ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অপর নাম বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

আমির হোসেন আমু : জনগণের সংগ্রামই ইতিহাস নির্মাণ করে। সেই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাহন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। জনগণের চিন্তা-চেতনা, আকাক্সক্ষা এবং স্বপ্ন দিয়ে তৈরি যে রাজনৈতিক দল, তার ভাষা আপামর জনসাধারণেরই কণ্ঠের ভাষা। আমরা ভাগ্যবান, আমরা তেমনই একটি রাজনৈতিক সংগঠনের উত্তরাধিকার এবং আলোকিত তেমনই জননেতার আলোকবর্তিকায়। আমাদের দল আওয়ামী লীগ, আমাদের নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবোধ সব একাকার এ মাটির ঐতিহ্যে, সংস্কৃতিতে, কৃষ্টিতে এবং স্বাধীনতায়।
প্রতিষ্ঠাকাল থেকে আওয়ামী লীগ একটি সংগ্রামী রাজনৈতিক গণসংগঠন। আর তাই এই দলটি জন্মলগ্ন থেকেই জনগণনির্ভর জাতীয়তাবাদী, দেশপ্রেমিক, নির্ভীক, ত্যাগী, উদার অসাম্প্রদায়িক সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে ধাবমান। সাতচল্লিশের দেশবিভাগের আগের অনেক বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ এবং উল্লেখ্য, কিন্তু আমি আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের কথাই আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করব। চেষ্টা করব এ কারণে যে, এদেশের মানুষের জন্য রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়ে প্রথমে এই একটি রাজনৈতিক দল গঠিত হয়, যা বাংলার মূল শেকড়কে আশ্রয় করেই ক্রমে মহীরুহ আকার ধারণ করেছে। এখানে বিশেষ বিশ্লেষণে গিয়ে ইতিহাসের ইভেন্টগুলো তুলে ধরলেই দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হবে বলে আমার বিশ্বাস। তাই শুধু তথ্যগুলো এখানে তুলে ধরা হচ্ছে, যাতে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক উত্থান এবং এদেশের সংগ্রামী জনগণের মূল চেহারাটা আমরা দেখতে পাই।
১৯০৬ সালের ডিসেম্বরে নবাব স্যার সলিমুল্লাহর বিশেষ উদ্যোগে এবং বঙ্গভঙ্গের প্রভাবে ঢাকায় মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনের সময় রাজনৈতিক সংগঠন মুসলিম লীগের জন্ম। পরবর্তী সময়ে সমগ্র মুসলমান জনগণের স্বার্থ ও কল্যাণের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি নেওয়া হয়। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের আগে কলকাতায় মুসলিম লীগের শাখা গঠন করা হয়। ভালো-মন্দ বৈশিষ্ট্যের মধ্যে সাম্প্রদায়িক চিন্তা কাজ করেছে। দলের মূল ছিল আহসান মঞ্জিল, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ সংরক্ষিত ছিল। নেতৃত্বের কাঠামোটি বস্তুত গড়ে উঠেছিল চিরস্থায়ী বন্দোবস্তপ্রসূত জমিদারি সামন্ত প্রভাব থেকেই। সম্পদ, অর্থ এবং সামাজিক প্রতিপত্তি ছিল নেতৃত্বের ভিত্তি। ত্রিশ দশকের শেষের দিকে একদল শিক্ষিত তরুণের আধুনিক চিন্তা থেকে জনগণের রাজনীতির দর্শন বিকশিত হয় উদার মুক্তচিন্তার সঙ্গে, বিভিন্ন জনপদের নিজস্ব স্বকীয়তা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টির মাঝে তারই সমষ্টিগত রূপ বাংলার জাতীয়তাবোধ।
এরপর নির্বাচন হয় ১৯৪৬ সালে। সামনে ছিল পাকিস্তানি প্রস্তাব। মুসলিম লীগ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে বিজয় লাভ করেছিল ১১৯টি আসনের ১১৩টিতে। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। ১৯৪৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মুসলিম লীগের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্ব শুরু হয়। সোহরাওয়ার্দী এবং খাজা নাজিমুদ্দিনের মধ্যেও বিসম্বাদ শুরু হয়। ১৯৪৭ সালের ৫ আগস্ট মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারি দলের সভায় নতুন করে নেতা নির্বাচন হয়। খাজা নাজিমুদ্দিন ১৪ আগস্টের আগে ঢাকায় এসে প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা গঠন করেন।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, মুসলিম লীগের মধ্যে মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল পূর্ববঙ্গ। বিশেষ করে ঢাকা। ঐ সময়ই শেখ মুজিবুর রহমান মুসলিম লীগের বিশাল কর্মীবাহিনীর মধ্যে অনন্য সাধারণ হয়ে উঠেছিলেন। জনপদের সাধারণের মধ্যে অনায়াসে বিচরণ, বাস্তব অভিজ্ঞান, স্মরণশক্তি ও তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুণ ছিল তার। অর্থাৎ ঊনপঞ্চাশে যে আওয়ামী লীগ গড়ে উঠেছিল, সেই সংগঠনের হাল তৈরি হচ্ছিল আগে থেকেই। দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক রীতির প্রাধান্য, নেতৃত্বের মূল্যবোধ ও তার বিকাশ, সময়োচিত কর্মসূচি প্রণয়ন, জনগণের চিন্তা ও আকাক্সক্ষার প্রতিফলনÑ এসবই মুজিব ধাতস্থ করেছিলেন রাজনীতির শুরু থেকে।

১.
পাকিস্তান সৃষ্টির পরপর সাংগঠনিক নীতিবহির্ভূত, অগণতান্ত্রিকভাবে মুসলিম লীগ নেতৃত্ব ছিনতাই করে (সোহরাওয়ার্দীর কাছ থেকে)। ১৫০ নম্বর মোগলটুলি বঙ্গীয় মুসলিম লীগের একটি শাখা অফিস ছিল। বঙ্গবন্ধু, শামসুল হকসহ সারাদেশের বিরাট কর্মীবাহিনী এই অফিস ঘিরে তখন কাজ পরিচালনা করত এবং ওয়ার্কার্স ক্যাম্প হিসেবে পরিচিতি ছিল। এই ওয়ার্কার্স ক্যাম্পের নেতৃবৃন্দের কাছে সদস্য সংগ্রহ বই দিতে (আকরাম খাঁ, তৎকালীন মুসলিম লীগ সভাপতি) অস্বীকৃতির মধ্য দিয়ে দ্বন্দ্ব চরম পর্র্যায় পৌঁছে।

২.
এমন সময় হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ঢাকা হাইকোর্টে দবিরুল ইসলামের হেবিয়াস কার্পাস মামলাটি পরিচালনা করার জন্য ঢাকা আসেন। তখন বিরোধী বিক্ষুব্ধদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা করেন। ইতোমধ্যে তিনি মুসলিম লীগের বিপরীতে পশ্চিম পাকিস্তানে গণতন্ত্রের পক্ষে নতুন দল গঠন করার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। তিনি ঢাকার নেতা-কর্মীদের পরামর্শ দিয়েছিলেন মুসলিম লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগ করে নতুন রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তুলতে, যাতে পাকিস্তানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যায় এবং একমাত্র গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হলেই জনগণের ও রাষ্ট্রের উন্নয়ন সম্ভব। আওয়ামী মুসলিম লীগ নামটিও তার দেওয়া।
এরপর ওয়ার্কার্স ক্যাম্পের নেতৃবৃন্দ মওলানা ভাসানীকে সভাপতি এবং ইয়ার মহম্মদ খানকে সম্পাদক করে অভ্যর্থনা কমিটি গঠন করে এবং ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন সকাল ১০টায় কে এম দাশ লেনের বশির সাহেবের ‘রোজ গার্ডেন’ বাসভবনের দ্বিতীয়তলায় মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে মুসলিম লীগের নেতাকর্মী ও বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের উপস্থিতিতে সম্মেলন হয়। সম্মেলনে শেরে বাংলা কিছুক্ষণ থেকে বক্তব্য দিয়ে চলে যান। সম্মেলনে মওলানা ভাসানীকে সভাপতি, শামসুল হককে সাধারণ সম্পাদক এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে যুগ্ম সম্পাদক করা হয় (কারাবন্দি অবস্থায়)।

৩.
আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম মেনিফেস্টোতে বলা হয়েছিল, রাষ্ট্রের প্রথম এবং প্রধান কাজ ও কর্তব্য হলো, আল্লাহর নির্দেশ ও পদ্ধতি অনুসারে জাতি, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের সামগ্রিক সুখ, শান্তি, উন্নতি, কল্যাণ এবং তার পুনর্বিকাশের জন্য সাধনা ও সংগ্রাম করা। পাকিস্তান খেলাফত অথবা ইউনিয়ন অব পাকিস্তান রিপাবলিকস ব্রিটিশ কমনওয়েলথের বাইরে একটি স্বাধীন সার্বভৌম ইসলামি রাষ্ট্র হবে। শিল্প, কারখানা, যানবাহন রাষ্ট্রায়ত্তের কথাও বলা হয়। সকল জমি রাষ্ট্রের মালিকানায় নিয়ে আসার কথাও মেনিফেস্টোতে উল্লেখ করা হয়েছিল।
আওয়ামী মুসলিম লীগের আত্মপ্রকাশের দিন ১৯৪৯ সালের ২৩ ও ২৪ জুন উপলক্ষে দলের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম মেনিফেস্টো পেশ করেন। এটির নাম ছিল ‘মূল দাবি’। এতে যেসব দাবি উথাপন করা হয়, সেগুলোর মধ্যে রয়েছেÑ ১. ব্যক্তি স্বাধীনতা ২. ধর্মের স্বাধীনতা ৩. সংখ্যালঘুদের ন্যায্য অধিকার ৪. আইনের চোখে সমতা ৫. মানুষের সমান অধিকার ৬. কাজ করার অধিকার ৭. শিক্ষার অধিকার ৮. স্বাস্থ্যের অধিকার ৯. নারীর অধিকার ১০. দেশ রক্ষার অধিকার ১১. বয়স্কদের ভোটাধিকার ১২. বৈদেশিক নীতি, ইসলামি রাষ্ট্র ও কৃষ্টি পুনর্গঠন ১৩. শিল্প বিপ্লব ইত্যাদি।
আওয়ামী লীগের প্রথম মেনিফেস্টোতে কৃষি-ব্যবস্থা পুনর্গঠন সম্পর্কে যেসব দাবি উথাপিত হয়েছিল, তা আজও সমভাবে প্রযোজ্য। যেমনÑ

১. সমস্ত কর্ষিত ও কৃষি উপযোগী অকর্ষিত জমি কৃষকদের মধ্যে সমভাবে বণ্টন করে দিতে হবে।
২. রাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে অবিলম্বে সমবায় ও যৌথ কৃষি প্রথা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
৩. সেচ-ব্যবস্থার সুবিধা ও সার প্রস্তুতের পরিকল্পনা তৈরি।
৪. উন্নত ধানের বীজ ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ।
৫. সহজ ঋণদান ও কৃষি ঋণ হতে কৃষকদের মুক্তিদান।
৬. ভূমিকর ৫০ শতাংশ কমানো।
৭. ভূমিকরের পরিবর্তে কৃষি আয়কর বসানো।
৮. খাদ্যশস্য প্রভৃতি জাতীয় ফসলের সর্বনিম্ন ও সর্বঊর্ধ্ব দর নির্ধারণ করে দিতে হবে এবং পাটের সর্বনিম্ন দর বেঁধে দিতে হবে।
৯. খাদ্যশস্যের ব্যবসা সরকারের হাতে একচেটিয়া থাকা উচিত।
১০. এছাড়া সকল জমি রাষ্ট্রের মালিকানায় নিয়ে আসার কথা বলা হয়।
১১. শিল্প-কলকারখানা ও যানবাহন রাষ্ট্রায়ত্ত করার কথা বলা হয়েছিল।

১৯৪৯ সালের ২৪ জুন আরমানিটোলা মাঠে প্রথম জনসভা অনুষ্ঠিত হয়। পূর্ববঙ্গের অভাব-অভিযোগসহ মুসলিম লীগের নেতা, মন্ত্রীদের অনাচার, অদক্ষতা ও দুর্নীতির কথা বলা হয়। বৈষম্যের কথাও বলা হয়েছিল। পবিত্র ইসলাম ধর্মকে অপব্যবহার করা হচ্ছে বলেও বক্তারা মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনেন। বঙ্গবন্ধু মুক্তি পেয়েছিলেন ১৯৪৯ সালের ১৭ জুলাই। বঙ্গবন্ধু জেল থেকে বেরিয়ে এসে লক্ষ করলেন আওয়ামী মুসলিম লীগের দাপ্তরিক কাজ কিছুই হয়নি। আওয়ামী লীগের দপ্তরটি ছিল ৯৪ নবাবপুর রোডের দালানে। বঙ্গবন্ধু চেয়ার-টেবিল, ফাইল-পত্তর নিয়ে বসে গেলেন। জেলায় জেলায় প্রথম যে কমিটিগুলো তিনি করেছিলেন, বস্তুত সেই কমিটিগুলো আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম সাংগঠনিক স্তম্ভ। প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের পূর্ববঙ্গ সফরের আগে ২৩ অক্টোবর আওয়ামী মুসলিম লীগের উদ্যোগে ডাকা হয় জনসভা। মূল বিষয় ছিল খাদ্য সংকট। লিয়াকত আলী খান যখন গভর্নর হাউসে (বর্তমান বঙ্গভবন) তখন মওলানা ভাসানী ও শেখ মুজিবের নেতৃত্বে ভুখামিছিল বের হয়। মিছিল নবাবপুর হয়ে গভর্নর হাউসের কাছাকাছি এলে পুলিশের লাঠিচার্জ এবং ঢালাও গ্রেফতার শুরু হয়। মওলানা ভাসানী, শামসুল হকসহ বেশ কয়েকজন গ্রেফতার হন। কিন্তু শেখ মুজিব গ্রেফতার এড়িয়ে যেতে সক্ষম হন। বঙ্গবন্ধু জীবনে এই প্রথম একবারই গ্রেফতার এড়িয়ে যান। ভাসানীর পরামর্শ অনুযায়ী পাকিস্তানভিত্তিক রাজনৈতিক দল করার জন্য সোহরাওয়ার্দীর সাথে আলাপ করতে পশ্চিম পাকিস্তান যান। সেখানে তিনি পাকিস্তানের রাজনীতির মূলধারা সম্পর্কে অবহিত হন। ১৯৪৯ সালের ২০ ডিসেম্বর ঢাকায় আসেন এবং ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি গ্রেফতার হন।

৪.
১৯৫৩ সালে পূর্ববঙ্গের গভর্নর হয়ে আসেন চৌধুরী খালেকুজ্জামান। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ১৯৫৩ সালের ১৭ এপ্রিল ঢাকার পল্টনে এক সভায় বৃহত্তর গণ-আন্দোলনের কথা বললেন। এ জনসভায় আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের কথা উল্লেখ করে বাঙালি জাতির অস্তিত্বের লড়াইয়ের জন্য বড় রকমের আত্মত্যাগের জন্য আহ্বান জানান, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকও বক্তব্য রাখেন।
১৯৫৩ সালের ১৪ নভেম্বর ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে আওয়ামী মুসলিম লীগের কাউন্সিল অধিবেশন বসে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এসেছিলেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, গোলাম মোহাম্মাদ লুন্ধখর, মিয়া ইফতিকার উদ্দিন এবং আরও অনেকে। এ অধিবেশনে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি এবং শেখ মুজিবুর রহমানকে সাধারণ সম্পাদক করে ৩৩ সদস্য বিশিষ্ট্য কমিটি করা হয়।
১৯৫৩ সালের ১৮ নভেম্বর আওয়ামী মুসলিম লীগের উদ্যোগে ঢাকা বার লাইব্রেরিতে সর্বদলীয় বৈঠক বসে গণবিরোধী মূলনীতি কমিটি খসড়া প্রতিরোধের বিষয়ে। এ বৈঠকেও নির্বাচনে মোর্চা গঠনের বিষয়টি আলোচনা হয়। যুক্তফ্রন্টে যে দলগুলো অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল, সেগুলো হলো- আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি (১৯৫৩ সালের অক্টোবরে গঠিত), গণতন্ত্রী পার্টি, নেজামে ইসলাম পার্টি, খিলাফতে রাব্বানী পার্টি ও কমিউনিস্ট পার্টি। ১৯৫৩ সালের ১১ ডিসেম্বর ময়মনসিংহে আওয়ামী মুসলিম লীগের বিশেষ কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী মুসলিম লীগ ২১-দফা অনুমোদন করে। ২১-দফাই যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী ইশতেহারে পরিণত হয়। নির্বাচনের ফলাফল : সর্বমোট ৩০৯টি আসনের মধ্যে আসনের সংখ্যা ২৩৭। যুক্তফ্রন্ট পেয়েছিল ২২৩টি, মুসলিম লীগ ৯টি এবং স্বতন্ত্র ৫টি। অন্যদিকে সংখ্যালঘু আসনে জাতীয় কংগ্রেস ২৫টি, কাস্ট ফেডারেশন ২৭টি, সংখ্যালঘু যুক্তফ্রন্ট ১৩টি, কমিউনিস্ট পার্টি ৪টি আসন এবং গণতন্ত্রী দল ৩টি আসন। বাংলার জনগণের রায় থেকে এটাই বোঝা গিয়েছিল যে মুসলিম লীগকে তারা মন-প্রাণ থেকেই বর্জন করেছে। ১৯৫৪ সালের ২৫ মার্চ কর্ণফুলি পেপার মিলে বাঙালি-বিহারি দাঙ্গায় ১০ জন প্রাণ হারায়। ১৯৫৪ সালের ২ এপ্রিল ঢাকা বার লাইব্রেরিতে যুক্তফ্রন্টের পার্লামেন্টারি দলের সভা বসেন। পালামেন্টারি দলের নেতা মনোনীত হন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক। চিফ মিনিস্টারের দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি ঐদিনই। সৈয়দ আজিজুল হক নান্না মিয়া এবং আবু হোসেন সরকার ও পরের দিন মন্ত্রিসভায় যোগ দেন এবং ১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল আশরাফ উদ্দিন আহমেদকে নেওয়া হয় মন্ত্রী হিসেবে। শেরে বাংলা কলকাতায় সফরে গিয়ে তার ভাষণে পাকিস্তানের সার্বভৌমত্বকে আঘাত করে কি একটা কথা বলেছেন বলে মারাত্মক অভিযোগ ওঠে। শেরে বাংলা দেশে ফিরে ঐ অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও দিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ রক্ষা করা যায়নি। শেরে বাংলা কলকাতা থেকে ফিরে ১৯৫৪ সালের ১৩ মে আতাউর রহমান খান, ইউসুফ আলী চৌধুরী, আবদুস সালাম খান, শেখ মুজিবুর রহমান, সৈয়দ মোয়াজ্জেম উদ্দিন হোসেন, আবুল মনসুর আহমেদ, হাশিমুদ্দিন আহমদ, কফিলউদ্দিন আহমদ চৌধুরী ও আবদুল লতিফ বিশ্বাসকে মন্ত্রী হিসেবে। নতুন মন্ত্রীগণ গভর্নর হাউসে শপথ নেওয়ার সময়ই ডেমরায় আদমজী পাটকলে বিহারি-বাঙালি দাঙ্গা বেধে যায়। ১৯৫৪ সালের ৫ মে মওলানা ভাসানী বিশ্ব শান্তি সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য বার্লিন যাত্রা করেন। শেরে বাংলার কলকাতার বক্তব্য নিয়ে পাকিস্তান যথেষ্ট গুরুত্ব আরোপ করে। ১৫ দিনের মাথায়, অর্থাৎ ৩০ মে পাকিস্তান সরকার ৯২(ক) ধারামতে প্রাদেশিক সরকার ভেঙে দিয়ে গভর্নরের শাসন কায়েম করে। বঙ্গবন্ধু বাসা থেকে বেরিয়ে আতাউর রহমানকে নিয়ে হক সাহেবের বাড়িতে গিয়ে কেবিনেট মিটিং ডেকে কেন্দ্রের এই আদেশ অগ্রাহ্য করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, এই অন্যায় আদেশ মেনে নেবেন না। দেশবাসী প্রস্তুত আছে। শুধু নেতৃত্ব দিতে হবে; কিন্তু হক সাহেব কোনো সিদ্ধান্ত না দিয়েই উপরে চলে গিয়েছিলেন। শেরে বাংলা এ কে ফজলুর হক তার কে এম দাস লেনের বাড়িতেই নজরবন্দি হলেন। আঞ্চলিকতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সরকার জানায়। যুক্তফ্রন্ট সরকার ২১ ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা করেছিল, গভর্নর ইস্কান্দার মীর্জা তাও বাতিল করে দেন।
১৯৫৪ সালের ৩১ মে প্রথমে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করা হয়। মওলানা ভাসানী বিদেশে আটকা পড়ে গেলেন। ১৯৫৪ সালের ২৪ জুলাই পাকিস্তানের সবকটি প্রদেশে কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। ঢাকায় জেনারেল আইয়ুব খান সাংবাদিকদের সঙ্গে মিলিত হয়ে কুশলবিনিময় করেন ১৯৫৪ সালের ২ জুন। ১৯৫৪ সালের ২০ সেপ্টেম্বর দৈনিক ইত্তেফাক জননিরাপত্তা আইনে নিষিদ্ধ করা হয়। ১৯৫৪ সালে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী গণপরিষদ ও মন্ত্রী পরিষদ ভেঙে দিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করেন। ঐদিনই আট সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়। বৈশিষ্ট্য হলোÑ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে আসেন জেনারেল আইয়ুব খান। সোহরাওয়ার্দী ১২ নভেম্বর চলে যান চিকিৎসার জন্য। ১৯৫৪ সালের ১৩ নভেম্বর শেখ মুজিবুর রহমানের জামিন হলেও অন্য একটি মামলায় তাকে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার করা হয়। ১৯৫৪ সালের ১৫ নভেম্বর ঢাকার পল্টনে শেরে বাংলা, আতাউর রহমান প্রমুখের উপস্থিতিতে জনসভা হয়। যুক্তফ্রন্টের মধ্যে আর কোনো অন্তর্দ্বন্দ্ব নেই বলে শেরে বাংলা ও আতাউর রহমান সভামঞ্চে কোলাকুলি করে দেখান।
১৯৫৪ সালের ১২ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তান ফিরে এলেন। সোহরাওয়ার্দীর প্রচেষ্টায় ১৯৫৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর শেখ মুজিব ঢাকা জেল থেকে মুক্তি পেলেন। ভাসানীর ওপর থেকেও নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। ১৯৫৪ সালের ২০ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী আইনমন্ত্রী হিসেবে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারে যোগদান করেন (পাকিস্তানে সংবিধান দেওয়ার জন্য)।
যুক্তফ্রন্ট আর জোড়া লাগবে না এটা পরিষ্কার বোঝা গেল তখন যখন অ্যাডভোকেট আবদুল সালামের নেতৃত্বে ১৯৫৫ সালের এপ্রিলের একদল সদস্য কেএসপির সঙ্গে আঁতাত করে। ১৯৫৫ সালের ২ জুন পূর্ববঙ্গ থেকে ৯২(ক) ধারা তুলে নেওয়া হয়। ১৯৫৫ সালের ৬ জুন কেএসপি প্রধান আবু হোসেন সরকার চিফ মিনিস্টারের দায়িত্ব নিয়ে সরকার গঠন করেন। আওয়ামী মুসলিম লীগের আবদুস সালাম খান, খন্দকার মোশতাক ও খালেক নেওয়াজসহ বেশ কিছু সংখ্যক সদস্য নিয়ে তাকে সমর্থন করেন। গণপরিষদ নির্বাচন হয় ১৯৫৫ সালের ২১ জুন, শেরে বাংলা সোহরাওয়ার্দীকে পরাজিত করেন। ১৯৫৫ সালের ১১ আগস্ট পাকিস্তান কেন্দ্রের নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হয়, এই মন্ত্রিসভায় শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন।
১৯৫৫ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগের দ্বি-বার্ষিক অধিবেশনটি হওয়ার কথা ছিল কার্জন হলে। কিন্তু চিফ মিনিস্টার আবু হোসেন সরকার ওখানে পারমিশন দিলেন না। ফলে ২১ সেপ্টেম্বর সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলে অধিবেশন বসল। আওয়ামী লীগ শুরু থেকে এদেশে অবাধ ও নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচনের দাবি করে আসছিল। যাকে আমরা যুক্ত নির্বাচন বলে আখ্যায়িত করে থাকি। অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে সবার জন্য দরজা খুলে দেওয়ার চিন্তা ছিল আরও আগে থেকেই। নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সভাপতি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী রূপমহলের অধিবেশনে এ প্রস্তাবটি আনেন। কেউই বিরোধিতা করেননি। কাউন্সিলর উপস্থিত ছিলেন প্রায় ৭০০ জন, সবার হর্ষধ্বনীর মাধ্যমে প্রস্তাবটি সমর্থন করেন। এ অধিবেশনে সভাপতি নির্বাচিত হন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক অলি আহাদ।
যুক্তফ্রন্ট নামে সরকার গঠিত হলেও আওয়ামী লীগের মূলধারাটি অনুপস্থিত ছিল। আওয়ামী লীগ বস্তুত তখনও সংখ্যাগরিষ্ঠই ছিল, তাই আবু হোসেন সরকার প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন থেকে বিরত ছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ রাতে পাকিস্তান কেন্দ্রীয় পরিষদে সংবিধান গৃহীত হয়। পরিষদে সেদিন শেখ মুজিব বলেছিলেন, পূর্ববঙ্গের নাম পূর্ব পাকিস্তান রাখার অধিকার এ পরিষদের নেই এবং সংবিধানে তা বৈধ নয়, একটি দেশের নাম বদল করতে হলে সেদেশের জনগণের রায়ের প্রয়োজন। পূর্ববঙ্গ হাজার হাজার বছরের ঐতিহ্যম-িত একটি জনপদ। এই নামের সঙ্গে জনগণের জাতীয় পরিচয় অবিচ্ছেদ্য।
১৯৫৬ সালের ৪ মার্চ জেনারেল ইস্কান্দার মীর্জা পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হয়েই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শেরে বাংলাকে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিয়োগ করেন। এত তথাকথিত যুক্তফ্রন্ট সরকারের শক্তি আরও বৃদ্ধি পায়। দুর্ভিক্ষ মোকাবিলার দাবিতে মওলানা ভাসানী ১৯৫৬ সালের ২ মে থেকে অনশন শুরু করেন। ১৬ মে পরিস্থিতি যখন চরম পর্যায়ে, শেখ মুজিব আরমানিটোলা ময়দানের জনসভায় গণ-আন্দোলনের কর্মসূচি দেবেন বলে ঘোষণা করেন। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এসে মওলানা ভাসানীর অনশন ভাঙালেন। ১৯৫৬ সালের ১৯ ও ২০ মে মুকুল সিনেমা হলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন সম্পন্ন হয়। ১৯৫৬ সালের ২৬ মে প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জা পূর্ব পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাসন জারি করেন। কিন্তু ১৯৫৬ সালের ১ জুন আবার তা তুলে নেওয়া হয়।
১৯৫৬ সালের ২৩ জুলাই পল্টন ময়দানে বঙ্গবন্ধু পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দাবি করলেন। অবিলম্বে ব্যবস্থাপক পরিষদের অধিবেশন ডাকা না হলে ঢাকা শহর অচল করে দেওয়া হবে বলে তিনি চূড়ান্ত ঘোষণা দিলেন। ১৯৫৬ সালের ১৫ আগস্ট খাদ্য সরবরাহ তদারক করার জন্য কেএসপি পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর হাতে ক্ষমতা প্রদান করেন। কিন্তু প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশনের কারণে ঢাকা শহরের অবস্থার অবনতি ঘটে মিছিল-মিটিং আর বিক্ষোভে। ১৯৫৬ সালের ২২ আগস্ট কেন্দ্র ৩০ আগস্টের মধ্যে প্রাদেশিক পরিষদের অধিবেশন ডাকার নির্দেশ দিলে ১৯৫৬ সালের ২৯ আগস্ট যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী পরিষদ সদলবলে পদত্যাগ করে। আওয়ামী লীগ বুঝতে পারে এটা কোনো পাতানো নাটক। কিন্তু পরিস্থিতি অন্যরকম হলো। ৩০ আগস্ট আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে শহরে ভুখামিছিল চলছিল। পুলিশ মিছিলে গুলি করে কয়েকজনকে হত্যা করে। সমস্ত শহর কেঁপে ওঠে। দুপুরের মধ্যেই সমস্ত অফিস-আদালত, দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়, গভর্নর শেরে বাংলা মুষড়ে পড়েন। তিনি আওয়ামী লীগকে মন্ত্রিসভা গঠনের জন্য অনুরোধ জানান। এ সময় কেন্দ্র এবং প্রদেশের রাজনীতি অতিদ্রুত পরিবর্তন হচ্ছিল। কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলেন। এদিকে আওয়ামী লীগে ১৯৫৬ সালের ৫ এবং ১৯ সেপ্টেম্বর ১১ জন মন্ত্রী নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন চূড়ান্ত করলেন। চিফ মিনিস্টার আতাউর রহমান, শেখ মুজিবুর রহমান, আবুল মুনসুর আহমদ, কফিউদ্দিন চৌধুরী (কেএসপি), মাহমুদ আলী (গণতন্ত্রী পার্টি), মনোরঞ্জন ধর (কংগ্রেস) ও শরৎচন্দ্র মজুমদার (কংগ্রেস)। আওয়ামী লীগের সামনে ছিল দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা করা। সরকার পরিচালনা এবং দুর্ভিক্ষ মোকাবিলা ছিল আওয়ামী লীগের জন্য একটা নতুন অভিজ্ঞতা। আওয়ামী লীগ সরকার একটি বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা হলোÑ সরকার এবং দলের অবস্থান নির্ধারণ। ওদিকে কেন্দ্রের প্রধানমন্ত্রী তখন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তিনিও পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নে আওয়ামী লীগ সরকারকে সহায়তা করেছেন। ১৯৫৭ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি কাগমারীতে আফ্রো-এশীয় সাংস্কৃতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এখানে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং সভায় শুধু কেন্দ্র নয়, প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সরকারকেও কঠোর ভাষায় সমালোচনা করা হয়।

৫.
১৯৫৬ সালের ২১ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে এবং ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল। এ সময়টা আওয়ামী লীগ সরকার দেশের জন্য কী কী করেছিল তার একটি সংক্ষিপ্ত হিসাব এখানে তুলে ধরা হচ্ছে দেশের উন্নয়নের জন্য-
১. ২১শে ফেব্রুয়ারি সরকারি ছুটি।
২. উন্নয়নের জন্য প্রথম প্ল্যানিং বোর্ড গঠন।
৩. প্রথম শিক্ষা সংস্কার কমিটি গঠন।
৪. আলিয়া মাদ্রাসার স্থায়ী ভবন নির্মাণ।
৫. ইপিএসআইসি (বিআইএসআইসি)।
৬. জুট মার্কেটিং অ্যান্ড করাপশন গঠন।
৭. ফেঞ্চুগঞ্জে সার কারখানা স্থাপন ও উৎপাদন। (বর্তমান হযরত শাহজালাল সার কারখানা)।
৮. স্থায়ী শিল্প ট্রাইব্যুনাল গঠন।
৯. সাভার ডেইরি ফার্ম স্থাপন।
১০. লেবার ইউনিয়ন রেজিস্ট্রেশন আইন পাস।
১১. কক্সবাজার প্রথম পর্যটন কেন্দ্র স্থাপন।
১২. ঢাকা-আরিচা রোড নির্মাণ।
১৩. কৃষি ঋণ সার্টিফিকেট প্রথা বাতিল।
১৪. চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (এফডিসি) গঠন।
১৫. ওয়াপদা গঠন।
১৬. রমনা পার্ক স্থাপন।
১৭. ইরি ধানের চাষ শুরু।
১৮. পাওয়ার পাম্প সেচের ব্যবস্থা।
১৯. বিচার বিভাগ প্রশাসন থেকে মুক্ত।
২০. ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট অফিস স্থাপন।
২১. ময়মনসিংহে দেশের প্রথম পশু হাসপাতাল স্থাপন।
২২. মন্ত্রিসভা গঠনের পরপরই মুখ্যমন্ত্রী জননিরাপত্তা আইন বাতিল ঘোষণা করেন এবং বিনা বিচারে আটক রাজবন্দিদের মুক্তির আদেশ দেন। ৮ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে উপস্থিত হয়ে ৫৯ জন মুক্ত রাজবন্দিকে অভ্যর্থনা জানান।

১৯৫৭ সালে ঐ কাগমারী থেকেই মওলানা ভাসানী প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটিতে ১৯৫৬ সালের ২১ মে অভিযোগ তোলা হয়েছিল যে, দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কোনো মন্ত্রী দলের সাংগঠনিক কমিটির দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। ১৯৫৬ সালের ২১ মে’তেই যারা মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন তাদের সকলেই দলের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে পদত্যাগ করেন। একমাত্র জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৬ সালের ৩১ মে মন্ত্রিত্বের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। একই সাথে তিনি সাধারণ সম্পাদকের পদেই রয়ে গেলেন। তার ঐ সিদ্ধান্ত যে কতটা জরুরি ছিল তা তখন না বোঝা গেলেও স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতিটি মুহূর্তে জাতি উপলব্ধি করেছে।
১৯৫৭ সালের ১৩ জুন শাবিস্তান হল ও গুলিস্তান হলে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন হয়। ওয়ার্কিং কমিটি নতুন করে গঠন করা হয়। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী পদত্যাগ করলে তাকেই সভাপতির পদে রাখা হয়। সহ-সভাপতির পদ ৩টি খালি রাখা হয়। সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান। সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল হামিদ চৌধুরী, প্রচার সম্পাদক অধ্যাপক হাফেজ হাবিবুর রহমান, শ্রম সম্পাদক জহুর আহমদ চৌধুরী, সাংস্কৃতিক ও সমাজকল্যাণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ, মহিলা সম্পাদক মিসেস মেহেরুন্নেসা, দপ্তর সম্পাদক মোহাম্মাদ উল্লাহ, কোষাধ্যক্ষের পদটিও খালি রাখা হয়েছিল।
হঠাৎ করে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার ফলে একটি বড় রকমের ধাক্কা এলো দলে। জেলা মহকুমা ও থানার শাখা কমিটিগুলোর অনেকেই চলে গেল মওলানা ভাসানীর সঙ্গে। কেউ কেউ আবার ফিরেও এলেন। ’৫৭-তেই হাল ধরতে হলো শেখ মুজিবকে, মওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব নিলেন। তখন থেকেই মুজিবের আওয়ামী লীগ বলে দলের পরিচিতি লাভ করেছিল। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন ১৯৫৭ সালের ১১ অক্টোবর। অনেকেই ধারণা করছিল যে পূর্ব পাকিস্তান আবার গভর্নরের শাসনে চলে যাবে। নানা ধরনের ষড়যন্ত্র চলছিল। গভর্নর শেরে বাংলা এ সময় সরাসরি কেএসপি’কে সমর্থন করে নতুন আইন জারি করেছিলেন পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিষয়ে। ১৯৫৮ সালের ৩১ মার্চ গভর্নর শেরে বাংলা আওয়ামী লীগে সরকারকে বরখাস্ত করে দিলেন এবং সঙ্গে সঙ্গেই আবু হোসেন সরকারকে চিফ মিনিস্টারের দায়িত্ব প্রদান করলেন। কিন্তু এই অনাহূত কাজটি ছিল নিছক আইন বিরুদ্ধ। সোহরাওয়ার্দী বিষয়টি প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীর গোচরে আনলেন। গভর্নর নিরপেক্ষ নয় বলে তিনি তাদের কাছে প্রমাণ রাখলেন। ১৯৫৮ সালের ৩১ মার্চ কেন্দ্রীয় সরকার শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হককে গভর্নরের পদ থেকেই বরখাস্ত করে দেয়। আবু হোসেন সরকারের শপথ নেওয়ার কথা ছিল; কিন্তু তার পরিবর্তে আওয়ামী লীগের আতাউর রহমান এসে শপথ নিলেন পরদিন ১ এপ্রিল।
হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বঙ্গবন্ধুকে কয়েকটি দেশে সফর করতে পাঠিয়েছিলেন। ওয়ার্কিং কমিটির সভায় তিনি বলেছিলেন এদেশের ভবিষ্যতের নেতৃত্বের ভার তাকেই নিতে হবে। কেএসপি সরকারের পতনের পরই কেএসপি সর্বত্রই জঙ্গি মনোভাব নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর আক্রমণ চালাতে থাকে। হামিদুল হক চৌধুরী আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করে ১৯৫৮ সালের ৩ এপ্রিল এবং পল্টনে জনসভা করে ৪ এপ্রিল। ১৯৫৮ সালের ৫ এপ্রিল পরিষদের সভা বসে। সভায় অধিবেশন মুলতবি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে পরিষদ কক্ষের মধ্যে হাতাহাতি মারামারি শুরু হয়ে যায়। সেই মারামারির জের চলে শীতকালীন অধিবেশন পর্যন্ত। ১৯৫৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর অন্যান্য দিনের মতো বিরোধী দল পরিষদ কক্ষে হৈচৈ মারামারিতে এত বেশি উত্তেজিত হয়ে পড়ে যে আওয়ামী লীগের ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলীকে তারা আঘাত করে মারাত্মকভাবে। সেই আঘাতে ডেপুটি স্পিকার শাহেদ আলী ঢাকা মেডিকেলে ২৬ সেপ্টেম্বর ইন্তেকাল করেন। পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে। অন্যদিকে জেনারেল ইস্কান্দর মীর্জা পাকিস্তানে মার্শাল ল’ জারি করেন ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর। জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর তাকে তাড়িয়ে শেষে নিজেই পাকিস্তানের সর্বময় দখল করে বসেন।
বঙ্গবন্ধু ১৯৫৮ সালের ১২ অক্টোবর প্রথম ধাপেই গ্রেফতার হলেন, মুচলেকা দিয়ে অনেক নেতাই মুক্তি পেয়েছিলেন; কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মেজাজে ঐ ধরনের কিছু কোনোদিনই ছিল না। তিনি মুচলেকা দিলেন না, ফলে তিনি মুক্তি পেলেন ১৯৫৯ সালের ১৭ ডিসেম্বর। আওয়ামী লীগের জন্য এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্য এটা ছিল সবচেয়ে গুরুতর সময়। কিন্তু আওয়ামী লীগ সে-সময় যে ঝুঁকিপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে, তা অবশ্যই ইতিহাসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়। আইয়ুব খান প্রথমেই গণতন্ত্রের ওপর হস্তক্ষেপ করে। মৌলিক গণতন্ত্র নামে এক ধরনের নির্বাচন চালু তিনি করেছিলেন, যাতে তার নিজের ক্ষমতাও দৃঢ় হয়। সেসব ইতিহাস সবাই জানেন। সোহরাওয়ার্দী একটু সময় নিয়েছিলেন; কিন্তু ১৯৬২ সালের দিকে তিনি আর বসে থাকলেন না। এদিকে দীক্ষাগুরু সোহরাওয়ার্দীর পরামর্শ নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। আওয়ামী লীগের অনেকেই এ সময় রাজনীতি ছেড়ে দূরে সরে গিয়েছিলেন, মুসলিম লীগের তো কোনো কথাই নেই, তারা তাদের হারানো ক্ষমতা আবার ফিরে পেয়েছে এ-রকম একটা ভালো অবস্থানে ছিল। ক্রমেই এদেশের বামপন্থি অনেক নেতাই আইয়ুব খানের সঙ্গলাভের চেষ্টা করেছিলেন। আইয়ুব খান মওলানা ভাসানীকে জেলে পুরে, আবার মুক্তি দিয়ে ধানমন্ডির একটা ভবনে নজরবন্দি করে, পরে করাচি নিয়ে চীনে পাঠান রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি হিসেবে। ১৯৬২ সালে হঠাৎ করেই হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে গ্রেফতার করে আইয়ুব খান সরকার। বরিশাল, ঢাকা, কুমিল্লাসহ বাংলাদেশের প্রায় সব জেলাতেই ছাত্র-জনতা তাৎক্ষণিকভাবে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। বিরোধী দলের রাজনীতিকরাও ক্রমেই নড়েচড়ে ওঠেন। ১৯৬২ সালের ১ মার্চ আইয়ুব খান তার পক্ষে দেশের একটি শাসনতন্ত্র রচনা করে। প্রেসিডেন্টের অপার ক্ষমতা। উভয় ইউনিট থেকে ৪০ হাজার করে মৌলিক গণতন্ত্রীদের নির্বাচিত করে প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদ গঠন করা হলো রাতারাতি। ১৯৬২ সালের ২৮ এপ্রিল জাতীয় পরিষদের এবং ১৯৬২ সালের ৬ মে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন দেওয়া হয়। দেশের সবগুলো রাজনৈতিক দল নির্বাচন বর্জন করে। তবে এক্ষেত্রে ১৯৬২ সালের ২৪ জুন ৯ জন বিরোধী দলের নেতা এক যুুক্ত বিবৃতি দান করেন, আইয়ুব খান-বিরোধী ঐ বিবৃতিটি ছাপা হলে চারদিকে হৈচৈ পড়ে যায়, রাজনীতির বাতাস বইতে শুরু করে। বিবৃতিতে যারা স্বাক্ষর করেন তারা হলেন : নুরুল আমিন, আতাউর রহমান খান, হামিদুল হক চৌধুরী, আবু হোসেন সরকার, শেখ মুজিবুর রহমান, ইউসুফ আলী চৌধুরী, মাহমুদ আলী, সৈয়দ আজিজুল হক ও মাওলানা পীর মোহসীন উদ্দিন আহমদ। ১৯৬২ সালের ৮ জুলাই পল্টনে ৯ নেতা সামরিক আইন ও আইয়ুবের মৌলিক গণতন্ত্র সম্পর্কে প্রকাশ্যে সমালোচনা করেন। ১৯৬২ সালের ১৪ জুলাই আইয়ুব দলবিধি গঠন করে দল পুনরুজ্জীবনের জন্য সরকারের কাছে বিভিন্ন বিবরণ দিয়ে অনুমতি নেওয়ার প্রচলন শুরু করে। ১৯৬২ সালের ১৯ আগস্ট হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে মুক্তি দেওয়া হয়। মুক্তির পর তার নেতৃত্বে এনডিএফ গঠিত হয়। তিনি নেতৃবৃন্দকে নিয়ে পাকিস্তানব্যাপী সফর করে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করেন এবং এ-সময় তিনি অসুস্থ হয়ে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যান।
১৯৬৩ সালের ৫ ডিসেম্বর হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী বৈরুতের একটা হোটেলে ইন্তেকাল করেন। সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার রাস্তায় শোকমিছিল নেমে আসে। ঢাকায় তার লাশ আনা হয়। ১৯৬৩ সালের ৭ ডিসেম্বর শেখ মুজিব একটা বিষয় মর্মে মর্মে অনুধাবন করলেন, তিনি একা হয়ে গেলেন। ১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু তার ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাসায়, আওয়ামী লীগের এক বিশেষ সম্মেলন ডাকেন। এতে আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য, সকল জেলা এবং মহকুমা শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকগণ উপস্থিত হন। এখানেই সংখ্যাগরিষ্ঠদের সিদ্ধান্তে আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৬৪ সালের ১ মার্চ আওয়ামী লীগ ঘোষণা দিয়ে পুনরুজ্জীবন ঘটায়, এতে এনডিএফের নেতাগণ বঙ্গবন্ধুর ওপর প্রচ-ভাবে ক্ষেপে যান। উল্লেখ্য, একমাত্র আওয়ামী লীগেরই নিবেদিত এবং সংগঠিত কর্মীবাহিনী ছিল অলিতে-গলিতে-মহল্লায়। আওয়ালী লীগের একদল নেতা এনডিএফের বাইরে দলের আত্মপ্রকাশের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেন।
১৯৬৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি এনডিএফ মিলাদ পড়িয়ে ইন্দিরা রোডে তাদের দপ্তর উদ্বোধন করে। এ সময় আওয়ামী লীগের নিজস্ব দপ্তরটিতে সামরিক বাহিনীর তালা ঝুলছে। মওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী লীগ পার্টি তখন না আইয়ুব খানের পক্ষে না বিপক্ষে। আওয়ামী লীগের বহু নেতা-কর্মী তখন জেলে। গভর্নর মোনেম খাঁ তখন তার পোষ্য ছাত্র সংগঠন এনএসএফ এবং পেশাদার গু-াবাহিনী দিয়ে আওয়ামী লীগকে দমন করার ব্রত নিয়েছে। ঐ সময় একটি মাত্র দল নির্ভেজাল বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা। আইয়ুব খান মোনেমের রবীন্দ্রবিরোধী কার্যক্রম থেকে শুরু করে বাঙালি জাতীয়তা হরণের সব রকমের অপচেষ্টাকে প্রতিহত করে যাচ্ছে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ। ১৯৬৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছোট বোন মাদারে মিল্লাত মিস ফাতেমা জিন্নাহ ঈদের বাণীতে উল্লেখ করলেন, রাজনৈতিক শিক্ষার উৎকৃষ্ট মাধ্যম হচ্ছে বয়স্ক ভোটাধিকার নির্বাচন। মিস ফাতেমা জিন্নাহর ঐ বাণীর প্রতি তাৎক্ষণিকভাবে সমর্থন জানায় শেখ মুজিব। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে এ বিষয়ে বেশ সাড়া জাগে। ১৯৬৪ সালে আইয়ুব খান ঢাকা আসেন ১০ দিনের সফরে। ১৯৬৪ সালের ৬ ও ৭ মার্চ ঢাকার ইডেন হোটেলে আওয়ামী লীগের সম্মেলন বসে। সম্মেলনের উদ্বোধন করেন নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ নেতা নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান। সভাপতিত্ব করেন দলের সভাপতি মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ। মুসলিম ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শাহ আজিজুর রহমানও এ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন।
সম্মেলনে কার্যনির্বাহী পরিষদের তালিকা : সভাপতি আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ, সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান, সহ-সম্পাদক এবং সম্পাদকীয় বিভাগের দায়িত্ব পরে বণ্টন করা হয়। তবে যারা সদস্য ছিলেন, তারা হলেনÑ অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম খান, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, শাহ আজিজুর রহমান, আবদুল মালেক উকিল, মোল্লা জালাল উদ্দিন, শেখ আবদুল আজিজ, এ এইচ এম কামারুজ্জামান, রফিকউদ্দিন ভূঁইয়া, ময়েজ উদ্দিন আহমেদ, আবদুল মোমেন তালুকদার, আবদুল মান্নান, রওশন আলী, সোহরাব হোসেন, মাহমুদুল্লাহ, এবিএম নুরুল ইসলাম, বাহাউদ্দিন চৌধুরী, মোমেন উদ্দিন আহমেদ, আবদুর রহমান খান, আজিজুর রহমান, টি হোসেন, গাজী গোলাম মোস্তফা, আলী হাফিজ, সাদ আহমেদ, লকিতুল্লাহ, মোশারেফ হোসেন, ডেএফ গাজী, শামসুদ্দিন মোল্লাহ, আবুল কালাম, আমিনুল হক চৌধুরী, অধ্যাপক ইউসুফ আলী, আমজাদ হোসেন, একে মজিবর রহমান, এমএ আজিজ ও তাজউদ্দীন আহমদ। ১৯৬৪ সালের ৫ জুন আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভা বসে। সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ঐ সভায় ১১-দফা পেশ করেন।
১. ফেডারেশন অব পাকিস্তান নামে সত্যিকার অর্থে ফেডারেল পদ্ধতি গঠন।
২. প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে গণতন্ত্র কায়েম ও যুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার গঠন।
৩. কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন সামরিক বাহিনীর সকল উচ্চপদে মেধা অনুসারে বাঙালিদের নিয়োগ।
৪. পাকিস্তানের উভয় অংশের বৃহৎ শিল্প-কলকারখানা জাতীয়করণ।
৫. মোহাজেরদের জন্য সম্মানজনক পুনর্বাসন কর্মসূচি প্রণয়ন।
৬. ফেডারেশনে বিভিন্ন জাতিভিত্তিক কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও ভাষার বিকাশ সাধনে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি প্রণয়ন।
৭. পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন, প্রয়োজনে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক মুদ্রার ব্যবস্থাসহ পৃথক অর্থনীতি প্রণয়ন।
৮. পাকিস্তানের সকল প্রদেশের জন্য পৃথক বৈদেশিক বাণিজ্যনীতি প্রণয়ন।
৯. বৈদেশিক মুদ্রার পূর্ণ আয়-ব্যয়ের পূর্ণ অধিকার এবং হিসাব-নিকাশ প্রদেশের হাতে ন্যস্তকরণ।
১০. পূর্ব পাকিস্তানে নৌবাহিনীর সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠাসহ দেশ রক্ষার উদ্দেশ্যে মিলিশিয়া বাহিনী গঠন।
১১. ছাত্রদের দাবি-দাওয়াসহ শ্রমিক কৃষকদের ন্যায্য দাবিসমূহ পূরণ।

১১-দফা নিয়ে সভায় বেশ হৈচৈ শুরু হয়। কেউ কেউ এটাকে দুঃসাহসিক বলে অভিহিত করেন। সম্পূর্ণটাই ছিল স্বায়ত্তশাসনের বিষয়। এতে ফেডারেলভিত্তিক রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে পূর্ব পাকিস্তানের মুদ্রা-ব্যবস্থা, মুদ্রার আয়-ব্যয় হিসাব পৃথককরণ, পৃথক বৈদেশিক বাণিজ্যনীতি প্রণয়ন, নৌবাহিনীর সদর দপ্তর পূর্বাঞ্চলে স্থাপন ইত্যাদি ঐ ১১-দফায় ছিল। অনেক আলোচনার পর ১১-দফা গৃহীত হলেও প্রচার এবং দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার ব্যাপারে কিছুটা অনীহা প্রকাশ পায়। বলা হয়, এতে আওয়ালী লীগের ওপর চরম দমননীতি শুরু হবে।
১৯৬৪ সালের ২২ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশন অনুষ্ঠানে গভর্নর মোনেম খাঁ ছাত্রদের ব্যাপক বিক্ষোভের মুখে প্যান্ডেল ইত্যাদি ভেঙে ফেলে। মোনেম খাঁ কোনোরকম পালিয়ে জান বাঁচে। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছাত্রলীগের প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মনির এমএ বাংলা, রোল-৭৪, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল এবং আসমত আলী এমএ ইতিহাস, রোল-২৫৮, এই দুজনের এমএ ডিগ্রি বাতিল করে। দুজনই ১৯৬২ সালে ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। আওয়ামী লীগ এ-সময় ১৯৬৪ সালের ৩ জুনের সিদ্ধান্ত অনুসারে ইউনিয়ন পর্যায়ে দলের শাখা কমিটি গঠনের সাংগঠনিক কাজ শুরু করে। ১৯৬৪ সালের ১৩ জুলাই আওয়ামী লীগ দল পুনর্গঠনের পর প্রকাশ্য জনসভা করে পল্টনে। সভার সভাপতি ছিলেন মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ, শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যরা বক্তব্য রাখেন। রাজবন্দিদের মুক্তি, শিক্ষাঙ্গনে সরকারি সন্ত্রাসী বন্ধ, যুক্ত নির্বাচন, গণতান্ত্রিক অধিকার প্রভৃতি দাবি ছাড়াও জোর দেওয়া হয় পূর্ব পাকিস্তানের স্বায়ত্তশাসনের ওপর। ১৯৬৪ সালের ১৪ জুলাই পুলিশ নগর আওয়ামী লীগ অফিসে হামলা চালায়। কমপক্ষে উপস্থিত আটজনকে গ্রেফতার করে এবং দলিলপত্র সিজ করে। ঐদিন মওলানা ভাসানী লাহোরে। লাহোরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ ন্যাপ আইয়ুব খান সরকার কেন, যে কোনো দল বা সরকারকে সমর্থন করবে। ১৯৬৪ সালের জুলাইয়ে গভর্নর মোনেম খাঁ রাজনৈতিক সংলাপ শুরু করেন। এতে উপস্থিত হন আতাউর রহমান খান, আবুল মুনসুর আহমদ, খাজা নাজিমুদ্দিন, নুরুল আমিন এবং আরও অনেকে। প্রাদেশিক ও কেন্দ্রীয় পরিষদের নির্বাচনকে রেখে খাজা নাজিমুদ্দিনের উদ্যোগে গঠিত হয় কম্বাইন্ড অপজিশন পার্টি ১৯৬৪ সালের ২৬ জুলাই। গণতন্ত্র উদ্ধারের প্রশ্নে এতে আওয়ামী লীগ যোগ দিয়েছিল।
বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ একযোগ কর্মসূচি নিয়েছিল আরবি বা উর্দু হরফে বাংলা লেখার সরকারি প্রস্তাবের বিরুদ্ধে। আওয়ামী লীগ তার প্রতিটি জনসভায় বাঙালি জাতীয়তাবাদের অস্তিত্ব, বাংলা ভাষার অধিকার নিয়ে বক্তব্য রাখত, যাতে এদেশ অন্যান্য বিরোধী দলের অনীহা ছিল। সরকার বাংলাকে উর্দু হরফে লেখার ঐ প্রস্তাব রেখেছিল ১৯৬৪ সালের ১৭ মে। আওয়ামী লীগ তার লিফলেট, প্রচারপত্র এবং জনসভায় পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যের বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্ব সহকারে প্রচার করত।
১৯৬৫ সালের ২৯ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে কোনো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে এবং সেই সুযোগে গ্রাম পর্যায়ে আওয়ামী লীগের বিস্তৃতি ঘটাতে হবে। আওয়ামী লীগের ভেতর স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলনের ওপর যতই জোর দেওয়া হচ্ছিল ততই অন্তর্দ্বন্দ্ব বৃদ্ধি পাচ্ছিল। সরকারের সঙ্গে বড় রকমের দ্বন্দ্বে না যাওয়ার জন্য ওয়ার্কিং কমিটির একদল নেতা সব সময়ই সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করতেন। সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য ছিল সুযোগ বুঝে অবশ্যই ঝুঁকি নিতে হবে। ১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর পাক-ভারত যুদ্ধ লেগে যায়। ১৭ দিন যুদ্ধের পর জাতিসংঘের হস্তক্ষেপে যুদ্ধ থামে। যুদ্ধে পাকিস্তানের যথেষ্ট ক্ষতি হয়। পশ্চিম পাকিস্তানেই যুদ্ধ চলেছে। আইয়ুর খানের ধারণা হয়েছিল যুদ্ধের ফলে পাকিস্তানের উভয় অঞ্চলের ঐক্য বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ যুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তানের অসহায় অবস্থার কথা তুলে ধরে। আক্রমণ প্রতিরোধ করার মতো কোনো ব্যবস্থাই পূর্ব পাকিস্তানে ছিল না। ১৯৬৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের বিশেষ অধিবেশনে পূর্ব পাকিস্তানের ঐ অসহায় বিশ্লেষণ হয় এবং এইসঙ্গে বলা হয় যে, ঐ যুদ্ধের সিংহভাগ ব্যয়ভার পূর্ব পাকিস্তানকেই বহন করতে হবে। ১৯৬৬ সালের ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের তাসখন্দে আইয়ুব খান এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর মধ্যে একটি শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। আইয়ুব খানের মন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো চুক্তির বিরোধিতা করেছিলেন। এনডিএফের নুরুল আমিনও চুক্তির বিরোধিতা করেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিব এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, আমরা তাসখন্দ চুক্তির বিষয়ে মোটেও উৎসাহিত নই, আমরা চাই পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। ১৯৬৬ সালের ১৬ জানুয়ারি ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাসায় শেখ সাহেবের বাসভবনে ওয়ার্কিং কমিটির সভার পর ঐ বিবৃতি দেওয়া হয়। অন্যদিকে আইয়ুব খানের পক্ষে এনডিএফের নেতা আতাউর রহমান পূর্ণ সমর্থন জ্ঞাপন করেন তাসখন্দ চুক্তির বিষয়ে। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ১৯৬৬ সালের ১৮ জানুয়ারি যুদ্ধকালীন জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। তাৎক্ষণিকভাবে আইয়ুব খানের মন্ত্রী খান আবদুস সবুর এক বিবৃতিতে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়ার দাবির নিন্দা জানান। ১৯৬৬ সালের ২১ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমান পাল্টা বিবৃতিতে বলেন, জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়াটা অসুবিধা হলে নিশ্চয়ই তাসখন্দ চুক্তিটা অর্থহীন।
এ সময়টা শেখ মুজিবের ওপর দমন নীতি চলে, সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুদিবসে প্রদত্তে ভাষণের জন্য মামলা চলছিল, তিনি জামিনে ছিলেন, ১৯৬৬ সালের ২৩ জানুয়ারি ঐ মামলার শুনানিকালে তার জামিন নামঞ্জুর হয়ে যায়, সঙ্গে সঙ্গেই হাইকোর্ট থেকে জামিন নেওয়া হয়। ১৯৬৬ সালের ৩১ জানুয়ারি এনএসএফের সম্মেলনে মোনেম খাঁ বলেন, দুষ্কৃতিকারীরা পাকিস্তান ভাঙতে চায়। তিনি চরম হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেন। এতে বোঝা গেল পাকিস্তানের বিরোধী দলগুলোর ওপর সরকার কড়া মনোভাব নিচ্ছে।
১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি নেজামে ইসলাম প্রধান লাহোরের চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর বাসভবনে পাকিস্তানের সবগুলো বিরোধী দলের সভা বসে। কিন্তু তার আগে ৫ ফেব্রুয়ারি সরকার ঐ বৈঠকের সকল খবর প্রকাশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করার জন্য নির্দেশ জারি করেন। বৈঠকেই বঙ্গবন্ধু ৬-দফা দাবি পেশ করেন। কিন্তু বিরোধী দলগুলো কোনো অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসন নিয়ে কথা না তোলার জন্য আহ্বান জানায়। আওয়ামী লীগ বৈঠক বর্জন করে। ঐ দিনেই তিনি লাহোরে সাংবাদিক সম্মেলন করে ৬-দফা ঘোষণা করেন। ১৯৬৬ সালের ৭ মার্চ পাকিস্তানের সকল পত্রপত্রিকায় ৬-দফার খবর ছাপা হয়। ১৯৬৬ সালের ১১ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঢাকা বিমান বন্দরে সাংবাদিক সম্মেলনে ৬-দফার ব্যাখ্যা প্রদান করেন। তিনি এটাকে বাঙালির বাঁচার দাবি বলে আখ্যায়িত করেন সেদিনই। কিন্তু অবাক ব্যাপার ছিল এটাই, তরুণ সমাজ তার প্রত্যাবর্তনের আগেই বরিশাল, ঢাকা, কুমিল্লা, নোয়াখালী, সিলেট, চট্টগ্রামসহ সর্বত্র পোস্টার এবং দেয়াল লিখনে ছেয়ে ফেলেছে ৬-দফার কথা। ৬-দফার প্রথম প্রচার পুস্তিকাটি প্রকাশিত হয় প্রচার সম্পাদক আবদুল মোমিন কর্তৃক, যা গ্লোব প্রিন্টার্স থেকে মুদ্রিত। পুস্তিকাটি সম্ভবত প্রথম প্রচার করা হয় ২১ ফেব্রুয়ারি শহিদ মিনারে। তখনই বোঝা যাচ্ছিল ৬-দফার ঝুঁকি এড়ানোর জন্য কেউ কেউ দল থেকে সরে যাওয়ার উদ্যোগ নিচ্ছে।
১৯৬৬ সালের ১২ মার্চ রমনা গ্রিনে বেসিক ডেমোক্রেসির জমায়েতে আইয়ুব খান স্পষ্টই বললেন, আওয়ামী লীগের ৬-দফা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য মারাত্মক। আইয়ুব এবং মোনেম দুজনেই দুষ্কৃতিকারীদের কঠোর হস্তে দমন করবেন বলে চরম হুঁশিয়ারি জানালেন। ১৯৬৬ সালের ১৩ মার্চ আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটিতে ৬-দফা অনুমোদনের জন্য পেশ করা হলে দলের সভাপতি এবং আরও কয়েকজন বিরোধিতা করেন। কাউন্সিল অধিবেশনেও ৬-দফা অনুমোদন নেওয়ার শর্তে ৬-দফা অনুমোদন করা হয়। অনুমোদনের আগেই সভাপতি সভাস্থল ত্যাগ করলে তার পরিবর্তে সভাপতিত্ব করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। অবশ্য ইতোপূর্বে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ মুষ্টিমেয়ের আপত্তি সত্ত্বেও ৬-দফার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানায়।

১৯৬৬ সালের ১৮ মার্চ মতিঝিলের হোটেল ইডেনে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন শুরু হয়। সভাপতি মাওলানা তর্কবাগীশ অনুপস্থিত থাকেন। ঐ কাউন্সিলেও ৬-দফা বিপুল সমর্থনে অনুমোদিত হয়। করাচি আওয়ামী লীগের সভাপতি মিয়া মঞ্জুরুল হক তার ভাষণে সর্বাত্মক সমর্থনের কথা ঘোষণা করেন। ১৯ মার্চ কাউন্সিল অধিবেশনে ওয়ার্কিং কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ঐদিনেই সন্ধ্যা নাগাদ কমিটিও অনুমোদন করেন কাউন্সিলররা। সর্বসম্মতিক্রমে সভাপতি নির্বাচিত হন শেখ মুজিবুর রহমান। সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আবদুস সালাম খান, খন্দকার মোশতাক আহমেদ, ক্যাপ্টেন এম মুনসুর আলী, মজিবর রহমান ও শাহ আজিজুর রহমান। সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ, সাংগঠনিক সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরী, শ্রম সম্পাদক জহুর আহমদ চৌধুরী, সমাজসেবা সম্পাদক ওবায়দুর রহমান, প্রচার সম্পাদক আবদুল মোমিন, মহিলা সম্পাদক আমেনা বেগম, দপ্তর সম্পাদক মাহমুদুল্লাহ, কোষাধ্যক্ষ হাফেজ মুসা। সদস্যগণ : লকিয়তুল্লাহ, এবিএম নুরুল ইসলাম, জাহির উদ্দিন, নুরুল ইসলাম চৌধুরী, আবদুর রহমান খান, এমএ রশিদ, রওশন আলী, মোমেন উদ্দিন আহমেদ, আতিউর রহমান, মোমিন উদ্দিন আহমদ, সা’দ আহমদ, জালাল উদ্দিন আহমদ, আমজাদ হোসেন, সোহরাব হোসেন, হোসেন মুনসুর, অধ্যাপক ইউসুফ আলী, আবদুল মালেক উকিল, নুরুল হক, বাহাউদ্দিন চৌধুরী, শামসুফ হক, শেখ আবদুল আজিজ, আফজাল হোসেন, জাকিরুল হক, মহিবুস সামাদ, আবদুর রশিদ তর্কবাগীশ ও মোল্লা জালাল উদ্দিন।
৬-দফাই পূর্ব পাকিস্তানের একমাত্র রাজনৈতিক বিষয় হয়ে ওঠে। পত্র-পত্রিকার রিপোর্ট থেকে জানা যায়, ৬-দফার প্রথম জনসভাটি হয়েছিল ১৯৬৬ সালের ২০ মার্চ। পূর্ব পাকিস্তানে ৬-দফার আন্দোলনই একমাত্র আন্দোলনে পরিগণিত হয়। বাঙালি মধ্যবিত্ত সমাজ অর্থনৈতিক টানাপোড়নে ৬-দফাকেই মুক্তির সনদ হিসেবে বিবেচনা করে। এত অল্প সময়ের মধ্যে ৬-দফা যে বাংলার প্রতিটি ঘরে পৌঁছে যাবে কেউই কল্পনা করতে পারেনি। বঙ্গবন্ধু প্রতিটি জনসভাতেই বলতেন, ওরা বেশি সময় দেবে না। দ্রুত নিজেদের আত্মত্যাগের জন্য তৈরি হতে হবে। ৬-দফা প্রচারে ছাত্রলীগের ভূমিকা ছিল সবচেয়ে উল্লেখ্যযোগ্য। ২০ মার্চের পর শেখ মুজিব সময় পেয়েছিলেন মাত্র পাঁচ সপ্তাহ। ৩৫ দিনে তিনি প্রায় ৩২টি মূল জনসভায় বক্তব্য রেখেছেন। পল্টনের জনসভার সময় আইনমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো চ্যালেঞ্জ করেছিলেন যে ৬-দফা পাকিস্তানের জনগণের জন্য যে আত্মঘাতি তা তিনি প্রমাণ করতে পারেন। শেখ মুজিব তার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু ভুট্টো আর এগোননি। ১৯৬৬ সালের ১৯ এপ্রিল খুলনায় তাকে গ্রেফতার করার প্রচেষ্টা চালানো হয়। পরে যশোর পুলিশ তাকে যশোরে গ্রেফতার করে ঢাকায় রাষ্ট্রদ্রোহী ভাষণ দেওয়ার অভিযোগে। সঙ্গে সঙ্গে জজকোর্ট থেকে জামিন নেওয়া হয়। ২২ এপ্রিল মুজিব ঢাকা এসডিও কোর্টে হাজির হন। এসডিও তার জামিন বাতিল করে গ্রেফতারের আদেশ দিলে জজকোর্ট থেকে আবার জামিন নেওয়া হয়। ২২ এপ্রিল রাত ১২টার সময় তাকে ৩২ নম্বর বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে সিলেট নিয়ে যাওয়া হয়, তিনি ১৯৬৬ সালের ৪ এপ্রিল সিলেটের জনসভায় ভাষণ দিয়েছিলেন। সিলেট প্রশাসন রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা করেছিল। ২৩ এপ্রিল সিলেট জজকোর্টে তার জামিন হলে জেলগেট থেকে বের হওয়ার আগেই পুলিশ ময়মনসিংহের ভাষণের মামলার জন্য তাকে গ্রেফতার করে ময়মনসিংহ নিয়ে যায়। সিলেট প্রচ- বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। ময়মনসিংহের জজকোর্টে জামিনের আবেদন জানানো হয় ১৯৬৬ সালের ২৫ এপ্রিল। জামিন মঞ্জুর হয়। ১৯৬৬ সালের ২৬ এপ্রিল তিনি ঢাকায় ফিরে আসেন। ছাত্রলীগ এবং আওয়ামী লীগ ভিন্ন ভিন্নভাবে সারাদেশে ৬-দফার প্রচারের মাত্রা আরও বাড়িয়ে দেয়। ১৯৬৬ সালের ৩০ এপ্রিল মাদারীপুর, ৩ মে নরসিংদী, ৫ মে ব্রাহ্মণবাড়িয়া এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ফিরে শেখ মুজিব ১৫ পুরানা পল্টন আওয়ামী লীগ অফিসে বসে বেশ নিশ্চিন্তে জানালেন, ৬-দফার আন্দোলন এমন এক পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যে পৃথিবীর কোনো শক্তি নেই তা স্তব্ধ করে দিতে পারে। ১৯৬৬ সালের ৭ মে ওয়ার্কিং কমিটির সভায় তিনি ৬-দফা আন্দোলনের কর্মসূচি নতুন করে তৈরি করেন। ১৯৬৬ সালের ৮ মে তিনি নারায়ণগঞ্জে বিশাল জনসভা করলেন। এটাই ছিল তার ৬-দফার শেষ জনসভা। সম্ভবত তিনি নিজেও তা আগে থেকেই জানতেন। বক্তৃতায় তিনি সকলকে বৃহত্তর আত্মত্যাগের আহ্বান জানিয়ে তার নিজের অবস্থার কথাও ব্যাখ্যা করেছেন। ঐদিনই গভীর রাতে ৩২ নম্বরের বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করে সরাসরি জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। এবার তার বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্নতার অভিযোগ দাঁড় করানো হয় ৩২ ধারা মোতাবেক। কঠোরতম দেশরক্ষা আইনে। ঐ সময়ই গ্রেফতার করা হয়েছিল তাজউদ্দীন আহমদ, আবদুল মোমিন, শামসুল হক, মোল্লা জালাল উদ্দিন, ক্যাপ্টেন মুনসুর আলী, মোস্তফা সরোয়ার, মহিউদ্দিন আহমদ, মোহাম্মদ উল্লাহ, সিরাজউদ্দিন আহমদ, শাহবুদ্দিন চৌধুরী, সুলতান আহমদ, শেখ ফজলুল হক মনি প্রমুখকে। এ সময়ই সারাদেশে হাজার হাজার আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। অন্যদিকে যারা ৬-দফার বিরোধিতা করে পিডিএম নামক পাল্টা আওয়ামী লীগ গঠন করেছিলেন, তাদের স্পর্শ করা হলো না। বঙ্গবন্ধুসহ রাজবন্দিদের মুক্তি ও ৬-দফার সমর্থনে ১৩ মে পল্টনের জনসভা থেকে ৭ জুনের হরতাল ঘোষণা।

৬-দফায় বিরোধিতার কথা এখানে কিছুটা উল্লেখ করা প্রয়োজন : হারবার্ড ফেল্ডম্যান প্রথম বলেন, ওটা শেখ মুজিব রচনা করেনি। অলি আহাদ বলেন, তারা ৬-দফার আগেই ৭-দফা রচনা করেছিল। আর মওলানা ভাসানীর মতে, ওটা আসলে কারোরই নয়, ওটা সিআইএ-র দলিল। ভাসানীর কাছে তার প্রমাণ আছে বলে দাবি করলেও, সাংবাদিকদের চাপের মুখে কোনোদিনই তিনি তা দেখাতে পারেননি। পরে অবশ্য বলেছিলেন, দলিলটি তিনি তার সাধারণ সম্পাদক তোয়াহাকে দিয়েছিলেন। পরে মোহাম্মদ তোয়াহা জানান, মওলানা ভাসানী কোনোদিনই ঐ রকম কিছু তাকে দেননি। এসব অপপ্রচারের কারণ আমরা জানি।
৭ জুন তেজগাঁওয়ে বেঙ্গল বেভারেজের শ্রমিক সিলেটের মনু মিয়া গুলিতে প্রাণ হারান। এতে বিক্ষোভের প্রচ-তা আরও বাড়ে। তেজগাঁওয়ে ট্রেন বন্ধ হয়ে যায়। আদাজ এনামেল অ্যালুমনিয়াম কারখানার নোয়াখালীর শ্রমিক আবুল হোসেন ইপিআরের গুলিতে শহিদ হন। বিকালের দিকে নারায়ণগঞ্জে রেলওয়ে স্টেশনের কাছে পুলিশের গুলিতে মারা যান ছয়জন শ্রমিক। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সন্ধ্যায় কারফিউ জারি করা হয়। দুই শহরে প্রায় ১ হাজার গ্রেফতার হয়। এ সময় বিক্ষুব্ধ জনতা নারায়ণগঞ্জের থানা থেকে বন্দিদের ছাড়িয়ে আনতেও দ্বিধা করে না। ফলে ১৯৬৬ সালের ১৩ জুনের মধ্যে আওয়ামী লীগের তৃতীয়সারির নেতারাও গ্রেফতার হন। ১৫ জুন ইত্তেফাকের সম্পাদক মানিক মিয়াকেও গ্রেফতার করা হয়। ১৬ জুন ইত্তেফাক এবং নিউনেশন প্রিন্টিং প্রেস নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়।
পিডিএম এবং মওলানা ভাসানী যতই সিআইএ-র উসকানি বলেন, বিবৃতি দিক না কেন, আন্দোলন এগিয়ে যেতে থাকে। চিহ্নিত নেতাকর্মীদের গ্রেফতার করেও কোনো লাভ হয় না। এরই মধ্যে ১৯৬৬ সালের ১৯ আগস্ট আওয়ামী লীগের একটি কাউন্সিল অধিবেশন হয়। ঐ অধিবেশন থেকে সকল বন্দির মুক্তি দাবি করা হয় এবং ৬-দফাই বাংলার মানুষের মুক্তির সনদ বলে উল্লেখ করা হয়। ১৯৬৬ সালের ৩০ আগস্ট মওলানা ভাসানী ন্যাপের জনসভায় প্রথমবারের মতো শেখ মুজিবের মুক্তি দাবি করেন, ৬-দফার বিরোধিতাও করেন। তখন বাংলার ঘরে ঘরে শেখ মুজিবের নাম পৌঁছে গেছে। ক্রমেই জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে যাচ্ছেন। বাংলার বিভিন্ন স্থানে তখন ধরপাকড় চলছিল। সমানতালে ৬-দফার আন্দোলনও চলছিল।
১৯৬৮ সালের জানুয়ারি সরকারি প্রেসনোটে উল্লেখ করা হলো, ভারতীয় হাইকমিশনের ফার্স্ট সেক্রেটারি মিস্টার ওঝার সঙ্গে যোগসাজশে পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীন করার যে ষড়যন্ত্র হয়েছিল, সরকার তার বিরুদ্ধে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। এ যাবত বিভিন্ন বিভাগের ১৯ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযুক্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। ইতিহাসে এটাই ‘আগরতলা মামলা’ নামে পরিচিত, যদিও মামলার শিরোনাম ছিল শেখ মুজিবুর রহমান গং বনাম পাকিস্তান। ১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি ঢাকা জেলে বন্দি শেখ মুজিবুর রহমানকে জানানো হয়েছিল যে তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এটা ছিল গভীর রাতের ঘটনা। জেলগেটেই শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হলো। উল্লেখ করা যেতে পারে, এবার ১৯৬৬ সালের ৮ মে থেকে ১৯৬৮ সালের ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত ঢাকা জেলে ছিলেন তিনি। ১৯৬৮ সালের ২৩ জুন সৈয়দ নজরুল ইসলামের একটি বিবৃতি প্রকাশিত হয়, যা লিফলেট আকারে হাজার হাজার কপি সারাদেশে বিলি করা হয়েছিল। এতে উল্লেখ ছিল, ১৭ জানুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানকে ঢাকা জেলগেট থেকে ধরে পশ্চিমা আর্মিরা কোথায় নিয়ে গেছে, কাউকে জানানো হয়নি। ১৯৬৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানসহ আগরতলা মামলায় অভিযুুক্ত সবার মুক্তির দাবিতে দেশের প্রায় সবগুলো শহর থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। বহু গ্রেফতার হয়। ১৯৬৮ সালের ২১ এপ্রিল পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের এক অর্ডিন্যান্সে জানানো হয় যে, পাকিস্তান পেনাল কোডের ১২১ এবং ১৩১ ধারায় শেখ মুজিবুর রহমানসহ অন্যদের বিচার করা হবে। এ জন্য ঢাকায় বিশেষ একটি আদালত গঠন করা হয় সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি এসএ রহমান ও পূর্ব পাকিস্তান হাইকোর্টের বিচারপতি মুজিবর ও মাকসুদুল হাকিমের সমন্বয় গঠিত কুর্মিটোলা সেনানিবাসের বিশেষ আদালতে ১৯৬৮ সালের ১৯ জুন বিচার শুরু হয়। অভিযুক্তদের নাম এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন। শেখ মুজিবুর রহমান, লে. কমান্ডার মোয়াজ্জেম হোসেন, স্টুয়ার্ড মজিবর রহমান, এলএস সুলতান আহমদ, এলএসডিআই নুর মোহাম্মদ, আহমদ ফজলুর রহমান সিএসপি, ফ্লাইট সার্জেন্ট মফিজুল্লাহ, আবুল বাশার মোহাম্মদ আবদুস সামাদ, প্রাক্তন হাবিলদার দলিল উদ্দিন, ফ্লাইট সার্জেন্ট মোহাম্মদ ফজলুল হক, খন্দকার রুহুল কুদ্দুস সিএসপি, বিভূতিভূষণ ওরফে মানিক চৌধুরী, বিধানকৃষ্ণ সেন, সুবেদার আবদুর রাজ্জাক, সার্জেন্ট জহিরুল হক, ক্লার্ক মজিবর রহমান, প্রাক্তন সার্জেন্ট মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক, প্রাক্তন এটি মোহাম্মদ খুরশিদ, খান এম শামসুর রহমান সিএসপি, হাবিলদার একেএম শামসুল হক, হাবিলদার আজিজুল হক, এএসপি মাহফুজুল বারী, সার্জেন্ট শামসুল হক, মেজর শামসুল আলম, ক্যাপ্টেন আবদুল মোতালেব, ক্যাপ্টেন এম শওকত আলী, ক্যাপ্টেন নাজমুল হুদা, ক্যাপ্টেন এএনএম রহমান, প্রাক্তন সুবেদার এএকে তাজুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলী রেজা, ক্যাপ্টেন খুরশিদ উদ্দিন আহমদ ও ফার্স্ট লে. আবদুর রউফ। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ থেকে ৬ ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়; আগরতলা মামলা প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত সংগ্রাম চলবে।
১৯৬৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি সেনাবাহিনী আগরতলা মামলার অন্যতম আসামি সার্জেন্ট ফজলুল হক ও সার্জেন্ট জহিরুল হকের ওপর গুলি চালায়। সার্জেন্ট জহিরুল হক ঘটনাস্থলেই নিহত হন। কেউ কেউ এটা আইয়ুব খানবিরোধী সামরিক চক্রের ষড়যন্ত্র বললেও, খবরটি ঢাকায় ছড়িয়ে পড়লে প্রচ- বিস্ফোরণ ঘটে। পল্টনে সার্জেন্ট জহিরুল হকের লাশ নিয়ে আসা হলো। এখানে জানাজা অনুষ্ঠিত হলো। কারফিউ জারি করা হয়। কিন্তু বিভিন্ন স্থানে বেরিকেড দিয়ে ছাত্র-জনতা-মিলিটারি প্রতিরোধ করে। এ ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে প্রায় বিনা উসকানিতে ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. শামসুজ্জোহাকে বেয়োনেট চার্জ করে হত্যা করে। ঢাকাসহ সারা বাংলাদেশে প্রজ্বলিত হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সেনাবাহিনীর পক্ষেও অসম্ভব হয়ে ওঠে। সারাদেশ থেকে মৃত্যুর খবর আসতে থাকে। আগরতলা মামলার বিচারকের অস্থায়ী বাসভবনসহ আইয়ুব খানের ১০ জন মন্ত্রীর বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। ঢাকা সেনানিবাস যে কোনো সময় জনগণ দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে, এ-ধরনের আশঙ্কার কথাও ক্ষমতাসীন মহল চিন্তা করতে থাকে। ১৮ ফেব্রুয়ারি কঠোর কারাফিউ বলবৎ করা হয়। ছাত্র-জনতা শহরের বিভিন্ন স্থানে কারফিউ ভেঙে রাজপথে নেমে আসে। পরিস্থিতি গৃহযুদ্ধের দিকে যাচ্ছে। ১৯৬৯ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান সমস্ত রাজনৈতিক দলের সাথে বৈঠকের প্রস্তাব দেন। আগরতলা মামলায় জামিনের কোনো বিধান না থাকার কারণে বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে নেওয়ার কথা বলা হয়। আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ মোটামুটি এই প্রস্তাব সম্মতি জ্ঞাপন করেন; কিস্তু বাধ সাধলেন বেগম মুজিব; তিনি ক্যান্টনমেন্ট গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করে প্যারোলে না যাওয়ার জন্য বললে তা ভুল হয়।
১৯৬৯ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান এক বেতার ভাষণে ঘোষণা করলেন, তিনি আর কখনও প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াবেন না। আগরতলা মামলা খারিজ করা হলো এবং তিনি বিরোধী দলের নেতাদের সঙ্গে বসে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা চান। আনন্দ উল্লাসিত জনতার ঢল নামে রাজপথে। ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি শেখ মুজিবুর রহমানসহ সকল বন্দিকে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদ লক্ষ জনতার অনুমোদনক্রমে তাকে বঙ্গবন্ধু অভিধায় ভূষিত করেন। এখানেই বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন ৬-দফা বাঙালির মুক্তির সনদ। ৬-দফার ব্যাপারে কোনো আপস নেই। যেখানে যার সঙ্গেই সংলাপ হোক না কেন।
১৯৬৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাওয়ালপিন্ডিতে গোলটেবিল বৈঠক বসে। আইয়ুব খানের পক্ষ থেকে ১৫ জন, নির্দলীয় দুজন এবং ১৬ জন রাজনীতিক নেতৃবৃন্দ আলোচনায় অংশ নেন। আলোচনা সফল হয় না, ১০ মার্চ পর্যন্ত আলোচনা মুলতবি রাখা হয়। ১৯৬৯ সালের ১০ মার্চ আবার গোলটেবিল বৈঠক শুরু হয়। ৬-দফাই ছিল মূল আলোচ্য বিষয়। বঙ্গবন্ধুকে ৬-দফার একটি দফা প্রত্যাহার করার অনুরোধ জানানো হয়; কিন্তু তিনি তা নাকচ করেন। ফলে আলোচনা ভেঙে যায়। অবশেষে ১৯৬৯ সালের ২৪ মার্চ ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের সামরিক আইন জারি করে সমস্ত জেনারেল ইয়াহিয়ার হাতে ন্যস্ত করে ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ান।
১৯৬৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইয়াহিয়া পাকিস্তানের এই ইউনিট বাতিল, সমগ্র পাকিস্তানে বয়স্ক ভোটাধিকারের ভিত্তিতে ১৯৭০ সালের ৫ অক্টোবর জাতীয় পরিষদের এবং ১৯৭০ সালের ২২ অক্টোবরের মধ্যে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের কথা ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময় ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনের তারিখ ৭ ডিসেম্বর এবং প্রাদেশিক পরিষদের ১৭ ডিসেম্বর পুনর্নির্ধারণ করেন। ১৯৭০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে প্রকাশ্যে রাজনীতি অনুমোদন করে। ঢাকায় আওয়ামী লীগের প্রথম জনসভা হয় ১১ জানুয়ারি পল্টন ময়দানে। গোলটেবিল বৈঠকে আওয়ামী লীগের ৬-দফার পক্ষে একটি দলও সমর্থন দেয়নি। বঙ্গবন্ধু ঘরোয়া রাজনীতির মধ্যেই বেশ অনেকগুলো জেলায় সাংগঠনিক সফর করেন। অন্যদিকে ১৯৬৯ সালের ১০ মার্চ মওলানা ভাসানী পশ্চিম পাকিস্তান নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে তিন-দফা চুক্তিতে আবদ্ধ হন।
১৯৭০ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঢাকার রেসকোর্স ময়দান (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) থেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। এ সময় মওলানা ভাসানী ‘ভোটের আগে ভাত চাই’ স্লোগান দিয়ে নেমে পড়লেন। ১৯৭০ সালের ৪-৫ জুন আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন বসে মতিঝিলের হোটেল ইডেনে। শেখ মুজিবুর রহমানকে সভাপতি ও তাজউদ্দীন আহমদকে সাধারণ সম্পাদক মনোনীত করা হয়। কাউন্সিল অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেন, বাঙালি জাতির মুক্তির আন্দোলনে আওয়ামী লীগকে একাই লড়ে যেতে হবে। আওয়ামী লীগের কোনো বন্ধু নাই। আওয়ামী লীগ চায় জনগণের মুক্তি। ৬-দফা জনগণের মুক্তির সনদ। এই ৬-দফার জন্য আমি সবকিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত; আপনারাও যে কোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকবেন। যে কোনো সময় ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। কোনো অবস্থাতেই আমি আপস করব না।
১৯৭০ সালের ৭ জুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান এবং সবাইকে যার যারা বাড়িতে পোস্টকার্ডের মাধ্যমে ভোটের প্রচারে অংশগ্রহণের জন্য বলেন। তিনি দ্বিতীয় রাজধানী আইয়ুবনগরের বদলে শেরে বাংলানগর এবং রেসকোর্সের নাম পরিবর্তন করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ঘোষণা দেন।
১৯৭০ সালের ২৮ অক্টোবর রেডিও/টেলিভিশনে ৩০ মিনিটের নির্বাচনী ভাষণ দেন।
ভাষণে প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল-
ক. কৃষকদের স্বার্থ ভূমি ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস।
খ. যমুনা নদীর ওপর অগ্রাধিকারভিত্তিতে সেতু নির্মাণ এবং সিন্ধু, বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা ও কর্ণফুলির ওপর সেতু নির্মাণ।
গ. জাতীয় উৎপাদনের ন্যূনতম ৪ শতাংশ শিক্ষা খাতে ব্যয়।
ঘ. প্রতি ইউনিয়নে একটি করে পল্লি চিকিৎসা কেন্দ্র এবং থানা সদরে হাসপাতাল নির্মাণ।
ঙ. কোরআন সুন্নাহবিরোধী কোনো আইন প্রণয়ন না করা।
চ. স্বাধীন ও জোট নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ।
ছ. ফারাক্কা বাঁধ সমস্যার ন্যায়সংগত সমাধান।
জ. ৬-দফার ভিত্তিতে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন।
ঝ. ব্যাংক, বীমা জাতীয়করণ করা।
ঞ. উপজাতীয় এলাকা উন্নয়নের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা।
ট. জাতীয় জীবনের সাথে মোহাজের একাত্ম করা।

নির্বাচনী প্রচারকার্য পরিচালনার সময় ১১ নভেম্বর উপকূলীয় অঞ্চলে এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে। প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে লাখ লাখ মানুষ ভেসে যায় ও মারা যায়; লাখ লাখ মানুষ গৃহহীন হয়। সমস্ত গবাদি পশু ভেসে যায়। উদ্ধার কাজ ছিল অত্যন্ত দুর্বল। প্রদেশে মাত্র একটি হেলিকপ্টার ছিল আর পশ্চিম পাকিস্তানে ৫৯টি হেলিকপ্টার অলস বসে ছিল। ঘূর্ণিঝড়/জলোচ্ছ্বাসের খবরে বঙ্গবন্ধু নির্বাচনী প্রচার বন্ধ করে ছুটে আসেন উপকূলীয় অঞ্চলে এবং উদ্ধার কাজে অংশগ্রহণ করেন।


২৬ নভেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, পূর্ব পাকিস্তানের এই দুর্দিনে প্রেসিডেন্টসহ ওরা কেউ দেখতে আসেনি। এটি প্রকৃতপক্ষে ঠা-া মাথার খুন। আমার ক্ষমতা থাকলে আমি তাদের বিচার করতাম। কোটিপতি বস্ত্র মালিকরা এক গজ কাপড় দিয়ে সাহায্য করেনি। এতবড় সেনাবাহিনী থাকা সত্ত্বেও লাশ দাফন করতে ব্রিটিশ মেরিনদের সাহায্য নিতে হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই অজুহাতে নির্বাচন পেছানোর চেষ্টা হলে গৃহযুদ্ধ হবে। পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাবে। ১০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছে, প্রয়োজনে আরও ১০ লাখ মানুষ জীবন দেবে। দুর্গত এলাকার জাতীয় পরিষদের ৯টি এবং প্রাদেশিক পরিষদের ২১টি বাদে সঠিক তারিখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। মওলানা ভাসানী প্রথমেই বলেছিলেন, ভোটের আগে ভাত চাই; উনিসহ যারা এলএফও-র আন্ডারে নির্বাচন হতে পারে না, নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করেছিলেন, তারাই এই সুযোগ নিতে চেয়েছিলেন। নির্বাচনের দুদিন আগে মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার ব্লাড-কে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, পিভিপির নুরুল আমিন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী চাকমা ত্রিদিব রায় ছাড়া সব সিট উনি পাবেন, বাস্তবেও হয়েছিল তাই।
১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি নির্বাচিত সমস্ত এমএলএও এমপিদের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় বঙ্গবন্ধু বললেন ৬-দফা এখন আর আমার বা আওয়ামী লীগের দাবি নয়। বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের দাবি। এর সাথে আপস করার অধিকার কারও নাই। আমার কোনো এমএলএ/এমপি যদি বিশ্বাসঘাতকতা করে তাদের জ্যান্ত করব দিয়ে দিবেন এবং এরপর থেকেই পাকিস্তানিদের চিন্তা-ভাবনার পরিবর্তন হতে থাকে।
৩ মার্চ সংসদ অধিবেশন ডাকা হয়েছিল। ভুট্টোর হুঙ্কার (যারা অধিবেশনে যাবে পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে দেওয়া হবে। উপেক্ষা করে ৩৫ জন সংসদ পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। হঠাৎ করে ১ মার্চ সংসদ অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করা হলো। ঢাকাসহ সারাদেশের জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিক্ষোভে ফেটে পড়ল। পাকিস্তানি পতাকা পোড়ানো শুরু হলো। সেøাগান উঠলÑ ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’; ‘তোমার নেতা আমার নেতা, শেখ মুজিব শেখ মুজিব’; ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’ ইত্যাদি।
৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভাকে কেন্দ্র করে প্রচার ছিল বোম্বিং হবে, সকাল থেকে হেলিকপ্টার ঘুরছিল। সেই অবস্থায় ১০ লাখ লোক উপস্থিত হয়।
বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ১০ লাখ লোকের উপস্থিতিতে বলেছিলেন :

“ভাইয়েরা আমার;
আজ দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। আপনারা সবই জানেন এবং বুঝেন। আমরা আমাদের জীবন দিয়ে চেষ্টা করেছি। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরে আমার ভাইয়ের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়েছে।
আজ বাংলার মানুষ মুক্তি চায়, বাংলার মানুষ বাঁচতে চায়, বাংলার মানুষ তার অধিকার চায়। কি অন্যায় করেছিলাম, নির্বাচনে বাংলাদেশের মানুষ সম্পূর্ণভাবে আমাকে আওয়ামী লীগকে ভোট দেন। আমাদের ন্যাশনাল এসেম্বলি বসবে, আমরা সেখানে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করবো এবং এই দেশকে আমরা গড়ে তুলবো, এদেশের মানুষ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তি পাবে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ দুঃখের সঙ্গে বলতে হয়, তেইশ বৎসরের করুণ ইতিহাস বাংলার অত্যাচারের, বাংলার মানুষের রক্তের ইতিহাস। তেইশ বৎসরের ইতিহাস মুমূর্ষু নর-নারীর আর্তনাদের ইতিহাস; বাংলার ইতিহাস এদেশের মানুষের রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করার ইতিহাস। ১৯৫২ সালে রক্ত দিয়েছি। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করেও আমরা গদিতে বসতে পারি নাই। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল’ জারি করে ১০ বৎসর পর্যন্ত আমাদের গোলাম করে রেখেছে। ১৯৬৬ সালে ৬-দফা আন্দোলনে ৭ই জুনে আমার ছেলেদের গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ১৯৬৯-এর আন্দোলনে আইয়ুব খানের পতন হওয়ার পর যখন ইয়াহিয়া খান সাহেব সরকার নিলেন, তিনি বললেন, দেশে শাসনতন্ত্র দেবেন, গণতন্ত্র দেবেন। আমরা মেনে নিলাম।
তারপরে অনেক ইতিহাস হয়ে গেল, নির্বাচন হলো। আমি প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান সাহেবের সঙ্গে দেখা করেছি। আমি, শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসাবে তাকে অনুরোধ করলাম, ১৫ই ফেব্রুয়ারি তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না, তিনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা। তিনি বললেন, প্রথম সপ্তাহে মার্চ মাসে হবে। আমরা বললাম, ঠিক আছে, আমরা এসেম্বলিতে বসবো। আমি বললাম, এসেম্বলির মধ্যে আলোচনা করবো; এমনকি আমি এ পর্যন্ত বললাম, যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও, একজনও যদি সে হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।
জনাব ভুট্টো সাহেব এখানে এসেছিলেন, আলোচনা করলেন। বলে গেলেন যে, আলোচনার দরজা বন্ধ না, আরও আলোচনা হবে। তারপর অন্যান্য নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলাপ করলাম, আপনারা আসুন বসুন, আমরা আলাপ করে শাসনতন্ত্র তৈয়ার করি। তিনি বললেন, পশ্চিম পাকিস্তানের মেম্বাররা যদি এখানে আসেন, তাহলে কসাইখানা হবে এসেম্বলি। তিনি বললেন, যে যাবে তাকে মেরে ফেলে দেওয়া হবে। যদি কেউ এসেম্বলিতে আসে তাহলে পেশোয়ার থেকে করাচি পর্যন্ত দোকান জোর করে বন্ধ করা হবে। আমি বললাম, এসেম্বলি চলবে। তারপর হঠাৎ ১ তারিখে এসেম্বলি বন্ধ করে দেওয়া হলো।
ইয়াহিয়া খান সাহেব প্রেসিডেন্ট হিসাবে এসেম্বলি ডেকেছিলেন। আমি বললাম যে, আমি যাবো। ভুট্টো সাহেব বললেন, তিনি যাবেন না। ৩৫ জন সদস্য পশ্চিম পাকিস্তান থেকে এখানে আসলেন। তারপরে হঠাৎ বন্ধ করে দেওয়া হলো। দোষ দেওয়া হলো বাংলার মানুষকে, দোষ দেওয়া হলো আমাকে। বন্দুকের মুখে মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠল।
আমি বললাম, শান্তিপূর্ণভাবে আপনারা হরতাল পালন করেন। আমি বললাম, আপনারা কলকারখানা সব কিছু বন্ধ করে দেন। জনগণ সাড়া দিল। আপন ইচ্ছায় জনগণ রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। তারা শান্তিপূর্ণভাবে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলো।
কি পেলাম আমরা? যে আমার পয়সা দিয়ে অস্ত্র কিনেছি বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশকে রক্ষা করার জন্য, আজ সেই অস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে আমার দেশের গরিব-দুঃখী আর্ত-মানুষের বিরুদ্ধে, তার বুকের উপর হচ্ছে গুলি। আমরা পাকিস্তানের সংখ্যাগুরু। আমরা বাঙালিরা যখনই ক্ষমতায় যাবার চেষ্টা করেছি, তখনই তারা আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। টেলিফোনে আমার সঙ্গে তার কথা হয়। তাকে আমি বলেছিলাম, জনাব ইয়াহিয়া খান সাহেব, আপনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, দেখে যান কিভাবে আমার গরীবের উপরে, আমার বাংলার মানুষের উপরে গুলি করা হয়েছে, কি করে আমার মায়ের কোল খালি করা হয়েছে। আপনি আসুন, দেখুন, বিচার করুন। তিনি বললেন, আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি ১০ই তারিখে রাউন্ড টেবিল কনফারেন্স ডাকব।
আমি বলেছি, কীসের বৈঠক বসবে, কার সঙ্গে বসবো? যারা আমার মানুষের বুকের রক্ত নিয়েছে তাদের সঙ্গে বসবো? হঠাৎ আমার সঙ্গে পরামর্শ না করে পাঁচ ঘণ্টা গোপনে বৈঠক করে যে বক্তৃতা তিনি করেছেন, সমস্ত দোষ তিনি আমার উপরে দিয়েছেন, বাংলার মানুষের উপর দিয়েছেন।

ভাইয়েরা আমার,
২৫ তারিখে এসেম্বলি কল করেছে। রক্তের দাগ শুকায় নাই। আমি ১০ তারিখে বলে দিয়েছি যে, ওই শহীদের রক্তের উপর পা দিয়ে কিছুতেই মুজিবুর রহমান যোগদান করতে পারে না। এসেম্বলি কল করেছে। আমার দাবি মানতে হবে : প্রথম, সামরিক আইন মার্শাল ল’ উইথ্ড্র করতে হবে, সমস্ত সামরিক বাহিনীর লোকদের ব্যারাকে ফেরত নিতে হবে, যেভাবে হত্যা করা হয়েছে তার তদন্ত করতে হবে, আর জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। তারপর বিবেচনা করে দেখবো, আমরা এসেম্বলিতে বসতে পারবো কি পারবো না। এর পূর্বে এসেম্বলিতে বসতে আমরা পারি না।
আমি, আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এদেশের মানুষের অধিকার চাই। আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দিবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাচারি, আদালত-ফৌজদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে। গরীবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে, সে জন্য সমস্ত অন্যান্য জিনিসগুলো আছে সেগুলির হরতাল কাল থেকে চলবে না। রিকশা, গরুর গাড়ি চলবে, রেল চলবে, লঞ্চ চলবে; শুধু সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমিগভর্নমেন্ট দপ্তরগুলো, ওয়াপদা কোন কিছু চলবে না।
২৮ তারিখে কর্মচারীরা বেতন নিয়ে আসবেন। এর পরে যদি বেতন দেওয়া না হয়, আর যদি একটা গুলি চলে, আর যদি আমার লোকদের হত্যা করা হয়, তোমাদের কাছে আমার অনুরোধ রইল,Ñ প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে, এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু, আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি, তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারবো, আমরা পানিতে মারবো। তোমরা আমার ভাই, তোমরা ব্যারাকে থাকো, কেউ তোমাদের কিছু বলবে না। কিন্তু আর আমার বুকের উপর গুলি চালাবার চেষ্টা করো না। সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দমাতে পারবে না।
আর যে সমস্ত লোক শহীদ হয়েছে, আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে, আমরা আওয়ামী লীগের থেকে যদ্দুর পারি তাদের সাহায্য করতে চেষ্টা করবো। যারা পারেন আমার রিলিফ কমিটিতে সামান্য টাকা পয়সা পৌঁছিয়ে দেবেন। আর এই সাত দিন হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইরা যোগদান করেছেন, প্রত্যেকটা শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছায়ে দেবেন। সরকারি কর্মচারীদের বলি, আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হবে খাজনা-ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো, কেউ দেবে না। মনে রাখবেন, শত্রুবাহিনী ঢুকেছে, নিজেদের মধ্যে আত্মকলহ সৃষ্টি করবে, লুটপাট করবে। এই বাংলায় হিন্দু মুসলমান বাঙালি অবাঙালি যারা আছে তারা আমাদের ভাই। তাদের রক্ষার দায়িত্ব আপনাদের উপরে। আমাদের যেন বদনাম না হয়। মনে রাখবেন রেডিও টেলিভিশনের কর্মচারীরা, যদি রেডিওতে আমাদের কথা না শোনেন, তাহলে কোন বাঙালি রেডিও স্টেশনে যাবেন না। যদি টেলিভিশন আমাদের নিউজ না দেয়, কোন বাঙালি টেলিভিশনে যাবেন না। দুই ঘণ্টা ব্যাংক খোলা থাকবে যাতে মানুষ তাদের মায়নাপত্র নিবার পারে। কিন্তু পূর্ববাংলা থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে এক পয়সাও চালান হতে পারবে না। টেলিফোন টেলিগ্রাম আমাদের এই পূর্ব বাংলায় চলবে এবং বিদেশের সঙ্গে নিউজ পাঠাতে চালাবেন। কিন্তু যদি এদেশের মানুষকে খতম করার চেষ্টা করা হয়, বাঙালিরা বুঝে শুনে কাজ করবেন। প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোল এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দিব। এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা। জয় বাংলা।”

লেখক : সংসদ সদস্য ও উপদেষ্টাম-লীর সদস্য
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply