ঈদ-আনন্দে বেঁচে থাকার জয়গান

আরিফ সোহেল : আসছে ঈদ। আসছে ঈদুল ফিতর। কিন্তু তা এলেও; ঈদ নেই মানবজীবনে। মহামারি করোনার ছোবলে অজানা শঙ্কায় গতিহীন মানবজীবন। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সেখানে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, খুশি-আনন্দের চাইতে এখন বেঁচে থাকার সংগ্রামটাই মুখ্য। অথচ ঈদ মানেই মুসলিম জাহানের মহা-আনন্দযজ্ঞ। ঈদ মানে ত্যাগ-মহিমার। আনন্দ আর কল্যাণময় কর্মের ব্যাপকতা। ছোট-বড়, ধনী-দরিদ্র সবাই মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় উৎসবে। এক কথায় শ্রেণি-বৈষম্যহীন সর্বজনীন আনন্দ আয়োজনের নামই ঈদ।
ঈদ; মুসলিম সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব। হাসি-আনন্দ-উদযাপনের ডামাডোল নিয়ে আসে ঈদ। কিন্তু এবার রোগ-শোক আর মৃত্যুর ধূসর রঙে পৃথিবীতে খুশির ঈদও বর্ণহীন। থাকবে না হাতে হাত মেলানো গল্প। থাকবে না কোলাকুলি আর নতুন পোশাকের আদিখ্যপনা। ছবি তোলাতুলির বাহারি রকমফের। গতবারের মতো এবারও নিরামিষ ঈদ পালিত হবে স্রেফ ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে। তবে ঈদের আগের রাত থেকে মোবাইলে চলবে ঈদের শুভেচ্ছা বার্তাবিনিময়। অন ফোকাস স্ক্রিনে থাকবে ঈদের শুভেচ্ছাবিনিময়ের প্রযুক্তি বন্দনা।
সাধারণভাবে মুসলিম বিশ্বে বছরে দুবার ঈদ পালিত হয়। এক ঈদুল ফিতর। পরে ঈদুল আজহা। ঈদুল ফিতর মানে দান করার উৎসব। দ্বিতীয়টি ত্যাগ করার। দুই ঈদের দিন ভুলে যাই; কে কার শত্রু, কে কার মিত্র। এক কথায় সব ভুলে ভাগ করে নিই ঈদের আনন্দ-নির্যাস; মেতে উঠি বর্ণিল উৎসবে। সেজেও সারা; সারাবিশ্ব।
ঈদ পৃথিবীর প্রাচীনতম উৎসবগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি। ৪ হাজার বছর আগে ব্যাবিলন সভ্যতার যুগে সকল প্রধান মন্দির-প্রার্থনালয়ে ১১ দিনব্যাপী নববর্ষ উদযাপনের প্রচলন ছিল। ধারণা করা হয় উৎসব-আয়োজনের সূচনাপথ সেখান থেকেই গ্রন্থিত। সবকিছু ভুলে মানুষ ওইসব উৎসবে-আনন্দে মেতে উঠত। ব্যাবিলনে শোভাযাত্রা বের হতো; করা হতো বিজয়োৎসব পালন। সেই হিসাব করেই ইতিহাসবিদরা বলেছেন, ঈদুল ফিতর সময়ের বিবেচনায় কনিষ্ঠতম ধর্মীয় উৎসব। ১৪০০ বছর আগে মহানবী হজরত মুহম্মদ (সা.) মদিনায় হিজরতের পরেই ঈদুল ফিতর উৎসব পালন শুরু হয়। বদরের যুদ্ধে বিজয়স্মৃতিকে সর্বজনীনভাবে আনন্দময় করে তোলার জন্য ঈদ উৎসব পালনের ঘোষণা দিয়েছিলেন মহানবী হজরত মুহম্মদ (সা.)। হজরত আনাস (রা.) বর্ণিত হাদিস থেকে জানা যায়, মহানবী হজরত মুহম্মদ (সা.)-এর সময়ে মদিনাবাসী বছরে দুটি দিবসে আনন্দ উল্লাস করত। একটি শরতের পূর্ণিমায় পালিত হতো নওরোজ উৎসব। আরেকটি বসন্তের পূর্ণিমায় পালিত হতো মিহিরজান উৎসব। জাহেলি যুগের অবসানের সন্ধিক্ষণে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘আল্লাহ তোমাদের উক্ত দিবস দুটির পরিবর্তে উত্তম দুটি দিবস দান করেছেন। তা হলো ঈদুল আজহা এবং ঈদুল ফিতরের দিন।’ জরথুস্ত্র প্রবর্তিত নওরোজ ছিল নববর্ষের উৎসব। ছয় দিনব্যাপী এই উৎসবের মধ্যে মাত্র একদিন ছিল সাধারণ মানুষের। বাকি পাঁচ দিন ছিল ধনী-শ্রেণির জন্য। একইভাবে ছয় দিনব্যাপী মিহিরজান উৎসবেও একদিন সাধারণ দরিদ্র মানুষরা উপভোগ করতে পারত। শ্রেণি-বৈষম্য, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য এবং অশালীনতায় ভরা ছিল ওই উৎসব দুটি। রাসূলুল্লাহর কথায় তা বাদ দিয়ে বছরে দুটি ঈদ উৎসব পালন শুরু করেছিল। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) মুসলিম সম্প্রদায়ের নিষ্কলুষ বিনোদনের জন্য ঈদুল ফিতর উৎসবের সূচনা করেছেন। পাশাপাশি শুরু হয় আত্মত্যাগের মহীমায় ভাস্বর ঈদুল আজহা উদযাপন। সেই উৎসবগুলো চলছে উত্তরাধিকার আর পরম্পরায়।
শুধু বাংলাদেশ নয়, মুসলিম সম্প্রদায় পৃথিবীর দেশে দেশে ঈদ উৎসবে উদ্বেলিত হয়ে ওঠে। মহা ধুমধামে এই উৎসব পালনে মেতে ওঠে। এ উৎসব পালনের জন্য বাংলাদেশ সরকার ছুটি ঘোষণা করে। ফলে পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে ঈদ উৎসব পালন করার সুযোগ সৃষ্টি হয়। ঈদের প্রাক্কালে শহর থেকে গ্রামে যাওয়া বেসুমার হিড়িক পড়ে। ঈদ উপলক্ষে পত্র-পত্রিকাগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র এবং ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করে। রেডিও, টেলিভিশন প্রচার করে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানমালা। রাষ্ট্রপ্রধানসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেকেই ঈদ উপলক্ষে জাতির উদ্দেশ্যে বাণী কল্যাণকর প্রদান করেন।
ঈদুল ফিতর [عيد الفطر]; অর্থাৎ রোজা ভাঙার দিবস] ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসবের একটি। অন্যটি ঈদুল আজহা। মুসলিম সম্প্রদায় দীর্ঘ এক মাস রোজা বন্দেগির পর মহা ধুমধামে ঈদুল ফিতর পালন করে। সাধারণত হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুসারে রমজান মাসের শেষে পহেলা শাওয়াল ঈদুল ফিতর পালন করা হয়। তবে হিজরি পঞ্জিকা অনুসারে কোনো অবস্থাতে রমজান মাস ৩০ দিনের বেশি হবে না। ঈদের আগের রাতকে লাইলাতুল জায়জা [পুরস্কার রজনী] বা চাঁদরাত বলা হয়। সরাসরি ঈদের চাঁদ দেখার পর ঈদ ঘোষণা ইসলামি বিধান। অনেক দেশ গাণিতিক হিসাব করে ঈদের দিন নির্ধারণ করে। তবে বাংলাদেশে ঈদের দিন নির্ধারিত হয় চাঁদ দেখার ওপর। জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি দেশের কোনো স্থানে চাঁদ দেখার পর ঈদ ঘোষণা করে। ঈদের দিন রোজা রাখা নিষিদ্ধ বা হারাম।
মুসলমানদের বিধান অনুযায়ী ঈদের নামাজ আদায় করতে যাওয়ার আগে খেজুর, খোরমা অথবা মিষ্টান্ন খেয়ে রওনা হওয়া সওয়াবের কাজ। শহর গ্রামের সব জায়গায় ঈদের দিন জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এরপর শুরু হয় প্রীতি আর শুভেচ্ছাবিনিময়ের কোলাকুলি। ইসলামে নতুন পোশাক পরিধান অপরিহার্য বলা হয়নি। তা এখন বহুল প্রচলিত একটি রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেকের কাছে ঈদের আনন্দ মানে ঝাকাস নতুন পোশাক, অনেকের কাছে রসালো পোলাও-কোরমা খাওয়া-দাওয়ার মহোৎসব।
ধর্মীয় পরিভাষায় ঈদ অর্থ খুশি এবং ফিতর এসেছে ফিতরা থেকে। তাই ঈদুল ফিতরের মানে দান-খয়রাতের মাধ্যমে আনন্দ ভাগাভাগি করে নেওয়া। রমজান মাসের রোজার ভুলত্রুটির জন্যে গরিব-দুঃখীদের ফিতরা দিতে হয়। এটি মুসলমানদের জন্য ওয়াজিব। ঈদের নামাজের পূর্বেই ফিতরা আদায় করার বিধান রয়েছে। তবে ভুলক্রমে নামাজ পড়া হয়ে গেলেও ফিতরা আদায় করার নির্দেশ ইসলামে রয়েছে। ইসলামি বিধান অনুযায়ী আড়াই সের আটার মূল্যমানের ভিত্তিতে ফিতরার টাকা নির্ধারিত হয়। সাধারণভাবে পরিবারের প্রতি সদস্যের জন্যই ফিরতা জায়েস করা হয়েছে। ইসলামে জাকাত পাওয়ার যোগ্যদেরই ফিতরা দেওয়া কথা বলা হয়েছে।
করোনা কারণে ঈদ আজ সবার কাছেই নিষ্প্রভ আনন্দহীন একটি ধর্মীয় উৎসবের নামমাত্র। অথচ দুই বছর আগেও ঈদ ডামাডোলে জেগে উঠত গোটা মুসলিম জাতি। তবে বলতে দ্বিধা নেই পৃথিবী থেকে করোনার কালবেলা কেটে গেলে মানুষ ঈদের আনন্দের চেয়েও বেশি আনন্দিত হবে। আসুন করোনামুক্ত আনন্দময় পৃথিবীর প্রত্যাশার অপেক্ষায় থাকি আমরাও। অপেক্ষায় থাকি; নতুন বছরে সমস্বরে গেয়ে উঠারÑ ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশীর ঈদ/তাই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে, শোন আসমানী তাগিদ।’ এই ইসলামি কালজয়ী গানটি মরমী শিল্পী আব্বাস উদ্দিনের অনুরোধে কাজী নজরুল ইসলাম রচনা করেছিলেন।

লেখক : সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, উত্তরণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply