অন্য আলোতে পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার নির্বাচন

সাইদ আহমেদ বাবু: নির্বাচন কমিশন গত ২৭ মার্চ থেকে পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, তামিলনাড়–, কেরালার ভোট শুরুর তারিখ ঘোষণা করায় সংঘাতটা হয়ে উঠেছে যতটা রাজনৈতিক ততটাই সাংস্কৃতিক। একদিকে ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুত্ব’, অন্যদিকে ‘নিখাদ বাঙালিয়ানা’। স্বকীয়তা বজায় রেখে মাথা উঁচু করে বাঁচা, না-কি হিন্দুত্ববাদী প্রভুত্বের কাছে মাথা নোয়ানো? এ ভোট সেই চূড়ান্ত দিক নির্ণয়ের মাহেন্দ্রক্ষণ।
বহুত্ববাদ আর ভারতবর্ষ পরস্পরের সমার্থক। ব্রিটিশ শাসনোত্তর পর্বে এদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উদারনৈতিক সংসদীয় গণতন্ত্র। এদেশের সংবিধানে অনুসৃত হয়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সংবিধানের উদারনৈতিক এবং মানবতাবাদী বিভিন্ন ধারা এবং উপধারার খোলা বাতাস। সে-কারণে সংবিধানের জন্মলগ্ন থেকে ভারতের নাগরিকদের প্রাণবায়ু উপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তিলাভের পর পেরিয়ে গেছে সাত দশকের বেশি সময়। বর্তমানে ভারতের নির্বাচন এক গণ-উৎসবে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনকে ঘিরে এত উন্মাদনা-উদ্দীপনা পৃথিবীর খুব কম দেশে লক্ষ করা যায়। এ নির্বাচনে মানুষ নির্বাচিত করবেন তাদের ভবিষ্যৎ। সে-জন্য নির্বাচন শুধু মত প্রকাশের স্বাধীনতার অনুশীলন বা নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়, জাতিগত এবং রাষ্ট্রীয় জীবনের বিভিন্ন জরুরি অনুষঙ্গ জড়িয়ে আছে। কিন্তু দেশ ভাবনায় কোন বিষয় অগ্রাধিকার তালিকায় আছে, সে-কথা বলার সঠিক ক্ষণও বোধহয় বর্তমান সময়ে। দেশ এক বোধ, এক মনন, তার সঙ্গে অবশ্যই জড়িয়ে আছে অনেক অনুভূতি। ভারত এ-মুহূর্তে, ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে। কারণ, স্বাধীনতা-উত্তর সমকালীন নেতৃত্ব দেশবাসীকে সুন্দর ও সুস্থ সমাজ নির্মাণের যে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব ও পথনির্দেশ করেছিল বর্তমানে সে-পথ যে রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। অথচ আশ্চর্যের বিষয় স্বাধীনতার গোড়ার দিকে যখন নব্য ভারত কঠিন পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে বহুমুখী সমস্যা, দারিদ্র্য, বিদেশি মুদ্রার অভাব এবং দেশবিভাগজনিত হিংসাশ্রয়ী ঘটনাবলি সর্বোপরি উদ্বাস্তু সমস্যা ইত্যাদি নিয়ে চরম বাঁচার লড়াইয়ে শামিল ছিল, সেই ক্রান্তিকালে সুযোগ্য নেতৃত্বে ভারতের মাটিতে মানবতাবাদ ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। শত প্ররোচনা, ভাবাবেগ আশ্রিত হঠকারী মতবাদ এবং ধর্মীয় বিভাজনের কুটিল ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে সেই দূরদর্শী নেতৃত্ব যেভাবে দেশের সনাতন ঐতিহ্য ও ভাবাদর্শ অক্ষুণœ রেখে গণতান্ত্রিক শাসন-ব্যবস্থাকে স্থান দিয়েছিল, তা স্মরণ করে বিস্মিত হতে হয়। শুধু তাই নয়, বহু আত্মত্যাগের ফলস্বরূপ অর্জিত স্বাধীনতা যাতে বিফলে না যায় এবং নাগরিক জীবন যাতে সর্বপ্রকার মালিন্য ও আবিলতা দূরে থাকে সেই লক্ষ্যে একদিকে যেমন দেশের সংবিধানে গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বহুত্ববাদকে কেন্দ্রস্থলে রাখা হয়েছিল, অন্যদিকে তেমনি আর্থিক প্রতিকূলতার কাছে হার না মেনে যুগোপযোগী নতুন ধারার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন, শিল্প ও কৃষিক্ষেত্রে উন্নত প্রযুক্তি আনয়ন, দেশজুড়ে আধুনিক ও বিজ্ঞান পরিবেশ রূপায়ণের বিশাল কর্মযজ্ঞ সূচিত হয়েছিল। বিশ্বে ভারতের মর্যাদাপূর্ণ আসন সুনিশ্চিত করতে দেশে তৎকালীন নেতৃত্ব সংকল্পবদ্ধ ছিলেন। আজকের ভারতে নাগরিকদের সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগে নানাভাবে বাধা দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনের এই সংঘাতপূর্ণ আবহে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত গণতন্ত্র। কেন্দ্র, রাজ্যে যেভাবে স্বৈরতন্ত্র ও অসহিষ্ণুতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে তাতে গণতন্ত্রের অন্তর্জলি যাত্রা আর বোধহয় দেরি নেই।
মমতা ব্যানার্জী কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ১৯৯৮ সালে এবং কিছুকালের মধ্যেই এটি পরিণত হয় বামফ্রন্ট-শাসিত পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলে। নন্দীগ্রামে কৃষকদের বিক্ষোভে নেতৃত্ব দিয়ে মমতা ব্যানার্জী হয়ে ওঠেন রাজ্যের জনপ্রিয় নেতা। ২০০৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে বামফ্রন্টের চেয়ে বেশি আসন পায় তৃণমূল। আর তার দু-বছর পর বিধান সভা নির্বাচনে কংগ্রেসের সাথে জোট বেঁধে মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল দল ওই রাজ্যে ৩৪ বছর ধরে ক্ষমতাসীন থাকা বামফ্রন্টকে হারায়। মমতা ব্যানার্জী হন পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের প্রথম নারী মুখ্যমন্ত্রী। এরপর থেকে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে ক্ষমতায় আছেন। বিদায়ী রাজ্য বিধান সভার ২৯৫টির মধ্যে তার দলের হাতে ছিল ২১১টি আসন।
২০২১-এর পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভার নির্বাচনে ২১৩টি আসনে জিতে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পরে তৃণমূল কংগ্রেসের সব নির্বাচিত বিধায়করা আবারও মমতা ব্যানার্জীকে পরিষদের দলনেত্রী হিসেবে নির্বাচিত করেছেন। গত ৫ মে তিনি তৃতীয়বারের জন্য পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নেন। ‘আমি মমতা ব্যানার্জী ঈশ্বরের নামে শপথ নিচ্ছি…।’ সেই মুহূর্তে তিনি হয়ে উঠেছিলেন আপামর মানুষের স্বপ্নের দেবী, আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিমূর্তি, অন্যায়-অবিচার এর সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রামে বিজয়িনী এক মানবী। ইনি সেই মমতা, যিনি ১৯৯৮ সালে চম্পলা সর্দারের ধর্ষণ কা- নিয়ে মহাকরণ উত্তাল করে তুলেছিলেন। ইনি সেই মমতা, যিনি সিঙ্গুরের জমি-আন্দোলনের সমর্থনে ২০০৬ সালের ৪ থেকে ২৯ ডিসেম্বর কলকাতায় আমরণ অনশনে বসেছিলেন। ইনিই সেই মমতা, যিনি ১৪ মার্চ ২০০৭-এ নন্দীগ্রামে গুলি চালনা ও ‘হাড়-হিম করা’ হিংসার বিরুদ্ধে কলকাতায় ধর্ম-মত-ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে এক ঐতিহাসিক অবিস্মরণীয় মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে সংযোজিত এক একটি অধ্যায়, দ্রুততার সঙ্গে তিনি তার নিজের স্বপ্ন ও মানুষের স্বপ্নকে রূপদানের চেষ্টা করেছেন। তার প্রাণশক্তি, তার এই উদ্যোগ, তার এই রূপায়ণ-প্রচেষ্টাকে আমরা সম্মান করি, স্বাগত জানাই। মমতা ব্যানার্জী ও তার নেতৃত্বাধীন সরকারকে ঘিরে আছে বহু মানুষের প্রত্যাশা ও ভরসা। মমতা আপন কর্মদক্ষতায় ও যথার্থ রাজ ধর্ম পালন করে এই পিছিয়ে পড়া রাজ্যটিকে সর্বশ্রেষ্ঠ করে তুলতে পারেন। তার প্রতি মানুষের নিরঙ্কুশ বিশ্বাসকে সম্মান জানিয়ে, তিনি যদি যথার্থ রাজ ধর্ম পালন করতে পারেন, তাহলে ২০২৪-এ পুনর্বার মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে বসিয়ে মমতা ব্যানার্জীকে কুর্নিশ জানাতে রাজ্যের মানুষ একবিন্দু দ্বিধা করবেন না। তিনি ভারতের অহঙ্কার। যে প্রতিশ্রুতির ডালি, যে সমুজ্জ্বল আলোকবর্তিকা হাতে নিয়ে তিনি পথের ধুলায় নেমেছিলেন, সে-সবের সুষ্ঠু বাস্তবায়ন কি একেবারেই অসম্ভব? আমরা অসম্ভব বলে বিশ্বাস করি না। কেননা মমতার আত্মশক্তি অকল্পনীয়। অসম্ভবকে সম্ভব করার রেকর্ড এখনও পর্যন্ত আছে তার ঝুলিতে। প্রতিপক্ষ যতই শক্তিধর হোক, মমতা ব্যানার্জী আবার প্রমাণ করে দিলেন যে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজনীতিতে তিনি এখনও অপরাজেয়। রাজনীতিবিদ হিসেবে তার এই সাফল্যের পেছনে কিন্তু একটা প্রতিভা কাজ করেÑ ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি এটা লিখেও গেছেন যে মমতা ব্যানার্জীর ‘একটা ক্যারিশমা বা সম্মোহনী ক্ষমতা আছে।’ তবে ১৯৭০-এর দশকে যখন তার রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল কংগ্রেস দলের একেবারে সাধারণ একজন কর্মী হিসেবে।
কলকাতার হাজরা এলাকার এক নিম্নবিত্ত পরিবারে মমতা ব্যানার্জীর জন্ম ১৯৫৫ সালে। তার পিতা ছিলেন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগের একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ এবং যোগেশচন্দ্র কলেজ থেকে আইনের ডিগ্রি নেওয়ার পর মমতা ব্যানার্জীর প্রথম পেশা ছিল স্কুল-শিক্ষকতা। রাজনীতি করতে শুরু করেছিলেন ছাত্র-জীবন থেকেই। ১৯৭৬ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সেই তিনি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য মহিলা কংগ্রেস (আই)-এর সাধারণ সম্পাদক হন। কয়েক বছর পর তিনি হন নিখিল ভারত যুব কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক।
প্রায় এক দশক হতে চলল, মোদি-ঝড়ে ল-ভ- হচ্ছে ভারত। প্রথমে অটল বিহারি বাজপেয়ী এবং পরে নরেন্দ্র মোদি সওয়ার হলেন। ভারতে একের পর এক রাজ্য তাদের হিন্দুত্ববাদের নিশানবরদার হলো। পূর্বে ত্রিপুরা আর উত্তরে মেঘালয়-আসাম। সব রাজ্যে পতপত উড়ছে বিজেপির গৈরিক ঝা-া। বাকি ছিল পশ্চিমবঙ্গ। সেটির দখল নিতে তুরুপের সব তাস ব্যবহার করে বিজেপি। বিজেপি দাবি করেছিল, তারা ২০০-র বেশি আসন পেয়ে পশ্চিমবঙ্গে ‘আসল পরিবর্তন’ আনবে।
স্বাধীন ভারতের প্রথম ভোট হয় ১৯৫২ সালে। পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব কায়েম বিজেপির প্রথম লক্ষ্য, দ্বিতীয় লক্ষ্য গোটা দেশে তাদের মতাদর্শ দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা। যা কি না প্রকারান্তরে হিন্দুস্তানকে ‘হিন্দু রাষ্ট্রে’ পরিণত করার শামিল। এ কারণে মোদি-শাহসহ বিজেপির শীর্ষ নেতারা বারবার বলছেন, ‘শুধু ভোটে জেতা ও সরকার গঠন বিজেপির একমাত্র লক্ষ্য নয়, আসল কথা মতাদর্শ প্রতিষ্ঠা, যা এখনও শেষ হয়নি। বিজেপিকে হতে হবে সরকার ও সমাজের সংযোগকারী সেতু। আদর্শ প্রতিষ্ঠার বাহন।’ পশ্চিমবঙ্গ দখল করতে না পারলে সেই লক্ষ্য পূরণ অসম্ভব। এবারের ভোটযুদ্ধ সেই আলোতেই দেখতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নির্বাচন উপলক্ষে সর্বাধিক প্রায় ২২টির মতো জনসভা করেন পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে। করোনাকালেও সবাই মিলে শতাধিক জনসভা ও রোড শো করেন। স্পষ্টতই প্রমাণিত, পশ্চিমবঙ্গ জয় তাদের বড় দায়। ফলে দিল্লি তথা উত্তর ভারত থেকে নেতানেত্রীর আনাগোনা লেগেই থাকে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিশেষভাবে গুরুত্ব দেন এই রাজ্যের বিধান সভা নির্বাচনকে।
এদের সবারই প্রথম রণনীতি হলো রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা শাসক দলের প্রধান এবং তার পরিবারের সদস্যদের আক্রমণ করা। দ্বিতীয় কৌশল হলো বঙ্গ সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন এবং হারিয়ে যাওয়া ‘সোনার বাংলা’ পুনর্নির্মাণের আশ্বাস প্রদান। প্রায় সব নেতাই নিয়ম করে স্মরণ করেন দেশ ও দশের প্রতি বাঙালি মনীষীদের অবদানের কথা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, স্বামী বিবেকানন্দ, শ্রীচৈতন্যদেব, বিধানচন্দ্র রায়Ñ প্রায় কেউই বাদ পড়েননি। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বণিকসভার সম্মেলনে ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের ‘নতুন যুগের ভোর’ কবিতা থেকে শুনিয়েছেনÑ “চলায় চলায় বাজবে জয়ের ভেরী”। সেই মোদি এবার ভিখ মেগেছিলেন, মুঝে বঙ্গাল চাহিয়ে, মমতা সেই মোদিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, মোদি বাংলায় চলবে না! বাঙালি আবেগকে কাজে লাগাবার জন্যে উঠে আসছে উদ্ভট উচ্চারণে ‘সোনার বাংলা’ গড়ার সোচ্চার ঘোষণা।
এই জোট যদি সার্থক হয়, তাহলে মোদির ভারতকে হিন্দুস্তান বানানোর ফন্দি মাঠে মারা যাবে। ঠিক এ-কারণেই মমতাকে বাঙালিরা ভাবতে শুরু করেছেন, উনি পারবেন! কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, বিজেপি নেতা অমিত শাহ এই নির্বাচন উপলক্ষে বাংলায় ৫০টিরও বেশি জনসভা করেছেন। কিন্তু তারপরেও কেন কাক্সিক্ষত ফলাফল পায়নি? বাংলা, যা দীর্ঘদিন ধরে জাতি-ধর্ম-ভাষা নির্বিশেষে এক ধরনের সবাইকে নিয়ে পথ চলার কথা বলত, তা ক্রমে পথভ্রষ্ট হচ্ছে। রাজনৈতিক তর্জা এবং বিভাজনের রাজনীতিতে বিসর্জিত হতে বসেছে বাংলার দীর্ঘদিনের ট্র্যাডিশন। ৩০ বছর আগেও বাংলায় কোনো নির্বাচনী জনসভায় এভাবে বিভাজনের কথা উচ্চারিত হওয়া রীতিমতো নিন্দনীয় ছিল। স্বাধীন ভারতে এই বিভাজনের রাজনীতির সূত্রপাত মূলত ৩৫-৪০ বছর আগে। একটা সময় পর্যন্ত কংগ্রেস দলটি ছিল বড় ছাতার মতো, সেখানে নানা মত, নানা বর্ণ, নানা ধর্মের এক ধরনের সহাবস্থান ছিল। অর্থাৎ একটু একটু করে বাংলার রাজনীতিতে ভয়ানক একটা পরিবর্তন এসেছে, যা আমরা ২০২১ সালের নির্বাচনে প্রত্যক্ষ করছি এবং হয়তো কিছুটা আতঙ্কিত হচ্ছি। সূক্ষ্মভাবে যে ঘৃণার রাজনীতি ছড়িয়ে দেওয়া শুরু হয়েছে তার ফল ভুগতে হবে সারা ভারতের মতো এই রাজ্যকেও। পশ্চিমবঙ্গ নিজের মতো করে আলাদা থাকতে পারবে না। রাজনৈতিক দলগুলোই এবারের ভোটের সেøাগানে এমন কিছু জিনিসকে হাতিয়ার করেছে, যা মূলত বিভাজনের ওপরে দাঁড়িয়ে। বাংলাবাসী বনাম বহিরাগত, মতুয়া সমাজ তথা নমশূদ্র, তফসিলি জাতি, উপজাতি এবং অবশ্যই সংখ্যালঘু সম্প্রদায় এবারের ভোটে খুব বড় ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংখ্যালঘুদের মধ্যেও আবার ভাগ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, খেলা হবে। ভাঙা পা নিয়ে হুইলচেয়ারে বসে বিজেপির জালে গোলবন্যা বইয়ে দিয়েছেন তিনি। মমতার এই চ্যালেঞ্জ তাকে দেশের বিভিন্ন আঞ্চলিক দলের কাছে নতুন নেত্রী বানিয়ে দিল। ২১-এর নির্বাচনে কোনো দল জেতেওনি। জিতেছেন একা একজন মহিলা মমতা, যিনি উদার ও মুক্তচিন্তার বাংলার গায়ে সাম্প্রদায়িকতার দাগ ধরিয়ে দেওয়ার রাষ্ট্রীয় চক্রান্ত রুখে দিতে পেরেছেন। বহু আলোচিত গুড়খা সংস্কৃতির লোকেদের কাছে হেরে যেতে হবে রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-বিবেকানন্দ-সুভাষচন্দ্রের ঐতিহ্যকে। তারা মনে-প্রাণে চেয়েছেন, আপাতভাবে হলেও পশ্চিমবঙ্গে হিন্দু-মুসলিমের ধর্মনিরপেক্ষতা বজায় থাক। মোদিকে হারিয়ে মমতা একাই জাতীয় রাজনীতিতে একটা নতুন সমীকরণের জন্ম দিতে চলেছেন। নরেন্দ্র মোদি নেহাতই ভদ্রলোক। অবশেষে নির্বাচনে হার স্বীকার করে কালবিলম্ব না করে টুইট বার্তায় মমতাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।

মমতা ব্যানার্জীর উত্থান ও তার সাফল্যের চাবিকাঠি
তৃণমূলের এই সাফল্যের পিছনে বিজেপির পক্ষে নেতিবাচক একটা বড় কারণ কাজ করেছে। তারা বাইরে থেকে, বিশেষত হিন্দি বলয় থেকে নেতাদের নিয়ে এসেছেন এখানে ভোটের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে। সঙ্গে আমদানি করেছেন একটা অ-বাঙালি সংস্কৃতির। তার মধ্যে একটা বড় দিক চূড়ান্ত ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি, যা পশ্চিমবঙ্গের চিরাচরিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ধারণার একেবারে বিপরীত। ধর্মীয় বিভাজন পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা কখনই পছন্দ করে না। বিজেপি মূলত হিন্দি ভাষা-সংস্কৃতির প্রচার ও প্রসার চায়। বাংলা ভাষা-সংস্কৃতি সংকোচনের একটা ভীতি বাঙালিকে পেয়ে বসেছে। বাঙালি ডান-বাম সবাই মিলে নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার তাগিদ থেকে বিজেপিকে পরাজিত করার জন্য ঐকমত্যে পৌঁছাতেই পারে। তাই বাংলার একটা বড় অংশ ভোট দিয়েছে বলে আমার মনে হয়।
বিজেপি যেভাবে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি বাংলার ওপরে চাপিয়ে দিতে চাইছে, সেটা তো মেনে নেওয়া যায় না! এর বিপরীতে তো অপশন একটা-তৃণমূল। কোনো কারণে সমর্থন দরকার হলে কংগ্রেসের কাছ থেকে মমতা তা পাবেন। সিপিএম বুদ্ধিমান হলে তারাও সমর্থন করবে। আর বাকি যারা আছে, তাদের সংগঠন বা লোকবল তো সে-রকম নেই যে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়তে পারবে। কংগ্রেস বা বামফ্রন্ট তো বিজেপি-বিরোধী সে-জায়গাটা নিতে পারেনি। সে-জন্যই তৃণমূল কংগ্রেস এত ভোট পেয়েছে। এটা তো স্পষ্ট যে বামফ্রন্ট-কংগ্রেস-আইএসএফ জোট বিজেপি-বিরোধী অবস্থানটা স্পষ্ট করতে পারেনি। সে-জন্যই স্বাধীনতার পর থেকে এই প্রথমবার বিধান সভায় একটা আসনও পায়নি কংগ্রেস বা বাম দলগুলো। বিজেপি-বিরোধী ভোট পুরোপুরিই গেছে তৃণমূলের দিকে। ভারতের শাসক দল বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলে ব্যর্থ হলেও এই প্রথমবারের মতো রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল হিসেবে উঠে এসেছে। বিদায়ী বিধান সভায় তাদের মাত্র ১ শতাংশ বা তিনজন নির্বাচিত বিধায়ক থাকলেও এবারে তারা কিন্তু ২৬ শতাংশেরও বেশি বিধায়ক পেয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, পশ্চিমবঙ্গ বিধান সভায় কংগ্রেস ও বামপন্থিরা সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হওয়ার ফলে ওই রাজ্যের সংসদীয় রাজনীতিতে ‘অপজিশন স্পেস’টাও এখন পুরোপুরি বিজেপির দখলে। ভারতীয় জনতা পার্টির কাছে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল বাংলা বিজয়। যার কারণে বছর তিনেক আগে থেকেই বাংলা-জয়ের প্রস্তুতি নিয়ে কাজ শুরু করেছিল বিজেপি। বিশেষত, ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের ফলাফল দেখে গেরুয়া শিবির পূর্ণ শক্তি নিয়ে নেমে পড়ে বাংলা বিজয়ে। একের পর এক তৃণমূল বিধায়ক ও হেভিওয়েট নেতাকে দলে ভিড়িয়ে বিধান সভা ভোটে জোরকদমে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিজেপি। শুধু কি তাই, শেষমেশ ড্যান্সিং হিরো মিঠুন চক্রবর্তীকে পর্যন্ত দলে ভিড়িয়ে চমক দেয় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অভিযোগে অভিযুক্ত এ দলটি।
স্বাধীনতা-উত্তর বঙ্গরাজনীতি ছিল স্পষ্টতই দুই বিপরীত শিবিরে বিভক্ত। একটি কংগ্রেস ঘরানা, অন্যটি কমিউনিস্ট। তৃণমূল কংগ্রেস আদর্শগতভাবে কংগ্রেস রাজনীতিরই নামান্তর। এই বিভাজিত দুই মেরুর মধ্যে দক্ষিণপন্থি রাজনীতি কোনোদিন স্থান করে নিতে পারেনি। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের হাত ধরে হিন্দু মহাসভাও পশ্চিমবঙ্গে হাঁটিহাঁটি পা পা’র বেশি এগোতে পারেনি। এর একটা বড় কারণ দেশভাগের পর মুসলিম লীগের রাজনীতির প্রাসঙ্গিকতা কমে যাওয়া। ৭০ বছর ধরে এটাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক চালচিত্র, এই প্রথম যেখানে প্রবলভাবে ধাক্কা দিতে চাইছে বিজেপি। অর্থবল, লোকবল ও সাংগঠনিক শক্তির পাশাপাশি ‘ফোর্স মাল্টিপ্লায়ার’ হিসেবে যুক্ত হয়েছে মোদি-শাহর ক্ষুরধার নেতৃত্ব, সরকারি আনুগত্য ও অনুগত ‘জো হুজুর’ মিডিয়া। তৃণমূল কংগ্রেসের মতো নিতান্তই রাজ্যভিত্তিক এক আঞ্চলিক দলের পক্ষে বিজেপির এ অপ্রতিরোধ্য রথ থামানো হয়ে দাঁড়িয়েছে অসাম্য এক লড়াইয়ের প্রতীক।
তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান প্রচারক মমতা ব্যানার্জী নিজেই। প্রতিটি নির্বাচনী জনসভাতেই বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির কড়া সমালোচনা করছেন তার নিজস্ব বক্তৃতার স্টাইলে। বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিরোধিতা তৃণমূল কংগ্রেস বা বামপন্থিরা আর কংগ্রেসÑ সবাই করছে। কিন্তু মূল বিরোধিতা করছেন যিনি, তিনি তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জী। ব্রিটিশ শাসকরা ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ করে যে চারা রোপণ করেছিল, তাকেই পানি, সার দিয়ে রাজনীতিকরা বড় করে এখন একটা মহীরুহের রূপ দিয়েছেন। আজকের যে পরিস্থিতি, সেটা একদিনে হয়নি। ওই দেশভাগ বা তার ঠিক আগে থেকে বিদেশি শাসকরা তাদের স্বার্থে হিন্দু মুসলমানের মধ্যে এই বিষ ঢুকিয়ে দিয়ে গেছে। কিন্তু জাতি হিসেবে আমরা এতটাই হতভাগ্য যে এত বছরেও তার থেকে বেরিয়ে আসতে পারলাম না। বিজেপির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলার ঐতিহাসিক রায়! এই রায় বিজেপির ক্ষমতা দখলের আগ্রাসী আস্ফালনের বিরুদ্ধে বাংলার গণ রায়। তাদের অভিযোগ গণহত্যা করে, ভয় দেখিয়ে, দলবদল করিয়ে ক্ষমতা দখলের চক্রান্তকে বাংলা রুখে দিয়েছে। এই রায় সংকীর্ণতা ও বিদ্বেষের রাজনীতির বিরুদ্ধে বাংলার উদার ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির বলিষ্ঠ প্রত্যুত্তর।
পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালার মতো আসামের মানুষও পূর্বতন সরকারের ওপরই পূর্ণ আস্থা রাখল। পশ্চিমবঙ্গে বাম জোট ক্ষমতায় থাকাকালে বাংলাদেশের সঙ্গে গঙ্গার পানি চুক্তি হয়েছে। কারণ, বাম নেতা জ্যোতি বসু এটা আন্তরিকভাবে চেয়েছিলেন। মমতার কারণে তিস্তা চুক্তি ভেস্তে গেছে। তারপরও বাংলাদেশের মানুষ মমতার জয়ে যত না খুশি হয়েছে, তার চেয়ে বেশি উল্লসিত হয়েছে বিজেপির পরাজয়ে। কারণ, সমস্যাটা শুধু পানির নয়, সমস্যাটা বিজেপির রাজনীতির। এক অর্থে বিজেপি অনেক ভালো ফল করেছে। বিধান সভায় তাদের আসন বেড়েছে অনেক। রাজ্যে তারা এখন প্রধান বিরোধী দল। তাদের জনসমর্থন বেড়েছে। তাদের ভাগে ২৬ শতাংশ আসন জুটলেও ভোট পড়েছে ৩৮ শতাংশ। মমতা-মোদি ঝড়ে কংগ্রেস আর বাম একেবারে সাফ হয়ে গেছে। এটা এক ধরনের মেরুকরণ। সমীক্ষা অনুযায়ী বিজেপির সব থেকে বড় ধাক্কা হলো এককভাবে হিন্দু ভোট পাওয়ার আশা পূরণ হয়নি। কারণ, হিন্দু ও মুসলিম নির্বিশেষে তৃণমূল ভোট পেয়েছে। বর্তমান সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ বলছে তৃণমূল ২০১৯ সালে পাওয়া ৩২ শতাংশ হিন্দু ভোট পেয়েছিল। কিন্তু এবার হিন্দু ভোট ৩৯ শতাংশ পেয়েছে শাসক দল। কিন্তু তৃণমূলের জয়ের আসল কারিগর গরিব, নিম্নবর্গ ও মহিলারা। এই অংশটি ঢেলে বাংলার মেয়েকেই ভোট দিয়েছে। আর্থিকভাবে দরিদ্রতম অংশের ভোট তৃণমূল পেয়েছে ৫০ শতাংশ। বিজেপি ৩৬ শতাংশ। নিম্নবর্গের ভোট তৃণমূল পেয়েছে ৫১ শতাংশ। বিজেপি ৩৫ শতাংশ। মধ্যবিত্ত সমর্থন তৃণমূল পেয়েছে ৪৭ শতাংশ। বিজেপি পেয়েছে ৪০ শতাংশ। বাংলায় মাত্র ৭৭টি আসন পেয়েছে বিজেপি। সমীক্ষা বলছে যে ভোট পেয়েছে বিজেপি তাদের বেশিরভাগ অংশই মধ্যবিত্ত এবং ধনী সম্প্রদায়ের মানুষ। তবে মধ্যবিত্ত ভোট এখনও সিংহভাগ তৃণমূলের দখলে। ধনী ও উচ্চবিত্তদের ৪৩ শতাংশ ভোট পেয়েছে বিজেপি। আর তৃণমূল পেয়েছে ৪০ শতাংশ। ২০১৯ সালে কিন্তু ধনীদের ৫১ শতাংশ ভোট তৃণমূল পেয়েছিল বলে লোকনীতি সিএসডিএস সমীক্ষা জানাচ্ছে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে উচ্চবর্ণের ভোটের চরিত্র বিশ্লেষণ করে সিএসডিএস, লোকনীতি দেখেছে, উচ্চবর্ণের মহিলারা আবার পুরুষদের তুলনায় তৃণমূলকে বেশি ভোট দিয়েছে। আদিবাসী মহিলারাও তৃণমূলকে বেশি ভোট দিয়েছে।
সমীক্ষা অনুযায়ী প্রকাশিত খবর জানাচ্ছে ২১-এর ভোটে গরিব মহিলাদের ভোট তৃণমূল পেয়েছে ৫২ শতাংশ। নিম্নবর্গের মহিলাদের ভোট পেয়েছে ৫৫ শতাংশ। মধ্যবিত্ত পরিবারের মা ও বোনদের ভোট পেয়েছে ৪৫ শতাংশ।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকের মতে, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল যে পথ দেখিয়েছে সেটির প্রভাব ভারতের জাতীয় রাজনীতিতেও পড়তে পারে। প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তিগুলো আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে পারে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এলে নাগরিক পঞ্জি (এনআরসি) হতো। ফলে রাজ্যের অনেক মুসলিম বাঙালি তাদের নাগরিকত্ব হারাতেন। এতে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলায় অস্থিরতা দেখা দিত। তৃণমূলের জয় পাওয়ায় সেই পরিস্থিতি হবে না। এনআরসি’র কারণে আসামে অনেক মুসলিম নাগরিকত্ব হারিয়েছেন। বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, যে পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে ধর্মনিরপেক্ষতার ইতিহাস রয়েছে, সেখানে এবারই হয়তো ভোটে ধর্মই হয়ে উঠবে একটা গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু, যা অন্তত এই রাজ্যে আগে কখনও হয়নি।
মমতা ব্যানার্জী বিভিন্ন কারণে ভোটারদের সহানুভূতি পেয়েছেন। মোদি সরকারের বিরুদ্ধে একক শক্তি হিসেবে তিনি যখন মোদি-অমিত শাহকে চ্যালেঞ্জ জানান, তা জনগণ খুব ভালোভাবে নেয়। তারপর মমতার ওপর ‘আক্রমণের’ কারণে তিনি যখন হুইলচেয়ারে করে জনসংযোগ করে গেছেন, তার ভোটাররা খুব ইতিবাচকভাবে সেটি নিয়েছে। সর্বশেষ যে কারণটি চোখে পড়েছে সেটা হলো, বিজেপি সম্ভাব্য কোনো মুখ্যমন্ত্রীকে সামনে আনতে পারেনি। মমতার বিকল্প কে হবে, সেটা বিজেপি পরিষ্কার করতে পারেনি। মমতার মতো জনপ্রিয় ও পোড় খাওয়া রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সামনে টেক্কা দেওয়ার মতো কোনো সম্ভাব্য প্রার্থী না থাকায় মমতাকে সুবিধা দিয়েছে।
এটা ভূমিধস বিজয়। এটা হ্যাট্রিক। দুই-তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা ও বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী পরাজিত করেছেন বিজেপির বাংলা বিজয়ের সাম্প্রদায়িক, প্রতিক্রিয়াশীল, অগণতান্ত্রিক, পুরুষতান্ত্রিক ও স্বৈরাচারী মনোভাবকে। বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে পরাজয়ের অন্যতম কারণ হলো তাদের চরম হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি। তাদের রাজনীতি চরম মুসলিম-বিরোধী। ফলে পশ্চিমবঙ্গের বিশাল একটা অংশ তাদের এই রাজনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছে। বিজেপি যেভাবে প্রচারণা আর সর্বশক্তি এবারের নির্বাচনে ব্যয় করেছে তার আশানুরূপ ফল ভোগ করতে পারেনি। কিন্তু অন্যদিকে মমতা ব্যানার্জী জয়ের কারণ তার কৌশল। বিশেষ করে মুসলিম ভোটারদের টানতে সব সময় আগে থেকে কাজ করে গেছে। ফলে তার রাজনীতির কাছে নরেন্দ্র মোদির রাজনীতি পারতপক্ষে হার মেনেছে।
বিজেপি এখনও পশ্চিমবঙ্গে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হাজির করতে পারেনি। এছাড়াও বিজেপি নির্বাচনে সহিংস প্রোপাগা-া ও আসামের মুসলমানদের বিষয়ে নাগরিক পুঞ্জি নিয়ে যে সমালোচনায় পড়েছে, তা পরাজয়ের একটি বড় কারণ।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে প্রায় ১ কোটি শরণার্থী আশ্রয় ও খাদ্য জোগানোর অভিজ্ঞতায় রাজ্যটি সমৃদ্ধ। নানা নাজুক সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতিতে রাজ্যটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করেছে। ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের সময় বা ২০০২ সালের গোধরা কা-ের প্রতিক্রিয়ার কোনো আঁচ লাগেনি রাজ্যবাসীর গায়ে। আয়তন ও জনসংখ্যার বিচারে রাজ্যটি চতুর্থ স্থান অধিকার করলেও, ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বের দিক থেকে রাজ্যটির অবস্থান তৃতীয়। কেন্দ্রীয় লোকসভায় রাজ্যটির আসন সংখ্যা ৪২। উত্তর প্রদেশ এবং মহারাষ্ট্রের যথাক্রমে ৮০ ও ৪৮। বিজেপি উত্তরবঙ্গে গোর্খাল্যান্ড, কামতাপুরী ও গ্রেটার কোচবিহারÑ এই ৩টি ছোট রাজ্য গঠনে নীতিগত সম্মতি জানিয়েছে। এতে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা ভূমি হারানোর আতঙ্কে আছে। সারা ভারতে ১৫ কোটির অধিক বাঙালির একমাত্র হোমল্যান্ড পশ্চিমবঙ্গ। তার কোনোরকম অঙ্গচ্ছেদ তাই বাঙালিদের আর কাম্য নয়। বিজিপির বিপরীতে তৃণমূল কংগ্রেস পশ্চিমবঙ্গের কোনোরকম অঙ্গচ্ছেদের বিরোধিতা করে বাঙালিদের সমর্থন ধরে রেখেছে।
বিজেপির ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনির বিপরীতে ‘জয় হিন্দ’ ধ্বনি ব্যবহার করেও তৃণমূল যেন বাঙালির মধ্যে জোশ আনতে পারছিল না। অবশেষ ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি সেই কাজটি সহজ করে দিল। বিজেপির ধর্মীয় অনুভূতির বিপরীতে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে বাঙালি জাতিসত্তার অন্তরাত্মাটি যেন জেগে উঠেছে। মমতা ব্যানার্জী বুঝতে পেরেছিলেন বিজেপির ধর্মীয় অনুভূতির বিপরীতে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি চেতনাকে কাজে লাগাতে হবে।
পশ্চিম বাংলার মুসলমানরা বুঝতে পেরেছিল কংগ্রেস ও বামপন্থিরা আব্বাস সিদ্দিকীর নতুন পার্টির সাথে জোট বাঁধলেও, তাদের পক্ষে বিজেপিকে পরাজিত করা সম্ভব নয়। তাই বিগত ১০ বছরে তৃণমূলের শাসন আমলে নানা বঞ্চনার বাস্তবতা থাকলেও শুধু বিজেপিকে পরাজিত করার লক্ষ্য নিয়ে তৃণমূলকে ভোট দিতে মুসলিমদের কোনো দ্বিধা ছিল না। পশ্চিমবঙ্গে দলিত ভোট ২৩ শতাংশ। এই ভোটের বেশ বড় একটা অংশ মতুয়াÑ যাদের প্রধান সমস্যা নাগরিকত্ব। বিজেপি তাদের জন্য নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাস করায় মতুয়ারা বিজেপির দিকে ঝুঁকে পড়ে। গত মার্চ মাসে রাষ্ট্রীয় সফরে বাংলাদেশে এসে পশ্চিমবঙ্গের মতুয়াদের ভোট টানার জন্য গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দীতে নরেন্দ্র মোদি এক সভা করে। মমতা ব্যানার্জী এর পাল্টা মতুয়াদের আরাধ্য শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মতিথিতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেন। হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন এবং গঠন করেন মতুয়া উন্নয়ন পর্ষদ ও নমঃশূদ্র বোর্ড। সার্বিকভাবে দলিত আন্দোলনের স্বীকৃতি দিয়ে চালু করেন ‘পশ্চিমবঙ্গ দলিত সাহিত্য একাডেমি’। তাছাড়া তৃণমূল কংগ্রেস দলিতদের জন্য সংরক্ষিত ৬৯ আসনের সঙ্গে সঙ্গে অতিরিক্ত ১০টি আসনে দলিত প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয়, যা বিজেপি করেনি। এসব কারণে দলিত ভোটেও তৃণমূল বিজেপি থেকে এগিয়ে আছে। বিজেপির পুরুষতান্ত্রিক চরিত্রটা পশ্চিমবঙ্গবাসীর চোখ এড়ায়নি। নানারকম প্রগতিশীল আন্দোলনের কারণে এ রাজ্যের নারী মুক্তি প্রশ্নটি বেশ জোরালো। বিজেপির বিপরীতে মমতা ব্যানার্জী হয়ে উঠেছেন নারীদের ভরসা। নির্বাচনে তাই জনপ্রিয় সেøাগান ছিল ‘বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়’। নির্বাচনে নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো; যার বৃহত্তর অংশ তৃণমূলকে ভোট দিয়েছে। বিজেপি যেভাবে নানা লোভ দেখিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের বড় বড় নেতাদের ভাগিয়ে নিচ্ছিল, সে-রকম নাজুক অবস্থায় দলকে বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে পেরেছে মমতা ব্যানার্জীর ইমেজ। সংসদীয় রাজনীতিতে ইমেজ অবশ্যই একটা ফ্যাক্টর। আমরা দেখেছি, ভারতের লোকসভা ভোটে মোদি ইমেজ কাজ করে, আর পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভা নির্বাচনে মমতা ইমেজ ফ্যাক্টর হয়ে ওঠে। এবার বিজেপি পশ্চিম বাংলায় ক্ষমতায় এলে তার প্রভাব পড়ত বাংলাদেশের রাজনীতিতে। বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি দুর্বল হলে তার প্রভাব পড়বে পশ্চিম বাংলায়। বাঙালি জাতিসত্তার একটি অংশ সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে ডুবে থাকবে, আর অন্য অংশটি অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির স্বর্গরাজ্য হবে এমনটি আশা করা বাস্তবসম্মত নয়। তাই উভয় বাংলার বাঙালিদের বাঙালি চেতনা বিকাশের কাজ সমান তালে এগিয়ে নিতে হবে। ৫০ বছর পর ভারতের পশ্চিম বাংলার মানুষ ‘জয় বাংলা’ সেøাগানকে সামনে এনে সেই সত্যকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বহুত্ববাদ, বৈচিত্র্য ও বিবিধের প্রয়োজনীয়তা বিসর্জন দিয়ে গোটা দেশে একদর্শী মতবাদ প্রতিষ্ঠায় বিজেপির বর্তমান নেতাদের যে তাগিদ, এর বিরুদ্ধে মমতা ব্যানার্জীর একক লড়াই এক ধরনের প্রতীকী ব্যঞ্জনা পেয়ে গেছে। হাজার কোটি নিয়ে প্রচার যুদ্ধে নামা মোদি-শাহকে স্তব্ধ করে মমতা এখন আক্ষরিক অর্থেই জননায়ক। মমতা বহুজাতিক ভারতের একটি রাজ্যে এখন নিঃসন্দেহে একজন জাতীয়তাবাদী নেতা।

লেখক : সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, উত্তরণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply