আন্তর্জাতিক জলবায়ু সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, যুক্তরাষ্ট্রের ফিরে আসা প্রশংসনীয়

সাইদ আহমেদ বাবু: গত ২২-২৩ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হলো ‘ভার্চুয়াল লিডার্স সামিট’ নামে বৈশ্বিক জলবায়ু সম্মেলন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এই সম্মেলন আহ্বান করেন এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ৪০ জন সরকার বা রাষ্ট্রপ্রধানকে আমন্ত্রণ জানান। তাদের মধ্যে বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের অন্তর্ভুক্তি জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক লড়াইয়ে বাংলাদেশের গুরুত্বই নির্দেশ করে।
হোয়াইট হাউসের উদ্যোগে ২২ এপ্রিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সভাপতিত্বে দুদিনের এই শীর্ষ ভার্চুয়াল জলবায়ু সম্মেলনে আমন্ত্রিত দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানেরা যোগ দেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে সবাইকে স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য রাখেন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা দেবী হ্যারিস এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এ সময় বিশ্বের অনেক নেতারাই বক্তব্য দিয়েছেন এবং জলবায়ু পরিবর্তন প্রশ্নে নানা পরামর্শও দেন। যাদের মধ্যে রয়েছেন জাতিসংঘের মহসচিব আন্তনিও গুয়েতেরেস, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন, জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মারকেল, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইম্যানুয়েল ম্যাক্রঁ-সহ আরও অনেকে।
উদ্বোধনী ভাষণে ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস বলেন, আমি আপনাদের অনেকের সঙ্গে জলবায়ু সংকট নিয়ে আলোচনা করেছি। তিনি বলেন, জো বাইডেন হচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেসের প্রথম সদস্য যিনি জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে গুরুত্ব আরোপ করছেন এবং তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস চুক্তিতে যোগ দিচ্ছে।
প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন তার স্বাগতিক ভাষণে ক্লিন টেকনোলজি বা পরিশোধিত প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপরে গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি বলেন, বিজ্ঞান নির্ভুল, বিজ্ঞান অস্বীকার্য বিষয় নয়। আমাদের সবাইকেÑ যারা বিশ্বের বৃহৎ অর্থনৈতিক দেশ হিসেবে পরিচিত তাদের এগিয়ে আসতে হবে এবং পরিশোধিত প্রযুক্তির ওপরে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। শীর্ষ সম্মেলনে তিনি ২০৩০ সালের মধ্যে নিজের দেশের কার্বন নিঃসরণের হার ২০০৫ সালের তুলনায় ৫০ থেকে ৫২ শতাংশ কমানোর প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি অন্যদের বিশেষত বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিসম্পন্ন দেশগুলোকে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন। আর তা করতে হবে তাদের নিজেদের জনগণের স্বার্থে। তিনি আরও বলেন, চলতি দশকেই জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আমাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যাতে করে জলবায়ু সংকটের মারাত্মক পরিণতি এড়ানো যায়। আমাদের উষ্ণায়নের মাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখা নিশ্চিত করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কার্বন নিঃসরণের মাত্রা অর্ধেক করার ঘোষণার পর চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংও ২০৬০ সালের মধ্যে তার দেশে তা শূন্যে আনার ঘোষণা দেন। এছাড়া সম্মেলনে যোগ দিয়ে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে আনার ঘোষণা দেন। আর ইউরোপের দেশগুলোতে ২০৩০ সালের মধ্যে ৫৫ শতাংশ কার্বন নিঃসরণ কমানোর আশ্বাস দেন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন বাইডেনের এই উদ্যোগকে যুগান্তকারী বলে অভিহিত করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক লড়াইয়ে এর প্রভাব রূপান্তর নিয়ে আসবে। বরিস জনসনও সবুজ বিপ্লবের ঘোষণা দেন। রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বকে এক হতে আহ্বান জানান। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নতুন কোনো লক্ষ্যের প্রতিশ্রুতি দেননি, তবে ২০৩০ সালের মধ্যে পরিশোধিত জ্বালানি শক্তির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার কথা বলেছেন, যাতে বিনিয়োগকে গতিশীল করা যায়। এদিকে, ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা ৪৬ শতাংশ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইয়োশিহিদো সুগা।
জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনে জাতিসংঘ মহাসচিব তার বক্তব্যে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের মারাত্মক প্রভাব প্রসঙ্গে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গ্রিন হাউস গ্যাস ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০-৫২ শতাংশ কমানোর বিষয়ে যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ সে-জন্য প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে তিনি ধন্যবাদ জানান। তিনি উষ্ণায়নের মারাত্মক প্রভাব প্রসঙ্গে বলেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ইতোমধ্যে ১ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জলবায়ু শীর্ষ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন। ভার্চুয়াল বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্তরাষ্ট্র যে প্যারিস চুক্তিতে পুনরায় ফিরে যাচ্ছে তার প্রশংসা করে বলেন, সম্মেলনে বাংলাদেশ এই উদ্যোগের প্রশংসা করে এবং যুক্তরাষ্ট্র যে আন্তর্জাতিক সমাজের সঙ্গে যোগ দেওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেছে তারও সাধুবাদ জানান। তিনি বলেন, প্রতি বছর আমরা গড়ে ৫ বিলিয়ন ডলার যা আমাদের জিডিপির প্রায় ২.৫ শতাংশ ব্যয় করি আমাদের জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব রোধে এবং এর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মেলনে ৪টি পরামর্শ রাখেন (এক) বৈশ্বিক তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম রাখতে উন্নত দেশগুলোকে কার্বন নিঃসরণ কমাতে তাৎক্ষণিক ও উচ্চভিলাষী অ্যাকশন প্ল্যান নেওয়া এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোকেও প্রশমন ব্যবস্থার দিকে মনোযোগী হতে বলেন। দ্বিতীয় পরামর্শটি হলো, বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার তহবিল নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত সম্প্রদায়ের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার মাধ্যমে এই তহবিলের ৫০ শতাংশ অভিযোজন ও ৫০ শতাংশ প্রশমনের জন্য কাজে লাগানো। তৃতীয়, উদ্ভাবন এবং জলবায়ু অর্থায়নে বড় অর্থনীতির দেশ, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতগুলোকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। চতুর্থ পরামর্শ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবুজ অর্থনীতি এবং কার্বন নিরপেক্ষ প্রযুক্তিতে রূপান্তর হওয়া প্রয়োজন। শেখ হাসিনা বলেন, কোভিড-১৯ মহামারি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় বৈশ্বিক সংকট শুধু সবার সম্মিলিত দৃঢ় পদক্ষেপের মাধ্যমেই মোকাবিলা করা যেতে পারে।
চীনের পর যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বে সবচেয়ে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী দেশ। বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির এই দুই দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একমত হতে পেরেছেন। তাদের ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিলে দিতে হবে, তবেই তা ন্যায্য পাওনা হবে। সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন কার্বন নিঃসরণ কমানোর বৈশ্বিক উদ্যোগ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বের করে নিয়েছিলেন। ক্ষমতায় এলে আবারও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্ব নেতৃত্বে ফেরার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন বাইডেন। হোয়াইট হাউস বলেছে, তারা জলবায়ু সংকটকে জরুরি বিবেচনায় এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের তহবিল হ্রাসের ক্ষতিপূরণ হিসেবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আন্তর্জাতিক সহায়তার জন্য ‘উচ্চভিলাষী তবে অর্জনযোগ্য লক্ষ্য’ গ্রহণ করেছে। বর্তমান বা প্রত্যাশিত জলবায়ু পরিবর্তনের সামঞ্জস্য রেখে ২০২৪ সাল নাগাদ জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বিষয়ে তিন গুণ অর্থায়ন করবে যুক্তরাষ্ট্র। ২০৫০ সালের মধ্যে মার্কিন অর্থনীতিকে পুরোপুরি কার্বনমুক্ত করতে চান মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। বাইডেনের এই সিদ্ধান্তকে ‘গেম চেঞ্জিং’ বলে উল্লেখ করেছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ‘লিডার্স সামিট’-এ আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানাতে কয়েকদিন আগে ঢাকা সফরে এসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের জলবায়ুবিষয়ক বিশেষ দূত জন কেরি। ওবামা প্রশাসনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময়ও ২০১৬ সালে ঢাকা সফর করেছিলেন তিনি। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিস্থিতি ও বাংলাদেশের অবস্থান বিবেচনা করলে এবারের সফর তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হয়।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন কনফারেন্সের পথে এটি হবে গুরুত্বপূর্ণ মাইলস্টোন। বাইডেন প্রশাসনের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই ওয়াশিংটন প্যারিস জলবায়ু চুক্তিতে ফিরেছে এবং পাশাপাশি আরও নতুন উদ্যোগে শামিল হতে প্রস্তুত বাইডেন প্রশাসন। প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বিশেষ দূত ও প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি অ্যামেরিকার এই নতুন ভূমিকার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বিজ্ঞানী ও বিদেশি কূটনীতিকরা যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। ২০১৫ সালে হওয়া প্যারিস চুক্তিতে প্রায় ২০০টি দেশ স্বাক্ষর করেছিল। ক্ষমতায় এসে ২০১৭ সালে দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া আর কোনো দেশ এখন পর্যন্ত প্যারিস চুক্তি থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়নি।
২০২১ সালের নভেম্বরে জাতিসংঘে জলবায়ু কনফারেন্স হওয়ার কথা রয়েছে। আশা করা যায়, এর মাধ্যমে বিশ্ব নেতৃবৃন্দ জলবায়ু পরিবর্তন রোধে শক্তিশালী পদক্ষেপ নেবেন, যা অর্থনীতির জন্য সুফল বয়ে আনবে। বাংলাদেশকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিও জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে বিশ্বব্যাপী আলোচিত। কারণ, দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের জনগণের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রয়াস, সহনশীলতা ও অভিযোজন কৌশল ও সরকারি ইতিবাচক পদক্ষেপগুলো বিশ্বব্যাপী সমাদৃত।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালে ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ২০০৯ সাল থেকে তার সরকারের গৃহীত নীতিমালা আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড গঠন ও টেকসই অর্থনৈতিক জলবায়ু গড়ে তোলার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, বিশ্বব্যাপী অনুকরণ করা হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন শীর্ষক বৈশ্বিক আলোচনা ও উদ্যোগে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ সব সময়ই বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছে।
বিজ্ঞান যতটা, তার থেকেও বেশি কূটনীতিক পাঞ্জা লড়াই। পরিবেশ সমস্যা মেটাতে পৃথিবীজোড়া আগামী কর্মপন্থার কথা হচ্ছে। বিজ্ঞান বড়জোর পথ দেখাতে পারে; কিন্তু সেই পথে কোনো রাষ্ট্র চলতে পারবে কি না তা নির্ভর করে তার রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সেদেশের নাগরিকদের আস্থা অর্জনে তার সাফল্যের ওপর। বৈশ্বিক আবহাওয়া এবং জলবায়ুতে যে নিয়মতান্ত্রিকতা ছিল তা ভেঙে পড়তে শুরু করছে। এর প্রধান কারণ বৈশ্বিকভাবে উষ্ণতা বৃদ্ধি। বিশ্ব ক্রমশ উষ্ণ হচ্ছে। ফলে ঘূর্ণিঝড় বাড়ছে, বরফ গলে যাচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ উঁচু হচ্ছে। এসবই হচ্ছে বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিফলন। এর ফলে আবহাওয়ার উপাদানগুলো কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার সঙ্গে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়েছে আবহাওয়ায়। আবহাওয়ার যে অনুমান করার ক্ষমতা ছিল, তা নষ্ট হয়ে গেছে। বন্যার ও খরার সময় বদলে যাচ্ছে। শীতে কুয়াশার প্রকোপ বাড়ছে। বজ্রপাত বাড়ছে। উপকূল অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে। সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ছে। ইদানীং কিছু উন্নয়নশীল দেশ, যেগুলো দ্রুত শিল্পায়িত হচ্ছে, সেগুলো থেকে গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণের ফলে আরও বেশি করে বায়ুম-লে গ্যাস জমা হচ্ছে। কাজেই জলবায়ু পরিবর্তন দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে। তাদের এ অবস্থা তাদের নিজেদের সৃষ্ট। সারাবিশ্বই জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত হুমকি এবং এর প্রভাবের মধ্যে আছে। ঐতিহাসিকভাবে এর জন্যও দায়ী উন্নত বিশ্ব। অন্যদিকে দায়ী না হয়েও প্রচুর গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণের কারণে আমরা আজ এই সংকটে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই। কিন্তু ঘটনা হলো, পরিবেশের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির অঙ্কটাও। হিসাবটা বেশ সরলরৈখিক। অর্থনৈতিক উন্নতি ঘটাতে গেলে চাই শিল্পায়ন। শিল্পায়নের প্রয়োজনে চাই প্রচুর শক্তি। তা আসে তেল বা কয়লা পুড়িয়ে। প্রতিটা ভোগ্যপণ্য আহরণ-উৎপাদনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ব্যয়িত শক্তির চাহিদাও বেড়ে চলে। সুতরাং সেখানে রাশ টানতে গেলে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকেও একটা প্রশ্নের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। যদি না এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করা যায়, যা কম শক্তিতে বেশি কাজ দেয় অথবা শক্তি উৎপাদনের এমন উপায় এনে দেয়, যাতে পরিবেশে গ্রিন হাউস গ্যাস মেশে কম। এমন প্রযুক্তিকে স্বাভাবিকভাবেই ডাকা হচ্ছে সবুজ প্রযুক্তি বলে। সবুজ প্রযুক্তির দিকে সকলেই যে পা বাড়ানোর জন্য হামলে পড়ছে না তার কারণ, সেসব প্রযুক্তি এখনও বেশ দামি।
বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়ার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে বরফ গলা। অ্যান্টারটিকা মহাদেশে যে বরফ আছে তা গললে বিপদ। এখন সেই বরফ গলে সমুদ্রের পানির উচ্চতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। সঙ্গে সূর্যের তাপ সমুদ্রের পানির উচ্চতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় বাড়ছে, জলোচ্ছ্বাস বাড়ছে। আবহাওয়ার এই অদ্ভুত পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিশ্বের খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া। অর্থাৎ রপ্তানিকারক দেশ আমদানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। জীববৈচিত্র্যের ওপর এর প্রভাব পড়ছে। ফসলের ওপর এর প্রভাব পড়ছে। এই যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে, তার মূল কারণ বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়া। তাই এখন বিকল্প জ্বালানি উৎস প্রয়োজন। নবায়নযোগ্য উৎসের দিকে এখন ঝুঁকতে হবে। সৌরবিদ্যুৎ, পানি থেকে বিদ্যুৎ, বাতাস থেকে বিদ্যুৎ, ঢেউ থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে।
বাংলাদেশ অবশ্য গ্রিন হাউস গ্যাস তেমন একটা নির্গমন করে না। কিন্তু এর প্রভাবে বাংলাদেশে ভূমিধস বাড়ছে, বাড়ছে নদীর ভাঙন। পোকামাকড়ের উপদ্রব বাড়ছে, রোগবালাই বাড়ছে। তাই বাংলাদেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, জ্বালানি ও পরিবেশবিষয়ক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মার্শা বার্নিকাটের ভাষায়, জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে বাংলাদেশের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কিছু শেখার আছে। তাই এদেশটি জলবায়ু সংকট নিরসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
‘ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরাম’ তথা সিভিএফ এবং ‘ভালনারেবল টোয়েন্টি গ্রুপস অব ফিন্যান্স মিনিস্টারস’ তথা ভি-টোয়েন্টি প্রধান হিসেবে ২৬তম জলবায়ু সম্মেলনও সফল করার অন্যতম অনুষঙ্গ হবে বাংলাদেশ। যে দেশটিতে কার্বন-নির্গমনের হার সবচেয়ে বেশি সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক বাংলাদেশের নেতৃত্বের স্বীকৃতি দেওয়ার এই বক্তব্যগুলো নিঃসন্দেহে গৌরবের ও আশাব্যঞ্জক।
বিগত জলবায়ু সম্মেলনে (কপ-২৫) প্রদত্ত ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উল্লেখ করেছিলেন, প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। জো বাইডেন সরকারের লক্ষ্য প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়া। প্যারিস চুক্তির অঙ্গীকারের আলোকে জন কেরি ভারত ও বাংলাদেশ সফরকালে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর ক্ষমতায়নের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। এ কারণে তিনি নারী নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ ও আমন্ত্রণ তাই একজন ব্যক্তির বাংলাদেশ সফর নয়; বরং এর সঙ্গে অনেক ইতিবাচক সুদূরপ্রসারী বার্তা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে অবগত যে পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, বন, পানি, পশুসম্পদ রক্ষায় বাংলাদেশের পদক্ষেপগুলো অনুকরণযোগ্য। সেদেশের প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো ও স্বীকৃতি দেওয়া জলবায়ু কূটনীতির একটি সফল মাইলফলক হিসেবে দেখা যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু পরিবর্তন রোধে গৃহীত যে কোনো পদক্ষেপ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য ইতিবাচক। প্যারিস চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতি পুষিয়ে নিতে শিল্পোন্নত দেশের সহায়তা পাবেÑ এটাই প্রত্যাশা করা যায়।
জলবায়ু পরিবর্তনের সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর বিশ্ব ফোরামে স্বল্পোন্নত দেশসমূহের মুখপাত্র হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছেন রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনা। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমানে ক্লাইমেট ভালনারেবলিটি ফোরামের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও গ্লোবাল সেন্টার অব অ্যাডাপটেশনের আঞ্চলিক অফিস ঢাকায় স্থাপনের ফলে এ বিষয়ক কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত প্যানেলের (ওচঈঈ) মতে, এ শতাব্দীর মাঝামাঝি জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যদি ১ মিটার বাড়ে, তাহলে বাংলাদেশের অন্তত ১৭ শতাংশ ভূমি সমুদ্রগর্ভে বিলীন হবে। এতে প্রথমেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশর নিম্নাঞ্চল। এরপর ধীরে ধীরে তা গ্রাস করবে অন্য অঞ্চলকেও। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, সমুদ্রগর্ভ যদি ৫ ফুট বা তার কাছাকাছি উঁচু হয়, তবে বাংলাদেশের এক-পঞ্চমাংশ এলাকা সমুদ্রে তলিয়ে যাবে এবং তা শুরু হবে নিম্নাঞ্চল থেকে।
বিগত কয়েক বছরের হিসাব মতে, বঙ্গোপসাগর উপকূলের কিছু এলাকায় এরই মধ্যে এর প্রভাব লক্ষ করা গেছে। সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঢাল সুন্দরবন মারাত্মক ক্ষতির মুখোমুখি হবে। তলিয়ে যাবে এর অনেকাংশ। ইতোমধ্যে সুন্দরবনের ভেতরে অবস্থিত সুপেয় পানির কিছু উৎসে লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়েছে। জীবজন্তুর জন্য যা অশনিসংকেত। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঝড় ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেতে সুন্দরবন আমাদের ঢালস্বরূপ।
লবণাক্ততার ফলে খাদ্য উৎপাদন ও কৃষিতে বিরূপ প্রভাব পড়বে। বিঘিœত হবে খাদ্য নিরাপত্তা। শুধু নিম্নাঞ্চলই নয়, রাজধানী ঢাকাও আশঙ্কামুক্ত নয়। ঢাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ডের মতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ঢাকাও আক্রান্ত হতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ঝুঁকিপূর্ণ ১২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম।
জরুরি পদক্ষেপ না নিলে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ মিলিয়ন মানুষ দরিদ্র হওয়ার শঙ্কায় রয়েছে। বাংলাদেশ থেকেও এর মধ্যে প্রশমন ও অভিযোজন নিয়ে উচ্চাভিলাষী কয়েকটি লক্ষ্য রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার প্রস্তুতির জন্য যুক্তরাজ্যেরও অঙ্গীকার রয়েছে। যুক্তরাজ্য নিজের দেশে কাজ করার পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশকেও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করতে সাহায্য করতে চায়। বাংলাদেশ জানে যে, জলবায়ু পরিবর্তন আসল হুমকি। এ ব্যাপারে দেশটি সচেতন। আর এ-কারণেই নীতিমালা তৈরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রয়োজন।

লেখক : সম্পাদকম-লীর সদস্য, উত্তরণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply