ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করতে প্রয়োজন কওমি মাদ্রাসার সংস্কার

ড. নূহ-উল-আলম লেনিন: নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে সর্বশেষ মার্কিন সেনা স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করবে। জো বাইডেন এই সিদ্ধান্ত নিলেও সেনা প্রত্যাহারের নীতিগত সিদ্ধান্ত ‘পাগলা’ ট্রাম্পও গ্রহণ করেছিলেন। ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুযুধান কয়েকটি দেশ থেকে তারা সেনা প্রত্যাহার করেছেন।
অন্য দেশে যা-ই হোক আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহারের পর ওই দেশটিতে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে কি? পশ্চিমা বিশেষজ্ঞদের অনেকেই এই প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। আফগানিস্তানে উগ্র মৌলবাদী তালেবানরা আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে কি? দিন শেষে এ-কথা প্রমাণিত হলো, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক আগ্রাসী নীতি, নৈতিকভাবে পরাস্ত হলো। প্রশ্ন হচ্ছে, অতঃপর কী? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে।
কিন্তু উদ্বেগজনক হলো, কেবল জিহাদ বা ইসলামি রাষ্ট্র কায়েমের জন্য ধর্মান্ধ-মৌলবাদী শক্তির সশস্ত্র কর্মকা-ই নয়; বরং জঙ্গিবাদী না হয়েও দেশে দেশে ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের ক্রমবর্ধমান বিপদ। পাকিস্তানে তো বটেই; প্রতিবেশী ভারতেও হিন্দুত্ববাদের উত্থান, শুধু সেই দেশটির জাতীয় ঐক্য, স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকেই হুমকির মধ্যে ফেলে দেবে না, ওর প্রভাব আমাদের দেশকেও রেহাই দেবে না।
সস্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার জিরো টলারেন্সের নীতি বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়েছে। একেবারে শেকড়শুদ্ধ উপড়ে ফেলা দুরূহ হলেও জঙ্গিবাদ এখন আর প্রধান বিপদ না। কোনো দেন-দরবার বা আলাপ-আলোচনা করে জঙ্গি তৎপরতা বন্ধ হয়নি। জিরো টলারেন্সে কার্যকর নীতি-পদক্ষেপই জঙ্গিবাদ দমনে ফলপ্রসূ হয়েছে। জঙ্গিবাদ অবদমিত হলেও ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের বিপদ কেটে যায়নি। সাম্প্রতিককালে আমরা তার কিছু বহিঃপ্রকাশ দেখলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, চট্টগ্রাম এবং নারায়ণগঞ্জে। দৃশ্যত ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরের প্রতিবাদে ‘হেফাজতে ইসলাম’ বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর হামলা, সরকারি স্থাপনায় হামলা-অগ্নিসন্ত্রাসের তা-ব ঘটিয়েছে। পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুড়তে হয়েছে। কয়েকজনের প্রাণহানি ঘটেছে। সরকার কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে।
দৃশ্যত হেফাজতে ইসলাম গড়ে উঠেছিল কওমি মাদ্রাসার শিক্ষকদের একটি অরাজনৈতিক প্লাটফরম হিসেবে। কিন্তু বাস্তবে হেফাজতে শামিল হয়েছিল বেশ কয়েকটি ধর্মব্যবসায়ী ইসলামি দল। মুখে শান্তির কথা বললেও ওই দলগুলোর লক্ষ্যের অভিন্নতা হলো জিহাদ করা। জামাত ও অন্য ফেতনার ধর্মীয় দলগুলোর সাথে হেফাজতের মৌলিক সাদৃশ্য হলো, হেফাজতিরা ও কওমি মাদ্রাসাগুলো বাংলাদেশকে স্বীকার করে না; তারা জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সংগীত গায় না। হেফাজতিরা সংবিধান মানে না, তারা কোনো ভিন্নমতকে স্বীকার করে না। ভিন্নমতের আলেম মাশায়েখ এবং ইসলামের অনুসারীদের তারা মুরতাদ, মুশরিক, নাস্তিক বলে বিদ্বেষ ছড়ায়। হেফাজতিরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকে মানে না। অরাজনৈতিক প্ল্যাটফরম বললেও হেফাজতে ইসলাম ক্রমেই রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে মাঠে নামছে। পেশাগত সংগঠনের গ-ি পেরিয়ে এটি হয়ে উঠছে রাজনৈতিক সংগঠন। এটা সহজেই অনুমেয় যে, এই হেফাজতের পেছনে দেশি-বিদেশি শক্তির মদত রয়েছে। বিশেষত গণবিচ্ছিন্ন বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী সুকৌশলে এই একদেশদর্শী রক্ষণশীল মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্রদের ‘ইসলাম রক্ষার’ নামে সরকার এবং মূলধারার সেকুলার রাজনীতির মুখোমুখি দাঁড় করাচ্ছে। তার প্রত্যক্ষ প্রমাণ আমরা পেয়েছিলাম ‘যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের সময় গণজাগরণ মঞ্চের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে দেশে এক সর্বাত্মক রাজনৈতিক মঞ্চ সৃষ্টির অপচেষ্টার মধ্যে। সরকার হেফাজতকে দুভাবেই মোকাবিলা করেছে। আইনি ব্যবস্থা ছাড়াও জামাত-বিএনপির পাতা ফাঁদ থেকে হেফাজতকে বের করে আনার নানা কৌশলও গ্রহণ করেছিল।
কিন্তু অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, ‘কয়লা ধুলে ময়লা যায় না’Ñ এই আপ্তবাক্যই সত্যি প্রমাণিত হলো। এ-কথা এখন সুস্পষ্ট, কওমি মাদ্রাসার ওই কয়েক হাজার শিক্ষক তথাকথিত পীর মাশায়েখগণ ইসলাম ধর্মের সুরক্ষা তো দূরের কথা, তারা তাদের কার্যকলাপ দিয়ে শান্তির ধর্ম ইসলামকে কলঙ্কিত করছে। এই অপশক্তি ধর্ম ব্যবসা থেকে ইসলামের মর্মবাণীকে রক্ষা করতে হলে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
অতীতে দেশভাগের আগে দেওবন্দ ঘরানার রক্ষণশীল মুসলমানদের উদ্যোগে কওমি মাদ্রাসা স্থাপন ও সংগঠন গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। দেওবন্দ ঘরানা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল। এটা ছিল ইতিবাচক দিক। অন্যদিকে আধুনিক শিক্ষা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে কেবল ধর্মীয় শিক্ষায় সীমাবদ্ধ থাকায় অর্ধশিক্ষিত মোল্লা মৌলবিরা জাতীয় মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তবে কওমি ধারার আলেমগণ কর্মমুখী শিক্ষা থেকে দূরে থাকলেও সাধারণভাবে তারা রাজনীতির সাথে দূরত্ব রেখেই চলত। ফলে অনেক ধর্মপ্রাণ এবং সেকুলার রাজনীতির অনুসারী মুসলমান ও কওমি মাদ্রাসা স্থাপন ও এর পৃষ্ঠপোষকতা করতে এগিয়ে আসেন। কওমি মাদ্রাসার এই ঐতিহ্যবাহী ভূমিকা এখন সংকোচিত হয়ে আসছে। অতীতে রাষ্ট্রের ধার না ধেরেই কওমি মাদ্রাসাগুলো চালু ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কওমি মাদ্রাসাগুলো রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধাও গ্রহণ করছে। হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের একটি দিক হলো, তারা কওমি মাদ্রাসার গ্রাজুয়েশন ও পোস্ট গ্রাজুয়েশনের স্বীকৃতি আদায় করেছে। বর্তমান সরকার নমনীয় হয়ে একদিকে যেমন তাদের স্বীকৃতি দিয়েছে, অন্যদিকে কওমি মাদ্রাসাকেও অবশ্য পালনীয় রাষ্ট্রীয় বাধ্যবাধকতার মধ্যে আনার চেষ্টা হচ্ছে। যতই আমরা একমুখী শিক্ষার দাবি জানাই, বাংলাদেশের বাস্তবতা হচ্ছে ইচ্ছে করলেই কওমি মাদ্রাসাকে সাধারণ শিক্ষার সাথে আপাতত একীভূত করা যাবে না। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন কোনো শিক্ষা-ব্যবস্থা চলতে পারে না। রাষ্ট্র যদি কওমি মাদ্রাসা থেকে পাস করা কোনো যুবককে সরকারি চাকরির সুযোগ দিতে চায়, তাহলে তাদের রাষ্ট্রের আইন, রীতিনীতির প্রতিও আনুগত্য থাকতে হবে।
মূল সমস্যা হচ্ছে কওমি মাদ্রাসাকে যারা তাদের আয়-রোজগারের পথ হিসেবে গ্রহণ করেছে, তারা কোনো নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে যেতে চায় না। কারণ নিয়মশৃঙ্খলা মানতে গেলে তাদের ‘ধর্ম ব্যবসা’ বন্ধ হয়ে যাবে। বে-আইনি, অনৈতিক এবং জবাবদিহিহীন ব্যবস্থায় তাদের একটি অংশ বিপুল অর্থবিত্তের মালিক হতে পারে। মাদ্রাসাগুলোকে নারী কেলেংকারীসহ বিভিন্ন অনৈতিক-অসামাজিক কর্মকা-ের নিরাপদ স্থান হিসেবে গড়ে তোলা সহজ হয়। এসব বিবেচনায় কওমি মাদ্রাসাগুলো ঝড়পরধষ ঈড়হভষরপঃ-এর অনুঘটক হয়ে উঠছে। গত ২৪ এপ্রিল এক ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে হেফাজতে ইসলামের সভাপতি মাওলানা বাবুনগরী, সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে। সাম্প্রতিক সহিংস তা-বের দায় এড়াবার কৌশল হিসেবেই বাবুনগরী উল্লিখিত চাতুর্যপূর্ণ ঘোষণা দিয়েছে। আমরা ওদের এসব কলাকৌশল বা ছলাকলায় ভুলতে চাই না। দেশবাসী চায় আইন তার নিজস্ব গতিতে আগাক। সাম্প্রতিক সহিংসতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের প্রতি কোনো অনুকম্পা নয়। প্রত্যেক অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। জঙ্গিদের মতো ওদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স নীতি কার্যকর করতে হবে।
যারা ধর্মের নামে রাজনীতি করে, যারা ধর্ম ব্যবসায়ী, তাদের হাতে পবিত্র ইসলাম অনিরাপদ হয়ে পড়েছে। কারণ এসব সামাজিক পরগাছার একমাত্র লক্ষ্য ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ। তারা দেশের কল্যাণের কথা ভাবেন না।
এমতাবস্থায় রাষ্ট্রকে পুনরায় ভাবতে হবে শান্তির ধর্ম ইসলামকে রক্ষা এবং সামাজিক শান্তি ফিরিয়ে আনতে হলে কওমি মাদ্রাসাগুলোকে দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতোই অভিন্ন নিয়মশৃঙ্খলার মধ্যে আসতে হবে। কারিকুলামের আধুনিকীকরণ যেমন দরকার, তার চেয়ে বেশি দরকার দেশের আইনের প্রতি আনুগত্য। যে কেউ ইচ্ছে করলেই যত্রতত্র কওমি মাদ্রাসা খুলে বসতে পারবে না। শিক্ষার অন্যান্য ক্ষেত্রে যেমন আইন আছে, রাষ্ট্রের তদারকি আছে, রাষ্টের নিয়মকানুন আছে, মাদ্রাসা শিক্ষার ক্ষেত্রেও সেসব বহাল করতে হবে। সস্ত্রাসবাদ, জঙ্গিবাদ, চরমপন্থা এবং হিংসাস্রয়ী ঘটনার এই উর্বর উৎসটিকে কঠোর নিয়ন্ত্রণে এখনই আনা না যায়, তাহলে আগামীতে রাজনৈতিক ইসলামের উত্থান আমরা ঠেকাতে পারব না। অতএব সাধু সাবধান।

লেখক : সম্পাদক, উত্তরণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply