নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

ড. জেবউননেছা: বঙ্গবন্ধু ১৯৫২ সালে তদানীন্তন পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে পূর্ব বাংলা থেকে ‘পিছ কনফারেন্স অব দ্য এশিয়ান অ্যান্ড প্যাসিফিক রিজিওন্স’-এ যোগদানের উদ্দেশে চীন সফর করেছিলেন। সেই সফর নিয়ে তিনি লিখেছিলেন ‘আমার দেখা নয়াচীন’ গ্রন্থ। উক্ত গ্রন্থের কয়েকটি পঙ্ক্তি লেখার শুরুতে উল্লেখ করছি, “আজ নয়াচীনে সমস্ত চাকরীতে মেয়েরা ঢুকে পড়েছে, পুরুষদের সাথে তাল মিলিয়ে কাজ করছে। প্রমাণ করে দিয়েছে পুরুষ ও মেয়েদের খোদা সমান শক্তি দিয়েই সৃষ্টি করেছে। সুযোগ পেলে তারাও বৈজ্ঞানিক, ঐতিহাসিক ডাক্তার, যোদ্ধা সকল কিছুই হতে পারে।” বঙ্গবন্ধুর কথার সূত্র ধরে যদি বর্তমান বাংলাদেশকে বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখা যায়, তারই কন্যা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের নারীরা এগিয়ে যাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে যিনি ছায়া হয়ে পাশে ছিলেন তিনি বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। তিনি নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারীকে সম্মান করতেন বলেই তার স্ত্রীকে সংসারের সকল দায়িত্ব প্রদান করে নিশ্চিন্তে রাজনীতি করেছেন এবং অসংখ্যবার কারাবরণ করেছেন।
১৯৭১-এ নির্যাতিত নারীদের বঙ্গবন্ধু ‘বীরাঙ্গনা’ খেতাবে ভূষিত করেন। নির্যাতিত নারীদের তিনি তার নামের স্থানে শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাড়ির ঠিকানা ধানমন্ডি ৩২ সড়কের বাড়ির ঠিকানা দিতে বলেন। তারই ধারাবাহিকতায় তার স্বপ্নের সোনার বাংলার এদেশে নানা সংগ্রামে পুরুষের পাশাপাশি নারীর সম্পৃক্ততা বিশেষভাবে স্মরণীয়। একদিকে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, অন্যদিকে সমাজের দেয়াল ভেঙে বাইরে আসার যুদ্ধ প্রতিনিয়ত নারীকে বিভিন্ন বাধার সম্মুখীন করেছে। তথাপি সকল ধরনের বাধা উপেক্ষিত করে নারীরা ইতিহাসের স্তরে স্তরে তাদের গৌরবোজ্জ্বল অবদান রেখেছেন। আর এই নারীদের এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যে রাজনৈতিক দলটি মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে সেই দলটির নাম ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন দলটির যাত্রা শুরু হয়েছিল। শুরু থেকেই দলটি ছিল নারীর প্রতি শ্রদ্ধাশীল। তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেখতে পাওয়া যায়, ১৯৬৪ সালে পুনরুজ্জীবিত পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টোতে। সেখানে বলা হয়েছিল, “নারী পুরুষ নির্বিশেষে পাকিস্তানের প্রতিটি নাগরিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে স্বীকৃত প্রতিটি মৌলিক অধিকার ভোগের অধিকারী। আইনের চোখে সকলে সমান বলে গণ্য হবে।”
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে আন্দোলনকারী নারীদের মধ্যে আনোয়ারা খাতুনের ভূমিকাও ছিল উল্লেখযোগ্য। যিনি ৪০ সদস্যবিশিষ্ট রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের একমাত্র মহিলা সদস্য ছিলেন। তিনি প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে প্রথম থেকে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে মুসলিমদের সংরক্ষিত আসনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী সেলিনা বানু, শামসুননাহার মাহমুদ, বদরুন্নেসা আহম্মদ, দৌলতুননেসা খাতুন, রাজিয়া বানু, তফতুন্নেসা, মেহেরুন নেসা প্রমুখ জয়লাভ করেন। এছাড়া আমেনা বেগম, মমতাজ বেগম, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, কণিকা বিশ্বাস, ফরিদা রহমান, জোহরা তাজউদ্দীন, নাদিরা হক, আইভি রহমান, ফরিদা মেরি, নূরজাহান কামাল প্রমুখ নারী নেত্রীরা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বিভিন্ন সময় রাজনীতিতে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।
১৯৬৬-এর ৬-দফা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার পূর্বে দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আমেনা বেগমকে মনোনয়ন করতে চাইলে দলের অনেকে আপত্তি তোলে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, “নারীদের ও পুরুষদের মতো সমান অধিকার এবং তা রাজনীতির ক্ষেত্রেও। আওয়ামী লীগ যেমন অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করে, তেমনি নর-নারীর সমান অধিকারেও বিশ্বাস করে। আওয়ামী লীগের নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলা দরকার।” বঙ্গবন্ধুর এই দূরদর্শী চিন্তাচেতনার প্রতিফলন আজ ঘরে বাইরে সর্বত্র নারীর জয়যাত্রা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ নারীদের ভূমিকা ছিল অসামান্য। এর মধ্যে অন্যতম হলো, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের বেশ কয়েকজন নারীযোদ্ধা রয়েছেন যাদের অবদান অবিস্মরণীয়, তাদের মধ্যে বকুল মোস্তফা, ফরিদা খানম সাকী, মনোয়ারা বেগম, মিনারা বেগম ঝুনু, মনোয়ারা বেগম মনু, আনোয়ারা বেগম আনু অন্যতম।
পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধুর নারীর অগ্রযাত্রাকে স্থায়ীরূপ প্রদান করতে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে মাত্র ৯ মাসের মধ্যেই বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ১৯৭২ সালে সংবিধান প্রণয়ন করেন। সেই সংবিধান কমিটির একমাত্র মহিলা সদস্য ছিলেন বেগম রাজিয়া বানু। সংবিধানের ১৭, ১৯, ২৮, ২৯ সহ অনুচ্ছেদে সমাজের সর্বস্তরে নারীর অশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৩ সালে মন্ত্রিসভায় অধ্যক্ষ বদরুন্নেসা শিক্ষামন্ত্রী এবং অধ্যাপক নূরজাহান মোরশেদ সমাজকল্যাণ মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৭৪ সালে অধ্যাপক ড. নীলিমা ইব্রাহিম বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। নারীদের জন্য সরকারি চাকরিতে ১০ শতাংশ কোটা সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় এবং নারীদের জন্য সংসদে সংরক্ষিত আসনেরও ব্যবস্থা করা হয়। মুসলিম নারীদের বৈবাহিক জীবন ও মর্যাদা অধিকার নিশ্চিতে ১৯৭৪ সালে প্রণীত হয় ‘মুসলিম ম্যারেজ অ্যান্ড রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট’।
বঙ্গবন্ধু নির্যাতিত নারীদের পুনর্বাসনের জন্য ১৯৭২ সালে গঠন করেন ‘নারী পুনর্বাসন বোর্ড’। ১১ জন প্রখ্যাত শিক্ষক নারীনেত্রী ও রাজনৈতিক কর্মী উক্ত বোর্ডের সদস্য ছিলেন। প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) স্বাধীনতা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের প্রাধান্য প্রদান করা হয়। উল্লেখ্য, ১৯৭৩ সালে প্রথম সংসদে ১৫ জন জাতীয় সংসদে নারী সদস্য ছিলেন। ১৯৭৪ সালে নারী উন্নয়ন বোর্ডকে পুনর্গঠন করে সংসদে অ্যাক্টের মাধ্যমে ‘নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশন’ রূপান্তর করা হয়। বাংলাদেশের প্রথম নারী সংগঠন জাতীয় মহিলা সংস্থার ভিত্তি রচনা করেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭৩ সালে সাভারে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের ৩৩ বিঘা জমির ওপর চালু করা হয় কৃষিভিত্তিক কর্মসূচি। বাংলাদেশ গার্লস গাইড এসোসিয়েশনকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এছাড়াও নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য তিনি উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। এই মহান নেতাকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যার পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দুর্দিন শুরু হয়। এতদ্বসত্ত্বেও দলটি দমে যায়নি।
১৯৭৭-এর এপ্রিল মাসে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলের দ্বিতীয় দিনে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীনকে ৪৪ সদস্যবিশিষ্ট সাংগঠনিক কমিটির আহ্বায়ক করা হয়। ১৯৭৮ সালে কাউন্সিল অধিবেশনে জোহরা তাজউদ্দীন জানান, তিনি ৫৭টি সাংগঠনিক জেলার দলীয় কর্মী সমাবেশে যোগ দেন।
১৯৮১ সালে ১৭ মে গণতন্ত্রের মানসকন্যা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা দলের হাল ধরেন। এক ধরনের বৈরী পরিবেশে তিনি দলকে সংগঠিত করতে থাকেন। নানা চড়াই-উৎরাই অতিক্রম করে দীর্ঘ ২১ বছর পর ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণ করে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম ১৯৯৭ সালের ৮ মার্চ ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি’ প্রণয়ন করেন। নারী-পুরুষের মধ্যে বিদ্যমান বৈষম্য নিরসন ও জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গৃহীত এ নীতিমালায় নারীর মানবাধিকার ও মৌলিক স্বাধীনতার বাস্তবায়নে বিভিন্ন উদ্যোগ এবং এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে বিভিন্ন কৌশলের কথা বলা হয়। প্রথমবারের মতো পিতার নামের পাশাপাশি মায়ের নাম লেখার আইন কার্যকর করা হয়। মেয়েদের দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বিনা বেতনে শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা করা হয়। তিনিই প্রথম সরকারপ্রধান, যিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে নারীকে বসিয়েছেন। জাতীয় সংসদে প্রথম নারী উপনেতা, নারী স্পিকার এবং নারী উপাচার্য, নারী সিটি মেয়র, উচ্চ আদালতে নারী বিচারক নিয়োগ, নারী পুলিশ সুপার, নির্বাচন কমিশনে নারী, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রথম নারী সচিব, উচ্চ আদালতে বর্তমানে সাতজন নারী, প্রশাসন সচিব পদে ও সচিবের পদমর্যাদতায় ১১ জন নারী কর্মকর্তা, ছয়জন নারী জেলা প্রশাসক হিসেবে নারীকে নিযুক্ত করেছেন। বর্তমান সংসদে নারী সদস্য ৭২ জন। বিভিন্ন শান্তিরক্ষী মিশনে নারী পুলিশের অংশগ্রহণ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। জাতিসংঘের ২০ শতাংশ নারীকর্মী নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের লক্ষ্যে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার সহায়তা করছে।
প্রায় ২ কোটি নারী কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে নিয়োজিত এবং ৩৫ লাখের বেশি নারী তৈরি পোশাক খাতে কাজ করছেন। সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে বর্তমানে ২০ হাজারের ওপরে নারী। সেনাবাহিনীতে নারী কর্মকর্তা-চিকিৎসকসহ আনুমানিক ১ হাজার ৬৫০ জন। মেজর জেনারেল পদে একজন, নিয়মিত ফোর্স বা ফাইটিং কোর্সে নারী কর্মকর্তার সংখ্যা ৪০০। বর্তমানে প্রাথমিকে ছাত্রীর হার প্রায় ৫১ শতাংশ, মাধ্যমিকে ৫৪ শতাংশ, কলেজে ৪৮ শতাংশ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৬ শতাংশের বেশি। পেশাগত শিক্ষায় নারীর হার ৫৪ শতাংশ।
নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করতে কোনো জামানত ছাড়াই ২৫ লাখ টাকা এসএমই ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সরকারের উদ্যোগে নারী উদ্যোক্তাগণ এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল থেকে বিশেষ সুবিধামুক্ত ১০ শতাংশ সুদে ঋণ প্রদান করা হচ্ছে। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে ৪৫ থেকে বৃদ্ধি করে ৫০-এ উন্নীত করেছেন। ইউনিয়ন পরিষদে নারী জনপ্রতিনিধিকে সরাসরি ভোটে নির্বাচনের ব্যবস্থা করেছেন শেখ হাসিনা। ইউনিয়ন কাউন্সিল, উপজেলা পরিষদে এবং পৌরসভায় সংরক্ষিত নারীর আসন এক-তৃতীয়াংশ উন্নীতকরণ এবং সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে ১২ হাজার নারী প্রতিনিধিত্ব করছেন, ভাইস চেয়ারম্যান ৫০০ জন।
পরিবারে নারীর সমতা বিধানের জন্য বর্তমান সরকার যৌতুক প্রতিরোধে ‘যৌতুক নিরোধ আইন-২০১৭’ প্রণীত করা হয়েছে, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১১। বাল্যবিবাহ রোধ ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে কঠোর আইন প্রণয়ন করেছে সরকার। নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ আইন-২০১২, পারিবারিক সহিংসতা দমন এবং নিরাপত্তা আইন-২০১২, ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টার দেশের ৮টি বিভাগে আইন সহায়তা প্রদান করছে। বাল্যবিবাহ আইন-১৯১৯ সংশোধন করা হয়েছে। মেয়ে শিশুদের নিরাপত্তায় শিশু আইন-২০১৩ প্রণীত হয়েছে, হিন্দু নারীর অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় হিন্দু বিবাহ নিবন্ধন আইন-২০১২, নারী নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। নারী সহায়তা কেন্দ্র ১০৯ এবং জাতীয় কল সেন্টার ৯৯৯ প্রবর্তন করা হয়েছে।
চেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ৫ নম্বর উদ্দেশ্য অনুযায়ী, নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সকল ধরনের সহিংসতা প্রতিরোধ, নারীর রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে কাজ করে যাচ্ছে সরকার। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের প্রথম ১০টি দেশের মধ্যে একটি।
কার্যকর মাতৃস্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে গর্ভবতী মহিলাদের জন্য ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর প্রবর্তন, মাতৃস্বাস্থ্য ভাউটার স্কিমের আওতায় গর্ভধারণ থেকে প্রসবকালীন সব খরচ এবং যাতায়াতের খরচও সরকার বহন করে। মাতৃমৃত্যু হার প্রতি লাখে ১৬৫ জন। সরকারি চাকরিতে ৩ হাজার ধাত্রীর পদ এবং ২০১০ সাল থেকে আন্তর্জাতিক মানের ধাত্রী কোর্স চালু করা হয়েছে। প্রান্তিক নারীদের স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে গ্রামভিত্তিক কমিউনিটি ক্লিনিক। প্রসূতি মায়েদের জন্য ছয় মাসের ছুটি কার্যকর করা, ভিজিএফ, দুস্থ নারী ভাতা, মাতৃত্বকালীন এবং দুগ্ধবতী মায়েদের জন্য ভাতা, অক্ষম মায়ের ভাতা, বিধাব ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলা ভাতা প্রদান, ৪০টি মন্ত্রণালয়ে জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রদান করা, দরিদ্র নারীদের ভিজিডি কার্যক্রমের মাধ্যমে ৩০ কেজি করে চাল দেয় হয়। নারী উদ্যোক্তা উন্নয়নে ২০১১ সালে ‘জয়িতা ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা, ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাব এবং ডিএনএ স্ক্রিনিং ল্যাব স্থাপন করা হয়েছে প্রশাসনের উচ্চস্তরে নারীদের নিয়োগ প্রদান করা হয়েছে।
প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের বাস্তবমুখী কর্মসূচির ফলে বাংলাদেশ জেন্ডার গ্যাপ সূচকে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য সব দেশের তুলনায় বৈশ্বিক হিসেবে গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট-২০২০ অনুয়ায়ী বাংলাদেশের অবস্থান ১৫৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৫০তম। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে বিশ্বে ১৫৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ সপ্তম। লিঙ্গ বৈষম্যের দিক দিয়ে বাংলাদেশে ১১১তম।
রূপকল্প ২০৪১-এর ৬ নম্বর অনুচ্ছেদে ক্ষমতায়ন এবং মহিলাদের জন্য সমানাধিকারের কথা বলা হয়েছে। সামাজিক বিভিন্ন সূচকে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে। নারীর এই অগ্রযাত্রা দৃশ্যমান। কৃষি, শিল্পে, ই-কমার্সে, সমাজের সকল স্তরে নারীর অংশগ্রহণের অন্যতম প্রেরণাদাত্রী এবং রূপকার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “নারী ক্ষমতায়নের কথা মুখে বললে হয় না, এটা অর্জন করে নিতে হয়।” আমি ও তার সাথে একমত। কেউ কাউকে কোনো কিছু এগিয়ে দেয় না, তাকে পরিশ্রম করে অর্জন করতে হয়ে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজ পরিশ্রম এবং দৃঢ়তায় আজ বিশ্বের ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে একজন। আর সেই সফলতায় তিনি বাংলাদেশের নারীদের সাথে নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছেন।
দেশের নারী ক্ষমতায়নের জন্য কাজ করায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অর্জন করেছেন আন্তর্জাতিক পুরস্কার। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পুরস্কারগুলোর মধ্যে বিশ্ব পার্টনারশিপ ফোরাম কর্তৃক ‘এজেন্ট অব চেঞ্জ প্লানেট ৫০-৫০’ চ্যম্পিয়ন্স পুরস্কার এবং ২০১৮ সালে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। নারী নেতৃত্ব ও অবদানের জন্য সম্মানজনক ‘গ্লোবাল উইমেন্স লিডারশিপ’ অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গ্লোবাল সামিট অব উইমেন্স পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৯ সালে নারী দিবস উপলক্ষে নারীর ক্ষমতায়ন এবং দক্ষ নেতৃত্বের জন্য ‘লাইফটাইম কন্ট্রিবিউশন ফর এমপাওয়ারমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করেন। জাতিসংঘের নারী ও শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের ‘পিস ট্রি’ পুরস্কার লাভ করেন। উইমেন ইন পার্লামেন্ট (ডব্লিউআইপি) ও ইউনেস্কো বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীকে ‘ডব্লিউআইপি গ্লোবাল ফোরাম অ্যাওয়ার্ড’ লাভ করে দেশের মুখ উজ্জ্বল করেন।
শুরু করেছিলাম লেখাটি বঙ্গবন্ধু রচিত ‘আমার দেখা নয়াচীন’ গ্রন্থের একটি উক্তি দিয়ে, শেষও করব উক্ত গ্রন্থের আর একটি উক্তি দিয়ে। “নয়াচীনের উন্নতির প্রধান কারণ পুরুষ ও মহিলা আজ সমানভাবে এগিয়ে এসেছে দেশের কাজে। সমানভাবে সাড়া দিয়েছে জাতি গঠনমূলক কাজে। তাই জাতি আজ এগিয়ে চলেছে উন্নতির দিকে।”
পঞ্চাশ দশকে বঙ্গবন্ধু নারী ও পুরুষের সমানভাবে কাজ করার দিকে যে জোর প্রদান করেছিলেন, তারই আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে এগিয়ে যাচ্ছে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’। গত চার দশক ধরে দলটিতে যিনি অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নেতৃত্ব প্রদান করছেন, সেই সাথে নেতৃত্ব প্রদান করছেন দেশ পরিচালনায়, যিনি শত বাধাবিপত্তিতেও থমকে যাননি। তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনা।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জন্মদিনে নারী ক্ষমতায়নের রূপকারকে সাধুবাদ জানাই। সেই সাথে শ্রদ্ধা জানাই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বাংলাদেশ চিরজীবী হউক, জয় বাংলা।

লেখক : অধ্যাপক, লোক প্রশাসন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply