বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ, ছোট ছোট ঘটনা

ড. এ কে আব্দুল মোমেন:  ১৯৬৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধু রাওয়ালপিন্ডিতে আইয়ুব খান আহূত গোলটেবিল বৈঠকে যোগদানের জন্য উপস্থিত হন। আমি তখন ইসলামাবাদ ইউনিভার্সিটির ছাত্র। বঙ্গবন্ধু রাওয়ালপিন্ডিতে পৌঁছবেন এ খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা ব্যস্ত হয়ে পড়ি। এ সময়ে রাওয়ালপিন্ডিতে একুশে ফেব্রুয়ারির একটি অনুষ্ঠান আয়োজন করছিলাম। বঙ্গবন্ধু আসবেন শুনেই তাকে ওই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি করার ইচ্ছে পোষণ করি। যখনই শুনলাম বঙ্গবন্ধু কনফার্ম আসবেন তখনই আমরা অনুষ্ঠানের তারিখটা পিছিয়ে দেই এবং ঘটা করে পালনের উদ্যোগ নেই।
একুশে ফেব্রুয়ারির অনুুষ্ঠানের খবর আমরা রাওয়ালপিন্ডির টিভিতে অ্যাড দিতে চাইলাম। আমি তখন সময় সময় রাওয়ালপিন্ডির টিভিতে বাংলা খবর পড়তাম। সেখানে আরও একজন ছিলেন, উনার নাম জাহাঙ্গীর আলম। উনি আর্টিস্ট, তবে সব সময় বাংলা সংবাদ পড়তেন। আমরা ঠিক করলাম যে খবর পড়ার সময় একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানটি যে রাওয়ালপিন্ডিতে হচ্ছে সে খবরটি পরিবেশন করব। কিন্তু কর্তৃপক্ষ রাজি হলেন না। তখন ঠিক করলাম বিজ্ঞাপন হিসেবে তা প্রচার করব। কমার্শিয়াল অ্যাড; কিন্তু তাতেও কর্তৃপক্ষ বাধা দিল। তখন টিভি স্টেশনের প্রধান ছিলেন একজন বাঙালি। তিনি বললেন, মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া তারা এ অ্যাডটি দিতে পারবেন না। আমরা তখন তথ্যমন্ত্রী খাজা শাহাবুদ্দীনের সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করি। কিন্তু উনি আমাদের কোনো সময় দেননি। সাক্ষাৎ সম্ভব হয়নি।
এ-সময়ে বঙ্গবন্ধু আসবেন শুনেই আমরা আমাদের অনুষ্ঠানের তারিখ পেছালাম। ভাবলাম যে, বঙ্গবন্ধুকে বলব যে আপনি এটার প্রধান অতিথি হন। বঙ্গবন্ধু রাওয়ালপিন্ডিতে আসবেন শোনার সঙ্গে সঙ্গেই আমরা একটি ব্যানার তৈরি করি। তাতে লেখা ছিল ‘বঙ্গ শার্দূল শেখ মুজিব’।
ঢাকায় ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদ ‘আমার নেতা, তোমার নেতা শেখ মুজিব’কে রেসকোর্সের ময়দানে বিরাট জনসভায় ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেওয়ার খবর জানার আগেই আমরা ব্যানার তৈরি করি। ব্যানার আজকালের মতো এত সহজ ছিল না। আমরা তুলা দিয়ে বেশ কষ্ট করে ব্যানার তৈরি করি। তাই আমরা আর ব্যানারটি পরিবর্তন করি নাই।
বঙ্গবন্ধুকে সংবর্ধনা জানানোর জন্য হাজার হাজার লোক রাওয়ালপিন্ডির ছোট এয়ারপোর্টে জড়ো হয়েছে। তবে পূর্ব পাকিস্তানিদের সংখ্যা হাতে গোনার মতো। আমাদের ‘বঙ্গ শার্দূল ব্যানারে’র পাশে দুজন বাঙালি সিএসপি অফিসার দেখতে এসেছিলেন। তাদের মধ্যে একজন এএমএ মুহিত এবং অন্যজন আবদুর রব চোধুরী। উনারা দুজনই তখন উপ-সচিব ছিলেন।
উনারা আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করেছিলেন। বিশেষ করে আবদুর রব চৌধুরীর স্ত্রী আমাদের ব্যানারের পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। বিকালে যখন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ফ্লাইট এলো তখন পুরো বিমানবন্দর এলাকা কানায় কানায় পরিপূর্ণ ছিল। উড়োজাহাজ যখন রানওয়েতে নামল তখন জনতার ঢল সকল ব্যারিকেড এবং বাধা-বিপত্তি অগ্রাহ্য করে রানওয়েতে দৌড় দেয়। এমন বিশৃঙ্খল পরিবেশে আমরা ব্যানার নিয়ে পিছনে পড়ে রইলাম। দূর থেকে দেখলাম, একজন নেতাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ ভেবে জনতার ঢল তাকে কাঁধে করে অগ্রসর হতে লাগল। জনতার ভিড় ঠেলে আমরা ধারে-কাছে যেতে পারিনি। পরে শুনলাম যাকে কাঁধে করে নিয়ে যায় তিনি বঙ্গবন্ধু ছিলেন না, হয়তো বঙ্গবন্ধুর সহযোগী মিজানুর রহমান চৌধুরী ছিলেন। আরও জানলাম যে, নিরাপত্তার কারণে বঙ্গবন্ধুকে সংগোপনে বের করে নিয়ে যাওয়া হয়, কেউ তা টের পায়নি।
এয়ারপোর্ট থেকে বঙ্গবন্ধুকে গাড়িতে করে রাওয়ালপিন্ডির ‘ইস্ট পাকিস্তান হাউসে’ নিয়ে যাওয়া হয়। যেখানে বঙ্গবন্ধু থাকবেন। এয়ারপোর্টে তার সঙ্গে আর সাক্ষাৎ হলো না। এর কারণ পাকিস্তান সরকার একটু ভয়ে ছিল উনাকে হয়তো কেউ মেরে ফেলতে পারে। এ-কারণে কড়া নিরাপত্তায় বঙ্গবন্ধুকে ‘ইস্ট পাকিস্তান হাউসে’ পৌঁছে দেয়।
সুতরাং ত্বরিত বেগে আমরা রাওয়ালপিন্ডির ‘ইস্ট পাকিস্তান হাউসে’ উপস্থিত হলাম। বঙ্গবন্ধু ও তার সহকর্মীরা ততক্ষণে সেখানে পৌঁছে গেছেন। বিশেষ করে তাজউদ্দীন সাহেব, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ড. কামাল হোসেন, মোল্লা জালালউদ্দিন, গোলাম সারোয়ার সাহেব সবার সাথে দেখা হলো সেখানে।
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলে তাকে আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার অনুরোধ করলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে একবাক্যে রাজি হন। তখন একুশে ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠান করতে গিয়ে আমরা যা অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছি, তা তাকে বললে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বললেন, ‘ফোন লাগাও’। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ তখন বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সচিব হিসেবে কাজ করেছিলেন। তবে রাত গভীর হওয়ায় সে-রাতে আর ফোন করা হয়নি। আমি ঐ রাত্রে বঙ্গবন্ধুর সাথে ‘ইস্ট পাকিস্তান হাউসে’ রাত্রিযাপন করি।
পরের দিন সকালে বঙ্গবন্ধু পোশাক পরে রেডি হওয়ার সময় পায়জামা বের করলেন; কিন্তু পায়জামায় নেমার (ফিতা) নেই। তখন বঙ্গবন্ধু আমাকে বললেন, পায়জামার নেমার লাগাতে। আমি পেনসিল দিয়ে বঙ্গবন্ধুর পায়জামার নেমার লাগিয়ে দিলাম। যেহেতু আমার মতো অন্য কোনো কনিষ্ঠ লোক সেখানে ছিলেন না, সুতরাং বিভিন্ন ফরমাস আমাকে করতে হয়। এখানে বললে অবান্তর হবে না যে বঙ্গবন্ধু সারাজীবন কষ্ট করেছেন, জেল খেটেছেন; কিন্তু তার হাতটা ছিল অনেক নরম এবং তুলতুলে। উনি যখন আমাকে জড়িয়ে ধরেন, আমি তখন খুবই উষ্ণতা অনুভব করি।
পরের দিন সকালে আমরা নাস্তার টেবিলে একত্রিত হই। বঙ্গবন্ধুও নাশতার টেবিলে এলেন। নাশতার টেবিলেই বঙ্গবন্ধু সৈয়দ নজরুল ইসলামকে তৎক্ষণিকভাবে বললেন, ‘খাজা সাহেবকে ফোন লাগাও এবং এদের সমস্যার কথা বলো।’
নজরুল ইসলাম সাহেব ফোন দিলেন এবং খাজা শাহাবুদ্দিন সাহেবকে বলার সাথে সাথেই শাহাবুদ্দিন সাহেব রাজি হয়ে গেলেন আমাদের অ্যাডটা প্রচারের জন্য। এরপরে বঙ্গবন্ধু-বিরোধী দলসমূহের আহ্বায়ক এবং আইয়ুব খানের বড় ভাই সরদার বাহাদুর খানের বাসাতে চলে গেলেন। ওখানেই তিনি পাকিস্তানের যত বড় বড় নেতা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ আছেন তাদের সাথে একের পর এক মিটিং করেন। ওখান থেকে বঙ্গবন্ধু আইয়ুব খানের রাওয়ালপিন্ডি গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করেন। আমরা সবাই বৈঠকস্থলের বাইরে অবস্থান করেছিলাম। বঙ্গবন্ধু যখন বৈঠক থেকে বের হলেন শুধু একটা কথা মুখ থেকে বের করলেন, ‘আমি মানুষের সাথে বেইমানি করি নাই।’ পরবর্তীতে তিনি ঈদের কারণে ঢাকায় ফিরে যান।

রাউন্ডটেবিল বৈঠক : ব্রিফিং
বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানে চলে যাওয়ার পর ইসলামাবাদের বাঙালি সিএসপি অফিসাররা প্রায়ই মিটিং করতেন। এসব অধিকাংশ মিটিং হতো আবুল মাল আবদুল মুহিতের রাওয়ালপিন্ডির স্যাটেলাইট টাউনের বাড়িতে এবং এটির মূল উদ্যোক্তা ছিলেন এএমএ মুহিত সাহেব নিজেই। তার সাথে ছিলেন হেদায়েত আহমেদ, আবদুর রব চৌধুরী, মাঝে মধ্যে এবিএম গোলাম মোস্তাফা, যুগ্ম সচিব মফিজুর রহমান এবং অধ্যাপক আনিসুর রহমান এবং ওয়াহিদুল হক উপস্থিত থাকতেন। উক্ত সভাগুলোতে ৬-দফা দাবির বিশদ বিশ্লেষণ করে কীভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব তার ওপর বিস্তারিত আলোচনাপূর্বক একটা তথ্যনির্ভর ডকুমেন্ট তৈরি করা হয়। ডকুমেন্টটি বঙ্গবন্ধু বা তার উপদেষ্টাদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পড়ে আমার ওপরে।
দ্বিতীয় দফা গোলটেবিল বৈঠক শুরু হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু মার্চ মাসের মাঝামাঝি উপস্থিত হলেন লাহোরে। আমাকে তখন ইসলামাবাদ থেকে মুহিত ভাই লাহোরে যেতে বললেন এবং ৬-দফার ওপর তৈরি ডকুমেন্টটি বঙ্গবন্ধু বা তার উপদেষ্টাদের হাতে পৌঁছে দিতে বললেন। ডকুমেন্টটি বঙ্গবন্ধুকে পৌঁছাতে হবে গোলটেবিল বৈঠকের আগেই।
সরকারি অফিসাররা চাকরি হারানোর ভয়ে ডকুমেন্টটি লাহোরে নিয়ে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর হাতে দেওয়ার সাহস পাচ্ছিলেন না। আবুল মাল আবদুল মুহিত ডকুমেন্টটি আমার হাতে দিয়ে বললেন, এটা খুব গোপনে বঙ্গবন্ধুর হাতে বা তার উপদেষ্টা কামাল হোসেন, অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ চৌধুরী, খান সারওয়ার মুরশিদ প্রমুখের হাতে দিতে এবং আরও বললেন যে, এই ডকুমেন্টটির বিষয়ে যাতে কারও সাথে আলোচনা না করি বা কাউকে না দেখাই। তখন রাওয়ালপিন্ডি থেকে বাসযোগে আমি লাহোরে আসি।
মুহিত সাহেব ও রব চৌধুরী লাহোরে কোথায় গিয়ে তা দিতে হবে সবিস্তারে বিশ্লেষণ করলেন। লাহোরে পৌঁছলে তৎকালীন পাঞ্জাবের খাদ্য বিভাগের ডাইরেক্টর মুফলে উর রহমান ওসমানী আমাকে রিসিভ করলেন। তার সঙ্গে লাহোরে কর্মরত আরও দুজন বাঙালি সিএসপি অফিসার ছিলেন। মুহিত ভাই উনাদের আমাকে রিসিভ করার জন্য বলেছিলেন।
তারা হলেন মোহাম্মদ আলী ও খালেদ শামস। আমাকে ডকুমেন্টের কথা বঙ্গবন্ধু ছাড়া কাউকে বলতে মানা ছিল, সে-জন্য তাদের আমি কিছু বলিনি। মুফলে ভাই তখন গুলবাগে সরকারি বাসায় থাকতেন। তার বাসায় থাকতে অনুরোধ জানালেন। আমি তখন তাকে শুধু বললাম, আমাকে হোটেলে নিয়ে যান। আমি হোটেলে গেলাম। হোটেলে গিয়েই আমি প্রথম মওদুদ আহমেদকে দেখতে পাই। মওদুদ ভাইকে বললাম, আমি ডকুমেন্ট নিয়ে আসছি। তিনি আমাকে বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে গেলেন। আমি বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করলাম এবং তার হাতে ডকুমেন্টটি দিলাম। উনার পাশেই তাজউদ্দীন সাহেব ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তাজউদ্দীন সাহেবের হাতে ডকুমেন্টটি দিয়ে দিলেন। তিনি খুবই খুশি হলেন এবং বললেন খুব ভালো, খুব ভালো। ‘Very good, they did a good job..’
বঙ্গবন্ধুর সাক্ষাৎ পেয়ে আমি তখন দুটো প্রস্তাব করি। এক হলো- জাস্টিস এসএম মুর্শেদ এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রাক্তন জনপ্রিয় গভর্নর আজম খানকে আওয়ামী দলের প্রতিনিধি হিসেবে গোলটেবিল বৈঠকে নিয়ে যাওয়ার জন্য তদবির করি। কিন্তু কাজ হয়নি। আমরা যখনই লাহোরে আসতাম, পূর্ব পাকিস্তান থেকে এসেছি শুনলে আজম খান খুবই খাতির-যতœ করতেন। বঙ্গবন্ধু শুনলেন কিন্তু কিছু বললেন না। আমি কোথায় উঠেছি জিজ্ঞেস করলে বললাম, এখনও কোথাও উঠিনি। তখন মওদুদ আহমেদ বললেন, এই হোটেলে থেকে যেতে। হোটেলের অনেকগুলো রুম ওয়াজির আলি ইন্ডাস্ট্রিজ বঙ্গবন্ধুর দলবলের জন্য ভাড়া করে রেখেছে। সুতরাং সেখানেই থেকে গেলাম।
পরবর্তীতে সকলেই রাওয়ালপিন্ডি ফিরে এলাম এবং ইস্ট পাকিস্তান হাউসে বঙ্গবন্ধুর সাথে থাকতে শুরু করলাম। তখন ঢাকা থেকে উনার সাথে মোহাম্মদ হানিফ (পরবর্তীতে ঢাকা মেয়র) এসেছিলেন, যিনি বঙ্গবন্ধুর ফরমায়েশগুলো পালন করতেন। বঙ্গবন্ধু প্রত্যেক দিন সকালে DAC চেয়ারম্যান সরদার বাহাদুর খানের বাড়িতে যেতেন। বঙ্গবন্ধু উনার বাড়িতে বহু রাজনীতিবিদের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করতেন। ডেমোক্রাটিক অ্যাকশন কমিটি (DAC) তৎকালীন সময়ে খুব দাপুটে হিসেবে পরিচিত ছিল। অনেকগুলো দলের সমন্বয়ে এটা তৈরি হয়েছিল। এর সভাপতি নওয়াবজাদা নসরুল্লাহ খান, মুসলিম লীগের দৌলতানা খান, ইসতিকলাল পার্টির এয়ার ভাইস মার্শাল আজগর খান।
যাই হোক, বঙ্গবন্ধু গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করলেন। মজার বিষয় হলো উক্ত বৈঠকের একমাত্র বিরোধিতাকারী নেতা ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানি। বাকি সব নেতা এই গোলটেবিল বৈঠকে যোগদান করেন।
বিশেষভাবে লক্ষণীয়, বঙ্গবন্ধু রাওয়ালপিন্ডিতে পৌঁছার পূর্বে অন্য নেতারা বৈঠকের জন্য এসেছিলেন আর তখন আমাদের কাজ ছিল রাওয়ালপিন্ডির বিভিন্ন বাজারে তাদের নিয়ে যাওয়া। তাদের মধ্যে কেউ কেউ স্যুটের কাপড়, ট্রানজিস্টার-রেডিও বা ধূমপানের বিভিন্ন আইটেম কিনতেন, লানডি কোটাল থেকে চোরাইপথে আসা এসব দ্রব্যসামগ্রী সস্তায় পাওয়া যেত।
কিন্তু বঙ্গবন্ধুর সাথে যারা এলেন তাদের কেউ বাজারে কোনো কিছু কেনাকাটার জন্য যাননি বা আগ্রহ দেখাননি। একমাত্র মোল্লা জালালউদ্দিনকে একবার বাজারে নিয়ে যাই। মূলত বঙ্গবন্ধু ও তার দলবল সবার আগ্রহ ছিল বৈঠকের রাজনৈতিক আলোচনার দিকে।
বঙ্গবন্ধু আমাকে একবার বলেছিলেন মোমেন ‘তুমি আমাকে আইয়ুব খানের ‘সাদ্দাদের বেহেশত্ দেখাও।’ সাদ্দাদের বেহেশত্ মানে আইয়ুব খানের ইসলামাবাদ। ইসলামাবাদ তখন নতুন করে গড়ে উঠতেছিল। আমি বললাম আপনার তো গাড়ি আছে। ‘তিনি বললেন না না, আমি ঐ টিকটিকির গাড়িতে যাব না। সরকারি গাড়িতে টিকটিকি আছে। তুমি আমাকে তোমার গাড়িতে করে নিয়ে যাবে। আমি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যাওয়ার জন্য একটি গাড়ি ম্যানেজ করি। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে আর নিয়ে যেতে পারলাম না। কারণ যখনই বলি তখনই তিনি মিটিং-সভা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। তিনি আর ইসলামাবাদ দেখতে পারেন নাই।
এখানে আরেকটু উল্লেখ করতে চাই ঐ সময়ে আমি অনেককে বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে দেই। এর মধ্যে আমার ভগ্নিপতি বদদুর নূর ছিলেন। উনি তখন রাওয়ালপিন্ডিতে সেন্ট্রাল ইনফরমেশন সার্ভিসে চাকরি করতেন। উনি এলেন বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করতে। উনার বাড়ি সিলেটে। সিলেট আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা দেওয়ান ফরিদ গাজী বছরের পর বছর উনাদের বাসাতে ভাড়া থাকতেন। বঙ্গবন্ধুর সাথে আমার ভগ্নিপতিকে পরিচয় করিয়ে দিলাম। বঙ্গবন্ধু জিজ্ঞেস করলেন, ‘উনি কে?’ আমি বললাম, আমার ভগ্নিপতি, সেন্ট্রাল ইনফরমেশন সার্ভিসের অফিসার। উনার বড় বস আলতাফ গওহর।
আলতাফ গওহর ছিলেন তখন ইনফরমেশন সেক্রেটারি। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের ঘনিষ্ঠ ও জাঁদরেল সচিব। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আপনি তো ইনফরমেশন সার্ভিসের লোক, এখানে আসছেন আপনার পিছনে তো টিকটিকি লেগে যাবে। আপনার তো সাহস অনেক।’ আমার ভগ্নিপতি বললেন, ‘আপনাকে (বঙ্গবন্ধু) দেখতে এসেছি, আলাপ করতে এসেছি।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আপনি বেশিক্ষণ থাকবেন না, টিকটিকি আপনার পেছনে লেগে যাবে।’ এ-রকম ছোট্ট ছোট্ট অনেক কাহিনি আজও ভাস্বর হয়ে আছে।

আরেকটি ঘটনা : চীন থেকে কয়লা আমদানি
আমি তখন বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজীর একান্ত সচিব। এ-সময়ে খন্দকার মোশতাক ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী। খন্দকার মোশতাক প্রায় সময়েই অফিসে আসতেন না। আর ঐ সময়ে মনে হয় তিনি পূর্ব ইউরোপের অনেকগুলো দেশে বেড়াতে গেছেন। ফলে আমার মন্ত্রী তখন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে। আমরা তখন ইন্ডিয়া থেকে সব কিছুই কিনে থাকি। কয়লাটা ইমপোর্ট করি ইন্ডিয়া থেকে। এর কিছুদিন আগে ইন্ডিয়া থেকে লবণ আমদানির কথা ছিল। লবণ যথাসময়ে এলো না। ইন্ডিয়া শেষ সময়ে লবণ আসাটা বন্ধ করে দিল। তারা বলল, ওখানকার শ্রমিকরা স্ট্রাইক করেছে পোর্টে। সে-জন্য তারা লবণ পাঠাতে পারেনি। বাংলাদেশে এটা নিয়ে খুব হৈচৈ। এর পরপর আমরা ভারত থেকে কয়লা কিনব। তখন যারা কয়লা বাংলাদেশে আনতেন তাদের অন্যতম হচ্ছেন মহসিন এমপি এবং আরেকজন সিলেটি, নাম মনে পড়ছে না।
তারা এসে মাননীয় প্রতিমন্ত্রীকে জানালেন যে, ইন্ডিয়া কোনো সময়ই সময়মতো কয়লা ছাড়ে না। ইন্ডিয়া থেকে কয়লা সস্তায় কেনা যায় বা ট্রান্সপোর্ট খরচও কম। তবে প্রত্যেক সময়ই শেষ মুহূর্তে তারা ঝামেলা বাধায়। যথাসময়ে কয়লা ছাড় দেয় না এবং তাদের কয়লা নিম্নমানের।
সে-জন্য তারা বললেন, শুধুমাত্র ইন্ডিয়া থেকে কয়লা না এনে বিকল্প হিসেবে চীন থেকে কয়লা আমদানি করা যায় কি না। চীনও কয়লা রপ্তানি করতে রাজি। কিন্তু চীনের কয়লার দাম বেশি। দাম বেশি তাই কেনা যাবে না। আমরা তখন খুব কৃচ্ছ সাধন করছিলাম। আমাদের বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি ছিল।
যারা কয়লা আমদানি করে থাকেন, যেমন- মহসিন সাহেবের দল (আমরা তাকে ‘কয়লা মহসিন’ নামে ডাকতাম) তিনি অত্যন্ত সৎ এবং পয়সাওয়ালা লোক ছিলেন। ইতোপূর্বে উনাকে নিয়ে আমরা ইংল্যান্ডেও গেছিলাম। তিনি খুলনা থেকে নির্বাচিত এমপি ছিলেন। সেই থেকে উনার সাথে আমার খুবই ভালো সম্পর্ক হয়েছিল। মহসিন ভাই বারবার বলেছিলেন, ইন্ডিয়া থেকে কয়লা আনতে অনেক ঝামেলা হয়। তাই চীন থেকে কয়লা আমদানির পক্ষে তিনি। কিন্তু সমস্যা হলো চীনের কয়লার দাম বেশি। আমাদের সচিব ছিলেন তখন External Trade–এর নুরুল ইসলাম। তারা দুই ভাই সিভিল সার্ভিসে ছিলেন। এক ভাই ইন্ডাস্ট্রি সেক্রেটারি মতিউল ইসলাম এবং অন্যজন নুরুল ইসলাম External Trade- সেক্রেটারি। নুরুল ইসলাম দাম বেশি দেখে চীন থেকে কয়লা কেনার প্রস্তাবটা নাকচ করে দেন। আমার মন্ত্রীর কাছে যখন ফাইলটা এলো তখন কয়লা ব্যবসায়ীরা আমার মন্ত্রীর সাথে দেখা করেন এবং বলেন ইন্ডিয়া থেকে কয়লা আমদানি করলে সময়মতো কয়লা পাওয়া যাবে না এবং যা পাওয়া যায় তাও নিম্নমানের।
আমার মন্ত্রী তখন ফাইল নিয়ে সোজা বঙ্গবন্ধুর কাছে নিয়ে গেলেন এবং সাথে আমিও ছিলাম। সেখানে গিয়ে বঙ্গবন্ধুর রুমে ঢুকলেন। বঙ্গবন্ধু তখন সুগন্ধায় অফিস করতেন। আমার বস ফাইলটা দিলেন বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধু ফাইলটা দেখে গভীর মনোযোগে পড়লেন; কিন্তু কোনো কথা বললেন না। কোনো কথা না বলে ফাইলটা সই করে দিলেন। তারপরে বললেন, ‘গাজী সাহেব, অনুমোদন দিয়ে দিলাম।’ ‘ব্যবসা হলে স্বীকৃতি আসবে।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘একটু বেশি টাকা খরচই হলো তাতে কি, স্বীকৃতি তো পাব। পাশাপাশি বিকল্প উৎস থাকা ভালো।’ ফাইল নিয়ে আমরা চলে এলাম। এটা নিয়ে তিনি কিন্তু কারও সাথে আলাপ করেননি। এই যে উনার তড়িৎ গতিতে সুদূরপ্রসারী চিন্তা এটা আমার নিজের চোখেই দেখলাম।
১৯৭৪ সাল। ফেব্রুয়ারি মাসে আমরা ESCAP কনফারেন্সে নিউ দিল্লিতে যাই। বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতা আমার প্রতিমন্ত্রী। চারজনের প্রতিনিধি দল। আমি উক্ত দলের সদস্য সচিব হিসেবে যাই। তখনকার সময়ে পিএস হিসেবে যেতাম কম। বাকিদের মধ্যে ডেপুটি লিডার ড. আশরাফুজ্জামান। উনি আমাদের অতিরিক্ত সচিব ছিলেন। আরেকজন মহিউদ্দিন, টেপের (Technical Assistance, ERD)-এর চিফ বা প্রধান ছিলেন।
আর ওখানে আমাদের দলে যোগ দেন রাষ্ট্রদূত ড. এ আর মল্লিক এবং দূতাবাসের কমার্সিয়াল কাউন্সিলর কামরুল হুদা, তখন ডেপুটি হাইকমিশনার ছিলেন আতাউল করিম সাহেব। দিল্লিতে আমরা যখন পৌঁছলাম তখন আমাদের রিসিভ করলেন ইন্ডিয়ার স্টেট মিনিস্টার অব কমার্সশ্রী প্রণব মুখার্জি। পরবর্তীতে তিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি হন।
এখানে মজার কাহিনি আছে। দিল্লিতে থাকা অবস্থায় আমরা এই সর্বপ্রথম মন্ত্রী পর্যায়ে মিটিং করলাম চাইনিজদের সাথে। মিটিংটি চাইনিজ দূতাবাস আয়োজন করে। এটা ছিল ডিনারের দাওয়াত। ওখানে চাইনিজদের মন্ত্রী পর্যায়ের প্রতিনিধি ছিল। তখন বার্মায় নিযুক্ত আমাদের রাষ্ট্রদূত খাজা কায়সারও যোগ দেন।
খাজা কায়সার একসময়ে পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে চীনে ছিলেন। এর কিছুদিন আগে বঙ্গবন্ধুর আদেশে আমরা চীন থেকে কয়লা আমদানি করি। হয়তো তারই ফলশ্রুতিতে এই মিটিংটা সম্ভব হয়। এখানে বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শিতা আমার চোখের সামনে এখনও ভাস্বর।
ওয়েজ আর্নার স্কিম : শিশুদের প্রতি সংবেদনশীলতা
১৯৭৩ সাল। আমরা লন্ডনে গেলাম। সেখানে অনেক প্রবাসী সিলেটিরা থাকতেন। বাংলাদেশ হাইকমিশনে তখন একটা মাত্র গাড়ি ছিল। অ্যাডভোকেট আবদুস সুলতান সাহেব ছিলেন আমাদের হাইকমিশনার এবং ডেপুটি হাইকমিশনার ছিলেন ফারুক আহমেদ চৌধুরী। গাড়ি একটা হওয়ার কারণে আমরা প্রবাসী ব্যক্তি বিশেষের প্রাইভেট গাড়িতে চড়তাম। কখনও উবেদ জায়গিরদর, কখনও তোয়াবুর রহিম প্রমুখ। বিভিন্ন বাংলাদেশি প্রবাসী ছিলেন, তারাই গাড়ির ব্যবস্থা করতেন। আমরা তখন চড়কির মতো ঘুরতাম। সিলেটি মন্ত্রী হওয়ার কারণে একটার পর একটা সভা-সমিতিতে ব্যস্ত ছিলাম। প্রবাসীরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সর্বতোভাবে সাহায্য করেন এবং তখন তাদের আগ্রহ ছিল অকল্পনীয়।
সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সভা-মিটিং করতাম। আমি যখন লন্ডন যাই তখন আমার বোন ডা. শায়েলা খাতুনের ছোট দুটো বাচ্চা ছিল। উনি আমাকে বলেছিলেন, ছোট দুটো বোতল আর গুঁড়া দুধ লন্ডন থেকে যেন নিয়ে আসি। আর এদিকে বাংলাদেশে তখন ব্লেডের দাম খুব বেশি ছিল। একটা ব্লেডের দাম প্রায় পাঁচ টাকা। খুবই ব্যয়বহুল। আমরা 7 O’clock ব্লেড ইউজ করতাম।
এগুলো লন্ডনি প্রোডাক্ট হওয়ায় আমি লন্ডন থেকে এগুলো নিয়ে আসার প্ল্যান করি। কিন্তু আমার হাতে তেমন কোনো সময় ছিল না যে দোকানে ঘুরে ঘুরে এগুলো কিনব। তখন ওখানে একজন গাবনার ছিলেন। গাবনার মানে রেস্টুরেন্টের মালিক। আমি উনার সাহায্য নিলাম। উনাকে আমি এক প্যাকেট ব্লেড কেনার জন্য বলেছিলাম। উনি পুরো একটা ব্লেডের শিট বা পাতা নিয়ে আসছিলেন যেখানে ১৫টা প্যাকেট এবং প্রতি প্যাকেটে ৫টা, অর্থাৎ সর্বমোট ৭৫টা ব্লেড ছিল। আর উনি দুই টিন গুঁড়া দুধ এবং ৬টা বোতলও নিয়ে আসেন। আমি দেখে বলি, ‘খলিল ভাই আমার তো অতো পয়সা নাই।’ তখন সরকার টিএ/ডিএ খুব কম পয়সা দিত। খলিল ভাই বললেন, ‘না না তোমার পয়সা দিতে হবে না। এটা তোমার জন্য গিফট।’
আমি যখন উনাকে জিজ্ঞেস করলাম ব্লেডের শিটটার দাম কত? উনি আমাকে বললেন, পুরো শিটটার দাম ১ পাউন্ড। তখন একচেঞ্জ রেট ছিল ১ পাউন্ড সমান ১৮ টাকা। আমি শুনে তো খুবই তাজ্জব হয়ে যাই। বাংলাদেশে যেখানে একটা ব্লেডের দাম ৫ টাকা, সেখানে লন্ডনে ৭৫টা ব্লেডের দাম মাত্র ১৮ টাকা।
তখন খলিল ভাই আমাকে বললেন, ‘তোমরা আমাদের অনুমতি দাও। আমরা যখন দেশে যাব, আমরা এগুলো আমাদের পয়সা দিয়ে নিয়ে যাব এবং বাংলাদেশে গিয়ে মার্কেটে তা বিক্রি করব। এই পারমিশন তোমরা দাও। যদি এটা তোমরা অনুমতি দাও তাহলে আমরা লন্ডন থেকে দুধ, ব্লেড, বোতল বাংলাদেশে নিয়ে যাব।’ খলিল ভাইয়ের ঐ কথাটা আমার খুব পছন্দ হলো।
আমি ঢাকাতে এসে বিষয়টি নিয়ে আমার প্রতিমন্ত্রীর সাথে আলোচনা করি। যুক্তরাজ্যে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি আমদানি করার সুযোগদানের জন্য একটি ডিও তৈরি করি এবং দেওয়ান ফরিদ গাজীর মাধ্যমে ১৯৭৩ সালে ডিওটি তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী চট্টগ্রামের এম আর সিদ্দিকীর কাছে পাঠাই। তখন মূলত প্রতি ছয় মাস অন্তর বাণিজ্যনীতি ঘোষণা করা হতো। আমাদের টার্গেট ছিল বাণিজ্যনীতিতে নতুন করে এ-বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা। এটার নামকরণ করা হলো ‘ওয়েজ আর্নার স্কিম’। কিন্তু এম আর সিদ্দিকী সাহেব এটা কোথায় কোথায় পাঠালেন, তারপরে প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলো না।
কিছুদিন পর মন্ত্রণালয়ের রদবদল হলো। এম আর সিদ্দিকী সাহেব বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হয়ে আমেরিকায় চলে গেলেন। রাজশাহীর এএইচএম কামারুজ্জামান হেনা ভাই বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করলে দেওয়ান ফরিদ গাজী ‘ওয়েজ আর্নার স্কিমে’র প্রস্তাব নিয়ে আবার হাজির হন। এখানে উল্লেখ্য যে, জনাব দেওয়ান ফরিদ গাজী ও কামারুজ্জামান বা হেনা ভাই ১৯৬৯ সালের দিকে একই সাইকেলে চড়ে আওয়ামী লীগের দলীয় রাজনীতি করেছেন এবং এর ফলে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর হৃদ্যতা। কামরুজ্জামান সাহেব প্রস্তাবটি শোনার পর একবাক্যে রাজি হয়ে গেলেন।
কেন প্রস্তাবটি গ্রহণ করা হয়নি, তার খোঁজ নিয়ে তাকে জানাতে বললেন এবং এর ফলে কত টাকার বৈদেশিক মুদ্রা বা সমপরিমাণ দ্রব্যসামগ্রী আমদানি হবে তা মন্ত্রী সাহেব জানতে চাইলেন। আমাদের তখন তেমন কোনো ধারণা ছিল না, তারপরও মন্ত্রী মহোদয়কে বলেছিলাম প্রতি বছর প্রায় আড়াই কোটি টাকার মতো হতে পারে। তখন খুব বেশি হুন্ডি হতো। স্বাধীনতার পর পোস্টাল এবং ব্যাংকিং অবস্থার অবনতি, ধীরগতি ও টাকা খোয়া যাওয়ার ঘটনায় Home Remittance একেবারে কমে যায় এবং হুন্ডির পরিমাণ বাড়তে থাকে। আমরা তখন যুক্তি দেখাই যে, বিদেশ থেকে মালামাল নিয়ে আসার অনুমতি দেওয়া হলে হুন্ডি কমে যাবে, প্রবাসীরা টাকা হুন্ডি না করে বিদেশ থেকে মালামাল নিয়ে আসবেন।
তাছাড়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিজ বৈদেশিক মুদ্রায় নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি আমদানি করতে দেওয়া হলে প্রথমত নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঘাটতি কমবে, মুদ্রাস্ফীতি কমবে, দ্বিতীয়ত স্বদেশে ‘হোম রেমিট্যান্স’ বাড়বে এবং তৃতীয়ত শুল্ক আয় বাড়বে। এখানে বলে রাখা ভালো যে ওই সময়ে মূলত সিলেটিদের মাধ্যমেই হোম রেমিট্যান্স আসত।
হুন্ডির প্রসঙ্গ আসতেই অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ জানালেন, তিনি শিগগিরই ইলেকট্রনিক ব্যাংকিংয়ের ব্যবস্থা করবেন, এতে তাড়াতাড়ি টাকা পাওয়া যাবে। এছাড়া হুন্ডিতে টাকা পাঠানো যাতে কমে তার জন্য তিনি শিগগিরই প্রতি পাউন্ডের মূল্য ১৮ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ টাকায় উন্নীত করবেন। তাতে হোম রেমিট্যান্স বাড়বে এবং ওয়েজ আর্নার স্কিমের প্রয়োজন হবে না। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রস্তাবটি ফাইলের মধ্যে রেখে দেয়। পরবর্তীতে আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, বাণিজ্যনীতিতে এ বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হলে প্রথমত শুধু সিলেটি লোকজন লাভবান হবে এবং এতে করে ‘ঈধঢ়রঃধষ ঙঁঃভষড়’ি হওয়ার সম্ভাবনা আছে। শুধু এক জেলার লোকেরাই লাভবান হবে বিধায় এ-বিষয়টি বাণিজ্যনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করার দরকার নেই বলে অর্থ মন্ত্রণালয় জানিয়ে দিয়েছিলেন।
বিষয়টি আমি সিলেটের এমপি এবং ব্যবসায়ীদের জানালে তারা তখন বলল, ‘চলো আমরা সদলবলে নেতার কাছে যাই।’ আমরা তখন বঙ্গবন্ধুকে ‘নেতা’ হিসেবে সম্বোধন করতাম। আমার বস দেওয়ান ফরিদ গাজীর নেতৃত্বে সিলেটের সাত-আটজন সংসদ সদস্য বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করেন।
আমরা দলবল নিয়ে ওয়েজ আর্নার স্কিমটি অনুমোদনের জন্য সন্ধ্যার দিকে গণভবনে উপস্থিত হই। বঙ্গবন্ধু তখন গণভবনে পুকুরের পাড়ে মাছগুলোকে খাবার দিচ্ছিলেন। সেখানে তখন এএইচএম কামারুজ্জামান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মনসুর আলী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুস সামাদ আজাদ সাহেবসহ অনেক রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
বঙ্গবন্ধু আমাদের দেখেই জিজ্ঞেস করলেন ‘দেওয়ান সাহেব কি হইছে, দল-বল নিয়ে আসছেন, অভিযোগ আছে কিছু?’ দেওয়ান সাহেব হাসি দিয়ে বললেন, ‘নেতা, আমার ছোট একটা ইস্যু আছে, কালকে বাণিজ্যনীতি ঘোষণা করা হবে, বাণিজ্যনীতিতে এই ইস্যুটা অন্তর্ভুক্ত করতে চাই; কিন্তু এটা এখনও অনুমোদন হয়নি।’ বঙ্গবন্ধু শুনেই বললেন, ‘কি হইছে বলেন তো?’ তখন আমার বস দেওয়ান ফরিদ গাজী সাহেব জানালেন, ‘নেতা, শিশুদের জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় গুঁড়া দুধ প্রবাসীরা নিয়ে আসবে, এটার জন্য অনুমতি দরকার। আর এটা সম্ভব হলে দেশে দুধের অভাব পূরণ হবে, শিশুরা সস্তায় দুধ খেতে পারবে। দেশে দুধের চাহিদাও পূরণ হবে।’ এ-কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘শিশুদের জন্য দুধ, এটা কেন বাদ পড়েছে, না না এটা অনুমোদন দিতে হবে।’ তিনি তাৎক্ষণিক সেক্রেটারিকে ডেকে বিষয়টি অনুমোদনের জন্য নির্দেশনা প্রদান করেন।
শিশুদের প্রতি তার অগাধ ভালোবাসা ও সংবেদনশীলতা থাকায় আর কিছু শুনতে চাননি। ওয়েজ আর্নার প্রস্তাব অনুমোদন করে দেন। কত টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আসার সম্ভাবনা, জিনিসপত্রের দাম কেমন কমতে পারে, কত টাকার জিনিসপত্র আসতে পারে, তা শোনার আগেই সেক্রেটারি সাহেবকে বললেন, ‘দেওয়ান সাহেবের এটা দিয়ে দিন।’ বঙ্গবন্ধুর আদেশের ফলে পরীক্ষামূলকভাবে ওয়েজ আর্নার স্কিম চালু হয় এবং শুধু ৪টি আইটেম আনার সুবিধা দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধু জনতার বন্ধু, শিশুদের প্রতি তার অগাধ দুর্বলতা এবং তার রাজনৈতিক বোধ অত্যন্ত প্রখর হওয়ায় তাকে বিশদভাবে বলতে হয়নি- সঙ্গে সঙ্গে স্কিমটি চালু করার আদেশ দেন।
স্কিমটি চালু হলো; কিন্তু আমলাতন্ত্র এতে বিভিন্ন বিধিনিষেধ জুড়ে দিলে পাঁচ মাস পার হওয়ার পরও আশানুরূপ দ্রব্যদি আসছে না দেখে স্কিমটিকে জোরদার করার জন্য আবারও আমরা বঙ্গবন্ধুর শরণাপন্ন হই এবং তার অনুমতি নিয়ে তিন সদস্যের একটি টিম গঠন করা হয়। টিমের সদস্য হলাম আমি নিজে। মন্ত্রী দেওয়ান ফরিদ গাজী, খুলনার এমপি ও ব্যবসায়ী মোহসিন সাহেব।
টিমটি ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে যায় এবং সেখানে প্রবাসীদের জানায় যে, তারা এর মাধ্যমে জিনিস পাঠাতে পারবে। প্রবাসীরা জানান যে, তারা মাল পাঠাতে চান, তবে বেজায় মুশকিল দুটো কারণে। প্রথমত; ওয়েজ আর্নার স্কিমে জিনিস পাঠাতে গেলে NOC বা  No Objection Certificate নিতে হয় এবং সেটা নিতে খুব ভোগান্তি হয়, ঘুষ দিতে হয়। দ্বিতীয়ত; ঐ অফিসে দূর-দূরান্ত থেকে গিয়ে সার্টিফিকেট আনা বড্ড ব্যয়সাপেক্ষ ও হয়রানিমূলক। আমাদের এই সফরে লন্ডন মিশন থেকে তিনজন অফিসার আমাদের সফর সঙ্গী হন এবং তারা হচ্ছেন- লন্ডনের তৎকালীন ইকনোমিক মিনিস্টার এনাম আহমদ চৌধুরী, মেজর জেনারেল মইন চৌধুরী। তিনি তখন ডিফেন্স অ্যাটাচে এবং কমার্সিয়াল কাউন্সিলর নিজামুর রহমান, যিনি ছিলেন উপ-রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেবের আত্মীয়। প্রবাসীদের দাবিতে আমরা NOC উঠিয়ে দেই এবং তৎকালীন চিফ কন্ট্রোলার অব ইমপোর্ট ও এক্সপোর্ট সেগুফ্তা বখত চৌধুরীর পরামর্শে ৪টি আইটেম থেকে প্রথমত ১২টি এবং পরবর্তীতে ৪২টি এবং শেষ পর্যন্ত সব আইটেমের অন্তর্ভুক্ত হয়। ওয়েজ আর্নার স্কিম বঙ্গবন্ধু সরকারের একটি সফল প্রাইভেট-পাবলিক ইনিসিয়েটিভ, যা বহু বছর প্রচলিত ছিল। এবং এর মাধ্যমে হাজার হাজার কোটি টাকার দ্রব্যসামগ্রী বাংলাদেশে আসে। দ্রব্যের সরবরাহ বাড়ে এবং মুদ্রাস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে চলে আসে। সর্বোপরি জনগণের মঙ্গল হয়।
বঙ্গবন্ধু না হলে আমাদের এই নীতি কোনোদিন গৃহীত হতো কি না সন্দেহ।

লেখক : পররাষ্ট্রমন্ত্রী, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply