বিশ্ব আর্চারিতে বাংলাদেশের ইতিহাস : রোমান-দিয়ার রুপা জয়

আরিফ সোহেল: সুইজারল্যান্ডে শেষ পর্যন্ত ইতিহাস গড়া হলো না। বাজলো না বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। উড়ল না রোমান সানা ও দিয়া সিদ্দিকীর মাথার ওপরে লাল-সবুজের পতাকা। বিশ্বকাপ আর্চারির ফাইনালে হেরে গেছেন রোমান-দিয়া জুটি। বাংলাদেশ জিতেছে রুপা। তারপরও এটা বাংলাদেশের জন্য নতুন এক মাইলফলক; বিরল ইতিহাস। সুইজারল্যান্ডে বিশ্বকাপ আর্চারির স্টেজ-টু’তে রোমান সানা ও দিয়া সিদ্দিকীকে রিকার্ভের মিশ্র ইভেন্টের ফাইনালে হারিয়েছেন নেদারল্যান্ডসের অভিজ্ঞ দুই তীরন্দাজ গ্যাব্রিয়েলা শুলুসার ও সেফ ফন ডেন বার্গ। ৫-১ সেট পয়েন্টে হারিয়ে স্বর্ণ জিতেছে নেদারল্যান্ডস। পাঁচ সেটের খেলা নিষ্পত্তি হয়েছে তিন সেটেই।
সুইজারল্যান্ডে বিশ্বকাপ আর্চারির শুরুর আগেই একটা স্পটলাইটে চলে এসেছিলেন রোমান সানা। আসরে চমক দিতে পারেন কারা; তাদের একটা তালিকা করা হয়। বিশ্ব আর্চারি ফেডারেশন প্রকাশিত অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে সেই তালিকার টপফাইভ জরিপে সবার ওপরে ছিলেন রোমান সানা। ফলে আসর শুরু হওয়ার আগেই রোমান সানাকে ঘিরে আশার বাতি জ্বলজ্বল করছিল।
বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ আসরে রোমান সানা তার প্রিয় ইভেন্টে খেই হারালেও। রিকার্ভের মিশ্র ইভেন্টের ফাইনাল নিশ্চিত করে ইতিহাস গড়েছিলেন। চূড়ান্ত মঞ্চে বাংলাদেশের রোমান-দিয়ার স্বপ্ন জয় না হলেও, দেশবাসীকে দেওয়া কথা রেখেছেন রোমান। সৌরভ ছড়িয়েছেন বিশ্বকাপ পদকমঞ্চের বেদীতে দাঁড়িয়ে। ঢাকা ছাড়ার আগে রোমান সানা বলেছিলেন, ‘আমরা বিশ্বকাপে ভালো কিছু করার জন্যই যাচ্ছি। নিজেদের সেরাটা উজাড় করে দিতে চাই সুইজারল্যান্ডে। ফাইনালের পদকমঞ্চে ওঠাই আমার একমাত্র লক্ষ্য।’ সেই লক্ষ্য পূরণ করে কথা রেখেছেন দেশসেরা রোমান।
আর দেশে ফিরে রোমান সানা বলেছেন, ‘আমার লক্ষ্য এবার টোকিও অলিম্পিকে দেশকে ভালো কিছু উপহার দেওয়া। তার আগে আমরা আরেকটা কোটা প্লেস নিশ্চিত করতে চাই। এই আসরের পারফরমেন্স আগামী মাসে প্যারিসে স্টেজ-থ্রি-তে বাড়তি আত্মবিশ্বাস জোগাবে।’ ফাইনালে ছন্দ হারিয়ে ফেলার জন্য নিজের অনভিজ্ঞতাকেই দুষেছেন দিয়া সিদ্দিকী, ‘আজ অনেক বাতাস ছিল। যে কারণে স্বাভাবিক পারফরমেন্স করতে পারিনি। তাছাড়া আমি এখানে খুব কম অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছিলাম। বলতে গেলে আমি একেবারেই নতুন। তবু যেটা অর্জন করছি, তার জন্য আল্লাহর কাছে অশেষ রহমত।’ ফাইনালে হেরেও খুশি দিয়া সিদ্দিকী বলেছেন, ‘আসলে বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে ভালো কিছু করার জন্য অভিজ্ঞতা দরকার। কিন্তু এমন মঞ্চে আমি একেবারে নতুন। তবুও যা অর্জন করেছি তাতে আমি অনেক খুশি।’
দুই বছর আগে নেদারল্যান্ডসে বিশ্ব আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে ব্রোঞ্জ জিতে সবাইকে চমকে দিয়েছিলেন রোমান সানা। সেবার বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ের চতুর্থ স্থানে থাকা ইতালির মাউরো নেসপোলিকে হারিয়ে ইতিহাস গড়েন বাংলাদেশের এই তীরন্দাজ। আর্চারির বিশ্বমঞ্চে সেটাই ছিল কোনো বাংলাদেশি তীরন্দাজের প্রথম পদক জয়। এমন বিরল কীর্তি গড়ার সুবাদে প্রথম তীরন্দাজ হিসেবে রোমান সানা সুযোগ পেয়েছেন সরাসরি টোকিও অলিম্পিকে অংশ নেওয়ার। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে রোমান খেলেছেন নেপালের পোখারায় দক্ষিণ এশিয়ান গেমসে। যেখানে বাংলাদেশ দল গড়েছিল ‘পারফেক্ট টেন’ রেকর্ডের বিরল কীর্তি, রোমান জেতেন রিকার্ভের এককে স্বর্ণ। আট সদস্যদের দল নিয়ে রোমান সানারা প্রায় দেড় বছর পর বিশ্ব আর্চারির মঞ্চে খেলতে গিয়েছিলেন সুইজারল্যান্ডে। এবারের বিশ্বকাপে ৩৫ দেশের ২৩৫ জন তীরন্দাজ অংশ নিয়েছেন। রোমানদের লড়তে হয়েছে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ইতালি, রাশিয়ার সেরা তীরন্দাজদের সঙ্গে। বিদেশের মাটিতে এর আগে বেশ কটি পদক জিতেছেন রোমান সানা। ২০১৪ সালে প্রথম এশিয়ান আর্চারি গ্রাঁ প্রি এবং ২০১৭ সালে কিরগিজস্তানে আন্তর্জাতিক আর্চারি টুর্নামেন্ট-এ স্বর্ণ জিতেছিলেন তিনি। ২০১৯ সালে হল্যান্ডে বিশ্ব আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে রিকার্ভ ইভেন্টে ব্যক্তিগত ব্রোঞ্জ জয়। সর্বশেষ ২০১৯ সালে ফিলিপাইনে এশিয়ান র‌্যাংকিং আর্চারিতে রিকার্ভ ইভেন্টের ফাইনালে চীনের লি শি ঝেনঝিকে ৭-৩ ব্যবধানে হারিয়ে স্বর্ণ জয় দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আলোচনায় নিয়ে এসেছিল রোমান সানাকে।
সুইজারল্যান্ডের লুজানের বিশ্ব আর্চারি এক্সিলেন্স সেন্টারে রিকার্ভের মিশ্র ইভেন্টের ফাইনালে প্রথম সেট থেকেই পিছিয়ে পড়েছিল বাংলাদেশ। প্রথম সেটে বাংলাদেশের দুই তীরন্দাজ মেরেছেন যথাক্রমে ৭, ৭, ৮ ও ৮ (৩০ পয়েন্ট)। পক্ষান্তরে নেদারল্যান্ডসের স্কোর ৯, ১০, ৮, ৯ (৩৬ পয়েন্ট)। দ্বিতীয় সেটে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় কিছুটা সফল হয়েছিল বাংলাদেশ। এই সেটে দুই দলই পয়েন্ট ভাগাভাগি করেছে। দুই দলই পেয়েছে সমান ৩৫ পয়েন্ট। কিন্তু তৃতীয় সেটে নেদারল্যান্ডসের দুই তীরন্দাজ পেয়েছেন ৩৭ পয়েন্ট (১০, ৮, ১০, ৯)। রোমান ও দিয়ার পয়েন্ট ৩৪ পয়েন্ট (৮, ৮, ৯, ৯)। বিশ্বকাপের প্রথম রাউন্ডে র‌্যাংকিংয়ের ১৬ নম্বরে থাকা ইরানকে ৫-৩ ব্যবধানে হারিয়েছিল বাংলাদেশ দল। দ্বিতীয় রাউন্ডে র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষ দল জার্মানি ন্যূনতম পাত্তা না দিতে বাংলাদেশ হারিয়েছে ৫-১ ব্যবধানে। কোয়ার্টার ফাইনালে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর বাংলাদেশ র‌্যাংকিংয়ের ৯-এ থাকা স্পেনকে হারিয়েছে টাইব্রেকারে। ম্যাচে ৫-৪ ব্যবধানে জিতে রোমান ও দিয়া জুটি পা রেখেছিল সেমিফাইনালে। ফাইনালের পথে কানাডাকে ৫-৩ সেটে উড়িয়ে দিয়েছে বাংলাদেশ। ফলে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় স্টেজে লাল-সবুজ জার্সিধারীদের পদক পাওয়া নিশ্চিত হয়। ফাইনালে হেরে স্বর্ণ জিততে না পারলেও আর্চারির বিশ্ব আসরে এটাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন। বাংলাদেশের এ সাফল্যে দলের সকল খেলোয়াড়, কোচ, কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. জাহিদ আহসান রাসেল এমপি। অভিনন্দন বার্তায় প্রতিমন্ত্রী বলেছেন, ‘আর্চারি ওয়ার্ল্ড কাপে বাংলাদেশ আর্চার দল রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করায় আমি আনন্দিত ও গর্বিত। আমি বাংলাদেশ আর্চারি দল বিশেষ করে রোমান সানা ও দিয়া সিদ্দিকীকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমি আশা করি, সেদিন বেশি দূরে নয় যেদিন আর্চারিতে বাংলাদেশ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হবে এবং বিশ্ব অলিম্পিকে আমাদের আর্চাররা স্বর্ণ জয় করবে।’
বাংলাদেশের ক্রীড়ামহলে দৃষ্টি ক্রিকেট ও ফুটবল ঘিরে। অন্য খেলার প্রতি কারোর তেমন আগ্রহ নেই বললেই চলে। তবে দৃশ্যটা কিছু পাল্টে যাচ্ছে দিন দিন। পাল্টে দিচ্ছেন কখনও আর্চার রোমান সানারা; কখনও শুটার বাকি-নিকিরা; কখনও ভালোত্তোলক মাবিয়ারা। এর কারণও আছে। বাংলাদেশের অনেক খেলোয়াড়ের হিটেই আউট হয়ে মিশন শেষ। তাই স্বপ্ন উন্মাদনা-উচ্ছ্বাসের সঙ্গে ক্রিকেট অনেকটাই; সঙ্গে ফুটবল মিশে আছে। ঘুরে দাঁড়ানো বাংলাদেশ প্রতিদিন যে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করছে সেখানে রোমান সানা-দিয়ারা আলোর বাতিঘর হয়েই থাকবেন।

লেখক : সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, উত্তরণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply