এই মৃত্যুর মিছিল বন্ধ করার অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে

সম্পাদকের কথা: ২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে ২০২১ সালের এপ্রিল। ১৪ মাস। মৃত্যুর মিছিল ক্রমাগত বেড়েই চলছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসর আলবদর, আলশামস যেমন বেছে বেছে বাঙালি বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক, ডাক্তার, সাংবাদিকদের নৃশংসভাবে হত্যা করেছে, হত্যা করেছে লক্ষ-লক্ষ নিরপরাধ সাধারণ মানুষকে; তেমনি কোভিড-১৯ নির্বিচারে মানুষের প্রাণ সংহার করছে। ’৭১-এ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করার লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদেরÑ বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছে। ইতোমধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়ে ১০ হাজারের ওপর মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। তবে এই মৃত্যুর মিছিল দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তান হিসেবে বিবেচিত খ্যাতিমান বুদ্ধিজীবী, লেখক, চিকিৎসক, পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, কোভিডের বিরুদ্ধে সম্মুখসারির যোদ্ধা, সাংবাদিক, কবি ও স্বাস্থ্যকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। একটু বয়োজ্যেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীগণ সহজেই মৃত্যুর কাছে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হচ্ছেন। ’৭১-এর মতো বাংলাদেশ মেধাশূন্য হতে চলেছে।
যাদের পরমাণু শক্তির বিস্ফোরণে এই পৃথিবী নিমিষেই জনমানবশূন্য হয়ে যেতে পারে, যারা ইচ্ছে করলে পরমাণু শক্তিহীন যে কোনো দেশকে মুহূর্তে দখল করতে পারে, সেই ঈশ্বরের মতো শক্তিধর দেশগুলোও কোভিড-১৯ এর কাছে যে কতটা অসহায় আমরা তা প্রত্যক্ষ করেছি। সবদিক থেকে মহাশক্তিধর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোভিড আক্রান্ত ও মৃত্যুর দিন থেকে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, ভারত ও ব্রাজিল প্রভৃতি দেশও মৃত্যুর মিছিলের প্রথমসারিতে।
কথাগুলো পুনরুক্তির মতো শোনাবে। কেননা এ-কথাগুলো আমরা প্রথম ওয়েভ-এর সময়ও বলেছিলাম। তারপরে আমরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছি মানুষের প্রকৃতিকে জয় করার শক্তির ওপর। এই ভাইরাসটিতে বন্দি করে বোতলে পুরে রাখার মানুষের অব্যাহত চেষ্টার ফলে বেশ কয়েকটি দেশে টিকা আবিষ্কার হয়েছে। ইতোমধ্যে টিকা গ্রহণ করেছে কয়েক কোটি মানুষ। মানুষের মনে আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে। তবে এখনও এই ঘাতক ভাইরাসের লাগাম টেনে ধরা যায়নি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ওয়েভে বিশ্বজুড়ে মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলছে।
আশার কথা, বেশ কয়েকটি দেশ ভ্যাকসিন আবিষ্কার করেছে। ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হয়েছে। আবিষ্কারক দেশগুলোর বাইরে ভ্যাকসিন ব্যবহারে আমাদের দেশও রয়েছে। ইতোমধ্যে ভারত থেকে ৭০ লাখ ডোজ-এর মতো ভ্যাকসিন পাওয়া গেছে। ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সাথে ৩ কোটি ডোজ ভ্যাকসিন পাওয়ার চুক্তি হলেও ভ্যাকসিন রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা থাকায় নির্ধারিত সময়ে ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না। উদ্বেগের বিষয় হলো জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার দেশের মানুষকে বাঁচাতে যে চুক্তি করেছিলেন বন্ধুপ্রতীম ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সাথে, সরকারি নিষেধাজ্ঞার জন্য সেটি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক চুক্তির বরখেলাপ একটা খারাপ নজির স্থাপন করবে। ভারত সরকারকে মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশে রপ্তানির বিশেষ অনুমতি দিতে হবে। এটা না করলে বাংলাদেশের জনগণের মনস্তত্ত্বে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে, তা দীর্ঘমেয়াদে কোনো দেশের জন্যই কল্যাণ বয়ে আনবে না। সরকার এখন যুক্তরাষ্ট্রের মডার্না, রাশিয়ার স্পুটনিক ভি এবং চীনের সিনোভেক বায়োটেক কোম্পানির কাছ থেকে ভ্যাকসিন সংগ্রহের চেষ্টা করছে। আমরা আশা করব, সরকারের এসব উদ্যোগ সফল হবে।
আমাদের অপেক্ষা করতে হবে। পশ্চিমের উন্নত দেশগুলোতে ভ্যাকসিনেশন এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। দ্রুতই তারা তাদের সকল নাগরিকদের ভ্যাকসিনের আওতায় আনার চেষ্টা করছেন। বস্তুত, বিশ্বের সকল মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে হবে। আমাদের দেশের ১৭ কোটি মানুষকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনতে সময় লাগবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আবিষ্কার করেই হোক, নয়তো প্রযুক্তি হস্তান্তর করেই হোক, বাংলাদেশসহ বিপুল জনসংখ্যার দেশগুলোতে ভ্যাকসিন উৎপাদন করতে হবে।
আমরা শুনছি, স্পুটনিক ভি তথা রাশিয়া বাংলাদেশে ভ্যাকসিন উৎপাদনের বিষয়টি ভাবছে। ইতোমধ্যে দুই দেশের মধ্যে ভ্যাকসিন উৎপাদনের পূর্বশর্ত হিসেবে গোপনীয়ভাবে চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, আমদানি নির্ভরতার অবসান ঘটিয়ে দেশের মানুষকে বাঁচাতে ভ্যাকসিন উৎপাদনে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
ভ্যাকসিন উৎপাদন কবে হবে, তার জন্য বসে থাকছে না সরকার। সরকার ভারত ছাড়া উল্লিখিত তিন দেশ থেকে ভ্যাকসিন আমদানি করে এই মৃত্যুর মিছিলকে বন্ধ করার লক্ষ্যের দিকে অভিযাত্রা জোরদার করবে বলে দেশবাসীর প্রত্যাশা। মানুষের শক্তি অবশ্যই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হবে।

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply