উৎসবমুখর পরিবেশেই শেষ হলো বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ গেমস

অনিন্দ্য আরিফ: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মানে এখনও এদেশের ক্রীড়াঙ্গনের বটবৃক্ষ। তিনি মনের সবটুকু মাধুরীর সুধারসে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনকে নতুন করে সাজাতে চেয়েছিলেন। ’৭৫-এর বিয়োগান্ত ঘটনায় তার সেই স্বপ্ন অপূরণ থেকে গেছে। কিন্তু ঘাতকদের সেই অমানবিক চক্রান্ত ছিল শুধু অসময়ের ফোঁড়। ক্রীড়াবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে এগিয়ে যাচ্ছে এদেশের ক্রীড়াঙ্গন। ফের জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নের মসৃণ পথে। শুধু বঙ্গবন্ধু এবং তার পরিবারের প্রায় সবাই ক্রীড়াপ্রাণ; তাই যতদিন তারা সরকারের দায়িত্বে ততদিন নিশ্চিত সমৃদ্ধ পথে হাঁটবে ক্রীড়াঙ্গন। দেশস্রষ্টা জাতির পিতার নামে তাই এবারের নবম বাংলাদেশ গেমস।
সব খেলা জাতির পিতার রক্তে মিশেছিল। পিতা শেখ লুৎফর রহমান ছিলেন একজন কৃতী ফুটবলার। ফুটবল প্রিয় খেলা হলেও, শখের বসে বাস্কেটবল, হকি ও ভলিবলও খেলতেন। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই খেলাধুলার ক্রীড়া-উন্নয়নে বিশেষ নজর দিয়েছিলেন। তিনি ক্রীড়াঙ্গনে কিশোর-যুবকদের সম্পৃক্ত করার তাগিদ অনুভব করতেন। মাঠে সরাসরি উপস্থিত থেকেছেন; তার সরকারকে সম্পৃক্ত করেছেন। ক্রীড়াঙ্গনের এই অন্তপ্রাণ ক্রীড়া-ব্যক্তিত্বকে প্রজ্বলিত করতেই এবার বাংলাদেশ গেমসের নামের আগে গৌরবময় বঙ্গবন্ধুর নাম উৎসর্গ করা হয়েছে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং মুজিব শর্তবার্ষিকীকে স্বর্ণাক্ষরে বাঁধিয়ে রাখতেই আয়োজকরা এমন নামকরণ করেছেন।
বাংলাদেশ গেমস হচ্ছে এদেশের সর্ববৃহৎ ঘরোয়া ক্রীড়া প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগিতায় দেশের সকল জেলার ক্রীড়াবিদরা অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭৮ সালে শুরু হওয়া এই আসরে মাঝে মাঝে ভাটা পড়েছিল; ছিল স্থগিত। এটা ছিল নবম আসর। অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ২০২০ সালে। তা শেষ পর্যন্ত গড়িয়েছে ২০২১-এ। সেখানে করোনার মহামারিতে স্থগিত হতে চলেছিল।
পরিপাটি আয়োজন শেষ। ১ এপ্রিল ২০২১। বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম। তখন ঘড়ির কাঁটা ৭টা ৪০ মিনিট ছুঁইছুঁই। ঠিক তখনই, গণভবনের ভার্চুয়াল প্লাটফর্ম থেকে বঙ্গবন্ধু নবম বাংলাদেশ গেমসে ২০২০-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণা করেন জাতির পিতার সুযোগ্য উত্তরাধিকার ক্রীড়াবান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর আগেই তিনি সন্ধ্যায় ভার্চুয়ালি জায়ান্ট স্ক্রিনে যোগ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের আগেই অডিও ভিজুয়াল প্রদর্শনীর মাধ্যমে একঝলকে তুলে ধরা হয়েছে বাংলাদেশের খেলাধুলার সামগ্রিক চালচিত্র। আর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন ঘোষণার পরপরই স্টেডিয়ামে স্থাপিত সুদীর্ঘ মশাল প্রজ্বলন করেছেন গলফার সিদ্দিকুর ও সাঁতারু শীলা। তারপর একে একে শেষ হয়েছে ভাষণ আর বক্তৃতা। মাঠ ত্যাগ করে গ্যালারিতে বাউন্ডারি জালের কাছাকাছি যখন পৌঁছেছেন ক্রীড়াবিদরা; তখন মাসকট শান্তির পায়রা প্যারেড করেছে সারা মাঠ। ‘বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ’ নিয়ে প্রদর্শিত হয়েছে বিশেষ পরিবেশনা। অংশ নিয়েছেন দেশের আলোচিত বেশ ক’জন শিল্পী। রাত সাড়ে ৮টায় লেজার শো, আতশবাজি প্রদর্শনীর মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে বর্ণিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান।
১০ দিনব্যাপী এই আসরে অংশগ্রহণকারী এবং আয়োজকদের অভিনন্দন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ভাষণে বলেছেন, ‘অংশগ্রহণকারী ক্রীড়াবিদরা প্রতিটি ডিসিপ্লিনে যেন সর্বোচ্চ পারদর্শিতা দেখাতে পারেন এবং আগামীতে বিশ্ব অলিম্পিকসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পর্যায়ে নিজেদের গড়ে তুলতে পারেন সেজন্য আগামীতে বর্তমান সরকার আন্তর্জাতিকমানের প্রশিক্ষণেরও ব্যবস্থা করবে। সেভাবেই দেশের খেলোয়াড়দের তৈরি করতে হবে।’ জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে গণভবন থেকে যুক্ত হয়ে তিনি ক্রীড়াপ্রাণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখন থেকে যে ৩১টি ডিসিপ্লিনে খেলা অনুষ্ঠিত হবে; তাতে প্রত্যেকে আপনারা স্বাস্থ্য সুরক্ষাটা একটু মেনেই চলবেন। কারণ, আমি চাই না আপনারা কেউ কোনো কারণে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন। যে কারণে, সকলকে বিশেষ করে যারা আয়োজক তাদের আমি বলব আপনারা এ-বিষয়টা বিশেষভাবে লক্ষ্য রাখবেন যাতে সকলেই স্বাস্থ্য সুরক্ষাবিধি মেনে চলতে পারেন।’ প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘এই গেমসটি ২০২০ সালে হওয়ার কথা থাকলেও গতবার হঠাৎ করে করোনাভাইরাসের প্রকোপ বেড়ে গেলে বাধ্য হয়ে সেটি স্থগিত করে এবার আয়োজন করছি।’ নতুনভাবে করোনা দেখা দেওয়ায় স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকে নজর রেখে এই খেলাগুলো আয়োজনের জন্য প্রধানমন্ত্রী গেমস সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল এমপি, বিওএ সভাপতি এবং সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং বিওএ মহাসচিব সৈয়দ শাহেদ রেজা বক্তৃতা করেন।
করোনাকালেও এই গেমসে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার অ্যাথলেট ৩১টি ক্রীড়ায় ১ হাজার ২৭১টি পদকের জন্য বিভিন্ন ইভেন্টে অংশগ্রহণ করেছেন। দেশের ৯টি শহরের ২৯টি ভেন্যুতে এই খেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই আসর ঘিরে ক্রীড়াবিদদের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছিল। এই গেমসকে সামনে রেখে অনেকে প্রস্তুতি নিয়েছিল। আরও বড় আসরের প্রস্তুতির প্লাটফর্মও এটা।
দুই ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত সমাপনী অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি যোগ দিয়েছেন সমাপনী অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ও গেমসের আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল এমপি। তবে স্টেডিয়ামে সরাসরি উপস্থিত ছিলেন গেমসের কো-চেয়ারম্যান যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী জাহিদ আহসান। উপস্থিত ছিলেন বিওএ’র সভাপতি ও সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ও মহাসচিব সৈয়দ শাহেদ রেজা। সন্ধ্যা ৭টায় ১৫ মিনিটের ভিজুয়াল প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে গেমসের ১০ দিনের পদক পাওয়া, না পাওয়ার আনন্দ-বেদনার মহাকাব্য তুলে ধরা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু নবম বাংলাদেশের গেমসের শেষ চমক ছিল লেজার শোর চোখ ধাঁধানো উপস্থাপনা। যেখানে দেখানো হয়েছে শৈশবের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। দেখানো হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবার সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” লেজার শোয়ের মাধ্যমে ফুটে ওঠে প্রতিটি খেলার গেমসের লোগো। ফুটে ওঠে প্রধানমন্ত্রীর মুখের প্রতিচ্ছবি, নবম বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ গেমসের লোগো। লেজার শো শেষে বিউগলের করুণ সুরে নিভে যায় গেমসের মশাল। এরপর শুরু হয় স্টেডিয়ামের অন্ধকার আকাশে আতশবাজির রঙিন খেলা। তারপরই আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে নবম বাংলাদেশ গেমসের।
এবারের গেমসে ছিল রেকর্ডের ছড়াছড়ি। ভারোত্তোলনে হয়েছে ৩৪টি নতুন জাতীয় রেকর্ড। সাইক্লিংয়ে ১৩টি, সাঁতারে ১১টি, আর্চারিতে ও অ্যাথলেটিকসে হয়েছে একটি করে নতুন জাতীয় রেকর্ডে বাংলাদেশ গেমস সমৃদ্ধ হয়েছে। আসরের সেরা বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি। ৩১টি খেলায় তারা জিতেছে ১৩২টি স্বর্ণ, ৮০টি রুপা ও ৫৭টি ব্রোঞ্জ। সব মিলিয়ে তাদের পদক ২৬৯টি। ১১৫টি স্বর্ণসহ মোট ২৯৭টি পদক নিয়ে রানার্সআপ বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। ৬৩টি স্বর্ণসহ মোট ১২৭টি পদক নিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনী হয়েছে আসরের তৃতীয়। ২০১৩ সালের অষ্টম বাংলাদেশ গেমসে ১১১টি স্বর্ণ, ৭৫টি রুপা ও ৬৪টি ব্রোঞ্জসহ ২৫০টি পদক জিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল আনসার ও ভিডিপি। সেবার ৬৯টি স্বর্ণসহ মোট ১৪৮টি পদক নিয়ে সেনাবাহিনী ছিল রানার্সআপ।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply