ। এরপর নানা চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে দেশ আজ ৬৬টি উদীয়মান সবল অর্থনীতির দেশের তালিকায় নবম স্থান দখল করেছে। ১৯৭১-এর পর থেকে এ পর্যন্ত বাংলাদেশকে যদি পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ১৯৭১ সালে দেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১২৯ ডলার। অথচ এখন মাথাপিছু ২,০৬৪ ডলার। দেশজ উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ৮.১৫ শতাংশে পৌঁছেছে। প্রবৃদ্ধির তালিকায় বিশ্বে শীর্ষ পাঁচ দেশের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশ। স্বাধীনতার পর দেশে পাকা সড়ক ছিল ৩ হাজার ৬১০ কিলোমিটার, বর্তমানে ২১ হাজার ৫৯৬ কিলোমিটারে উন্নীত হয়েছে। ১৯৭১ সালে ১০ হাজার ৪৯০ জনের জন্য একজন রেজিস্টার চিকিৎসক ছিলেন। বর্তমানে ২ হাজার ৫৮১ জনে একজন চিকিৎসক। যেখানে ১৯৭২-৭৩ সালের বার্ষিক বাজেট ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা, সেখানে আজ ২০১৯-২০২০ সালের অর্থবছরের বাজেট ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। ১৯৭১ সালের সাক্ষরতা হার ১৬.৮ শতাংশ ছিল, বর্তমানে ৭৪.৭ শতাংশ। ১৯৭১-এর পূর্বে দারিদ্র্যসীমার ৮৮ শতাংশ, যা এখন ২০ শতাংশের নিচে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশের রেমিট্যান্স আয় ছিল ০.৮০ কোটি ডলার, বর্তমানে ২০১৯-২০২০ সালে ১৮ বিলিয়ন ডলার। স্বাধীনতার প্রাক্কালে গড় আয়ু ছিল ৩৭ বছর, এখন ৭৩ বছর গড় আয়ু।
অর্থনীতির আকার ৩০০ বিলিয়ন ডলার। ২০১৮ সালের ১৫ মার্চ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে পদার্পণ করেছে বাংলাদেশ। সরকারের রূপকল্প-২০২১ অনুযায়ী দেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হয়েছে। ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রণীত হয়েছে জাতীয় স্বাস্থ্য নীতিমালা-২০১১, নারী উন্নয়ন নীতিমালা-২০১১, জাতীয় শিশুনীতি-২০১১ এবং কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন-২০১২ এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়েছে। জাতীয় গ্রিডে ৬,৩২৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সংযোজিত হয়েছে। তথ্য শিল্পে ১০ কোটি মার্কিন ডলার রপ্তানি আয় হয়েছে। উৎক্ষেপণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট। জাতীয় প্রবৃদ্ধির হার গড়ে ৬ শতাংশের বেশি। তারই ধারাবাহিকতায় তথ্যপ্রযুক্তির স্রোতে বাংলাদেশ এখন ই-গভর্নমেন্ট ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে ১৯৩টি দেশের মধ্যে ১১৫তম স্থান দখল করেছে এবং ০.৪৮৬২ স্কোর অর্জন করেছে। বাংলাদেশ সরকার ২০২১ সালের মধ্যে সরকারি সেবা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত নিয়ে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে। নতুন কাজে ডিজিটাল মুদ্রাব্যবস্থা ব্লকচেইন প্রযুক্তি চালু করার ঘোষণা দিয়েছে সরকার। ব্লকচেইন বিশ্বজুড়ে তথ্য আদান-প্রদান অপরিবর্তনীয় এবং নিরাপদ মাধ্যম। এবারের নির্বাচনী ইশতেহারে ২০২১-২৩ সালের মধ্যে সারাদেশে ফাইভ-জি ইন্টারনেট সেবা পৌঁছে দেওয়ার কথা অঙ্গীকার করা হয়েছে। সেই সূত্র ধরে মন্ত্রণালয়, বিভাগ, দপ্তর, উপজেলা, জেলা, বিভাগসহ ১৮ হাজার ৪৩৬টি সরকারি অফিসকে একীভূত নেটওয়ার্কে সংযুক্ত করা হয়েছে। সরকারিভাবে জাতীয় ডাটা স্টোর স্থাপন করা হয়েছে। চালু হয়েছে ভূমি ব্যবস্থাপনার অটোমেশন। ইতোমধ্যে অনলাইনে খতিয়ান সরবরাহ, ই-নামজারি ও ই-সেটেলমেন্ট ব্যবস্থা চালু হয়েছে। দেশের সকল আদালতকে তথ্যপ্রযুক্তি নেটওয়ার্কের মধ্যে আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। অপরাধের দ্রুত ও কার্যকরী বিচার নিশ্চিত করতে রাজধানী ঢাকায় একটি ‘সাইবার ট্রাইব্যুনাল’ গঠন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বিভাগীয় শহরে ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের প্রক্রিয়া চলমান। দেশের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন মামলার বর্তমান অবস্থা, শুনানীর তারিখ, ফলাফল ও পূর্র্ণাঙ্গ রায় নিয়মিতভাবে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করার প্রক্রিয়া চলছে। পেনশনভোগীদের হয়রানি এড়াতে ব্যাংকের ইএফটি-র পাশাপাশি মোবাইল ব্যাংকিংসেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। দেশের ১৮ হাজার ৪৩৪টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও ৩ হাজার ৮০০ ইউনিয়নে ফাইবার অপটিক ক্যাবল স্থাপনের মাধ্যমে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়েছে। প্রত্যন্ত ৩১টি দ্বীপে ইন্টারনেট সেবা প্রদান করা হচ্ছে। কয়েকটি ব্যাংক সরকার ২০২৩ সালের মধ্যে আইসিটি খাতে রপ্তানি আয় ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ। ১৯৭১ সালে সাড়ে ৭ কোটি জনসংখ্যার দেশে ৪০ শতাংশ বিদেশ থেকে খাদ্য আমদানি করতে হতো, অথচ ১৭ কোটির দেশে খাদ্য আমদানি করতে হয় না। বর্তমানে বিশ্বে ধান উৎপাদনে তৃতীয়, স্বাদু পানির মাছে তৃতীয়, সবজি উৎপাদনে তৃতীয়, বিশ্বে বাংলাদেশ মোট ইলিশের উৎপাদন ৮৬ শতাংশ, ছাগল উৎপাদনে চতুর্থ, আলু উৎপাদনে বিশ্বে অষ্টম, ফল উৎপাদনে বিশ্বে দশম। এই কৃষকরা যদি সুশিক্ষিত হতেন তাহলে কৃষিজ পণ্য উৎপাদনে আমাদের অবস্থান কোথায় পৌঁছাবে তা সহজেই অনুমেয়। তাছাড়া গত ১৮ বছর ধরে বাংলাদেশে প্রতি বছর ফলের উৎপাদন গড়ে ১১ শতাংশ হারে বেড়েছে, যা বিশ্বের আর কোনো দেশে সে-হারে বাড়েনি। বাংলাদেশ এখন বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনে দ্বিতীয়, আমে সপ্তম, পেয়ারায় অষ্টম, পেঁপেতে ১৪তম। গত বছর ৪২ লাখ ৭৬ হাজার টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে এবং চাষ থেকে ২৪ লাখ টন মাছ উৎপাদিত হচ্ছে, যা মোট উৎপাদনের প্রায় ৫৬ শতাংশ। পোল্ট্রি শিল্প এখন ৩০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের বাজার, দেশে এখন ৯৫ শতাংশ জমি পাওয়ার টিলার এবং ট্রাক্টর দিয়ে চাষ হচ্ছে। ৭৬ শতাংশ জমিতে সেচ দেওয়া হয় পাম্পের মাধ্যমে। দুধ উৎপাদন হয় শুধুমাত্র সাতক্ষীরা জেলাতেই প্রায় ২ লাখ মেট্রিক টন। বর্তমানে সবজি বীজের বাজার প্রায় ৮০০ কোটি টাকার। বাংলাদেশে গরুর ঘনত্ব প্রতি বর্গমাইলে ৪৩৬টি। যা এক্ষেত্রে দ্বিতীয়, ভারতের তুলনায় প্রায় পৌনে ৩ গুণ বেশি। শুধু কি তাই, প্রাণী সম্পদ ছাগলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। জিডিপিতে প্রাণী সম্পদের অবদান ১.৫৪ শতাংশ, প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের পরিমাণ ২০ শতাংশ। দেশে প্রতিদিন ২১৬ মিলিয়ন লিটার গোমূত্র উৎপাদিত হয়, তা গাজন করে বছরে প্রায় ২ মিলিয়ন টন ইউরিয়া সার উৎপাদন সম্ভব। আর এসব বিষয়ে সফলতার কারণ রয়েছে, ২০১৮ সালে সরকারের সহযোগিতায় ১ হাজার ২৫০টি সৌরচালিত সেচপাম্প স্থাপিত হয়। ৪১ হাজার ৫০০ কৃষক, ২ হাজার ৮৮৬ উদ্যোক্তা, ৭০০ এনজিও কর্মী, ৩৮০ ব্যাংকার, ২৮৪ সরকারি কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। গত আট বছরে সরকার ৫,৭৭৬ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। ৩৩ হাজার ৪৩২ কৃষি উদ্যোক্তা ঋণ পেয়েছেন ২,৫৬০ কোটি টাকা। ২ কোটি ১০ লাখ কৃষক কৃষি সহায়ক কার্ড পেয়েছেন। ২০০৭ সালে সেচ এলাকা ছিল ৫০ লাখ হেক্টর, ২০১৭ সালে ৭০ লাখ হেক্টর (সূত্র : সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইনফরমেশন)। অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির হারে বাংলাদেশ দ্বিতীয় স্থানে এবং ইলিশ উৎপাদনকারী ১১ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম।
২০০৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পল্লি এলাকায় ৬৩ হাজার ৬৫৫ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন, ৩ লাখ ৭৬ হাজার ব্রিজ-কালভার্ট, ১ হাজার ৬৮৫টি ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন, ৯৩৬টি সাইক্লোন সেন্টার এবং ২৪৯টি উপজেলা কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। বাস্তবায়িত হচ্ছে ১২ মেগা প্রকল্পের কাজ। পদ্মা বহুমুখী সেতু, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলি টানেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, মেট্রোরেল এলএনজি টার্মিনাল, গ্যাস পাইপলাইন স্থাপন, পদ্মাসেতুতে রেল সংযোগ, মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার, কক্সবাজার ও রামু থেকে মিয়ানমার সীমান্তের কাছাকাছি ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্পসহ শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল এবং যমুনা রেলসেতু। যেখানে ২০০৯ সালে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ছিল মাত্র ২৭। এখন দেশে ১৪০টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ২৩,৫৪৮ মেগাওয়াটের ওপরে।
২০২৩ সালের মধ্যে সর্বজনীন সুস্বাস্থ্য অর্জনের লক্ষ্যে ৭০ শতাংশ ব্যয় ধরা হয়েছে। ৯৭ শতাংশ ওষুধের চাহিদা স্থানীয় ঔষধ শিল্প দ্বারা পূরণ করা হচ্ছে। সরকারি স্বাস্থ্য সুবিধা থেকে নিয়মিত স্বাস্থ্য তথ্য সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশ সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিশ্বের বৃহত্তম জেলা স্বাস্থ্য তথ্য পদ্ধতি Ñ ডিএইচআইএস-২ স্থাপন করা হয়েছে। প্রতি ৬ হাজার মানুষের জন্য একটি কমিউনিটি ক্লিনিক। সারাদেশে সাড়ে ১৮ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করেছে। বিনামূল্যে ৩০ রকমের ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে। বিনামূল্যে চিকিৎসা পরামর্শ, অ্যাম্বুলেন্স রিজার্ভেশন এবং স্বাস্থ্য তথ্য পরিসেবা প্রদানের ২৪/৭ ঘণ্টা কল সেন্টার খোলা হয়েছে, যার নম্বর ১৬২৬৩। প্রায় ১৯ হাজার ডে কেয়ার স্বাস্থ্য সুবিধা চালু করা হয়েছে। মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য প্রদানের জন্য ৩০ হাজার স্যাটেলাইট ক্লিনিক রয়েছে। ৯৭ শতাংশ ওষুধের চাহিদা স্থানীয় ঔষধ শিল্প দ্বারা পূরণ হচ্ছে। মাতৃমৃত্যু হার এবং শিশুমৃত্যু হার কমে এসেছে। বর্তমানে শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তির হার ৯৭.৭ শতাংশ, প্রাথমিকে ছাত্রীদের হার ৫১ শতাংশ এবং মাধ্যমিকে ৫৪ শতাংশ। উচ্চশিক্ষায় ও শিক্ষার্থীদের হার বেড়েছে। অনাকাক্সিক্ষত করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে মোকাবিলা করার জন্য বাংলাদেশ করোনাভাইরাস টিকা আমদানি করেছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে বিতরণের জন্য বিনা পয়সায় সুরক্ষা সফটওয়্যার চালু করা হয়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন, বাল্যবিবাহ, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় তথ্য ও পরামর্শের জন্য টোল ফ্রি দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা সেবা প্রদানের জন্য ১০৯ নম্বরে কল করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যে কোনো জরুরি যোগাযোগের জন্য ৯৯৯ নম্বর প্রবর্তন করা হয়েছে।
রূপকল্প ২০৪১-এর কৌশলগত দলিল হিসেবে দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-৪১ প্রণয়ন করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ২০২১-২৫ মেয়াদি অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়েছে।
বর্তমানে বিশ্বের ১৫৭টি দেশে বাংলাদেশে ৮৬ লাখের অধিক শ্রমিক নিয়োজিত আছে। বিশ্বের ৩৯টি দেশের ৬৪টি শান্তি মিশনে বাংলাদেশের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। অংশগ্রহণকারী ১১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সর্বাগ্রে। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরের ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার সামুদ্রিক সম্পদের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। নারী উন্নয়ন থেকে শুরু করে সমাজের সর্বস্তরে অভূতপূর্ব পরিবর্তন হয়েছে ‘বাংলাদেশ’ নামক আমাদের স্বপ্নের রাষ্ট্রের, যে রাষ্ট্রটির জন্ম হয়েছিল মাত্র ৫০ বছর আগে। সেই বাংলাদেশের দিকে তাকালে চেনা যায় না যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির জাদুকরি পরিবর্তন।
যেদেশটির নিপীড়ন, শোষণ থেকে মুক্ত হয়েছিল বাংলাদেশ, সেদেশের সাথে তুলনা করলে দেখা যায়। বেশ কিছু ক্ষেত্রে পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে। পাকিস্তানি জাতীয় ইংরেজি দৈনিকে বাংলাদেশের প্রশংসার এক পর্যায়ে বলা হয়েছে, ‘দারিদ্র্য বিমোচনে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির প্রয়োজন তাতে সন্দেহ নেই; কিন্তু দুই দশক আগেও যা তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে বিবেচিত বাংলাদেশের মতো একটি দেশ প্রমাণ করেছে যে, অনেক প্রবৃদ্ধির জন্য অপেক্ষার প্রয়োজন নেই। শুধু দরকার গৃৃহীত নীতির প্রতি আস্থা রেখে সরকার ও সংশ্লিষ্টদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার মনোভাব।’
সংক্ষিপ্তাকারে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশকে তুলনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ স্বাস্থ্য এবং শিক্ষার দিক থেকে ছাড়িয়ে গেছে পাকিস্তানকে। যেখানে পাকিস্তানে প্রতি ১ হাজার জনে ৫৭.২ শিশু মারা যায়, সেখানে বাংলাদেশ ২২.১ শতাংশে শিশুমৃত্যু হার। শিশুদের নিরাপদ পরিবেশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রেটিং ৪.১ এবং পাকিস্তানের রেটিং ৯.৭ শতাংশ। শিশুদের প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ১১৬.৫ এবং পাকিস্তান ৯৪.৩ শতাংশ। বাংলাদেশে শিক্ষার হার ৭৩.৯ এবং পাকিস্তানে ৫৯.১৩ শতাংশ। জন্মহার নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ ২.০, পাকিস্তান ৩.৫ শতাংশ। বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭২.৩ বছর, পাকিস্তানে ৬৭.১ বছর। বেশি সংখ্যক মানুষকে বিদ্যুতের আওতায় বাংলাদেশ ৮৫.২ এবং পাকিস্তান ৭১.১ শতাংশ। সামরিক ব্যয়ে বাংলাদেশ ১.৪ এবং পাকিস্তান ৪.০ শতাংশ। বাংলাদেশ পোলিওমুক্ত দেশ অথচ পাকিস্তান পোলিওমুক্ত নয়। পাকিস্তান শুধু মুখে মুখে নারী-পুরুষের সমতার কথা বলে, অথচ বাংলাদেশের পরিবারের মধ্যে নারীদের ভূমিকা বেড়েছে। পাকিস্তানে সেই অর্থে পরিবারে নারীদের তেমন ভূমিকা নেই। বাংলাদেশের নারীরা ৩৩.২ শতাংশ কর্মমুখী, পাকিস্তান ২৫.১ শতাংশ।
জাতির পিতা তার প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেম দিয়ে বাংলাদেশ গড়ে তোলার প্রত্যয় নিয়ে কাজ করেছেন। তারই আন্তরিকতার অন্যতম প্রমাণ তিনি ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর জাতির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত ভাষণ। সেই ভাষণের এক পর্যায়ে বলেছিলেন, “স্বাধীনতা সংগ্রামের চাইতেও দেশ গড়া বেশ কঠিন। দেশ গড়ার সংগ্রামে আরও বেশি আত্মত্যাগ, আরও বেশী ধৈর্য, আরও পরিশ্রম দরকার। আমরা যদি একটু কষ্ট করি, একটু বেশী পরিশ্রম করি, সকলেই সৎপথে থেকে সাধ্যমত নিজের দায়িত্ব পালন করি, সব চাইতে বড় কথা সকলে ঐক্যবদ্ধ থাকি, তাহলে আমি বিনা দ্বিধায় বলতে পারি ইনশাআল্লাহ্ কয়েক বছরের মধ্যে আমাদের স্বপ্নের সোনার বাংলা আবার স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত হবে।”
ঠিক তাই, দেশ এখন স্বপ্নের সোনার বাংলা। সফলতার সূত্র ধরে বাংলাদেশ উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হবে ২০৩১ সালে, উচ্চ আয়ের সমৃদ্ধিশালী মর্যাদাশীল দেশ হবে ২০৪১ সালে। ২০২৫ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়াবে ৮.৫১ শতাংশ। দারিদ্র্য বিমোচনে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর ১০টি উদ্যোগ বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে, যা দারিদ্র্য বিমোচনে সহায়ক হবে। তারই ধারাবাহিকতায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন নিশ্চিত করার এর আগে ‘বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’ শীর্ষক পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৪তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। ২০৩৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। ২০২০ সালের সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৪১তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। ২০২১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি গড়ে উঠবে। ১৯৭২ সালে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলেছিলেন। ৪১ বছর পর ২০১৩ সালে ২৮ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ধান গবেষণা নিয়ে এক সেমিনারে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ আর এখন তলাবিহীন ঝুড়ি নয়, ধানে উপচে পড়া দেশ।’ নব্বইয়ের দশকের তুলনায় বর্তমানের কৃষি খাত ফসল, মৎস্য এবং প্রাণী সম্পদ উন্নয়নে বিস্ময়কর উন্নতি হয়েছে।
২০২০-এ বিশ^ করোনা মহামারির বিপর্যয়ের কবল থেকে রক্ষা পায়নি বাংলাদেশ। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দক্ষ প্রচেষ্টা, আন্তরিকতা এবং সচেতনতায় এগিয়ে গেছে বাংলাদেশ। ১০ ডিসেম্বর দুপুর ১২টা ২ মিনিটে সবকিছু ছাপিয়ে করোনাকালীন সময়েও বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ বিস্ময় সৃষ্টি করে, দৃশ্যমান হয়েছে ৬.১৫ কিলোমিটারের পদ্মাসেতু। এভাবেই একের পর এক বিস্ময় তৈরি করে বাংলাদেশ সেই অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় এগিয়ে যাবে। একটি স্বাধীন পতাকার জন্য ৩০ লাখ শহিদ, আড়াই লাখ মা-বোন সম্ভ্রম দিয়েছেন। মুক্ত করেছেন এই দেশকে নিষ্পেষণ থেকে। সেই দেশে নীল আকাশে পতপত করে ওড়ে লাল সবুজ পতাকা।
তাই তো পাকিস্তানের ‘দ্য নেশন’ পত্রিকার কলামে ‘দ্য বাংলাদেশ মডেল’ শিরোনামে লেখায় পাকিস্তানকে বাংলাদেশ হওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। বলা হয়, ‘বাংলাদেশই হওয়া উচিত পাকিস্তানের উন্নয়নের মডেল। আমাদের যদি শেখার কিছু থাকে, সেটা বাংলাদেশের কাছে।’ টেলিভিশনের টক শো’তে আলোচনায় বলা হয়, ‘পাকিস্তানের সামনে শেখার জন্য উদাহরণ হিসেবে যে কয়টি দেশ আছে তার প্রধান হলো বাংলাদেশ।’ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য তার ‘দুর্মর’ কবিতায় লিখেছিলেন-

“সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী
অবাক তাকিয়ে রয়ঃ,
জ্বলে পুড়ে মরে ছারখার
তবু মাথা নোয়াবার নয়।”

সত্যিই তাই নানা চড়াই-উতরাই অতিক্রম করে বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বুকে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। সার্থক হয়েছে শহিদের আত্মত্যাগ। আর এই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন একজন রাজনৈতিক দূরদর্শী, ধৈর্যশীল, প্রজ্ঞাময়ী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরিবার-পরিজন সব হারিয়ে দেশকে নিয়ে তার সাধনা এবং হাড়ভাঙা খাটুনি অবাক করার মতো। তিনি তার শোককে শক্তিতে পরিণত করে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠায় দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এ-কথা অনস্বীকার্য যে তার দৃপ্ত প্রত্যয়ের কারণেই দেশ আজ মাথা তুলে সগৌরবে দাঁড়িয়েছে। তারই জ্বলন্ত প্রমাণ বাংলাদেশ এখন নিজস্ব অর্থায়নে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে সক্ষম দেশ।
৫০ বছরে বাংলাদেশের অর্জন এত স্বল্প পরিসরে লেখা সম্ভব নয়। লেখাটি লেখার সময় গর্বে শির উন্নত হয়েছে শতগুণে। মনে হচ্ছিল বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে দাঁড়িয়ে লাল সবুজের পতাকা হাতে নিয়ে বলি, এই আমার বাংলাদেশ। এই তো ধান শালিকের বাংলাদেশ, আমার বাংলাদেশ, স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ, ভালোবাসার বাংলাদেশ। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ নিয়ে একটিই প্রতিজ্ঞা, হাতে হাত ধরে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে সততা, নিষ্ঠা, সাধনা দিয়ে দেশটিকে এগিয়ে নিয়ে যাব সফলতার দ্বারপ্রান্তে। লেখাটি শেষ করব জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর একটি উদ্ধৃতি দিয়ে। তিনি ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমির ভাষণের এক পর্যায়ে বলেছিলেন, “একটি সুষ্ঠু জাতি গঠনে শিল্প, কৃষি, যোগাযোগ ব্যবস্থা বা অন্যান্য সংস্কৃতির যেমন উন্নয়ন, তেমনি প্রয়োজন চিন্তা ও চেতনার ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করা।” সেই বৈপ্লবিক পরিবর্তনের দিকেই অগ্রসর হচ্ছে সুবর্ণজয়ন্তীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা স্বপ্নের সোনার বাংলাদেশ।

লেখক : লোকপ্রশাসন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply