সাম্প্রদায়িকতা প্রতিরোধে সংস্কৃতি চর্চা

গোলাম কুদ্দুছ : বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারের এ যুগেও মানুষের অপ্রাপ্তি, মানবিক ও রাজনৈতিক সংকটের শেষ নেই। তবে বোধকরি মানুষের সবচেয়ে বড় সংকট হলো চিন্তা, শিক্ষা এবং সংস্কৃতির সংকট। ওসব সংকটের মূলে রয়েছে আবার রাজনীতি। চূড়ান্ত বিচারে রাজনীতিই রাষ্ট্র এবং সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং মানুষের কোনো কর্মই এর আওতা-বহির্ভূত নয়। সমকালীন বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক অপশক্তির উত্থান এবং সমাজে এর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াও রাজনৈতিক চিন্তা থেকে উৎসারিতÑ ধর্মের ভূমিকা এখানে গৌণ। যদিও যারা ধর্মকে তাদের রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চানÑ তারা এ বক্তব্য মানতে রাজি নন। সংক্ষিপ্তভাবে আলোচনা করে দেখি, আসলে ব্যাপারটা কী?
বাঙালির ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ঘটনা রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন এবং শ্রেষ্ঠ অর্জন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এ দুটো ক্ষেত্রেই ধর্মকে রাজনীতি এবং শোষণের হাতিয়ার হিসেবে অপব্যবহার করা হয়েছে। দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় পাকিস্তানের অধিকাংশ নাগরিকের মাতৃভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও বাংলাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার চক্রান্ত শুরু হয়। এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল প্রধানত বাঙালি ছাত্র, যুবক, প্রগতিশীল শিক্ষিত-সমাজ এবং সংস্কৃতিকর্মীরা। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ সরকার এবং তাদের অনুসারীরা বাংলাকে হিন্দুদের ভাষা এবং রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে ভারত ও হিন্দুদের চক্রান্ত বলে মানুষকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছিল। পাকিস্তানি শাসনামলের ২৩ বছরই পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠী এবং তাদের সহযোগিরা বাঙালিদের শোষণ এবং দাবিয়ে রাখার জন্য মুসলমানদের পবিত্র ধর্ম ইসলামকে ব্যবহার করেছে। ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নিপীড়নকারী দখলদার পাকিস্তানকে ইসলাম ধর্মের সমার্থক হিসেবে ব্যবহারের একটি অপচেষ্টা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। এদেশে বসবাসকারী ইসলামের নাম ব্যবহারকারী কতিপয় রাজনৈতিক দল সেদিন ধর্মরক্ষার নামে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণহত্যা, নারীধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং লুটপাটে মেতে উঠেছিল। নারী ধর্ষণকে ‘মুতা ম্যারেজ’ নামে জায়েজ বলে ফতোয়া দিয়েছিল। ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ একই গোষ্ঠী দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের দুষ্টকর্ম সেদিন বিশ্ববিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। এই অভিজ্ঞতা এবং বাস্তবতার আলোকে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। একাত্তরের গণহত্যায় অংশগ্রহণকারী মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলাম, নেজামে ইসলামসহ অন্যান্য ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল বাতিল করা হয়। একাত্তরের গণহত্যায় জড়িতদের বিচারের জন্য করা হয় ‘দালাল আইন’।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ১৯৭২ সালের ৪ নভেম্বর বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান অনুমোদিত হয়। বাহাত্তরের সংবিধান নামে পরিচিত এ সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতাকে অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ঘোষণা করা হয়। অর্থাৎ- বাংলাদেশ হবে এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে সকল মানুষ সমান অধিকার নিয়ে বসবাস করবে। এখানে ধর্মের নামে মানুষে মানুষে বিভাজন, নির্যাতন, নিপীড়ন করা যাবে না। কিন্তু আমাদের জাতির দুর্ভাগ্য, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী শক্তি এবং ক্ষমতালোভী চক্রের ষড়যন্ত্রে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ নিহত হন। তার দু-কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা সেদিন বেলজিয়ামে থাকায় প্রাণে রক্ষা পেয়েছিলেন। ক্ষমতা দখলকারী খুনিচক্রের মূল উদ্দেশ্যই ছিল একাত্তরের পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণ এবং বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ভাবাদর্শে পরিচালিত করা। ক্ষমতা দখলকারী খন্দকার মোশতাক, জেনারেল জিয়া, জেনারেল এরশাদ এবং খালেদা জিয়া একই নীতিতে রাষ্ট্র পরিচালনা করেন। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এই ২১ বছরে বাংলাদেশের সংবিধান থেকে চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতিÑ গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে কেটে-ছিঁড়ে বিদায় করা হয়। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার যাতে করা না যায়, তার জন্য কুখ্যাত ‘ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ’ জারি করা হয়। ১৯৭৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর দালাল আইন বাতিল করে যুদ্ধাপরাধীদের কারাগার এবং অভিযোগ থেকে মুক্তি দেওয়া হয়। বিদেশে পলাতক খুনিদের বাংলাদেশে আসার সুযোগ করে দিয়ে রাজনীতিতে পুনর্বাসিত করা হয়। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি চালু এবং চিহ্নিত স্বাধীনতাবিরোধীদের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী নির্বাচিত করা হয়। বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুরস্কৃত করা হয়। সংবিধানের অসাম্প্রদায়িক চরিত্র বিসর্জন দিয়ে ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম’ যুক্ত করা হয়। দীর্ঘ ২১ বছর স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক অপশক্তি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ সহযোগিতা পেয়ে নিজেদের আবার সংগঠিত করে নেয়। সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে অপব্যবহার করে তারা মুক্তিযুদ্ধ এবং প্রগতিশীল শক্তির বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার শুরু করে। এতদ্বসত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাঙালি আবার ঘুরে দাঁড়ায়। ১৯৯৬ সালে গণরায়ে ক্ষমতাসীন হবার পর বাংলাদেশকে আবার মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের পক্ষে পরিচালিত করবার কঠিন সংগ্রামে অবতীর্ণ হন বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা। প্রতিটি পদে পদে ষড়যন্ত্র ও জীবনহানির আশঙ্কা। কিন্তু তিনি তো বঙ্গবন্ধুর কন্যাÑ দমে যাবার পাত্র নন। দেশব্যাপী গড়ে ওঠা সাম্প্রদায়িক অপশক্তির ভিত গুঁড়িয়ে দিতে ধীর পদক্ষেপে অগ্রসর হন তিনি। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার, একাত্তরের মানবতা-বিরোধী অপরাধের সাথে যুক্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার তার অনমনীয় সাহসী অবস্থানের পরিচয় বহন করে। দেশি-বিদেশি নানামুখী ষড়যন্ত্র এবং অযাচিত হস্তক্ষেপ তাকে সঠিক সিদ্ধান্ত থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
দীর্ঘ আলোচনা করার অবকাশ এ নিবন্ধে নেই। আমরা লক্ষ করছি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ এক অভূতপূর্ব সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলছে। বিশ্বে বাংলাদেশ আজ শুধু সমাদৃতই হচ্ছে নাÑ উন্নয়ন এবং সামাজিক ভারসাম্যের এক মডেল হিসেবে অনুসৃত হচ্ছে। সরকারের সাফল্যে ঈর্ষান্বিত গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবিরোধী অপশক্তি এবং তাদের দোসররা কখনও গণতন্ত্র আবার কখনও ধর্মের নামে মানুষকে বিভ্রান্ত করে হারানো জমি ফিরে পেতে নানাবিধ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। এসব ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে নানা জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থান, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বকে হত্যার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত গ্রেনেড হামলা, যশোরে উদীচীর সম্মেলনে বোমা বিস্ফোরণ, রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে গ্রেনেড হামলা, দেশের ৬৩ জেলায় একইসাথে বোমা হামলা এবং হলি আর্টিজানসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের সশস্ত্র অপতৎপরতা জাতি প্রত্যক্ষ করেছে।
২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশ ও নৈরাজ্য সৃষ্টি, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য নির্মাণ নিয়ে উত্তেজনা তৈরি, স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে জ্বালাও-পোড়াও ও সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস সবাইকে ভাবিয়ে তুলেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং পুনরাবৃত্তি রোধে কী কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়Ñ এ নিয়ে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা ও মতভেদ রয়েছে। কেউ বলছেন- আইনের কঠোর প্রয়োগ, কেউ বলছেনÑ রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে। আবার অনেকে বলছেনÑ সংস্কৃতির জাগরণ দিয়ে একে পরাস্ত করতে হবে।
আমি মনে করি, কোনো একক বা একপাক্ষিক প্রচেষ্টায় এই অপশক্তিকে প্রতিরোধ করা যাবে না। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে রাষ্ট্র এবং সমাজকে অগ্রসর হতে হবে। যারা রাষ্ট্রের সংবিধান, আইন, নিয়মনীতি ভঙ্গ করে জ্বালাও-পোড়াও, হত্যা, সন্ত্রাস চালাবেÑ তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই রাষ্ট্রকে আইনের কঠোর পথে এগুতে হবে। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের শৈথিল্য বা পক্ষপাতমূলক আচরণ সমাজে নৈরাজ্যকে উসকে দেবে।
সংবিধান হলো রাষ্ট্র পরিচালনার ভিত্তি। আমাদের সংবিধানের প্রতিটি শব্দের সাথে যুক্ত আছে লক্ষ শহিদের রক্ত আর স্বজন হারানো মায়েদের অশ্রুজল। বাংলাদেশের রাজনীতি হবে আমাদের সংবিধান এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উৎসারিত। রাষ্ট্রীয় মূলনীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ পরিপন্থী রাজনৈতিক দল গঠন এবং দলীয় কর্মসূচি প্রণয়ন দেশের সংবিধান-বিরোধী। দেশের সকল রাজনৈতিক দলকেই দেশের সংবিধান অনুযায়ী নীতি-আদর্শ ও কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। গণতন্ত্রের বাইরে সকল ধরনের সশস্ত্র বা জঙ্গি তৎপরতা নিষিদ্ধ কর্ম হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। গণতন্ত্রই সরকার পরিবর্তনের একমাত্র সাংবিধানিক পদ্ধতি- রাষ্ট্র এবং সমাজে এ সত্য প্রতিষ্ঠিত করতেই হবে।
তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- আমাদের তরুণদের একাংশ কেন পশ্চাদপদ অবৈজ্ঞানিক চিন্তাকে ধারণ করছে, কেন তারা জঙ্গিবাদের সাথে যুক্ত হচ্ছে? সবাই তো আর ক্ষমতা কিংবা অর্থবিত্তের জন্য এসব চিন্তাকে গ্রহণ বা জঙ্গিবাদের সাথে যুক্ত হচ্ছে না। আমরা কেন ব্যর্থ হচ্ছি আমাদের সন্তানদের অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিবাদী চিন্তায় গড়ে তুলতে? এ-কথা সত্য যে, বর্তমানে বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ এক অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উন্নয়নের ধারায় এগিয়ে চলছে। দারিদ্র্য বিমোচন, নারী উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি বৃদ্ধিকরণ, শিক্ষা, কৃষি, শিল্প, যোগাযোগ অবকাঠামো ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ সকল ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি আজ বিশ্বনন্দিত। এতদ্বসত্ত্বেও আমরা উন্নয়নের ধারাকে টেকসই করার ক্ষেত্রে আশঙ্কামুক্ত নই। কোনো কোনো মহলের সমাজে হিংসা এবং অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। আর সে-কারণেই আমরা আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কামুক্ত নই। শিশু এবং কিশোরদের মনোজগতে মানবিকবোধ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলার আবশ্যকতা সবাই আজ অনুভব করছেন। প্রশ্ন হলো, কোন পথে এগোলে আমরা এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে পারব?
সচেতনমহলের প্রধান বক্তব্য হচ্ছে, শিক্ষা এবং সংস্কৃতিই পারে তরুণদের মনোজগতে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার প্রাণশক্তি জোগাতে।

শিক্ষা-ব্যবস্থা
আজ প্রয়োজন আমাদের শিক্ষা-ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো। পাঠ্যপুস্তকের সর্বস্তরে জ্ঞান, মানবিক বোধ, অসাম্প্রদায়িক চেতনা, প্রগতির আদর্শ, বিজ্ঞানচেতনা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। পাঠ্যক্রমে নৈতিকতার শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নিজ নিজ ধর্মশিক্ষার ব্যবস্থাও থাকতে হবে। বার্ষিক শিক্ষাক্রমে সংস্কৃতি চর্চা ও খেলাধুলাকে যুক্ত করতে হবে। শিশুদের মনোবিকাশের জন্য বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির সাথে পরিচয় ঘটানোর লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের শিক্ষাক্রমে নানা উদ্যোগ প্রত্যক্ষ করা যায়। ইসলাম ধর্মের তীর্থভূমি সৌদি আরবে সম্প্রতি এ ধরনের একটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ২৩ এপ্রিল ২০২১ ভারতের কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক প্রতিদিন পত্রিকার সংবাদ থেকে জানা যায় যে, সৌদি প্রিন্স মহম্মদ বিন সালমানের পরিকল্পনায় দেশটির স্কুল শিক্ষা পাঠ্যসূচিতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে ভিশন ২০৩০-এ। এতে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইতিহাস সংস্কৃতি সম্পর্কে ছাত্র-ছাত্রীদের সম্যক ধারণা দেওয়া হবে। ইতোমধ্যে সৌদি আরবের রামায়ণ ও মহাভারত অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। সেখানে ইসলাম ধর্ম ছাড়াও হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ অন্যান্য ধর্মীয় বিষয় তাদের পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বাংলাদেশে বিরাজমান পরিস্থিতিতে শিক্ষা-ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সময়ের দাবি। এ লক্ষ্যে- একটি একমুখী শিক্ষা-ব্যবস্থা চালু করতে হবে। ত্রিমুখী শিক্ষা-ব্যবস্থা আমাদের সমাজে বৈষম্য এবং চিন্তার ভিন্নতা তৈরি করছে, যা শিশুদের মানস গঠনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। একটি পরিবারের তিন সন্তান যদি জাতীয় শিক্ষা পাঠক্রম, ইংরেজি মাধ্যম এবং মাদ্রাসায় শিক্ষালাভ করেÑ তবে পরিবারে তিন ধরনের মানসিকতাসম্পন্ন প্রজন্ম তৈরি হয়। বেড়ে ওঠার এই সন্ধিক্ষণেই পরিবারের সংহতি বিপন্ন হবার অবস্থা দেখা দেয়। এক পরিবারে তিন চিন্তা, তিন সংস্কৃতির প্রভাব সমাজে অস্থিরতা তৈরি করে। কেউ ইংরেজি শিখতে চাইলে জাতীয় শিক্ষা পাঠ্যক্রমের ইংরেজি ভার্সনের স্কুল থাকতে পারে। কিন্তু শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো শিক্ষায়তন চালু থাকা সমীচীন হবে না। আমরা সব ধরনের স্কুল এবং মাদ্রাসায় জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সংগীত পরিবেশনের কথা বলছি; কিন্তু তা কার্যকর করবার ক্ষেত্রে কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই।

সংস্কৃতি চর্চা
সাম্প্রদায়িকতার বিপরীতে একটি উদার মানবিক বোধসম্পন্ন প্রজন্ম গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সংস্কৃতির বড় ভূমিকা রয়েছে। আমাদের রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্যপূর্ণ বাঙালি সংস্কৃতি। মতান্তরে প্রায় ৩ হাজার বছরের গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের বিশাল প্রান্তরজুড়ে বাঙালি সংস্কৃতির নানা শাখা-প্রশাখা পল্লবিত হয়েছে। নদীর কলতান, পাখির কূজন, দুপুরের কাঠফাটা রোদ্দুর, বর্ষার কাদামাটি বাঙালির মানস গঠনে মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। বারো মাসের তেরো পার্বণের এ অঞ্চলে মানুষে মানুষে মেলবন্ধনের যে ঐতিহ্য তৈরি হয়েছে তার মূলে রয়েছে নীতি-নৈতিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং আরও কত কী। ভালো লাগে ভাবতে যে, বাঙালির মানসগঠনে আমাদের কবি-লেখকÑ বিশেষ করে লোককবিদের ভূমিকাও ছিল বেশ গুরুত্বপূর্ণ। ছোটবেলায় আমরা বাল্যশিক্ষায় পড়েছি কত নীতি-আদর্শ, জীবনচলার পথরেখা। প্রাসঙ্গিক দু-একটি উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। মদনমোহন তর্কালঙ্কার লেখেনÑ

সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি,
সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি।
আদেশ করেন যাহা মোর গুরুজনে,
আমি যেন সেই কাজ করি ভালো মনে।
ভাইবোন সকলেরে যেন ভালোবাসি
একসাথে থাকি যেন সবে মিলেমিশি।

কুসুমকুমারী দাশ লেখেন-

আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।

বড়– চণ্ডীদাস তো ঘোষণাই করলেন-

সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই।

যে উদ্ধৃতিগুলো দেওয়া হলো, তার মূলে রয়েছে- মানুষের চেতনা, ঐক্য ও নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি ও কর্তব্য নির্ধারণ। জীবন চলার সাথে সংশ্লিষ্ট চিন্তাকে এগিয়ে নিতে কবি বলেন- ‘দশে মিলি করি কাজÑ হারি জিতি নাহি লাজ’। বাঙালির এই চেতনাবোধকে আরও একধাপ এগিয়ে নিয়ে চারণকবি গুরুসদয় দত্ত বলেন-

‘বিশ্বমানব হবি যদি, কায়মনে বাঙালি হ।’

এর তাৎপর্য হলো, একজন বাঙালি যদি তার সকল বৈশিষ্ট্য নিয়ে নিজেকে গড়ে তুলতে পারে, তবে সে বিশ্বমানবের অংশীদার হতে পারবে। এই বিশ্বমানবে থাকবে না জাত-পাত আর ধর্মের বাড়াবাড়ি। শোষণ-বঞ্চনা আর পরাধীনতার শেকল ভেঙে আপন মনে সে উড়ে বেড়াবে বিশ্বব্রহ্মা-ের সর্বত্র। মানুষের ঐক্য, মননশীলতা আর মানবিক বোধ ভরিয়ে দেবে গ্রাম-গঞ্জ-শহরের প্রতিটি প্রান্তর। বাঙালি সংস্কৃতির মূলে রয়েছে ঐক্য ও সম্প্রীতি। হাজার বছর ধরে এ গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের প্রতিটি প্রান্তরে আয়োজিত বাংলা নববর্ষ, চৈত্র সংক্রান্তি, পৌষমেলা, বসন্ত উৎসবসহ হাজারো আয়োজনে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, মুসলমান মিলেমিশে একাকার হয়েছে। জাত-পাত-ধর্মের ভেদ নিয়ে কখনও মাথা ঘামায়নি মানুষ। সব ধর্মের উৎসবে অংশগ্রহণ করেছে প্রতিটি বাঙালি। বাঙালির শাশ্বত ঐক্যে যারা ফাটল ধরিয়ে দেশকে নৈরাজ্যের দিকে নিয়ে যেতে চায়Ñ তাদের বিরুদ্ধে সংস্কৃতির এই শক্তি নিয়ে রুখে দাঁড়াতে হবে।
এখন প্রশ্ন হলোÑ সংস্কৃতির এই শক্তিকে জাগাব কীভাবে? প্রচলিত ধারার সংস্কৃতি চর্চা দিয়ে কি তরুণ প্রজন্মকে অসাম্প্রদায়িক মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করা সম্ভব? দেশের আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিশ্বায়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের এ যুগে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগহীন সংস্কৃতি চর্চা কখনও কাক্সিক্ষত প্রত্যাশা পূরণ করবে না। আমাদের দেশের সংস্কৃতি চর্চার মূলধারাই ব্যক্তি উদ্যোগ, ভালোলাগা এবং শিল্পের প্রতি অনুরাগ। অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রকাশ আমরা প্রত্যক্ষ করি। কিন্তু সার্বিক বিবেচনায় সমাজের প্রতি দায়বদ্ধ সংস্কৃতিকর্মীদের একার পক্ষে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি, পশ্চাদপদ চিন্তা, সামাজিক অনাচার এবং দুর্বৃত্তায়নের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক জাগরণ গড়ে তোলা প্রায় অসম্ভব। সে-কারণে সংস্কৃতির বিকাশে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা সকল সংকটে সংস্কৃতির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিÑ কিন্তু তার জন্য রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগে আগ্রহী নই। অনুদান অনেকটা অক্সিজেনের মতোÑ এ দিয়ে সংস্কৃতিকে বেশিদূর এগিয়ে নেওয়া যাবে না। স্থায়ী বিনিয়োগের প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব সহকারে ভাবতে হবে। এক্ষেত্রে কিছু আশু করণীয় সম্পর্কে আলোকপাত করতে চাই।

১. গ্রাম থেকে রাজধানী পর্যন্ত সংস্কৃতি চর্চাকে জোরদার করতে হলে প্রথমত উপজেলাকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। প্রত্যেক উপজেলায় ‘শিল্পকলা কেন্দ্র’ গড়ে তুলতে হবে। ওখানে একটি মিলনায়তন, কয়েকটা মহড়া কক্ষ, প্রশিক্ষণ কক্ষ, লাইব্রেরি থাকবে। তবলা, হারমোনিয়াম এবং আনুষঙ্গিক বাদ্যযন্ত্র থাকবে। উপজেলায় দুটি বড় বাজার-সংলগ্ন স্থানে ‘উন্মুক্ত মঞ্চ’ নির্মাণ করতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে একজন শিল্পকলা অফিসার নিয়োগ দিতে হবে। প্রত্যেক উপজেলায় সংগীত, নৃত্য, আবৃত্তি, নাটক ও চারুকলার স্থায়ী প্রশিক্ষক দিতে হবে। উপজেলা এবং গ্রাম পর্যায়ে সক্রিয়, অর্ধসক্রিয় এবং নিষ্ক্রিয় সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহকে যথাযথ পরিচর্যা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সক্রিয় সংগঠনে পরিণত করতে হবে। প্রত্যেক গ্রামে গড়ে ওঠা ক্লাবসমূহকে তালিকাভুক্ত করে এগুলোকে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সংগঠনে পরিণত করার উদ্যোগ নিতে হবে। এ সমস্ত ক্লাবের মাধ্যমে গ্রামীণ খেলাধুলা ও মেলার আয়োজন করা যেতে পারে। সাংস্কৃতিক সংগঠনসমূহ বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস, শহিদ দিবস, রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তী, বাংলা নববর্ষসহ নানা ধরনের উৎসবের যাতে আয়োজন করতে পারে, সে-ব্যাপারে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক সহায়তা প্রদান করবে। ক্লাবগুলোর ক্ষেত্রে ক্রীড়া মন্ত্রণালয় দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারবে।
বছরব্যাপী গ্রামপর্যায়ে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন থাকলে মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম, সম্প্রীতি এবং মানবিক বোধ জাগ্রত হবে ও নতুন নতুন শিল্পী তৈরি হবে।
২. প্রত্যেক গ্রামে অন্তত একটি করে শিশু সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। ‘শিশুরা জাতির ভবিষ্যৎ’- এ-কথা মাথায় রেখে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অসাম্প্রদায়িক, মানবিক ও বিজ্ঞানচেতনায় অগ্রসর করতে হলে শিশু সংগঠনের কোনো বিকল্প নেই। এ লক্ষ্যে বিদ্যমান জাতীয়ভিত্তিক শিশু সংগঠনকে সরকারি সহায়তার আওতায় আনতে হবে। নতুন নতুন শিশু সংগঠন গড়ে তোলার জন্য বিভিন্নভাবে উদ্যোগ নিতে হবে। পশ্চাদপদ চিন্তা, অপসংস্কৃতি এবং মাদকাসক্তিতে তরুণদের রক্ষার জন্য এসব উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করি।
৩. জেলা পর্যায়ে একাধিক আধুনিক মিলনায়তন, মুক্তমঞ্চ, মহড়া ও প্রশিক্ষণ কক্ষ, লাইব্রেরির ব্যবস্থা করতে হবে। নাটক, সংগীত, নৃত্য, চারুকলা ও আবৃত্তির স্থায়ী প্রশিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। জেলা পর্যায়ে চারুকলা প্রদর্শনীর জন্য আর্ট গ্যালারি এবং সুস্থধারার চলচ্চিত্র ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনের জন্য মিনি অডিটরিয়াম নির্মাণ করা যেতে পারে।
৪. জেলা পর্যায়ে বাংলা একাডেমি’র শাখা গঠন করা যেতে পারে। জেলা পর্যায়ে বইমেলা আয়োজন, বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বই বিক্রি ছাড়াও এই একাডেমি হয়ে উঠবে জেলা পর্যায়ের কবি-লেখক, গবেষকদের মিলনকেন্দ্র। স্থানীয় ইতিহাস, ঐতিহ্য, লোকশিল্পের বিকাশ এবং গবেষণা আরও সহজতর করার ক্ষেত্রে জেলা বাংলা একাডেমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। জেলা পর্যায়ে বাংলা একাডেমিকে সম্প্রসারিত করা হলে কেন্দ্রীয়ভাবেও চাপ কমবে।
৫. লুপ্তপ্রায় যাত্রাশিল্পকে বেনিয়াদের হাত থেকে রক্ষা এবং ঐতিহ্যকে লালন করতে হলে রাজধানীসহ প্রত্যেক জেলায় একটি করে সরকারি উদ্যোগে যাত্রাপ্যান্ডেল নির্মাণ করতে হবে। ফলে যাত্রাশিল্পীরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে। যাত্রাশিল্পের অযাচিত অশ্লীলতা দূর করতে হলে অনুমতি গ্রহণের প্রথা বাতিল এবং দল তালিকাভুক্তির পদ্ধতি রহিত করতে হবে। কেউ অশ্লীলতা বা উচ্ছৃঙ্খলতা করলে প্রচলিত আইনেই তার বিচারের বিধান রয়েছে।
বিস্মিত হতে হয়, যাত্রা মঞ্চায়নের জন্য আজও বাংলাদেশে সরকারি উদ্যোগে একটি স্থায়ী প্যান্ডেলও নির্মিত হলো না। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে বাংলাদেশে একদিনের জন্যও যাত্রা প্রদর্শনী বন্ধ থাকেনি। বঙ্গবন্ধু তার একনিষ্ট কর্মী যাত্রাপাগল নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের গিয়াসউদ্দিনের অনুরোধে তার প্রতিষ্ঠিত যাত্রাদলের নাম দিয়েছিলেন ‘আজাদ অপেরা’। ২০১৬ সালে গিয়াসউদ্দিনের মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত এ যাত্রাদলটি সক্রিয় ছিল।
৬. ব্যাপকভিত্তিক সাংস্কৃতিক কর্মকা- পরিচালনা এবং ‘সাংস্কৃতিক জাগরণ’ গড়ে তোলার জন্য জাতীয়ভিত্তিক সাংস্কৃতিক ফেডারেশনসমূহের সদস্যদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় এ কাজ বেশিদূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। গ্রাম থেকে রাজধানী পর্যন্ত একটি সাংস্কৃতিক জাগরণ গড়ে তোলার লক্ষ্যে একটি সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সরকারকে প্রাতিষ্ঠানিক এবং আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করতে হবে। এটিকে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্মাণের বিনিয়োগ হিসেবে ভাবতে হবে।
৭. দেশব্যাপী সাংস্কৃতিক কর্মকা- পরিচালনার প্রয়োজনে জাতীয়ভিত্তিক সাংস্কৃতিক ফেডারেশনসমূহের স্থায়ী অফিস নির্মাণের জন্য ঢাকা শহরের সুবিধাজনক স্থানে সরকারি জমি বরাদ্দ দেওয়া আবশ্যক। যেমনিভাবে মতিঝিলে ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেওয়া হয়েছে।
৮. ঢাকা শহরের বিভিন্ন অঞ্চলে আধুনিক মিলনায়তন নির্মাণ করা জরুরি। ভাবতে অবাক লাগে, প্রায় ৫০ লাখ মানুষের নিবাস মিরপুরে আজ পর্যন্ত একটি মিলনায়তনও নির্মিত হয়নি। এত অপ্রতুল সংস্কৃতি চর্চার সুযোগ-সুবিধা দিয়ে কখনও সাম্প্রদায়িকতাকে মোকাবিলা করা যায় না।
৯. সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং সংস্কৃতিসেবীদের প্রদত্ত বার্ষিক অনুদানের পরিমাণ খুবই কম। সারাদেশের ১০ সহস্রাধিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের মধ্যে মাত্র ১ হাজার সংগঠন অনুদানের আওতাভুক্ত। অনুদানের পরিমাণ বার্ষিক ১০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৬০ হাজার টাকা। অসচ্ছল শিল্পীদের অবস্থা আরও খারাপ। অনুদান পায় প্রায় দেড় হাজার শিল্পী। মাসিক মাত্র ১ হাজার ২০০ থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার টাকা। সারাদেশে বাউলশিল্পী, লোকশিল্পী, যাত্রাশিল্পী, যন্ত্রশিল্পী, কারুশিল্পীসহ বিভিন্ন ধারার অন্তত ২০ হাজার শিল্পী রয়েছে, যারা অনুদান পেতে পারে।
সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং অসচ্ছল শিল্পীদের অনুদানের পরিমাণ কয়েকগুণ বৃদ্ধি করতে হবে।
১০. জাতীয় বাজেটে সংস্কৃতির অংশীদারিত্ব কখনও ০.১০ শতাংশের বেশি হয়নি। যদি সত্যি সত্যি আমরা সংস্কৃতির শক্তি দিয়ে সকল অপশক্তিকে প্রতিরোধ করতে চাই, তাহলে জাতীয় বাজেটে এর প্রতিফলন থাকতে হবে। জাতীয় বাজেটের ১ থেকে দেড় শতাংশ সংস্কৃতি ক্ষেত্রে বরাদ্দ অত্যাবশ্যক।

দেশে বিরাজমান পরিস্থিতিতে সকল জঙ্গিবাদ, অপসংস্কৃতি, মাদকাসক্তি, সামাজিক অনাচার, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় প্রতিরোধ করে একটি মানবিক, অসাম্প্রদায়িক, প্রগতিবাদী রাষ্ট্র নির্মাণে আমাদের সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। শিক্ষা এবং সংস্কৃতি যমজ ভাইয়ের মতো তরুণ প্রজন্মকে লালন করবে। তবে রাষ্ট্রকে সঠিক নির্দেশনায় এগিয়ে আসতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ভিত্তিতে রাজনৈতিক শক্তির দৃঢ় অবস্থান সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিম-লকে সঠিক পথে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করবে নিঃসন্দেহে। আমরা বিশ্বাস করি, বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার নির্লোভ রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দৃঢ়তা আমাদের সুন্দর আগামীর পথে পরিচালিত করবে।

লেখক : গবেষক ও সভাপতি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply