শুভ জন্মদিন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

ইনাম আহমেদ চৌধুরী: আওয়ামী লীগ সত্যিকারভাবেই ‘আওয়াম’ অর্থাৎ সাধারণ জনগণেরই লীগ বা দল। মানুষের অধিকারের অনুভূতি, ন্যায় প্রতিষ্ঠার সংগ্রামÑ দাবিÑ অর্জনÑ এসবেরই সমাহার রয়েছে এই রাজনৈতিক দলে। ফরমায়েশী নয় বা কারও উচ্চাশা পূরণের হাতিয়ার হিসেবে নয়; বরং সমষ্টির চেতনা-বিকাশের স্বাভাবিকতায়ই গড়ে উঠেছে এই দল। সদ্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে যখন ক্রমে ক্রমে উপলব্ধ হলো গণতন্ত্র বিকাশের অনুকূল পরিবেশ তদানীন্তন মুসলিম লীগ সরকার মোটেই রাখছেন না, তখনই অঙ্কুরিত হলো আওয়ামী লীগের বীজ।
বঙ্গবন্ধুর নিজের ভাষায়- (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ. ১১৯)… “স্বাধীন দেশ (পাকিস্তান), জনগণ নতুন কিছু আশা করেছিল, ইংরেজ চলে গেলে তাদের অনেক উন্নতি হবে এবং শোষণ হবে না। আজ দেখছে ঠিক তার উল্টো। জনগণের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছিল, এদিকে ভ্রুক্ষেপ নাই আমাদের শাসকগোষ্ঠীর। জিন্নাহর মৃত্যুর পর থেকেই কোটারী ও ষড়যন্ত্রের রাজনীতি শুরু হয়েছে। লিয়াকত আলী খান এখন সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী।… যদিও তিনি গণতন্ত্রের কথা মুখে বলতেন, কাজে তার উল্টা করছিলেন। জিন্নাহকে পূর্ব বাংলার জনগণ ভালবাসত এবং শ্রদ্ধা করত। ঘরে ঘরে জনসাধারণ তাঁর নাম জানত।” কিন্তু রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কে ঢাকায় জিন্নাহ সাহেবের ঘোষণা অবশ্য তাৎক্ষণিকভাবেই প্রত্যাখ্যাত হয়েছিল এবং রাষ্ট্রভাষা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সূচনা সেখানেই ছিল, তবুও “জিন্নাহ সাহেব শাসনতন্ত্র দিয়ে গেলে কোনো গোলমাল হওয়া বা ভুল বোঝাবুঝির সম্ভাবনা থাকত কি না সন্দেহ ছিল।” (প্রাগুক্ত) বস্তুত; ১৯৪৭ সালের ২৭ এপ্রিল দিল্লিতে এক সম্মেলনে যখন সোহরাওয়ার্দী তার স্বাধীন অবিভক্ত বাংলার পরিকল্পনা প্রকাশ করেন এবং অব্যবহিত পরেই তা আবুল হাশিম এবং শরৎচন্দ্র বসু কর্তৃক সমর্থিত হয়, তখন জিন্নাহ সাহেবও এই প্রস্তাবে তার সম্মতির কথা জানিয়েছিলেন। তাছাড়া ১১ই আগস্ট ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান গণপরিষদের প্রথম প্রস্তুতি সভায়ই তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে পরিপূর্ণ অসাম্প্রদায়িক পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার ঘোষণা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, (এই মর্মে) যে “পাকিস্তান হবে এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে মুসলিম, হিন্দু, খ্রিষ্টান কেউই ধর্মভিত্তিতে আলাদা থাকবে না- তাদের ভুলে যেতে হবে তারা বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীÑ ব্যক্তিগত ধর্মের অর্থে নয়Ñ জাতিগতভাবে। এখন থেকে হবে তারা সবাই পাকিস্তানী। তবে ব্যক্তিগত ধর্মপালনের সমানাধিকার প্রত্যেকেরই থাকবে।” শুধু সেদিন নয়, ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে সিলেটে গণভোটের সময় ভারতের তদানীন্তন অন্তর্বর্তীকালীন (Interim Goverment) সরকারে যারা পূর্ব ভারত থেকে একমাত্র মন্ত্রিসভা সদস্যÑ মুসলিম লীগের প্রতিনিধি যোগেন্দ্র নাথ ম-ল এটাই প্রচার করেছিলেনÑ “স্বাধীন পাকিস্তানে অধিকারের দিক থেকে কোনভাবে ধর্মগত, জাতিগত, শ্রেণীগত, বর্ণগত, হিন্দু-মুসলিম, ব্রাহ্মণ-শুদ্রÑ এ জাতীয় কোনো ভেদাভেদ থাকবে না। আমিই হব পাকিস্তানের আইন-সংসদ মন্ত্রী। গঠনতন্ত্র রচনার মূল দায়িত্ব হবে আমার।” এসব বক্তব্য তখন গণভোটে, বিশেষ করে হিন্দু তফসিলি সম্প্রদায়ের ওপর প্রচুর প্রভাব ফেলেছিল। এবং প্রচুর তফসিলি ভোট সিলেটের পাকিস্তান যোগদানের পক্ষে পড়েছিল। সিলেটের পাকিস্তান-ভুক্তির (এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের) অন্যতম কারণ ছিল এটা। (বিভিন্ন কারণে সিলেটের মুসলমানদের বেশ ভোট আসামে থেকে যাবার বা ভারত-ভুক্তির অনুকূলে পড়েছিল)।
যা হোক, জিন্নাহ সাহেবের মৃত্যু এবং পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অল্পকালের মধ্যেই শাসনযন্ত্রের অগণতান্ত্রিক রূপ এবং আঞ্চলিক বৈষম্য প্রকটভাবে প্রকাশ পেল। তখন জনগণের ভাবনায় ও চেতনায় এই উপলব্ধিই প্রধান হলোÑ (বঙ্গবন্ধুর ভাষায়ই- প্রাগুক্ত, পৃ. ১২০) “আর মুসলিম লীগের পিছনে ঘুরে লাভ নাই, এ প্রতিষ্ঠান এখন গণবিচ্ছিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।… কারণ এরা কোটারী করে ফেলেছে। একে আর জনগণের প্রতিষ্ঠান বলা চলে না…।”
এই জনগণের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রাণের তাগিদেই হলো আওয়ামী লীগের জন্ম।
আওয়ামী লীগ জন্মলগ্নে ছিল ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং শেখ মুজিবুর রহমান একমাত্র জয়েন্ট সেক্রেটারি। দলটিকে অসাম্প্রদায়িক হিসেবে গড়ে তোলার খাতিরে পরে ‘মুসলিম’ বাদ পড়ল। আওয়ামী লীগের প্রথম ওয়ার্কিং কমিটির সভায় যোগদান করেছিলেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকÑ ১৫০নং মোগলটুলীতে। সোহরাওয়ার্দী সাহেব ভারত থেকে চলে আসার পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যুক্ত হলেন। অনেক নেতাই আওয়ামী লীগের জন্ম এবং গড়ে উঠায় উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছেন। কিন্তু অবিসংবাদিতভাবে এটা সত্যি যে (বঙ্গবন্ধু) শেখ মুজিব একদম প্রথম থেকেই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত মুসলিম লীগের বিপরীতে অসাম্প্রদায়িক, জনগণের দুঃখ-কষ্টের প্রতি সংবেদনশীল, দুর্নীতিবিরোধী, পূর্ব বাংলার স্বার্থ রক্ষায় বদ্ধপরিকর অসাম্প্রদায়িক একটি রাজনৈতিক দল গঠনের ভাবনা এবং যথাযোগ্য কার্যক্রমের উদ্যোগে পাকিস্তানের প্রধান বিরোধী গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে গঠন করে তোলেন। তার অতুলনীয় ত্যাগ, মরণপণ সংগ্রাম, অবিশ্বাস্য সাংগঠনিক তৎপরতা, অদম্য উৎসাহ, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে অটল একনিষ্ঠতা এবং সম্মোহনী নেতৃত্ব এটা সম্ভব করে তুলেছিল।
তবে রেকর্ডের জন্য বলা যায়, “আওয়ামী লীগের জন্ম ১৫০ মোগলটুলীতে, এটা বললে ভুল হবে না। তবে এই ঐতিহ্যবাহী দলটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয় টিকাটুলিতে অবস্থিত রোজ গার্ডেনে- ২৩শে জুন, ১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে।” (উত্তরণ, মুজিববর্ষ সংখ্যা, পৃ. ১৮৬, সালাহউদ্দিন আজাদ শওকতের ‘১৫০ মোগলটুলি’)
২৩ জুন ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পলাশীর প্রান্তরে মীরজাফর-জগৎশেঠদের চরম বিশ্বাসঘাতকতায় বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নৃপতি নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার ব্রিটিশ ফৌজের নিকট পরাজয়ই বাংলা তথা ভারতের স্বাধীনতার অবসান সূচিত করে। এর ঠিক ১৯২ বছর পরে ২৩ জুন, পলাশী দিবসেই প্রতিষ্ঠিত হয় আওয়ামী লীগ, যার মাধ্যমে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি শেখ মুজিবের নেতৃত্বে একটি চরম রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ফলশ্রুতিতে অর্জিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা।
তারপর অনেক চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে বন্ধুর পথে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে এবং বাংলাদেশের সরকার-প্রধানের আসনে সমাসীন হন বঙ্গবন্ধু-তনয়া শেখ হাসিনা। তার বলিষ্ঠ এবং দূরদর্শী নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর নির্দেশিত পথে আজ দৃপ্ত পদক্ষেপে ধাবমান বাংলাদেশ। আর আওয়ামী লীগ তার বাহন।
বাংলাদেশের জনগণ সংগত কারণেই আশা করে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ তার গুরুদায়িত্ব যথাযথভাবেই পালন করবে। জাতির পিতা শেখ মুজিবের নীতি ও আদর্শের যথার্থ প্রতিফলন থাকবে তার কর্মকা-ে। এই বিশ্বাসের জন্যই আওয়ামী লীগ আজ দেশের গণতন্ত্রকামী সকল মানুষের ঠিকানা। আওয়ামী লীগের জন্যে আজ এটা একটা কঠিন ও বিরাট চ্যালেঞ্জ। অতীতের সংগ্রাম ও সাফল্যের আলোকে বলা যায় এই চ্যালেঞ্জের যথাযোগ্য মোকাবিলা করতে পারবে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন এই দল। শুভ জন্মদিনে এটাই আজ দেশ-বিদেশের সব বাঙালির আন্তরিক মনোকামনা ও শুভেচ্ছা।

লেখক : সদস্য, উপদেষ্টা পরিষদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ; সাবেক সচিব

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply