অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা ৭২ বছর পূর্তিতে আওয়ামী লীগ

কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ: বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে দলটির প্রতি আমার অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। ১৯৫৫ সালে দলটির নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে সকল ধর্মের মানুষের জন্য এই দলে অন্তর্ভুক্তি উন্মুক্ত করা হয়। আর ২৬ মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু কর্তৃক স্বাধীনতা ঘোষিত হলে স্বাভাবিকভাবে দলের নাম হয় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ। শুরুতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, পরবর্তীতে বেশ কয়েক বছর সাধারণ সম্পাদক থাকার পর ১৯৬৬ সাল শেখ মুজিবুর রহমান দলটির সভাপতি নির্বাচিত হন আর ঐ সময় তাজউদ্দীন আহমদ নির্বাচিত হন সাধারণ সম্পাদক। তখন থেকে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। প্রথমেই ৬-দফা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন, পরবর্তীতে স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং শেষে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেয়। এই পথ পরিক্রমায় প্রধান নেতৃত্বদানকারী শেখ মুজিবুর রহমান হয়ে ওঠেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, বঙ্গবন্ধু এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা পিতা। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে বর্তমানে মুজিববর্ষ পালিত হচ্ছে। আমি তার স্মৃতির উদ্দেশ্যে গভীর শ্রদ্ধা জানাই এবং তার মাগফিরাত কামনা করি। এদিকে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালিত হয়েছে বিগত ২৬ মার্চ এবং কয়েক মাস পর, অর্থাৎ আগামী ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী। এ এক গৌরবোজ্জ্বল সময় পার করছে জাতি। এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এবারের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
বিগত এক যুগ ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। এ সময়ে দেশে সামগ্রিকভাবে যে ঈর্ষণীয় আর্থ-সামাজিক অগ্রগতি হয়েছে, তা দেশে-বিদেশে নন্দিত। বিভিন্ন খাতে উন্নতি ধারাবাহিকভাবে হয়েছে এবং অভূতপূর্ব গতি পেয়েছে। ফলে সার্বিকভাবে যে অর্জন হয়েছে তার কয়েকটি বিশেষ দিক হলো : জাতীয় উৎপাদনে ধারাবাহিক উচ্চ প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়ে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচনে প্রভূত অগ্রগতি, শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হারে ব্যাপক হ্রাস, নারী শিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে লক্ষণীয় উন্নতি এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে বিস্তর সম্প্রসারণ। অর্থনীতিকে সুসংহত, স্থিতিশীল এবং আরও গতিশীল করার লক্ষ্যে অনেকগুলো বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ পদ্মাসেতু, পদ্মাসেতুতে রেল সংযোগ, ঢাকা মেট্রোরেল, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, পায়রা বন্দর, কর্ণফুলি টানেল এবং মাতারবাড়ী কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র। উল্লেখ্য, পদ্মাসেতু নিজ অর্থায়নে করা হচ্ছে এই সিদ্ধান্ত যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা করেন তখন বাংলাদেশের সামর্থ্যরে বার্তা বিশ্ব পরিম-লে পৌঁছে যায়।
উপর্যুক্ত অর্জনসমূহ করোনা মহামারির আগ পর্যন্ত বাস্তবায়িত অথবা দ্রুত এগিয়ে চলা। লক্ষণীয়, এই মহামারি ব্যবস্থাপনায়ও (জীবন রক্ষা, চিকিৎসা, খাদ্য সংকটে পড়াদের সহায়তা, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠনে প্রণোদনা ইত্যাদি) শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ পৃথিবীর অনেক দেশ থেকে অনেক ভালো করছে।
বঙ্গবন্ধুর ঘাতকদের বিচার ও মৃত্যুদ-প্রাপ্ত অধিকাংশের দ- বাস্তবায়ন (ফেরার থাকায় কয়েকজনের দ- এখনও কার্যকর করা যায়নি) এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং শাস্তিবিধান নিশ্চিত করে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনেক প্রণিধানযোগ্য বক্তব্য আছে। এই লেখায় তার দুটি বক্তব্যের কথা উল্লেখ করতে চাই। কয়েক মাস আগে তিনি বলেন, প্রান্তিক পর্যায়ে যারা রয়েছে তারা এদেশের মালিক। আমাদের সংবিধান অনুযায়ী এদেশের সকল নাগরিক এই প্রজাতন্ত্রের সমমালিক। ক্ষমতাবান ও সম্পদশালী অনেকে মনে করেন তারাই মালিক বা তারা বেশি মালিক। তাদের কাছে দরিদ্র ও পিছিয়ে থাকারা দেশে এক ধরনের ‘উটকো’ জীব। প্রধানমন্ত্রীর উপর্যুক্ত উচ্চারণ তাদের কাছে আশা করি পৌঁছেছে। তার ঐ উচ্চারণে আরও একটা তাগিদ রয়েছে বলে আমি মনে করি আর তা হচ্ছে সবার ন্যায্য অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে, তবেই টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।
সম্প্রতি তিনি বলেছেন দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিষ্ঠানের এমন উপদেশ গ্রহণ করা হবে না। রেলপথ ও বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট কর্পোরেশন (বিআরটিসি) বন্ধ করে দেওয়ার বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থ পরিপন্থী ছিল। তিনি রেলপথ ও বিআরটিসি’কে আরও শক্তিশালী করছেন এবং এগুলো সাধারণ মানুষের উপকারে আসছে। অবশ্যই দেশের বাস্তবতা, সাধারণ মানুষের নানা সমস্যা এবং তাদের আশা-আকাক্সক্ষা, দেশের উন্নয়ন দর্শন ও সংস্কৃতি, উন্নয়ন সম্ভাবনা ও সমস্যা আমরা নিজেরা ভালো জানি। কোনো পরামর্শ যদি সেই আঙ্গিকে গ্রহণযোগ্য হয়, তবে তা গ্রহণ করা যেতে পারে। অন্যথায় নয়। আর বাংলাদেশের বৈদেশিক সহায়তা নির্ভরতা এখন অতি সামান্য।
বঙ্গবন্ধু দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফুটাতে চেয়েছিলেন, অর্থাৎ সবার ন্যায্য অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করে উন্নয়নের কথা তিনি বলেন। বস্তুত তিনি সবার অন্তর্ভুক্তিমূলক কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথাই বলেন। বঙ্গবন্ধুর অনুসরণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে একটি অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল উদার গণতান্ত্রিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন ২০০৯ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে। এক্ষেত্রে মূল কথা হচ্ছে, মানুষকে কেন্দ্র করে অর্থাৎ দেশের সব মানুষকে তথা প্রজাতন্ত্রের সব মালিককে ন্যায্য ও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করে উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। বাংলাদেশ জাতিসংঘ প্রবর্তিত ২০৩০ টেকসই উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নেও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, যার মৌলিকত্বে আছে কাউকে বাদ না দেওয়া বা সবাইকে ন্যায্যভাবে অন্তর্ভুক্ত করার মন্ত্র। সুষম সমাজ গড়া বাংলাদেশের জন্মসূত্র-উদ্ভূত দায়িত্ব, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নিহিত। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র এবং বাংলাদেশের সংবিধানে বিধৃত।
তবে বাস্তবে বাংলাদেশে বৈষম্য প্রকট ও ক্রমবর্ধমান। এই সমস্যা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে চিহ্নিত করে সমাধানের অঙ্গীকার করা হয়েছে। করোনা মহামারির আগেই তা উপর্যুক্ত অন্য সব অর্জন মøান করে দিচ্ছিল। অবস্থা অনুধাবন করার জন্য একটি তথ্যই যথেষ্ট। বৈষম্য পরিমাপক জিনি সহগ আয়ের ক্ষেত্রে ২০১০ সালের ০.৪৫ থেকে ২০১৭ সালে বেড়ে হয়েছে ০.৪৮; আর জাতীয় আয়ে দেশের সবচেয়ে দরিদ্র ৫ শতাংশ মানুষের অংশ ২০১০ সালে ছিল মাত্র ০.৭৮ শতাংশ; কিন্তু ২০১৭ সালে তা আরও অনেক কমে দাঁড়ায় ০.২৩ শতাংশে, অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী ৫ শতাংশ মানুষের অংশ একই সময় ব্যবধানে ২৩.৬১ শতাংশ থেকে বেড়ে হয় ২৭.৮৯ শতাংশ। প্রাপ্ত তথ্য থেকে বোঝা যায় সম্পদ বৈষম্য আরও প্রকট। ব্যাপক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ বৈষম্য অর্থ-সম্পদ-সামাজিক বৈষম্যকে আরও পাকাপোক্ত করে চলেছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে নতুনভাবে সৃষ্ট এবং বেড়ে চলা তথ্যযুক্তিতে অভিগম্যতায় বৈষম্য (শিক্ষা-প্রশিক্ষণ-অবকাঠামো-উপযুক্ত যন্ত্র বঞ্চিত থাকায় বা এসব ক্ষেত্রে অপ্রতুলতা বা দুর্বলতার কারণে) বিরাজমান বহুমাত্রিক বৈষম্যের বেড়াজালকে আরও কণ্টকাকীর্ণ করে তুলছে। এ অবস্থা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিবেচনায় তো বটেই, মানবিক কোনো বিবেচনায় গ্রহণযোগ্য নয়।
করোনা মহামারিকালে বিভিন্ন মাত্রায় দারিদ্র্য ও বৈষম্য আরও অনেক বেড়ে গেছে। বিভিন্ন গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্য থেকে দেখা যায়, করোনাকালে আড়াই থেকে ৩ কোটি মানুষ নতুন দরিদ্র হয়েছে অর্থাৎ করোনা প্রাক্কালে প্রায় সাড়ে ৩ কোটিসহ দেশে বর্তমানে কম-বেশি ৬ কোটি মানুষ (৩৬/৩৭ শতাংশ) দরিদ্র। এছাড়া আরও অসংখ্য মানুষ আছেন যারা স্বল্প আয়ের। এই দরিদ্র ও স্বল্প আয়ের মানুষেরা আগের চেয়ে করোনাকালে অধিক বৈষম্যের শিকার। তাদের পারিবারিক অর্থনীতি করোনাকালে বিধ্বস্ত হয়েছে অথবা সংকুচিত হয়েছে। তাদের ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে গেছে, কেননা তাদের অর্থনৈতিক ভিত আগের চেয়ে অনেক দুর্বল হয়ে গেছে এবং তাদের অধিকাংশ অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণের জন্য সহায়তা বা প্রণোদনা পাচ্ছেন না।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার হউক আর পরবর্তীতে এর পুনর্জাগরণ হউক এগিয়ে চলার পথে বহুমাত্রিক বৈষম্য ও দারিদ্র্য দূরীকরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি কি প্রচলিত বাজার অর্থনীতিতে সম্ভবপর? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বঙ্গবন্ধুর একটি বক্তব্য বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তিনি লিখেন : “আমি নিজে কমিউনিস্ট নই। তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসাবে মনে করি। এই পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যতদিন দুনিয়ায় থাকবে ততদিন দুনিয়ার মানুষের উপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না।” অত্যন্ত বাস্তবানুগ বক্তব্য যার সত্যতা দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে এবং বিশ্বজুড়ে প্রকট ও ক্রমবর্ধমান বহুমাত্রিক বৈষম্যে। যে প্রক্রিয়া এমন বৈষম্য ও শোষণ সৃষ্টি করে সেই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শোষণমুক্তি ও বৈষম্য দূরীকরণ সম্ভব নয়, এ-কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়।
আর যদি পুঁজিপতিরা রাষ্ট্রীয় নীতি-নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকেন এবং সেই আলোকে কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে নেতৃত্বে দেন, তাহলে বৈষম্যের বেড়াজাল ভাঙা সম্ভব হবে না; বরং ক্রমে তা আরও ব্যাপক ও দুরূহ হতে থাকবে। বঙ্গবন্ধু যেমনটি বলেছেন, পুঁজিপতি সৃষ্টিকারী অর্থনীতিতে সাধারণ মানুষের ওপর থেকে শোষণ বন্ধ হবে না।
তাই বঙ্গবন্ধু কৃষক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও শ্রমিকসহ সাধারণ মানুষকে সক্ষম ও ক্ষমতায়িত করে দেশে সবার জন্য সুষম উন্নয়ন প্রক্রিয়া চালু করার লক্ষ্যে সমবায় পদ্ধতি প্রবর্তন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। অন্যদিকে বড় শিল্প, ব্যাংক, বীমা ও ব্যবসায় রাষ্ট্রীয়করণ করা হয়েছিল। অর্থাৎ পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি নয়, প্রজাতন্ত্রের সকল নাগরিকের (মালিকের) ন্যায্য অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করে কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার পথ রচনা করতে চেয়েছিলেন। সেই পথে অগ্রসর হওয়ার সময়-সুযোগ তাকে ঘাতকরা দেয়নি। তিনি সেই সুযোগ পেলে তার উন্নয়ন দর্শনের আলোকে বাস্তবতা আজ ভিন্ন হতে পারত।
বৈষম্য ও দারিদ্র্য-সংক্রান্ত বর্তমান বাস্তবতায় এদেশে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, বঙ্গবন্ধুর উন্নয়ন দর্শন এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অঙ্গীকারভিত্তিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলা কি সম্ভব? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সে-পথে অগ্রসর হওয়া সম্ভব বলে আমি মনে করি। তবে অবাধ বাজার অর্থনীতি-নব্যউদারতাবাদের প্রভাব আয় ও সম্পদ বৈষম্য বৃদ্ধিতে অব্যাহত থাকলে কাজটি সহজ হবে না। যাই হোক, অন্তর্ভুক্তিমূলক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ার কাজ জোরদার করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ এক গুচ্ছ দিক-নির্দেশনা রয়েছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে। কয়েকটি এখানে উল্লেখ করছি।
‘আমার গ্রাম আমার শহর’ অর্থাৎ শহর থেকে অনেক পিছিয়ে থাকা গ্রামসমূহে শহরের সুযোগ-সুবিধা তৈরি করা হবে। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার গ্রামীণ মানুষের বাস্তবতা ও আশা-আকাক্সক্ষাভিত্তিক বহুমাত্রিক (শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, কৃষি ও বিভিন্ন অ-কৃষি খাতে অর্থনৈতিক কর্মকা-, রাস্তাঘাট ও অন্যান্য অবকাঠামো, পানি ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা ইত্যাদি) কর্মসূচির আওতায় বাস্তবতা বিশ্লেষণ, পরিকল্পনা ও কর্মসূচি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নে গ্রামীণ মানুষদের ও স্থানীয় সরকারকে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করে গ্রাম পর্যায়ে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সম্প্রসারণ এবং সংশ্লিষ্ট সব গ্রামীণ মানুষের সক্ষমতা বৃদ্ধি ও আর্থ-সামাজিক উন্নতি নিশ্চিত করা যেতে পারে। এমন প্রক্রিয়া ব্যয়-সাশ্রয়ী করা যায় বলে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন সমৃদ্ধি কর্মসূচির অভিজ্ঞতা থেকে প্রতীয়মান হয়। উল্লেখ্য, সমৃদ্ধি কর্মসূচি প্রণয়ন করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর মানুষকেন্দ্রিক উন্নয়ন দর্শনকে বিবেচনায় নিয়ে।
একই সঙ্গে উক্ত ইশতেহারের অন্য একটি সেøাগান ‘তারুণ্যের শক্তি বাংলাদেশের সমৃদ্ধি’-এর আঙ্গিকে তরুণ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিয়ে এই প্রক্রিয়ায় এবং গ্রামে বা শহরে অন্যান্য কাজে নিয়োজিত করা যেতে পারে। সম্ভাব্য ক্ষেত্রে তাদের বিদেশে কাজ করতে পাঠানো যেতে পারে।
মাঠ পর্যায়ে সাধারণ মানুষকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করে স্থানীয় বাস্তবতা ধারণ করে প্রস্তাবিত উন্নয়ন কর্মসূচিসমূহ বাস্তবায়ন কার্যকরভাবে করার জন্য রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রায়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ বিকেন্দ্রায়ন বাস্তবায়ন করার কথা ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহারে স্বীকৃত। এছাড়া বিষয়টি বহুল আলোচিত এবং জাতীয় সংসদেসহ বহুল অঙ্গীকারাবদ্ধ। তদুপরি করোনা মহামারিকালে এর প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে সামনে এসেছে। যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ অতীব জরুরি।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা ঘোষণা করা হয়েছে। প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এই নীতির কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরিÑ সবখানে এবং সব পর্যায়ে। এখন পর্যন্ত সাধারণত রাঘব বোয়ালরা ধরা পড়েন না বা শাস্তি পান না। কী রাজনৈতিক পরিম-লে, কী প্রশাসনিক বলয়ে, কী ব্যাংকিং খাতে, কী শেয়ারবাজারে, কী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, কী অন্য কোথাওÑ যে পর্যায়েই দুর্নীতি হউক, দ্রুত শূন্য সহনশীলতা অনুসরণ করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ ও আইনানুগ শাস্তি বিধান করলেই এই পথে যাওয়া থেকে উৎসাহী অন্য অনেকেই বিরত থাকবে।
ঐ ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত আরও দুটি বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ মানবকেন্দ্রিক উন্নয়ন বাস্তবায়নে এবং স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বিধৃত সবার মানব-মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে। এ দুটির একটি হচ্ছে সুশাসনে ঘাটতিসমূহ দূর করে সবার জন্য আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং অন্যটি প্রশাসনকে জনমুখী করে তোলা। সংগত কারণেই এই অঙ্গীকার দুটির বাস্তবায়ন জরুরি। কেননা উভয় ক্ষেত্রে নানা ঘাটতি রয়েছে। দেখা যায়, প্রশাসনে অনেকে চেয়ার-ক্ষমতা তাড়িত হয়ে কাজ করেন, সেবাদানে জনবান্ধব নন। এক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর একটি গুরুত্বপূর্ণ উক্তি উল্লেখ্য। সাধারণ মানুষকে সম্মান দিয়ে কথা বলতে তিনি ক্ষমতার চেয়ারে উপবিষ্ট ‘সাব’দের বলেছিলেন, কেননা ঐ মানুষদের করের টাকায় তাদের বেতন-ভাতার ব্যবস্থা হয়।
এবার বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২০১৮ সালের নির্বাচনী ইশতেহার থেকে বেরিয়ে আরও ৩টি বিষয়ে কিছু কথা বলে এই লেখা শেষ করব।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় কল্যাণ রাষ্ট্র গড়তে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। কিন্তু বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনও মাত্র ৯ শতাংশের মতো। এটি সর্বনিম্ন কর আদায়কারী দেশসমূহের অন্যতম। নেপালেও এই অনুপাত ১৭ শতাংশ। তদুপরি, বাংলাদেশে ধনীদের করের টাকা থেকে প্রণোদনা হয়ে থাকে। এ অবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়। কর-জিডিপি অনুপাত অবশ্যই উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো জরুরি। আর প্রণোদনা ধনীদের নয়, প্রয়োজনানুসারে গরিবদের দেওয়া উচিত।
অনেক নেতা-নেত্রী এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বক্তব্যে এক ধরনের আত্মতুষ্টি এবং নিজেই সব জানি এবং যা করছি সবই ঠিক করছি এমন ভাব প্রকাশ পায়। এ-ধরনের মানসিকতা চোখে ঠুলি পরিয়ে দেয় এবং জরুরি পরিবর্তন এবং অগ্রগতি ব্যাহত করে। এই মানসিকতা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
সর্বশেষে বলতে চাই, করোনা মহামারি ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্যভাবে সফল। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং পুনর্জাগরণ প্রক্রিয়ায় নতুন দরিদ্র ও যারা আগে থেকে দরিদ্র ছিলেন এবং এখন আরও সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছেন তাদের উপর্যুক্ত মানবকেন্দ্রিক প্রক্রিয়া অনুসরণে অগ্রাধিকার দিয়ে বৈষম্য দূরীকরণ এবং সুষম উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় উত্তরণের পথ প্রশস্ত করা বাঞ্ছনীয়। পাশাপাশি টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন ব্যবস্থাপনায় অব্যাহত কার্যক্রম অগ্রাধিকার নিরূপণ করে জোরদার করার দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আবারও অভিনন্দন। দীর্ঘদিন ধরে দলটির সভাপতি হিসেবে সফল নেতৃত্বদানকারী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা। এই ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলটি উত্তরোত্তর আরও সমৃদ্ধ হউক এবং দেশে প্রতিশ্রুত অন্তর্ভুক্তিমূলক সমৃদ্ধ কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় দৃপ্তপদে এগিয়ে চলুক।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, অর্থনীতিবিদ, সমাজচিন্তক, স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply