ক্লান্তি : স্বাভাবিক না-কি অন্যকিছু?

সালাহউদ্দীন আহমেদ আজাদ:

কতখানি ক্লান্তি স্বাভাবিক?
‘ক্লান্ত’ এই শব্দটি সব ডাক্তারকে প্রায়ই শুনতে হয়। ক্লান্ত লাগাটা তখনই স্বাভাবিক যখন আগের রাতে আপনার ঘুম ঠিকমতো হয়নি বা আপনি দেরিতে ঘুমাতে গেছেন। কিন্তু স্বাভাবিক হোক বা অস্বাভাবিকই হোক, ক্লান্তি লাগাটা একটা সমস্যা হতে পারে, যদি সেটি আপনার স্বাস্থ্যহানি ঘটায় এবং আপনাকে বিপদে ফেলে। যেমনÑ ড্রাইভিংয়ের সময় ঘুমঘুম ভাব চলে আসাটা বিপদ ডেকে আনতে পারে। এই সমস্যা খুব বেশি আকারে দেখা দিলে ডাক্তারের পরামর্শ নিন, কেননা এটা কোনো রোগের উপসর্গ হতে পারে।

কখন ডাক্তারের শরণাপন্ন হবেন?
আপনার উচিত হবে ডাক্তারের সাথে দেখা করা যখন- অস্বাভাবিক ক্লান্তির কোনো কারণ আপনি খুঁজে পাচ্ছেন না, শরীরের তাপমাত্রা সাধারণের চেয়ে বেশি, কোনো কারণ ছাড়াই দেহের ওজন কমেছে, ঠা-া তাপমাত্রায় কাবু হয়ে পড়েন, সব সময় ঘুমাতে এবং ঘুম থেকে সময়মতো উঠতে সমস্যা হয়, যদি মনে করেন আপনি মানসিক চাপে ভুগছেন।

যেসব কারণে সব সময় ক্লান্তিবোধ হতে পারে-

১. পরিশোধিত শর্করা বা রিফাইন্ড কার্বোহাইড্রেট বেশি খেলে
কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা আমাদের শক্তি জোগায়। আমরা যখন শর্করা খাই তখন আমাদের শরীর এটাকে চিনিতে রূপান্তরিত করে, যাতে সেটি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা যায়। যখন চিনি এবং প্রক্রিয়াজাত খাদ্য গ্রহণ করা হয়, তখন তা আমাদের শরীরে ব্লাড সুগারের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এটা তখন অগ্নাশয়কে সিগন্যাল দেয় যেন সেই রক্ত থেকে চিনিকে শরীরের কোষে স্থানান্তরের জন্য অধিক পরিমাণে ইন্সুলিন উৎপাদন করে। হঠাৎ করে এই ব্লাড সুগার বেড়ে আবার তা কমে যাওয়ার ফলে আপনি ক্লান্তিবোধ করেন। তাই অতিমাত্রায় রিফাইন্ড কার্ব খাওয়া ক্লান্তির একটি কারণ। পরিশোধিত শর্করাযুক্ত খাবার হলো সেসব খাবার যেগুলো প্রক্রিয়াজাতকরণের মধ্য দিয়ে গেছে এবং যার ফলে ফাইবার বা আঁশ এবং খনিজ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। এসব প্রক্রিয়াজাত শর্করায় উচ্চমাত্রার কর্ন সিরাপ থাকে। যেসব খাবার পরিশোধিত শর্করা দিয়ে তৈরি : প্রক্রিয়াজাত সিরিয়াল, ময়দার রুটি, পাস্তা, ভাত, কেক এবং অন্যান্য বেক করা পণ্য ও মিষ্টি।
২. আসীন জীবনধারা (Sedentary lifestyle)
সারাক্ষণ ঘরে বসে থাকা এবং শারীরিক ক্রিয়াকলাপ কম হলে ক্লান্তিবোধ হতে পারে। অনেক মানুষ আছেন যারা নালিশ করেন যে তারা ক্লান্তির কারণে ব্যায়াম করতে পারেন না। এটা হতে পারে ক্রনিক ফ্যাটিগ সিন্ড্রোমের (Chronic fatigue syndrome) কারণে। নিয়মিত ব্যায়াম করলে এই ক্লান্তি দূর হতে পারে।

৩. পর্যাপ্ত ঘুম এবং উন্নতমানের ঘুম না হওয়া
পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া ক্লান্তির কারণ হতে পারে। যখন আপনার উন্নতমানের ও পর্যাপ্ত ঘুম হয় তখন আপনি সকালে ঘুম ভাঙলে ফ্রেশ, তেজোদীপ্ত এবং জাগ্রতবোধ করবেন। এর ব্যতিক্রম হলে ফল হবে বিপরীত। ভালো ঘুম চাইলে প্রতিরাতে একই সময়ে ঘুমাতে যেতে হবে, ঘুমানোর আগে একটু রিল্যাক্স করতে হবে এবং সারাদিন পর্যাপ্ত ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটি করতে হবে। কিন্তু, তারপরও যদি ঘুমের সমস্যা হয় তাহলে বুঝতে হবে আপনার ঘুমের রোগ আছে এবং ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।

৪. পর্যাপ্ত ক্যালরি গ্রহণ না করা
খাবারে পর্যাপ্ত ক্যালরি না থাকলে ক্লান্তিবোধ হওয়া স্বাভাবিক। যখন আপনি কম ক্যালরি গ্রহণ করেন তখন শক্তি ধরে রাখতে আপনার মেটাবলিজম ধীর হয়ে পড়ে এবং আপনাকে ক্লান্ত করে তোলে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বয়সের সাথে সাথে ক্যালরি গ্রহণের মাত্রা বাড়ানো উচিত। এছাড়া যখন আপনার ক্যালরি গ্রহণ কমে যায় তখন ভিটামিন এবং মিনারেল গ্রহণও কমে যায়। খাবারে কম পরিমাণে ভিটামিন ডি এবং আয়রন কম থাকলে তা আপনাকে ক্লান্ত করবে। আপনার লক্ষ্য যদি হয় ওজন কমানো, তারপরও অতিমাত্রায় ক্যালরি গ্রহণ কমাবেন না। শরীরের মেটাবলিজম ধীর হওয়া রোধ করতে প্রত্যেকের উচিত প্রতিদিন ১২০০ ক্যালরি খাওয়া।

৫. ভুল সময়ে ঘুমানো
যারা শিফটে কাজ করেন, যেমন রাতে কাজ করে দিনে ঘুমান তাদের দেহের সারকেডিয়ান রিদম (Circadian rhythm)-এর ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়, ফলে ক্রনিক ফ্যাটিগ সিন্ড্রোম (chronic fatigue syndrome) হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে ২-৫ শতাংশ শিফট ওয়ার্কাররা ঘুমের সমস্যায় ভোগেন। শুধু এক বা দু-রাত জেগে থাকার চেষ্টা করলেও তা আপনার ক্লান্তি অনেক বৃদ্ধি করতে পারে। তাই যখনই সম্ভব রাতে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নেওয়া উচিত।

৬. পর্যাপ্ত প্রোটিন না খাওয়া
অপর্যাপ্ত প্রোটিন ক্লান্তি বাড়াতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রোটিন খেলে তা কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের তুলনায় বেশিমাত্রায় শরীরের মেটাবলিক রেট বৃদ্ধি করে। দক্ষিণ কোরিয়ার ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর চালানো এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা সপ্তাহে অন্তত দুদিন বেশি পরিমাণে প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার; যেমন- মাছ, মাংস, ডিম এবং বীন খেয়েছে তাদের ক্লান্ত ভাব অনেক কম ছিল। বডি বিল্ডারদের ওপর চালানো আরেকটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা বেশিমাত্রায় প্রোটিন খান তাদের মধ্যে ক্লান্ত ভাব অন্যদের তুলনায় কম। তাই আপনার ক্লান্তি দূর করতে এবং মেটাবলিজম শক্তিশালী রাখতে বেশি বেশি প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার খান।

৭. অপর্যাপ্ত পানি পান
শরীরকে শক্তিশালী রাখতে দরকার শরীর জলয়োজিত (hydrated) রাখা। আপনার শরীরে প্রতিদিন সংঘটিত বায়োকেমিক্যাল রিয়েকশনের ফলে অনেক পানি শরীর থেকে নিঃসরণ হয়। এই ঘাটতি পূরণের জন্য সব সময় শরীরে পানির প্রয়োজন হয়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, সামান্যতম ডিহাইড্রেশনও ক্লান্তির কারণ হতে পারে। ট্রেডমিল ব্যবহারকারী একদল পুরুষের ওপর চালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ট্রেডমিল চালানোর ফলে তাদের শরীরের পরিমাণের ১ শতাংশ পানি খরচ করেছেন, তারা একই ব্যায়াম করে হাইড্রেটেড থাকা অবস্থার চেয়ে বেশি ক্লান্তবোধ করেছেন।

৮. এনার্জি ড্রিঙ্ক
বাজারে পাওয়া এনার্জি ড্রিঙ্কসে আছে : * ক্যাফিন * চিনি * এমিনো এসিড * ভিটামিন বি। এনার্জি ড্রিঙ্কে থাকা ক্যাফিন এবং চিনির ফলে এটা আপনাকে কিছু সময়ের জন্য শক্তি জোগাবে। দুর্ভাগ্যবশত ক্ষণস্থায়ী এই শক্তি চলে যাবে যখন চিনি এবং ক্যাফিনের কার্যকারিতা কমে যাবে এবং আপনাকে করে তুলবে ক্লান্ত। ৪১ জন প্রাপ্তবয়স্কের ওপর চালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এনার্জি ড্রিঙ্ক পানের ফলে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে শক্তি এবং সচেতনতা বৃদ্ধি পায়; কিন্তু পরদিন দিনের বেলা বেশিমাত্রায় ঘুমঘুম ভাব দেখা দেয়। শুধু এনার্জি ড্রিঙ্ক নয়, যে কোনো ক্যাফিনেটেড পানীয় যেমন- কফি, কোক ইত্যাদি পান করলেও এই সমস্যা দেখা দিতে পারে। কফি, কোক ইত্যাদি রাতে পান না করে দিনের বেলা পান করা উচিত।

৯. মানসিক চাপ
দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ বা ক্রনিক স্ট্রেস আপনার শক্তির মাত্রা এবং জীবনের মানের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। সামান্য মানসিক চাপ থাকাটা স্বাভাবিক; কিন্তু বেশিমাত্রায় মানসিক চাপ আপনাকে ক্লান্ত করে তুলতে পারে। যদিও মানসিক চাপ থেকে পুরোপুরি মুক্তি পাওয়া কঠিন, তথাপি কৌশল অবলম্বণ করলে খুব বেশি ক্লান্তি থেকে রক্ষা পেতে পারেন। মানসিক চাপ মুক্তির অন্যতম উপায় হচ্ছে যোগ ব্যায়াম বা ইয়োগা এবং মেডিটেশন।

যেসব খাবার ক্লান্তি কমাতে পারে
কলা : কলায় আছে পটাশিয়াম, ভিটামিন বি-৬, ফাইবার (আঁশ) এবং শক্তি জোগানোর জন্য পর্যাপ্ত কার্বোহাইড্রেট। দিনে ১-৩টি কলা খাওয়াই যথেষ্ট।
স্বল্প চর্বিযুক্ত (Low-fat) প্রোটিন : মুরগির মাংস, টার্কির মাংস বা তৈলাক্ত মাছ।
বাদাম : কাঠবাদাম (Almond), আখরোট (Walnut), কাজুবাদাম (Cashew), ইত্যাদি বাদামে আছে প্রোটিন, শর্করা এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি। শুধু একমুঠো বাদাম আপনাকে দিতে পারে সারাদিনের প্রয়োজনীয় শক্তি।
ডিম : ডিমে আছে প্রচুর প্রোটিন, যা আপনাকে দিবে প্রচুর শক্তি এবং আপনার ব্লাড সুগার বৃদ্ধি করবে না। ডিমে থাকা লুসিন (Leucine) নামক এমিনো এসিড শক্তি জোগাতে সহায়তা করে।
আপেল : প্রতিদিন একটি আপেল শুধু ডাক্তারকেই দূরে রাখবে না, এটা আপনাকে দেবে শক্তি। আপেলের প্রাকৃতিক চিনি ও ফাইবার একসাথে কাজ করে আপনাকে শক্তি জোগাতে। আপেল খেলে খোসাসহ পুরো আপেল খাওয়া উচিত, আপেল জুস ততটা কার্যকর নয়।
পানি : পানি শরীরের শক্তি নিয়ন্ত্রণে কার্যকরি ভূমিকা রাখে। দিনে ১.৮৯ লিটার পানি একজনের জন্য পর্যাপ্ত। মেপে পান করতে চাইলে প্রতিদিন ৮ আউন্স কাপের ৮ কাপ পান করুন।

পরিশেষে
সব সময় ক্লান্তিবোধ করার অনেক কারণ থাকতে পারে। প্রথমেই মনে করবেন না আপনার ক্লান্তি কোনো খারাপ রোগের লক্ষণ। এটা খুব সাধারণ কারণেও হতে পারে। আপনার খাদ্যাভ্যাস, শরীর চর্চা এবং মানসিক চাপ আপনার ক্লান্তির কারণ হতে পারে। সুসংবাদ হচ্ছে, খাদ্যাভ্যাস এবং জীবনধারার সামান্য পরিবর্তন আপনার ক্লান্তি দূর করে আপনার জীবনকে আরও সুন্দর ও গতিশীল করতে পারে।

লেখক : খাদ্য, স্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিষয়ক গবেষক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply