বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র

মাসুদ পথিক: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালি সংস্কৃতির নিবিড় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন এটা সর্বজন বিদীত। প্রকৃত রাজনৈতিক মুক্তির সঙ্গে সংস্কৃতির নিবিড় বন্ধন থাকেই। বঙ্গবন্ধুও এই বোধকে সব সময় ধারণ করেছেন। তার নজির আমরা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সর্বত্রই পাই। বিশেষ বাংলা চলচ্চিত্রের বিকাশের ধারায় আজকের বিএফডিসি স্থাপনেও ছিল বঙ্গবন্ধুর অবদান। এখনও সে ধারাবাহিকতা ধরেই এগোচ্ছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র। পৃথিবীর চলচ্চিত্র নির্মাণযাত্রার ৫০ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও তখনও ঢাকায় চলচ্চিত্র নির্মাণের কোনো ধরনের সামান্যটুকু অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।
তো, ১৯৫৩ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকার সচিবালয়ে পূর্ববঙ্গ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিচালক ড. আবদুস সাদেক স্থানীয় সংস্কৃতিসেবী, চলচ্চিত্র পরিবেশক ও প্রদর্শকদের এক সভা আহ্বান করেন। ড. সাদেক পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাথে জড়িত ছিলেন, ফলে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের মনোভাব ভালোভাবে জানতেন। তিনি উক্ত সভায় চলচ্চিত্রে পূর্ববঙ্গের অনগ্রসরতার কারণ তুলে ধরে তার সমাধানের ইঙ্গিত দেন। পূর্ববঙ্গকে স্বাবলম্বী করার জন্যই তিনি প্রদেশে চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি প্রদেশে ৯২টি প্রেক্ষাগৃহে বিদেশি ছবির বদলে যাতে স্থানীয় ছবি যেন প্রদর্শিত হয় সেজন্য ছবি তৈরির কথা বলেন। ড. সাদেকের এই আহ্বানে সেই সভায় উপস্থিত এক অবাঙালি চলচ্চিত্র ব্যবসায়ী ফজলে দোসানী বলেন, এখানকার আবহাওয়া খারাপ, আদ্রতা বেশি। কাজেই এখানে ছবি তৈরি সম্ভব নয়। দোসানীর বক্তব্যকে সেদিন চ্যালেঞ্জ করে সেই সভায় উপস্থিত তেজস্বী বাঙালি নাট্যকার আবদুল জব্বার খান বলেছিলেন, “কলকাতায় যদি ছবি হতে পারে তবে ঢাকায় হবে না কেনো? আমি প্রমথেশ বড়–য়াকে ছবির শুটিং করতে দেখেছি। কলকাতার বেশ কয়েকজন ছবির নির্মাতাও এখানে এসে ছবির শুটিং করেছেন। তাহলে এখানে ছবির শুটিং কেনো হবে না। মি. দোসানী আপনি জেনে রাখুন, আগামী এক বছরের মধ্যে যদি কেউ ছবি না করেন তবে আমি জব্বার খানই তা বানিয়ে প্রমাণ করব।” বলা যায় এই চ্যালেঞ্জের জবাব থেকেই পরের বছর আবদুল জব্বার খান শুরু করেন বাংলাদেশ তথা পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সবাক বাংলা চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’-এর কাজ। ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট আবদুল জব্বার খানের ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তি পায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও নারায়ণগঞ্জে। এ ছবির উদ্বোধন করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক।
১৯৪৭-এর দেশবিভাগের পর জনসংযোগ বিভাগের অধীনে সরকারি প্রচারচিত্র তৈরির জন্য ঢাকার তেজগাঁওস্থ বিজি প্রেসে স্থাপিত হয় প্রাদেশিক সরকারের চলচ্চিত্র শাখা। পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নির্মাণের মতো কোনো স্টুডিও ল্যাবরেটরি তখন ঢাকায় ছিল না। বায়ান্ন’র ভাষা আন্দোলনের পর এখানে পূর্ণাঙ্গ ফিল্ম স্টুডিও স্থাপনের দাবি ক্রমশই জোরদার হয়। অন্যদিকে অস্থানীয় চলচ্চিত্র ব্যবসায়ীরা কখনোই চাইতো না ঢাকায় চিত্রশিল্প গড়ে উঠুক।

১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ক্ষমতাসীন
মুসলিম লীগ সরকারের পতন হলে যুক্তফ্রন্ট সরকার পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষমতায় আসে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী।
ঢাকায় একটি স্থায়ী ফিল্ম স্টুডিও স্থাপনের ব্যাপারে মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে আলোচনা করেন আবদুল জব্বার খান, ড. আবদুস সাদেক, নূরুজ্জামান প্রমুখ। শেখ মুজিবুর রহমান তাদের স্টুডিও স্থাপনের ব্যাপারে একটি পরিকল্পনা করতে বলেন। আবদুল জব্বার খান ও তৎকালীন প্রাদেশিক সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) আবুল কালাম শামসুদ্দীন যৌথভাবে সরকারের কাছে একটি পরিকল্পনা পেশ করেন। সেই পরিকল্পনার প্রেক্ষিতে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রচেষ্টায় ১৯৫৫ সালের শেষের দিকে ইটালির একটি চলচ্চিত্র মিশন ঢাকায় আসে। ইটালীয় মিশন স্টুডিও স্থাপনের ব্যাপারে সরকারকে পরামর্শ দেয়। ১৯৫৬ সালে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে সরকার প্রদেশে চলচ্চিত্র শিল্প প্রসারের লক্ষ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করে।
১৯৫৭ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিম পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়নের লক্ষ্যে ওখানে একটি সংস্থা গঠনের জন্য ১ কোটি টাকা বরাদ্দের উদ্যোগ নেয়। এ অবস্থায় পূর্ব পাকিস্তানের চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য সমপরিমাণ অর্থ বরাদ্দের দাবি তোলেন প্রাদেশিক চলচ্চিত্র বিভাগের প্রধান নাজীর আহমেদ।
নাজীর আহমেদ তখন শিল্প দপ্তরের সচিব আসগর আলীসহ শিল্প দপ্তরের উপ-সচিব আবুল খায়েরের মাধ্যমে বিষয়টি তৎকালীন শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের নজরে আনেন। শেখ মুজিবুর রহমান বিষয়টি শুনে অতিসত্ত্বর চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা প্রতিষ্ঠার বিলের একটি খসড়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র তৈরি করার নির্দেশ দেন। তখন প্রাদেশিক আইন পরিষদের অধিবেশন শেষ হতে মাত্র দু’দিন বাকি ছিল। এ অবস্থায় নাজীর আহমেদ ও আবুল খায়ের এফডিসি বিলের কাগজপত্র তৈরি করেন।
১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল প্রাদেশিক আইন পরিষদের অধিবেশনের শেষ দিন সকালে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা বিল উত্থাপন করেন। সেদিন পরিষদে উপস্থিত ছিলেন ১১ মন্ত্রী ও ২৫০ জন সদস্য আর স্পিকার ছিলেন আবদুল হাকিম। বিল উত্থাপনের পর প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্য আবদুল মতিন, ইমদাদ আলী ও মনীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য সামান্য সংশোধনী আনেন। সংশোধনীর পর বিলটি বিনা বাধায় আইন পরিষদে পাস হয়। উল্লেখ্য, তখন প্রদেশের গভর্নর ছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক আর মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন আতাউর রহমান খান।
অতএব তার ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকার, দেশরতœ শেখ হাসিনার সরকারও জাতির পিতার পথ ধরে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। যদিও মাঝখানে ২১ বছর স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তানপন্থিদের কারণে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ও ইতিহাস পশ্চাদগামী ছিল।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় চলচ্চিত্রের জন্য নতুন প্রজেক্ট বাস্তবায়নের পথে। সারাদেশে নতুন সিনেপ্লেক্সে নির্মাণ থেকে শুরু করে চলচ্চিত্র নির্মাণের অনুদান দেওয়া, হল নির্মাণের জন্য ঋণ সহায়তা প্রজেক্ট বাস্তবায়নের পথে।

লেখক : সহ-সম্পাদক, উত্তরণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply