বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অভ্যুদয়ের পটভূমি

নূহ-উল-আলম লেনিন: সাম্প্রদায়িক ও অবৈজ্ঞানিক দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত দুটি পৃথক ভূ-খ- নিয়ে কৃত্রিম রাষ্ট্র পাকিস্তান গঠিত হয়। এই দুই অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভাষা, সংস্কৃতি এমনকি নৃ-তাত্ত্বিক ক্ষেত্রেও কোনো মিল ছিল না। জন্মলগ্ন থেকেই পাকিস্তানের প্রকৃত রাষ্ট্রক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানের সামন্ত ভূ-স্বামী, ভারত প্রত্যাগত উর্দুভাষী অভিজাত সম্প্রদায় ও উঠতি ধনিক-শ্রেণি এবং সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রের কুক্ষিগত হয়। ঐতিহাসিকভাবে এরা ছিল বাংলা বাঙালি এবং বাংলা ভাষা-বিদ্বেষী। অচিরেই তার বহিঃপ্রকাশ ঘটে রাষ্ট্রভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রশ্নে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী প্রথম থেকেই পূর্ব বাংলাকে তাদের উপনিবেশে পরিণত করে। পূর্ব বাংলা ছিল সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনসংখ্যা অধ্যুষিত। কিন্তু পাকিস্তানের কেন্দ্রীয়ক্ষমতা অবাঙালি অভিজাত-শ্রেণির হাতে থাকায় এবং রাজধানী পাকিস্তানের করাচিতে স্থাপিত হওয়ায়, শুরুতেই পূর্ব বাংলা বৈষম্যের শিকারে পরিণত হয়। শুরু থেকেই বেসামরিক প্রশাসনের চাকরি, সশস্ত্র বাহিনীতে বাঙালিদের অংশগ্রহণ এবং উভয় ক্ষেত্রে পদোন্নতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা স্থাপন এমনকি মন্ত্রিসভায় পর্যন্ত বাঙালির সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ছিল না। পাকিস্তানের প্রথম মন্ত্রিসভার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ভারত প্রত্যাগত (মোহাজের) লিয়াকত আলী খান। প্রধানমন্ত্রী বাদে ১৩ জন মন্ত্রী, তিনজন প্রতিমন্ত্রী ও দুজন উপমন্ত্রী নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। লক্ষণীয় যে, ১৩ জন মন্ত্রীর মধ্যে মাত্র চারজন পূর্ববঙ্গের। তিনজন প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে একজন মাত্র বাঙালি। এমনকি পূর্ব বাংলা থেকে নিয়োগকৃত চারজন কেবিনেট মন্ত্রীর একজন (ঢাকার নবাব পরিবারের খাজা সাহাবুদ্দিন) ছিলেন উর্দুভাষী এবং অপর একজন বাঙালি হয়েও (ফজলুর রহমান) ছিলেন কট্টর উর্দুপন্থি, যিনি আরবি হরফে বাংলা লেখার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
পাকিস্তানের দুই অংশের ক্রমবর্ধমান বৈষম্য, পূর্ব বাংলার সম্পদ দিয়ে পাকিস্তানকে গড়ে তোলা স্বাভাবিকভাবেই বাঙালি চিত্তে ক্ষোভের সঞ্চার করে। ক্রমশ বাঙালির মোহভঙ্গ ঘটতে থাকে। তবে ভাষার প্রশ্নে পাকিস্তান সরকারের নীতি বাঙালির জাতীয় জাগরণকে তরান্বিত করে। বিতর্কটা শুরু হয় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা নিয়ে। পাকিস্তান জন্মের আগেও এ বিতর্ক ছিল। তবে ১৯৪৮ সালে পূর্ব বাংলা সফরে এসে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সুস্পষ্ট ভাষায় উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করায় অগ্নিতে ঘৃতাহুতি পড়ে। জিন্নাহর উক্তি ছিল সুস্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন। তার এ কথা থেকেই পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মাতৃভাষা বাংলাকে অস্বীকৃতি জানিয়ে উর্দুকেই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র পরিষ্কার হয়ে যায়। ছাত্র-সমাজ, সংস্কৃতিসেবী, বুদ্ধিজীবী ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় তীব্র প্রতিক্রিয়া।
১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ‘তমুদ্দন মজলিস’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন গঠিত হয়। তমুদ্দন মজলিসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা আবুল কাশেম তার এক লেখায় পূর্ব পাকিস্তানের সরকারি দাপ্তরিক ভাষা বাংলা করা এবং কেন্দ্রে বাংলা ও উর্দুকে সরকারি ভাষা হিসেবে চালু করার দাবি জানান। তমুদ্দনের প্রতিষ্ঠাকালীন এই নেতা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের তরুণ লেকচারার আবুল কাশেম (পরবর্তীকালে প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম হিসেবে সমধিক পরিচিত)। তিন সদস্যের তমুদ্দন মজলিসের অন্য একজন প্রতিষ্ঠাতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, যিনি পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পর থেকেই শাসক মুসলিম লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ক্ষমতাসীন খাজা গ্রুপ দলের মধ্যে কোটারি সৃষ্টি করে। তারা সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিম গ্রুপের সবাইকে বাদ দিয়ে দলের কর্মকা- চালায়। এমন কী সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের দখলে থাকা ১৫০ মোগলটুলীর অফিসটিও দখলের জন্য একাধিকবার হামলা চালায়। দলের সদস্য রসিদ বই চাইলে তা প্রত্যাখ্যান করে। সর্বোপরি নাজিমুদ্দীন সোহরাওয়ার্দী অনুসারীদের ওপর নির্যাতন শুরু করে। এমতাবস্থায় ঐক্যবদ্ধভাবে মুসলিম লীগ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তাই সোহরাওয়ার্দী অনুসারীরা ১৫০ মোগলটুলিতে মুসলিম লীগ ওয়ার্কার্স ক্যাম্প নামে স্বতন্ত্র কেন্দ্র স্থাপন করে এবং স্বতন্ত্রভাবে সাংগঠনিক তৎপরতা শুরু করে। ১৯৪৭ ও ’৪৮ সালে একাধিক কর্মিসভা অনুষ্ঠিত হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে না ভাঙলেও ১৯৪৯ সালের টাঙ্গাইল উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে মুসলিম লীগে ভাঙনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল উপনির্বাচনে মুসলিম লীগের অফিসিয়াল প্রার্থী খুররম খান পন্নীর বিরুদ্ধে মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দীপন্থিরা তরুণ নেতা শামসুল হককে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দান করে। এই নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে জয়লাভ করেন। এরপর পরাজয়ের ভয়ে মুসলিম লীগ আর কোনো উপনির্বাচন দিতে সাহস পায়নি। ১৯৪৭ সালের আগস্টে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার প্রাক্-মুহূর্তে ৩ জুন মাউন্ট ব্যাটেন পরিকল্পনা প্রকাশের পর ঢাকায় কর্মরত সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের অনুসারীদের একটি অংশ ‘১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে ঢাকায় গণআজাদী লীগ (১৯৫০ সালে সিভিল লিবার্টিজ লীগ নাম ধারণ করে) গঠন করেন।’ এই সংগঠনের মেনিফেস্টোতে বলা হয় : ‘সত্যিকার পাকিস্তান অর্থে আমরা বুঝি, জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি। সুতরাং আমাদের এখন কর্তব্য এই নবীন পূর্ব পাকিস্তান রাষ্ট্রকে সুন্দরভাবে গঠিত করা এবং মানুষের মধ্যে বৈপ্লবিক দৃষ্টিভঙ্গি আনয়ন করা।’ গণআজাদী লীগ ছিল মুসলিম লীগের বামধারার অসাম্প্রদায়িক চিন্তার তরুণদের সংগঠন। এই দলে অন্যদের মধ্যে ছিলেন মোহাম্মদ তোয়াহা, তাজউদ্দীন আহমদ, অলি আহাদ ও নইমউদ্দিন আহমদ প্রমুখ। গণআজাদী লীগের আহ্বায়ক ছিলেন কামরুদ্দিন আহমেদ। মুসলিম লীগ সরকারের তীব্র দমননীতি, সাম্প্রদায়িক পরিবেশ এবং অলি আহাদের মতে সভাপতির নিষ্ক্রিয়তার জন্য এই দলটি জনদল হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি। ‘এর কারণ : প্রথমত, আহ্বায়ক কামরুদ্দীন আহমদের কর্মবিমুখ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা, কারাগার-ভীতি ও ত্যাগী মনোভাবের অভাব; দ্বিতীয়ত, সমগ্র দেশে উৎকট সাম্প্রদায়িক বিষাক্ত আবহাওয়া, তৃতীয়ত, তদানীন্তন মুসলিম লীগ সরকারের কঠোর দমননীতি।’ গণ-আজাদী লীগ দীর্ঘস্থায়ী না হলেও, এই রাজনৈতিক দল নবপ্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানে যে প্রগতিশীল ও নতুন ধারার রাজনীতির শুভসূচনা করেছিল, পরবর্তীকালে তা বিকশিত হয়ে মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কবর রচনা করেছিল।
অন্যদিকে ১৯৪৮ সালে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির কলকাতা কংগ্রেস থেকে পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি আলাদা হয়ে যায়। সাজ্জাদ জহিরকে পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নিয়োগ করে কেন্দ্রীয় কমিটি গঠিত হয়। মণি সিংহকে সাধারণ সম্পাদক করে পূর্ববঙ্গে স্বতন্ত্র কমিটি গঠিত হয়। কিন্তু কলকাতা কংগ্রেসে সিপিআই নতুন সাধারণ সম্পাদক বিটি রণদীভের রাজনৈতিক লাইন অনুসরণ করে। সিপিআই ভারতের স্বাধীনতাকে ভুয়া হিসেবে মূল্যায়ন করে বিপ্লবের ডাক দেয়। ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়’ সেøাগান তুলে সিপিআই সশস্ত্র সংগ্রামের লক্ষ্য স্থির করে। এই উগ্র হঠকারী রাজনৈতিক লাইন গ্রহণ করার পর কমিউনিস্ট পার্টির ওপর দমননীতি নেমে আসে। ভারতে সিপিআই নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। সিপিআই-র এই লাইন অন্ধভাবে পাকিস্তানের কমিউনিস্টরা গ্রহণ করে। পূর্ব পাকিস্তানেও এই হঠকারিতার জন্য কার্যত কমিউনিস্ট পার্টির তৎপরতা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। অসংখ্য নেতা গ্রেফতার হন, আত্মগোপনে যান। ১৯৫০ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে সংখ্যালঘু হিন্দুসম্প্রদায় ব্যাপকভাবে দেশত্যাগ করে ভারতে চলে যায়। কমিউনিস্ট পার্টির গণভিত্তি ছিল হিন্দুসম্প্রদায়ের মধ্যে। দেশভাগের পর পূর্ব বাংলায় পার্টি সদস্য ছিল ১২ হাজার। এর অধিকাংশই ছিল হিন্দু। দাঙ্গার ফলে কমিউনিস্ট পরিবারগুলোও দেশত্যাগে বাধ্য হয়। পার্টির সদস্যসংখ্যা কয়েক শ-তে নেমে আসে। একদিকে দাঙ্গা, সরকারের নিষ্ঠুর দমননীতি এবং অন্যদিকে কমিউনিস্ট পার্টির বাম হঠকারী রাজনৈতিক লাইন প্রভৃতি কারণে পার্টি কার্যত একটি গণবিচ্ছিন্ন গ্রুপে পরিণত হয়। কমিউনিস্ট পার্টির অনুসারী ছাত্রসংগঠন ছাত্র ফেডারেশনও ১৯৪৮ সালে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ফেডারেশন হিসেবে আলাদা কমিটি গঠন করে। এই কমিটির সভাপতি ছিলেন আখলাকুর রহমান (পরবর্তীকালে অর্থনীতির খ্যাতিমান অধ্যাপক ও জাসদের জন্মলগ্নের তাত্ত্বিক), সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শহিদুল্লাহ কায়সার (শহিদ সাংবাদিক)। কিন্তু ছাত্র ফেডারেশন ছাত্রদের মধ্যে তেমন কোনো প্রভাবশালী সংগঠন হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি। তেভাগা, টংক ও নানকার আন্দোলনের নামে হঠকারিতার জন্য সংগঠিত এলাকার কৃষক আন্দোলন নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। অর্থাৎÑপাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে ছাত্র ফেডারেশনের কিছুটা জনপ্রিয়তা থাকলেও, দেশভাগোত্তর পূর্ববঙ্গে তা একেবারেই হ্রাস পায়। মুনতাসীর মামুন ও মো. মাহবুবর রহমান লিখেছেন : “দেশভাগের পর পূর্ববাংলা ছাত্র ফেডারেশনের যে শাখা গঠিত হয় তা গোড়াতেই দুর্বল ছিল। এই সংগঠনটি কমিউনিস্ট পার্টির অঙ্গসংগঠন ছিল। এর অধিকাংশ সদস্য ছিল হিন্দু। দেশভাগের পর হিন্দু রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা ব্যাপক হারে ভারতে গমন করায় কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ফেডারেশন উভয় সংগঠন এখানে দুর্বল এবং অকার্যকর হয়ে পড়ে। তাছাড়া সরকারের দমননীতির কারণেও ছাত্র ফেডারেশন এখানে স্থায়ী হতে পারেনি।”

ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা
১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ববঙ্গে একদার বঙ্গীয় মুসলিম লীগের অঙ্গসংগঠন মুসলিম ছাত্রলীগ বিভক্ত হয়ে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ নামে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন মুসলিম লীগ ভেঙে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার দুই বছর না যেতেই শাসক মুসলিম লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যায়। তবে ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগে এই বিভক্তি দেশভাগের আগে থেকে চলে আসা অন্তর্দলীয় কোন্দলেরই অনিবার্য পরিণতি। এ-কথা সর্বজনবিদিত যে দেশভাগের আগেই বেঙ্গল মুসলিম লীগে দুই গ্রুপে বিভক্ত ছিল। খাজা নাজিমউদ্দিন গ্রুপ ও সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম গ্রুপ। বাংলার মুসলিম লীগের নেতৃত্ব দীর্ঘদিন যাবত ঢাকার নবাব পরিবার ও বাংলার অভিজাত মুসলমানরা নিয়ন্ত্রণ করত। নবাব জমিদার জোতদারদের প্রভাবিত এই মুসলিম লীগের খুব একটা জনসম্পৃক্ততা ছিল না। ভাবাদর্শের দিক থেকে মুসলিম লীগ ছিল রক্ষণশীল, সাম্প্রদায়িক এবং গণবিরোধী। জেলা পর্যায়ে কিছু উকিল-মোক্তার ও মুসলমান জমিদারদের পকেটস্থ মুসলিম লীগ কার্যত এদের ড্রয়িংরুম পার্টি হিসেবেই পরিচিত ছিল। ত্রিশের দশকেও অধিকাংশ জেলা, মহকুমা এবং থানা পর্যায়ে মুসলিম লীগের সক্রিয় শাখা ছিল না। যেটুকু ছিল, তাও ছিল কাগজে-কলমের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
পক্ষান্তরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন উদার গণতন্ত্রী এবং সাধারণভাবে অসাম্প্রদায়িক। তরুণ বয়সে ব্যারিস্টারি পাস করে কলকাতায় ফিরে এসে তিনি কিছুদিন খিদিরপুর ডকইয়ার্ড এলাকায় ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। উদার গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে তিনি নেতাজী সুভাষ বসুর আস্থা অর্জন করেন। নেতাজী যখন কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র, সোহরাওয়ার্দী তখন নেতাজীর সহকর্মী হিসেবে ডেপুটি মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন। দ্বিতীয়ত; সোহরাওয়ার্দী ছিলেন দক্ষ সংগঠক। নিজ দক্ষতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলির কারণে তরুণ মুসলিম লীগারদের মধ্যে তিনি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। তিরিশের দশকের মাঝামাঝি থেকেই সোহরাওয়ার্দী বঙ্গীয় মুসলিম লীগের নেতৃস্থানীয় হিসেবে নিজের দৃঢ় অবস্থান গড়ে তোলেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সোহরাওয়ার্দীর ভাবশিষ্য।
১৯৩৮ সালের দিকে বর্ধমানের আবুল হাশিম মুসলিম লীগের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করেন। আবুল হাশিম ছিলেন ইসলাম শাস্ত্র ও মার্কসবাদী সাহিত্যের প-িত। সোহরাওয়ার্দীর পৃষ্ঠপোষকতায় আবুল হাশিম খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মুসলিম লীগের রাজনীতির প্রথম কাতারে উন্নীত হন। আবুল হাশিম লিখেছেন : ব্যক্তিগতভাবেই ‘দ্বি-জাতিতত্ত্বে বিশ্বাসী ছিলেন না; দ্বি-জাতিতত্ত্ব তিনি প্রচারও করেন নি।’ এ প্রসঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন :

“এই সময় আবুল হাশিম সাহেব মুসলিম লীগ কর্মীদের মধ্যে একটা নতুন প্রেরণা সৃষ্টি করেন এবং নতুনভাবে যুক্তিতর্ক দিয়ে বোঝাতে চেষ্টা করতেন যে পাকিস্তান দাবি হিন্দুদের বিরুদ্ধে নয়, হিন্দু মুসলমানদের মিলানোর জন্য এবং দুই ভাই যাতে শান্তিপূর্ণভাবে সুখে বাস করতে পারে তারই জন্য।”
তিনি মুসলিম লীগকে একটি গণপার্টিতে পরিণত করার ব্যাপারে বিশেষভাবে উদ্যোগী ছিলেন। বস্তুত, আবুল হাশিম সোহরাওয়ার্দীর চেয়েও অগ্রসর চিন্তার দক্ষ সংগঠক ছিলেন। ১৯৪৩ সালে আবুল হাশিম বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। আবুল হাশিম মুসলিম লীগের কার্যালয়ে পার্টি স্কুল চালু করেন। যেখানে তিনি যুবকদের নিয়ে বিভিন্ন তাত্ত্বিক বিষয়ে প্রশিক্ষণের বা ক্লাসের ব্যবস্থা করেছিলেন। আবুল হাশিম শিক্ষিত তরুণ বিশেষত মুসলিম ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের একটা বড় অংশকে তার পার্টি স্কুলে সমবেত করতে সক্ষম হন। তার এই নীতি-কৌশলের জন্য খাজা নাজিমউদ্দিন ও মওলানা আকরাম খাঁর রক্ষণশীল গ্রুপ তাকে কমিউনিস্ট হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেন। আবুল হাশিমের এই প্রচেষ্টা, বিশেষত মুসলিম লীগকে গণপার্টি করা, সব জেলায়/মহকুমায় ও তৃণমূল পর্যায়ে দলের সংগঠন গড়ে তোলা, সদস্য সংগ্রহ করা ইত্যাদি উদ্যোগের জন্য একদিকে যেমন মুসলিম লীগে পুরনো স্থবিরতা ভেঙে যায়; জেলায়/মহকুমায় শক্তিশালী সংগঠন গড়ে উঠতে থাকে, অন্যদিকে খাজা গ্রুপও বিভিন্ন স্তরে তাদের নেতৃত্ব ধরে রাখার জন্য উঠে-পড়ে লাগে।
সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম বিভিন্ন জেলায় মুসলিম লীগ এবং ছাত্রলীগ গড়ে তোলার জন্য তরুণ ছাত্র নেতাদের দায়িত্ব দিতে থাকেন। যেমন বৃহত্তর ফরিদপুর অঞ্চলে মুসলিম লীগ ও ছাত্রলীগকে সংগঠিত করার জন্য তরুণ ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এভাবে অন্যান্য জেলা/মহকুমায়ও ছাত্র নেতাদের সংগঠনের কাজে নিয়োজিত করা হয়। বলা যেতে পারে, তখন থেকেই শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জেলায় সংগঠন গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৩৩ সালে বঙ্গীয় মুসলিম ছাত্র সমিতি গঠিত হয়েছিল। এই ছাত্র সমিতিই ১৯৩৫ সালে মহম্মদ আলি জিন্নাহর উপস্থিতিতে বেঙ্গল মুসলিম স্টুডেন্টস লীগ বা বঙ্গীয় মুসলিম লীগ নামে পুনর্গঠিত হয়। সভাপতি নির্বাচিত হন এমএএইচ ইস্পাহানি এবং সম্পাদক হন মাহমুদ নুরুল হুদা। পরবর্তীকালে আবদুল ওয়াসেক সভাপতির দায়িত্ব পান এবং টানা এক দশক সভাপতি থাকেন। বঙ্গীয় মুসলিম লীগে যেমন খাজা নাজিমউদ্দিন, মাওলানা আকরাম খাঁ, খাজা শাহাবুদ্দিন, মির্জা ইস্পাহানি, ফজলুর রহমান, হামিদুল হক চৌধুরী, ইউসুফ আলী চৌধুরী, তমিজ উদ্দিন খাঁ, নুরুল আমিন প্রমুখ এক গোষ্ঠীবদ্ধ ছিলেন এবং এরা প্রতিক্রিয়াশীল বা ডানপন্থি হিসেবে পরিচিত ছিলেন; তেমনি ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের বিজয়ের মূল নায়ক এবং অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, আবুল হাশিমের নেতৃত্বে অপেক্ষাকৃত তরুণরা বামপন্থি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
এই সময় কলকাতায় অধ্যয়নরত মুসলিম ছাত্রলীগের নেতাদের মধ্যে ‘নুরুদ্দীন আহমদ, সালেহ আহমদ, বরিশালের আবদুর রহমান, খুলনার ইকরামুল হক ও শেখ আবদুল আজিজ, যশোহরের আবদুল হাই ও মোশাররফ খান, রাজশাহীর আবুল হাসনাত মহাম্মদ কামারুজ্জামান, আতাউর রহমান, মোজাম্মেল হক, মহম্মদ মাহবুবুল হক ও আবদুর রশিদ খান, ফরিদপুরের শেখ মুজিবুর রহমান, বগুড়ার বিএম ইলিয়াস ও শাহ আবদুল বারি, রংপুরের আবুল হোসেন, পাবনার মহম্মদ আবদুর রফিক চৌধুরী, নদীয়ার ফকির মহম্মদ ও মহম্মদ সোলায়মান খান, দিনাজপুরের মহম্মদ দবিরুল ইসলাম, চট্টগ্রামের মাহবুব আনোয়ার, ইসলামিয়া কলেজ ইউনিয়নের সহ-সভাপতি শাহাবুদ্দীন এবং কলকাতার জহিরুদ্দীন কলকাতা কেন্দ্রের যুব মুসলিম লীগের কর্মীদের নেতা ছিলেন। কামরুদ্দীন আহমেদ, টাঙ্গাইলের শামসুল হক, ঢাকার কাজী মহম্মদ বশির, ইয়ার মহম্মদ, শামসুদ্দিন আহমেদ, মহম্মদ শওকত আলী, এ কে আর আহমেদ, মসিহুদ্দিন আহমেদ (রেজা মিয়া), আলমাস আলী, আউয়াল এবং তাজউদ্দীন আহমদ, কুমিল্লার খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও অলি আহাদ এবং নোয়াখালীর মহম্মদ তোয়াহা ও নজমুল করিম, এরা ঢাকা কেন্দ্রের নেতা ছিলেন। কামরুদ্দীন আহমেদ আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনি ঢাকার মুসলিম যুবদলের নেতা ছিলেন। বর্তমানে পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে চব্বিশ পরগনার আনোয়ারুল হক, শাহ আজিজুর রহমান এবং বাংলার কিছু সংখ্যক স্বার্থপর, প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিম যুবক খাজা নাজিমুদ্দীন এবং তার গোষ্ঠীকে সমর্থন করতেন।… খুলনার আবদুস সবুর খান এই যুবদলের মধ্যে ছিলেন এবং শাহ আজিজুর রহমানের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।’
আবুল হাশিম সাহেব যথার্থই লিখেছেন মুসলিম লীগ প্রভাবিত ছাত্র যুবকদের মধ্যে এই বিভেদ ও বিভাজন দেশভাগের পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। শুধু তাই না, ১৯৪৭ দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গে নাজিমুদ্দীনের নেতৃত্বে মুসলিম লীগ সরকার গঠনের পর এই বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। এই সময় কলকাতা থেকে অধিকাংশ মুসলিম লীগের নেতা-কর্মী এবং যাদের বাড়ি পূর্ববঙ্গে সেই সব ছাত্র ও যুবনেতারা ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকায় এসে তারা মুসলিম লীগ ও ছাত্রলীগের কাজে সম্পৃক্ত হতে চেষ্টা করেন। তবে প্রথম শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলকাতা ও পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রশমনের জন্য ঢাকায় না আসার সিদ্ধান্ত নেন। পরে তিনি যখন পূর্ববঙ্গে স্থায়ীভাবে চলে আসতে চান তখন নাজিমুদ্দীন সরকার তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। আবুল হাশিম সাহেব অবশ্য পশ্চিমবঙ্গেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কলকাতার ছাত্র-যুবকদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৭ সালের আগেস্টর শেষ দিকে গোপালগঞ্জের বাড়িতে এলেও ঢাকায় আসেন সেপ্টেম্বর মাসে। ঢাকায় এসে তিনি তৎকালীন ঢাকাস্থ দলীয় কার্যালয় ১৫০ মোগলটুলিতে ওঠেন। দেশভাগের আগে থেকেই ১৫০ মোগলটুলি মুসলিম লীগের অফিস হিসেবে চালু ছিল। ১৫০ মোগলটুলী অফিসে আবাসিক সুবিধাও ছিল। সে-কারণে অনেক নেতৃস্থানীয় কর্মী অফিসেই থাকতেন। শেখ মুজিবুর রহমানেরও ঠিকানা হয়ে দাঁড়ায় এই অফিস। দেশভাগের পর সরকারি মুসলিম লীগ ১৫০ মোগলটুলীর দখল নেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। ১৫০ মোগলটুলী সরকারি মুসলিম লীগ বিরোধীদের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
পাকিস্তান-সৃষ্টির অব্যবহিত পূর্বে কলকাতার সিরাজ-উদ-দৌলা হোটেলে প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী ও ছাত্ররা পূর্ব পাকিস্তানে তাদের পরবর্তী কর্তব্য ও কর্মপন্থা নির্ধারণের জন্য সমবেত হয়েছিলেন। তারা কমিউনিস্ট পার্টির আহাম্মদ রুহুলসহ কয়েকজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে শলাপরামর্শ করেন। নবগঠিত পাকিস্তানে পরিবর্তিত অবস্থার প্রেক্ষাপটে তারা ‘অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক আন্দোলন’ এবং এর জন্য ‘উপযুক্ত সংগঠন’ গড়ে তোলার তাগিদ অনুভব করেন। পরবর্তীকালে তারা “ঢাকা এসে কামরুদ্দীন আহমদ, শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, শামসুদ্দীন আহমদ, তসদ্দুক আহমদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, আবদুল ওয়াদুদ, হাজেরা মাহমুদ প্রভৃতির সাথে প্রাথমিক যোগাযোগ স্থাপন করেন।” দেশভাগের পর শেখ মুজিব ঢাকায় এসেই দেখতে পান, গণতান্ত্রিক যুবলীগ নামে একটি যুব সংগঠন গড়ে তোলার তোড়জোড় চলছে। সরকারি মুসলিম লীগে যেহেতু কাজের সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে না, তাই মূলত সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম গ্রুপের কর্মীরা একটা যুব সংগঠন গড়ার প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন করে এনেছে। মুসলিম লীগের শামসুল হক, আতাউর রহমান খান, কামরুদ্দীন আহমদ, শওকত আলী, ইয়ার মোহাম্মদ প্রমুখ সামনের কাতারে থাকলেও এই উদ্যোগের পেছনে মূল শক্তি ছিল কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সম্পৃক্ত যুবকর্মীরা। ১৫০ মোগলটুলীতে অফিস স্থাপন করে সম্মেলনের প্রস্তুতি চলছে। সম্মেলন অনুষ্ঠানের জন্য ঢাকায় কোনো হলের অনুমতি পাওয়া যাচ্ছিল না। এমতাবস্থায় ঢাকা মিউনিসিপ্যাল্টির ভাইস চেয়ারম্যান খান সাহেব আবুল হাসনাত সাহেবের বাড়ির হলঘরে ৬ ও ৭ সেপ্টেম্বর ১৯৪৭ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তবে সরকারি চাপে এই সম্মেলনের কোনো সংবাদ পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়নি। সম্মেলনের মূল লক্ষ্য সম্পর্কে শামসুল হক বলেন :

“পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলনের সবচেয়ে বড় উদ্দেশ্য ছিল একটি ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক যুব প্রতিষ্ঠানের কর্মসূচি তৈয়ার করা এবং সারা দেশব্যাপী এই প্রতিষ্ঠান গড়িয়া তোলার দায়িত্ব গ্রহণের জন্য কর্মীদিগকে উদ্বুদ্ধ করা। উপরোক্ত উদ্দেশ্যেই যুব সংগঠনের ইস্তাহারখানা রচিত হইয়াছে। উহাতে বলা হইয়াছে যে, নবজাত শিশু পাকিস্তান রাষ্ট্রকে সাহায্য করার জন্য দেশে বহু যুব প্রতিষ্ঠান স্বভাবতই গড়িয়া উঠিবে সন্দেহ নাই, কিন্তু সকল যুবশক্তির মিলন না ঘটিলে কোন বৃহৎ কাজই করা সম্ভব হইবে না। তাই যুব সংগঠনের ইস্তাহার যুবকদের অর্থনৈতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উন্নতি সাধন ও পূর্ণ বিকাশের জন্য সাধারণ গণতান্ত্রিক নীতির উপর ভিত্তি করিয়াই রচিত হইয়াছে।”

এছাড়া যুব-ইস্তাহার নামের আলাদা ঘোষণাপত্রে বিনা খরচে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাদান, জাতীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা চালু, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা, যুবকেন্দ্র ও যুবসংগঠনে রাষ্ট্রীয় সাহায্য প্রদান প্রভৃতি বিষয়ের উপর গুরুত্বারোপ করা হয়। ইস্তাহারে সাংস্কৃতিক স্বাধিকার সম্পর্কে পরিষ্কারভাবে বলা হয় :

“রাষ্ট্রের অধীনস্থ বিভিন্ন এলাকার পৃথক পৃথক সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক বিকাশকে সরকার স্বীকার করিয়া নিবেন, জীবন এবং সংস্কৃতিকে গড়িয়া তুলিতে এইসব এলাকার সকল ব্যাপারে স্বায়ত্তশাসন মানিয়া লইতে হইবে।”

সম্মেলনে ২৫ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ব পাকিস্তান গণতান্ত্রিক যুবলীগের কমিটি গঠিত হয়। এছাড়া ম্যানিফেস্টো ড্রাফটিং কমিটিতে শেখ মুজিবসহ ১৭ জনকে কো-অপ্ট করা হয়। গণতান্ত্রিক যুবলীগ-এর প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন তাসাদ্দুক আহমদ চৌধুরী। সংগঠনের অন্য নেতারা হলেন শামসুল হক, কামরুদ্দীন আহমদ, শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদ, শামসুদ্দীন আহমদ, অলি আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, আবদুল ওয়াদুদ, নূরুদ্দীন আহমদ, হাজেরা মাহমুদ প্রমুখ। অলি আহাদ লিখেছেন :

“Democratic Youth League-এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শামসুল হক, তসদ্দুক, শহীদুল্লা কায়সার, শেখ মুজিব, আউয়াল, আবদুল মতিন খান চৌধুরী (ময়মনসিংহ), তোয়াহা, সরদার, মুনীর চৌধুরী, শওকত আলী প্রভৃতি।”

মোট ২৫ জন সদস্য গণতান্ত্রিক যুবলীগের পূর্ব পাকিস্তান সাংগঠনিক কমিটির কার্যক্রম শুরু হয়। নবগঠিত রাষ্ট্র পাকিস্তানে গণতন্ত্র এবং ভাষা ও সংস্কৃতির স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশের বিষয়ে গণতান্ত্রিক যুবলীগ নানা দাবি-দাওয়া তুলে ধরে। গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠন সম্পর্কে রাজশাহীর এম আতাউর রহমান এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন :

“কলকাতাতে টাকা যোগাড় করলাম। মেনিফেস্টো শহীদুল্লাহ কায়সারের দ্বারা drafted হলো কলকাতাতেই। সেখানে প্রাথমিক প্রস্তুতির পর আমরা ঢাকায় এলাম। ১৫০, মোগলটুলীতে অফিস করে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অমিয় চক্রবর্তী, অজিত বসু, আমি উত্তরবঙ্গ ঘুরলাম। রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, পাবনা, রাজশাহী ইত্যাদি। মোটামুটিভাবে একটা ফল পাওয়া গেলো। তোহা, অলি আহাদও ছিলো। তাছাড়া বগুড়া কলেজের অধ্যাপক আবুল খায়ের (বাড়ী কুমিল্লা), দিনাজপুরের অধ্যাপক মোকাররম হোসেন। তসদ্দুক কিছু ট্যুর করলো, আওয়াল ছিলো। শেখ মুজিব সমর্থন করলো কিন্তু খুব বেশী এলো না। শামসুল হক খুব সক্রিয় হলো। আবদুল ওদুদ ও নূরুদ্দীন সাহেবও ছিলো।”

এই সংগঠন প্রতিষ্ঠার সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমান প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন এবং তিনি ছিলেন এর প্রথম কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। শুরুর দিকে তিনি গণতান্ত্রিক যুবলীগের সক্রিয় নেতা ছিলেন। পরবর্তীকালে এ সংগঠনের অন্য নেতাদের সঙ্গে মতপার্থক্য সৃষ্টি হওয়ায় তিনি এ সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তিনি লিখেছেন :

“সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায় এলাম। … তিন-চার দিন পরেই কনফারেন্স হবে। … বিকালে হক সাহেব আমাদের নিয়ে বসলেনÑকনফারেন্সে কি করা হবে সে সম্বন্ধে আলোচনা করতে। একটা যুব প্রতিষ্ঠান গঠন করা দরকার, যাতে তরুণ কর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে না যান। … শেষ পর্যন্ত ঢাকা মিউনিসিপ্যালিটির ভাইস-চেয়ারম্যান খান সাহেব আবুল হাসানাত সাহেবের বাড়িতে কনফারেন্স হবে ঠিক হল। … তিনি রাজি হলেন, আর কেউই সাহস পেলেন না আমাদের জায়গা দিতে।
কনফারেন্স শুরু হল। জনাব আতাউর রহমান খান ও কামরুদ্দিন সাহেবও এই কনফারেন্স যাতে কামিয়াব হয় তার জন্য চেষ্টা করেছিলেন। … প্রথম অধিবেশন শেষ হওয়ার পরে সাবজেক্ট কমিটি গঠন হল। আমাকেও কমিটিতে রাখা হল।”

অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল রাজনৈতিক-চেতনার বিস্তার, সুখী ও সমৃদ্ধ পাকিস্তান গড়াই ছিল এই যুব সংগঠন প্রতিষ্ঠার মূল লক্ষ্য। এর প্রচারপত্রে বলা হয় :

“গত ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়। ইহার এক মাস পরে সেপ্টেম্বর মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পূর্ব পাকিস্তান কর্মী সম্মেলনে মিলিত হইয়া পাকিস্তান সংগ্রামে যাহারা পুরোভাগে ছিল সেই যুব সমাজ গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠন করিয়া পাকিস্তানকে স্বাধীন, সুখী এবং সমৃদ্ধশালী করিয়া গড়িয়া তুলিবার প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করে।”

গণতান্ত্রিক যুবলীগ নেতৃবৃন্দ কমিউনিস্ট ভাবাপন্নরা সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ব্যক্তব্যসহ একটি পূর্ণাঙ্গ আর্থ-সামাজিক কর্মসূচি প্রণয়ন করে। কিন্তু শেখ মুজিব ও মুসলিম লীগপন্থি সংখ্যাগরিষ্ঠ নেতারা, প্রথমত কোনো দল গঠনের বিরুদ্ধে, দ্বিতীয়ত ‘গণতান্ত্রিক যুবলীগ’ নামে নতুন সংগঠনের কোনো আর্থ-সামাজিক ম্যানিফেস্টো রচনারও বিরুদ্ধে। শেখ মুজিব সম্মেলনে বলেন, “এর একমাত্র কর্মসূচি হবে সাম্প্রদায়িক মিলনের চেষ্টা, যাতে কোনো দাঙ্গা-হাঙ্গামা না হয়, হিন্দুরা দেশত্যাগ না করেÑযাকে ইংরেজিতে বলে ‘কমিউনাল হারমনি’, তার জন্য চেষ্টা করা।” এই নিয়ে কমিউনিস্টদের সাথে বিতর্ক হয়। তারা পূর্ণাঙ্গ আর্থ-সামাজিক কর্মসূচি প্রণয়নের পক্ষে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র দুই মাসের মধ্যে সরকারবিরোধী যে কোনো কর্মসূচি সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করবে এবং গণবিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। সম্মেলনের পর ম্যানিফেস্টো অনুমোদনের জন্য ময়মনসিংহে গণতান্ত্রিক যুবলীগের কমিটির সভা আহ্বান করা হয়। সভায় শামসুল হক যেমন ছিলেন না, তেমনি অনেককেই নোটিস দেওয়া হয়নি। ময়মনসিংহ ট্রেন স্টেশনে সারারাত অপেক্ষা করে সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম গ্রুপের কর্মীরা সভা বর্জন এবং গণতান্ত্রিক যুবলীগের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে ঢাকায় চলে আসেন। বামপন্থিরা তাদের দলীয় রাজনৈতিক লাইনের আলোকে রাজনৈতিক দলের মতোই একটি পূর্ণাঙ্গ ম্যানিফেস্টোর খসড়া প্রণয়ন করেÑ যা সোহরাওয়ার্দীপন্থিরা সঠিক মনে না করে প্রত্যাখ্যান করেন। এভাবে অঙ্কুরেই গণতান্ত্রিক যুবলীগের অকাল মৃত্যু ঘটে। ১৫০ মোগলটুলীতে টানানো সাইনবোর্ড নামিয়ে ফেলা হয়। বামপন্থিরা কিছুদিন এই সংগঠন ধরে রাখলেও, শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক যুবলীগের স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে। যে উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠিত হয়েছিল, তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। সংগঠনের নামে আখলাকুর রহমান ও আতাউর রহমানের সম্পাদনায় গণতান্ত্রিক যুবলীগ শীর্ষক একটি বুলেটিনের কয়েকটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়। ১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত কলকাতায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া যুব সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আবদুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে যে প্রতিনিধি দল অংশগ্রহণ করেছিল তাদের মধ্যে গণতান্ত্রিক যুবলীগের শামসুল হক, আখলাকুর রহমান, হাজেরা মাহমুদ প্রমুখ নেতা ছিলেন।
১৯৪৪ সালে কলকাতায় বঙ্গীয় মুসলিম ছাত্রলীগের সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। শাহ আজিজুর রহমান ছিলেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক। চল্লিশের দশকে পাকিস্তান আন্দোলনে বঙ্গীয় মুসলিম ছাত্রলীগ অগ্রবাহিনীর ভূমিকা পালন করেছে। কলকাতার মুসলমান শিক্ষার্থীদের রাজনীতির প্রাণকেন্দ্র ছিল ইসলামিয়া কলেজ। বস্তুত এই কলেজকে কেন্দ্র করেই কলকাতাভিত্তিক বঙ্গীয় মুসলিম ছাত্রলীগের সকল তৎপরতা চলেছে। ১৯৪২ সালে শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামিয়া কলেজে ভর্তি হন। কলকাতায় আসার আগেই সোহরাওয়ার্দীর সাথে তার পরিচয় ছিল এবং সোহরাওয়ার্দীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। অসাধারণ বাগ্মী, সাহসী এবং দক্ষ সংগঠক শেখ মুজিব খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ইসলামিয়া কলেজ এবং কলকাতার ছাত্রলীগের জনপ্রিয় ছাত্রনেতা হিসেবে আবির্ভূত হন। এক পর্যায়ে (১৯৪৬ সালে) শেখ মুজিব ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। শেখ মুজিব কলেজে ভর্তি হয়েই আবিষ্কার করেন, কলকাতায় মুসলিম ছাত্রলীগ কার্যত দুই গ্রুপে বিভক্ত হয়ে আছে। ঐ বিভাজন ছিল মূলত নেতৃত্বের প্রশ্নে। চল্লিশের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে, দেশভাগের পূর্ব পর্যন্ত মুসলিম ছাত্রলীগ রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৪৪ সালের পর ১৯৪৭ পর্যন্ত ছাত্রলীগের আর কোনো সম্মেলন হয়নি। এ প্রসঙ্গে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন :

“মুসলিম ছাত্রলীগ দুই দলে ভাগ হয়ে গেল, একদল পরিচিত হত শহীদ সাহেব ও হাশেম সাহেবের দল বলে, আরেক দল পরিচিত হত খাজা নাজিমুদ্দীন সাহেব এবং মাওলানা আকরাম খাঁ সাহেবের দল বলে।”

দেশভাগের আগে মুসলিম ছাত্রলীগের নেতৃত্বের কোনো পরিবর্তন হয়নি। রেডিওতে চাকরি নেওয়া অছাত্র শামসুল হুদা চৌধুরী ও শাহ আজিজুর রহমান যথাক্রমে মুসলিম ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। সাংগঠনিক শক্তির বিচারে মুসলিম ছাত্রলীগের সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম উপদলই ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী ও জনপ্রিয়। ইসলামিয়া কলেজের এবং সোহরাওয়ার্দীর অনুসারী শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন সে-সময়ে অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রনেতা। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরক্ষমতাসীন খাজা নাজিমুদ্দীন এবং মুসলিম লীগ সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিমের অনুসারী ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের মুসলিম ছাত্রলীগে ঠাঁই দেয়নি। নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের নাম বদলিয়ে ‘নিখিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ করা হয়েছে। শাহ আজিজুর রহমান সাহেবই জেনারেল সেক্রেটারি ছিলেন। ঢাকায় কাউন্সিল সভা না করে অন্য কোথাও তারা করলেন গোপনে। কার্যকরী কমিটিতে সদস্য প্রায় অধিকাংশই ছাত্র নয়, ছাত্র রাজনীতি ছেড়ে দিয়েছেন। ১৯৪৪ সালে সংগঠনের নির্বাচন হয়েছিল, আর হয় নাই। এমতাবস্থায় ছাত্ররাজনীতির শূন্যতা পূরণে এগিয়ে আসে নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্রলীগের প্রগতিশীল অংশের নেতা-কর্মী ও প্রগতিশীল ভাবধারার ছাত্রনেতৃবৃন্দ ও রাজনীতিবিদগণ। তারা ১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট নিজেদের কর্মপন্থা ঠিক করার জন্য কামরুদ্দীন আহমদের বাসভবনে বৈঠক করেন এবং এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করেন। এরপর ৫, ৬, ৭ ও ৮ আগস্ট আরও চারটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় কামরুদ্দীন আহমদের বাসভবন, নাজির লাইব্রেরি ও ফজলুল হক মুসলিম হলে। সভাগুলোতে ঢাকা নগর মুসলিম ছাত্রলীগ ও গণতান্ত্রিক যুবলীগ গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়। এসব সভা সম্পর্কে তাজউদ্দীন আহমদ তার ডায়েরিতে লিখেছেন :

“৬ আগস্ট ’৪৭, বুধবার

জনাব আউয়াল এলেন ১০টার দিকে। তিনি ঢাকা নগর মুসলিম ছাত্র লীগ গঠনের পরিকল্পনার জন্যে নাজির লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত একটি সভায় আমাকে নিয়ে গেলেন। জনাব হাবিবুর রহমান, তাসাদ্দুক, আজিজ আহমদ, মহিউদ্দিন, ওয়াদুদ পাটোয়ারি, শামসুদ্দিন, আউয়াল প্রমুখ সেখানে উপস্থিত ছিলেন। নগর ছাত্রদের একটা সাংগঠনিক কমিটি গঠনের জন্য ৮ আগস্ট বিকেল ৪টায় এফএইচ হলের এসেম্বলি হলে একটা সভা ডাকার সিদ্ধান্ত হলো। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে আংশগ্রহণ করতে হবে। কমিটিতে অন্যান্য দলও থাকবে। দুপুর ১২টায় সভা শেষ হলো।
৮ আগস্ট ’৪৭, শুক্রবার

সেখান থেকে নগর ছাত্রলীগের সভায় যোগ দিতে আবার এফএইচএম হলে গেলাম। বিকেল ৪টায় এফএইচএম হলের ভিপির সভাপতিত্বে সভা শুরু হলো। সর্বজনাব হাবিবুর রহমান, ওয়াদুদ, আবদুল্লাহ আল-মুতি শরফুদ্দিন, বাহাউদ্দিন, আউয়াল, তেজগাঁওয়ের কালু ও অন্যান্যরা ঢাকা নগরীর জন্য একটি ছাত্রলীগ গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখিয়ে বক্তব্য রাখল। সভায় উপস্থিতি চমৎকার। সাংগঠনিক কমিটি গঠনের লক্ষ্যে এ সভার অনুমোদন সাপেক্ষে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের নিয়ে অচিরেই একটা বড় আকারের সভা ডাকার প্রস্তাব গ্রহণ করে বিকেল সাড়ে ৫টায় সভা শেষ হলো।”

এরপর ৩০ আগস্ট তারা ঢাকার নাজির লাইব্রেরিতে এক সভায় মিলিত হন এবং ছাত্রলীগের ঢাকা নগর অস্থায়ী কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেন। এছাড়া সিদ্ধান্ত নেন যে, কমিটির নামে ‘মুসলিম’ শব্দটা ব্যবহার না করারও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এরপর ৩১ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে ঢাকা শহরের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্রদের একটি সভা আহ্বান করা হয়। তবে শাহ আজিজের অনুসারীদের আক্রমণে সে সভা প- হয়ে যায়। এরপর কয়েক মাস আলাপ-আলোচনা ও প্রস্তুতি চলে। এ পর্যায়ে নতুন এই ছাত্রসংগঠন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন ইসলামিয়া কলেজের সাবেক জি. এস., মুসলিম ছাত্রলীগের বলিষ্ঠ কর্মী এবং ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র শেখ মুজিবুর রহমান। সদ্য স্বাধীন পাকিস্তানে ‘একটি শক্তিশালী ছাত্র সংগঠন’ গড়ে তুলতে তিনি জোর তৎপরতা শুরু করেন। ইসলামিয়া কলেজের ছাত্র সংসদের জি. এস. হিসেবে তিনি যে সাংগঠনিক দক্ষতা অর্জন করেছিলেন, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ সংগঠনে তা কাজে লাগান। মোহাম্মদ হান্নান লিখেছেন : ‘ছাত্রলীগ গঠনে মূল উদ্যোগ গ্রহণ করেন ছাত্ররাজনীতি থেকে প্রায় বিদায় গ্রহণকারী ছাত্রনেতা শেখ মুজিবুর রহমান।’ হারুন-অর রশিদ বলেছেন : “জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগ ও নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ছাত্রলীগ (৪ জানুয়ারি ১৯৪৮)…।” ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বঙ্গবন্ধু নিজেই বলেছেন :

“আমি ছাত্রলীগ কর্মীদের সাথে আলাপ-আলোচনা শুরু করলাম। … ১৯৪৮ সালের ৪ঠা জানুয়ারি তারিখে ফজলুল হক মুসলিম হলের অ্যাসেম্বলি হলে এক সভা ডাকা হল, সেখানে স্থির হল একটা ছাত্র প্রতিষ্ঠান করা হবে। যার নাম হবে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। নঈমুদ্দীনকে কনভেনর করা হল। … যদিও নঈমুদ্দিন কনভেনর ছিল, কিন্তু সকল কিছুই প্রায় আমাকেই করতে হতো।”

বঙ্গবন্ধু অরও লিখেছেন, “কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ও জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে বহু ছাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। তারা এই প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত নয়। আমি ছাত্রলীগ কর্মীদের সাথে আলাপ-আলোচনা শুরু করলাম। আজিজ আহমেদ, মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ, আবদুল হামিদ চৌধুরী, দবিরুল ইসলাম, নইমউদ্দিন, মোল্লা জালাল উদ্দিন, আবদুর রহমান চৌধুরী, আবদুল মতিন খান চৌধুরী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং আরও অনেক ছাত্রনেতা একমত হলেন, আমাদের একটা প্রতিষ্ঠান করা দরকার। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি তারিখে ফজলুল হক মুসলিম হলের এসেম্বলি হলে এক সভা ডাকা হল, সেখানে স্থির হল একটা ছাত্র প্রতিষ্ঠান করা হবে। যার নাম হবে ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’। নইমউদ্দিনকে কনভেনর করা হল।” এ ছাত্র-সংগঠনের অস্থায়ী অর্গানাইজিং কমিটির ‘২নং সার্কুলারে’ বলা হয় :

“পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হইবার পর হইতে পূর্ব্ব পাকিস্তানের ছাত্র ও জনগণ যে সমস্ত সমস্যার সম্মুখীন হইয়াছেন তার আশু সমাধানের জন্য সুষ্ঠু ছাত্র আন্দোলন একান্ত প্রয়োজনীয়। দুর্ভাগ্যবশতঃ এ ব্যাপারে পূর্ব্বতন ছাত্র প্রতিষ্ঠান ‘মুসলিম ছাত্র লীগ’ আমাদের নিরাশ করিয়াছে। বর্ত্তমানে নির্জীব ও অকর্ম্মণ্য এই প্রতিষ্ঠানের নিকট হইতে আমরা যাহা চাহিয়াছি তাহার কিছুই পাই নাই। তাই পাকিস্তান রাষ্ট্রকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর গড়িয়া তুলিবার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে আন্দোলন একান্ত প্রয়োজনীয় এবং এই ছাত্র আন্দোলন পরিচালনা করিবার জন্য ‘পূর্ব্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ নামে একটি নূতন ছাত্র প্রতিষ্ঠান গঠনে সহায়তা করিবার জন্য আমরা আপনাদের সহযোগিতা কামনা করি।”

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার এই সভায় সভাপতিত্ব করেন ঘটনাক্রমে উপস্থিত ফেনী কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক নজমুল করিম। সভায় ১৪ সদস্যের একটি অস্থায়ী সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হয়। বঙ্গবন্ধুর উল্লিখিত ছাত্রনেতাদের মধ্য থেকে (এর বাইরেরও আছে) নিম্নলিখিত ১৪ জনকে নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়। “কমিটির সদস্য হন নইমুদ্দিন আহমদ (রাজশাহী), আবদুর রহমান চৌধুরী (বরিশাল), শেখ মুজিবুর রহমান (ফরিদপুর), অলি আহাদ (কুমিল্লা), আজিজ আহমদ (নোয়াখালী), আবদুল মতিন (পাবনা), দবিরুল ইসলাম (দিনাজপুর), মফিজুর রহমান (রংপুর), শেখ আবদুল আজিজ (খুলনা), নওয়াব আলী (ঢাকা), নুরুল কবীর (ঢাকা শহর), আবদুল আজিজ (কুষ্টিয়া), সৈয়দ নূরুল আলম (ময়মনসিংহ) ও আবদুল কুদ্দুস চৌধুরী (চট্টগ্রাম)।” ছাত্রলীগ গঠন সম্পর্কে আবদুল মতিন লিখেছেন : “শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের লক্ষ্য করে বললেন, ‘আপনারা এগিয়ে আসুন, আমরা একটি নতুন ছাত্র সংগঠন গড়ে তুলি।’ আমি তাঁর প্রস্তাবে রাজি হলাম। মোগলটুলীর ওয়ার্কাস ক্যাম্প সমর্থিত নেতৃত্বস্থানীয় ছাত্ররা শেখ মুজিবুর রহমানের আবেদনে সাড়া দিলেন। অলি আহাদ, নাইমউদ্দীন আহমদ, আবদুর রহমান চৌধুরী, মোহাম্মদ তোয়াহা, আজিজ আহমদ, শেখ মুজিবুর রহমান এবং আমিসহ আরো কয়েকজন নেতৃত্বস্থানীয় ছাত্র ফজলুল হক হল মিলনায়তনে এক কর্মীসভায় বসি। এ সময় আমরা পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করি।”
১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রগতিশীল ছাত্রনেতৃবৃন্দের প্রচেষ্টা ও শেখ মুজিবুর রহমানের ‘উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত’ পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ ১৫০ নম্বর মোগলটুলিতে অফিস স্থাপন করে এর সাংগঠনিক কার্যক্রম চালাতে থাকে। ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে নঈমুদ্দীন আহমদ লিখেছেন :

“ছাত্রদের তখন ভীষণ সমস্যা। কাজেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বস্থানীয় ছাত্রবৃন্দ ফজলুল হক হল মিলনায়তনে মিলিত হলেন, কি করা যায় তাহা নির্ধারণের জন্য। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ গঠিত হলো আমাকেই কনভেনর করে।”

নইমউদ্দীন আহমদকে আহ্বায়ক করা হলেও পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন সম্পর্কে পূর্ববঙ্গের সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে শেখ মুজিবুর রহমানসহ কয়েকজন ছাত্রনেতার স্বাক্ষর-সম্বলিত একটি লিফলেট বিলি করা হয়। ১৯৪৮ সালের ৩ মার্চ পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদনে বলা হয় :

The Leaflet explains the necessity of the formation of the East Pakistan Muslim Students League, after the partition of Bengal, eliminating the Muslim Students League which existed un-United Bengal published under the signature of the following :- … 4) Sk. Mujibur Rahman, B. A. (Faridpur). s/o Luthfur Rahman of Tangipara, Faridpur & Student 1st Year B. L.

ছাত্রলীগের নামকরণে মুসলিম শব্দ ব্যবহার করায় অলি আহাদ কমিটি সদস্য হতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। মুসলিম ছাত্রলীগ নাম রাখা হলে তা সাম্প্রদায়িক দল হিসেবে চিহ্নিত হবে বলে অলি আহাদ ও আরও কেউ কেউ (তোয়াহা?) আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমান তখনকার বাস্তবতায় কৌশলগত কারণে মুসলিম শব্দ রাখার পক্ষে ছিলেন। মুসলিম লীগ সরকার যাতে এই সংগঠনের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করতে এবং জনগণকে বিভ্রান্ত করতে না পারে, সে-কারণেই মুজিব মুসলিম শব্দ রাখা সংগত মনে করেছেন। বামপন্থিদের কেউ কেউ এ জন্য শেখ মুজিবকে ‘সাম্প্রদায়িক’ হিসেবে চিহ্নিত করারও চেষ্টা করেছেন। নইমউদ্দিন আহমদ সংগঠনের আহ্বায়ক হলেও ছাত্রলীগের প্রাণ ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। প্রতিষ্ঠাকালীন সভায় তিনি উপস্থিত থাকতে না পারলেও, এই সংগঠন গড়ার মূল উদ্যোক্তা যে তিনি, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে তার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। বঙ্গবন্ধু লিখেছেন :

“ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠান গঠন করার সাথে সাথে বিরাট সাড়া পাওয়া গেল ছাত্রদের মধ্যে। এক মাসের ভিতর আমি প্রায় সকল জেলারই কমিটি করতে সক্ষম হলাম। যদিও নইমউদ্দিন কনভেনর ছিল, প্রায় সকল কিছুই প্রায় আমাকেই করতে হত।”
বলা যেতে পারে, কলকাতায় ছাত্রলীগের সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম গ্রুপই সদ্য দেশভাগ-উত্তর পূর্ববঙ্গে ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’ নামে স্বতন্ত্র ছাত্র সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে :

“১৯৪৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পুরান ঢাকার আরমানিটোলার নিউ পিকচার্স সিনেমা হলের মিলনায়তনে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনের মাধ্যমে ছাত্রলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠিত হয়। কারাগারে বন্দী থাকা অবস্থায় ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক দবিরুল ইসলাম পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রথম সভাপতি এবং জনাব খালেক নেওয়াজ খান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। জনাব দবিরুল ইসলাম জেলে বন্দী থাকার জন্য প্রখ্যাত ছাত্রনেতা মোল্লা জালাল উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে থাকেন।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, এই সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন শেখ মুজিবুর রহমান। এই সম্মেলনের মধ্য দিয়েই ছাত্র আন্দোলনে তার আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের অবসান ঘটে। সভাপতির ভাষণে তিনি ঘোষণা দেন, ‘তিনি যেহেতু আর ছাত্র নন, এই প্রতিষ্ঠানে তিনি আর সদস্য হিসেবে যাবেন না।’ ”

’৪৮-এর ভাষা আন্দোলন
দেশভাগের আগেই, পাকিস্তান হওয়া যখন অনিবার্য, তখনই এই নতুন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রভাষা কী হবে, সে-বিতর্কের সূচনা হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভাবাদর্শগত ভিত্তি রচনায় আলীগড় আন্দোলনের প্রভাব এবং ৩টি চধৎধফড়ী আলোচনা করতে গিয়ে আমরা দেখিয়েছি পাকিস্তান রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে পাকিস্তানি শাসক-শ্রেণির মূল্যায়ন কী। তারা পাকিস্তান বলতে বুঝেন, পাকিস্তান = ইসলাম + উর্দু। এই চিন্তারই বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখতে পাই ১৯৪৭ সালের ১৮ মে ‘মজলিসে ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের’ হায়দ্রাবাদে অনুষ্ঠিত উর্দু সম্মেলনে। উত্তর প্রদেশের মুসলমান নেতারা এই ঘোষণা করেন যে, ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু।’ ১৯৪৭ সালের ৩ জুন মাউন্ট ব্যাটেনের দেশভাগের পরিকল্পনা প্রকাশের পর সম্মেলনে উত্তর-পশ্চিম ভারতের নেতারা উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার পরিকল্পনার কথা প্রকাশ করলে, এর প্রতিবাদ জানিয়ে কলকাতা থেকে প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেহাদ ও দৈনিক আজাদ-এ প্রবন্ধ লেখেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, কাজী মোতাহার হোসেন, এনামুল হক, আবদুল হক, আবুল মনসুর আহমদ, আবুল হাশিম, কবি ফররুখ আহমদ প্রমুখ বাঙালি বুদ্ধিজীবীগণ। ১৯৪৭ সালের জুলাই মাসে উর্দুকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবি জানিয়ে বিবৃতি দেন আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ প্রবন্ধ লিখে জিয়াউদ্দিনের বিবৃতির বক্তব্য খ-ন করেন এবং পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার যুক্তি উপস্থাপন করেন। এ বিতর্ক অমীমাংসিত থাকতেই পাকিস্তানের আনুষ্ঠানিক অভ্যুদয় ঘটে ’৪৭-এর ১৪ আগস্ট।
আগেই উল্লেখ করেছি, ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ভাষার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আত্মপ্রকাশ করে সাংস্কৃতিক সংগঠন তমুদ্দন মজলিস। ১৯৪৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাসেই আবার ভাষাবিতর্ক উত্থাপিত হয়। ২৩ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তান গণপরিষদের অধিবেশনে উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকেও রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন কংগ্রেস থেকে নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত। ২৫ ফেব্রুয়ারি এই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা হয়। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এই প্রস্তাবকে পাকিস্তানের সংহতি নস্যাতের ষড়যন্ত্র বলে প্রত্যাখ্যান করেন। অথচ জনসংখ্যার বিচারে পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের আনুপাতিক হার ছিল নিম্নরূপ : বাংলা ৫৪.৬%, পাঞ্জাব ২৭.১%, পশতু ৬.১%, সিন্ধি ৪.৮%, ইংরেজি ১.৪%, উর্দু ৬%। অধিবেশন শেষে ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত ঢাকায় ফিরে এলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা তাকে সংবর্ধনা জানায়।
গণপরিষদের এই তোঘলকী সিদ্ধান্ত পূর্ববঙ্গে বিশেষত ছাত্র-তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার করে। ২৭ ফেব্রুয়ারি তমুদ্দন মজলিসের উদ্যোগে অধ্যাপক আবুল কাশেমের সভাপতিত্বে ঢাকায় একটি সর্বদলীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। প্রথমত : ভাষাসংগ্রামকে সুসংগঠিত করার উদ্দেশ্যে ‘রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ’ গঠিত হয়, যার আহ্বায়ক করা হয় সলিমুল্লাহ হলের আবাসিক ছাত্র শামসুল আলমকে। দ্বিতীয়ত : সভায় ১১ মার্চ সমগ্র পূর্ববঙ্গজুড়ে সাধারণ ধর্মঘট বা হরতাল আহ্বান করা হয়। ইতোমধ্যে ১১ মার্চের হরতালকে সফল করা এবং রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদকে প্রতিনিধিত্বশীল করার উদ্দেশ্যে ২ মার্চ একটি পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। ক্রমান্বয়ে রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। এই কমিটিতে ছিল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, তমুদ্দন মজলিস, গণতান্ত্রিক যুবলীগ, গণআজাদী লীগ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল সংসদের ভিপি/জিএস অথবা অন্য প্রতিনিধি, ঢাকার বিভিন্ন কলেজের ছাত্র প্রতিনিধি। ১১ মার্চের হরতালকে সফল করার আহ্বান জানিয়ে ৩ মার্চ একটি যৌথ বিবৃতি প্রদান করা হয়। বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক শামসুল আলম, পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বায়ক নইমুদ্দিন আহমদ, তমুদ্দন মজলিসের অধ্যাপক আবুল কাশেম, প্রাদেশিক আইন সভার সদস্য তফাজ্জল আলী ও আনোয়ারা খাতুন, গণআজাদী লীগের কামরুদ্দিন আহমদ, সলিমুল্লাহ মুসলিম হক ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ তোয়াহা, দৈনিক পূর্ব পাকিস্তানের এ সালাম, কাফেলা সম্পাদক এসএম বজলুল হক, ঢাকা শহর মুসলিম ছাত্রলীগের আহ্বায়ক অলি আহাদ, মুসলিম লীগের সংগঠক শামসুল হক এবং ইনসান পত্রিকার সম্পাদক আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী।
রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ আহূত ১১ মার্চের দেশব্যাপী হরতাল কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ছাত্রনেতারা বিভিন্ন জেলা সফর করেন। ১১ মার্চের কর্মসূচি নিয়ে সরকারি মহল খুবই উদ্বিগ্ন ছিল। কারণ ১৯ মার্চ পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মহম্মদ আলী জিন্নাহ প্রথমবার পূর্ববঙ্গ সফরে আসার কর্মসূচি ছিল। জিন্নাহর ঢাকার কর্মসূচি যাতে শান্তিপূর্ণ হয় এবং সফল হয়, সেটি ছিল মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীনের প্রধান বিবেচনার বিষয়। ১১ মার্চ হরতাল কর্মসূচি সফল হলে এবং ছাত্রদের আন্দোলনের ধারা অব্যাহত থাকলে জিন্নাহর সফর নির্বিঘœ ও শান্তিপূর্ণ করা যাবে না। তাই সরকার ১১ মার্চের কর্মসূচির ব্যাপারে দমননীতির পথ গ্রহণ করে। ঢাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। ১১ মার্চের আগেই অনেক ছাত্রনেতা ও সংগঠককে গ্রেফতার করা হয়। ১১ মার্চ ৬৯ জন ছাত্র ও যুবনেতাকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ছিলেনÑ শামসুল হক, শেখ মুজিবুর রহমান, অলি আহাদ, কাজী গোলাম মাহবুব, রণেশ দাশগুপ্ত, ধরিনী রায়, শওকত আলী ও আবদুল ওয়াদুদ প্রমুখ। কর্মসূচিকে কমিউনিস্টদের ষড়যন্ত্র, এমন কী ভারতের উসকানি বলেও ব্যাপক অপপ্রচার চালানো হয়। কিন্তু ভাষা সংগ্রাম পরিষদ কর্মসূচি বাস্তবায়নে দৃঢ় ভূমিকা গ্রহণ করে। এই কর্মসূচি সম্পর্কে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন :

“… ১১ মার্চকে ‘বাংলা ভাষার দাবি’ দিবস ঘোষণা করা হলো। জেলায় জেলায় আমরা বের হয়ে পড়লাম। আমি ফরিদপুর, যশোর হয়ে দৌলতপুর, খুলনা ও বরিশালে ছাত্রসভা করে এই তারিখের তিন দিন পূর্বে ঢাকায় ফিরে এলাম।… রাতে কাজ ভাগ করা হলোÑ কে কোথায় থাকবে এবং কে কোথায় পিকেটিং করার ভার নেব।…
১১ মার্চ ভোরবেলা শত শত ছাত্রকর্মী ইডেন বিল্ডিং, জেনারেল পোস্ট অফিস ও অন্যান্য জায়গায় পিকেটিং শুরু করল।… সকাল ৮টায় জেনারেল পোস্ট অফিসের সামনে ছাত্রদের ওপর ভীষণভাবে লাঠিচার্জ হলো। একদল মার খেয়ে স্থান ত্যাগ করার পর আরেক দল হাজির হতে লাগল।… নয়টায় ইডেন বিল্ডিংয়ের সামনের জায়গায় লাঠিচার্জ হলো। খালেক নেওয়াজ খান, বখতিয়ার … এম এ ওয়াদুদ গুরুত্বররূপে আহত হলো।… এর মধ্যে শামসুল হক সাহেবকে ইডেন বিল্ডিংয়ের সামনে পুলিশ ঘিরে ফেলেছে।… আমাদের ওপর কিছু উত্তম-মধ্যম পড়ল এবং ধরে নিয়ে জিপে তুলল। হক সাহেবকে পূর্বেই জিপে তুলে ফেলেছে। বহু ছাত্র গ্রেফতার ও জখম হলো। কিছু সংখ্যক ছাত্রকে গাড়ি করে ৩০-৪০ মাইল দূরে জঙ্গলের মধ্যে ফেলে আসল। কয়েকজন ছাত্রীও মার খেয়েছিল। অলি আহাদও গ্রেফতার হয়ে গেছে। তাজউদ্দীন, তোয়াহা ও অনেককে গ্রেফতার করতে পারে নাই। আমাদের প্রায় ৭০/৭৫ জনকে বেঁধে নিয়ে জেলে পাঠিয়ে দিল সন্ধ্যার সময়। ফলে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠল। ঢাকার জনগণের সমর্থনও আমরা পেলাম।
তখন পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার অধিবেশন চলছিল। শোভাযাত্রা রোজই বের হচ্ছিল। নাজিমুদ্দীন সাহেব বেগতিক দেখলেন।… এই সময়ে শেরে বাংলা, বগুড়ার মোহাম্মদ আলী, তোফাজ্জল আলী, ডা. মালেক, সবুর সাহেব, খয়রাত হোসেন, আনোয়ারা খাতুন ও আরও অনেকে মুসলিম লীগ পার্টির বিরুদ্ধে ভীষণভাবে প্রতিবাদ করলেন।… নাজিমুদ্দীন সাহেব ঘাবড়ে গেলেন এবং সংগ্রাম পরিষদের সাথে আলাপ করতে রাজি হলেন।
আমরা জেলে, কি আলাপ হয়েছে জানি না। তবে সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে কামরুদ্দিন সাহেব জেলে আমাদের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং বললেন, নজিমুদ্দীন সাহেব এই দাবীগুলি মানতে রাজী হয়েছেন : এখনই পূর্ব পাকিস্তানের অফিসিয়াল ভাষা বাংলা করে ফেলবে। পূর্ব পাকিস্তান আইনসভা থেকে সুপারিশ করবেন, যাতে কেন্দ্রে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হয়। সমস্ত মামলা উঠিয়ে নিবেন, বন্দীদের মুক্তি দিবেন এবং পুলিশ যে জুলুম করেছে সেই জন্য নিজেই তদন্ত করবেন।… আমাদের ১১ তারিখে জেলে নেওয়া হয়েছিল, আর ১৫ তারিখে মুক্তি দেওয়া হয়।”

শেখ মুজিব, অলি আহাদ এবং ’৪৮-এর ১১ মার্চের অন্যান্য সংগঠকরা জেলে থাকতে সরকারের সাথে যে চুক্তির কথা শেখ মুজিবুর উপরে উল্লেখ করেছেন, সরকারের পক্ষে সে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন। ভাষাসংগ্রামীদের পক্ষে স্বাক্ষরকারী ছিলেন কামরুদ্দিন আহমদ। ইতোমধ্যে কারাবন্দি নেতাদের বিশেষত শেখ মুজিব ও অলি আহাদের সাথে এ ব্যাপারে আলোচনা করেন এবং তাদের সম্মতি নেন কামরুদ্দিন আহমদ। চুক্তিটির পূর্ণ বয়ান নিম্নরূপ :

(১) ২৯ ফেব্রুয়ারি (১৯৪৮) হতে বাংলা ভাষার প্রশ্নে যাদের গ্রফতার করা হয়েছে, তাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।
(২) পুলিশি অত্যাচারের অভিযোগ সম্পর্কে মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং তদন্ত করে এক মাসের মধ্যে এ বিষয়ে বিবৃতি দিবেন।
(৩) ১৯৪৮ সালের এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদে বেসরকারি আলোচনার জন্য নির্ধারিত তারিখে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার এবং একে পাকিস্তান গণপরিষদে এবং কেন্দ্রীয় চাকরির পরীক্ষা দিতে সেন্ট্রাল সার্ভিসেস এক্সামিনেশনে উর্দুর সমমর্যাদা দানের জন্য একটি বিশেষ প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে।
(৪) পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদে এপ্রিল মাসে একটি প্রস্তাব আনা হবে যে প্রদেশের অফিস-আদালতের ভাষা ইংরেজির বদলে বাংলা হবে।
(৫) আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না।
(৬) সংবাদপত্রের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হবে।
(৭) ২৯ ফেব্রুয়ারি হতে পূর্ববঙ্গের যে সকল অংশে ভাষা আন্দোলনের কারণে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে, তা প্রত্যাহার করা হবে।
(৮) সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে আলোচনার পর আমি এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হয়েছি যে এই আন্দোলন রাষ্ট্রের দুশমনদের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়নি।

৮নং দফাটি মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দীন নিজ হাতে লিখেছেন বলে বদরুদ্দিন উমর তার গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। এই চুক্তির পর ১১ মার্চ গ্রেফতারকৃত রাজবন্দিদের ১৫ মার্চ মুক্তি দেওয়া হয়। ১৬ মার্চ রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের এক বিশাল সভা অনুষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমতলায়। সভায় সভাপতিত্বে করেন সদ্য কারামুক্ত শেখ মুজিবুর রহমান। আন্দোলনকারীদের মধ্যে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়।
পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মহম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯ মার্চ ঢাকায় আসেন। জিন্নাহর সম্মানে আন্দোলনকারীরা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো কর্মসূচি দেওয়া থেকে বিরত থাকেন। জিন্নাহর ২১ মার্চ রেসকোর্স ময়দানের জনসভায় এবং ২৪ মার্চ কার্জন হলে আয়োজিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ কনভেনশনে বক্তৃতা দেন। রেসকোর্সের ভাষণে যেমন তিনি ‘উর্দু এবং উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা’ বলে ঘোষণা করেন, তেমনি ২৪ মার্চ কনভেনশনেও একই কথা পুনরুল্লেখ করেন। কিন্তু কার্জন হলের সভা থেকে জিন্নাহর ঐ ঘোষণায় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে কতিপয় ছাত্র ঘড় ঘড় বলে প্রতিবাদ জানায়। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা জিন্নাহর মুখের ওপর না না বলে প্রতিবাদ জানানোয় জিন্নাহ স্তম্ভিত হয়ে যান। ফলে ঐ দিনই সন্ধ্যায় চিফ সেক্রেটারি আজিজ আহমদের বাসভবনে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্যদের সাথে জিন্নাহর একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। জিন্নাহ উর্দুর পক্ষে নানা যুক্তি উপস্থাপন করে ছাত্র নেতাদের বোঝানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ছাত্র নেতারা রাষ্ট্রভাষা বাংলা করার পক্ষে জিন্নাহকে একটি স্মারকলিপি প্রদান করে সভা শেষে চলে আসেন। ভাষা সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে এই সভায় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেনÑ শামসুল হক, কামরুদ্দিন আহমদ, অধ্যাপক আবুল কাসেম, তাজউদ্দীন আহমদ, শামসুল আলম, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, মো. তোয়াহা, নইমউদ্দীন আহমদ, অলি আহাদ প্রমুখ।
জিন্নাহর ধারণা ছিল ভাষা আন্দোলনের পেছনে শেরে বাংলা ফজলুল হকের উসকানি রয়েছে। সে-কারণে তিনি একাধিকবার সে-যাত্রায় শেরে বাংলার সঙ্গে বৈঠক করেন। জিন্নাহ করাচিতে ফিরে যাওয়ার পর তার জীবিতাবস্থায় রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে আর কোনো উচ্চবাচ্য করেন নি। তবে যথারীতি খাজা নাজিমুদ্দীন মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালে এবং জিন্নাহর মৃত্যুর পর পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হওয়ার পর ভাষা সংগ্রাম পরিষদের সাথে তার চুক্তি ভঙ্গ করেন। ইতোমধ্যে প্রথম দফা ভাষা আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে।

চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ধর্মঘট ও মুচলেকা কাহিনি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন যাবত তাদের ন্যায়সঙ্গত কিছু দাবি-দাওয়া নিয়ে ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হয়ে উঠেছিল। কর্মচারীরা তাদের দাবি-দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নোটিস দিয়ে এক মাসের সময় বেঁধে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিম্নবেতনভুক্ত এই কর্মচারীদের দাবির প্রতি কর্ণপাত না করায় ১৯৪৯ সালের ৩ মার্চ তারা ধর্মধট আহ্বান করে। পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ তাদের ধর্মঘটের প্রতি সংহতি জানায়। ধর্মঘট সফল করার জন্য ছাত্রলীগের কর্মীরাও সরাসরি কর্মচারীদের নানাভাবে সহযোগিতা করে। নুরুল আমিন সরকার তীব্র দমননীতির পথ গ্রহণ করে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১১ মার্চ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করে। বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট (এক্সিকিউটিভ কাউন্সিল) ২৭ জন ছাত্রের বিরুদ্ধে অর্থদ-সহ বিভিন্ন মেয়াদের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে। অন্যদিকে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের মুচলেকা দিয়ে কাজে যোগদানে বাধ্য করে। তখনকার বাস্তবতায় এই আন্দোলনের সাথে সাধারণ ছাত্রদের তেমন সম্পৃক্ততা ছিল না। ফলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিলেও এর বিরুদ্ধে ছাত্র ও কর্মচারীদের জোরদার প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। যেসব ছাত্রের বিরুদ্ধে জরিমানা অনাদায়ে বহিষ্কার প্রভৃতি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, ছাত্ররা জরিমানা ও মুচলেকা দিয়ে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার করিয়ে নেয়। ছাত্র নেতাদের অধিকাংশই জরিমানা ও বন্ড দেওয়ার ফলে কর্মীদের মনোবল ভেঙে যায় এবং আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এ প্রসঙ্গে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন :

“১৬ এপ্রিল খবর পেলাম, ছাত্রলীগের কনভেনর নইমউদ্দিন আহমদ, ছাত্রলীগের আরেক নেতা আবদুর রহমান চৌধুরী (এখন এডভোকেট)- ভিপি সলিমুল্লাহ হল, দেওয়ান মাহবুব আলী (এখন এডভোকেট) আরও অনেকে গোপনে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেয়ে বন্ড দিয়েছেন। যারা ছাত্রলীগের সভ্যও না, আবার নিজেদের প্রগতিবাদী বলে ঘোষণা করতেন, তারাও অনেকে বন্ড দিয়েছেন। সাতাশ জনের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই বন্ড দিয়েছে। কারণ ১৭ তারিখের মধ্যে বন্ড না দিলে আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকবেন না। ছাত্রলীগের কনভেনর ও সলিমুল্লাহ হলের ভিপি বন্ড দিয়েছে খবর রটে যাওয়ার সাথে সাথে ছাত্রদের মনোবল একদম ভেঙে গিয়েছিল। আমি তাড়াতাড়ি কয়েকজনকে নিয়ে নইমউদ্দিনকে ধরতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু তাকে পাওয়া কষ্টকর, সে পালিয়ে গিয়েছিল। সে এক বাড়িতে লজিং থাকত। সন্ধ্যার কিছু পূর্বে তাকে ধরতে পারলাম। সে স্বীকার করল আর বলল, ‘কি করব, উপায় নাই। আমার অনেক অসুবিধা।’ তার সাথে আমি অনেক রাগারাগি করলাম এবং ফিরে এসে নিজেই ছাত্রলীগের সভ্যদের খবর দিলাম, রাতে সভা করলাম। অনেকে উপস্থিত হল। সভা করে এদের বহিষ্কার করা হল এবং রাতের মধ্যে প্যামপ্লেট ছাপিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিলি করার বন্দোবস্ত করলাম। কাজী গোলাম মাহাবুবকে (এখন এডভোকেট) জয়েন্ট কনভেনর করা হয়েছিল। সে নিঃস্বার্থভাবে কাজ চালিয়েছিল।”

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে নেতৃত্বদানের কারণে শেখ মুজিবুর রহমানসহ অনেক ছাত্রনেতাকে শাস্তিপ্রদান করা হয়। শেখ মুজিবসহ পাঁচজনকে ১৫ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছিল। অন্যরা জরিমানার টাকা পরিশোধ করলেও শেখ মুজিবুর রহমান জরিমানা দিতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি আরও কয়েকজনকে নিয়ে আইন বিভাগসহ বিশ্ববিদ্যালয়ে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রতিবাদে ১৮ এপ্রিল উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান বিক্ষোভ ও অবস্থান ধর্মঘটের কর্মসূচি দেন। ১৯ তারিখ পর্যন্ত অবস্থান ধর্মঘট চলে। ১৯ তারিখে বিরাট এক পুলিশ বাহিনী এসে অবস্থানকারী ছাত্রদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং শেখ মুজিবুর রহমানসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। বন্ড না দেওয়ায় শেখ মুজিবুর শুধু গ্রেফতারই হন না, চিরদিনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব হারান এবং তার ছাত্র রাজনীতিরও অবসান ঘটে।
ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের আন্দোলনে নেতৃত্ব প্রদান করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু কারানির্যাতন ভোগ করেছেন, ছাত্রত্ব হারিয়েছেন কিন্তু মুচলেকা দেননি বা ক্ষমা চাননি। সম্প্রতি প্রকাশিত পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার গোপন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ১৯৪৯ সালের ৯ মে বিকাল ৫.৩০টায় ফজলুল কাদের চৌধুরী নিরাপত্তা-বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দেখা করে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমঝোতা করার প্রস্তাব দিলে তিনি সম্মানজনক প্রস্তাব হলে রাজি হবেন মর্মে জানালেও দৃঢ়ভাবে বলেন, তিনি ক্ষমা চাইবেন না। মুনতাসীর মামুন লিখেছেন :

“এরি মধ্যে মে মাসের ৯ তারিখে ফজলুল কাদের চৌধুরী দেখা করলেন শেখ মুজিবুরের সঙ্গে ঢাকা কেন্দ্রীয় জেলে। ফজলুল কাদের চৌধুরী জিজ্ঞেস করেন, বিশ^বিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে তিনি সমঝোতা করতে রাজি আছেন কিনা? মুজিব বলেন, সম্মানজনক প্রস্তাব হলে তিনি রাজি হবেন। তিনি আরো বলেন, বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নিঃশর্তভাবে ছাত্রদের বিরুদ্ধে যে বহিষ্কারাদেশ দেয়া হয়েছে তা প্রত্যাহার করতে হবে। তিনি কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষমা চাইবেন না। ভিসির বাসায় যেসব জিনিসপত্র ভাংচুর হয়েছে তার জন্য ছাত্ররা দায়ী নয় এবং ছাত্রদের কেউ ভিসিকে উদ্দেশ্য করে অপমানজনক কোন মন্তব্য করেননি।
ফজলুল কাদের চৌধুরীর আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ছাত্ররা কমিউনিস্টদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে এটি ডাহা মিথ্যা কথা। বরং নি¤œবেতনভোগী কর্মচারীদের অসন্তোষ যাতে কমিউনিস্টরা পুঁজি করতে না পারে সে জন্য তারা আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। কমিউনিস্টরা যাতে এ ধরনের পুঁজি করতে না পারে সে জন্য তারা সতর্ক ছিলেন। বরং, কর্তৃপক্ষ পুলিশ ডেকে ছাত্রদের নিপীড়ন করে তাদের মনে আঘাত দিয়েছে। চৌধুরী বলেন, ধর্মঘট অব্যাহত থাকলে অনেক ছাত্রের ভবিষ্যৎ নষ্ট হবে, অন্তত এ কারণে সমঝোতা করা উচিত। ছাত্র-শিক্ষকদের সম্পর্ক পিতা-পুত্রের মতো। উত্তরে মুজিব বলেন, এক পর্যায়ে ছাত্ররা ক্ষমা চাইতে রাজি ছিল। কিন্তু এক মন্ত্রীর পরামর্শে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা নাকচ করে দেয়। সুতরাং ছাত্রদের সম্মানার্থে ক্ষমা চাইবার শর্তে তিনি রাজি নন।”

গোয়েন্দা প্রতিবেদন সূত্রে আরও জানা যায়, ১০ মে ১৯৪৯ নিরাপত্তা-বন্দি শেখ মুজিবুর রহমান সম্মানজনক এবং মর্যাদাপূর্ণ সমঝোতার জন্য ৪টি শর্তের কথা উল্লেখ করেন; শর্তগুলো ছিল : ১. ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নিঃশর্তভাবে শাস্তি প্রত্যাহার করতে হবে; ২. কর্মচারীদের আন্দোলনে যুক্ত থাকার কারণে পূর্ববাংলায় যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে তাদের নিঃশর্ত মুক্তি প্রদান করতে হবে; ৩. আর কাউকে অপরাধী করা যাবে না; ৪. কর্মচারী আন্দোলনের কারণে যেসব পত্রিকার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, তা প্রত্যাহার করতে হবে। এ বিষয়ে বিস্তারিত ও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার নিম্নোক্ত প্রতিবেদনে :

Interview between Moulvi Fazlul Quader Choudhuri of Chattagong and Security Prisoner Sk. Mujibar Rahman a law student of the Dacca University and leader of the Eastern Pakistan Muslim Students League (arrested in connection with the students strike) at 5. 30 p. m. on 9. 5. 49 at the Dacca Central Jail in presence of the undersigned.
Moulvi Fazlul Quader Chauduri asked the prisoner whether he would agree to a compromise with the University authorities. The prisoner replied that he would agree to an honorable compromise.
The prisoner was of openion that the University authorities should unconditionally withdraw the orders of punishment inflicted on some of the students. He was not ready to offer any opology to the University authorities, and said that the students did nothing for which they morally owed any apology to anybody. He denied the charge of damage to the furniture and electric fittings of the house of the Vice-Chancellor by the students was totally false.
In reply to further queries by Mr. Quader the prisoner said that it was totally false that the students joined hands with the communists in effecting and conducting the strike. He asserted that on the contrary the object of their taking up the cause of the menial staff was to present the communists from exploiting the menials of the University, he said that they were ever vigilance to guard against the communists capturing the situation. He therefore stated that on the whole the students had no fault while the University authorities wounded the feelings of the students by calling the Police to appress them.
Moulvi Quader pointed out that the strike if pursued further would spoil the carrer of many students, and on that consideration insisted on a compromise being affected. He also said that there was no harm in an apology from the students of the University authorities as the relation between leaders and students of the University authorities as the relation between leaders and students was akin to the relation between father and son. The prisoner said that at one stage the students were ready for such an apology but the University authorities at the instance of some Minister (not named) ultimately turned down the proposal. So he would not consider the question of apology any more for the sake of the prestige of the students. At least personally he was opposed to it.
Mvi. Quader requested the prisoner that in consideration of the past relation between him & the prisoner the latter should empower him to negotiate for the compromise and to decide by himself what terms would be within the honour of the students. The prisoner after some hesitation said that he gives his reply to that proposal at 10-30 a. m. tomorrow (10.5. 1949). It was arranged that the consent (or otherwise) of the prisoner to the proposal would be communicated to Mvi. Quader by the jailor through telephone.

*** *** ***
Message to be communicated to Mr. Fazlul Qader Choudhury. We are prepared to come to our honorable & amicable settlement on following conditions :-
1. Unconditional withdrawal of the punishment order by Dacca University authority.
2. Unconditional releases of student prisoners throughout East Pakistan arrested in this connestion.
3. No Further victimization.
4. Withdrawal of the ban on newspapers banned in this connection.

Sd/ – Sk. Majibor Rahman
Dacca Central jail
10. 5. 49

 

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগ গঠিত হয়। শেখ মুজিব কারাগারে থাকতেই আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৪৯ সালের ২৭ জুন তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, উত্তরণ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply