ক্রীড়া উন্নয়নে বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার ভূমিকা

মো. জাহিদ আহসান রাসেল: বাঙালির আন্দোলন-সংগ্রামেই শুধু নয়, খেলার মাঠেও অনবদ্য ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। কৈশোরে, তারুণ্যে খেলাধুলার সঙ্গে বাংলাদেশের স্থপতির ছিল নিবিড় সখ্য। ছেলেবেলায় দাপিয়ে বেড়িয়েছেন টুঙ্গিপাড়ার মাঠ। চল্লিশের দশকে ঢাকা ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের জার্সিতে শাসন করেছেন ঢাকার ফুটবল। খেলার প্রতি তার আজন্ম ভালোবাসার সঞ্চার ঘটেছে পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও।
সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের ক্রীড়াক্ষেত্রের উন্নয়নে রেখেছিলেন অনন্য ভূমিকা। খেলাধুলা একটি জাতির মন ও মানস গঠনে এবং বিশ্বের বুকে পরিচয় এনে দিতে যে দারুণ ভূমিকা রাখে, সব সময় এ ব্যাপারটি স্মরণে রেখেছিলেন তিনি। ক্রীড়াবিশ্বে বাংলাদেশ আজ আপন দ্যুতিতে ভাস্বর। এর যাত্রাপথ রচনা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু নিজ হাতেই। ক্রীড়াপ্রেমী মানুষ হিসেবে তার তুলনার শেষ টানা যাবে না।
১৯৪১ থেকে ১৯৪৮ পর্যন্ত ওয়ান্ডারার্স ক্লাবের হয়ে খেলেছেন স্টাইকার পজিশনে। তার নেতৃত্বে বগুড়ার টুর্নামেন্টে ওয়ান্ডারার্স ক্লাব ৫-০ গোলে বিজয়ী হয়। যার মধ্যে শেখ মুজিব দিয়েছিলেন ২টি গোল। ক্রীড়াপ্রেমী পরিবারে জন্ম নেওয়া বঙ্গবন্ধুর যে খেলাধুলার প্রতি গভীর টান ছিলÑ সেটি খুব সুন্দর করে লিখে গেছেন তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে। তরুণ বয়সে খেলতেন ভলিবল এবং হকিও। বলা যায় সব ধরনের খেলার প্রতি ছিল তার গভীর দুর্বলতা।
স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ফুটবল ম্যাচ হয় ১৯৭২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। বঙ্গবন্ধুর একান্ত ইচ্ছায় ঢাকা স্টেডিয়ামে এদিন একটি প্রদর্শনী ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয়। খেলায় মুজিবনগর একাদশ ও প্রেসিডেন্ট একাদশ অংশ নেয়। ম্যাচটি স্টেডিয়ামে উপস্থিত থেকে সরাসরি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ও প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপভোগ করেন। ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে কলকাতার মোহনবাগান দল এবং ১৯৭৩ সালে রাশিয়ার মিন্সক ডায়নামো ক্লাব ঢাকা খেলতে এলেও খেলা দেখতে স্টেডিয়ামে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।
ক্রীড়া অনুরাগী ছিলেন বিধায় বঙ্গবন্ধু নিজে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তদারকি করতেন। ফুটবলের উন্নতিকল্পে তিনি ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন প্রতিষ্ঠা করেন। ’৭২ সালে তার উদ্যোগে বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ড গঠিত হয়। এটির বর্তমান রূপ ‘বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড’। একই বছর বাংলাদেশ ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ সংস্থা প্রতিষ্ঠা করা হয়। যার বর্তমান নাম ‘জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ’। ১৯৭৫ সালের ৬ আগস্ট ‘বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অনুমোদন করেন। উদ্দেশ্য ক্রীড়া, খেলাধুলা ও শরীরচর্চার ক্ষেত্রে যারা বিশেষ অবদান রেখেছেন বা রাখছেন তাদের এবং তাদের পরিবারের কল্যাণ। ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নির্মমভাবে নিহত হলে এ প্রস্তাব আলোর মুখ দেখতে পারেনি। ২০১১ সালে প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ‘বঙ্গবন্ধু ক্রীড়াসেবী কল্যাণ ফাউন্ডেশন আইন, ২০১১’ পাস করেন। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। করোনাকালীন সময়েও প্রধানমন্ত্রী এ ফাউন্ডেশনে ১০ কোটি টাকা অনুদান দিয়েছেন। এছাড়াও করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত ৫ হাজারেরও অধিক ক্রীড়াবিদকে তিনি আর্থিক সহায়তা প্রদান করেছেন। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর বড় ছেলে শেখ কামালকে বলা হয় বাংলাদেশের আধুনিক ফুটবলের পথিকৃৎ। তিনি আবাহনী ক্রীড়াচক্র প্রতিষ্ঠা করেন। তার ক্রীড়া কর্মকা-ের প্রধান উৎসাহদাতা ও পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বঙ্গবন্ধু। সব সময় তিনি শেখ কামাল ও শেখ জামালকে পাশে থেকে সহযোগিতা করেছেন। শেখ কামাল-জামাল ও শেখ কামালের স্ত্রী সুলতানা কামাল খুকু ছিলেন স্বনামধন্য ক্রীড়াবিদ।
জাতির পিতার নির্দেশনা, সহযোগিতা ও দৃঢ় পদক্ষেপের ফলে দেশব্যাপী ক্রীড়া অবকাঠামোর উন্নয়ন শুরু হয়। সেই ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছেন তার উত্তরসূরি শেখ হাসিনা। ক্রীড়াক্ষেত্রে নানাবিধ পদক্ষেপ নিয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নে অর্জিত হয়েছে সাড়া-জাগানিয়া সাফল্য। দেশের ক্রিকেট বর্তমানে যে অবস্থায় আছে, বাংলাদেশকে এ অবস্থায় আনার আসল বীজটা বপন করা হয়েছিল শেখ হাসিনার প্রধানমন্ত্রিত্বের প্রথম মেয়াদে। ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফির নতুন চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। কৃতী সন্তানদের স্বাগত জানাতে বিমানবন্দরে ছুটে যান শেখ হাসিনা। এরপর দলকে বীরোচিত সংবর্ধনাও দেয় তার সরকার। তাদের জন্য পুরস্কারের ঘোষণাও দেয় শেখ হাসিনার সরকার। আইসিসি ট্রফির শিরোপা জয় করে ১৯৯৯ বিশ্বকাপের খেলা নিশ্চিত করে বাংলাদেশ। আর সেখানে পরাশক্তি পাকিস্তানকে গ্রুপ পর্বের ম্যাচে হারিয়ে বাংলাদেশ বিস্ময় সৃষ্টি করেছিল। সরকারের প্রচেষ্টা আর এ জয়ের হাত ধরেই আসে বাংলাদেশের ওয়ানডে স্ট্যাটাস। ওয়ানডেতে পুরোপুরিভাবে মেলে ধরার পর টেস্ট আঙিনায় প্রবেশ করে বাংলাদেশ। ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে প্রথম টেস্ট খেলতে নামে বাংলাদেশ। প্রতিপক্ষ ছিল ভারত। আর বাংলাদেশ দলকে উৎসাহ দিতে নিজেই মাঠে উপস্থিত হন শেখ হাসিনা। টেস্টটি হারলেও বিশ্বের কাছে নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দেয় বাংলাদেশ।
শুধু বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে নিয়েই নিজেদের ব্যস্ত রাখেনি আওয়ামী লীগ সরকার। প্রথমবার দেশের মাটিতে উইলস কাপের মতো বড় ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন করে তারা। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে উন্নতির জন্য সব ধরনের সহযোগিতা দেয় শেখ হাসিনার সরকার। ক্রিকেটে উন্নতি করলেও এ খেলার জন্য নিজস্ব কোনো মাঠ ছিল না বাংলাদেশে। তাই শেখ হাসিনার একান্ত উদ্যোগ নিয়ে মিরপুরের শেরে বাংলা মাঠকে ক্রিকেটের জন্য বরাদ্দ দেন। ফতুল্লায় গড়ে তোলা হয় ক্রিকেটের জন্য দ্বিতীয় মাঠ।
ক্রীড়াবান্ধব আওয়ামী লীগ সরকার যখনই ক্ষমতায় ছিল, তখনই এদেশের ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়ন-অগ্রগতি-সমৃদ্ধি রচিত হয়েছে। অর্জিত হয়েছে সাড়া-জাগানিয়া সাফল্য। ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, শুটিং, ভারোত্তোলন, আর্চারি, সাঁতার ও ভলিবলের আন্তর্জাতিক আসর থেকে লেগেছে বাঙালি জাতির মাথায় গৌরবের পালক। সময়-সুযোগ পেলেই ছুটে যান স্টেডিয়ামে। অনুপ্রাণিত করেন খেলোয়াড়দের। সাকিব যখন বিশ্ব মাতিয়ে দেন, মাবিয়া-সাকিলরা যখন লাল-সবুজের পতাকা উড়িয়ে দিয়ে নিজের আবেগ ধরে রাখতে পারেন না; তখন মায়ের মমতায় তাদের ফোন করে অনুপ্রাণিত করেন প্রধানমন্ত্রী। যে কোনো খেলোয়াড় বা তার পরিবারের আর্থিক দুরবস্থার খবর শুনলেই সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।
দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ক্রীড়াঙ্গনকে সমুন্নত রাখতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। হয়তো তাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ গঠনের রূপকল্প-২০২১ ও রূপকল্প-২০৪১-এ ক্রীড়াঙ্গনকে আলাদা মর্যাদার জায়গায় রেখেছেন। তার কারণও রয়েছে। ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়ন-সাফল্যে প্রশংসিত হয়েছে শেখ হাসিনা সরকার। সেই প্রশংসা এসেছে কখনও ক্রিকেট বিশ্বকাপে, কখনও কিশোর মেয়েদের ফুটবলে, কখনও এশিয়ান গেমস বা কমনওয়েলথ গেমসের আসর বা অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটে বিশ্বকাপ জয়ের মধ্য দিয়ে।
একনজরে গত দশকে ক্রীড়ার অর্জন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ক্রীড়াঙ্গনের জন্য গত ১০ বছরে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে। ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, গলফ, আর্চারি, শ্যুটিং, দাবা, ভারোত্তোলন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস, ভলিবলসহ বিভিন্ন খেলায় সবচেয়ে বেশি সাফল্য এসেছে। দেশের মাটিতে সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে আয়োজিত হয়েছে আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ, বিশ্ব রোলার স্কেটিং চ্যাম্পিয়ন, এশিয়ান কাপ ক্রিকেট, ফিফা আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্ট, সাফ গেমস ছাড়াও বিভিন্ন খেলার আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট ও চ্যাম্পিয়নশিপ। আন্তর্জাতিক আয়োজন ছাড়াও প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি, বিদেশে অংশগ্রহণ এবং এর আগে প্রস্তুতিপর্বের জন্য বিশেষ অনুদান সব সময় পেয়েছে ক্রীড়াঙ্গন সরকারের তরফ থেকে। নতুন নতুন ক্রীড়াকাঠামো নির্মাণ ছাড়াও বিরাজমান বস্তুগত সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নয়ন সাধন করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ-২০০৯, সাউথ এশিয়ান গেমস-২০১০, আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ-২০১১, আইসিসি মহিলা বিশ্বকাপ ক্রিকেট বাছাই পর্ব-২০১১ (বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দল জাপান, আয়ারল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে ওয়ানডে স্ট্যাটাস অর্জন করে জাতির জন্য নতুন এক ইতিহাস সৃষ্টি করে), এশিয়া কাপ-২০১২, এশিয়া কাপ ক্রিকেট-২০১৪, ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি বাংলাদেশ-২০১৪, ২০১৬ সালে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক ভলিবল টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বাংলাদেশ। ৪৫ বছরের ইতিহাসে এই প্রথমবার আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে জিতল বাংলাদেশ। ২০১৬ সালেই স্বাধীনতার ৪৫ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার গলফার সিদ্দিকুর রহমান যোগ্যতা অর্জন করে সরাসরি রিও অলিম্পিকে অংশ নিয়েছেন। চতুর্থ রোলবল বিশ্বকাপ ২০১৭ ইসলামিক সলিডারিটি আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপ-২০১৭, দশম পুরুষ এশিয়া কাপ হকি টুর্নামেন্ট-২০১৭ ও সাফ অনূর্ধ্ব-১৫ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপ-২০১৭ সফলভাবে আয়োজন করে বাংলাদেশ। ২০১৯-এর জুন গলফার সিদ্দিকের পর রোমান সানা এবার সরাসরি টোকিও অলিম্পিকে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে ইতিহাসের ধারা বজায় রেখেছেন। নেদারল্যান্ডসে বিশ্ব আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের এই তারকা তীরন্দাজ কোটা প্লেস পেয়ে ২০২০ সালের টোকিও অলিম্পিকে সরাসরি খেলার সুযোগ করে নিয়েছেন। ২০১৯ এসএ গেমসেই প্রথম দেশের বাইরে সবচেয়ে বেশি স্বর্ণপদক জিতেছে (১৯টি) বাংলাদেশ। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০, দক্ষিণ আফ্রিকায় অনূর্ধ্ব-১৯ যুব বিশ্বকাপের ফাইনাল ভারতকে হারিয়ে শিরোপা জিতে নেয় বাংলাদেশ। যে কোনো স্তরের ক্রিকেটে কোনো বিশ্বকাপ জেতা বাংলাদেশের জন্য এটাই প্রথম।
বিশ্ব আর্চারির সর্বোচ্চ সংস্থা গত বছরের বর্ষসেরা চমক হিসেবে বেছে নিয়েছে রোমান সানাকে। যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাসে বিশ্ব ইনডোর আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপ চলাকালে এ ঘোষণা দেয় বিশ্ব আর্চারি ফেডারেশন। রোমান সানার পাশাপাশি গত বছরের বর্ষসেরা কোচ হয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় দলের জার্মান কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখ। সুইজারল্যান্ডের লুজানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপেও বাংলাদেশ আর্চারি দল রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুচিন্তিত পরামর্শ-নির্দেশনায় বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনও রূপায়িত হয়েছে উন্নয়ন ও অগ্রগতির রোল মডেলে। একদিকে বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে সাফল্য ছুঁয়ে দেখা; অন্যদিকে স্টেডিয়াম-মাঠ-গ্যালারিসহ অবকাঠামো খাতে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই ৫টি জাতীয় স্টেডিয়াম, ৪টি বিভাগীয় স্টেডিয়াম, ৬২টি জেলা স্টেডিয়াম এবং থানা পর্যায়ে ৫টি স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হয়েছে। এছাড়া নির্মাণ ও সংস্কার মিলিয়ে ঢাকাসহ সারাদেশে ৩২টি জিমনেসিয়াম, ২০টি সুইমিংপুল, ৭টি ইনডোর স্টেডিয়াম এবং ৪টি মহিলা ক্রীড়া কমপ্লেক্স, ৫টি পূর্ণাঙ্গ ক্রীড়া কমপ্লেক্স, একটি করে হ্যান্ডবল, বক্সিং, ভলিবল ও কাবাডি, শেখ রাসেল রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্স তৈরি হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ভেন্যু হিসেবে শেরে বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়াম, চট্টগ্রাম জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়াম, ফতুল্লা খান সাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়াম, সিলেট বিভাগীয় স্টেডিয়াম, খুলনা শেখ আবু নাসের স্টেডিয়াম ক্রিকেট বিশ্বে প্রশংসিত হচ্ছে। সর্বশেষ দ্রুতগতিতে চলছে ৪৯০টি উপজেলা পর্যায়ে মিনি স্টেডিয়াম বিনির্মাণের কাজ। ইতোমধ্যে সরকার ১৩১টি মিনি স্টেডিয়ামের অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শেষ করেছে। চলতি অর্থবছরে ১৮৬টি স্টেডিয়ামের কাজ সম্পাদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অতিসম্প্রতি বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামের প্রয়োজনীয় সংস্কারের জন্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন।
গত অর্থবছরে শুরু হয়েছে ৪টি নতুন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ। এই ৪টি নতুন গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হচ্ছে ঢাকার পূর্বাচলে ৩৭.৫ একর জমির ওপর ৬৫ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতার শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম; কক্সবাজারে ৪৯.২ একর জায়গায় শেখ কামাল আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম এবং ক্রীড়া কমপ্লেক্স; মানিকগঞ্জে ২৫ একর জমির ওপর আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট স্টেডিয়াম এবং ক্রীড়া পরিষদের নতুন ভবন নির্মাণের প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

চতুর্থ রোলবল বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট
ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে বাংলাদেশে বসেছিল রোলার স্টেটিংয়ের চতুর্থ রোলবল বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট-২০১৭। আসরে পাঁচ মহাদেশের ৫৫টি দেশ অংশ নিয়েছে। এ আসর সামনে রেখে বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম কমপ্লেক্সে জাতীয় রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক এ আসরের বিজয়ী দলকে শিরোপা তুলে দিয়েছেন। বাংলাদেশ আসরে চতুর্থ হয়ে দারুণ চমক সৃষ্টি করেছে।

তৃণমূলে প্রতিভা অন্বেষণ কর্মসূচি
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের উদ্যোগে প্রথমবারের মতো দেশব্যাপী তৃণমূলে প্রতিভাবান খেলোয়াড় বাছাইয়ের প্রশিক্ষণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে ২০১৭ সালে। এই কর্মসূচির জন্য সরকার ১৫ কোটি ১০ লাখ টাকা অর্থ বরাদ্দ দিয়েছিল। এই প্রশিক্ষণ কর্মসূচি থেকে ৩১টি ক্রীড়া ফেডারেশন খুঁজে নিয়েছে তাদের আগামী দিনের তারকা। তৃণমূলে এই কর্মসূচি ক্রীড়াঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছে। প্রতিভা অন্বেষণ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির জন্য ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো দীর্ঘদিন সরকারের কাছে অর্থ বরাদ্দ চেয়ে আসছিল। চলতি বছরও তৃণমূলে প্রতিভা অন্বেষণের কর্মসূচি শুরু হতে যাচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গমাতা শিশু-কিশোর ফুটবল
প্রাথমিক স্কুল পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গমাতা গোল্ডকাপের আয়োজন সারাদেশের শিশু-কিশোর ও তরুণ-তরুণীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। বাংলাদেশের প্রমীলা ফুটবলের আজকের দৃপ্ত পদচারণে এই টুর্নামেন্টের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিয়মিতই বঙ্গবন্ধু এবং বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্নামেন্টে উপস্থিত থাকেন এবং বিজয়ীদের পুরস্কৃত করেন। বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপে ৬৩ হাজার ৫০৯টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১০ লাখ ৭৯ হাজার ৬৫৩ ফুটবলার অংশ নেয়। আর বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপে ৬৩ হাজার ৪৩১টি বিদ্যালয়ের ১০ লাখ ৭৮ হাজার ৩২৭ ফুটবলার অংশ নেয়। বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের নামে দেশব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্ট বাংলাদেশে খুদে ফুটবলার তৈরির ক্ষেত্রে অনন্য ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

১২তম সাউথ এশিয়া গেমস
ভারতের গোয়ায় অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়া গেমসে এবার ৪টি স্বর্ণ জিতে পঞ্চম স্থান অর্জন করেছে বাংলাদেশ। এই ৪টি স্বর্ণ জিতেছেন তিন অ্যাথলেট। দুই মেয়ে মাবিয়া আক্তার সীমান্ত ও মাহফুজা খাতুন শিলা এবং শ্যুটার শাকিল আহমেদ। ভারোত্তোলন থেকে প্রথম স্বর্ণ এনেছেন মাবিয়া, এরপর সাঁতার থেকে বাকি দুটি স্বর্ণ জিতেছেন মাহফুজা খাতুন শিলা। বাংলাদেশের অ্যাথলেটরা ৪টি স্বর্ণ ছাড়াও ১৫টি রৌপ্য এবং ৫৬টি তাম্রপদক জিতেছেন।

গোল্ডকোস্ট কমনওয়েলথ গেমস
বাকি এবং শাকিল এবার অস্ট্রেলিয়ায় আয়োজিত গোল্ডকোস্ট কমনওয়েলথ গেমস শ্যুটিংয়ে দুটি পদক জিতেছে। অস্ট্রেলিয়ার গোল্ডকোস্ট কমনওয়েলথ গেমস একক কীর্তিগাথার সুললিত সুর বাজিয়েছেন গাজীপুরের ছেলে ২৮ বছরের আবদুল্লাহ হেল বাকি। এর সাহসী শ্যুটার কমনওয়েলথ গেমসে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে রৌপ্যপদক জিতেছেন। এছাড়া শাকিলের পিস্তল থেকেও বাংলাদেশ অর্জন করেছে ৫০ মিটার এয়ার রাইফেলে রৌপ্য।

ক্রিকেটের গৌরবময় অধ্যায়
ক্রিকেট এখন বাংলাদেশের অহংকারের প্রতীক। বিশ্ব ক্রিকেটে নিত্যনতুন অধ্যায়ের সৃষ্টি করেছেন তামিম, সাকিব, মাশরাফি এবং মোস্তাফিজরা। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ পাকিস্তান, ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দুবার সিরিজ জয় করে। সবচেয়ে বড় ঘটনা পাকিস্তানকে হোয়াইটওয়াশ করা। সর্বশেষ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডসহ ৩টি দেশের বিপক্ষে জয় তুলে নিয়ে বাংলাদেশ কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠে। ২০১৬ সালে পাকিস্তান-শ্রীলংকাকে হারিয়ে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত এশিয়া কাপ ক্রিকেটে রানার্সআপ হয়েছে মাশরাফিরা। ভারতে অনুষ্ঠিত টোয়েন্টি-২০ বিশ্বকাপে সুপার এইটে ওঠে বাংলাদেশ। দেশে আফগানিস্তানের বিপক্ষে জিতে টানা ৬ সিরিজ জয়ের রূপকথা সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ। ২০১৬ সালের অক্টোবরে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট সিরিজ ড্র করে বাংলাদেশ। এই ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক অভিষেকও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে। প্রথম টেস্ট বাংলাদেশে, তার উদ্বোধকও শেখ হাসিনা। বিশ্বকাপ ক্রিকেট আয়োজনও হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। এদেশে খেলে গেছে আর্জেন্টিনা-সুপার ঈগল নাইজেরিয়া; তা-ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আন্তরিক সদিচ্ছার কারণে।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস উদযাপন
২০১৭ সালে ‘শান্তি ও উন্নয়নের জন্য ক্রীড়া’ সেøাগান সামনে রেখে প্রথমবারের মতো উদযাপিত হয়েছিল জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস। প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ক্রীড়া দিবসের ঘোষণা দিয়েছিলেন। ক্রীড়াকে সবার কাছে জনপ্রিয় করার জন্য; সবাইকে ক্রীড়ায় মনোনিবেশ করার জন্য এই দিবস পালন করা হয়েছে।
পৃথিবীর অনান্য দেশের সঙ্গে সমানতালে ২০১৪ সাল থেকে বাংলাদেশও ৬ এপ্রিল আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস পালন করে আসছে। এই দিবসের গুরুত্ব অন্যান্য বছরের তুলনায় বৃদ্ধি পায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে ৬ এপ্রিলকে জাতীয় ক্রীড়া দিবস ঘোষণা করার পর। ৬ এপ্রিল উৎসব রাঙানো একটি দিন পালন করেছে ক্রীড়া সংশ্লিষ্টরা। ক্রীড়া দিবস পালন করেছে উৎসবমুখর আয়োজনের মধ্য দিয়ে।

প্রথম জাতীয় যুব গেমস
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো আয়োজন করা হয়েছে বাংলাদেশ যুব গেমস। প্রায় পাঁচ মাসব্যাপী এ আয়োজনকে ঘিরে ব্যাপক সাড়া পড়েছে। সারাদেশে হাজার হাজার তৃণমূলের প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদ খুঁজে পাওয়া গেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ আয়োজনে সরাসরি সম্পৃক্ত থেকে উঠতি বয়সী তারকাদের প্রাণিত করেছেন। একেবারে উপজেলা পর্যায় থেকে এই আসরের প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল- এই আসর থেকে আগামী দিনের সম্ভাবনাময় ক্রীড়াবিদ উঠে আসবে।

আরও কিছু উদ্যোগ
* মুজিববর্ষ উপলক্ষে এ বছর থেকে সরকার মাসিক ক্রীড়া ভাতা চালু করতে যাচ্ছে। শুরুটা ছোট পরিসরে হবে।
* শারীরিক প্রতিবন্ধী ক্রীড়াবিদদের স্টেডিয়াম হচ্ছে জাতীয় সংসদের পশ্চিম পাশে আসাদ গেটে।
* টেবিল টেনিস, তায়কোয়ান্দো, কারাতে, উশু এবং ভলিবল খেলার প্রশিক্ষণ প্রদানের জন্য বিকেএসপি’তে ক্রীড়া অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে।
* ৬ এপ্রিলকে জাতীয় ক্রীড়া দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে-অনুযায়ী বাংলাদেশে ৬ এপ্রিল ২০১৭ থেকে প্রতি বছর উৎসবমুখর পরিবেশে পালিত হয় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ক্রীড়া দিবস।
* ক্রীড়া পরিদপ্তরের আওতাধীন ৬টি সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ স্নাতক ডিগ্রিধারী যুবক ও যুব মহিলাদের নিবিড় প্রশিক্ষণ প্রদানপূর্বক ব্যাচেলর অব ফিজিক্যাল এডুকেশন (বিপিএড) শিক্ষা প্রদান করছে।
* ঢাকা শারীরিক শিক্ষা কলেজে মাস্টার্স অব ফিজিক্যাল এডুকেশন (এমপিএড) কোর্স চালু করা হয়েছে।
* প্রথমবারের মতো ১০ বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বঙ্গবন্ধু আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় টুর্নামেন্ট করা হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু-কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দেশরতœ শেখ হাসিনা ক্রীড়ামোদি রাষ্ট্রনায়ক। পিতার মতোই খেলাধুলার প্রতি তার আগ্রহ, আন্তরিকতা আমাদের মুগ্ধ করে। তিনি ফুটবল, ক্রিকেটসহ সব খেলা ও খেলোয়াড়দের জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। ব্যক্তিগতভাবেও তিনি খেলোয়াড়দের খোঁজখবর নেন। সুযোগ পেলে বঙ্গবন্ধুর মতো নিজে স্টেডিয়ামে গিয়ে খেলা দেখেন। তার সামগ্রিক প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদরা বর্তমান বিশ্বে সুনাম অর্জন করছে। ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ক্রীড়া চর্চা বৃদ্ধি করতে শেখ হাসিনা বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা জাতীয় গোল্ডকাপ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জাতীয় গোল্ডকাপ-এর আয়োজন করেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ক্রীড়াক্ষেত্রে আরও এগিয়ে যাবে, ওয়ানডে ক্রিকেটে একদিন বিশ্বকাপও আনতে পারবে। আর বাংলাদেশ সার্বিকভাবে এগিয়ে গেলেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। জয় বাংলা। জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক : প্রতিমন্ত্রী, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply