করোনার দুর্যোগে এবারের মে দিবসের তাৎপর্য

শেখর দত্ত

“রবির কিরণে, কুসুমে-গন্ধে ভরে নিতে চাই মনটা।
জানি, বিধাতারও সেই অভিলাষ, চাই চাই আট ঘণ্টা।
কল-কারখানা-বন্দর থেকে বাজাই যে রণডংকা,
শ্রম, বিশ্রাম, আনন্দÑ সবই এক একটি আট ঘণ্টা।”

ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে আমেরিকায় পুঁজিবাদী ব্যবস্থা তথা কল-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন বিকশিত হওয়ার যুগে শ্রমিকদের কাজের সময় ৮ ঘণ্টার দাবিতে আন্দোলন যখন ব্যাপক ও তীব্র হয়ে ওঠে, তখন শ্রমিকদের মুখে মুখে ছিল স্বতঃস্ফূর্ত-রচিত এই গান। কোনো কোনো কারখানার শ্রমিকরা নিজস্ব প্রতিষ্ঠানে অন্দোলন করে ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি আদায় করে নেয়। তখন সেই কারখানার জুতা বা সিগারেট কারখানায় পণ্যের নাম হয়ে যায় ‘৮ ঘণ্টা জুতা’, ‘৮ ঘণ্টা চুরুট’ ইত্যাদি। নিউইয়র্ক, বাল্টিমোর, ওয়াশিংটন, সিনসিনাটি, সেন্ট লুট, পিট্সবুর্গ, ডেট্রয়েট প্রভৃতি শিল্পাঞ্চল ও শহরের সাথে শিকাগোর শিল্পাঞ্চল ও শহরে ‘৮ ঘণ্টা উন্মাদনা’ ছড়িয়ে পড়ে।
১৮৮৬ সালের ১ মে ছিল শনিবার, স্বাভাবিক কাজের দিন। শিকাগোর শ্রমিকরা পুলিশি হামলা, তীব্র অপপ্রচার ও উসকানি উপেক্ষা করে ৮ ঘণ্টা কাজের সময়ের দাবিতে শন্তিপূর্ণ ধর্মঘট পালন করে। ধর্মঘট চলতে থাকলে ৩ মে ম্যককর্মিক ফসল কাটার কারখানায় শ্রমিক-সভা চলাকালীন সময়ে মালিকের গুণ্ডাদের আক্রমণের সাথে সাথে পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ে। পুলিশের গুলিতে ছয়জন ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারায়। এর প্রতিবাদে ৪ মে শিকাগোর হে মার্কেট স্কয়ারে বিশাল এক প্রতিবাদ সভায় নেতাদের বক্তৃতার সময় বোমা বিস্ফোরিত হয় এবং সাথে সাথে পুলিশ ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং চার শ্রমিক ও সাত পুলিশসহ বহুসংখ্যক শ্রমিক গুরুতর আহত হয়। ইতিহাসে এই ঘটনা ‘হে মার্কেটের ঘটনা’ বলে সুপরিচিত। এই ঘটনার অভিযোগে মামলায় শ্রমিক নেতা পার্সনস, স্পাইজ, ফিসার, এঞ্জেলকে ফাঁসি এবং ফিলডেন ও স্কোয়াবকে দীর্ঘমেয়াদি কারাদ- প্রদান করা হয়। লিংগকে মৃত অবস্থায় জেলের ভেতরে পাওয়া যায়।
শিকাগোর শ্রমিক-হত্যা ও নেতাদের বিচারের প্রতিবাদ চলতে থাকে আমেরিকা ও ইউরোপে। এই প্রেক্ষাপটে ১৪ জুলাই ১৮৮৯ মার্কসবাদী কমিউনিস্ট নেতাদের উদ্যোগে ফরাসি বিপ্লবের শততম বার্ষিকীতে বিপ্লবের লীলাভূমি ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে ইউরোপ-অমেরিকার ২০টি দেশের মার্কনবাদী কমিউনিস্ট শ্রমিক প্রতিনিধিরা এক সম্মেলনে মিলিত হয়ে পরের বছর থেকে ৮ ঘণ্টা শ্রম দিবসের দাবিতে মে দিবস পালনের ঘোষণা দেয়। তারপর থেকে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস’ বিশ্বের দেশে দেশে পালিত হতে থাকে। প্রসঙ্গত, আমেরিকার শ্রমিক-শ্রেণির ৮ ঘণ্টা শ্রম দিবসের আন্দোলন ছিল সর্বস্তরের শ্রমিকদের জনপ্রিয় ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন। ১৩১ বছর ধরে দিবসটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শ্রমিকরা তাদের প্রধান অনুষ্ঠান হিসেবে পালন করে আসছে। গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল জনগণও শ্রমিক ও শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে একাত্মতা ও সংহতি প্রকাশের জন্য দিবসটি পালন করে থাকে। এত সুদীর্ঘ বছর ধরে কোনো দিবস বিশ্বব্যাপী পালনের দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল।

দুই
আমাদের দেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে একে একে রেল, চা-বাগান, ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কশপ, আখ পেষাইয়ের কল প্রভৃতি প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে শ্রমিক-শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। পরে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে কুষ্টিয়ায় বস্ত্রকল ও নারায়ণগঞ্জে পাট বেইলিং ও প্রসেসিং কল এবং দ্বিতীয় ও তৃতীয় দশকে নারায়ণগঞ্জে কটন মিলস স্থাপিত হলে শ্রমিক-শ্রেণির সম্প্রসারণ ঘটে। শ্রমিক-শ্রেণির উদ্ভব ও বিকাশ আমাদের এই মানচিত্রে মে দিবস পালনের পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। ব্রিটিশ শাসিত পরাধীন ১৯২৭ সালে ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস ভারতে মে দিবস পালনের আহ্বান জানালেও সুদীর্ঘ ১২ বছর পূর্ব বাংলায় মে দিবস পালনের খবর পাওয়া যায় না।
সেই সময়টা ছিল একদিকে ‘সুসভ্য’ ব্রিটিশ শাসকদের বাংলায় শ্বেত সন্ত্রাসের যুগ। ফলে সশস্ত্র সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের উত্থান ঘটে। তীব্র দমন-পীড়নের মধ্যে তখন শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন-সংগঠনের কাজ স্থবির হয়ে পড়ে। যতটুকু ধারণা করা যায়, ১৯৩৭ সালে কুষ্টিয়ায় মোহিনী মিলের শ্রমিকরা প্রথম মে দিবস পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করে; কিন্তু পালিত হতে পারে না। কারণ কর্তৃপক্ষ ধর্মঘটি শ্রমিকদের সমাবেশ কুষ্টিয়া শহরের ৫ মাইলের মধ্যে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৩৮ সালে প্রথম নারায়ণগঞ্জে মে দিবস পালনের খবর পাওয়া যায়। পরের বছরও নারায়ণগঞ্জে শ্রমিকরা ওইদিনে ধর্মঘট পালন করে মে দিবস পালনে ব্যাপকভাবে শামিল হয়। সকালে মিল ও শ্রমিক এলাকায় লাল পতাকা উত্তোলন এবং দুপুরের পর ৬-৭ হাজার শ্রমিকের বিশাল সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ স্লোগানে আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে। তখন থেকে পাকিস্তানি আমলে বায়ান্ন সালের ভাষা আন্দোলনের আগ পর্যন্ত পরিস্থিতি অনুযায়ী কখনও বেশি আবার কখনও কম জমায়েতের ভেতর দিয়ে শহর ও শিল্পাঞ্চলের শ্রমিক ও শ্রমজীবী জনগণ দিবসটি পালন করে।

তিন
আমাদের দেশে দিবসটির তাৎপর্য ও মর্মবাণীকে ধারণ করে নতুন রূপে আত্মপ্রকাশ করে ১৯৪৫ সালের যুক্তফ্রন্টের বিজয়ের পর। মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলার নেতৃত্বে পরিচালিত পূর্ব বাংলার সরকারে শেখ মুজিবুর রহমানসহ আওয়ামী লীগের নেতারা তখন ছিলেন মন্ত্রী। সরকার মে দিবস পালন উপলক্ষে পুরো বেতনে অর্ধদিবস ছুটি ঘোষণা করে। পল্টনের শ্রমিক জনসভায় আওয়ামী লীগ সভাপতি মওলানা ভাসানী বলেন, ‘ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য শ্রমিকদের সংঘবদ্ধ হতে হবে।’ ১৯৫৬ সালে শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আওয়ামী লীগও দলীয়ভাবে মে দিবস পালনে শামিল হয়। পরবর্তীতে ষাটের দশকের শেষ দিকে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে পরিচালিত আমাদের জাতীয় রাজনীতির মূলধারা আন্দোলনের সঙ্গে মে দিবস ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে যায়।
সত্তরের নির্বাচন ও একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শ্রমিক-কৃষক ও শ্রমজীবী জনগণের ব্যাপক ও নির্ভিক অংশগ্রহণ ছিল এরই ফসল। স্বাধীনতার পর দেশ যখন জাতীয় চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করেছে, তখন প্রথম মে দিবস ১৯৭২ পালন সামনে রেখে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। তিনি মে দিবস সরকারি ছুটি হিসেবে ঘোষণা করেন। এভাবে তিনি সৌহার্দ্য, একাত্মতা, ভ্রাতৃত্ববোধে সমুজ্জ্বল ও সর্বমানবের মিলনের চেতনায় লালিত মে দিবসকে তিনি জাতির ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে একাত্ম করে তোলেন। বাস্তবে যুগ যুগ ধরে শোষিত-বঞ্চিত জনতার স্বপ্ন তথা শ্রমজীবীদের অধিকার ও অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামী ঐতিহ্য ও সুমহান চেতনাকে তিনি জাতির চলার পথের পাথেয় করে তোলেন। তিনি যে বাঙালি জাতির নেতা হয়ে বিশ্বনেতা রূপে বিশ্বব্যাপী নন্দিত হয়েছিলেন, এটা ছিল এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

চার
প্রকৃত বিচারে জাতি হিসেবে আমরা রয়েছি ক্রান্তিলগ্নে, এনালগ অবস্থা থেকে ডিজিটালাইজেশনের যুগে উত্তরণের প্রাথমিক সময়কালে। আমাদের সৌভাগ্য বঙ্গবন্ধু-কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতি হিসেবে আমরা ওই যুগে প্রবেশের দুয়ারকে উন্মোচন করতে সক্ষম হয়েছি। দেশ এখন সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় নতুন যুগে প্রবেশের জন্য সংগ্রামে রত। ‘দিনবদল’ বা পরিবর্তনের মধ্যে যখন রয়েছে দেশ; তখন স্বাভাবিকভাবেই রাষ্ট্র ও সমাজ-জীবনের প্রান্তস্থিত ও শোষিত শ্রমিক-শ্রেণির ওপরেই চাপ ও দুর্ভোগ বেশি বাড়ছে। বর্তমানের শ্রমিক-কৃষকবান্ধব সরকার এই চাপ ও দুর্যোগ লাঘব করার জন্য অবিরত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গার্মেন্ট শ্রমিক ও রাষ্ট্রায়ত্ত কল-কারখানায় শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি যথাক্রমে ১ হাজার ৬৬২ টাকা থেকে ৮ হাজার টাকা এবং ৪ হাজার ১৫০ টাকা থেকে ৮ হাজার ৩০০ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। বন্ধ হওয়া ২৫টি জুট মিলের শ্রমিকদের চাকরির অবসায়ন সুবিধার আওতায় এনে প্রাপ্য বকেয়া, পেনশন ও আনুতোষিক এবং গ্রাচুইটির সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশ হারে প্রদান করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। যাতে এই অর্থ সঠিকভাবে প্রদান করা হয়, তা নিয়ে সরকারি মনিটরিং জোরদার করা হচ্ছে।
একটু খেয়াল করলেই অনুধাবন করা যাবে, ‘ডিজিটালাইজেশন’-এর যুগে প্রবেশের এই সময়কালে অতীত আমলের কল-কারখানা থাকছে না। এমনকি শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন তথা স্কপ, যে সংগঠনের ছিল কেবল ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে নেতৃত্ব নয়, জাতীয় আন্দোলনেও গৌরবময় ভূমিকা রেখেছিল, সেই ঐতিহ্যবাহী সংগঠনও বর্তমান সময়কালে তেমনভাবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। এর মধ্যে এসেছে রাক্ষুসী করোনা। তাতে উৎপাদন ও ব্যবসা-বাণিজ্য তথা স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। তাতে শ্রমজীবী মানুষের দুর্দশা-দুর্ভোগ বাড়ছে। সংগঠিত বা অর্গানাইজ শ্রমিকরা যেমন চাকরি হারাচ্ছেন বা বেকার হচ্ছেন, তেমনি অসংগঠিত বা আন-অর্গানাইজড শ্রমিকরা ব্যাপক হারে বেকার হচ্ছেন। নতুন কর্মসংস্থান যখন হুমকির সম্মুখীন বা সংকুচিত হচ্ছে। করোনার প্রথম ঢেউয়ের শুরুতেই সরকার উদ্যোগ নিয়ে ৫০ লাখ শ্রমিক-কর্মচারীর বেতন-ভাতা প্রদান অব্যাহত রাখতে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ ৮ হাজার ৬০০ টাকা বরাদ্দ করেছে।
এভাবে করোনা যুদ্ধ যখন বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার চালিয়ে যাচ্ছে, তখন সমুপস্থিত হয়েছে এবারের মে দিবস। কঠিন চ্যলেঞ্জ এখন যেমন সরকারের সামনে, তেমনি শ্রমিক ও শ্রমজীবী জনগণের জীবনেও। এক্ষেত্রে জাতীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কল-কারখানা ও ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মালিকপক্ষকেও সর্বাত্মকভাবে এগিয়ে এসে সহযোগিতার হাত সম্প্রসারণ করা ভিন্ন বিকল্প নেই। মানবতার জয়গান আজ সমবেত কণ্ঠে গাইতে হবে। দুর্যোগ মোকাবিলায় শ্রমিক-মালিক-সরকার-জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রয়াশ হচ্ছে এবারের মে দিবসের আহ্বান। মে দিবসের শহিদরা অমর। মে দিবসের মর্মবাণী ও চেতনা চিরঞ্জীব হোক। জয় বাংলা। জয় হোক বাংলার মেহনতি মানুষের।

লেখক : সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, উত্তরণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply