ফিরে দেখা- আপন ভুবন

সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের ছেলেরা সেøাগানের মতো চিৎকার করে বলে, আমার টুঙ্গিপাড়া, আমার টুঙ্গিপাড়া। মুজিব হাসতে হাসতে তালি দেয়। সব ছেলের উৎফুল্ল চেহারায় টুঙ্গিপাড়ার সবুজ প্রকৃতি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। সবাই পৌঁছে যায় দরিদ্র মানুষদের কুঁড়েঘরে। একে একে কথা বলেন মুজিব। খোঁজখবর নিয়ে ফিরে আসেন
বাজারে। চাল কিনে ছেলেদের বলেন, চল চাল দিয়ে আসি।

সেলিনা হোসেন: দুদিন আগে ঢাকা থেকে টুঙ্গিপাড়ার বাড়িতে এসেছেন মুজিব। টুঙ্গিপাড়ায় ঘুরতে আসেন নিজের ভুবনের নতুন আলোর বিচ্ছুরণ দেখতে। প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে সৌন্দর্যের আনন্দ অনুভব করেন বুক ভরে। কিন্তু কুঁড়েঘরে বিচ্ছুরণ নাই। দারিদ্র্যের চাপে মানুষের জীবন কুঁকড়ে থাকে। চেহারার মলিনতা দেখে চোখে পানি আসার উপক্রম হয়। এই দারিদ্র্য মানতে পারে না মুজিব। দেশজুড়ে দারিদ্র্যের বিভীষিকা তাকে মর্মাহত করে।
এখন তো তার দিনযাপন হচ্ছে ঢাকায়। রাজনীতি করছেন। চুয়ান্নর নির্বাচনে জিতেছেন। মনে হয় পথচলার দরজা খুলে গেছে। সেটা আর কোনোদিনই বন্ধ হবে না। এখন তো দিন ঢাকাতে কাটছে; কিন্তু টুঙ্গিপাড়ার মেঠোপথে হেঁটে যাওয়া সীমাহীন ভালোলাগার নির্ণিমেষ জ্যোতি। এই টান ফুরোয় না কোনোদিন। দেশজুড়ে এই দারিদ্র্যের অবস্থা কবে কাটিয়ে উঠতে পারবে মানুষ? প্রশ্নটি নিজেকে করা। নিজেকে দিয়েই তার উত্তর খোঁজা।
টুঙ্গিপাড়ার মেঠোপথে হাঁটতে হাঁটতে একসময় শুনতে পান মুজিব যে কোনো এক কুঁড়েঘর থেকে প্রবলভাবে কান্নার শব্দ আসছে। সঙ্গের ছেলেদের দিকে তাকিয়ে বলেন, কে কাঁদছে এমন করে? সেলিম তুই জানিস?
– আমি তো জানি না মিয়াভাই।
– খোঁজ নিয়ে আমাকে জানাবি। এখন কাঁদে কাঁদুক। কাঁদলে দুঃখের প্রেসার কমবে। আমি কালকে যাব ওই কুঁড়েঘরে। কেন কাঁদছে তা আমার জানতে হবে। দেখতে হবে কী হয়েছে?
– তাহলে চলেন অন্যদিকে যাই।
– চল, এই পথে হাঁটতে হাঁটতে যাদের সঙ্গে দেখা হবে তাদের খোঁজখবর নেব।
পেছন থেকে দুজনে ডাকে, মিয়াভাই, মিয়াভাই দাঁড়ান।
ঘুরে দাঁড়িয়ে মুজিব দেখলেন নাসিরুদ্দিন আর হাবিবুল্লাহ আসছে। দুজনে খেতখামারে কাজ করে। দিনের ভাত দিনে খায়। ওরা কাছে এলে তিনি বলেন, কেমন আছিস রে তোরা দুজনে?
নাসিরুদ্দিন বলে, আমাদের আর থাকা কি মিয়াভাই? নুন আনতে পান্তা ফুরায়।
– মুখস্ত কথা বলছিস কেন?
– বলব না কেন? কাজ না থাকলে ভাত নাই। আমাদের তো ধানের গোলা নাই।
– আমি তো জানি রে।
– আপনি কয়দিনের জন্য এসেছেন?
– দেখি কয়দিন থাকতে পারি।
– এমন কতা শুনব না। এক মাস থাকেন।
– আমার তো অনেক কাজ আছে ঢাকায়।
– আমরাই তো আপনার কাজ। টুঙ্গিপাড়ার কাজ। আপাকে আমাদের কাজ শেষ করতেই হবে। আমরা যেন নুন-পান্তা একসঙ্গে পাই।
– আমি চেষ্টা করব রে ভাইরা। এটা তো আমার রাজনীতির কথা। মানুষের অধিকার অর্জন করার জন্য আমি জীবন দিয়ে খাটব।
– আল্লাহর রহমত, আপনার জন্য দোয়া করব।
– যাই আমরা। ক্ষেতের কাজে নামা লাগবে।
– ঠিক আছে, তোরা যা। ভালো করে কাজ করবি, যেন তোদের ভালো হয়। ক্ষেতের ফসলও ভালো হয়। তাহলে সবদিক ভালো হয়ে উঠবে।
– দোয়া করেন আমাদের জন্য। আপনার দোয়া মাথায় নিয়ে গেলাম।
মুজিব ওদের মাথায় হাত রাখেন। ওদের চলে যাওয়া দেখেন। চোখের সামনে ফুটে ওঠে দিগন্তবিথারী সবুজ মাঠ। মধুমতি নদী- দূরের আকাশ। মুজিব মনে মনে বলেন, আমার স্বপ্নের পটভূমি।
তখন দেখতে পান দুলাল দৌড়াতে দৌড়াতে আসছে। কাছে এসে বলে, আমি ওই ঘরের কান্নার খবর নিয়ে এসেছি মিয়াভাই।
– কী হয়েছে?
খালার ছেলে নজরুল ভাই ঢাকায় রিকশা চালাতো। অ্যাকসিডেন্টে মারা গেছে।
– ওহ্ হো, চল দেখতে যাই। আহা রেÑ
সবাই মিলে দ্রুত হেঁটে কুঁড়েঘরের কাছে আসে। কান্নার শব্দ তখনও চারদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে। ঘরের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকেন মুজিব। তার চোখও সজল হয়ে ওঠে। দুলাল ঘরের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলে, মিয়াভাই বাড়িতে আর কেউ নেই। আমি দেখে গিয়েছিলাম। আমরা দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে দেখি খালাকে?
– যা, আমি এখানে দাঁড়াচ্ছি।
খানিকক্ষণ পরে দুলাল দরজা খুলে বেরিয়ে আসে। ভেতরে কান্নার শব্দ নেই। ফোঁপানির শব্দ আসছে।
– মিয়াভাই ভেতরে চলেন।
দুজনে ঘরে ঢুকলে কাঁদতে কাঁদতে উঠে দাঁড়ায় নজরুলের মা ফাতেমা খাতুন। মুজিবের দিকে তাকিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে, বাবা খোকা তুই আসছিস। ওরে আমার সোনার পোলা। আমার পাশে আয়। বস।
মুজিব একটি মাদুরের ওপর বসে। ফাতেমা খাতুন হাত বাড়িয়ে মুজিবের হাত ধরে। বলে, আমার পোলাডার কথা কি তোর মনে আছে খোকা? ছোটবেলায় ও তোর সাথে ইস্কুলে পড়ছে খোকা।
– আমার সাথে তো কত ছেলে স্কুলে পড়েছে। সবার কথা এখন মনে নাই। তাছাড়া এখন তো ঢাকায় থাকি। অনেকের সঙ্গে দেখা হয় কম।
– আমার ছেলেটির কথা তোর মনে আছে খোকা।
– আমার সঙ্গে পড়া ছেলেরা কে কোথায় গেছে তা কি মনে রাখা সম্ভব। কত বছর পার হয়ে গেল।
– আহা রে পোলা। তোরে দেখলে আমার চোখ পানিতে ভাসে। তোরেও আমি অনেক বছর দেখি নাই। ইলেকশনের সময় যে আসছিলি তখন আমি তোরে ভোট দিছিলাম।
– ভোট তো দিবেনই। টুঙ্গিপাড়ার সবাই আমাকে ভালোবাসে।
– আমাগো লাগি তোরও প্রাণের টান আছে। আমার পোলাডা গেলো, অহন আমি ক্যামনে দিন কাটামু?
– চিন্তা করবেন না। আমি থাকব আপনার পাশে।
– আমার পোলাটারে তুই একটা জামা দিছিলি রে খোকা।
– ও তাই? কবে?
– বিশ বছর আগে। ও বিষ্টিতে ভিজা ইস্কুল থাইকা আসতে ছিল। বিষ্টি থামলে তুই কইছিলি আমার তো ছাতা আছে জামা ভিজে নাই। তোর জামা খোল। আমারটা গায় দিয়া বাড়ি যা। আমার পোলাতো তোর কাছ থাইকা জামা পাইয়া খুশিতে লাফাইতে লাফাইতে বাড়ি আইছিল।
– এখন বুঝেছি। ওর নাম নজরুল ছিল। আমার সঙ্গে তো অনেকদিন যোগাযোগ নাই। ও কবে ঢাকায় গেল?
– মাস ছয় আগে। আমারে কইল বাড়িতে বইসা থাইকা লাভ নাই। ঢাকায় গিয়া রিকশা চালাইয়া কিছু কামাই কইরা আনি। আমি যাইতে না করছিলাম। কিন্তু আমার কথা হুনল না। চইলা গেল। অহন ওর লগে আমার শ্যাষ দেখাটাও হইল না। কবরও দেইখতে পারুম না।
– কোথায় কবর দিয়েছে?
– শুনছি, আজিমপুর গোরস্তান।
– আমি আপনাকে ওর কবর দেখাতে নিয়ে যাব।
আঁতকে উঠে চিৎকার করে কান্না শুরু করে ফাতেমা খাতুন। মুজিব চুপচাপ বসে থাকে। তাকে থামানোর চেষ্টা করে না। ভাবে, এই বুকভরা আর্তনাদ সন্তানের জন্য মায়ের। তাকে থামানো উচিত না। থামালে শোকে আঘাত করা হবে। জোর করে থামানোর চেষ্টা না করে কাঁদতে দেয়াই উচিত। তাহলে শোক হালকা হবে। নিজেকে স্থির করতে পারবে। বেশ কিছুক্ষণ কেঁদে একসময় থেমে যায় ফাতেমা খাতুন। শাড়ির আঁচল দিয়ে দুহাতে চোখ মোছে। মুজিব তার মাথার ওপর হাত রেখে বলে, আপনি আমার সঙ্গে ঢাকায় যাবেন?
– যামু, যামু। তুই আমারে আবার বাড়িতে আনবি তো?
– হ্যাঁ, আনব। আপনাকে বাড়িতে রেখে যাব আমি।
– তুই কোনদিন যাবি?
– যাওয়ার আগের দিন আপনাকে বলে যাব। আপনি তৈরি থাকবেন।
– আয় তোরে একডা জিনিস দেহাই।
ফাতেমা খাতুন উঠে দাঁড়াতে গিয়ে আবার বসে পড়ে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ। ঠিকমতো দাঁড়াতে কষ্ট হয়। তাছাড়া এমন কান্নাকাটি করার পরে ক্লান্তি চেপে বসেছে। তারপরও বসে বসে নিজেকে টেনে নিয়ে যায় ঘরের কোনের টিনের বাক্সটার কাছে। বাক্স থেকে একটা ছোট শার্ট বের করে মেলে ধরে মুজিবের দিকে তাকিয়ে।
– কি রে চিনতে পারছস?
– হ্যাঁ চিনি খালা। শার্টটা আমি নজরুলকে দিয়েছিলাম। আপনি এটা এমন যতœ করে রেখে দিয়েছেন?
– আমার ছেলেই রাখেছে। ও বলত এই শার্ট আমার স্মৃতি। টুঙ্গিপাড়ার একটি ছেলে নিজের জামা গায়ে থেকে খুলে আর একটি ছেলেকে দেয় এটা একটা বড় ঘটনা। আমি বড় হলে সবাইকে খোকার কথা বলব। মানুষজনকে জামাটা দেখাব। সবাইকে বলব আমরা সবাই যেন ওর মতো হতে পারি। গরিব মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াব। আমি বলতাম তুই কী করে দাঁড়াবি? কেন দাঁড়াতে পারব না। যার পেট খালি থাকে এমন একজনকে তো ভাত খাওয়াতে পারব। এটা আমি খোকার কাছ থেকে শিখেছি।
– বাহ, বেশ তো। ও সামনে থাকলে ওকে আমি বুকে জড়িয়ে রাখতাম। আমি তো চাই আমাদের এই গরিব দেশে ওর মতো হাজার হাজার মানুষ হোক। তাহলে আমাদের দুঃখী মানুষদের কষ্ট অনেক কমবে।
– ওরে খোকা আমার পোলাটা তোর কথা খুব মনে রাখছে। মাসখানেক আগে একবার বাড়িতে আসছিল। আমারে কয়, মাগো রাস্তার ধারে কত পোলাপান গড়ায়। আমি ওগোরে বাদাম-বিস্কুট কিনা দেই। ওরা খুশিতে টগবগ করে। কখনও কখনও কয়, আমাগোরে একটু রিকশায় চড়াইয়া ঘুরাও। আমি ওগোরে ঘুরাই। রাস্তার মানুষেরা আমারে দেইখা হাসে।
– আহা রে, ও যদি বেঁচে থাকত ওকে আমি বন্ধুর মতো সঙ্গে রাখতাম।
– ফাতেমা খাতুন আর কথা বলে না। নিজের একমাত্র ছেলের শোকে আবার কাঁদতে শুরু করে। মুজিব শার্টটা ভাঁজ করে বাক্সে ঢুকিয়ে রেখে পাল্লা বন্ধ করে দেয়। দেখতে পায় বাক্সের ভেতর নজরুলের অন্য কাপড়চোপড় আছে। বুঝতে পারে এসবই মায়ের সঞ্চয়। ফাতিমা খাতুনের হাত ধরে টেনে তুলে বলে, আসেন আমার সঙ্গে। নজরুলের বোনেরা কোথায়?
– ওরা তিনজনই শ্বশুরবাড়িতে। ছোট মেয়েটার অসুখ। সেজন্য তোর খালু ওরে দেখতে গেছে।
– কখন আসবে?
– আজকে বিকালেই আসবে। সেও ঢাকায় যাবে। তোর সঙ্গে গেলে আমাদের ভালো হবে। আমরা বুড়া মানুষেরা পথ হারাব না রে খোকা।
– আচ্ছা, আমি আপনাদের নিয়ে যাব। এখন যাই।
– তোরে কিছু খাওয়াইতে পারলাম না। ঘরে কিছু নাই। শুধু মুড়ি আছে। খাবি?
– না, না কিছু লাগবে না। যাই আমরা।
– আবার আসিস।
– আসব। আপনি যত সুন্দর করে আমার জামার স্মৃতি ধরে রেখেছেন, তা আমাকে অনেক আনন্দ দিয়েছে।
– ধরে রাখব না কেন? তোর মতো ছেলে কি টুঙ্গিপাড়ায় আছে? নাই, নাই। তুই আমাদের সোনার ছেলে। আমাদের জন্য তোর মন কান্দে রে। আমরা বুইঝতে পারি।
– খালা, আমাদের জন্য দোয়া করবেন।
– হ্যাঁ, দোয়া তো সব সময় করি। আল্লাহ্র রহমতে তুই আমাদের জন্য একশ বছর বাঁইচা থাক খোকা। আমি মরণের আগে পর্যন্ত এই দোয়াই কইরে যাব।
মুজিব পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে ফাতেমা খাতুনকে। মুজিবের মাথায় হাত রেখে চোখের পানি মোছে ফাতেমা খাতুন। স্নিগ্ধ বাতাস বয়ে যায় সবার মাথার ওপর দিয়ে।
সন্তানহারা একজন মায়ের হাতের স্পর্শ মাথায় নিয়ে পথে নামে মুজিব। চারদিকে এমন অজস্র মানুষ আছে যাদের হাসি-কান্না মিশে আছে জীবনের পরতে পরতে। এসব মানুষকে সমান জায়গায় টেনে তুলতে হবে। এরাই হবে আমার রাজনীতির লক্ষ্য। এই লক্ষ্যের যাত্রা অব্যাহত রেখে জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাব।
– মিয়াভাই, মিয়াভাই-
– কী রে মাসুম?
– আমরা এখন কোথায় যাব?
– গ্রামের চারদিকে ঘুরব। কে কেমন আছে খোঁজ নেব। কারও ঘরে চাল না থাকলে চাল দিয়ে আসব। ভাত রেঁধে যেন খেতে পারে।
– তাহলে চলেন ডানের পথে যাই। ওরা খুব গরিব।
– আমিও জানি ওরা খুব গরিব। তোদেরকে তো বলিনি আমি মনে মনে ঠিক করেছি আমি আগে জানব ওরা কেমন আছে। কারও অসুখ হয়েছে কি না তাও জানতে হবে। তারপর বাজারে গিয়ে চাল কিনে নিয়ে আসব।
– চলেন, চলেন। আপনি তো ছোটবেলা থেকেই বাবার চালের গোলা থেকে গরিব মানুষকে চাল দিতেন।
– এসব কথা এখন থাক।
– আপনার এমন কাজ আমাদের বলতে ভালো লাগে। আমরা খুশি হই। টুঙ্গিপাড়ার এমন একজন মানুষ নিয়ে আমাদের গর্ব হয়।
– ওরে তোরা থাম রে।
চারপাশের কেউ আর কথা বলে না। মুজিব লম্বা লম্বা পা ফেলে এগোতে থাকলে সবাই সমান তালে এগোতে থাকে। চারদিকে পাখির কিচিরমিচির, বাতাসের শোঁ-শোঁ শব্দ। সবুজ প্রকৃতি উজ্জ্বল হয়ে আছে চারদিকে। মুজিব চারদিকে তাকিয়ে বলতে থাকে, আমার টুঙ্গিপাড়া, আমার টুঙ্গিপাড়া।
সঙ্গে সঙ্গে চারপাশের ছেলেরা সেøাগানের মতো চিৎকার করে বলে, আমার টুঙ্গিপাড়া, আমার টুঙ্গিপাড়া। মুজিব হাসতে হাসতে তালি দেয়। সব ছেলের উৎফুল্ল চেহারায় টুঙ্গিপাড়ার সবুজ প্রকৃতি উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। সবাই পৌঁছে যায় দরিদ্র মানুষদের কুঁড়েঘরে। একে একে কথা বলেন মুজিব। খোঁজখবর নিয়ে ফিরে আসেন বাজারে। চাল কিনে ছেলেদের বলেন, চল চাল দিয়ে আসি।
বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে ঘুরে চারদিন কেটে যায়। তখন ভাবেন, ঢাকা যেতে হবে। সন্ধ্যায় ফাতেমা খাতুনকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলার জন্য তার বাড়ির সামনে এলে পুরুষ কণ্ঠে কান্নার শব্দ পান। আঁতকে ওঠেন মুজিব। বুক ভার হয়ে যায়। বাঁশের দরজাটা ঝাঁকাতে শুরু করেন। বেশ কিছুক্ষণ পরে দরজা খোলে নজরুলের বাবা। মুজিবকে দেখে অবাক হয়ে বলেন, খোকা তুই? কেন এসেছিস?
– আমি কালকে ঢাকায় যাব। আপনাদের ঢাকায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলতে এসেছি।
– ওহ ঢাকা, ঢাকা – আমার ছেলের কবর।
আবার চিৎকার করে কান্না শুরু করে হাবিব। মুজিব বিব্রত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন। কান্না থামিয়ে একসময় বলে, নজরুলের মা ঘণ্টাখানেক আগে মারা গেছে।
– মারা গেছে!
মুজিব দুহাতে বুক চাপড়ায়। চোখে পানি ঝরে।
হাবিব তখন মুজিবের হাত ধরে বলে, আমার বউ তোমাকে তোমার জামাটি দেখিয়েছে সেই কথা আমাকে বলেছিল আমি খুব খুশি হয়েছিলাম।
– আমি যাই দাফনের ব্যবস্থা করি।
– তুই আমাদের টুঙ্গিপাড়ার সোনার ছেলে রে। তুই দাফনের ব্যবস্থা না করলে আমিও ঘরে মরে পড়ে থাকব।
হাবিব দুহাতে নিজের বুক চাপড়ায়। মুজিব টুঙ্গিপাড়ার অবারিত প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে দ্রুতপায়ে হেঁটে যায়। নিজেকে বলে, সামনে অনেক কাজ। দাফনের ব্যবস্থা করে দিয়ে দুঃখী মানুষটির দুঃখ ভোলাতে চাই।
এদিক-ওদিক তাকালে মনে হয় চারদিক থেকে ভেসে আসছে শুধু কান্নার ধ্বনি।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply