অমর একুশে বইমেলায় নতুন বইয়ের সুবাস

সোহাগ ফকির: ‘বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না’- সাহিত্যিক সৈয়দ মুজতবা আলীর উক্তিটি চিরন্তন সাক্ষ্য যেন বাংলা একাডেমির অমর একুশে বইমেলা। বরাবরের মতোই প্রতি বছর বইমেলা আসে একটি উৎসব ও বইয়ের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টিতে। শিশু-কিশোর আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা সব শ্রেণির পাঠক, লেখক ও প্রকাশক সবাই যেন অমর একুশে বইমেলার মিলন মেলায় সমাগত হয়েছে এবারও।
‘বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী’। এই প্রতিপাদ্যে অমর একুশে বইমেলা-২০২১ এর আয়োজন করে বাংলা একাডেমি। গত বছর বইমেলা শেষ হওয়ার পর থেকেই শুরু হয় করোনা মহামারির সংক্রমণ। এবারে করোনা সংকটের কারণে বইমেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার অনিশ্চয়তা ছিল লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের মনে। কিন্তু সব শঙ্কা এড়িয়ে নির্ধারিত তারিখের প্রায় দেড় মাস পর শুরু হলো প্রাণের উৎসব বইমেলা।
গত ১৮ মার্চ বিকাল ৩টায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালায়ের প্রতিমন্ত্রী কেএম খালেদ। বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক শামসুজ্জামান খানের সভাপতিত্বে স্বাগত বক্তব্য রাখেন একাডেমির মহাপরিচালক হাবিবুল্লাহ সিরাজী। এবারের বইমেলায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও কর্ম অধ্যয়ন এবং স্বাধীনতার মর্মবাণী জাতীয় জীবনে যাতে প্রতিফলিত হয় তার ওপর জোর দেওয়া হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে বইমেলায় আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বই কেনা এবং বই পড়ার পাশাপাশি সবাইকে স্বাস্থ্য সুরক্ষার দিকে নজর দিতে হবে। নিজেকে সুরক্ষিত রাখা মানে অন্যদের স্বাস্থ্য সুরক্ষিত রাখা এবং সবাইকে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলার আহ্বান জানান। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে বই পড়ার অভ্যাস করানোর ওপর জোর দেন তিনি। পাশাপাশি এবারের বইমেলার সাফল্য কামনা করেন সরকারপ্রধান।
‘আমার দেখা নয়াচীন’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা এই বইটির ইংরেজি অনুবাদ ‘নিউ চায়না-১৯৫২’ প্রকাশ করে বাংলা একাডেমি। আনুষ্ঠানিকভাবে বইটির মোড়ক উন্মোচন করেন বঙ্গবন্ধু-কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যা ছিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের প্রধান আকর্ষণ। এছাড়াও নতুন ও পুনর্মুদ্রিত ১১৫টি বই প্রকাশ করেছে বাংলা একাডেমি। এরপর বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-২০২০ প্রদান করা হয়। ১০টি ক্যাটাগরিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে এ পুরস্কার সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কেএম খালেদ এমপি বিজয়ীদের হাতে তুলে দেন। পুরস্কারপ্রাপ্তরা হলেনÑ কবিতায় কবি মুহাম্মাদ সামাদ, প্রবন্ধ সাহিত্যে বেগম আখতার কামাল, কথাসাহিত্যে ইমতিয়াজ শামীম, নাটকে রবিউল আলম, অনুবাদে সুরেশ রঞ্জন বসাক, শিশুসাহিত্যে আনজির লিটন, মুক্তিযুদ্ধে সাহিদা বেগম, বিজ্ঞান ও কল্পবিজ্ঞানে অপরেশ বন্দ্যোপাধ্যায়, আত্মজীবনী, স্মৃতিকথা ও ভ্রমণ কাহিনি বিভাগে ফেরদৌসী মজুমদার এবং ফোকলোর বিভাগে হাবিবুল্লাহ পাঠান। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বইয়ের আনন্দ যন্ত্রে পাওয়া যায় না। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে সেমিনারসহ মাসব্যাপী প্রতিদিন সন্ধ্যায় চলছে কবিকণ্ঠে কবিতা পাঠ ও আবৃত্তি ছাড়াও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এছাড়াও ২০২০ সালে অনুষ্ঠিত বইমেলায় সেরা বইয়ের প্রকাশককে ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’, শৈল্পিক বিচারে সেরা বই প্রকাশের জন্য ৩টি প্রকাশনাকে ‘মুনির চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’, শিশুতোষ গ্রন্থের জন্য ‘রোকনুজ্জামান খান দাদা ভাই স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান এবং স্টলের নান্দনিক সাজসজ্জায় শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানকে ‘কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার’ প্রদান করা হয়।
মেলা শুরু হওয়ার পর থেকে ক্রমেই বাড়ছে দর্শনার্থীর আনাগোনা। মেলা প্রাঙ্গণ ঘুরে বই নেড়েচেড়ে দেখছেন। কেউবা কিনে নিচ্ছেন পছন্দের বইটি। পাঠকদের পদচারণায় আনন্দে মন নাড়া দিচ্ছে প্রকাশকদের। এবারেও বইমেলা বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণ এবং ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রায় ১৫ লাখ বর্গফুট জায়গাজুড়ে। মেলায় মোট প্যাভিলিয়ন ৩৩টি এবং ৫৪০টি প্রতিষ্ঠানকে ৮৩৪টি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। যার মধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৪৩৩টি প্রতিষ্ঠানকে ৬৮০টি স্টল এবং বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণে ১০৭টি প্রতিষ্ঠানকে ১৫৪টি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এবারও শিশুচত্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্থানান্তর করা হয়েছে। করোনা সংকটের জন্য প্রথম দিকে ‘শিশুপ্রহর’ রাখা হয়নি।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশের উত্তর-পূর্ব কোণে নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনের মঞ্চ করা হয়েছে। নির্বাচিত লেখকগণ তাদের সদ্য প্রকাশিত বই নিয়ে পাঠকের মুখোমুখি হবেন। একজন লেখকের জন্য সময় ­­থাকবে ২০ মিনিট। প্রতিদিন বিকাল ৫টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত চলবে মঞ্চের কার্যক্রম। এবার লিটল ম্যাগাজিন চত্বর বাংলা একাডেমির প্রাঙ্গণ হতে স্থানান্তর করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মূল মেলা প্রাঙ্গণে নেওয়া হয়েছে। লিটলম্যাগকে ১৩৫টি স্টল বরাদ্দের পাশাপাশি ৫টি স্টল উন্মুক্ত রেখে ১৪০টি স্টল বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়া জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের স্টলে একক ক্ষুদ্র প্রকাশনা সংস্থা ও ব্যক্তি উদ্যোগে যারা প্রকাশ করেছে তাদের বই বিক্রি বা প্রদর্শনের ব্যবস্থা রেখেছে। বাংলা একাডেমির ৩টি প্যাভিলিয়ন, শিশু-কিশোর উপযোগী বইয়ের জন্য একটি এবং সাহিত্য মাসিক উত্তরাধিকারের জন্য একটি স্টল রাখা হয়েছে। বাংলা একাডেমি ও মেলায় অংশগ্রহণকারী অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ২৫ শতাংশ কমিশনে বই বিক্রি করছে।
মেলা প্রাঙ্গণ সম্পূর্ণ নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, বিজিবি, গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের পাশাপাশি অগ্নিনিরাপত্তা বাহিনীকে সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্বে রাখা হয়ে। সেই সাথে মেলার এলাকাজুড়ে তিন শতাধিক ক্লোজসার্কিট ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এছাড়াও নীলক্ষেত থেকে টিএসসি, দোয়েল চত্বর থেকে চাঁনখারপুল, চাঁনখারপুল, দোয়েল চত্বর, শহিদ মিনার, টিএসসি হয়ে শাহবাগ হয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউট মৎস্য ভবন পর্যন্ত পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, প্রতিদিন মশক নিধনের ব্যবস্থাসহ ধূলিকনার জন্য নিয়মিত পানি ছিটানো হচ্ছে। মেলা প্রাঙ্গণ সম্পূর্ণ পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত রাখা হয়েছে। সেই সাথে রাখা হয়েছে নারী ও পুরুষদের নামাজের ঘর, পুলিশ নিয়ন্ত্রণ কক্ষের নিকটে ব্রেস্টফিডিং কর্নার, হুইলচেয়ার ও পর্যাপ্ত স্বেচ্ছাসেবী।
বইমেলা প্রসঙ্গে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হাবিবুল্লাহ সিরাজী বলেন, এবারের অমর একুশে বইমেলা নির্ধারিত সময় হতে পিছিয়ে ১৮ মার্চ শুরু হয়েছে এবং তা ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। এবারের অমর একুশে বইমেলা অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে হচ্ছে। প্রথম চ্যালেঞ্জ করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ স্কুল-কলেজ বন্ধ, ফলে তারুণ্যের একটা অনুপস্থিতি আমরা পরিলক্ষণ করছি। তৃতীয় চ্যালেঞ্জ বইমেলার অনুপযোগী সময় গ্রীষ্মকালের গরম ও ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা শতভাগ। তারপরও দর্শনার্থীর সমাগম ও বই বিক্রি বিবেচনা করে আমরা আশাহত নই। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও পহেলা বৈশাখকে সামনে রেখে আমরা নতুনভাবে এই মেলার যে রূপরেখা সৃষ্টি করেছি তাতে সাফল্য আসবে।
সকল বাধা-বিপত্তি কাটিয়ে এবারের অমর একুশে বইমেলা সফলভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের মিলন মেলায় পরিণত হয়েছে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, যা আশাহত করেনি লেখক, পাঠক ও প্রকাশকদের। ছুটির দিন ব্যতীত প্রতিদিন বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা এবং ছুটির দিন বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা ছিল বইমেলা। করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ৩১ মার্চ থেকে বইমেলা বিকাল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। বইমেলা চলবে ১৪ এপ্রিল পর্যন্ত।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply